[আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একশ বছর পূর্তি (১০১৬-২০১৬) উপলক্ষে আমি এর আগে দুই কিস্তিতে তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বের একটা লোকপ্রিয় আলোচনার উপস্থাপন করেছিলাম। এই তৃতীয় কিস্তিতে আমি চেষ্টা করেছি এই মহান বিজ্ঞানীর মানসিক গঠন ও দার্শনিক বোধির একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরতে। শেষ পর্বে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের দার্শনিক তাৎপর্য সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা করার ইচ্ছা আছে।]

দর্শন কেন?

আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বুঝে নেবার পরই একজন পাঠকের মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়: তিনি কীভাবে পারলেন? আর কেউ পারলেন না কেন? আরও অনেকেই এই তত্ত্বের আশেপাশে এসে গিয়েছিলেন, চিন্তার স্রোতকে সামান্য ভিন্ন পথে চালিত করতে পারলেই তাঁরাও পৌঁছে যেতেন এই তত্ত্বের চৌকাঠে। আইনস্টাইনের নিজেরও বোধ হয় এরকম একটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেত। হয়ত এর একটা সম্ভাব্য উত্তর যেন তিনি আগ বাড়িয়েই আমাদের দিয়ে গেছেন তাঁর লেখায়: “কোথায় পৌঁছতে চাই তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলেই একটা তত্ত্ব নির্মাণ করা যায় না; এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গিগত চিন্তা-কাঠামো থাকা দরকার যার সাহায্যে অসংখ্য বিকল্প সম্ভাবনাগুলির মধ্য থেকে ঝাড়াইবাছাই করে নেওয়া সম্ভব হয়।” [Einstein 1984a, 328] এর মাধ্যমে তিনি নিশ্চয়ই বিজ্ঞানের সমস্যার সমাধানে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব ও উপযোগিতার প্রশ্নটিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

প্রথমে এই বিষয়ে আমাদের একটা ধারণা করে নেওয়া দরকার।

বিজ্ঞানের ইতিহাস এবং দর্শন নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন তাঁরা সকলেই জানেন, ঊনবিংশ শতাব্দ থেকে ইউরোপীয় চিন্তাশীলদের মননে প্রত্যক্ষবাদের ব্যাপক প্রভাব বাসা বেঁধেছিল। যার পেছনে, অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে, একটা বড় কারণ ছিল দুই প্রথিতযশা পদার্থবিজ্ঞানী আর্নস্ট মাখ এবং অঁরি পোয়াকার-এর চিন্তাধারা। তাঁদের দ্বারা, বিশেষ করে মাখের দ্বারা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রভাবিত হননি, এমন বিজ্ঞানী সেকালে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আইনস্টাইনও সেই দর্শনের কুহকে একটা বেশ ভালো সময় ধরে মোহাবিষ্ট ছিলেন। তিনি নিজেই বলেছেন: “আমার জীবনের শুরুতে মাখের জ্ঞানতত্ত্ব আমার চিন্তাজগতে খুবই প্রভাব বিস্তার করেছিল, কিন্তু আজ আমি বুঝি সেটা আসলে নিতান্তই অকার্যকরী।” [Einstein 1949, 21]

এই প্রত্যক্ষবাদের মূল কথা হল, যে কোনো বিষয়ে প্রদত্ত বিবৃতির সত্যতা বুঝতে হবে অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে, প্রত্যক্ষ সংবেদনের প্রেক্ষিতে। যে তত্ত্বগত পাঠের পেছনে পরীক্ষা এবং/অথবা পর্যবেক্ষণের শক্ত খুঁটি নেই, তাকে এই দর্শন বলেছে, অধিবিদ্যা, বাজে-কথা; অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়নি মানেই তা প্রাথমিক বিবৃতি নয়। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে এই দার্শনিক কুল বলেছিলেন বিজ্ঞানের উপাত্ত বা পর্যবেক্ষণকে সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপনার “সুলভ হাতিয়ার”। [Mach 1910, 207] ফলে এই চিন্তার দ্বারা আচ্ছন্ন বিজ্ঞানীদের পক্ষে নিউটনীয় বলবিদ্যার সহজে বোধগম্য ভরবিন্দু-ধারণাকে ছেড়ে এসে ফ্যারাডে ম্যাক্সওয়েল হার্ৎস প্রমুখর হাত ধরে গড়ে ওঠা তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গগতি ও ক্ষেত্রের ধারণাকে গ্রহণ করা প্রায় দুঃসাধ্য ছিল। আবার একটি বস্তুগত মাধ্যম হিসাবে ইথারের ধারণা দিয়ে আলোক তরঙ্গ ও অন্যান্য তড়িচ্চুম্বক তরঙ্গের গতি সমূহকে ব্যাখ্যা সহজ মনে হয়েছিল। বস্তুর গতিতে মাধ্যমের বাধা এবং তা অতিক্রম করতে বল প্রয়োগ — এইভাবে বুঝে নেওয়া সত্যিই সহজ ছিল।

এই দার্শনিক বিভ্রান্তির কারণে তাঁদের দৃষ্টিপথে যেন সব কিছু পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ছিল না। সম্ভবত এই কারণেই লোরেঞ্জ, পোঁয়াকার, ও অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞানীরা দেশ ও কালকে চেতনার হাতিয়ার বা প্রতীক হিসাবে বুঝতে ও বোঝাতে চেয়েছিলেন। যার ফলে তাঁরা ইথারের ধারণাকে পরিত্যাগ করে সাবেকি বলবিদ্যার চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। নয়ত, লোরেঞ্জ এবং পোঁয়াকার নতুন তত্ত্বটির পেছনকার সমস্যা, এর সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ এবং গাণিতিক কলা সম্পর্কে যথেষ্টই অবহিত ছিলেন। আইনস্টাইনেরই বরং এই সব কিছু জানা ছিল না। তাঁদের আবার একটা বাড়তি সুবিধা ছিল — তাঁরা সকলেই তখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষণ ও গবেষণার সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত ছিলেন, আর আইনস্টাইন ছিলেন বিদ্যায়তনিক জ্ঞানচর্চার বাইরে, কোনো এক পেটেন্ট অফিসে নিযুক্ত একজন টেকনিক্যাল কর্মচারি মাত্র। দর্শনই যেন পার্থক্যটা গড়ে দিল।

উদাহরণ দিলে বুঝতে বোধ হয় সুবিধা হবে। যেমন পোঁয়াকার, তিনি মেনে নিয়েছেন যে দেশ ও কালের ধারণা আপেক্ষিক; তবুও তাঁর মনে হল, এই ধারণা আমরা প্রকৃতির কাছে পাই না, বরং আমরাই প্রকৃতির উপর চাপিয়ে দিই — এতে সুবিধা হয় বলে। [Cited, Lenin 1976, 212] তিনিও এটা বুঝেছিলেন, আলোকের গতিবেগের ধ্রুবসীমা মেনে নিলে বলবিদ্যাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, তার পরও তাঁর মনে হল, তড়িচ্চুম্বক গতিবিদ্যার ক্ষেত্রেও “পুরনো সিদ্ধান্ত সমূহ” (অর্থাৎ, নিউটনীয় বলবিদ্যার নিয়ম) “সাফল্য”-এর সঙ্গেই বেরিয়ে আসবে। [Cited, Pais 1983, 127-28] এমনকি, আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রস্তাবনা করার পর বিজ্ঞানীদের বেশির ভাগ তা মেনে নেওয়ার পরেও তিনি তাঁর সেই “সুবিধাজনক প্রকরণ” তত্ত্ব থেকে সরে না এসে আরও জোর দিয়ে বললেন: “আমরা সুবিধাজনক বিধায় আগে একটা বিচারপদ্ধতি গ্রহণ করেছিলাম, এবং বলেছিলাম, কেউ আমাদের এটাকে পরিত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারে না। আজ একদল পদার্থবিজ্ঞানী একটা নতুন বিচারপদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এমন নয় যে কেউ তাঁদের বাধ্য করেছে; তাঁদের এই বিচারপদ্ধতি আরও সুবিধাজনক মনে হচ্ছে, এই হল গিয়ে কথা। যাঁরা তা মনে করেন না, তাঁরা আগেকার মতো করে কাজের অভ্যাস নষ্ট না করে পুরনো বিচারপদ্ধতিই মেনে চলতে পারেন।” [Poincaré 1913, 54]

এদিকে, ১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের কাজ শেষ করার পাশাপাশি আইনস্টাইন তাঁর দ্রবণে দ্রাব অণুর ব্যাসের মাপ সংক্রান্ত গবেষণার থিসিস জমা দেবার দিকে এগোচ্ছিলেন। সেই সঙ্গে চলছিল অ্যাভোগাদ্রো সংখ্যা নির্ণয়ের কোনো প্রত্যক্ষ পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য তাঁর প্রয়াস। পাশাপাশি তিনি ব্রাউনীয় চলন সম্পর্কে পদার্থের আণবিক গতীয় তত্ত্বের সাহায্যে একটা তাত্ত্বিক গাণিতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেললেন। এর দ্বারা তিনি এক ঐতিহাসিক কর্ম সম্পাদন করলেন। কেন না, প্রায় আট দশক ধরে ব্রাউনীয় চলনের ঘটনা একটা সর্বজনীন পর্যবেক্ষণ হিসাবে জানা ছিল, আবার অন্তত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পদার্থের গতীয় তত্ত্বের কোনো পরীক্ষামূলক প্রমাণ জানা ছিল না। আইনস্টাই তাঁর গণনার মাধ্যমে এই দুইয়ের মধ্যে এক সেতুবন্ধন ঘটালেন, ১৯০৯ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী পেরাঁ সেই অঙ্কের পরীক্ষামূলক প্রমাণও পেয়ে গেলেন। এই সব কাজ করতে গিয়ে আইনস্টাইন ধীরে ধীরে টের পেলেন, তিনি প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আর্নস্ট মাখের দার্শনিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। মাখ বলেছিলেন, অণু এবং পরমাণুর ধারণা কাল্পনিক, এর পেছনে কোনো বাস্তব সত্তা নেই। [Mach 1906, 138] কিন্তু তিনি সেই অণু নিয়েই কাজ করছেন, দ্রবণে তাদের ব্যাস মাপছেন, গ্যাসে তাদের সংখ্যা গণনা করতে চাইছেন। যারা বাস্তবে নেই, তাদের কি গোনা যায়, না, মাপা যায়? অর্থাৎ, গবেষণার খাতিরেই তাঁকে ধরে নিতে হল, চোখে দেখা যাক আর নাই যাক, যাদের নিয়ে তিনি কাজ করছেন — যদি অঙ্কগুলো ঠিক হয়, তত্ত্বটা সঠিক হয়, অন্যান্য ইতিমধ্যে প্রাপ্ত সঠিক তত্ত্বের সাথে কোনো বিরোধ না থাকে, এর থেকে নতুন আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তের দিকে এগোনো যায় — তারাও বাস্তবে আছেই। তাঁর চেতনা নিরপেক্ষ বস্তু হিসাবেই আছে। এইখানে তিনি বস্তুবাদী অবস্থানে চলে গেলেন, কতকটা যেন আনমনেই।

এই কারণেই বিজ্ঞানী হিসাবে মাখের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রেখেও পরবর্তীকালে (১৯২২) তিনি বলেছিলেন: “মাখ বলবিদ্যায় যতই পণ্ডিত হোন না কেন, দর্শনের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল চূড়ান্ত হতাশাজনক। এক সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি পরমাণুর অস্তিত্বই অস্বীকার করে বসেছিলেন।” [Cited, Pais 1983, 283] এই মন্তব্যটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় লেনিনের ১৯০৮ সালের একটি অসাধারণ পর্যবেক্ষণ: “The philosophy of the scientist Mach is to science what the kiss of the Christian Judas was to Christ.” [Lenin 1976, 422]

বহু কাল পরে, পেছনের দিকে তাকিয়ে একটি আত্মজীবনীমূলক রচনায় তিনি তাঁর সেই সময়ের অন্যান্য গবেষণা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মন্তব্য করেন, “আমার তখন প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন কিছু তথ্য খুঁজে বের করা যার দ্বারা নির্দিষ্ট আকারের পরমাণুর অস্তিত্ব যতটা পারা যায় সুনিশ্চিত করা। . . . এই ধারণাগুলো যখন অভিজ্ঞতার সাথে মিলে গেল, প্লাঙ্কের (উচ্চ তাপমাত্রায়) বিকিরণের নিয়ম থেকে প্রাপ্ত অণুর আকারের ফলের সঙ্গেও মিলে গেল, কত সংশয়বাদী ছিলেন তখন (মাখ, অসওয়াল্ড), সবাইকেই পরমাণুর অস্তিত্ব মানতে হল।” [Einstein 1949, 45, 47]

প্রসঙ্গত, আমরা ভারতের মহান কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যে সংলাপ (১৪ জুলাই ১৯৩০) হয়েছিল সেখানে দর্শনের প্রশ্নে তাঁর বক্তব্যকেও স্মরণ করতে পারি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাববাদী ঔপনিষদিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বোঝাতে চাইছিলেন, “এই বিশ্বটা মানুষের বিশ্ব”, “এই দুনিয়া মানুষেরই দুনিয়া — এর সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও মানুষ-বিজ্ঞানীরই ব্যাখ্যা”, “সত্য ও সুন্দরের ধারণা মানব নিরপেক্ষ নয়”, ইত্যাদি। কবি তাঁর স্বভাবসুলভ ভাববাদী অবস্থান থেকে বাস্তবতা আর বাস্তব সত্তা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারেননি। বা হয়ত মেনে নিতে পারেননি। আইনস্টাইনকে দিয়ে এই মত মানিয়ে নিতে পারলে সেদিন কবির এক বিরাট দার্শনিক জয় হত। কিন্তু সুখের কথা এই যে আইনস্টাইন এতে সায় দিতে পারেননি। কবির এই রকম প্রতিটি বিবৃতির মৃদু স্বরে বিরোধিতা করে তিনি “বাস্তবের চেতনা নিরপেক্ষ তথা জ্ঞাতা নিরপেক্ষ অস্তিত্ব” সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাসের কথা জোর দিয়ে বলতে থাকেন। তার ভিত্তিতে তিনি এও বলেন যে “বাস্তব যদি মানব চেতনা নিরপেক্ষ হয়, তবে সেই বাস্তবের সম্পর্কে যে সত্য জ্ঞান তাও মানব নিরপেক্ষ।” [Einstein 1976, 51-54]

দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষ কবির এই কাব্যিক সংলাপগুলিকে খুব গর্বের সাথে স্মরণ করেন, বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর (ভ্রান্ত) দার্শনিক মতের (আপাত) জ্ঞান-গভীরতা বোঝাতে, যেন বিজ্ঞানীর চেয়েও তিনি সেদিন বিজ্ঞানের মর্মকথা অনেক বেশি অনুভব করেছিলেন! এর মধ্য দিয়ে তাঁরা যে বিজ্ঞানের সত্যকে এক মিথ্যা দেশপ্রেমিক আবেগের যূপকাষ্ঠে বলি দিচ্ছেন তা বোধ হয় টেরও পান না।

বাস্তব সত্তা সম্পর্কে আইনস্টাইন তাঁর এই বস্তুবাদী ধারণাই তাঁর একটি গ্রন্থে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন: “বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাহায্যে আমরা পর্যবেক্ষণ লব্ধ তথ্যের জঙ্গলে রাস্তা খুঁজে নিতে চাই, অভিজ্ঞতার জগতকে গভীরে ঢুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়ে বুঝতে চেষ্টা করি। বাস্তব জগত সম্বন্ধে আমরা যে ধারণা পাই তা এমনভাবে গঠন করি যাতে তার থেকে পর্যবেক্ষণে পাওয়া তথ্যগুলি যুক্তিসম্মতভাবে বেরিয়ে আসে। আমাদের তত্ত্ব নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাস্তবকে বোঝা যাবে, এই বিশ্বাস না থাকলে, বাইরের বস্তুজগতের ঘটনাবলির মধ্যে অন্তর্নিহিত সংহতি আছে বলে বিশ্বাস না করলে, বিজ্ঞান কিছুই করতে পারে না। এই বিশ্বাসের তাড়না থেকেই সমস্ত বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণার জন্ম হয়ে থাকে এবং চিরকালই তা হতে থাকবে।” [Einstein and Infeld 1938, 312]

আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই বস্তুবাদী দার্শনিক অবস্থানই তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বীয় ক্ষেত্রে বাস্তবতার নতুন জগত উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়েই দেশ ও কাল সম্পর্কে নতুন ধারণা আয়ত্ত করতে সাহায্য করেছিল। ফ্রান্সের তৎকালীন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী লুই দ্য ব্রয় বিষয়টাকে স্পষ্ট করে দিয়ে বলেছিলেন: “১৯০৪ সালে, এই বিষয়ে আলবার্ট আইনস্টাইনের চূড়ান্ত কাজের প্রাক্কালে অঁরি পোঁয়াকারের হাতে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সমস্ত উপাদান এসে গিয়েছিল। . . . পোয়াকার তাঁর চিন্তার পরিণতির দিকে এগোলেন না কেন?” এই জায়গায় পোঁয়াকারের ব্যর্থতার কারণ হিসাবে তাঁর বাস্তবতা বর্জনের দার্শনিক মননকেই দায়ী করেই তিনি দেখিয়েছিলেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বিজ্ঞানের “অসংখ্য তত্ত্ব বা ধারণার সবই আসলে বিজ্ঞানীদের মন গড়া কল্পবস্তু, তার প্রত্যেকটাই গুরুত্বের দিক থেকে সমান; বিজ্ঞানীরা তাদের মধ্য থেকে যে যার পছন্দ এবং কাজের সুবিধা অনুসারে কে কোন তত্ত্ব দেবেন বেছেন নেন।” অন্য দিকে ব্রয়ের মতে, আইনস্টাইনের সাফল্যের কারণ “তত্ত্বের পেছনে বস্তুগত বাস্তব সত্তাকে সচেতনভাবে মেনে নেবার ক্ষেত্রে তাঁর এক নিপুণ ক্ষমতা”। [Broglie 1956, 65-66]

হ্যাঁ, অত্যন্ত সঠিক কথা বলেছেন ব্রয়। সত্যিই তো, দেশ ও কালের আপেক্ষিকতা তাঁর কাছে মাখ চিন্তার মতো “যে যেমন দেখছে ও ভাবছে” তেমন ব্যাপার ছিল না, কিংবা পোঁয়াকারের মতো “সুবিধা অনুযায়ী পছন্দ”-এর ব্যাপারও ছিল না। পোয়াকার এবং লোরেঞ্জ অনেক দূর এগিয়ে এসেও যেটা পারলেন না, আইনস্টাইন অতি সহজেই সেই কাজটা সেরে ফেললেন: ইথারের ধারণাকে ছেঁটে ফেললেন, তাত্ত্বিক দিক থেকেও কাজে লাগবে না, পরীক্ষায়ও দেখা মিলবে না যার। তত্ত্ব থেকে যা পাওয়া গেল তাকে তিনি সরাসরি মেনে নিলেন, অর্থাৎ, আলোকের গতিবেগের ধ্রুবকত্ব—যে কোনো দিকে এবং সমবেগে চলমান যে কোনো নির্দেশাক্ষে; দ্রুত ধাবমান বস্তুর স্বাভাবিক গতি জনিত ঘটনা হিসাবে গতির অভিমুখ বরাবর দৈর্ঘ্যের সঙ্কোচন এবং সময়ের মন্থরায়ন; আর তার ভিত্তিতেই তিনি এগোলেন দেশ কাল ও গতি সম্পর্কে নতুন তত্ত্ব নির্মাণের দিকে, নির্দেশাক্ষ বদলের ক্ষেত্রে পরিপাতন সম্পর্কগুলোকে নতুন করে লিখে ফেলতে।

এই দার্শনিকবোধে চালিত হয়েই তিনি বুঝেছিলেন, দেশ এবং কাল পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বস্তু বহির্ভূত কোনো চরম সত্তা নয়, আবার তারা বস্তুরও কোনো নির্বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়। দেশ ও কাল বস্তুর একাধারে জ্যামিতিক ধর্ম এবং তার গতি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। আর এই কারণেই কোনো বস্তুর ভর ও দৈর্ঘ্য এবং কোনো ঘটনার সংঘটন কাল স্থান কাল পরিস্থিতি নিরপেক্ষ কোনো গুণ বা পরিমাপ নিয়ে অবস্থান করে না। এরা সমস্তই আপেক্ষিক এবং বস্তুর গতীয় বৈশিষ্ট্য তথা নির্দেশাক্ষ নির্ভর। আপেক্ষিকতা মানে জ্ঞাতা নির্ভর আপেক্ষিকতা নয়; বস্তুস্থিতি নির্ভর আপেক্ষিকতা।

এখানে আর একটা বিষয়ও পাঠককে জানানো দরকার। আইনস্টাইন মনে করতেন, বিজ্ঞান ভালো করে বুঝবার জন্য দর্শনও ভালো করে বোঝা দরকার। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। ১৯৪৪ সালে রবার্ট থর্নটন মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের কোর্সে বিজ্ঞানের দর্শনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে চান। তিনি এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সাহায্য ও পরামর্শ চেয়ে যে চিঠি লেখেন, তার উত্তরে আইনস্টাইনের মন্তব্যটি খুবই চিত্তাকর্ষক: “আমি পদ্ধতিতন্ত্র তথা বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শনের তাৎপর্য এবং শিক্ষাগত মূল্য সম্পর্কে তোমার ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত। আজকাল অনেককেই দেখে — তার মধ্যে বেশ কিছু পেশাদার বিজ্ঞানীও আছেন — আমার কেমন যেন মনে হয়, তাঁরা অসংখ্য গাছ দেখেছেন, কখনই কোনো অরণ্য দেখতে পাননি। অধিকাংশ বিজ্ঞানী তাঁদের সমকালীন যে সমস্ত বিভ্রান্তিতে ভোগেন, তা থেকে মুক্ত হতে হলে তাঁদের বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক ও দার্শনিক পৃষ্ঠভূমি সম্পর্কে জানতে হবে। দার্শনিক বোধের ভিত্তিতে প্রাপ্ত এই মুক্তচিন্তা আছে কিনা দেখেই একজন কারিগর বা নিপুণ ব্যক্তির সঙ্গে — আমার মতে — একজন প্রকৃত সত্যসন্ধানীর পার্থক্য বোঝা যায়।” [Einstein 1944, 574; cited in Howard 2005] কেন না, তাঁর মতে, Epistemology without contact with science becomes an empty scheme. Science without epistemology is—insofar as it is thinkable at all—primitive and muddled. [Einstein 1949, 683–684] অর্থাৎ, বিজ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হলে জ্ঞানতত্ত্ব এক ফাঁকা আওয়াজে পর্যবসিত হয়; আবার বিজ্ঞানের তত্ত্বকে যদি জ্ঞানতত্ত্বের সাধারণ কাঠামোয় প্রতিষ্ঠা না করা যায়, তাহলে তা আদিম ও গোলমেলে চিন্তার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে না। বিজ্ঞান চর্চার সাথে দর্শন চিন্তাকে কতখানি গুরুত্ব তিনি দিতেন, তা এই সব মন্তব্য থেকে বোঝা যায়।

আর এই সব কথা তিনি নিছক গুরুগম্ভীর আলোচনা করার জন্য বলতেন না; প্রিন্সটনে তিনি পদার্থবিজ্ঞানের যে পাঠক্রম নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে আবশ্যিকভাবে একটা কোর্স ছিল The Theory of Scientific Thought [Einstein 1987; Doc. 28]।

জীবন সংগ্রামের দর্শন

আইনস্টাইন তাঁর ব্যক্তি জীবনে এরকম একটি বাস্তবপন্থী দর্শনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেন কেন — তার অন্য একটা গভীরতর প্রেক্ষিত রয়েছে বলে মনে হয়। জীবনভর তিনি সংগ্রামে ব্যাপৃত থেকেছেন—শুধু বিজ্ঞানের জগতে সত্যের সন্ধানে ভুলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম নয়; সে তো ছিলই, তার সাথে ছিল এক নতুন ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার সংগ্রাম — এমন এক সমাজ সংসার, যেখানে জাতিবিদ্বেষ নেই, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ অসাম্য ও বঞ্চনা নেই, যেখানে আছে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের অফুরন্ত সুযোগ। এই সংগ্রামেও তাঁর প্রয়োজন ছিল এমন এক সঠিক দূরদৃষ্টির, যেখানে জগত সম্পর্কে অবিকৃত ধারণা গড়ে তোলার অবকাশ থাকবে, থাকবে মানুষের সামনে উপস্থিত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য সঠিক দিশা।

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন তিনি অধ্যাপনা করছিলেন, সেখানকার গরিব ছাত্রদের সমস্যার প্রতি তিনি উদাসীন থাকতে পারেননি, ভাবতে পারেননি, “ওদের-যাই-হোক-আমার-কী-আসে-যায়”। রুটিন ক্লাশের পর তিনি তাদের নিয়ে আলাদা করে বিনা পয়সায় পড়াতে বসতেন (আমরা সমাজ কর্মীরা আমাদের দেশে যেরকম ফ্রি কোচিং ক্লাশের ব্যবস্থা করে থাকি)। তিনি যখন একজন বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী, সেই সময়েও তিনি গরিব মানুষের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আহুত সান্ধ্য অনুষ্ঠানে গিয়ে বেহালা বাজিয়েছেন, যাতে তাঁর নামেই অনেক পয়সা ওঠে। প্রিন্সটনে যাওয়ার পর তিনি জানলেন পোল্যান্ড থেকে আসা তাঁর। একজন ছাত্র — লিওপোল্ড ইনফেল্ড, আর্থিক কষ্টে পড়েছে। তিনি তাঁকে সহযোগী লেখক হিসাবে সঙ্গে নিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের একটা ইতিহাস গ্রন্থ লিখে ফেললেন। আপাত উদ্দেশ্য কোপারনিকাসের সময় থেকে সমকাল পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশের একটা লোকপ্রিয় আলোচনা; ভেতরের উদ্দেশ্য সেই ছাত্রটিকে অর্থ সাহায্য করা, এমনভাবে যাতে তাঁর আত্মসম্মান বিঘ্নিত না হয়।

কি বার্লিন, কি প্রিন্সটন, সর্বত্রই তিনি বাড়িতে প্রতি মাসে কয়েকশ অতিথিকে আপ্যায়ন করতেন, যাদের বেশিরভাগই ঘুরতে ঘুরতে চলে আসতেন আর একজন বিখ্যাত বিজ্ঞানীকে চাক্ষুষ দেখবার কৌতুহল নিবৃত্ত করতেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজনীয় অমূল্য সময় নষ্ট করা ছাড়া এই সব সাক্ষাৎকার তাঁর কোনো উপকার করত না। কিন্তু তাঁদের সাথে সকলের সাথে তিনি হাসিমুখে দেখা করতেন, এক সমুদ্র ধৈর্য সহকারে তাঁদের অবান্তর কথা শুনতেন — একটাই কারণে, এতে তাঁরা জীবনের অনেক ঝড়ঝাপটার মধ্যেও সেখানে এসে মনের ভেতরে একটা অপার শান্তি অনুভব করতেন। যে বা যারাই তাঁর কাছে চাকরি-বাকরির জন্য সুপারিশ-পত্র চাইত, তিনি বিনা আপত্তিতে তা লিখে দিতেন, যদি তাতে সত্যিই তাদের কিছু সুরাহা হয়। যে কেউ তাঁর সাথে আলাদা করে কথা বলতে পারত, নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান বা পরামর্শ চাইত, এবং তিনিও সাধ্যমতো দিতেন। উদাহরণ স্বরূপ ইনফেল্ড লিখেছেন, একবার এক দম্পতি তাঁকে চিঠি লিখে জানান, তাঁদের ছেলের মাথায় ছিট আছে; তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কিছু সময় দিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বললে হয়ত সে একটু সুস্থ হয়ে যেতে পারে। আইনস্টাইন আপত্তি করেননি, ছেলেটির সাথে একদিন কয়েক ঘন্টা ধরে আলাপন চালিয়েছেন। [Infeld 1941, 287; Kuznetsov 1965, 258]

একটাই মাত্র ঘটনার কথা জানা যায়, যেখানে — বার্লিনে থাকা কালীন — তিনি একজন অতিথির উপরে এতটাই ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে তাঁকে প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন। আসলে হয়েছিল কি, সেই লোকটি খুবই নিরীহ একটা প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে এসেছিল, তাঁর E = mc^2 এই সূত্রটির একটা যৌথ পেটেন্ট নেবে বলে। তার ধারণা ছিল, এই সূত্র অদূর ভবিষ্যতে একদিন খুব শক্তিশালী বোমা বানাতে কাজে লাগবে এবং তখন তাঁরা দুজনে সেই পেটেন্টের সুবাদে অনেক টাকা (মানে ডয়েচ মার্ক) কামাতে পারবেন! আইনস্টাইনের কাছে যুদ্ধ থেকে লাভ করা কিংবা যুদ্ধকে কোনো না কোনোভাবে সমর্থন জানানোর মতো জঘন্য কাজ আর কিছুই হত না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সর্বশক্তি দিয়ে ছাত্রদের মধ্য থেকে সেনাবাহিনীতে নাম লেখানোর বিরুদ্ধে একদম নিঃসঙ্গভাবে প্রচার করে গেছেন। বিখ্যাত ব্যক্তি বলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার না করলেও বহু উগ্র জাতীয়তাবাদী লোকজন তাঁকে যেভাবে পেরেছে অপমান করে গেছে। যুদ্ধের আগ্রাসী মনোভাবকে তিনি যে অন্তরের গভীর থেকে কতটা ঘৃণা করতেন, নীচের এই একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্য থেকেই তার কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে:

“একজন মানুষ যে ব্যান্ডের তালে তালে চার হাত পা নাচিয়ে আনন্দ পেতে পারে, এর জন্যই আমি তাকে ঘৃণা করতে পারি। ভুলক্রমে তার ঘাড়ের উপরে একটা মাথা আছে; খোলা মেরু-মজ্জা থাকলেই তার কাজ চলে যেত। সভ্যতার এই দুষ্ট ক্ষতকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিরাময় করে তোলা উচিত। আদেশ পেলেই বীরত্ব ফলানো, অর্থহীন নৃশংসতা, এবং দেশপ্রেমের নামে চলতে থাকা যত্তসব জঘন্য কারবার — এই সমস্ত আমি তীব্র জ্বালার সাথে ঘৃণা করি! আমার কাছে যুদ্ধ কী নোংরা এবং ঘৃণ্য ব্যাপার বলে মনে হয়! আমাকে পিটিয়ে মেরে টুকরো টুকরো করে ফেলুন, তবু আমি এই নোংরা খেলায় যাব না।” [Einstein 1984b, 10-11]

জার্মানিতে ফ্যাসিস্তরা ইহুদি বিদ্বেষ থেকে তাঁর উপর বারবার হামলা চালায় এবং ভয় দেখাতে থাকে। অবশেষে চূড়ান্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে ১৯৩৩ সালে তিনি সপরিবারে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই দেশেও তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দেখলেন মানুষের জীবন এবং বাক-স্বাধীনতার উপর সেই একই রকম সহিংস ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন। কোরিয়া এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা, শান্তির সপক্ষে প্রচার, নিউক্লিয়ার বোমাতঙ্ক সৃষ্টির সমালোচনা — যাঁরাই তা করেছেন তাঁদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা — ম্যাক্‌আর্থি শাসনের এই রকম এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়! তিনি দেখলেন, মার্ক টোয়েন-কে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের সিলেবাস থেকে তাঁকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে (হাওয়ার্ড ফাস্ট-এর লেখা ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’ উপন্যাসটির কথা স্মরণ করুন); মার্কিনি সমাজে ও রাজনীতিতে বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতা করার জন্য পল রোবসনকে গানের জলসা করতে দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হলে কখনও পুলিশ কখনও স্থানীয় মস্তানদের দিয়ে তা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে; চার্লি চ্যাপলিনকে তাঁর যুদ্ধ বিরোধী মনোভাবের জন্য নানা ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে; পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমারকে কাঠগড়ায় দাঁর করানো হয়েছে সোভিয়েত রাশিয়ায় পরমাণু বোমার বোমার ফরমুলা পাচারের হাস্যকর অভিযোগে; আর দু এক বছর বেঁচে থাকলে তিনি এও দেখে যেতেন, যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির অক্লান্ত প্রচারক বিজ্ঞানী লিনাস পাউলিং-কে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিতে যাওয়া আটকে দিতে তাঁর পাশপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর এই রকম প্রতিটি ঘটনায়, তিনি, খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদের মতো চুপ করে নিরপেক্ষ থাকার কোনো চেষ্টাই করেননি, নিজের নাম ও খ্যাতির সমগ্র ওজন ব্যবহার করে এসবের প্রতিবাদ ও নিন্দা করেছেন, বলেছেন, “চুপ করে থাকা মানে তো আসলে ওদের অপকম্মগুলিকেই সমর্থন জানানো।” [Einstein 1984c, 35] সেদিনের আমেরিকান সমাজকে দেখে তিনি গভীর দুঃখের সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, “কয়েক বছর আগেকার জার্মান দুর্যোগই আবার নেমে আসছে।” [Cited, Simon 2005]

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা একটু সবিস্তার বলা যাক।

১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন দেশের সমস্ত শিক্ষকের কাছে নির্দেশ পাঠায় কংগ্রেসের একটি কমিটির কাছে এসে এই মর্মে মুচলেকা দিতে যে তাঁরা কোনো রকম অ-আমেরিকান কাজের মধ্যে যুক্ত থাকছেন না। মানে হল, তাঁরা কেউ আমেরিকার যুদ্ধ প্রচেষ্টা বা পরমাণু বোমার ধমকির বিরোধিতা করবেন না, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মুখর হবেন না, কোরিয়া বা ভিয়েতনামে আমেরিকা যে আগ্রাসন চালাচ্ছে তার সমালোচনা করবেন না, ইত্যাদি। নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনবাসী একজন শিক্ষক ঠিক করলেন, তিনি এই মুচলেকা দেবেন না। তিনি আইনস্টাইনের শরণাপন্ন হলেন। আইনস্টাইন উত্তরে চিঠি লিখে তাঁকে বললেন, দেশের শিক্ষিত মানুষের স্বাধীন বিচারবুদ্ধিকে এইভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার এই “আধুনিক ইঙ্কুইজিশন-পদ্ধতি”-র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। “জেলে পচে মরা এবং অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে হলেও” লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে। সেই পত্রের শেষ পংক্তিটা পড়েই চেনা গিয়েছিল আইনস্টাইনের মানসলোকের জাত: “পুনশ্চ:— এই চিঠিটিকে ব্যক্তিগত মনে করবার কোনো দরকার নেই”! [Einstein 1984d, 33-34] অস্যার্থ, আপনি চাইলে এই পত্রকে কোথাও ছাপিয়ে দিতে পারেন, সরকারি প্রশাসনযন্ত্র এবং আম জনগণ, উভয় পক্ষকে জানিয়ে দিতে পারেন, এরকম প্রশ্নে আমার অবস্থান কোন দিকে থাকবে!!

সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্ত সমস্যা দুর্ভোগের জন্য তিনি ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করে লেখেন: “I regard class distinction as unjustified, and in the last resort, based on force.” [Einstein 1984b, 8] তাই তিনি খোলাখুলি আলোচনা করেছেন বিদ্যমান সমস্ত দুঃখ দুর্দশা থেকে মানুষের সর্বাঙ্গীন মুক্তির জন্য “কেন সমাজতন্ত্র” চাই, এই নামে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (মে ১৯৪৯) একটি প্রবন্ধও লেখেন। সময়টা লক্ষ করতে বলছি — সেদিন যখন ম্যাক্‌আর্থি আমলে সাম্যবাদ তো দূরের কথা, যে কোনো প্রগতিশীল মতবাদের সাথে সামান্য সংস্পর্শ দোষ থাকলেই বুদ্ধিজীবীদের মার্কিনি প্রশাসন ভয়ানকভাবে হেনস্থা করে যাচ্ছিল, সেই রকম সময়েই তিনি এই প্রবন্ধটি রচনা করেন।

নৈতিকতার নিশান

তিনি এটা পেরেছিলেন, কারণ, তাঁর সমগ্র জীবনই ছিল এক উচ্চতর নৈতিক সুরে বাঁধা। একজন ব্যক্তির জীবন ও অস্তিত্বের সমস্ত কাজের পেছনেই নৈতিক প্রেরণা থাকাটাকে তিনি বাধ্যতামূলক মনে করতেন। তাঁর জীবনের প্রথম দুই তৃতীয়াংশ কেটেছিল ইউরোপে, যেখানে তিনি দেখেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংস রণহুঙ্কার। দেখেছেন ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং তার সাথে সাথে মনুষ্যত্বের জঘন্যতম পরাজয়। এমনকি বিজ্ঞানের জগতে, বিজ্ঞানীদের মধ্যেও দেখেছেন অর্থ ও ক্ষমতার লোভ, অপ্রাপ্য খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা, পারস্পরিক ঈর্ষা বিদ্বেষ, ধর্ম ও জাতের নামে হিংসার উন্মত্ত প্রকাশ! সেই দুর্দিনে একদিকে নিজেকে রক্ষা করা, আর চারপাশের মানুষদের কাছে মানবিকতা নৈতিকতার কথা বলে যাওয়া — এই তাঁর ধ্যান জ্ঞান হয়ে উঠেছিল।

তিনি মনে করতেন, নৈতিকতাবোধই মানুষের জীবনকে সুন্দর, মর্যাদামণ্ডিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ করে তোলে: “মানুষের জীবনের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল সমস্ত কাজের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধকে স্থাপন করা। আমাদের মানসিক ভারসাম্য, এমনকি আমাদের অস্তিত্বও এর উপরেই নির্ভর করে। সমস্ত কাজকর্মের মধ্যে নৈতিক আধার থাকলে তবেই জীবনে সৌন্দর্য ও মর্যাদা আসে।” [Cited, Dukas and Hoffman 1979, 95] যাঁরা মনে করতেন, বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞান চর্চা করাই কাজ, তার ভালোমন্দের দায় তাঁদের নয়, তিনি তাঁদের সেই চিন্তাকে ভ্রান্ত বলে সাব্যস্ত করেছিলেন: “I can think nothing more objectionable than the idea of science for the scientists. It is almost as bad as art for artists and religion for the priests.” [Comment, Planck 1933, 209] কারণ, তিনি দেখিয়েছিলেন, আমরা প্রত্যেকেই আমাদের জীবনের খুঁটিনাটি ব্যাপারের অনেক কিছুর জন্য সমাজের অনেকের কাছে বিভিন্ন মাত্রায় ঋণী: “আমি প্রতিদিন শতবার নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিই যে ঘরে ও বাইরে আমার অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে জীবিত ও মৃত অসংখ্য মানুষের শ্রমের ফসল; আমি যতটা পেয়েছি এবং আজও পেয়ে চলেছি, আমাকেও বিনিময়ে তার সমপরিমাণে কিছু না কিছু ফিরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে হবে।” [Einstein 1984b, 8] আর এই ঋণ শুধু সমকালের কাছেই নয়, ইতিহাসের ধারাপথ বেয়ে যুগ যুগান্ত ধরে অসংখ্য মানুষের শ্রমের ফসল গ্রহণ করে তাদের সকলের কাছে আমরা অধমর্ণ হয়ে আছি।

এই কথাটাই একবার তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন একটি স্কুলের কিছু ছাত্রছাত্রীকে: “মনে রেখ, তোমরা আজ স্কুলে যে ভালো ভালো জিনিসগুলি শিখছ, তা বহু প্রজন্ম ধরে পৃথিবীর সমস্ত দেশের অসংখ্য মানুষের আগ্রহ প্রয়াস ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে পাওয়া গেছে। এই সমস্ত কিছু তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে উত্তরাধিকার হিসাবে, যাতে তোমরা একে গ্রহণ করে এর মর্যাদা রক্ষা করতে পার, এর সাথে আরও নতুন উপচার যোগ করতে পার, এবং একদিন তোমাদের পরের প্রজন্মের হাতে সবটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে দিয়ে যেতে পার। এই ভাবেই আমরা মরণশীল হয়েও আমাদের সম্মিলিত চিরস্থায়ী সৃষ্টির মাধ্যমে অমরত্ব লাভ করি। এই কথাটা যদি তোমরা মনে রাখতে পার, তবেই তোমরা জীবনের এবং কাজকর্মের মধ্যে মানে খুঁজে পাবে, এবং অন্যান্য জাতি ও আগেকার সময়ের প্রতি সঠিক মনোভাব আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে।” [Einstein 1984e, 56] এরকম কথা, আমি যত দূর জানি, মার্ক্সবাদীরাও এত স্পষ্ট ভাষায় এযাবত বলতে পারেননি।

একবার তিনি গিয়েছিলেন ক্যালটেক-এর এক সভায় বক্তৃতা দিতে। ভাষণের শেষ দিকে এসে ছাত্রদের উদ্দেশে তিনি যা বলেছিলেন, তা নামকরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে আর কাউকেই আমি বলতে শুনিনি: “প্রযুক্তিবিদ্যা আয়ত্ত করার প্রধান আকর্ষণের বিন্দু অবশ্যই হওয়া উচিত মানুষ এবং তার ভাগ্যের পরিণতি নিয়ে চির জাগ্রত উদ্বেগ, শ্রম সংগঠন ও উৎপাদিত দ্রব্য বন্টনের ক্ষেত্রে যাবতীয় পড়ে থাকা সমস্যার সমাধানের চিন্তা। একমাত্র এইভাবেই আমাদের মানসিক শ্রমের ফসলকে মানবজাতির পক্ষে অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ করে তুলতে পারি। নকশা অনেক আঁকবে, সমীকরণও অনেক সমাধান করবে তোমরা—কিন্তু তার মাঝে এই কথাটা যেন ভুলে যেও না।” [Shapley, Rapport and Wright (eds.) 1946, 44]

স্বভাবতই, প্রত্যক্ষবাদ যেভাবে ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকেই জ্ঞানের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভিত্তিভূমি বলে মনে করে, এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যেহেতু সে মূল্যবোধ নিরপেক্ষতার কথাটার উপর জোর দিয়ে বলে, আইনস্টাইনের পক্ষে এই দর্শনকে মেনে নিয়ে কোনো কাজই করা সম্ভব ছিল না — না বিজ্ঞানের সত্যানুসন্ধান, না বাস্তব জীবনের সংগ্রাম! বিজ্ঞানের জগতে একজন গভীর যুক্তিবাদী সত্যসন্ধানী এবং সামাজিক অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে একজন মানবতাবাদী বিবেকবান ও সচেতন সংগ্রামী সৈনিক হিসাবে তাঁর প্রয়োজন ছিল এক ভূমিস্পর্শী দার্শনিক বোধ। তাই প্রত্যক্ষবাদও নয়, আবার ভাববাদী ধর্মীয় বিশ্বাসও নয় — তিনি বস্তুবাদের প্রাঙ্গনেই আজীবন নিজের চারণ ভূমি খুঁজে বেরিয়েছেন। নৈতিক উপলব্ধিকেও সেই বস্তুবাদী যুক্তিবাদী বিচারের পথেই খোঁজ করেছেন।

ধর্মবিশ্বাস, না, সুপ্ত নিরীশ্বরবাদ?

অথচ একথা তো ঠিক, অনেক লেখাতেই তিনি বারবার ধর্মের কথা বলেছেন, বিজ্ঞানীদের এক মহাজাগতিক ঈশ্বর বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেছেন। লোকপ্রিয় বিজ্ঞানের আলোচনায় তাঁর একটি বিশেষ মন্তব্য অনেকে প্রায়শই উল্লেখ করে থাকেন এবং তাঁর ধর্মে সুমতির ব্যাপারে নিশ্চিন্ত সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন। তিনি বলেছিলেন: “Science without religion is lame; religion without science is blind.” [Einstein 1984f, 46] তাঁর যে অনস্পষ্ট বস্তুবাদী বীক্ষার পরিচয় আমরা বিজ্ঞানের আলোচনায় অনেক জায়গাতেই পেয়েছি, তার সাথে এই উচ্চারণ যে মেলে না — একথাও ঠিক। একে কেমন যেন ধর্মের উদ্দেশে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।

আসুন, দেখা যাক, তিনি বাস্তবে ঠিক কী ধরনের ধর্মের কথা বলতে চেয়েছেন।

এই বিচার বিশ্লেষণে ঢুকলে আমরা দেখতে পাব, তিনি যে প্রকারের ধর্মের কথা বলতেন, তার সাথে এই “খঞ্জ-অন্ধ” সমীকরণ ব্যবহারকারী ধর্মে আস্থাশীল ব্যক্তিদের বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ মানুষ ধর্ম বললে যা বোঝে তার সাথেও এর কোনো সামান্যতম যোগ নেই। আইনস্টাইনের ধর্ম দিয়ে তাদের পূজাপাঠ ধ্যান উপাসনা আচার বিচার — কিছুই করা সম্ভব হবে না। কেন না, ধর্মের কথা বলতে গেলেই তিনি কোনো ব্যক্তিরূপী ঈশ্বরের ধারণার বিরোধিতা করতেন, অথচ, বিভিন্ন দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলি ধর্মের যে আদর্শ খাড়া করেছিল, তাদের পক্ষে এরকম এরকম একজন অভিভাবক ঈশ্বর ছাড়া কাজ চালানো মুশকিল। আইনস্টাইন মনে করতেন, আধুনিক বিজ্ঞানের শিক্ষাদীক্ষায় সার্থকভাবে অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের কাছে “ভীতি উদ্রেককারী ধর্মেরও যেমন প্রয়োজন নেই, কোনো সামাজিক বা নৈতিক ধর্মবিশ্বাসেরও দরকার নেই। যে ভগবান শাস্তি বা পুরস্কার দেন, সেরকম ঈশ্বরের ধারণা তাঁর কাছে অবাস্তব মনে হতে বাধ্য, কেন না, মানুষ তো যা কিছু করে তা কোনো এক বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন অনিবার্যতার চাপে পড়েই করে; ঈশ্বর তার জন্য তাঁকে কীভাবে দায়ী করবেন? একটা জড় বস্তুর গতির জন্য কি তাকে দায়ী করা যায়?” [Ibid]

আধুনিক ধর্মদার্শনিকরা অনেকেই খুব দৃঢ়ভাবে মনে করেন, মানুষের জীবনে নৈতিক বোধের সঞ্চার করার জন্যই নাকি ধর্মের অপরিহার্য প্রয়োজন। তাঁদের কারোর কারোর মতে, আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশ ও প্রসারই নাকি বর্তমান প্রজন্মের মানুষদের জীবনে নৈতিকতার সর্বব্যাপক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী। আইনস্টাইন এই দুটো ধারণারই তীব্র বিরোধিতা করে গেছেন। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় দেখিয়ে দিয়েছেন যে বিজ্ঞানকে এই ব্যাপারে অত্যন্ত ভুলভাবে “নৈতিকতাবোধকে অবদমনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়। মানুষের নৈতিক আচরণের কার্যকরী ভিত্তি হবে সহানুভূতি, শিক্ষা, সামাজিক বন্ধন ও উপযোগিতা; এর জন্য ধর্মীয় ভিত্তর কোনোই প্রয়োজন নেই।” [Einstein 1984g, 39] কেন না, তাঁর মতে, “বিজ্ঞানী বিশ্বজগতের সর্বত্র এক হেতুত্বের ধারণা নিয়ে চলেন। অতীতের মতোই ভবিষ্যতের ঘটনাবলিও সমানভাবেই কারণ-কার্য সম্বন্ধ দ্বারা নির্ধারিত। ফলে নীতিবোধের মধ্যে দৈব ব্যাপার বলে কিছুই নেই; এর সমস্তটাই মানবীয় পরিঘটনা।” “তাঁর [বিজ্ঞানীর] ধর্মানুভূতি আর কিছুই নয়, প্রাকৃতিক নিয়মের সামঞ্জস্যের দিকে তাকিয়ে এক আপ্লবিক বিস্ময়, যেন এর মধ্য দিয়ে এক এমন উচ্চমার্গীয় উৎকৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তির সন্ধান ফুটে বেরচ্ছে যার পাশে মানুষের সমস্ত সুসংবদ্ধ চিন্তা ও কর্মকে নিতান্তই এলেবেলে বলে বোধ হয়। এই অনুভূতিই তার সারা জীবনের সমস্ত কাজের পেছনে মূল আদর্শ হিসাবে দাঁড়িয়ে থাকে, এর জোরেই সে যে কোনো স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষার শেকল থেকে নিজেকে মুক্ত করে রাখে।” [Einstein 1984h, 40]

যে ধর্মীয় চিন্তায় কোনো ব্যক্তিরূপী ঈশ্বর নেই, যার হাত থেকে মানুষকে নৈতিক প্রেরণা দেবার দায়িত্বও তুলে নেওয়া হয়েছে, সাধারণ ভক্তবৃন্দের কাছে এরকম ধর্মের কোনোই মূল্য নেই। এতে বরং শুধুমাত্র এটাই বোঝা যায় যে আইনস্টাইন বস্তুজগতের ঐক্য ও বস্তুসর্বস্বতা, প্রকৃতির নিয়মসমূহ, বুদ্ধিমান মানুষের পক্ষে সেই সমগ্র জ্ঞান আয়ত্ত করার ক্ষমতা, এবং যাঁরা সেই জ্ঞান ধাপে ধাপে আয়ত্ত করতে সক্ষম হন তাঁদের আবেগ বিস্ময় ও এক ধরনের উচ্চমার্গীয় অনুভূতির পরিঘটনাকে প্রকাশের জন্য একটা একক-শব্দ খুঁজে বেরিয়েছেন। সেরকম কোনো ভাবঋদ্ধ শব্দ (বাস্তবে নেই বলেই) না পেয়ে অবশেষে তিনি বারুখ স্পিনোজার দর্শন থেকে এক বিমূর্ত প্রকৃতিলীন ঈশ্বরের ধারণা সংগ্রহ করেছিলেন। আর, এই প্রসঙ্গে মনে রাখা ভালো, স্পিনোজার দর্শনে ঈশ্বরের উপস্থিতি থাকলেও সেই ঈশ্বর যেহেতু সমগ্র বস্তুজগতেরই সাথে একাত্ম ও অন্তর্লীন এক সংজ্ঞা, শেলিং এবং হেগেলের মতো ভাববাদী দার্শনিকরা প্রচণ্ড রেগে গিয়ে তাঁকে “বস্তুবাদী” বলে নিন্দা করেছেন; আর উলটো দিকে দিদরো ও ফয়ারবাখের মতো বস্তুবাদী দার্শনিকরা তাঁকে সেই “বস্তুবাদী” বলেই সম্মান জানিয়েছেন। [See Plekhanov 1976, 594 and 629] সেই স্পিনোজার প্রতি অনুরক্ত আইনস্টাইনের ভগবানকেও তাই — ঠিক মতো জানা থাকলে — ভাববাদী এবং ধর্মবিশ্বাসীর তেমন পছন্দ হওয়ার কথা নয়। সেই জন্যই ইনফেল্ড খুব সঠিকভাবে দেখিয়েছেন: “This sense of the materiality of the outside world is so powerful in Einstein that it frequently falls into its opposite. When Einstein speaks of God he means the intrinsic relationships and logical simplicity of the laws of nature.” [Infeld 1941, 271]

১৯২২ সালে জাপানের এক পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁকে একবার জিগ্যেস করেছিলেন, “আচ্ছা, বিজ্ঞানের সত্য আর ধর্মের সত্য কি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ফসল?”

উত্তরে তাঁকে আইনস্টাইন বলেছিলেন, “দেখুন, “বৈজ্ঞানিক সত্য” বলতে কী বোঝায় সঠিকভাবে বলা খুব শক্ত। সত্যের অর্থ এক এক জায়গায় এক এক ভাবে হতে পারে; কেউ এটা দিয়ে বোঝেন অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত ঘটনা, কারোর কাছে একটা গাণিতিক প্রতিজ্ঞাই সত্য, আবার কেউ ভাবতে পারেন, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বই হল সত্য। কিন্তু “ধর্মীয় সত্য” যে কী জিনিস আমার কাছে তার কোনো কিছুই স্পষ্ট নয়।” [Einstein 1922]

কিছুকাল আগে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। ২০০৮ সালে লন্ডনের নিলাম দপ্তর বন্ধু এরিক গুটকিন্ডকে পাঠানো আইনস্টাইনের ৩ জানুয়ারি ১৯৫৪ তারিখের একটি হাতে লেখা চিঠি প্রকাশ্যে বিক্রির জন্য তুলে আনে। মৃত্যুর এক বছর আগের সেই চিঠিতে তিনি লিখে গিয়েছেন: “The word God is for me nothing more than the expression and product of human weakness, the Bible a collection of honourable, but still primitive legends which are nevertheless pretty childish. No interpretation no matter how subtle can change this.” [Cited, Natarajan 2008] অর্থাৎ, তখন তিনি “ঈশ্বর” শব্দের মধ্যে দেখেছেন মানুষের মানসিক দুর্বলতা, বাইবেলের রূপকথার মধ্যে পেয়েছেন শিশু সাহিত্যের উপযোগী কল্প কাহিনি; হাজার ব্যাখ্যা দিলেও যার অবস্থানের কোনো বদল হবে না।

এই সমস্ত তথ্য সামনে রেখে বিচার করলে এটা বুঝতে আর অসুবিধা হয় না, ভগবান আর মহাজাগতিক ধর্ম বলার দ্বারা আইনস্টাইন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে জানা বোঝার আবেগময় অনুভূতিকেই বোঝাতে চেয়েছেন। আর তা দেখতে দেখতে আর এক জার্মান ভাববাদী চিন্তাবিদ শোপেনহাউয়ারের এক আক্ষেপোক্তির কথা মনে পড়ে যায়: “Pantheism is only a polite form of atheism.” [Cited, Häckel 1934, 238] অর্থাৎ, সর্বেশ্বরবাদ আসলে নাস্তিকতারই ভদ্রতাসূচক বাচন। যত তাঁর বয়স বেড়েছে, ততই ধীরে ধীরে তিনি এই আপসমূলক ঈশ্বর-পৃক্ত বাক্যবন্ধকে পাশ কাটিয়ে নিজের মত খোলাখুলি বলতে চেষ্টা করেছেন। দুঃখের কথা হল, বিভিন্ন গণ মাধ্যমে এবং অধিকাংশ লোকপ্রিয় জীবনী গ্রন্থে এই সব প্রশ্নে আইনস্টাইনের প্রথম জীবনের কিছু কিছু মন্তব্যই বেছে তুলে এনে এক খণ্ডিত ও বিকৃত পরিচয় তুলে ধরা হয়। পরবর্তীকালে, যত দিন গেছে, বিশ্ব পুঁজিবাদী অসভ্য দুনিয়ার হালচাল তাঁকে যত বাস্তব সম্পর্কে সচেতন এবং শাসকদের সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলেছে, ততই তিনি ক্রমাগত ঈশ্বর ধারণাকে পরিত্যাগ করার দিকেই এগিয়ে গিয়েছেন। এই প্রকৃত ও সামগ্রিক সত্যকে কখনই পাঠকদের কাছে উন্মোচিত করা হয় না।

সিদ্ধান্ত

তাহলে এই হল সংক্ষেপে আইনস্টাইনের দার্শনিক অবস্থান। তিনি ধর্মের কথা বললেও প্রচলিত ভাববাদী অর্থে ধর্মের কোনো অনুষঙ্গকেই গ্রহণ করেননি — না তার ঈশ্বর, না তার কোনো বিশেষ সাম্প্রদায়িক আচার আচরণ। এমনকি কোনো ধর্মগ্রন্থের প্রতিই তাঁর সামান্যতম বিশ্বাস বা শ্রদ্ধার আভাসমাত্রও দেখা যায়নি। বিজ্ঞানের চর্চায় তিনি ভাববাদ ও প্রত্যক্ষবাদের প্রায় সমস্ত যুক্তিকেই কখনও না কখনও খণ্ডন করেছেন — যদিও তাঁর নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে। বিজ্ঞানের বিচার্য ক্ষেত্র হিসাবে বহির্জগতকে তিনি মানব চেতনা ও জ্ঞান নিরপেক্ষ বলে মনে করতেন। বিজ্ঞানীর চেতনার বাইরে অবস্থিত বস্তুবিশ্বকে জানার মধ্য দিয়ে চেতনার অন্তর্ভুক্ত করাকেই তিনি বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অর্জন বলে ভাবতে চাইতেন।

গ্রন্থপঞ্জি

1. Broglie, Louis de (1956), “Henri Poincaré and physical theories” (in French) in Oeuvres du Henri Poincaré, Vol. XI; Cauthiers-Villars, Paris.
2. Dukas, Helen and Hoffman, Banesh (eds. 1979), Albert Einstein, the Human Side. New Glimpses from His Archives; Princeton University Press, Princeton.
3. Einstein, Albert (1922), “Interview with a Japanese scholar” on 14 December 1922; Kaizo, Vol. 5 No. 2 (1923).
4. Einstein, Albert (1944), “Einstein’s Letter to Thornton”, dated 7 December 1944; Einstein Archive, Vol. 61.
5. Einstein, Albert (1949), “Autobiographical Notes”, in Schlipp, Paul Arthur (1949), Albert Einstein: Philosopher-Scientist; The Library of Living Philosophers, Evanston.
6. Einstein, Albert (1976), My Views; Rupa and Co., Kolkata.
7. Einstein, Albert (1984), Ideas and Opinions; Rupa and Co., Kolkata.
8. Einstein, Albert (1984a) “The Fundamentals of Theoretical Physics”, in Einstein (1984).
9. Einstein, Albert (1984b) “The World As I See It”; in Einstein (1984).
10. Einstein, Albert (1984c), “Human Rights”; in Einstein (1984).
11. Einstein, Albert (1984d), “Modern Inquisitional Methods”; in Einstein (1984).
12. Einstein, Albert (1984e), “Teachers and Pupils”; in Einstein (1984).
13. Einstein, Albert (1984f), “Science and Religion”; in Einstein (1984).
14. Einstein, Albert (1984g), “Religion and Science”; in Einstein (1984).
15. Einstein, Albert (1984h), “The Religious Spirit of Science”; in Einstein (1984).
16. Einstein, Albert (1987), The Collected Papers of of Albert Einstein; Vol. I, John 17. Stachel et al (eds.); Princeton University Press, Princeton.
18. Einstein, Albert and Infeld, Leopold (1938), The Evolution of Physics; Cambridge University Press, Cambridge.
19. Häckel, Ernst (1934), The Riddle of the Universe; Watts and Co., London.
20. Howard, Don A. (2005), “Albert Einstein as a Philosopher of Science”; Physics Today, December 2005. Also see, Howard, Don A. (2015), “Einstein’s Philosophy of Science”; The Stanford Encyclopedia of Philosophy.
21. Infeld, Leopold (1941), Quest; Doubleday, Doran, New York.
22. Kuznetsov, B. (1965), Einstein; Progress Publishers, Moscow.
23. Lenin, V. I. (1976), Materialism and Empirio-Criticism; Foreign Languages Press, Beijing.
24. Mach, Ernst (1906), Space and Geometry; Open Court, Chicago.
25. Mach, Ernst (1910), Popular Scientific Lectures, Open Court, Chicago.
26. Natarajan, Vasant (2008), “What Einstein Meant When He said, God does not play dice ……”; Resonance, Vol. 13 No. 7 (July 2008)
27. Pais, Abraham (1983), ‘Subtle Is the Lord…’: The Science and the Life of Albert; Oxford University Press; Oxford.
28. Planck, Max (1933), Where Is Science Going? (Epilogue); George Allen and Unwin, London.
29. Plekhanov, Georgi (1976), (a) “Preface to A. Deborin’s Book: An Introduction to the Philosophy of Dialectical Materialism”; and, (b) “From Idealism to Materialism”; in G. Plekhanov (1976), Selected Philosophical Works, Vol. III; Progress Publishers, Moscow.
30. Poincaré, Henri (1913), Dernières pensées; Flammarion, Paris.
31. Shapley, Harlow; Rapport, Samuel and Wright, Helen (eds. 1946), A Treasury of Science; Harper and Brothers, New York.
32. Simon, John S. (2005), “Albert Einstein, Radical”; Analytical Monthly Review, Vol. 3 No. 2 (May 2005).

[759 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0