কেমন করে যেন একটা বছর পার হয়ে গেল। অভিজিতের নৃশংস খুন, আমার উপর চাপাতির উপর্যুপরি আঘাতের পরে বারোটা মাস কেটে গেছে। আমার জীবন নিস্তরঙ্গ ডোবাপুকুর ছিল না কোনো কালেই, কিন্তু এই এক বছর যেন কেটেছে উথাল-পাথাল সমুদ্রের বুকে। এক বছর আগে এই দিনে প্রবল এক সুনামির ঢেউয়ে যেন ভেসে গেছে আমার জীবনের সব স্বাভাবিকত্ব।

মানুষ দুঃখ বিচ্ছেদ মৃত্যুকে সহনীয় করে তোলে যে সব পর্যায়গুলোর মধ্য দিয়ে গিয়ে, আমারও হয়তো সেই পথেই জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া হত যদি অভির সমাপ্তিটা ঘটত কোনো আপাত স্বাভাবিকভাবে। এই এক বছরে অনেক নির্ঘুম আতঙ্কের রাতে সে প্রশ্ন যে কখনও আসেনি মনে, তা বলব না। কিন্তু অশ্রুর স্রোতে ডুবতে ডুবতেও স্বভাবগতভাবেই যুক্তির খড়কুটোই আঁকড়ে ধরেছি বারংবার। ভেবেছি, যে দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে আজকের পৃথিবী, তাতে এমনটা ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, অসম্ভাব্য তো নয়ই। রোজ সারা দুনিয়ায় ঘটে যাওয়া সীমাহীন অন্যায়ের বলি যে শত শত মানুষ, তাদের মধ্যে যে আমার থাকার কথা ছিল না এই প্রতিশ্রুতি তো দেয়নি কেউ!

এই মহাবিশ্বে আমাদের র‌্যানডম অস্তিত্ব এবং ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রব্যাবিলিটির অঙ্ক কষলে খুব সহজেই হিসাবটা পরিষ্কার হয়ে যায়। আমিই কেন, আমারই এ রকম হল কেন, এ রকম কষ্ট আমাকেই দেওয়া হল কেন– তখন এই ধরনের প্রশ্নগুলোর বাইরে বেরিয়ে না এসে আর উপায় থাকে না।

আজ এই এক বছরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি অনেক কিছু। এই এক বছরে কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে অনেক অনেক মানুষের সঙ্গে– অনলাইনে, ফোনে, বা সামনাসামনি। দেশ বিদেশের অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য সংগঠন এগিয়ে এসেছেন সংহতি জানাতে; জানতে চেয়েছেন সেই দুঃসময়ের দুর্যোগের কথা। বাঙালি, অবাঙালি নানা দেশের নানা সংস্কৃতির মানুষ জানতে চেয়েছেন অভিজিতের কথা, আমাদের কথা, প্রাণের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো ব্লগারদের কথা, আজকের বাংলাদেশের কথা। এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে বিভিন্ন ভাষায়।

আজকের পৃথিবী সব দিক থেকেই একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে কতখানি জড়িত সেই বোধটাই যেন প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে সবার কথায়। সিরিয়া থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া– মেক্সিকো থেকে শুরু করে ইউক্রেন, নেদারল্যান্ডস, ইরাক, নাইজেরিয়া, কানাডা, আমেরিকা– সর্বত্র আজ যেন এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাস্কৃতিক অস্থিরতার দামামা বেজে চলেছে।

মহাবিশ্বে আমাদের র‍্যানডম অস্তিত্ব এবং ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে প্রব্যাবিলিটির অঙ্ক কষলে খুব সহজেই হিসাবটা পরিষ্কার হয়ে যায়

অনেকে জানতে চান অভিজিৎ হত্যার বিচারের অগ্রগতি নিয়ে। আমি তাদের সঙ্গে সহমত, খুনিদের বিচার হওয়া অবশ্যই দরকার সমাজিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। কিন্তু এই দুচারজন মগজ ধোলাই হওয়া তরুণের বিচারের করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে না সেটা আমাদের মনে রাখা দরকার। এই বিষবৃক্ষের শিকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। অসংখ্য শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত কমবয়সী এই মানুষগুলোকে মৌলবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে খুনি বানিয়ে তুলতে গেলে অনেক গভীর আদর্শিক ভিত্তি, সংগঠন, প্রশিক্ষণ এবং সর্বোপরি বিশাল ফান্ডিংএর প্রয়োজন।

এর কর্ণধারদের গ্রেফতার করার কোনো আগ্রহ সরকারের কোনো দিন ছিল না। তার উপর আবার রয়েছে জটিল এক স্বার্থের খেলা — জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সাম্রাজ্যবাদী সব অমোঘ শক্তির মহাশক্তিমান হাতের কারসাজি! আজকের এই বিশ্ব-বিস্তৃত গভীর সমস্যাগুলোর ব্যাপ্তি নিয়ে ডিল করার সদিচ্ছা আমাদের সরকারের কখনওই ছিল না।

আমার সঙ্গে বাংলাদেশের সরকার, পুলিশ, প্রশাসন কোনো দিন যোগাযোগ করেনি, কিছুই জানতে চায়নি বা জানায়নি। তাই তারা কী ভাবছে, কী করছে সেটার ব্যাখ্যা আমার পক্ষে শুধু বাইরে থেকেই দেওয়া সম্ভব। মাঝে মাঝেই খবরে দেখি অভিজিতের খুনিদের নাকি ধরা হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, যাদের ধরা হয়েছে তাদের মধ্যে আক্রমণের তিন-চার দিনের মধ্যেই সিসি ক্যামেরায় শনাক্তকৃত পাঁচ-সাত জন সন্দেহভহাজন ব্যক্তির (স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে প্রথম তিন-চার দিন থাকার সময়েই এফবিআইএর এক কনসালটেন্ট এদের ভিডিও আমাকে দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন) একজনও নেই।

গত এক বছরে আর যে কথাটা বার বার শুনতে হয়েছে নানা মিডিয়াজাত লেখালেখিতে, আমাদের যে নামকরণটা আমাকে ভাবিয়েছে তা হল, ‘নাস্তিক ব্লগার’। মাঝে মাঝে ভাবি আমাদেরকে শুধু নাস্তিক ব্লগার হিসেবে চিহ্নিত করা কেন? এ কথা সত্যি যে, আমরা কিছু মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করি যার সঙ্গে প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত ধর্ম জিনিসটা যায় না এবং এ-ও ভুল নয় যে, আমরা শখ হিসেবে ব্লগ লিখি, ঘরের খেয়ে বনের এই মোষ তাড়াতে আমরা অনেক সময় ব্যয়ও করি। কিন্তু ব্লগিংএর বাইরেও তো আমরা আরও অনেক কিছুই করি এবং নাস্তিকতার বাইরে অনেক কিছু নিয়েই লিখি।

অভিজিতের কথাই ধরুন, সে বায়োমেডিকাল ইঞ্জিনিইয়ারিংএ পিএইচডি করা ব্যক্তি, আমেরিকায় আইটি জগতে প্রতিষ্ঠিত একজন প্রফেশনাল, লেখালেখিটা সে শখের বশেই করত। তার লেখা এবং সম্পাদিত ১০ খানা বই এবং শত শত ব্লগের মধ্যে অল্পসংখ্যক লেখাই আসলে নাস্তিকতা নিয়ে। দর্শন, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, বিবর্তন, সমকামিতা থেকে শুরু করে সাহিত্যের পর্যালোচনা পর্যন্ত বিস্তৃত তার লেখালেখি। বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো জনপ্রিয়ভাবে সাধারণ পাঠকের কাছে তুলে ধরতে সিদ্ধহস্ত ছিল সে।

আবার ইরাকের যুদ্ধ থেকে শুরু করে নারীআন্দোলন, ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রাম, একাত্তরের খুনিদের বিচার, বা আমাদের আদিবাসীদের উপর অত্যাচার পর্যন্ত কত অনাচারের বিরুদ্ধেই না কলম ধরেছে সে। সেই সঙ্গে ধর্মীয় দর্শন, আদর্শ, নাস্তিকতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধেও লিখেছে সে।

আমার আর অভিজিতের অন্তহীন বিতর্কগুলোর মধ্যে ছেয়ে থাকত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, ধর্মের অসারতার মতো বিচিত্র সব বিষয়বস্তু। আমাদের বৃহত্তর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক জায়গায় মিল থাকলেও আমি পৃথিবীকে যতখানি রাজনীতি এবং অর্থনীতি দিয়ে বিচার করি, অভি ঠিক ততখানিই জোর দিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর উপর। এই বৈচিত্র এবং একজন আরেক জনকে চ্যালেঞ্জ করে আরও শক্তিশালী করতে পারাটাই ছিল আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি।

কিন্তু এত বিষয়-বৈচিত্র্য, আগ্রহের এমন সর্বত্রগামিতা সত্ত্বেও তুলির এক মোটা দাগে অভিজিতকে তথা আমাদেরকে ‘নাস্তিক ব্লগার’ বলে রাঙ্গিয়ে দিতে পারলে সুবিধাটা কার হয়? ঘটা করে শুধু এটাকেই সামনে নিয়ে আসার পেছনের মতলবটা ঠিক কী হতে পারে?

ধর্মীয় উন্মাদনায় চাপাতি উঁচিয়ে ছুটে আসা বন্ধুরা কেন আমাদের ‘নাস্তিক ব্লগার’ বলেন, সেটা বুঝতে খুব বেশি মাথা খাটানোর দরকার পড়ে না। ‘নাস্তিক’ নাম দিয়ে একটা কাল্পনিক শত্রু দাঁড় করানো গেলে মৌলবাদের উস্মা শক্তিশালী হয়, জুজুর ভয় দেখিয়ে রিক্রুট করা যায় অসংখ্য শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত পথভ্রষ্ট হতাশ তরুণদের। অন্ধ যে কোনো আদর্শ ঘিরে একটা গলাকাটা চাপাতিদক্ষ খুনিবাহিনী সৃষ্টি করতে হলে এই শত্রু শত্রু খেলার পদ্ধতিটা খুবই কার্যকর। আর তাদের পিছনে যদি ৫৭ ধারার মতো কালো আইনের ধারক ও বাহকদের নিত্য সমর্থন থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা!

তবে আমাদের তথাকথিত ‘সেক্যুলার’ আওয়ামী লীগ সরকারের এই ইসলামিক মৌলবাদ তোষণের ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটু প্রশ্নদীর্ণ– এটা কি শুধুই ভোটের রাজনীতি, নাকি আরও গভীর কিছু? তারা কি এই মৌলবাদীদের ভোটের উপর এতটাই নির্ভরশীল? সরকার এবং বাংলা একাডেমীর সম্মিলিত প্রয়াসে আজ ‘রোদেলা’ কাল ‘বদ্বীপ’ প্রকাশনী বন্ধ যেন নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একুশ শতকে বসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার একদিকে আনসারুল্লাহর চাপাতি আর আরেক দিকে সরকারের ৫৭ ধারার চাপাতির চিপায় ফেলে পিষ্ট করা হচ্ছে।

আগ্রহের এমন সর্বত্রগামিতা সত্ত্বেও তুলির এক মোটা দাগে আমাদেরকে ‘নাস্তিক ব্লগার’ বলে রাঙ্গিয়ে দিতে পারলে সুবিধাটা কার হয়

বিশ্বজুড়ে সামাজ্যবাদের আগ্রাসন আর ধর্মীয় মৌলবাদের দামামার মাঝে এই সরকারের ভূমিকা কী হবে তা বুঝতে আরও কিছুদিন সময় লেগে যাবে হয়তো আমাদের।

আমেরিকায় লিবারেলদের মধ্যে একতার অভাব নিয়ে আমি আর অভি প্রায়ই হাসিঠাট্টা তথা আলোচনা করতাম। প্রগতিশীল মানসিকতার কর্মী বা জ্ঞানচর্চাকারীদের মধ্যে একতা বড্ড কম দেখা যায়। এই ব্যাপারটা সব সমাজেই প্রগতিশীল মানুষের মধ্যে কম-বেশি দেখা যায়। তারা এতটাই স্বনির্ভরভাবে চিন্তা করে এবং বিশ্ব নিয়ে তাদের এতটাই স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি থাকে যে, তারা ঠিক ‘ভেড়ার পালের’ মতো এক পূজনীয় নেতা বা মতাদর্শ অনুসরণ করতে বা ‘ওয়াজ’ শুনতে রাজি হয় না। এর ফলে অনেক স্বাধীন এবং বৈচিত্র্যময় মত ও পথের বিকাশ ঘটে।

এর খারাপ দিকটা হল যে, রক্ষণশীলরা যেভাবে একতাবদ্ধ হয়ে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে, আমরা সেটা করতে ব্যর্থ হই প্রায়শই। তবে ইতিহাসের কোনো সন্ধিক্ষণে, কিছু কিছু প্রতীকী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, অথবা কোনো মহত্তর উদ্দেশ্যের সামনে কখনও কখনও প্রগতিশীলেরাও একতাবদ্ধ হইয়ে কাজ করতে এগিয়ে আসেন।

গত এক বছরে বহু প্রতিকূলতা, নৃশংসতা এবং হানাহানির মধ্যে অবাক হয়ে দেখেছি যে, বিশাল এক প্রগতিশীল জ্ঞানপ্রেমী অংশের মধ্যে সম্মিলিতভাবে কাজ করার একটা ইচ্ছা বা প্রত্যয় গড়ে উঠেছে। এঁদের অনেকেই অভিজিৎ বা আমার সঙ্গে পূর্ণভাবে সহমত নন, অনেকেই নিজেকে বিজ্ঞানপ্রেমী বা নাস্তিক বলে গণ্যও করেন না। কিন্তু আজকের এই দমবন্ধ করা অবস্থার পরিবর্তনের জন্য কিছু একটা করার দায় থেকেই তাঁরা একতাবদ্ধভাবে একটা প্রশস্ততর মঞ্চ গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন, দীর্ঘমেয়াদী একটা পরিবর্তনের আশায় বুক বেঁধে।

তারা সকলেই এই সাধারণ মতে বিশ্বাসী যে, কোনো সমাজ বা সংস্কৃতি শুধু তখনই উৎকৃষ্টতার মানগত সিঁড়ি বেয়ে উর্ধ্বগামী হতে পারে যখন সেখানে বহুমুখী অসংখ্য সুপ্ত প্রতিভা, মত এবং পথের বিকাশ ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়। প্রাচীন গ্রিস, ইসলামি বিশ্বের স্বর্ণযুগ, রেনেসাঁ বা এনলাইটেনমেন্টের সময়ের উদাহরণ দেখা গিয়েছে অজস্র। টুঁটি চেপে ধরা সমাজ বা হীরক রাজার ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের’ যন্ত্রে বিশ্বাসী সমাজে এই বিকাশ কখনও ঘটতে পারে না, ঘটেনিও কখনও। চাপাতির আঘাতে মগজ ছিন্নভিন্ন করে দেওয়া সংস্কৃতি যেমন উটের পিঠে চড়ে শুধু পশ্চাদমুখী হতে বাধ্য, ঠিক তেমনি একইভাবে আবার আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার দড়িতে ফাঁস পড়ানো সমাজও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না।

মানুষের সৃজনশীলতাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, অন্যান্য অনেক প্রাণির সঙ্গে আমাদের হার্ডওয়্যারের ৯০-৯৫-৯৯ শতাংশ এক হওয়ার পরও আমরা প্রকৃতিতে এক বিশেষ অবস্থান দখল করেছি এই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা দিয়েই। আমাদের প্রজাতির ৭০০ কোটি সদস্যের পদতলে পৃথিবীকে পিষ্ট করে তোলার পিছনে প্রধান ভূমিকাই রেখেছে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা। আজকে আমাদের দমবন্ধ অন্ধকূপ সমাজে এই বৈচিত্র্যময় বহুগামী মত ও ‘অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতা’র পথ সুগম করার লক্ষ্যে এগোতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখছি অনেকেই এগিয়ে আসছেন একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এক বছর আগেও এত মতের ও পথের এই সম্মিলন সম্ভব ছিল বলে মনে হয়নি।

ইতিহাসের নিবিড় শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি অভিজিৎ ইতিহাসের পাতায় কোথায় স্থান পাবে তা সময়ের হাতেই ছেড়ে দিতে হবে। তবে তার অকালমৃত্যু যে অবাধ বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রতীকী রূপ হিসেবে কাজ করছে সেটা বলতে আর বোধহয় কোনো বাধা নেই। আমাদের সকল মতের ও পথের সবটুকু মিল না-ই-বা হল, হওয়া সম্ভবও নয়, উচিতও নয়।

তবু আসুন সকলে শ্রদ্ধা ও প্রত্যয় নিয়ে তর্কবিতর্ক করি, সমালোচনা করি, ভুল ধরিয়ে দিই আর স্বীকার করি নিজের ভুল এবং সর্বোপরি পরস্পরের মতামত বিনিময়ের সুস্থ বাতাবরণ বাড়তে দিই মহীরুহের মতো আর সাধ্যমতো অবদান রাখার চেষ্টা করি ইতিহাসের চাকা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে।

আমি মনে করি যে, অভিজিতকে স্মরণ বা শ্রদ্ধা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে আমাদের চিন্তাধারা, মতামত ও গঠনমূলক প্রচেষ্টা নির্ভীকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এমন এক সমাজ সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত হওয়া যেখানে এই নির্ভীকতা প্রেরণা দেওয়া হবে, স্বাধীন মতপ্রকাশের ‘অপরাধে’ চাপাতির আঘাতে জর্জরিত করে রাস্তায় ফেলে রাখা হবে না, বা কাউকে কালো ৫৭ ধারার অন্ধকূপে বন্দি করা হবে না।

অভিজিৎ যেমন ‘ভেড়ার পালের’ সদস্য হতে চায়নি, ঠিক তেমনি সে অন্যদেরও অন্ধভাবে ভেড়ার পালের সদস্য হওয়া থেকে নিবৃত্ত করতেই হাতে কলম তুলে নিয়েছিল। বাংলা অনলাইন জগতে প্রথম ফ্রি থিঙ্কারদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল সেই উদ্দেশ্য থেকেই, অন্তহীন প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিতে, সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে নির্ভীক চিত্তে সব ধরনের জ্ঞানের গহনে অবগাহন করাতে। সে বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, নির্ধর্ম সব কিছু নিয়েই নতুন প্রযুক্তির আলোকে সাহসী এক ধারার সূচনা করতে চেয়েছিল যেখানে জনপ্রিয় স্টাইলে সাধারণ পাঠকের সঙ্গে মতামত বিনিময়ের একটা সুযোগ তৈরি হয়।।

এত কম সময়ে এত পাঠকের মনে অভিজিতের বিচরণই প্রমাণ করে যে তার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই ব্যর্থ হয়নি।

আমরা মনে করি, এখন সময় হয়েছে ব্লগ এবং ফেসবুকের জগতের অবাধ গণজ্ঞানের বাইরে গিয়ে বাংলা ভাষায় ইন্টারনেটে একটি সহজবোধ্য কিন্তু গভীর, বিস্তৃত এবং নির্ভরযোগ্য জ্ঞানের ভাণ্ডার সৃষ্টি করার। আজকে শত শত ব্লগে এবং ফেসবুকের অন্তহীন বিচরণে অযুত লক্ষ কোটি তথ্যের সমাহার ঘটলেও তাদের মধ্যে নির্ভরযোগ্যতা এবং গভীরতার অভাব প্রকট। তাই আমরা যৌথভাবে প্রথম অনলাইন বাংলা জ্ঞানকোষ তৈরির কাজ শুরু করেছি যার নাম দিয়েছি ‘মুক্তান্বেষা’।

মুক্তান্বেষার মধ্যে আমরা মানুষের মনের চিরন্তন জ্ঞানের অভীপ্সা এবং অনন্ত জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পেতে চাই। জ্ঞানের গভীরতা এবং অতীতের জ্ঞানের সম্মিলনে নতুন জ্ঞান আহরণের কৌতূহল সমাজে অগ্রগতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। আমাদের উদ্দেশ্য সারা বিশ্বকে ভিতর থেকে এবং বাইরে থেকে বাংলা ভাষায় পাঠকের সামনে এমনভাবে তুলে ধরা যা তাদেরকে ক্রমান্বয়ে আরও জিজ্ঞাসু করে তুলবে। মুক্তান্বেষা হবে আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি, আমাদের নিজের ভাষায় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পর্যালোচিত ও সম্পাদিত প্রথম অনলাইন বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডার।

আজকের ডিজিটাল জগতে নতুন এবং পুরাতন সব তথ্য, গবেষণা, আবিষ্কার খুব সহজভাবেই সংযোজিত হতে পারে। সে জন্য মুক্তান্বেষা হবে একটি যথার্থ জ্ঞানকোষ যেখানে ক্রমাগতভাবে নতুন তথ্য ও নতুন শিরোনাম যুক্ত হবে।

এ ধরনের একটা জ্ঞানকোষ যে তথ্যের সমাহার না হয়ে গোটা বিশ্বের বর্তমান এবং অতীতের দার্শনিক-বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধি হতে পারে তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের এনলাইটেনমেন্ট দার্শনিকদের তৈরি অঁসিক্লোপেদি (Encyclopédie)। দিদেরো ও দালেম্বর সম্পাদিত এই বিশ্বকোষটিকে অনেকে এনলাইটেনমেন্ট প্রজেক্টের চূড়া হিসেবেও বিবেচনা করেন। দালেম্বরদের বিশ্বকোষ যেন ছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক ভাণ্ডারে ধারণ করার এক উচ্চাশার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলা ভাষায় এ রকম চলমান জ্ঞানকোষ বর্তমানে নেই। ১৮ শতকের মাঝামাঝি কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় এনসাইক্লোপিডিয়া বেঙ্গলিস নাম দিয়ে ১৩ খণ্ডে ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষিক বিশ্বকোষ বের করেছিলেন যার নাম ছিল ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’। সংস্কৃত ভাষায় ‘দ্রু’ দ্বারা ঊর্ধ্বগতি বুঝায় এবং সেই হিসেবে দ্রুম মানে হয় বৃক্ষ যেহেতু তা সদাঊর্ধ্বগামী। পুরাণে ‘কল্পদ্রুম’ দ্বারা ইন্দ্রলোকের সর্বকামনাপূরণকারী দেবতরু বুঝানো হত।

বিদ্যাকল্পদ্রুমে যে কেবল তথ্যবহুল, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ছিল তাই নয়, অনেক বই ও প্রবন্ধের অনুবাদও সেখানে ছিল। যেমন বাংলা ভাষায় ইউক্লিডের এলিমেন্টস বইয়ের প্রথম অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্যাকল্পদ্রুমেরই একটি খণ্ডে। তারপর গত দেড়শ বছরে বেশ কয়েকটি বিশ্বকোষ বের হলেও পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত হয়ে এই কোষগুলি আধুনিক অন্তর্জালে কোনোদিন অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতক পার হয়ে আসা যাক আজকের অনুপ্রেরণার কথায়। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে সাধারণ তথ্যভারাক্রান্ত লেখা প্রচুর থাকলেও সেখানে অতিবিস্তৃত গবেষণাধর্মী সমালোচনা-নিবন্ধও এত বেশি যে, তাকে একটা মুখ্য অনুপ্রেরণা মেনে নিতে কোনো সমস্যাই নেই।

আশার কথা, ব্রিটানিকার প্রায় পুরোটাই এখন বিনামূল্যে ইন্টারনেটে পড়া যায় এবং বর্তমানে তারা কেবল অনলাইন প্রকাশনাটাই চালায়, এটার মুদ্রণ সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আমাদের প্রধান আধুনিক অনুপ্রেরণা নিঃসন্দেহে স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফি (এসইপি) এবং ইন্টারনেট এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফি (আইইপি)। এই দুটোতেই দর্শনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেই বিষয়ের সেরা বিশেষজ্ঞদের কেউ সমালোচনা-নিবন্ধ লেখেন এবং প্রতিটি নিবন্ধই সাধারণ আকাদেমীয় জার্নালের মতো পিয়ার-রিভিউড, অর্থাৎ পুনর্নিরীক্ষিত।

এসইপিএর যে কোনো নিবন্ধ পড়লে সেই বিষয় সম্পর্কে একটা সার্বিক ধারণা পাওয়া যায় এবং সেই বিষয়ক গবেষণার সূচনা-বিন্দু হিসেবে নিবন্ধটি ব্যবহার করা যায়; উদাহরণ হিসেবে তাদের বিজ্ঞান ও ছদ্মবিজ্ঞান (Science and Pseudo-Science) প্রবন্ধটা পড়ে দেখা যেতে পারে।

কোনো সমাজ বা সংস্কৃতি তখনই উৎকৃষ্টতার মানগত সিঁড়ি বেয়ে উর্ধ্বগামী হতে পারে যখন সেখানে অসংখ্য প্রতিভা, মত এবং পথের বিকাশ ঘটার পরিবেশ তৈরি হয়

পরিশেষে, মুক্তান্বেষা যে কেবল কলেবরেই বিশ্বকোষ ধরনের হবে, কার্যত বা প্রবন্ধের ধরনের দিক দিয়ে একেবারেই বিশ্বকোষের মতো হবে না তা বুঝাতে আরেকটা বিশ্বকোষকে অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করা উচিত। এটা হল ভলতেয়ারের ব্যক্তিগত বিশ্বকোষ। এমনিতে অঁসিক্লোপেদির অনেকগুলো লেখাই ভলতেয়ার লিখেছিলেন; যেমন, ‘ইতিহাস’ প্রবন্ধটা তাঁরই লেখা। কিন্তু তিনি নিজে অনেক বছর ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের মনের মতো করে যা ইচ্ছা লিখে রাখতেন এবং প্রায় সবগুলো লেখারই অন্যতম উদ্দেশ্য থাকত রোমান ক্যাথলিক চার্চের সমালোচনা করা।

এক সময় বিষয়ের বর্ণানুক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে লেখাগুলো প্রকাশ করেছিলেন এবং নাম দিয়েছিলেন Dictionnaire philosophique; একেও এক ধরনের দার্শনিক বিশ্বকোষই বলা যায় যদিও এর প্রতিটি লেখাই স্বতঃস্ফূর্ত কলমযুদ্ধের ফল। মুক্তান্বেষায় যে অনেক ধরনের লেখা প্রকাশ করা সম্ভব তা বুঝানোর জন্যই ভলতেয়ার কোষটার নাম উল্লেখ করা হল।

বাংলাদেশে এশিয়াটিক সোসাইটির উদ্যোগে বাংলাপিডিয়া জাতীয় জ্ঞানকোষ প্রণীত হয়েছে যেটি অন্তর্জালে পাওয়া যায়। বাংলা ভাষায় বাংলাপিডিয়া নিশ্চয়ই একটি মূল্যবান সংযোজন, কিন্তু বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধসমূহ মূলত বাংলাদেশভিত্তিক, সর্বজনীন নয়।

প্রশ্ন হতে পারে, উইকিপিডিয়ার মতো একটি প্রতিষ্ঠান থাকতে মুক্তান্বেষা নামে নতুন একটি জ্ঞানকোষের কী প্রয়োজন। আসলে উইকির সঙ্গে মুক্তান্বেষার তুলনাই হওয়া উচিত নয়। উইকি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত পাবলিক এনসাইক্লোপিডিয়া, প্রবন্ধ বা তথ্য যেহেতু বিশেষজ্ঞদের দ্বারা উপস্থাপিত বা সম্পাদিত নয়, যে কেউ সেখানে লিখতে পারে। তাই তাদের নির্ভরযোগ্যতার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ, লেখক এবং সম্পাদকদের সংগঠিত উদ্যোগে তৈরি মুক্তান্বেষার নিবন্ধগুলি তাদের মান, মৌলিকত্ব, নির্ভরযোগ্যতা, বিষয়ের গভীরতা ও প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে পাঠকের জ্ঞানের ইচ্ছা পূরণ করবে এই আমাদের আশা। একই সঙ্গে এর চলমান চরিত্রের কারণে বর্তমান ঘটনাবলী ও পাঠকের আগ্রহ বিবেচনা করে নতুন বিষয়ের অবতারণা করতেও সক্ষম হবে।

আমাদের আশা বহু বছরের প্রচেষ্টায় ও যত্নে, বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং অবারিত সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে মুক্তন্বেষা এমন একটি প্লাটফর্ম হয়ে গড়ে উঠবে যা বিশেষজ্ঞরা তাদের সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জ্ঞান-বিনিময় করার জন্য এবং সেই জ্ঞান সাধারণ পাঠকদের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারবেন।

আমাদের ইচ্ছা মুক্তান্বেষা শুধুমাত্র একটি এনসাইক্লোপিডিয়া জাতীয় জ্ঞানকোষই হবে না, এখানে নানা ধরনেরর প্রশ্ন, ভিডিও, স্লাইড ইত্যাদির মাধ্যমে বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন শাখার বর্তমান অবস্থা পাঠকের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হবে। বিশ্বের, মহাবিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রামাণ্য চিত্র তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে এই সাইটের জন্য। সেই অর্থে মুক্তান্বেষা হবে একটি চলমান পাঠাগার যেখানে আনন্দের সঙ্গে জ্ঞান আহরণের বিভিন্ন অপ্রচলিত পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা করা হবে।

জ্ঞান অন্তহীন, আর আমাদের প্রজাতির জ্ঞানের অভীপ্সাও অশেষ। আজকের সীমাহীন সম্ভাবনাময় ইনফরমেশন টেকনোলজির যুগে জ্ঞানের চর্চা ও বিকাশ প্রথমবারের মতো হয়ে উঠছে সর্বত্রগামী। প্রিন্টিং প্রেস রেনেসাঁর সময় যে যুগান্তকারী ভূমিকা নিয়েছিল সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিতে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে আজকের যুগের ইন্টারনেট।

আসুন সেই প্রাযুক্তিক বিপ্লবে সামিল হয়ে মানুষের শতাব্দীলব্ধ সেই জ্ঞানের ভাণ্ডার পৌঁছে দিই সমস্ত জ্ঞানপিপাসু মানুষের হাতে, সাধারণ পাঠকের হাতে হাতে। যা হয়তো একদিন হাজারো অন্যায় অবিচার আগ্রাসন রক্ষণশীলতা ও মৌলবাদকে ধাক্কা দিতে ভূমিকা রাখবে। আগামী পয়লা মে-তে ইন্টারনেটে মুক্তান্বেষার ওয়েবসাইটটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্দেশে কাজ করে চলেছেন টেকনিক্যাল, লেখক, বিশেষজ্ঞদের এক বেশ বড়সড় দল।

আশা করি আপনারাও আমাদের পাশে থাকবেন।

*****বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরে প্রকাশিত।

[2244 বার পঠিত]