ধর্মের কী দোষ! জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে-(৪)

By |2018-03-15T21:50:33+00:00মার্চ 15, 2018|Categories: ব্লগাড্ডা|3 Comments

লিখেছেন: সুমন চৌকিদার।

যা প্রমাণিত সত্য নয় বা অনুমান নির্ভর সত্য, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু ‘মহাসত্য’ নিয়ে বিতর্কের প্রশ্নই ওঠে না। সামান্য বিতর্ক থাকলে তা ‘মহাসত্য’ হতে পারে না। এই সহজ কথাটি বোঝার জন্য আইনস্টাইন হতে হয় না। অর্থাৎ ধর্মের ফাঁকি বুঝতে হলে শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, অনুসন্ধিৎসু হতে হবে। জানি না, মানুষ কী সত্যিই বোঝে না, নাকি বংশানুক্রমে না বোঝার ভান করেই চলবে? বলছি, মহাসত্য(!) ধর্ম নিয়ে যতো বিতর্ক, বিভক্তি, বিভ্রান্তি… এতো বিপুল বিতর্ক, বিভক্তি, বিভ্রান্তি… এ পৃথিবীতে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আজ পর্যন্ত হয়নি, আর হবেও না। শুধু ধর্মে-ধর্মেই নয়, একই ধর্মের শত-সহস্র মতবাদ থাকা সত্ত্বেও, কী করে যে তা মহাসত্য(!) কিংবা সর্বশ্রেষ্ঠ(!), ধার্মিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিগণের বোধগম্য হলেও, এ অধমের বোধগম্য নয়। কারণ প্রমাণিত সত্য বা মহাসত্য কখনো বিভক্ত, বিতর্ক, মিথ্যাচার, হুমকি, ভয়ভীতি, আস্ফলন, অহংকার, গর্ব, দাঙ্গা-যুদ্ধ, খুনাখুনি… করে না বরং মিথ্যাই এসব করে! অতএব মিথ্যাকে সত্য বানাতে গেলে, সত্য তো হবেই না বরং বিরামহীনভাবে বিতর্কের পর বিতর্ক, বিবাদের পর বিবাদ বাঁধবেই (যা চলছেই)।

কেননা যে পথ সত্যের বিরুদ্ধে, সে পথ অবশ্যই ভয়ংকর। যদিও ধর্ম শিক্ষা দেয়, মিথ্যা বলা পাপ/অন্যায়। অথচ ধর্ম নিজেই বহু মিথ্যাই শুধু নয়, ছলনা, কুটকৌশল, বিভ্রান্তি, বিতর্ক, ঘৃণা, যুদ্ধ-দাঙ্গা… এসবেরও শিরোমনি। ধর্ম না হয়ে অন্য কোনো বিষয় এমন অন্যায় করলে, অবশ্যই মানুষ মেনে নিতো না এবং বিচারের কাঠগাড়ায় তুলতো। কিন্তু হায়! প্রাণিকূলের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান মানুষই কিনা, এর অন্যায়গুলোও ন্যায় হিসেবে মেনে নিয়ে বড়াই করছে- আমার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, মহাসত্য… ইত্যাদি! ফলে মানুষ চেষ্টা করলে যে কোনো নেশা/আসক্তি ত্যাগ করতে পারলেও, ধর্মত্যাগ করতে পারে না। কারণ ধর্ম এ শিক্ষাই দেয়, একে ভুল ভাবা বা অস্বীকারের মতো ক্ষমার অযোগ্য ও মারাত্মক পাপ/অন্যায় আর নেই। তাছাড়া একে ধরলেই হবে না, সারা জীবনই এতে উম্মাদ থাকতে হবে, রক্ষা করতেও হবে, এর জন্য প্রাণ দেওয়ার চেয়ে মহত্বের ও গৌরবের আর কোনো কাজই হতে পারে না; এর জন্য জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা না থাকলে স্বর্গপ্রাপ্তি হবে না… ইত্যাদি। অতএব, পৃথিবীতে ধর্মের ন্যায় এতো নিরাপদ এবং সর্বজন স্বীকৃত ও সমাদৃত আর কোনো বিষয় নেই। তবে (নকল ছাড়া) পরীক্ষায় কোনোরকম পাশ করতে হলে কিছু না কিছু পড়তে হয় কিন্তু ধর্ম শিখতে হলে অক্ষর জ্ঞানেরও প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ ধর্মই একমাত্র বিষয়, যা না পড়ে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মানুষ নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করে। যদিও না বুঝে, বিনাপ্রশ্নে ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বিশ্বাস মানেই- ‘অন্ধবিশ্বাস।’ ধর্মের ব্যাপারে মানুষ ১০০% অন্ধবিশ্বাসী বলেই- ধর্মকে কোনরূপ সন্দেহও করে না, বিশেষ করে স্বধর্মের বেলায় সংশয়, সন্দেহ, প্রশ্ন, সমালোচনা… সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অন্য ধর্মের প্রতি তা অবিরামভাবে চলছেই! এক্ষেত্রে ধর্ম নিজেই মানবাধিকার লংঘন করে চলেছে।

যাহোক, অধমের প্রশ্ন- ধর্মগুলো পবিত্র, উত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ, মহান… কীভাবে ও কেনো? প্রমাণই বা কী? এমন প্রশ্নে, ধার্মিকরা কথিত মহাপবিত্র গ্রন্থের উদাহরণ টানেন। যদিও উদাহরণগুলো প্রমাণিত নয় এবং গদবাঁধা ও মুখস্ত (অল্পকিছু শব্দ ও বাক্য)। হয়তো (কমবেশি) ৯০ ভাগই নিজ নিজ ধর্মের (বিশেষ কিছু শব্দ ও বাক্য ছাড়া) তেমনকিছু জানেন না। কারণ তাদের জানার ৯৯%-ই শুনে, পড়ে-বুঝে নয়। যারা পড়েন, হয়তো সঠিকভাবে জানা/বোঝার জন্য পড়েন না, স্বর্গের লোভ কিংবা ধর্মব্যবসার জন্য পড়েন এবং বুঝলেও সত্য বলেন না। কারণ সত্য বললে, ধর্মেরই বিপদ! তাছাড়া ধার্মিকদের দৃঢ় বিশ্বাস- পবিত্র(!) পুস্তক না বুঝে পড়লে পাপ/গুণা হয়! আবার সেই প্রশ্ন- পড়ার আগেই “বুঝে পড়ে” কীভাবে? ধর্মজীবিদের বিরুদ্ধে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তোলার সাহস কেনো যে বিশ্বজয়ী মানুষের নেই, ভেবে পাই না। ঈশ্বর/ধর্মপুস্তক, ধর্মপ্রবর্তকসহ ধর্মব্যবসায়ীরা বারবার ওই একটি কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে- আগে বুঝো, তারপর পড়! কীভাবে সম্ভব? প্রশ্ন করতে নিষেধই বা করছেন, কেনো? যা কথিত খাঁটি সত্য, সুন্দর, পবিত্রতম(!)… তা নিয়ে এতো ঢাক-ঢাক-গুড়-গুড়ই বা কেনো? এ প্রশ্নগুলোও মানুষের মনে কেনোই বা উদয় হয় না? এমন অন্ধবিশ্বাসে অটল বলেই ধর্মপুস্তকগুলো পড়া দূরে থাক, বেশিরভাগ মানুষ ইহজীবনে তা ছুঁয়েও দেখে না! অথচ প্রায় শতভাগই বলছে- ধর্ম চিরসত্য, খাঁটি, মহান, সর্বশ্রেষ্ঠ…!

অধমের মতে- যা সর্বশ্রেষ্ঠ তা কখনোই ঠুনকো, ভঙ্গুর, স্পর্শকাতর হতে পারে না। অথচ ধর্ম শুধু ঠুনকো, ভঙ্গুর, স্পর্শকাতরই নয়, যারপর নাই- ঠুনকো, ভঙ্গুর ও স্পর্শকাতর। যা ছলে-ছুতায় আহত হয়, অবিশ্বাসী/বিধর্মীদের সামান্য স্পর্শে নষ্ট হয়, কথিত নিষিদ্ধ খাদ্য দেখলেও বমি আসে, শিশুর ন্যায় আদার বাড়ানোর জন্য ছলেছুতায় মরলামরে, গেলামরে বলে চিৎকার-চেঁচামেচি করে…। এছাড়া সংখ্যালঘু নির্যাতনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহাকার্যকর অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আবার নিজের সমালোচকদের মৃত্যু কামনা করছে, অস্ত্র হাতে হন্যে হয়ে খুঁজছে…। তথাপিও বিদ্বান থেকে মূর্খ, এমনকি অবিশ্বাসীদেরকেও একে মহাসম্মানের স্থানে রাখতে হচ্ছে এবং সকল বিষয়ের চেয়ে উঁচুতে রেখে এর অনেক মিথ্যা, বানোয়াট, অযৌক্তিক দাবি তথা কুসংস্কারের কাছে মাথানত করতে বাধ্য হচ্ছে। বেশি প্রশ্রয় দিলে কুকুর যেমন মাথায় ওঠে- ধর্মের অবস্থাও তাই। মানুষ এর বহু অন্যায় আবদার বিনাপ্রশ্নে মাথায় তুলে রাখছে বলেই, এর দেমাক হিমালয় ছাড়িয়ে মহাকাশের দিকে ধাইছে…! নিজের কথিত সম্মান রক্ষা এবং বৃদ্ধির জন্য সর্বদাই হুমকি-ধামকি, লম্ফঝম্ফ করছে, ফলে আরো বেশি স্পর্শকাতর, ঠুনকো ও ভঙ্গুর হচ্ছে। কিছুতেই নিজের ভুল-ভ্রান্তি স্বীকার না করে, গো ধরে নিজের গোড়ামিটাই বজায় রাখছে। অন্যদিকে ধর্মজীবি এবং মতলববাজ নেতারা, সর্বশ্রেণির কাছে অত্যন্ত পবিত্র(!) মহাগর্বের ও মহাসম্মানের কথিত ধর্মোম্মাদনাকে সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নানান অপকর্মসহ বহু সুবিধা যেমনি আদায় করে নিচ্ছে, তেমনি নিজেদের বহু অন্যায়ও ধামাচাপা দিচ্ছে। যা ধর্মের দ্বারা অতি সহজেই সম্ভব, অন্যকিছু দ্বারা নয়। কারণ অপরাধ ঢাকবার এবং অন্যায়কে ন্যায়ে পরিণত করার এমন সহজলভ্য মারণাস্ত্র যে আর নেই।

আবার, বিনা খরচে উম্মাদ এবং মহাউম্মাদ বানানোর সর্বশ্রেষ্ঠ কারিগরও ধর্ম! এ উম্মাদনার কারণেই ধার্মিকরা, ধর্মের কথিত সম্মান রক্ষার্থে যতোবড় মানবতাবিরোধি অন্যায়ই করুক, অপরাধবোধ থাকে না, থাকে প্রচণ্ড গর্ববোধ। তাই অতি সহজেই তারা ধর্মের জন্য আত্মঘাতিও হতে পারে। যদিও মানুষ- কথিত ঈশ্বর এবং কথিত ভূত-প্রেত, জীন-পরী, কুসংস্কার (এগুলোও ধর্মের মহামূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার) ছাড়াও রোগ-শোকে, অন্যায়-অত্যাচার, মানসিক সমস্যায়… উম্মাদ ও আত্মঘাতি হতে পারে। তবে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, এ শ্রেণির লোকেরা আত্মঘাতি হলেও প্রায় একাই মরে, অন্যদের মেরে মরে না। কিন্তু একমাত্র ধর্মের কারণে যারা আত্মঘাতি হয়, তারা পূর্ব পরিল্পিতভাবেই অপরিচিত ও নিরাপরাধ বহু লোককে (টার্গেট থাকে সর্বোচ্চ সংখ্যক) হত্যার উদ্দেশ্যে এবং গর্বের সাথেই আত্মাঘাতি হয়। এর প্রধান কারণ, এরা ধর্মসৃষ্ট উম্মাদ বা কথিত ধর্মবীর এবং অমরত্বের জন্য আত্মঘাতি হয়। মূলত এরাই ধর্মদানব। যাদের সৃষ্টির মূল উপাদানও- ধর্ম; কারণ অন্য কোনো বিষ দিয়ে এতোবড় দানব সৃষ্টি অসম্ভব। আবার এদেরকে দানব বানানোর জন্য তেমন কোনো অর্থ ব্যয় কিংবা পরিশ্রম করতে হয় না। কেননা ধর্মই বিরামহীনভাবে তা করছে অর্থাৎ ক্ষেত্র (মস্তিষ্ক বা হার্ডডিস্ক) প্রস্তুত রাখছে এবং এতে শতভাগ সফল ও বটে।

ফলে বিশ্বাসীরা আজীবনই উম্মাদ বা মহাউম্মাদ অথবা কমবেশি উম্মাদ হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেই থাকে। আর এ উম্মাদনাই ধর্মকে টিকিয়ে রাখার প্রধান মশলা বা হাতিয়ার। কারণ উম্মাদনা বজায় রেখেই স্ব-স্ব অনুসারীদের ঐক্যে (ভাই-ভাই) ও বিশ্বস্ত রাখা হয়। কেননা উম্মাদনা সৃষ্টি এবং ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে, ধর্মের পতন নিশ্চিত। যেহেতু ধর্ম পৃথিবীর সর্বাধিক সমালোচিত, বিতর্কিত, প্রচণ্ডরকমের স্পর্শকাতর এবং ভঙ্গুর বিষয়, সেহতু একে টিকিয়ে রাখতে হলে, উম্মাদনার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র যে হতে পারে না; এব্যাপারে অতিচালাক ধর্মসৃষ্টিকারীরা বেশ ভালোভাবেই জানতো (যা পুরোদমে চলমান)। অন্যদিকে, এ উম্মাদনা ধরে রাখার জন্য অমরত্ব ও স্বর্গের লোভই প্রধান নিয়ামক। যে লোভের কারণেই মানুষ ধর্মের প্রতি এতো মারাত্মক উম্মাদ। কারণ স্বর্গলাভ ও অমরত্বের জন্য মানুষ সবকিছু বিসর্জন দিতে পারে, এমনকি অনেকে আপন সন্তানকেও বলি কিংবা নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও কুষ্ঠাবোধ করে না (প্রমাণ বহু)।

আবার স্বর্গলাভ ও অমরত্বের জন্য যারা মরিয়া, তাদেরকে ‘ধর্মান্ধ’ বলা হয়। প্রশ্ন হলো- ধর্ম নিজেই যখন অন্ধ, তখন এর অনুসারীরা কেনো ধর্মান্ধ হবেন না? অর্থাৎ ধর্ম নিজেই মানুষকে অন্ধ বানিয়ে রাখার মূল কারিগর। কারণ ধর্মানুসারে স্বধর্মে প্রশ্নহীন আনুগত্য না থাকলে (অন্ধবিশ্বাস/ধর্মান্ধ), তার স্বর্গপ্রাপ্তিই তো অনিশ্চিত! অতএব মানুষ স্বর্গপ্রাপ্তির জন্য ধর্মান্ধ তো হবেই। আর এসব উম্মাদনা কাজে লাগিয়ে, কথিত ধর্মাবমাননার গুজব ছড়িয়ে, কাফের হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন কিংবা লুটপাটের ডাক দিলে অনেকেই বিনা প্রশ্নেই ঝাপিয়ে পড়ে। যারা পড়ে না, তারা বেশিরভাগই নিরব সমর্থক। ফলে প্রায় শতভাগ কাফের হত্যাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের মামলাগুলোর যেমন সঠিক তদন্ত হয় না, তেমনি নড়েচড়ে না, কদাচিৎ নড়লেও সাক্ষি পাওয়া যায় না। নির্যাতিতরা সাক্ষি দেয় না প্রাণের ভয়ে, সংখ্যাগুরুরা দেয় না ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মতা নষ্ট হয়ে সমাজচ্যুত হওয়া, বিশেষ করে ধর্মের সম্মান নষ্ট হওয়ার আশংকায় (তদন্তকারীরাও এর বাইরে নয়)। এমন ধর্মোম্মাদনার কারণেই, স্বর্গলাভ ও অমরত্বের লোভে লোভীদের দিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা যে কোনো ভয়াবহ, মারাত্মক, কদর্য, নৃশংস্য, বর্বর, জঘন্যতম… কাজই করিয়ে নিতে কিংবা নিরব সমর্থক বানিয়ে বশে রাখতে সক্ষম (যার বহু প্রমাণ)।

যেমন, সিনক্লেয়ার বলেছেন,

‘একজন মানুষকে অমরত্বে বিশ্বাসী করে তুলুন, তারপর তার সমস্ত ধনসম্পত্তি কেড়ে নিতে যান, দেখবেন সে আপনাকে অবলীলায় তার সবকিছু দিয়ে দেবে। ধর্মগুরু আর ক্ষমতাধরদের মধ্যকার আঁতাতের ফলেই তৈরি হয়েছে কারাগার, ফাঁসিকাষ্ঠ আর এই সমস্ত তত্ত্ব।’

কারণ ধর্মের জন্য মানুষ যেমনি অকাতরে ও হাসিমুখে অর্থদান কিংবা প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে, অন্য কোনো কিছুর জন্য এতো নির্দিধায় ও প্রশ্নহীনভাবে তা পারে না। কেননা ধর্মই একমাত্র বিষয়, যা অদৃশ্য ও অপ্রমাণিত পরকালের লোভ দেখিয়ে মানুষের মনে যে উম্মাদনা বংশানুক্রমে জিইয়ে রাখে, তা উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরেও লোপ পায় না। প্রকাশ্যে না হলেও ছাইচাপা আগুনের ন্যায় শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত, অশিক্ষিত… সব ধার্মিকের মনেই এ লোভ চিরস্থায়ী। বরং বলা ভালো, এ লোভ ছাড়া ধর্মবিশ্বাসী হওয়ার অর্থই নেই। সেহেতু কার মনে কী আছে (ধর্ম প্রশ্নে), তা যদি জানা যেতো, দেখা যেতো- একজন ধার্মিকও সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ নয় এবং স্বধর্মের জন্য সর্বদাই কিছু না কিছু বিসর্জন দেওয়াসহ প্রশ্নহীন সমর্থন করাকে গৌরবের বলে মনে করে।

যাহোক, ধর্মে-ধর্মে কিংবা একই ধর্মের বিভিন্ন গোষ্ঠির মধ্যে বিভক্তি ও বিবাদের মূল সৃষ্টিকর্তা কারা? যদিও তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন না তুলে বরং তাদের সমান্য কিছু গুণের কথা ঘুরেফিরে বলাটাই যেন অত্যন্ত গর্বের বিষয়! অর্থাৎ তাদের নাম স্মরণ করেই ধার্মিকরা নিজেদের ধন্য মনে করছেন। কারণ এসব বিতর্ক, বিবাদ, বিভক্তি, হিংসা-বিদ্বেষ, ধর্মযুদ্ধ-দাঙ্গার… নির্দেশকারীদের সাহায্য ছাড়া নাকি কথিত স্বর্গপ্রাপ্তি সম্ভব নয়। যেমন কথিত আছে, শেষ বিচারের দিন নাকি ধর্মপ্রবর্তকরা নিজ নিজ বন্দাদের পক্ষে সাক্ষি দেবে, আর ঈশ্বরেরা বিচার করবে! [জানিনা, সেদিন নাস্তিকদের পক্ষে কে সাক্ষি দেবে? হয়তো শয়তান! কারণ শয়তান ছাড়া তো নাস্তিকদের পক্ষে কেউ নেই, এমনকি পিতা-মাতাও নয়! অথচ নাস্তিকদের চেয়ে আস্তিকরাই বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর, আর অশিক্ষিত মৌলবাদির চেয়ে শিক্ষিত মৌলবাদিরাই মহাভয়ংকর।] যদিও ধর্মপ্রবর্তকদের মৌলবাদিতাই মানব জাতির জন্য চরম ক্ষতিকর। কারণ এদের দেওয়া আদেশ-নির্দেশ পালন করেই ধর্মীয় মৌলবাদের জন্ম। তথাপিও মানুষ কথিত ধর্মাবতারদের প্রসংশায় সহস্রমুখ, এদের কোনো দোষ মুখে বা মনে আনাও মহাপাপ! সেহেতু মানুষ কেবল তাদের গুণের কথা বলে, প্রশংসা করে, তাদেরকে খুশি রাখতে ঈশ্বরদের পুঁজা দিলেই হয় না, একই সাথে ধর্মপ্রবর্তকদের গুণগানও গাইতে হয়…। অথচ তাদের খারাপ কোনো কাজের সমালোচনা করে না। মনে হয়, এদের গুণ ছাড়া দোষ-ত্রুটি ধরা চলবে না, তাহলে নরক নিশ্চিত! ফলে ঈশ্বর বন্দনা আরম্ভ থেকে শেষ পর্যন্ত তো বটেই, যখন-তখনও তাদের নাম নিতে হয়। অর্থাৎ ঈশ্বরদের চেয়েও ঈশ্বর সৃষ্টিকারীদের নাম মানুষ বেশি করেই নেয়। এমনকি বর্তমানের ধর্মব্যবসায়ীসহ ভণ্ড পীর, দরবেশ, সাধুরাও… ধার্মিকদের কাছে মহা সম্মানের ও শ্রদ্ধার। যেন ঈশ্বর খুশি না থাকলেও চলবে কিন্তু এরা গোস্‌সা হলে আর উপায় নেই, নরক নিশ্চিত!

আবার অনেকেই এ দেশটাকে ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ বলেন। সম্পূর্ণ অস্বীকার করি না, কারণ স্বাভাবিক অবস্থায় অসাম্প্রদায়িক বলা যেতে পারে। তবে ধর্মপ্রশ্নে কতোখানি অসাম্প্রদায়িক সেটাই প্রশ্ন। এক ধর্ম অন্য ধর্মের প্রতিদ্বন্দ্বি, এমনকি এক ধর্মগোষ্ঠি অন্য ধর্মগোষ্ঠির প্রতিদ্বন্দ্বি হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম/ঈশ্বর এরা অপ্রতিদ্বন্দ্বি থাকে কীভাবে? অতএব যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিষ্কার, সেখানে সম্প্রীতিও ভণ্ডামি! কারণ ধর্ম যা শিক্ষা দেয়, তাতে কারো পক্ষেই পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক থাকা অসম্ভব। কেননা বাইরের সম্প্রীতি আর হৃদয়ের সম্প্রীতি এক নয় (ধর্ম প্রশ্নে)। লোক দেখানো সম্প্রীতি সব দেশ, সব সমাজেই আছে। প্রকৃত সম্প্রীতির দেশ ও জাতি হতে হলে যেরূপ উদার শিক্ষার প্রয়োজন, তা এদেশে অচল। তাহলে কীভাবে সম্প্রীতির দাবি করছেন? দেশের ৩৭% সংখ্যালঘু প্রায় ৭% হওয়ার পরেও কীভাবে এই দাবি মেনে নেই? যেটুকু সম্প্রীতি দেখি, অস্বীকার করি না কিন্তু বাস্তব আর ধর্মশিক্ষা তথা বিশ্বাস এক নয়। কেননা, অন্য ধর্ম/ঈশ্বরের প্রশংসা দূরে থাক, কেউ কী কখনো শুনেছেন বা ধর্মশিক্ষা পেয়েছেন যে- আপনার ধর্ম/ঈশ্বরের চেয়ে অন্য ধর্ম/ঈশ্বরেরা ভালো! ভালো দূরে থাক, এটাও কী শুনেছেন- অন্য ধর্ম/ঈশ্বরেরা খারাপ নয়! যদি কেউ বলেন শুনেছি, তাহলে ওই ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদি। বরং সকলেই শুনেছেন এবং শুনছেন, অন্য সব ধর্ম ও ঈশ্বর খারাপ, ভুল, বিধর্মী, কাফের… ইত্যাদি। সেজন্যই বলছি, অন্তরে এক, বাইরে আরেককে- একে কী করে প্রকৃত সম্প্রীতি বলবো? বাইরের প্রকাশ, কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার যা-ই হোক, ধর্মের ব্যাপারে হৃদয়ের দৃঢ় ও অটল বিশ্বাস কিন্তু ভিন্ন। সেখানে নিজেরটা ছাড়া অন্য সব ধর্মেরই সমালোচনা হয় (প্রকাশ্যেও হয়)। অতএব, চোখের দেখা আর বাস্তব যে এক নয়, এটা তো ৩৭-৩০=৭ থেকেই পরিষ্কার। যদিও রাষ্ট্রের আইন নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হলে, সাম্প্রদায়িকতা ঠেকানো সম্ভব, কিন্তু হৃদয়ের সাম্প্রদায়িক, যা দেখা যায় না, সহজে প্রকাশ পায় না, মনে ঠিকই গেঁথে থাকে, তা ঠেকাবেন কীভাবে? প্রয়োজনের সময় এর আসল রূপটাই তো আমরা বারবার দেখি! তাই নয় কী? অর্থাৎ ধর্ম প্রশ্নে যে অসহিষ্ণুতা তা যদি আমলে নেন, ধার্মিকের মনে যে ধর্মশিক্ষা শিশুবয়সেই অমোচনীয় কালিতে লেখা হয়, যে ভাবধারায় লালিত-পালিত হয়… এসব যদি আমলে নেন- দেখবেন, সেখানে প্রকৃত সম্প্রীতি নেই। সব ভণ্ডামি এবং গোজামিল দিয়ে দেখানো/চালানো হচ্ছে। কারণ এক ধর্ম যখন অন্য ধর্মকে স্বকৃতি দিলে নিজের ধর্ম নষ্ট হয়, সেখানে প্রকৃত সম্প্রীতি থাকে কীভাবে? মেকি সম্প্রীতি দেখে খুশি থাকলে যা হয়, তলে তলে বিরামহীনভাবে সেটাই হচ্ছে।

যাহোক, পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ আছে যারা আমাদের ন্যায় সারাদিনই ধর্মের গন্ধ শুকেও না, মাখেও না, শোনায়ও না; রাস্তাঘাটে-যেখান-সেখানে ধর্মের বাণী/পোষ্টার/স্টিকার… নেই, হিমালয় সমান উচুঁতে শব্দদূষণকারী যন্ত্র বেঁধে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে চিৎকার করে না, কেউ ধর্মালয়ে গেলো কিনা খোঁজ নেয় না, মিডিয়ায় ধর্মের বাণী প্রচার/ছাপা হচ্ছে কিনা… এসবের খোঁজ রাখে না। অথচ আমরা! এর সবগুলোর প্রতি প্রচণ্ড সজাগ দৃষ্টি রাখি। নিজে যে ধার্মিক সেটা দেখাতে খুব বেশি গর্ববোধ করি; প্রতিবেশী ধর্ম পালন করছে কিনা সেব্যাপারেও সম্পূর্ণ সচেতন…। কার সন্তান ধর্মালয়ে না গিয়ে কোথায় যায়, কার মেয়ে ধর্মীয় পোশাকে আবৃত নয়, কে কী দেখছে, ও শুনছে (টিভি/ইণ্টারনেটে), ধর্মীয় সভায় যাচ্ছে কিনা, পোশাকে-আশাকে ধর্মের লক্ষ্যণ আছে কিনা, চাল-চলনে ও কথার্বার্তায় অনর্গল ধর্মীয় বাক্য ব্যবহার কিংবা ভাব রয়েছে কিনা, ধর্মের বাণী শুনে জয়োধ্বনি করছে কিনা… ইত্যাদি সবকিছুর উপর নজর রাখা ও সমালোচনা করাই যেন ধর্মজীবিসহ প্রায় সব পাড়া-প্রতিবেশীর প্রধান কাজ…! কিন্তু যেসব দেশগুলোতে ধর্ম নিয়ে আমাদের ন্যায় উজবুকি নেই, সেরূপ কয়েকটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে, এর একটির সংক্ষিপ্ত উদাহরণ।

দেশটি বাংলাদেশের মতোই সাংবিধানিকভাবে ধর্মরাষ্ট্র হলেও, আমি একেবারে ‘থ’। রাষ্ট্রটির ধর্ম আছে, কিন্তু কোথায়? প্রায় ২ সপ্তাহ বিরামহীনভাবে বহুস্থানে ঘুরেছি কিন্তু ধর্ম খুঁজে না পেয়ে অত্যন্ত অবাক হয়েছি। কারণ নিজের দেশে ধর্মকে খুঁজতে হয় না, ধর্মই আমাদের খোঁজে! কেউ ধর্মবাণী শুনতে না চাইলেও তাকে শুনতেই হবে, কেননা কর্ণমূলে যে শব্দদূষণকারী যন্ত্র (মাইক) লাগানোই থাকে! ভোরে ঘুম ভাঙ্গে ধর্মের ডাকে, রাতে ঘুমাতে যাই ধর্মের ডাকে, কোনো কোনো রাতে ধর্মের বকবকানিতে সারারাতই ঘুম হারাম…। এমনকি পত্র-পত্রিকাসহ ন্যাশনাল বা প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলোতেও প্রায় একই অবস্থা। হয়তো দেখা যাবে, হোস্ট ও গেস্টারা বারেবারে ধর্মের চিরাচরিত একই ঘ্যান-ঘ্যান করছে, যারা অনুরোধ জানাতে ফোন করছেন, তারাও একই ধর্মমন্ত্র উচ্চারণ করে কথা শুরু ও শেষ করছে… (বিস্তারিত ব্যাখ্যা নিসেপ্রায়জন)। পথে-ঘাটে, বাসে-লঞ্চে, লিফটে… চায়ের দোকান থেকে বড় বড় মার্কেটে… একই ধর্মবাণী (বেশি না কয়েকটি কমন শব্দ), যা দিন-রাত, বছরের পর বছর বিরামহীন ও উর্দ্ধগতিতে চলছেই। এসব ব্যাপারে আমাদের ধর্মরাষ্ট্র ও ধার্মিক সরকারও সদা সজাগ। প্রশ্ন হলো- একই ধর্মকথা, একই ব্যক্তি এভাবে দিনে কতোবার উচ্চারণ করেন? যতোবার উচ্চারণ করেন, ততোবারাই কী আশির্বাদ লাভ করেন, নাকি ততোবারাই তিনি জানান দেন- “আমি ধার্মিক?” কোনটা সঠিক?

উক্ত ধর্মরাষ্ট্রটি ভ্রমণের পর এ মূর্খের ধারণা- যে জাতি সর্বত্র-সর্বক্ষণ ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সবকিছুতেই ধর্মের গন্ধ পায়-শুকে-মাখে-শোনে ও শোনায়; মুখে সদাই ধর্মের বোল অবিরাম ফুটতেই থাকে, পোশাক-আশাক, অঙ্গভঙ্গি ও চেহারায় ধর্মের অভিব্যক্তি ফুটাতে যারা অত্যন্ত পটু… সেই জাতি কখনোই সত্যিকারের ধার্মিক নয়। কারণ হৃদয়ের ধার্মিকতা আর বাহ্যিক ধার্মিকতা এক নয়। তথাপিও আমাদের উচ্চশিক্ষিত বিদ্বান-পণ্ডিত থেকে অতিসাধারণ, প্রায় সকলেই জোর গলায় নিজেদেরকে ধার্মিক বলে দাবি করেন। এজন্যই হয়তো বিদ্বানরা এসব জাতিকে ধার্মিক, ধর্মভীরু, অসাম্প্রদায়িক… বলছেন। কিন্তু এমন সব বিশেষণের পূর্বে অবশ্যই জাতির নীতি-নৈতিকতা এবং হৃদয়ের প্রকৃত ধার্মিকতা বিচারে আনা প্রয়োজন (যা তারা করেননি)। শুধু ধর্মচর্চার মহামারী দেখেই সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন- ধার্মিক, ধর্মভীরু, অসাম্প্রদায়িক… ইত্যাদি। অর্থাৎ বাহিক্য ধার্মিকতা দেখেই সার্টিফিকেট দেওয়া কতোটা যুক্তিসঙ্গত? এ মূর্খের মতে, যা অত্যন্ত হাস্যষ্করই নয়, বোকামিও বটে। না হলে, প্রায় শতভাগ ধার্মিকের(!) দেশে প্রায় শতভাগ দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, লুটেরা, ভেজালকারী… অসৎ রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ধার্মিক বা ধর্মভীরু জাতিতে পরিণত হলো? হয়তো আমি অধম বলেই বুঝি না। তবে কী শুধু ঠিকঠাক ধর্ম পালন এবং মুখে অনর্গল ধর্মের খই ফোটানো মানেই ধার্মিক বা ধর্মভীরু জাতি? তাহলে এ মূর্খের দাবি, যারা এসব বলছেন- হয় ধর্মমূর্খ, নয় ভণ্ড।

যা বলছিলাম, ধর্মরাষ্ট্র হলেও, ওই দেশেটিতে ধর্মকে খুঁজে পেতে হয়েছে! ধর্মের চি‎হ্ন তাদের রাস্তাঘাটে যেমন নেই, তেমনি প্রতি রাস্তায়, বাসার কোণায়-কোণায় ধর্মালয় নেই… যা দু’চারটা চোখে পড়েছে, তাতে শব্দ দূষণকারী যন্ত্রদানব থাকলে তা অতিসহনীয় মাত্রায় বাজে; ধর্মালয়ে যারা যান তারা নিরবে যান, অন্যকে জানিয়ে যান না, কাউকে জিজ্ঞেস করেন না, কেনো তিনি যাচ্ছেন না…। অর্থাৎ এসব প্রশ্ন করে, আমাদের ন্যায় ওখানে কেউ কাউকে বিব্রত করে না। মুখে ও শরীরে রাষ্ট্রধর্মের চি‎হ্ন কিংবা আবৃত মুখ অত্যন্ত কম দেখেছি, যাদের দেখেছি, তারা বেশিরভাগই স্থানীয় নয় (চেহারায় পরিষ্কার)। এছাড়া যানবাহনের কোনো হর্ণ নেই, রাস্তাঘাটে আমাদের ন্যায় কফ, থু-থু নেই…। এ অধম মনে করে, এটাই হলো প্রকৃত ধার্মিকের দেশ। কারণ কেউ ধার্মিক কিনা জানান দেয় না, ধর্ম চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা নেই, কৌশলে বা জোর করে শুনাচ্ছেও না, যার খুশি করুক, না হয়- না করুক। হয়তো রাষ্ট্রধর্ম থাকা সত্ত্বেও, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক/বাল্যশিক্ষা অত্যন্ত মানবিক অর্থাৎ শিক্ষায় ধর্ম মেশানো নেই, যা সম্পূর্ণ আমাদের বিপরীত। ওই ধর্মরাষ্ট্রটিতে দুর্নীতি যে নেই তা নয়, তবে আমাদের মতো এমন গণহারে আছে বলে শুনিনি। এরপরেও কী আমাদের বিদ্বানগণ বলবেন যে, আমরা ধার্মিক বা ধর্মভীরু জাতি… ইত্যাদি। আমি মূর্খ জানি না- ধার্মিক, ধর্মভীরু এবং অসাম্প্রদায়িক কাকে বলে? এটাও জানি না- ধর্মের প্রতি এতো বেশি অন্ধবিশ্বাস, ভক্তি-শ্রদ্ধা রেখে কী করে অসাম্প্রদায়িক হওয়া বা থাকা সম্ভব? বিদ্বানরাই ভালো বলতে পারবেন, আমিও জানতে চাই।

আবার, ধর্মানুসারীদের সুদৃঢ় বা অটল বিশ্বাস তার ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোনো ঈশ্বর সত্য নয়, অন্যরা ভুল ঈশ্বর মানছে, মৃত্যুর পর এর প্রতিফল তারা পাবে… ইত্যাদি। তারা মানতে না চাইলেও, বাস্তবে তথাকথিত বহু ঈশ্বরই সত্য! তারা এটাও বিশ্বাস করেন, নিজেদের ধর্ম, ধর্মপ্রবর্তক ও ঈশ্বরই সর্বশ্রেষ্ঠ! তাদের ধর্ম ছাড়া মুক্তি নেই এবং তাদের ধর্মপ্রবর্তক জন্ম না নিলে ঈশ্বর পৃথিবীটাই সৃষ্টি করতো না…! এসবই নাকি স্বয়ং ঈশ্বরেরই মুখনিসৃত বাণী এবং তা অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে, নতুবা তিনি বিধর্মী, অধার্মিক, কাফের, নাস্তিক… ইত্যাদি। আরো বলা হয়- ঈশ্বরের অগোচরে কেউ কিছু করতে পারে না! তবে কী খুনি, ধর্ষক, দাঙ্গাকারী, নির্যাতক, লুটেরা, কালোবাজারী, ঘুষখোর, ভেজালকারী… ঈশ্বরের গোচরেই সবকিছু করে?

তবে জানি না, সবগুলো ঈশ্বর একইসাথে কীভাবে সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলো? শ্রদ্ধেয় আরজ আলী মাতুব্বরের মতে, কোনো একটি ঈশ্বর সত্য বা সর্বশক্তিমান কিংবা সর্বশ্রেষ্ঠ হলে, অন্যরা নয়। অথচ কেউ কারোটাকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে না, নিজেরটাকেই সর্বসত্য, সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ… বলে চেঁচিয়েই চলছে। সেহেতু প্রশ্ন- প্রায় ৪ সহস্রাধিক ঈশ্বরদের মধ্যে নিজের ঈশ্বরটিই সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ, ধার্মিকরা তা নির্ণয় করলো কোন পদ্ধতিতে বা কীভাবে? নাকি সবকিছুর বেলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হলেও, ঈশ্বরদের বেলায় প্রয়োজন নেই! সকলেই বংশানুক্রমে শুনেছে আর চেঁচাচ্ছে, আর চোখরাঙ্গানিসহ অস্ত্র হাতে ধর্ম/ঈশ্বর পাহারা দিচ্ছে…। সেহেতু এতোগুলো ঈশ্বরদের মধ্যে কোন ঈশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ তা প্রমাণ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। হয়তো কেউ প্রমাণ করার চেষ্টা করলে বেঁচে থাকবেন না। কারণ ধর্ম এতোটা সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণু নয় যে, কেউ তার নিজের ঈশ্বরকে অন্য ঈশ্বরের চেয়ে অধম ভাববে বা মানবে! যাহোক, ধরে নিলাম- প্রথম ঈশ্বর সর্বশক্তিমান কিংবা সর্বশ্রেষ্ঠ। তাহলে অন্য ঈশ্বরগুলো জন্ম হলো কীভাবে? প্রথম সর্বশক্তিমান কী নিজেই তাদের জন্ম দিয়েছে, নাকি অন্য কোনোভাবে জন্মেছে (নাকি শয়তানের জন্ম)? যদি নিজে জন্ম দেয়, তাহলে প্রশ্ন- কেউ কী জেনেশুনে আপন শত্রু বৃদ্ধি করে? নাকি সে সর্বশক্তিমান হলেও বোকা? আর যদি অন্য কোনো শক্তি বা শয়তানের শক্তি দ্বারা জন্ম হয়, তাহলে ওই ঈশ্বর সর্বশক্তিমান থাকে কীভাবে? মূল কথা, প্রথম ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হলে অন্য কোনো ঈশ্বরের অস্তিত্বই থাকার কথা নয়। এজন্যই হয়তো এতোগুলো সর্বশক্তিমানের শক্তির দাপটে মানবজাতির ত্রাহি-ত্রাহি রব (ধর্মযুদ্ধ-দাঙ্গা-সংখ্যালঘু নির্যাতন… লেগেই আছে)। কী আশ্চর্য! ৪ হাজারের বেশি ঈশ্বর একটা মাত্র পৃথিবীতে! অতএব ঈশ্বরদের সর্বশক্তিমান কিংবা মহাসত্য, সর্বশ্রেষ্ঠ… জাতিয় বিশেষণগুলো- পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিথ্যা। এছাড়াও কোনো একটিমাত্র ঈশ্বরও যদি সর্বশক্তিমান হতো, তাহলে তার রাজ্য পরিচালনার জন্য স্বর্গদূত/ফেরেশতা প্রয়োজন হলেও অন্ততপক্ষে শয়তানের প্রয়োজন হতো না। অথচ প্রায় সব ঈশ্বরই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে নিজ হাতেই শয়তান সৃষ্টি করে ফাঁদে পড়েছে। তাছাড়া, প্রথম ঈশ্বরের কী অন্য ধর্মরোধ করার শক্তি ছিলো না? যদি তর্ক এড়াতে ধরেও নেই, প্রথম ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও ভুল করেছিলো কিন্তু পরের ঈশ্বরগুলোও (২য়, ৩য়, ৪র্থ…) কেনো একই ভুল করেছে? এর ফলাফলই বা কী? ঈশ্বরগুলো ভুল করেছে, আর মাশুল দিচ্ছে পুরো মানবজাতি।

আবার সর্বশেষ ঈশ্বরকেও যদি সর্বশক্তিমান ধরা হয়, তাহলেও প্রশ্ন- তার জন্মের কয়েক হাজার বছর পূর্বে এবং তার অগোচরে যদি অন্য ঈশ্বরগুলো এসে, হাজার হাজার বছর পৃথিবী শাসন করতেই পারে, তাহলে সে কীভাবে সর্বশক্তিমান থাকে? যদি তার পূর্বেকার ঈশ্বরেরা মানবজাতিকে ভ্রান্ত ধর্মে কিংবা শয়তানের ধর্মে দীক্ষা ও পরিচালিত করে থাকে, সেই অন্যায়ের দায়-দায়িত্ব কার? অন্যদিকে সর্বশেষ ঈশ্বরটি একমাত্র নিজেই সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পূর্বের সব ধর্ম ও ঈশ্বরদের বাতিল করেছে! তথাপিও পৃথিবীব্যাপী পূর্বের সব ধর্ম ও ঈশ্বরগুলো এখনো পুরোদমে সক্রিয়- কীভাবে? এজন্য নিজেই কী দায়ী নয়? কেনো সে ওইসব শয়তান সৃষ্ট বা ভুল ঈশ্বরগুলোর কার্যকলাপ চলতে দিয়েছে, সহ্য করেছে, কেনোই বা সহস্র বছর পরে তা বাতিল করলো? কেনো এতোগুলো জাতি, দেশ, সম্প্রদায়কে আজো শয়তানের ধর্ম থেকে মুক্ত করতে পারছে না? সর্বশক্তিমান হলে নিজেই কেনো প্রথম এলো না এবং অন্যদের প্রতিহত করলো না? হাজার হাজার বছর কোথায় ছিলো? কেনো ছিলো? অন্য ঈশ্বরদের ন্যায় এটাও কী কথিত সর্বশেষ ঈশ্বরটির অজ্ঞতা, অপরিমাণদর্শিতা, ভয়ানক লজ্জার নয়? আরো প্রশ্ন- মানুষ যখন নষ্ট বা শয়তানের ধর্ম পালন করছিলো (আজে করছে, ভবিষ্যতেও করবে), তখন সর্বশেষ ঈশ্বরটি বাধা না দিয়ে হাজার হাজার বছর চুপ করে কেনো এসব করতে দিয়েছিলো বা দিচ্ছে? এমন অজস্র প্রশ্ন করা যেতে পারে, কিন্তু…? সবচেয়েও বড় প্রশ্ন- শুনবেটা কে? যুক্তিপূর্ণ উত্তরই বা দেবে কে?

জানি, যতোদিন মানুষ (বিশেষ করে বিদ্বানরা) ধর্মকে প্রশ্ন করতে ভয় পাবে; ততোদিন ধর্মের কোনো চিন্তা নেই, ধ্বংস নেই বরং দিনদিনই আরো বেশি আদরে-আহ্লাদে হৃষ্টপুষ্ট হতেই থাকবে। কারণ ধর্মকে সাথে রাখলে বহু বিপদ কাটানো সম্ভব, ত্যাগ করা মানেই অজস্র বিপদে জড়ানো। এছাড়া মানুষ যতোদিন ধর্মাবতার, ঈশ্বর বিশেষ করে ধর্মব্যবসায়ীদের ভয় করবে, সমীহ করবে, মানবে… ততোদিনও ধর্মের কোনো ভয় নেই অর্থাৎ মহাদাপটেই থাকবে। আবার যতোদিন দুর্নীতিবাজ, চোর-বাটপার থাকবে, ততোদিনও ধর্ম মহাগৌরবেই রাজত্ব করবে। কারণ ধর্মজীবিদের ন্যায় বর্ণচোরা ধার্মিক অথচ ক্ষমতা ও অর্থলোভী রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী, কথিত উচ্চশিক্ষত অতিধূর্ত চোর-বাটপার, লুটেরা, দুর্নীতিবাজদের… ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অসীম।

অতএব বলছি, মন সায় না দিলেও ধর্মকে সঙ্গে রাখাই ভালো, ত্যাগ করা ভালো নয়! কারণ কোনো অন্যায় না করেও ধর্মত্যাগিদের মাথায় হুলিয়া নিয়ে সর্বক্ষণ মৃত্যুচিন্তায় থাকতে হয়। অথচ ধার্মিক কিন্তু মহাদুর্নীতিবাজ, খুনি, ভূমিদস্যু, শেয়ারবাজার ও ব্যাংকখোর, নদী-নালা, খাল-বিল, সাগর-মহাসাগর, আকাশ-পাতালখোর… বহু তথাকথিত ধার্মিক, যারা বুক ফুলিয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে দাপিয়ে বেড়ায়। এমনকি এরাই ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষাসহ রাষ্ট্র ও সমাজকে নানান উপদেশ দেয়…। সমাজ ও রাষ্ট্রের নায়ক-মহানায়ক, চালক, ধারক-বাহকও… এরাই। কারণ এরা ধর্মকে সব সময় সাথে রাখে অর্থাৎ মুখে ধর্মের খৈ ফুটতেই থাকে। এছাড়া, ধর্মালয়ের জন্য জমি দান, নির্মাণ খরচ, বিরাট অংকের ডোনেশন… ইত্যাদি দিয়েই চলেছে। তবে জানিনা, এসব দুর্নীতির অর্থে পবিত্রতম(!) ঈশ্বরেরা খুশি হয়- কীভাবে? যাহোক বলছি- ধর্মত্যাগ মানেই অপরাধ ধামাচাপা দেবার কিংবা গর্বের সাথে বেঁচে থাকার প্রধান অস্ত্রটি খুইয়ে, প্রাণ হাতে নিয়ে খুব বেশি অসহায় পড়া!

এসব কারণেই ধর্ম নিশ্চিন্তে আছে এবং একে নিয়ে প্রচণ্ডরকমের বাড়াবাড়ি ও বাহাদুরি হচ্ছে। বিশেষ করে এর উচ্ছৃংখলতা, ঈর্ষা, কুসংস্কার ও ভুল-ত্রুটি স্বীকার না করার গোড়ামি, বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা, কোনো বিষয়ে ছাড় না দেয়া, ভিন্নমত সহ্য না করায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, অহংকার-অহমিকা-গর্বে পূর্ণ, সামান্য ব্যাপারকে বিশাল করে সংখ্যালঘু ও নারী নির্যাতন, পোশাক থেকে পায়খানা-প্রস্রাব করার বিধান, লুটপাট, যুদ্ধ-দাঙ্গার… কাজে নিয়মিতভাবেই ধর্ম ব্যবহৃত হচ্ছে। যা অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারকভাবে ঘটিয়েই চলেছে কতিপয় ধর্মদানব। কিন্তু কথিত মডারেটরা এর দায় নিতে চাইছে না, এব্যাপারে অবশ্যই জাতিসংঘের মাধ্যমে ঘোষণা বা আইন থাকা উচিত যে, ধর্মের নাম যারা হত্যাযজ্ঞ ঘটাবে কিংবা জঙ্গিবাদে মদত দেবে, এর সম্পূর্ণ দায় ওই ধর্মসম্প্রদাকে অবশ্যই নিতে হবে এবং অবশ্যই ওই ধর্মকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কোনোরূপ ছলচাতুরির আশ্রয় নিতে পারবে না। কারণ কোনো ধার্মিক/ধর্ম যখন ভালো কাজ করে, ভালো বক্তব্য রাখে, তখন ধার্মিকরা যেমন পুলকিত হয়, গর্বে ফুলে ওঠে; ঠিক তেমনিই একটা ধর্মদানবও যদি ট্রাকের চাকায় পিষে কিংবা জ্যান্ত মানুষ পুড়িয়ে মারে বা বোমা-গুলি চালিয়ে শতশত মানুষ খুন করে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ধর্ম ব্যবহার করে… তখন ওই ধর্মসম্প্রদায় কেনো এসবের দায় নেবে না? কারণ, ভালো মানুষ যদি ধর্মের সৃষ্টি হয়, দানবও তো ধর্মেরই সৃষ্টি। বিশ্বাস না হলে ধর্মপুস্তক এবং এর ইতিহাস পড়ে দেখুন। শুনুন নানা ভিডিও/অডিও, ধর্মের বাণী ব্যাখ্যা করে এবং ধার্মিকদের তথাকথিত অতিভয়ানক সেন্টিমেন্ট (ধর্মানুভূতি) ব্যবহার করেই ধর্মদানব বানানো অতীব সহজ…। বলতে চাইছি, লিখিত কিংবা অলিখিত, ধর্মে যদি ধর্মদানব বানানোর মশলা/ব্যবস্থা নাই থাকে, তাহলে কারো বাপের সাধ্য নেই- ধর্মদানব বানাবে; আছে বলেই তা সম্ভব। জানি, ধর্মের ওইসব বিধানের ব্যাখ্যায় এক মডারেট অন্য মডারেটের সাথে, এক বিদ্বান অন্য বিদ্বানের সাথে একমত হবেন না। তাহলে প্রশ্ন- এরূপ বিতর্কিত, বিভ্রান্তিকর বাণী/পুস্তক কীভাবে কথিত সর্বশক্তিমানদের মহাসত্য(!) বাণী/বাক্য হতে পারে? অতএব ধর্ম বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত ধর্মের সমালোচনা হওয়া আবশ্যক এবং যে কোনো মানবতাবিরোধি কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো ধর্মকেই কাঠগড়ায় তোলা উচিত। তাছাড়া মৌলিক মানবাধিকার থেকে ধর্মকে অবশ্যই খারিজ করে দেওয়া উচিত। কারণ ধর্ম যেমনি নিজের (গোষ্ঠিদ্বন্দ্ব) এবং অন্য ধর্মের শত্রু, তেমনি মানবতার ভয়ানক শত্রুও বটে।

যে বিশ্বাসে শুধুমাত্র ব্যক্তির ক্ষতি করে তা সওয়া যায়, কিন্তু যে বিশ্বাস সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্ষতিকরই শুধু নয়, ভয়ংকরও বটে, তা সহ্য করি কীভাবে? তথাপিও, ধর্ম পালনের অধিকার, মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত! সেহেতু ধর্মকে কিছু বলার অর্থ মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা। এতেও সমস্যা ছিলো না, যদি তা ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থকাতো। কিন্তু তা নয়, ধর্ম যে সমিষ্টির। অতএব এর খারাপ প্রভাবগুলো জাতিই শুধু নয়, পুরো বিশ্বকেই খারাপের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম। প্রশ্ন হলো- ধর্ম নিজে কী অপর ধর্মের মৌলিক অধিকার বজায় রেখে চলেছে? মনে হয় না। কারণ বিধর্মীদের নিয়ে বহু নেতিবাচক কথাবার্তা প্রকাশ্যেই শোনা যায়, গোপনে এবং অন্তরে না জানি আরো কতো বেশি চলে। তবে যদি কেউ মনে করে, ধর্ম ছাড়াও মানুষ বাঁচতে পারে, তাহলে ওই ব্যক্তি কেনো ধর্মের ভুল-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করতে পারবে না? জানিনা, ভুল ধরিয়ে দেওয়া অন্যায় কেনো? পৃথিবীর সব বিষয়ের ভুল ধরা যায়, এতে মৌলিক অধিকারও নষ্ট হয় না, শুধু ধর্মের ভুল-ত্রুটি ধরলে অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হবে- কোন যুক্তিতে? যারা এই আইনটি করেছেন, তারা কী ধর্ম পড়ে-বুঝে করেছেন? ধর্মের রেকর্ড চেক করেছেন? পাল্লা কোনদিকে ভারি, মানবতার পক্ষে, নাকি মানবতার বিপক্ষে? অতএব, কেউ যদি যুক্তি দিয়ে বলেন- ধর্মগুলোতে এই দোষ-ত্রুটি আছে, কুসংস্কার আছে, আছে দানব সৃষ্টির মশলা… তাহলে অন্যায়/দোষ হবে কেনো? যা ভুল, যা মিথ্যা, যা বহু কুংস্কারের ভরা, দানব সৃষ্টির কারখানা, যা ধর্মযুদ্ধ-দাঙ্গা লাগানোর সর্বোৎকৃষ্ট ওষুধ… তা বিশ্ব মানবাধিকারে স্বীকৃতি পেলো কীভাবে ও কেনো? ‘ধর্ম’ বলেই কী ভুল-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও মানবাধিকারের শিকেয় তুলে রাখতে হবে? এ কেমন কথা! তাহলে ভুল ও অন্যায়কে, অন্যায় বলাই কী- অন্যায়? কেননা, ধর্মে সবধরণের মোটিভেশন সম্ভব (ভালো বা মন্দ, খারাপ বা অতিখারাপ)।

অথচ পণ্ডিত, লেখক, সমাজসেবক, গবেষক, পাঠশালা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা… পর্যন্ত ধর্মের ভুল ধরতে বা দেখতে রাজি নয় (যতো সঙ্গতই হোক)। যাদের গদবাঁধা বক্তব্য- ধর্ম নিয়ে কিছু না লেখা বা না বলাই বুদ্ধিমানের কাজ! সত্যিই তো, তা না হলে- তারা যে আর বুদ্ধিমান থাকতে পারতো না, আমার মতো বোকা কিংবা কাফের হয়ে যেতো! অতএব, কোনোকিছুর ভুল দেখে ও বুঝে বুদ্ধিমানেরা যখন চুপ থাকনে এবং অন্যদেরকেও একই পরামর্শ দেন, তখন বুঝতে হবে- এ জাতির মেরুদণ্ডটিও ধর্মের ন্যায় অত্যন্ত ভঙ্গুর। অতএব বিদ্বানেরা যেদিন অন্য সব বিষয়ের ন্যায় ধর্ম ও ঈশ্বরগুলো বিষয়ে সত্য তুলে ধরবে, সেদিনই কেবল মানবজাতির দুর্ভোগ কিছুটা লাঘব হবে।

আগেও বলেছি, কোনো বিষয় সঠিকভাবে জানা বা বোঝার জন্য বারবার পড়তে হবে এবং কী বুঝলাম, সেবিষয়ে অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে। প্রয়োজনে নিজেই উত্তর দিতে হবে, উত্তর ঠিক হলো কিনা, সেজন্য উত্তরকেও প্রশ্ন করতে হবে…। পরবর্তীতে অনেক প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্যে নিজের মেধা ও মনন যেটাকে গ্রহণ করতে চাইবে, সেটাই গ্রহণ করতে হবে। বোধকরি এটাই কোনো অদৃশ্য, অপ্রমাণিত বিষয়কে সঠিকভাবে জানার ও বোঝার পদ্ধতি। অর্থাৎ সবকিছুতেই প্রশ্নোত্তর থাকতে হবে। কিন্তু কেউ পড়তে না চাইলে পড়াবেন কীভাবে? আবার যারা পড়ছেন (অতি সামান্য), তারা শুধু স্বর্গলাভের আশায় পড়ছেন, নাকি বোঝার জন্য পড়ছেন? হয়তো শুধু স্বর্গলাভের আশাতেই পড়া। কারণ প্রশ্ন করে না পড়লে ধর্ম- ধর্মই থাকে; প্রশ্নোত্তরসহ পড়লে তা ধর্ম থাকে না! সেজন্যই, ধর্মপ্রবর্তক থেকে ধর্মব্যবসায়ীরা সকলেই একই সুরে বলছেন, বুঝে পড়তে হবে, যা সম্পূর্ণ অসম্ভব। কারণ সবকিছুই পড়ে বুঝতে হয়, বুঝে পড়া যায় না। হয়তো ধর্মকে মানুষ চিরকালই বুঝে পড়ে(!) বলেই এর ফাঁকফোঁকড় বোঝে না! ধর্মজীবিরা আরো বলেন- প্রশ্ন করো না, যা জানবার নয়, তা জানতে চেয়ো না। অথচ যা জানাবার নয়, তা যদি মানুষ জানতে না-ই চাইতো, তাহলে মানুষ তো আদিম যুগেই থাকতো!

সবশেষে, প্রিয় নজরুলের বহু বাণী চিরন্তনীর মধ্যে মাত্র কয়েকটি-

“…আলো নিয়ে কখনও ঝগড়া করে না মানুষে, কিন্তু গোরু-ছাগল নিয়ে করে। এ বলছে আমাদের আল্লা; ও বলছে আমাদের হরি। স্রষ্টা যেন গোরু-ছাগল! …নিজেকে চেনা, আপনার সত্যকে আপনার গুরু, পথ-প্রদর্শক কান্ডারি বলে জানা, এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়। এটা আত্মকে চেনার সহজ স্বীকারোক্তি। …আত্মকে চেনা, নিজের সত্যকে নিজের ভগবান মনে করার দম্ভ– আর যাই হোক, ভণ্ডামি নয়। …স্পষ্ট কথা বলাটাকে কেউ যেন অহংকার বা স্পর্ধা বলে ভুল না করেন।” -নজরুল।

কষ্ট করে অধমের লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ ॥

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

About the Author:

মুক্তমনার অতিথি লেখকদের লেখা এই একাউন্ট থেকে পোস্ট করা হবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. হাসান সিদ্দিক এপ্রিল 20, 2018 at 1:51 অপরাহ্ন - Reply

    ধর্ম কি ও কিভাবে উৎপত্তি লাভ করেছে ? সমাজতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব এর আলোকে যদি খোলা চোখে যে কেউ অনুসন্ধান করতে থাকে তবে তার পক্ষে এর রহস্য উন্মোচন করা জলবৎ তরলত হতে বাধ্য। কেননা, এসব আর যাই হোক, আইনস্টাইন এর তত্ত্ব বা হালের জটিল কোয়ান্টাম মেকানিজম নয় । আমরা আদিম মানুষের ইতিহাস যতটুকু স্কুলপাঠ্যবইয়ে পড়েছি, তার আলোকেই সচেতন প্রশ্ন জাগে মনে, যাদের কিছুই ছিল না, তাদের কাছে ধর্মীয় গ্রন্থ ঈশ্বর ধারণা দূরের কথা, ভাষা বরণ ই ছিল না । এবার ইতিহাসের যাত্রাপথ টা হেটে আসলে যে কেউ ই বুঝবেন সবই মহান মানুষের সৃষ্টি । বিজ্ঞান যেমন বলে, প্রয়োজনই আবিস্কারের প্রসূতি , তেমনই ধরে নিতে পারি বিজ্ঞানের অনুপস্থিতিই ধর্মীয় মতবাদের প্রবক্তা আসলে । এর সাথে শ্রেণীগত চারিত্রিক গুণাবলি যদি আমলে নিই তাহলে আর সমীকরণ এর কিছু উহ্য থাকে না ।

  2. Alamin মার্চ 26, 2018 at 11:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    যে দেশে আপনি ভ্রমণ করেছেন তার নামটা বলেন,,,,সত্যতা যাচাই করতে পারব।

  3. ক খ গ বৃত্তবন্দী মার্চ 21, 2018 at 5:04 পূর্বাহ্ন - Reply

    তবে জানি না, সবগুলো ঈশ্বর একইসাথে কীভাবে সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ হলো? শ্রদ্ধেয় আরজ আলী মাতুব্বরের মতে, কোনো একটি ঈশ্বর সত্য বা সর্বশক্তিমান কিংবা সর্বশ্রেষ্ঠ হলে, অন্যরা নয়। অথচ কেউ কারোটাকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে না, নিজেরটাকেই সর্বসত্য, সর্বশক্তিমান, সর্বশ্রেষ্ঠ… বলে চেঁচিয়েই চলছে। সেহেতু প্রশ্ন- প্রায় ৪ সহস্রাধিক ঈশ্বরদের মধ্যে নিজের ঈশ্বরটিই সর্বশক্তিমান ও সর্বশ্রেষ্ঠ, ধার্মিকরা তা নির্ণয় করলো কোন পদ্ধতিতে বা কীভাবে?

    আসলে ব্যাপারটা এরকম!
    মানুষের পক্ষে ঈশ্বরত্ব বুঝা অসম্ভব, কারন ঈশ্বর মহাপন্ডিৎ আর আশ্বারীয় ক্ষমতাবান। যার দাবার গোটির চাল বুঝা চাঁদের অভিযানের মতই রহস্যময়। ব্যাপারটা এরকম হতে পারে, সবগুলা ঈশ্বর জাতভাই, আর এদের সবাই স্পার্ম ছাড়া মায়ের সন্তান। সর্বশক্তিমান তো হতেই পারেন।
    বৃহৎ পরিসরে এক ক্ষুদ্র অজ্ঞতাই হল ধর্ম। এই ক্ষুদ্র অজ্ঞতাকে ভাইরাস এর মত এমনভাবে রক্তের সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয় যাতে বুঝে উঠার আগেই ভয়টা সামনে ভেষে আসে। ধর্মের ভ্রষ্টাচারীর শাস্তির নাম করে মস্তিষ্কে ভয়ের বিচি জন্মের পরপরই রোপন করে দেওয়া হয়। ক্রমে ক্রমে পানি, সার আর জৈবযৌগ দিয়ে এই বিচিকে এক বিশাল বটবৃক্ষের রূপ দেওয়া হয় এবং যার ডালপালা এবং মুলগুলো অসম্ভব আকারে বিস্তৃত। ডালপালা চেটে যতই আলোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হোকনা কেন, মুলের কারনে সেখানে আবার নতুন ডাল জন্মায়, নতুন করে সবুঝ পাতাও।

মন্তব্য করুন