লিখেছেন: সুমন চৌকিদার

বোধকরি জীবজগতে একমাত্র মানুষেরই ধর্ম(প্রাতিষ্ঠানিক) আছে। জানি না, বুদ্ধিমান এ প্রাণির কেনো ধর্মের প্রয়োজন হয়েছিলো? সত্যই কী মানুষের জন্য ধর্ম, নাকি ধর্মের জন্য মানুষ? কারণ যা রক্ষার জন্য ঈশ্বর নয়, মানুষকেই সর্বদা প্রস্তুত থাকতে ও লড়াই করতে হয়, চরম মূল্য দিতে হয়, অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, শত্রু-মিত্র চিনতে-জানতে হয়, পাহারাদার রেখে পালন করতে হয়, যুদ্ধ করতে হয়, নৃশংস্যভাবে ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মালম্বী হত্যা করতে হয়… তা কীভাবে মানুষের জন্য সত্য, সুন্দর, মঙ্গলজনক… হয়? সেহেতু মনে হয়, মানুষই একমাত্র জীব, যাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হলেও ধর্মযুদ্ধের নামে(যা বিশ্বের ভয়ংকর ও প্রধানতম সমস্যা), গণহত্যা করে, জঙ্গি হয়, অপরকেও বানায়… (জঙ্গি অল্প হলেও সমর্থক প্রচুর)। অথচ পশুরা মৌলিক চাহিদা পূর্ণ করা ছাড়া লড়াই করে না। তাহলে কী মানুষের ধর্ম আছে বলেই, এরূপ বীভৎস্য যুদ্ধ-দাঙ্গা, লড়াই, গণহত্যায়… লিপ্ত হচ্ছে? কারণ বর্তমান সভ্য পৃথিবীতে ধর্মের অনুপ্রেরণাতেই কতিপয় মানুষ হিংস্রতম, বিভীষিকাময়, মহাভয়ংকর, নিকৃষ্টতম, নৃশংস্যতাময়, পৈশাচিকতাময়, জঘন্যতাময়, বর্বরতাময়, ইতরতাময়, ঘৃণ্যতাময়… জঙ্গি হচ্ছে এবং নারকীয় গণহত্যায় লিপ্ত রয়েছে। বলছি, ধর্মরক্ষার নামে মানুষ (অল্প হলেও) যেরূপ হিংস্র হয়, ভিন্ন মতালম্বীদের ঘৃণা করে, নৃশংসত্যা চালাতে পারে… তা কী অন্য কোনো কারণে পারে বা করে? মনে হয় না। অতএব এবিষয়ে পশুরা অন্তত মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং মানুষকে লজ্জা দিতেই পারে।

তাছাড়া, ধর্ম আছে বলেই একমাত্র মনুষ্য সন্তানেরাই মানুষ হওয়ার পূর্বে ধার্মিক হয় (বিশেষভাবে ধর্মপ্রিয় বা ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে)। কারণ শিশুর সম্পূর্ণ ধবধবে সাদা মগজে সর্বপ্রথম যে নাম লেখা হয়, তাহলো- ঈশ্বর এবং ধর্ম। ফলে বেশিরভাগ মানুষই একে ইস্পাতকঠিন সত্য বলে মেনে নেয় এবং শিক্ষিত/উচ্চশিক্ষিতসহ প্রায় সকলেই আজীবন বিচার-বিবেচনাহীনভাবে পালন করে যায়। সুতরাং কেউই বুঝেশুনে, যাচাই-বাছাই করে ধর্ম ধারণ বা গ্রহণ করে এমন প্রমাণ নেই। অর্থাৎ মানুষ নিজে ধর্ম ধারণ করে না, ধর্মই তাকে ধারণ করে; যা জ্ঞান হওয়ার সর্বপ্রথম ধাপেই ঘটে। অতএব, যা না বুঝে, না জেনেই ধারণ করা হচ্ছে, তা কীভাবে মহাসত্য, মহাপবিত্র, সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বজ্ঞানের ভান্ডার… হয়, এ মুর্খের বোধগম্য নয়। এছাড়া, ধর্মের নির্দিষ্ট একটি বাণীর বহু ব্যাখ্যাও সম্ভব। প্রশ্ন হলো- যা মহাসত্য(!), যারপর নাই খাঁটি(!) তা এতো বিভ্রান্তিময় কেনো? যা বিভ্রান্তিকর তা সত্যই হতে পারে না, অথচ মহাসত্য(!), যারপর নাই খাঁটি(!) হয় কীভাবে?

জ্ঞানার্জনের জন্য একটি শিশুর অক্ষরজ্ঞান এবং পড়াশোনার কোনোই বিকল্প নেই। তবে একমাত্র ধর্মকেই ভালোভাবে দূরে থাক, জীবনে কোনোদিনই না পড়ে, না বুঝে, না জেনে, সামান্যতম অক্ষরজ্ঞান… ছাড়াই গ্রহণ করা যায় এবং এর জন্য একখানা পুস্তকই যথেষ্ট। তাও মনে হয়, সাধারণ শিক্ষত তো নয়ই, শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও ৯০% মানুষই পড়ে না, শুধু শুনেই বিশ্বাস করে। ফলে মানুষ নিজের অজান্তেই ধর্মের (ভালো কিছু উপদেশসহ) নানাপ্রকার ঘৃণ্য, জঘন্য, মানবতাহীন… আদেশ-নির্দেশ গ্রহণ ও পালন করতে বাধ্য হয়। অথচ পৃথিবীর সব দর্শন ও মতবাদ গ্রহণ বা বর্জনের জন্য ভালোভাবে পড়তে, বুঝতে ও জানতে হয়। অর্থাৎ কাউকে শিক্ষিত হতে হলে বহু কষ্টে, বহু বিষয় (অংক, বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস, অর্থনীতি…) পড়াশোনা করতে হয়। আর সুশিক্ষিত হতে হলে পাঠ্যতালিকার বাইরেও প্রচুর বই, গবেষণাপত্র ইত্যাদি পড়তে হয় (যা খুব কম সংখ্যক লোকেই পড়ে)। তবে মনে হয়, আমরা কমপক্ষে ৯৫% বাঙালিই শিক্ষিত হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করি, সুশিক্ষিত বা সুন্দর মানুষ হওয়ার জন্য নয়। অর্থাৎ আমরা ততোটুকুই পড়াশোনা করি, যতোটুকু না শিখলে বড় পদে অধিষ্ঠিত বা ভালো একটা চাকুরি পাওয়া যাবে না (আজকাল অনেকেরই তাও প্রয়োজন হয় না)।

বলতে পারেন, ধর্ম ছাড়া ধর্মজঙ্গি হয় কীভাবে? কারণ পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ভাইরাস হলো ধর্মভাইরাস। এ ভাইরাসে যাকে ধরে সে জঙ্গি না হলেও, জঙ্গিসমর্থক হবেনই। আর যদি উচ্চশিক্ষতদের ধরে, তবে তাদের মতো মহাদানব আর কেউ হতে পারে না (যা প্রমাণিত সত্য)। অন্যদিকে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ অসামপ্রদায়িক থাকতে পারলেও ধর্ম প্রশ্নে অসামপ্রদায়িক হয় বা থাকে কীভাবে? অথবা, কোনো ধর্মরাষ্ট্রের ব্যক্তি বা সমাজ কীভাবে অসামপ্রদায়িকতা হতে পারে? যেহেতু ধর্ম এবং ঈশ্বর দুটোই সামপ্রদায়িকতার চরম দৃষ্টান্ত। কারণ, এক ঈশ্বর/ধর্ম যখন বলে- আমাকে বিশ্বাস করো, মান্য করো, গ্রহণ করো, অন্য ঈশ্বর/ধর্ম সঠিক নয়, তারা ভ্রান্ত, জঘন্য, ঘৃণ্য, ওরা নিষিদ্ধ খাদ্য খায়, নিষিদ্ধ কাজ করে, আমিই একমাত্র সত্য, অদ্বিতীয়, খাঁটি, আমাকে না মানলে বেহেশতে/স্বর্গে যাওয়া সম্ভব না… ইত্যাদি তখন মানুষ কীভাবে অন্যের ঈশ্বর/ধর্মকে শ্রদ্ধা করবে? অর্থাৎ ঈশ্বর/ধর্মই যখন সামপ্রদায়িক, তখন মানুষ (বিশেষ করে ধার্মিকরা) কীভাবে অসামপ্রদায়িক হয় বা থাকে। অর্থাৎ ধর্মপালনকারীরা কমবেশি সামপ্রদায়িক? অতএব ঈশ্বর/ধর্মই যখন মানুষকে বিভ্রান্তিকর এবং সামপ্রদায়িকতা শিক্ষা দেয়, তখন কিছু মানুষ যে ধর্মের কারণেই জঙ্গি হবে, এতে আশ্চর্য হবার কী আছে? অথচ গুলশান হামলার পর, আমাদের বুদ্ধিজীবি, দেশনেতা-নেত্রীসহ প্রায় সকলেই মাহাশ্চর্য হয়ে গেছেন। প্রশ্নোত্তর খুঁজছেন, উচ্চবিত্ত এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা কেনো জঙ্গি হচ্ছে? এর শেকড় কোথায়? কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়…? কিন্তু হায়! উত্তর পাচ্ছেন না। পাবেন কীভাবে? ওনাদের কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি এমন যেন, ধর্ম কখনোই জঙ্গি বানাতে পারে না এবং ধর্ম ছাড়া জীবন চলতেই পারে না। অতএব ধর্মকে কিছু বলা যাবে না, ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, একে সবার উর্দ্ধে রেখেই জঙ্গি নির্মূল করা যাবে… ইত্যাদি। ফলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাবেন কীভাবে? বোকার স্বর্গ বোধকরি একেই বলে! অথচ তাদের প্রশ্নের সব উত্তরই প্রকাশ্যে রয়েছে। যেমন, ধর্মজীবদের উগ্রবাদি বক্তব্যের অজস্র অডিও, ভিডিও (যা সর্বত্রই দেখা/শোনা যায়)। রয়েছে পরিবার ও সমাজের প্রচলিত ধর্মশিক্ষায়, যা তারা এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং আকাশে-বাতাসে জঙ্গির উৎস খুঁজছেন। এছাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর খোঁজা একান্তই আবশ্যক বলে মনে করি। তাহলো, সব ধর্মালম্বীদের মধ্যে সমহারে জঙ্গিবাদি হচ্ছে না কেনো (বেশিরভাগ ধর্মেই এ হার শূন্যের কোটায়)? এ প্রশ্নের উত্তর বের করে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জঙ্গিবাদ দূর করা সহজ হবে; যদিও প্রচুর সময় লাগবে। কারণ ইতোমধ্যে জঙ্গিবাদের যে হিমালয় তৈরি হয়েছে, তার বিষফল ভোগ করতেই হবে।

সাধারণত, ধার্মিক ও জঙ্গির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলে, কে কতোখানি গোড়া ধর্মীয় পরিবারের সদস্য অথবা গোড়া ধর্মগুরু দ্বারা দীক্ষিত। গোড়া ধার্মিক পরিবার বা গোড়া ধর্মগুরু যে কোনো একটিই, যে কাউকে জঙ্গি অথবা জঙ্গিবাদের নিরব সমর্থনকারী বানাতে পারে এবং একটা জঙ্গি বা দানব কয়েক হাজার পুলিশ বা আর্মির চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে (সমপ্রতি, গুলশান ও ফ্রান্সের নিস শহরের হামলাসহ বহু প্রমাণ আছে)। কারণ তার ভেতরের সবটুকু মনুষ্যত্ববোধ ধর্মের প্রলোভন ও ভয়-ভীতি দিয়ে ধ্বংস করে, সেখানে ঢুকানো হয় ভয়ানক ভাইরাস বা বিষাক্ত পদার্থ। যা পৃথিবীর যে কোনো ড্রাগের চাইতেও মহাভয়ংকর। যে মহাবিষাক্ত ভাইরাসটি ট্রাকের চাকায় মরিচ বাটা করে মাত্র ৮০/৯০ জন কেনো, সেকেন্ডের মধ্যে সমস্ত পৃথিবী ধ্বংসের ক্ষমতা রাখে। যেমন, ওরা যদি কখনো পারমাণবিক বোমা হাতে পায়, তাহলে কী হবে, একবার ভাবুন তো! কারণ তাদের তো মৃত্যুভয় থাকে না। দেশের কর্ণধারগণ আরেকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন, জঙ্গিরা বিদেশিদের গুলি ও জাবাই করার পর কেনো অসংখ্যবার কুপিয়েছে? তাহলে জঙ্গিরা কী ড্রাগ খেয়েছিলো? খেলে কী ড্রাগ খেয়েছিলো? ইত্যাদি। কিন্তু ওনারা এটা বোঝেন না যে, ধর্মের ড্রাগে যারা উম্মত্ত তাদের কাছে অন্য ড্রাগ নস্যিমাত্র। হলফ করে বলছি, পৃথিবীতে এমন কোনো ড্রাগ এখনো সৃষ্টি হয়নি যা ধর্মের ড্রাগের চাইতে বেশি নেশাগ্রস্ত এবং উম্মাদ বানাতে পারে। অর্থাৎ মনুষ্য সৃষ্ট যে কোনো ড্রাগের চাইতে কয়েক সহস্রগুণ বেশি উম্মত্ত করতে পারে ধর্মড্রাগ। এর বড় প্রমাণ ধর্মপুস্তকগুলো। যা পড়ে ধার্মিকরা জীবনের সব সমস্যার সমাধান পায়, একই পুস্তক পড়ে নাস্তিকরা পায় জীবনের সব অমানবিকতা ও বিভ্রান্তিসহ জঙ্গি সৃষ্টির মহৌষধ। অতএব, নাস্তিকদের কথায় সন্দেহ করে হলেও, একটিবার ধর্মপুস্তক ‘ভালোভাবে’ পড়ে দেখুন (যেনতেনভাবে নয়)। পড়ে সত্য করে বলুন, জঙ্গি হওয়ার কোন্‌ সূত্রটি ওসব পুস্তকে নেই? আপনি কী হতে চান, দানব কিংবা মহাদানব অথবা মানব কিংবা মহামানব… সব সূত্রই ওতে পাবেন। প্রশ্ন হলো, কে কোনটা হবে অথবা কাকে কী বানানো হবে, সব নির্ধারিত হয় পিতা-মাতা ও ধর্মগুরুর মাধ্যমেই। কারণ আমাদের দেশের প্রচলিত ধর্মশিক্ষাতেই প্রচণ্ড প্রচণ্ডরকমের গলদ রয়েছে, যেখানে সংশোধন আনা অতীব জরুরি এবং প্রথম ও প্রধান কাজ। তাই যে যাই বলুন বা করুন, ধর্মপুস্তকের সংস্কার না করে জঙ্গিবাদ নির্মূল কোনোভাবেই সম্ভব না।

আরো বুঝতে হবে, একটি শিশুর বুলি ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ম যে চরম মনোভাবাপন্ন বা চরমপন্থি শিক্ষা দেয়, তা কতোখানি বিষময়। এতে শিশুটিকে ধর্মের প্রতি একান্ত বাধ্য ও অত্যাধিক দুর্বল করে তোলা হয়, এক মারাত্মক অহংকার-অহমিকা, গর্বে… শিশু মনটিকে অন্য ধর্ম ও গোত্রের প্রতি অসহিষ্ণু, বৈষম্য, ঘৃণ্যতায়… পরিপূর্ণ করা হয়। অর্থাৎ শিশুর সাদা মগজে সর্বপ্রথমেই যেসব ধর্মশিক্ষা দেয়া হয় এর অন্যতম- নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, অন্য ধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা, ধর্মের বহু শত্রু আছে, তাই সর্বক্ষণই ধর্মের জন্য লড়াই করতে প্রস্তত থাকতে হবে… ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে বহু ধর্মযুদ্ধের কাহিনী, যা গর্বভরে শেখানো হয়। অথচ যুদ্ধের শিক্ষা কখনোই শান্তির শিক্ষা হতে পারে না। পরবর্তীতে ওই শিশু উচ্চ শিক্ষালাভ করলেও শিশুকালের শিক্ষা কখনোই ভোলো না। এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে, কোনো ধার্মিকের সামনে কেউ ধর্মের সমালোচনা করলেই ওই ধার্মিক ব্যক্তি চরমভাবে ক্ষেপে ওঠে এবং চিৎকার করে অন্যদের নিয়ে তার উপর হামলা চালায়। এমনকি যারা ওই ভদ্রলোক/ধার্মিকের কথায় হামলা করে তারাও সঠিকভাবে কিছু না জেনেই করে। অর্থাৎ ধর্মের ন্যায় এতো উত্তেজক শিক্ষা অন্য কোনোকিছুতেই দেয়া হয় না বা যায় না। তবে ব্যতিক্রম শুধু পরিবেশ ও পরিস্থিতির শিকার হয়ে কারো ধার্মিকতা বাড়ে, করো কমে। বড় হতে হতে কেউ পড়ে খাসা মৌলবাদি ধার্মজীবির হাতে, কেউ কথিত মডারেট ধর্মজীবির হাতে…। ফলে কেউ হয় দানব, কেউবা মহাদানব, বাকিরা প্রায় সকলেই হয় নিরব সমর্থক অর্থাৎ কথিত মডারেট (ধরি মাছ না ছুই পানি প্রকৃতির)। প্রকৃত ধার্মিক বা পূর্ণ অসামপ্রদায়িক বলতে যা বুঝায়, তা প্রায় কেউই হয় না বা হতে পারে না। কারণ ধর্ম আমাদের সেরূপ শিক্ষা দেয় না। মুখে যে যাই বলুক, প্রকৃতপক্ষে এক ধর্ম অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করার শিক্ষা দেয়, এমনটা শোনা বা দেখা যায় না।

তবে ধর্মে সন্ত্রাসী হবার যেমন প্রচুর উপাদান আছে, তেমনি ভালো মানুষ হবার উপায়ও আছে। তবে যারা জঙ্গি হচ্ছে তারা সম্পূর্ণরূপে ধর্ম মেনেই হচ্ছে। অতএব, যারা জঙ্গির কারখানা খুঁজছেন, তাদেরকে অবশ্যই ধর্মের মধ্যেই খুঁজতে হবে, ধর্মের বাইরে খুঁজলে সাময়িক জঙ্গিবাদ ঠেকানো সম্ভব হলেও চিরস্থায়ীভাবে ঠেকানো যাবে না। কারণ, জঙ্গি তৈরির জন্য ধর্মপুস্তক এবং এর সহযোগি পুস্তকেই যথেষ্ট; শুধু কট্টোর ধর্মগুরুদের মাঝে মধ্যে একটু খুঁচিয়ে বা উষ্কে দিতে হয়। কারণ এর বর্ণনা এবং আদশে-নির্দেশ পুরোটাই ধর্মপুস্তকে বিদ্যমান, যদিও ধার্মিকগণ তা অস্বীকার করেই যাচ্ছেন। ফলে সন্ত্রাসীরাও পার পেয়ে যাচ্ছে। এর প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে মুক্তচিন্তকসহ ভিন্নধর্মী ও ভিন্নমতালম্বী হত্যার পর রাষ্ট্রও বারবার অস্বীকার করেছে, যার বিষফলই গুলশানের ঘটনা এবং এর দায় সম্পূর্ণটাই সরকারের কর্তাব্যক্তিদের। আবার সাধারণ পর্যবেক্ষণে বোঝা যায়, যে ধর্মশিক্ষা, যতো বেশি উগ্র ও অসহিষ্ণু সেই ধর্মের লোকেরা ততো বেশি উগ্র ও অসহিষ্ণু হয়। অতএব জঙ্গি নিয়ে যারা চিন্তিত তাদের বুঝতে হবে, ধর্মের মধ্যে যদি হিংসা, ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা… না-ই থাকতো, তাহলে একজনও জঙ্গি হতো না। ধর্মে জঙ্গি হবার মন্ত্র আছে বলেই, মানুষ জঙ্গি হয়। অতএব, পাথরে খোদাই করে লিখে নিন, যে পর্যন্ত ধর্ম থেকে জঙ্গিবাদের মন্ত্র সম্পূর্ণ দূরীভূত করা না হবে, সে পর্যন্ত জঙ্গি হওয়া রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

কদিন পূর্বে আমাদের আইজিপি বললেন, জঙ্গিরা মানবতার ওপর আঘাত হানে। অন্যদিকে ব্লগাররা ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করে। আটক জঙ্গিরা তেমন কোনো তথ্য দেয় না। তারা বলে, ‘আমাকে মেরে ফেলেন। আমি জান্নাতে যাব।’ (যুগান্তর ৬/৮/১৬)। ফলে, জঙ্গিদের জান্নাতে পাঠানো ছাড়া হয়তো তাদের কিছুই করার থাকে না। তবে ব্লগার হত্যার বিচার না করে আইজিপিসহ দেশের কর্ণধারগণের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, এতোদিন তাদের সব রাগ ব্লাগারদের উপরই ছিলো। কারণ ওই একটাই, তারাও ধর্মের প্রতি প্রচণ্ড দুর্বল। অতএব, তাদেরকে অনুরোধ, ব্লগারদের দোষারোপ করার পূর্বে দয়া করে একটিবার ‘সঠিকভাবে’ধর্মপুস্তক পড়ে দেখুন। এমন নোংরা ভাষা যেসব পুস্তকে, এর সমালোচনা না করে কোনো (সামান্য বুদ্ধিসম্পন্ন) মানুষও কী করে চুপ থাকতে পারে? সবিনয় বলছি, জঙ্গি সৃষ্টির আদিমতম উৎস যে ধর্মপুস্তকই, সেটা না বোঝা পর্যন্ত জঙ্গিবাদের উৎস বন্ধ হবার কোনোই সম্ভাবনা নেই। কারণ ধর্ম ব্যতিরেকে কারো মগজ ধোলাই করা এতো সহজ নয়, ধর্মে এসব না থাকলে কারো বাপের সাধ্য নেই, কাউকে জঙ্গি বানায়!

তবে সত্য যে, কেউ জঙ্গি হয়ে জন্ম নেয় না, পরিস্থিতি ও পরিবেশই তাকে জঙ্গি বানায়। সর্বপ্রথম যা পরিবার ও সমাজ থেকেই সংক্রামিত হয়। অর্থাৎ মানবশিশুর মুখে বুলি ফোটার সাথে সাথেই পৃথিবীর ভয়ংকরতম বিষাক্ত এ ভাইরাসটি তার সাদা মগজে ঢোকানো হয়। অতএব এর বীজ কোথায়, যে পর্যন্ত রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা না বুঝবেন, স্বীকার না করবেন, সে পর্যন্ত জঙ্গিবাদ নির্মূল হবে না। তাদেরকে বুঝতে হবে, সন্তানের ধর্ম পালনই মানুষ করার একমাত্র মাপকাঠি নয়, যদি তাই হতো, তাহলে প্রায় শতভাগ ধার্মিকদের এ দেশে, একটি দানবও সৃষ্টি হতো না। মনে রাখবেন, পৃথিবীকে অশান্তিময় করতে বেশি দানব প্রয়োজন নেই। কারণ ধর্ম সৃষ্ট দানবের ন্যায় অন্য কোনোকিছুতে এতোবড় মাপের মহাদানব সৃষ্টি অসম্ভব। অর্থাৎ ধর্ম যেরূপ মহাদানব সৃষ্টিতে সহায়ক, সেরূপ অন্য কোনো বিষয় নয়। যেহেতু জঙ্গি হওয়ার সব মশলাই ধর্মে বা ধর্মপুস্তকে আছে, সেহেতু ধর্ম নিষিদ্ধ বা ধ্বংস ছাড়া দানব সৃষ্টি বন্ধ করাও অসম্ভব। এছাড়া প্রায় সব ধার্মিকদেরই একটা বড় মুদ্রাদোষ আছে। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, জঙ্গিরা ধর্মের শ্লোগানে ও নামে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। অথচ ধার্মিকরা একই সুরে বলছেন, সব করেছে বা করিয়েছে ইহুদি-নাছাড়ার দল। তবে আজ পর্যন্ত যতো ধর্মীয় জঙ্গি ধরা পড়েছে বা যাদের নাম এসেছে, এর মধ্যে কোনো ইহুদি-নাছাড়া আছে কিনা, জানি না, আপনারা জানেন কী? তাহলে বলতে হচ্ছে, পৃথিবীর সব ষড়যন্ত্রের মূলেই ইহুদি-নাছাড়াগণ(!), শুধু কার্যকর করে ধার্মিকরা। এতে দোষের কী? তাই না! অর্থাৎ ইহুদি-নাছাড়াগণ জঙ্গিবাদ ও গণহত্যায় উদ্বুদ্ধ করেছে বলেই জঙ্গিরা তা করছে! তাহলে, এক্ষেত্রে ইহুদি-নাছাড়াগণ কী ওদের ঈশ্বর? তা-ই যদি না হবে, তাহলে সব জেনেশুনেও ওদের ষড়যন্ত্রে ধর্মিকরা কেনো পা দিচ্ছে এবং মেনে নিচ্ছে?

গুলশানে বেছে বেছে বিদেশিদের পৈশাচিকতাময় হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ফ্রান্সের নিস শহরে ঘটলো আরো বিশাল ও ভয়ংকরতম হত্যাযজ্ঞ (যা চলমান এবং ব্যাখ্যা নিসপ্রয়োজন)। এসব ধর্মোম্মাদদের উম্মত্ততার বিভীষিকা একটার চাইতে আরেকটা ভয়ংকরতম হচ্ছেই হচ্ছে। অথচ দেশি-বিদেশি সব নেতারাই একই সুরে গান গাইছেন। গাইছেন, এরা ধার্মিক নয়, এরা জঙ্গি, এরা ধর্ম জানে না…। কারণ আপনারা জানেন না, জঙ্গি তৈরি হওয়ার প্রধান ফ্যাক্টরি কোনটি? এটাও জানেন না যে, কট্টোর ধর্মবাদ (ধর্মের প্রধান হাতিয়ার) ছাড়া ধর্মোম্মাদ বা ধর্মসন্ত্রাসী বা জঙ্গি হওয়া সম্ভব কী? কখনোই না। ফলে, আপনারা ধর্মের মধ্যে জঙ্গিবাদ না খুঁজে বাইরে খুঁজছেন, এটাই সবচেয়ে বড় মূর্খতা। অতএব এ মূর্খের ধারণা, একমাত্র ধর্ম থেকে জঙ্গিবাদ বাদ দিলেই জঙ্গিবাদ নির্মূল হতে পারে, নতুবা নয়। যদিও এটা করা প্রায় অসম্ভব, কারণ তাহলে ধর্মের শেকড় ধরে টান মারতেই হবে। যা মুষ্টিমেয় নাস্তিক ছাড়া কেউই চাইবে না। কারণ, ধর্ম বিশ্বব্যাপী এক মাল্টিবিলিয়ন ব্যবসা, যাতে তেমন কোনো পুঁজির প্রয়োজন হয় না।

এছাড়া, পরিবারের কর্তা পিতা যদি কট্টোরপন্থি ধার্মিক হয়, তাহলে কমপক্ষে ৯০-৯৫% শিশুই কট্টোর হতে বাধ্য। আর যদি পিতা উদারপন্থি ধার্মিক হন, তাহলে সন্তানেরাও একইভাবে উদারপন্থি হবে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। অতএব সন্তানের জঙ্গি হওয়ার জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কেউই দায় এড়াতে পারে না। তবে পরিবার, বিশেষ করে পিতা-মাতার দায় প্রায় ১০০%। কারণ পিতা-মাতা যে আচরণ করে, যে শিক্ষা দেয়, সর্বপ্রথমেই শিশু তা শেখে ও করে এবং এতে আজীবনের তরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সুতরাং এখন যারা সন্তান নিখোঁজের কথা বলছেন, তাদের ধার্মিকতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন, গোড়া ধার্মিক কিনা? কারণ সন্তান নিখোঁজ হলে কোনো পিতা-মাতাই মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চুপ করে থাকতে পারে না। পত্র-পত্রিকা, মিডিয়ায় নিখোঁজ খবরের পর খবর ছাপতো, দ্বারে দ্বারো ঘুরতে ঘুরতে এসব পিতা-মাতার কঙ্কাল হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ এরা কীভাবে নিশ্চিন্তে ছিলো, বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিমানেরা ভাবছেন কী? অতএব, এসব পিতা-মাতাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞেস করা উচিত। কারণ তারা অবশ্যই জানে তাদের সন্তানরপ কোথায় ও কী করে? একান্ত ঠিকানা না জানলেও, তারা নিশ্চিন্ত, তাদের সান্তানেরা কোনো না কোনো ধর্মালয়ে বা ধর্মগুরুর শিষ্য হয়েছে এবং ধার্মিকতার জীবনযাপন করছে। এজন্যই এর দায় তারা এড়াতে পারে না। ঠিক একইভাবে ধর্মকেও জঙ্গি সৃষ্টির দায় অবশ্যই নিতে হবে। যে যাই বলুক, ধর্ম এটা শিখায় না, ওটা শিখায় না… এসব বলে ধর্ম বারবারই পার পেয়ে যাচ্ছে আর একটার পর একটা অতিদানবীয়, অতিনারকীয়, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বর্বরতাময় হত্যাযজ্ঞ ঘটাচ্ছে। বিশ্বনেতারা যে পর্যন্ত সত্য স্বীকার না করবে, ধর্মের মধ্যেই এর শেকড় না খুঁজবে, সে পর্যন্ত অন্য কোনো পন্থাতেই জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন সম্ভব না।

পরিতাপের বিষয়, বহু পণ্ডিত ব্যক্তিকেই বলেন, তারা নিয়মিত ধর্মপুস্তক পড়েন এবং প্রশংসায় গদগদ হন! কিন্তু সঠিকভাবে পড়লে, প্রশংসার চেয়ে নিন্দাই বেশি করতে হয়। অর্থাৎ যতোটুকু প্রশংসাযোগ্য তারচেয়ে ঘৃণ্য, জঘন্য, অবাস্তব, কাল্পনিক, হিংস্র, পরশ্রীকাতর, চাতুরিপূর্ণ… বাক্য/বাণী কোনো অংশে কম নয়। আবার অনেক উচ্চশিক্ষিত (সুশিক্ষিত নয়) ধার্মিক ব্যক্তি, যারা ওমুক সাধু বা পীরের মুরিদ, তমুক ধর্মগুরুর চেলা… এদের অনেকেই বলতে শুনেছি, তারা নিজ নিজ ধর্মপুস্তক কয়েকবার পড়েছেন। আভাসে-ইঙ্গিতে তাদের কাছে জানতে চেয়েছি, তারা কী ধর্মের মধ্যে কোনো খারাপ বাণী পেয়েছেন? উত্তরে প্রায় সকলেই বলেছে, না। একজন মাত্র বলেছেন, হ্যাঁ কিছু তো খারাপ বাণী আছে তা ওই সময়কার প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে। গুলশান হত্যাকান্ড নিয়ে কথা প্রসঙ্গে একজন পেশাজীবিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার মর্ধের মধ্যে এতো ভাগ কেনো এবং এর কোন ভাগ সঠিক? তিনি অবাক হলে বললেন, ভাগের বিষয়টি তিনি জানেন না। সবচেয়ে অবাক হলাম, যখন তিনি বললেন, ধর্মপুস্তক না বুঝে পড়লে গুণাহ বা পাপ হয়। তাই আমরা যেহেতু সঠিকভাবে উচ্চারণ করে ধর্মপুস্তক পড়তে পারি না সেহেতু তা পড়ি না। এই হলো আমাদের ধর্মবিশ্বাসীদের অবস্থা। তারা কেউ গুণার ভয়ে পড়ে না, কেউ বারবার পড়েও খারাপ কিছু পান না, বুঝতে পারেন না… এরপর কী করে উচ্চশিক্ষিতদের জঙ্গি হওয়া ঠেকাবেন? অথচ ওতেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক, বিষাক্ত ও ভয়ানক বাণী, যা চরম ঘৃণামিশ্রিত ড্রাগ এবং এ ড্রাগ পান করা ছাড়া জঙ্গি হওয়া সম্ভব নয়। একমাত্র এ ড্রাগে অভ্যস্ত ও নেশাগ্রস্তরাই হাসতে হাসতে, একই হাতে ২০/৩০ বা ততোধিক ভিন্নমতালম্বীদের জবাই বা কুচিকুচি করে কাটতে পারে। মাত্র জবাই করা একজনের গরম রক্তের উপর আরেকজনকে ফেলে জবাই করতেও এদের এতোটুকু হাত কাঁপে না। অর্থাৎ (ধার্মিকদের বক্তব্য) সব বুঝি কিন্তু তালগাছটা যে আমরাই, সেটা বোঝেন না কেনো?

দেখা যাক, জঙ্গিদের ছোটখাটো তাণ্ডবসহ যে কোনো পৈশাচিকতার পর ধার্মিকরা কী বলেন? (ইত্তেফাক, ২০/৭/১৬), ফ্রান্সের নিস শহরে পৈশাচিক ঘটনায় “…স্থানীয় আল ফোরকানি মসজিদের ইমাম এ ঘটনায় হত্যাকারীর ধর্মকে দায়ী করার বিষয়ে সাবধান থাকতে বলেন। তিনি বলেন, ‘ধর্ম যাই হোক, অপরাধ অপরাধই।’ অর্থাৎ তার মতে, হত্যাকারীকে দায়ী করা যেতে পারে, তবে ধর্মকে নয়। এ বক্তব্য ওই ইমামের একার নয়, প্রায় সব ধার্মিকেরই। অথচ ধর্মকে দায়ী না করে কীভাবে ধর্মোম্মাদ বা ধর্ম মাতালদের থামানো সম্ভব? আমি বোকা বুঝতে পারছি না, বিজ্ঞজনেরা একটু বুঝিয়ে বলবেন কী? আবার বলছেন, ‘ধর্ম যাই হোক, অপরাধ অপরাধই’। অর্থাৎ ধর্মের মধ্যে খারাপ কিংবা বিভ্রান্তিকর কোনকিছুই খোঁজার প্রয়োজন নেই, ধর্মকে স্পর্শ না করে অপরাধীকেই দায়ী করতে হবে। কিন্তু ধর্মের নির্দেশ ছাড়া কী করে ধর্মোম্মাদ জন্ম নেয়া সম্ভব, সেটা বলছেন না! এছাড়াও, প্রতিটি হত্যাকারীর চরিত্র বিচারে স্বজন ও বন্ধুরা এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর মহাশ্চর্য, হতবাক হয়ে বলছে, এতো ধার্মিক ছেলে কী করে এটা করলো, ওটা ঘটালো…? এসব আমরা বহু শুনেছি, কোনোদিনও শুনিনি, হত্যাকারীদের বন্ধু-বান্ধবরা বলেছে যে তার মধ্যে জঙ্গি বা দানবীয়তা দেখেছে। আসলে তারা এটা বুঝতে অক্ষম যে, দুষ্ট লোকেরা সব সময়ই ভদ্রবেশেই থাকে। চরম ঘটনা ঘটাবার আগে তারা কোনোভাবেই ধরা দেয় না। বাস্তবে কী দেখা যায়? যারা বেশি ভদ্র, নম্র, বেশি বেশি ধর্মকর্ম করে, তাদের মধ্য থেকেই তো ধর্মসন্ত্রাসী বেশি জন্মে; যারা এমনটা করে না তাদের মধ্যে ধর্মসন্ত্রাসী হওয়ার কাহিনী বিরল (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। কারণ ধর্মের মধ্যেকার ভয় এবং লোভ দুটোই তাদের মানবীয় গুণাবলি ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। অতএব সমাজের এই ধারণাটাই সবচাইতে মারাত্মক যে, ছেলে ধার্মিক তাই তার প্রতি নজর রাখার প্রয়োজন নেই। কারণ কাউকে ধর্মসন্ত্রাসী হতে হলে তাকে অবশ্যই যে কোনো সময়, যে কোনোভাবেই ধর্মগুরুদের অথবা পিতা-মাতার কাছ থেকে কট্টোরপন্থা শিখতে হবেই। আবার ধার্মিক ছেলেটির মনে ধর্মোম্মাদনা বা ধর্মউম্মত্ততা বাসা বেঁধেছে কিনা, এটা যদি আগে থেকে দেখা বা জানাই যাবে, তাহলে কী করে এমন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ ঘটাবে? অতএব তারা তো ধার্মিক বেশে, ধার্মিক হয়েই সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেই। বরং দুশ্চরিত্রদের ধর্মের বাণী শুনিয়েই মগজ ধোলাই করা সবচেয়ে সহজ, সেটা কেউ ভাবে না, বলে না, অর্থাৎ একমাত্র নাস্তিক বাদে সকলেই ধর্মকে বাঁচিয়ে কথা বলে। ধর্মের নামেই যদি জঙ্গি তৈরি না হবে, তাহলে “ধর্মীয় জঙ্গিবাদ”, “মৌলবাদী”, “গোড়া ধার্মিক”, “ধর্ম অপব্যাবহারকারী”, “ভ্রান্ত ধার্মিক”, এসব শব্দগুলোর সৃষ্টি হলো কেনো? কারণ এসব সত্য, তাই বলছে ও মেনে নিয়েছে। আবারো দৃঢ়তার সাথেই বলছি, ধর্মের মধ্যে জঙ্গি সৃষ্টির মসলা না থাকলে, জঙ্গি সৃষ্টি হতে পারে না।

আবার, ধার্মিকগণ বলছেন, ধর্ম হত্যাকাণ্ড সমর্থন করে না। তবে জঙ্গিরা কিন্তু সকলেই ধার্মিক পিতামাতা, ধার্মিক সমাজ ও ধর্মরাষ্ট্রেরেই সন্তান (ধর্মহীন রাষ্ট্রের নেই বললেই চলে)। যারা কারো না কারো কাছে (পরিবার-ধর্মগগুরু…) ধর্মশিক্ষা গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে বড় এবং জঘন্য কায়দায় (যা ঘৃণার চরম বর্হিপ্রকাশ) হত্যাকান্ডগুলো ধর্মের নামেই হচ্ছে। সত্যি না হলে, প্রত্যেকটা মহাবর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোতে ধর্মের নাম জড়িত কেনো? ধর্ম ছাড়া অন্য কোন দর্শনের মাধ্যমে বা সমর্থনে ধারাবাহিকভাবে এরূপ ধ্বংসলীলা ঘটাচ্ছে এমন কোনো সন্ত্রাসী দেখাতে পারবেন কী? অর্থাৎ ধর্মজঙ্গিরা যেভাবে জবাই করে, কাটা মুন্ডু নিয়ে ফুটবল খেলে, বিধর্মী নারীদের খাঁচায় বন্দি করে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে এবং মৃত্যুর পরও ৪০/৫০ বার কুপিয়ে কুচিকুচি করে, ট্রাকের চাকায় পোঁয়াজ বাটা করে… তা কী অন্য জঙ্গিরা করে? তাহলে কাদের মধ্যে চরম ঘৃণ্যতা দেখা যাচ্ছে! ধর্মজঙ্গি নাকি রাজনৈতিক জঙ্গি? এছাড়া, ধর্মের সম্পৃক্ততা যদি না-ই থাকে, তাহলে কেনো হত্যাকারীরা ধর্মের শ্লোগান দিয়ে হত্যা শুরু ও শেষ করে? অতএব যদি কেউ ধর্মের নাম ব্যবহার করে এসব ভয়ংকর, বর্বরোচিত, ঘৃণ্যতম… হত্যাকান্ড ঘটায়, তাহলেও এর দায়ভার ধর্মেরই, অন্য কারো নয়। তাছাড়া এতে ধর্মের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত পরিষ্কার। জানি, (ধর্ম বাঁচাতে) মিথ্যা বলায় ধার্মিকদের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু লাজ-লজ্জাও কী সবটুকুই বিসর্জন দিয়েছেন? মনে রাখবেন, অবিশ্বাসীরা যা বলে যুক্তিসহকারে এবং ধর্মপুস্তকের রেফারেন্স দিয়েই বলে। তথাপিও ধর্মবিশ্বাসীরা তা বিশ্বাস করে না, এটা যে তাদের কতোবড় মূর্খতা সেটা যদি জানতো, তাহলে গুলশানের ন্যায় নারকীয় ঘটনা ঘটতো না। অর্থাৎ যদি রাজিব, ওয়াশিকুর, অভিজিৎ, অনন্ত, দীপনদের… হত্যাকারীদের প্রশ্রয় না দিয়ে প্রথম হত্যাকান্ডের পরই সরকার কড়া পদক্ষেপ নিতো তাহলে এতোবড় ঘটনার মুখোমুখি হতো না। বরং তারা যা বলছে, তাতে হত্যাকারীদেরকেই পরোক্ষভাবে সাহস যুগিয়েছে। অবিশ্বাসীরা যা আজ ভাবে, ধার্মিকরা ভাবে কয়েক বছর পর। যাহোক, অধমের অনুরোধ, অবিশ্বাসীদের কথা অবিশ্বাস না করে, ঘৃণা না করে, তাদের যুক্তি উড়িয়ে না দিয়ে, তাদের রেফারেন্সগুলো খতিয়ে দেখুন, যার যার ধর্মপুস্তকগুলো ‘সঠিকভাবে’ পড়ে ‘সঠিক’ অর্থ বুঝতে চেষ্টা করুন।

আজ যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে তারা কোনো না কোনো সময়ে মৌলবাদি শিক্ষা পায়নি, এমনটি ভাবা কী ঠিক? কারণ ছেলেবেলায় কমবেশে প্রায় সকলেই মৌলবাদি শিক্ষা পেয়েছে। ফলে জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে উচ্চবিত্ত বা উচ্চশিক্ষিতরা যতোটা না জঙ্গি হচ্ছে, এর চেয়ে বেশি হচ্ছে পরজীবনে অফুরন্ত আনন্দ, চিরযৌবনার সাথে অফুন্ত সেক্সসহ পরিশ্রমহীন বিলাসবহুল জীবনের নিশ্চয়তা পেয়েই… বেশি হচ্ছে। এছাড়া, মৌলবাদ তো এদেশে প্রকাশ্যেই প্রচারিত হচ্ছে, যা প্রতিদিন কোনো না কোনো ধর্মপ্রচারকদের মুখে শোনা যাচ্ছে (ইউটিউবে এরূপ বক্তৃতার অভাব নেই)। জানি না, ধর্ম সৃষ্ট এসব মহাদানবেরা আর কতো নিষ্পাপ প্রাণ নিলে বিশ্বনেতারা ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হবে এবং ঈশ্বর বা ঈশ্বর সৃষ্টিকারীদেরই দায়ী করবে? অর্থাৎ সন্ত্রাসের মহানেতা এবং এর উৎস বা গোড়া খুঁজবে? যদিও মনে হয়, এর শেকড় কোথায় ওনারা ভালো করেই জানেন। তবে জানি না, আর কতো বীভৎস্যতার পর তারা ঘোষণা দেবেন, দেশে কোনো ধর্ম চর্চা চলবে না অথবা ধর্ম ও ঈশ্বর নিষিদ্ধের ডাক দেবেন? হয়তো বিশ্বনেতাদের ভয়, ধর্মের সমালোচনা করলে রেসিস্ট আখ্যা পাবে, ক্ষমতা হারাবে, ভোট কমে যাবে… তাই না? প্রশ্ন হলো- যা পৃথিবীর ভয়ানক, ঘৃণ্য, জঘন্য, যারপর নাই ক্ষতিকর, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, কেনো রেসিজম হবে? রেসিজম অর্থ কী? আমি মূর্খ যতোটুকু জানি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা, লিঙ্গ… এসব নিয়ে বৈষম্য, বিদ্রূপ, কুটুক্তি… করাকে রেসিজম বলে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোনোটা যদি মানুষের জন্য ভয়ানক বিপদজ্জনক হয়ে ওঠে, দানবতা শুরু করে, তখনও কী এর বিরুদ্ধে মানুষ চুপ করে থাকবে এবং ধর্মোম্মাদদের ট্রাকের চাকায় বাটাবাটা বা জবাই হতেই থাকবে? যা ভয়ংকর হতে শেখায় তার বিরুদ্ধে মুখ খুললে কোনো রেসিস্ট হবো? বিশ্বনেতারা এখনো কেনো বুঝতে চাইছে না, বর্ণ, পেশা, লিঙ্গ সমালোচনা আর ধর্ম সমালোচনা এক নয়। কারণ, বর্ণ, পেশা, লিঙ্গ… এসব সত্য কিন্তু ধর্ম সত্য নয়। বিতর্কের খাতিরে ধর্মকে সত্য মেনে নিলেও, ধর্মপুস্তকে ভালো কিছু বাণীর সাথে যেসব জঘন্য বাণী আছে, তা কেনো খতিয়ে দেখছেন না! ধর্মজীবিরা প্রকাশ্যে যেসব বক্তৃতা দিচ্ছে, ইউটিউবে যে উত্তেজনকার বক্তব্য ঘুরছে… এগুলোর একটাও ধর্মপুস্তকের বাইরে বা তাদের মনগড়াও নয়। তারা কখনোই মনগড়া বক্তব্য দেয়নি, সবই ধর্মপুস্তকে লেখা। এরপরও আপনারা বলছেন, ধর্মে জঙ্গিবাদ নেই! এসব বলে ধর্মকে বাঁচাবেন, অথচ একবারও ধর্মপুস্তক পড়ে দেখবেন না! এভাবে চলতে দেয়ার কারণেই আজ পৃথিবীতে একটি মানুষও যে নিরাপদ নয়, সেটা ভাবছেন না কেনো? ধর্ম সমালোচনা করলেই কেউ রেসিস্ট হবে এমন নিয়ম-কানুন নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ ধর্ম সমালোচনাকারীরা কেউই ধর্মপুস্তকের বাইরে কথা বলেন না। অতএব রেসিস্টের সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে হবে।

অতএব, ধর্ম যদি মানুষকে কেবলমাত্র বিনয়ী, নম্র, ভদ্র, সহনশীল… রাখতে সমর্থ হতো, তাহালে কোনো প্রশ্ন থাকতো না। কিন্তু তা তো নয়, এটা ক্রমশই ভয়ংকর থেকে মহাভয়ংকর বরং মহাতঙ্ক হয়ে উঠছে। যেহেতু দু-চারটা ধর্মদানবই যে কোনো দেশের জন্য মহাতঙ্ক। বিশ্বনেতারা ধর্ম বাঁচিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষদেরকে বারবার মহাদানবদের হাতে তুলে দিচ্ছেন? কেনো বুঝতে চাইছেন না, ধর্মের উপর প্রকাশ্যে আঘাত না হেনে, ট্রাকের চাকায় পিষ্ট অথবা গণজাবাই থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। কারণ দাবন সৃষ্টি করতে আইএস, আলকায়েদা, আলশাবাব… এর প্রয়োজন নেই। প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই এর সূত্র বা শেকড় রয়েছে। ফলে জঙ্গিদের এখন দলবদ্ধ হয়ে হামলা চালানোর প্রয়োজন নেই। নিস শহরের হামলাকারীর ন্যায় বহু একক দানব আছে, যাদের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগুরু নাও থাকতে পারে। আবার কোনো জঙ্গিদলের সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও এরা একাকী পরিকল্পনা করে মহাতান্ডব চালাতে সক্ষম এবং এদের ধরা বা খোঁজ পাওয়া অসম্ভবই নয়, দুষ্করও বটে। কারণ এরা অত্যন্ত ভদ্র-নম্র ব্যবহার দিয়ে মানুষের চোখে খুব ধামির্ক হয়েই থাকে এবং সময় ও সুযোগমত মহাবিপর্যয় ঘটিয়ে ফেলে। অর্থাৎ এক দানবই এক’শ বা একসহস্র…। অতএব বিশ্ব নেতাদের পরিষ্কার করে বলা উচিত, তারা কী চায়? ধর্ম না মানবতা? মানবতা চাইলে ধর্মকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। যা বৈশ্বিক ধর্মসন্ত্রাসের মূল বা শেকড়, তা উপড়ে ফেলতে আপনাদের এতো অনীহা কেনো? দেশি-বিদেশি সব নেতাদের কাছে এ মূর্খের প্রশ্ন, ধর্মকে কেনো কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে না? কারণ কেবলমাত্র দু-চারটা জঙ্গি ধরে এর মূলোপাটন কোনোভাবেই সম্ভব নয়, একথাটি যদি আপনাদের মতো বুদ্ধিমানেরা না বুঝে তাহলে বুঝবেটা কে?

পরিশেষে বলছি, মানুষ যতোদিন ধর্মপুস্তকগুলোকে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বসত্য, মঙ্গলজনক, একমাত্র জীবনবিধান হিসেবে মানবে, ততোদিন জঙ্গিবাদ থামবে না। অর্থাৎ মগজ পরিশুদ্ধ না করে, ধর্ম সংস্কার না করে, ধর্মসন্ত্রাস বন্ধ করা যাবে না (নিষিদ্ধ করাই উত্তম), এ সরল কথাটি যে পর্যন্ত বিশ্ব নেতারা না বুঝবে, অর্থাৎ ধর্মকে কাঠগড়ায় দাঁড় না করাবে… সে পর্যন্ত নিত্য নতুন কায়দায় কখনো নৃশংস্যভাবে জবাই কিংবা ট্রাকের নিচে মানবতা পিষ্ট হতেই থাকবে।

[1611 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0