বর্তমান বাংলাদেশে লেখক প্রকাশকগণ কে কি লিখবেন, কে কি প্রকাশ করবেন তা রাষ্টের প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দেশিত করে দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী, পুলিশের প্রধান, মন্ত্রী মহোদয়গণ থেকে শুরু করে বাংলা একাডেমীর প্রধান পর্যন্ত লেখকদেরকে তাদের লেখালেখিতে সীমা লংঘন না করা, উস্কানীমূলক এবং অশ্লীল লিখা না লিখার সবক দিচ্ছেন। হ্যা, এটা অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে উস্কানিমূলক এবং অশ্লীল কোন লিখা মননশীলতার পরিচয় বহন করে না। দুঃখের বিষয় এই যে, কি লিখলে সীমা লংঘন হবে না, কি প্রকাশ করলে তা উস্কানি হবে কিংবা কি প্রকাশ করলে তা অশ্লীল হবে সেটা কেউ স্পষ্ট করে বলছেন না বা বলতে পারছেন না। আমরাও কিছু বুঝতে পারছি না।

যারা বেহেস্তে হুর পাবার লোভে লেখনীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ তুলছেন, আসুন দেখি হুর সম্পর্কে তাদের কোরানে কি বলা আছে। কোরানে একাধিক সুরার বিভিন্ন আয়াতে হুরদের কথা পাওয়া যায়।

কোরানের সর্ববহুল পরিচিত একটি সূরা হলো আর রাহমান(৩৭)। এই সূরার ৫৬ নং আয়াতে বেহেস্তের হুরদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,

“তথায় থাকবে আনত নয়না রমনীগন, যাদেরকে জীন ও মানুষ কখনো স্পর্শ করেনি” – ৩৭:৫৬
৭০ নং আয়াতে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে বেহেস্তের লোভ দেখাচ্ছেন এই বলে যে,
“সেখানে থাকবে সচ্চরিত্রা সুন্দরী রমনীগণ”- ৩৭:৭০

কাউকে এমনভাবে আনত নয়না, কুমারী যোনি সম্পন্ন সুন্দরী রমনীর লোভ দেখানো অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে না কী? আবার একই সূরার ৭২ নং আয়াতে বলা হচ্ছে,

“(বেহেস্তে থাকবে)তাবুতে অবস্থানকারী হুরগন” ৩৭:৭২

তৎকালীন আরবের যৌনকর্মীদের একটা অংশ ছিলো ভ্রাম্যমান, যারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে ঘুরে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতো। তারা শহর বা কোন বসতির আশেপাশে তাবু টানিয়ে অবস্থান করতো। কোন গ্রন্থে যদি কাজের বিনিময়ে এমন করে তাবুতে অবস্থানকারী যৌনকর্মীদের লোভ দেখনো হয়, তাহলে সেই গ্রন্থ কি অশ্লীলতা মুক্ত হবে?

জান্নাত সম্পর্কে কোরানে সূরা বাকারার ২৫ নং আয়াতে বলা হচ্ছে,

“ আর হে নবী (সাঃ), যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজসমূহ করেছে, আপনি তাদেরকে এমন বেহেশতের সুসংবাদ দিন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহমান থাকবে। যখনই তারা খাবার হিসেবে কোন ফল প্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, এতো অবিকল সে ফলই যা আমরা ইতিপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুতঃ তাদেরকে একই প্রকৃতির ফল প্রদান করা হবে। এবং সেখানে তাদের জন্য শুদ্ধচারিনী রমণীকূল থাকবে। আর সেখানে তারা অনন্তকাল অবস্থান করবে” – ০২:২৫

জান্নাতের বর্ণনা খুঁজতে গেলে কোরানের ৫৬ নং সূরা আল ওয়াকিয়ার কয়েকটি আয়াতে যা পাওয়া যায়ঃ

“ আর সেখানে তাদের সাথে থাকবে পবিত্র দৃষ্টিসম্পন্ন সাথিরা, ঝিনুকের ভেতরে সংরক্ষিত মুক্তোর ঔজ্জ্বল্য নিয়ে” – ৫৬:২২-২৩
“ উঁচু আসনে তাদের সাথে থাকবে তাদের সাথিরা, সম্পূর্ণ নতুন করে সৃষ্টি করবো তাদের, অনন্ত যৌবনের বিকশিত সৌন্দর্যে তারা হবে প্রেমময় অনুগত সমকক্ষ”- ৫৬:৩৪-৩৭

ভাবতে অবাক লাগে, মুসলমানেরা ঝিনুকের মুক্তো রঙা, অনন্ত যৌবনা নারীর প্রলোভনকে অশ্লীল মনে করে না। কারণ, তা কোরানের কথা! আর এই সুরাটির ১৭-১৯ নং আয়াতে যে চিরকিশোর দ্বারা মদ পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে তা না হয় নাই বললাম।

একইভাবে ৩৭ নং সূরা সফের ৪৮ নং আয়াতে বলা হচ্ছে,
“তাদের কাছে থাকবে নত, আয়তলোচনা তরুণীগণ”-৩৭:৪৮

৫২ নং সুরার ২০ নং আয়াতে দেখুন,
“তারা শ্রেণীবদ্ধ সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসবে। আমি তাদেরকে আয়তলোচনা হুরদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে দেব” ৫২:২০
৭৮ নং সূরা আন নাবার ৩১-৩৩ নং আয়াতে আছে,
“৩১। পরহেযগারদের জন্যে রয়েছে সাফল্য ৩২। উদ্যান, আঙ্গুর, ৩৩। সমবয়স্কা, পূর্ণযৌবনা তরুণী” ৭৮:৩১-৩৩

৩৮ নং সূরা সোয়াদ এর ৫২ নং আয়াতের সরলার্থ,
“তাদের কাছে থাকবে আনতনয়না সমবয়স্কা রমণীগণ”-২৮:৫২

কি চমৎকার! জান্নাত মানেই রমনী, অনন্ত যৌবন। কাউকে চিরকুমারী রমনীর লোভ দেখানো কি অশ্লীলতা নয়?

কোরানে বেহেস্তের লোভ দেখানোর জন্য হুরদের কথা কেবলমাত্র এ কারণে বলা হয়েছে যে এরা হচ্ছে মুমিনদের যৌনসংগী। যৌন প্রলোভন এবং যৌনসংগীদের বর্ণনা কি অশ্লীলতার দায়ে দুষ্ট নয়! আর হাদীস অনুসারে ৭২ জন নারীর সাথে গ্রুপ সেক্স করার প্রলোভন কোন ধরনের শালীনতার দৃষ্টান্ত!

ইসলাম বিতর্ক বইটির বিরুদ্ধে অভিযোগ যে এটি অশ্লীল এবং অশালীনতায় পূর্ণ। আমি ঠিক জানি না, রাষ্ট্রীয় আইনে অশ্লীলতার কি সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে শ্লীল কিংবা অশ্লীলতায় বিশ্বাস করি না। তবে যেহেতু বইটির শেষ অংশ নিয়েই অভিযোগটা বেশি জোরালো হচ্ছে, এবং যেহেতু সেখানে মুসলমানদের নবী মোহাম্মদের যৌন জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেহেতু ধরে নেয়া যায় যৌনতা নিয়ে শব্দ চয়ন করাটা অশ্লীলতা। যৌনতা নিয়ে শব্দ চয়নকে যদি অশ্লীলতা ধরে নিই, তাহলে যৌনশিক্ষা ও প্রজনন বিদ্যাকে অশ্লীলতার দায়ে বন্ধ করে দিতে হবে। তাহলে, অশ্লীলতা কী? ধরে নিলাম, শুধু যৌনতাপূর্ন শব্দই নয়, সাথে যৌনক্রিয়ার বর্ননা কিংবা যৌনাবেদনময় শব্দ কিংবা প্রলোভন যুক্ত বাক্যগুলো অশ্লীল। যদি তাই হয়, এবং এ কারণে ইসলাম বিতর্ক বইটি বন্ধ করে দেয়া হয়, এবং এই যুক্তিতে কেউ যদি যৌনাবেদন ও যৌনতার প্রলোভনে পূর্ণ কোরান ও হাদীস গ্রন্থগুলো নিষিদ্ধ করার দাবী করে, তাহলে তার দাবী অগ্রহনযোগ্য কিংবা অযৌক্তিক হবে কি?

[2625 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0