“Religion, a medieval form of unreason, when combined with modern weaponry becomes a real threat to our freedoms” ~ Salman Rushdie.

আমি একটা বই লিখেছিলাম ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নামে[1]। তেমন বিরাট কোন কাজ বা মৌলিক কিছু নয়, মূলত আধুনিক মেমেটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় বিশ্বাসকে বিশ্লেষণ করা হয়েছিল এ বইয়ে। সেই বিগত সত্তরের দশকে রিচার্ড ডকিন্সের সেলফিশ জিন বাজারে আসার পর থেকেই মিম এবং মেমেটিক্স তৈরি করেছে চলমান গবেষণার ক্ষেত্রে এক সজীব প্রেক্ষাপট। পশ্চিমা বিশ্বের একাডেমিয়ায় অজস্র গবেষণাপত্র তো বটেই, বিগত কয়েক বছরে এ সংক্রান্ত বেশ কিছু জনপ্রিয় ধারার ভাল বিজ্ঞানের বইও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাংলাভাষায় এ নিয়ে কোন বই ছিল না। আমার একটা প্রচেষ্টা ছিল এ বইয়ের মাধ্যমে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোর সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেবার। বইটা লিখার প্রেরণা ছিল মূলত সেটাই। কতটুকু সফল হয়েছি জানি না, তবে মাসখানেকের মধ্যেই বইটির একাধিক সংস্করণ প্রকাশ এবং পাঠকদের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়ার নিরিখে বলা যায় বইটি নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল ছিল, হয়তো এখনো আছে। কৌতূহল এবং প্রশংসার পাশাপাশি বইটির কারণে কিছু লোকের বিরাগভাজনও হয়েছি বোধ করি। বিরাগভাজন হওয়া লোকজনের মধ্যে কিছু মুখচেনা অসুস্থ মৌলবাদী যেমন আছে, তেমনি আবার দু একজন বামপন্থি প্রগতিশীল ব্যক্তিও আছেন। প্রথম দলভুক্তরা রকমারির মত অনলাইন বই-বিপণন প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দিয়ে আমার বই নিষিদ্ধ করার মিছিলে সামিল হয়েছিলেন, আর দ্বিতীয় দলভুক্তরা সরাসরি জিহাদে না নামলেও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লেখার কারণে ‘সালাফি সেক্যুলার’ বলে ট্যাগ করেছেন।

প্রথমোক্ত দলভুক্তদের নিয়ে আমার নতুন করে বলার কিছু নেই। কারণ তারা যুক্তি মানেন না, জবাব দিতে চান অস্ত্রে কিংবা সহি উপায়ে কল্লা ফেলে দিয়ে। তারা মনেই করেন ধর্ম এবং ধর্মপ্রচারকদের বিন্দুমাত্র সমালোচনা কেউ করলে তাকে মেরে ফেলার স্বর্গীয় অধিকার তাদের আছে। তারা যদিও বাস করছেন আধুনিক একবিংশ শতকে, কিন্তু দেখে মনে হয় নিজেদের বিবেক, বুদ্ধি এবং মনন জিম্মি রেখে এসেছেন সেই সপ্তম শতকে। এদের নিয়ে কিছু লেখার কোন অর্থ হয় না। কারণ জিহাদ এবং কতলের বাইরে তারা চিন্তা করতেই অক্ষম। দ্বিতীয় দলভুক্তরা অবশ্য সেরকম নন। তারা নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষের পক্ষেই কথা বলেন। সমাজ রাজনীতি এবং মানুষ নিয়ে তারা সংবেদনশীল। ব্লগে পত্র-পত্রিকায় মননশীল লেখা লেখেন। কাজেই তাদের বক্তব্যের আলাদা গুরুত্ব আছে আমার কাছে। পারভেজ আলম এমনি একজন মননশীল লেখক। ব্লগে লেখা ছাড়াও ‘মুসলিম জ্ঞানতত্ত্ব’ নিয়ে এবং ‘শাহবাগের রাষ্ট্রপ্রকল্প’ বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ দুটো বই আছে তার। আমি উদ্যোগী হয়ে বইদুটো সংগ্রহ করেছি, পড়েছি, অন্যদেরও উৎসাহিত করেছি একসময়। ভদ্রলোক আরজ আলী মাতুব্বর পাঠাগার আন্দোলনের সাথেও যুক্ত। এমন একজনের লেখা নিঃসন্দেহে বাড়তি মনোযোগ দাবী করে। ঘটনার শুরু হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। সে সময় আমি ইংরেজিতে একটি লেখা লিখেছিলাম, মূলত: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিখ্যাত মুক্তচিন্তার পত্রিকার অনুরোধে। সে সময় আইসিস কর্তৃক আমেরিকান এবং ব্রিটিশ সাংবাদিকদের শিরোচ্ছেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে মিডিয়া ছিল তোলপাড়। আমার সে সে লেখায় স্বভাবতই আইসিসের সে সব বর্বর কর্মকাণ্ডের কিছু সমালোচনা ছিল, এবং এটিকে দেখেছিলাম আমি ‘বিশ্বাসের ভাইরাসের’ মহামারী হিসেবে। এ লেখার বিপরীতে পারভেজ একটি লেখা লিখেন ইস্টিশন ব্লগে আমাকে ‘সালাফি সেক্যুলার’ হিসেবে ট্যাগ করে। তিনি তার লেখাটির শিরোনাম পর্যন্ত দিয়েছিলেন ‘অভিজিৎ রায় কেন সালাফি সেক্যুলার হইলেন?’। কিন্তু মজার বিষয় হল, এ ধরণের উদ্দেশ্যমূলক ট্যাগে সামিল হলেও আমার বইটি পড়ে দেখার সৌজন্য তিনি দেখাননি। কিন্তু বইটি না পড়লেও আমার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তা না হয় ঠিক আছে, সবাইকে সব কিছু পড়তে হবে এমন দিব্যি কেউ দেয়নি। অনেক সময় পক্ষে –বিপক্ষের চলমান বিতর্ক থেকেও আমরা শিখি, নিজেদের আপডেট করি। সে সময় এই বিতর্কের কারণেই মুক্তমনায় মুহম্মদ গোলাম সারোয়ার এবং নাস্তিকের ধর্মকথার দু’ দুটি সুলিখিত লেখা পেয়েছিলাম আমরা। বিশেষতঃ নাস্তিকের ধর্মকথা্র কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। তিনি আমার এবং পারভেজের লেখার উপর দুইপক্ষেরই কিছু দোষত্রুটি দেখিয়ে একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন মুক্তমনায় (যদিও দূর্ভাগ্যক্রমে তিনিও আমার বইটি পড়ে দেখেননি)। মিম এবং মেমেটিক্স নিয়ে তার আগ্রহ না থাকলেও (যেটা তিনি লেখাতে স্বীকারও করেছেন) সেই লেখায় ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ এই ধারনাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কিছু আপাতঃ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। আমি সে সময় প্রবন্ধটির নীচে একটি প্রতিমন্তব্য করলেও (আমি ছাড়াও অভিষেক রহমান কিছু চমৎকার পয়েন্টের অবতারণা করেছিলেন) বিস্তৃত পরিসরে উত্তর দেবার সময় এবং সুযোগ পাইনি। পারভেজ অবশ্য বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন, শেষ লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের স্বার্থে অভিজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে লিখেছি’। আমি এ লেখায় সেরকম কোন শিরোনাম দিচ্ছি না। আমি ঠিক করেছি ব্যক্তিগত মান অভিমান ক্যাচাকেচি বাদ দিয়ে নির্মোহভাবে আরেকটিবার সবকিছু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। আর এ লেখার লক্ষ্য কেবল পারভেজ নয়, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পর প্রাসঙ্গিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের ফেসবুক স্ট্যাটাস এবং আলোচনা দেখার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। এদের নিয়েও আমার কিছু অভিমত রয়েছে। আশা করব এ নিয়ে এটাই হয়তো আমার শেষ লেখা হবে।

এর মধ্যে বেশ কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেছে। আইসিসের বিধর্মী-কাফেরদের ধরে ধরে শিরোচ্ছেদের যজ্ঞ তো চলছেই, পাশাপাশি খবরে দেখলাম, তারা আবার ১৫০ জন সগোত্রীয় নারীকেও হত্যা করেছে, কারণ এই নারীরা ইসলামের তাগুদি জিহাদীদের বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল[2]। পাশাপাশি চলছে নাইজেরিয়াতে বোকো হারামের ম্যাসাকার। প্রায় ২০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ইসলামের নামে[3]। আরেকটা খবরে দেখলাম, রেইহানা নামে এক ইরানী মেয়েকে ধর্ষণ করা হল, আবার উল্টে শরিয়া আইনে বিচার করে তাকেই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া হল। এদিকে সৌদি আরবে এক মুয়াজ্জিন আজান দিতে দেরী করায় গুলি করে দিয়েছে ধর্মের এক দ্বীন এক ‘পাগলা’ সেবক। ক’দিন পরেই অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে এক ক্যাফে দখল করে মানুষজনকে জিম্মি করে রাখল আইসিসের পতাকাবাহী এক মধ্য বয়সী যুবক। এর মধ্যে আরেকটি দুঃখজনক ঘটনায় পাকিস্তানের পেশোয়ারে পাকিস্তানী তালিবানেরা স্কুলে এসে গুলি করে প্রায় ১৪০ জন ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করেছে। শুধু তাই নয়, এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর পাক তালিবান প্রধান সহি বুখারির রেফারেন্স দিয়ে বলেছে, তাদের পেশোয়ারে গনহত্যা মুহম্মদের জীবনী এবং হাদিস শরিফ দিয়ে সমর্থিত। পেশোয়ারে যা তারা করেছে, তা ইসলামী ‘সুন্নত’[4]। পেশোয়ারের বর্বরতার রক্ত শুকোতে না শুকাতেই ঘটলো ফ্রান্সে শার্লি এবদোর দুঃখজনক ঘটনা। সাম্প্রতিক এ ঘটনাটি নিয়ে আবারো মিডিয়া তোলপাড়। নবী মুহম্মদকে নিয়ে ‘ব্যঙ্গাত্মক’ কার্টুন আঁকার কারণে ‘ধর্মানুভূতি’তে আঘাতপ্রাপ্ত জিহাদিরা ফ্রান্সের শার্লি এবদো পত্রিকা অফিসে হামলা চালায়। ১২ জন কার্টুনিস্টকে হত্যা করে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনি দিয়ে। হত্যা-মিশন সম্পন্ন করার সময় সন্ত্রাসীর মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল – ‘The prophet has been avenged’। পেশোয়ারের এবং শার্লি এবদোর বিয়োগান্তক ঘটনার পর আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো, এ ধরণের বর্বরোচিত হামলার পর যদি ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নিয়ে কারো সংশয় থাকে তা ঝেড়ে ফেলা উচিৎ। স্কুলের ১৪০ জন নিষ্পাপ শিশুদের গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিতে যাদের হাত এতোটুকু কাঁপে না, সামান্য কার্টুনের জবাব যারা বন্দুক এবং বোমার মাধ্যমে দিতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, তাদের মস্তিষ্ক ভাইরাসাক্রান্ত নয়তো আর কি! সেই চির পুরাতন ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ !

আসলে আমরা স্বীকার করি আর নাই করি, ধর্মের বিস্তার আর টিকে থাকার ব্যাপারগুলো ভাইরাসের মত করেই কাজ করে অনেকটা। ধর্মের তাগুদি বান্দারাই তা বারে বারে প্রমাণ করে দেন। একটি ভাইরাসের যেমন ‘হোস্ট’ দরকার হয় বংশবৃদ্ধির জন্য, নিজেকে ছড়িয়ে দেবার জন্য, ধর্মেরও টিকে থাকার জন্য দরকার হয় এক গাদা অনুগত বান্দা এবং সেবকের, যাদের বুকে আশ্রয় করে ধর্ম টিকে থাকে। শুধু তাই নয়, জীবাণু যেমন নিজেকে রক্ষার জন্য অন্য জীবাণুর সাথে প্রতিযোগিতা করে, ঠিক তেমনি এক বিশ্বাসও প্রতিযোগিতা করে অন্য বিশ্বাসের সাথে। নিজেকে অন্য বিশ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করতে চায়। বিশ্বাসী বান্দাদের মনে ঢুকিয়ে দেয়া হয় – ‘অবিশ্বাসীদের কিংবা বিধর্মীদের কথা বেশি শুনতে যেয়ো না, ঈমান আমান নষ্ট হয়ে যাবে।’ ভাইরাস যেমন চোখ বন্ধ করে নিজেকে কপি করে করে সংক্রমণ ছড়িয়ে যায়, প্রতিটি ধর্মীয় বিশ্বাস অন্য বিশ্বাসগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে কেবল নিজের বিশ্বাসের কপি করে যেতে থাকে ঠিক একইভাবে। এভাবেই বিস্তার ঘটাতে থাকে বিশ্বাস নির্ভর সাম্রাজ্যের। কেন ধর্ম ভাইরাসের মতো সঙ্ক্রামক তা পেশায় চিকিৎসক এবং সুলেখক মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার তাঁর একটি সুলিখিত প্রবন্ধে খুব চমৎকার ভাবে দেখিয়েছিলেন[5]। তিনি ভাইরাসের শারীরিক গড়ন, ভাইরাসের কর্মক্ষমতা এবং এর কাজের ধরণ, ভাইরাসের ক্ষতিকর দিক এবং এমনকি ভাইরাসের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও ধর্মের সাথে ভাইরাসের প্রবল সাযুজ্যের উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। সেখান থেকে কিছু পয়েন্ট আমাকে উল্লেখ করতেই হবে –

১ -ভাইরাসের শারীরিক গড়ন

ভাইরাস হচ্ছে এক ধরনের জীবাণু যা নিজে নিজের খাদ্য তৈরি করতে পারেনা, এটা বংশ বৃদ্ধি করতে পারেনা যদিনা এরা ভিন্ন কোনও প্রাণী দেহের ভেতরে অবস্থান না করে, অর্থাৎ, কোনও হোস্ট বা প্রাণী দেহের বাইরে ভাইরাস একটি নিরেট জড় পদার্থ। মাইক্রোবায়োলজির কোনও কোনও পুস্তক হোস্ট দেহের বাইরের ভাইরাস কে স্রেফ একটি জড় পাথরের সাথে তুলনা করেছে, ইংরাজিতে যাকে বলা যায় Inert substance। অর্থাৎ অন্যের দেহে না ঢুকে, ভাইরাসের পক্ষে কোনও কাজই করা সম্ভব নয়। নিজ অস্তিত্ব ও বৃদ্ধির প্রয়োজনে তাকে একটি হোস্ট খুঁজতেই হয়।

এবারে আসুন, পারভেজ আলমের লেখায় হজরত আলীর জবানিতে তিনি কি লিখেছেন পড়ে দেখুন –

“সিফফিনের যুদ্ধের সময় খারেজিরা যখন ‘আল্লাহ ছাড়া কোন শাসক নাই’ এবং ‘কুরান ছাড়া কোন বিচারক নাই’ এই জাতীয় স্লোগান দিয়ে আলীর বিরোধিতা শুরু করেছিল তখন তাদের সাথে আলীর একটি বিতর্কের কাহিনী পাওয়া যায়। আলী একটি কুরান শরিফকে জনসমাজের সামনে রেখে সেই কুরানকে বলেছিলেন আল্লাহর আইন জনগণকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্যে। কুরান তো কথা বলতে পারে না, সে আলীর প্রশ্নের জবাব কিভাবে দেবে? জনগণ এই প্রশ্ন তোলার পর আলী সায় দিয়ে বলেছিলেন, কুরান হলো কাগজ আর কালি, কুরান নিজে থেকে কিছু বলতে পারে না। কুরান থেকে আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারে খালি মানুষ, তার নিজের বুঝ বুদ্ধির আওতা অনুযায়ী।“

পারভেজ, আপনার এই গল্পটি হচ্ছে একটি আদর্শ উদাহরণ যে কুরআন বা যেকোনো গ্রন্থ হচ্ছে এক রকমের নিরেট নির্জীব পদার্থ, যার নিজের কোনও স্বাধীন কার্যক্ষমতা নেই, যার সক্রিয় হবার জন্যে অন্যের কাঁধে সওয়ার হতে হয়, অর্থাৎ যার সক্রিয় হবার জন্যে অবশ্যই একজন হোস্ট দরকার হয়, ঠিক যেমনটা দরকার হয় ভাইরাসের। অর্থাৎ কুরআনের বা যেকোনো ধর্মগ্রন্থের একটি হোস্ট দরকার, তার নিজেকে বৃদ্ধির জন্যে, নিজের বিস্তারের জন্যে। হোস্ট বিহীন কুরআন বা বাইবেল বুক শেলফ এর আরও তিন হাজার পুস্তকের মতই একটি নিরুপদ্রব পুস্তক। কিন্তু যখন ধর্ম গ্রন্থ একটি হোসট লাভ করে, তখন? তখন সে তার হোস্ট এর উপরে নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে এবং এক পর্যায়ে হোস্ট তার নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে দাস হয়ে পড়েন ধর্মের, যাকে “ধর্মীয় অনুশাসন” নামে চালানো হয়ে থাকে। এই অনুশাসন মানুষ কে মুসলমান বানায়, হিন্দু বানায়, শিখ বানায় তারপর একজনকে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। অর্থাৎ মানুষের স্বাভাবিক চিন্তার জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ধর্ম। আসুন, ভাইরাস এই কাজটি কিভাবে করে দেখা যাক –

২ – ভাইরাসের কর্মক্ষমতা এবং এর কাজের ধরণ

ভাইরাস যখন কোনও হোস্ট সেল এর ভেতরে ঢুকে যায়, তখন ভাইরাস সেই হোসট সেল এর প্রজনন ও অন্যান্য মেটাবলিক বা বিপাকীয় কাজের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। ভাইরাস কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম কে বন্ধ করে দেয়, অর্থাৎ এটি একটি স্বাভাবিক কোষের সাধারণ কাজ কে বন্ধ করে দিয়ে তাঁর মতো করে কাজ শুরু করে দেয়। তখন কোষ আর নিজের কাজের রুটিন বা নিয়ম মানতে পারেনা, যে ভাইরাস টি দ্বারা আক্রান্ত ঠিক তার শাসন অনুযায়ী কাজ করে। এক পর্যায়ে ভাইরাস মানব বা প্রাণী কোষের ভিতরে প্রজনন শুরু করে, লক্ষ লক্ষ নতুন ভাইরাস আরও লক্ষ লক্ষ কোষ কে আক্রমণ করে এবং এক সময় মানুষের দেহের কোনও নির্দিষ্ট তন্ত্রের স্বাভাবিক কাজ কে বন্ধ করে দেয়। সব শেষে হোস্ট কোষের বা এমনকি হোস্ট প্রাণীরও মৃত্যু ঘটে। ঠিক যেমন টা ধর্ম একজন মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক বোধ বুদ্ধি কে বন্দী করে ধর্মের অনুশাসন চাপিয়ে দেয়।মানুষ তখন হয়ে যায় ধর্মের ডিক্টেশনে চালিত, বিজ্ঞান বা মানবিক বোধ দ্বারা চালিত নয়।

৩ -ভাইরাসের ক্ষতিকর দিক এবং আক্রমণের ধরণ

ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণী বা মানুষ বা হোস্ট দুই ধরনের হতে পারে। প্রথমত – ভাইরাস সঙ্ক্রমিত এবং যার মধ্যে সক্রিয় রোগ দেখা দিয়েছে (Virus infected with disease menifestation)। দ্বিতীয়ত – ভাইরাস আক্রান্ত কিন্তু রোগাক্রান্ত নয় (Carrier without active infection or disease), কিছু হোস্ট বা মানুষ কোনও রকমের রোগের প্রকাশ বিহীন ভাবেও থাকতে পারেন তার সারা জীবন। অথচ এরা ভাইরাস এর বাহক, এদেরকে বলা হয় ক্যারিয়ার।

– প্রথম গোত্রের মানুষ হচ্ছে সংক্রমিত এবং যাঁদের রোগের লক্ষণ প্রকাশিত ইনফেক্টেড উইথ এক্টিভ ডিজিস! বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত মানুষের একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা ভোগান্তি হয়ে থাকে, মৃত্যুও হয়ে থাকে। এই ভোগান্তি সামান্য সর্দি – কাশী – ফ্লু থেকে শুরু করে মরনঘাতি এইডস ও হতে পারে।

– দ্বিতীয় গোত্রের হোস্ট হচ্ছে ক্যারিয়ার অর্থাৎ এরা জীবাণু টি বহন করেন কোনও রকমের লক্ষণ ছাড়াই। এই গোত্রের হোস্ট দের দুইটি সমস্যা আছে –

প্রথমত, যেহেতু এরা ক্যারিয়ার কিন্তু সাফারার নন, তাই এরা মনে করেন যে এরা সুস্থ এবং বাস্তবের এদের ইনফেকশন এর কথা ধরাও পড়ে কদাচিৎ বা অনেক দেরীতে, যেহেতু এদের কোনও লক্ষণ বা অভিযোগ থাকেনা। এদের কারো কারো সারা জীবনেও লক্ষণ প্রকাশিত হয়না।

দ্বিতীয়ত, রোগের আক্রমণ থেকে এরা বেঁচে গেলেও সবার অলক্ষ্যে এরা এই ভাইরাস কে সমাজের অন্যান্য মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন। অর্থাৎ ক্যারিয়ার হোস্ট বা মানুষেরা আপাত দৃষ্টিতে ঝুকিহীন হলেও এরা সবার অলক্ষ্যে ভাইরাস টিকে ছড়িয়ে দেন সমাজের সবার মাঝে।যারা ক্যারিয়ার বা বাহক, তারা যে সব সময় রোগের ঝুকিমুক্ত থাকবেন, তাও কিন্তু নয়। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে এলে, এই ক্যারিয়ার বা বাহকরাও আক্রান্ত হতে পারেন সক্রিয় রোগে। সুতরাং ভাইরাস এর বাহক আপাত লক্ষনবিহিন হলেও এরাই ভাইরাসটিকে ছড়িয়ে দিয়ে আরও হাজার হোস্ট কে আক্রান্ত করে এবং নিজেও কোনও দিন আক্রান্ত হতে পারে।

আশ্চর্য জনক ভাবে একথা সত্যি যে পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছেন যারা বিভিন্ন রকমের ভাইরাস বহন করছেন কোনও রকমের রোগের লক্ষণ ছাড়াই। এমন কি মারাত্মক এইচ আই ভি ভাইরাসও বহন করছেন অনেকেই কোনও রকমের রোগের লক্ষণ ছাড়া। তার মানে হচ্ছে রোগের লক্ষণ প্রকাশিত না হলেই ভাইরাসের অনুপস্থিতি নিশ্চিত করেনা। ধর্মের ভাইরাস বহন করছেন কিন্তু কোনও রকমের সন্ত্রাসী কাজ কর্মের সাথে জড়িত নন, এই গোত্রের মানুষদের পারভেজ বলছেন “শান্তিপ্রিয়” অর্থাৎ যারা ধর্ম বিশ্বাসী বা ধর্মের বিশ্বাস কে বহন করেন কিন্তু কোনও রকমের সন্ত্রাসবাদী কাজের সাথে জড়িত নন। তাই পারভেজ প্রশ্ন রাখছেন –

“কিন্তু দুনিয়ার সকল মুসলমানই কেনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে না অথবা আক্রান্ত হলেও কার্যক্ষেত্রে তার কোন প্রকাশ ঘটাচ্ছে না সেই প্রশ্নটি আসে।“

পারভেজ এর প্রশ্ন টি কি ভাইরাস এর “ক্যারিয়ার” ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?

লক্ষণ প্রকাশিত না হওয়াকে পারভেজ বলেন “শান্তিপ্রিয়” কিন্তু আমাদের জীবদ্দশায় কি আমরা দেখিনি, ধর্মের বিশ্বাস বহন করা এই “শান্তিপ্রিয়” মানুষেরাও কখনও কখনও হয়ে ওঠেন ভয়ংকর? ধর্ম এদের কে কখনও সক্রিয় করে তোলে আবার নির্লিপ্ত – ভুমিকাহীন ও করে তোলে। এজন্যেই গুজরাটে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা বাঁচাতে পারেনা মুসলিম শিশুর খুন হওয়াকে, এ জন্যেই বাংলাদেশের একটি গ্রামে যেখানে লক্ষ ঘর মুসলিম “শান্তিপ্রিয়” মানুষ থাকতেও ৫ – ১০ টি হিন্দু পরিবার কে বাচাতে পারেনা। এ জন্যেই দেখা যায় মাত্র ৩০ জন মুসলমান সন্ত্রাসী হয়ত ৩০০ হিন্দু পরিবার কে ভারতে পাঠিয়ে দিলো অথচ গ্রামের ৩০ হাজার মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখলো। কারণ এই হাজার হাজার মানুষ গুলোর মস্তিষ্কের ভাইটাল মেকানিজম ধর্ম নামের ভাইরাসের দখলে। মানুষ এখানে ডিক্টেটেড বা পরিচালিত হয় “ধর্মের” অনুশাসন দ্বারা।

জীববিজ্ঞান থেকে কিছু প্যারাসাইটিক সংক্রমণের উদাহরণ

তবে বিশ্বাসের ভাইরাস বইটিতে কেবল জৈবভাইরাস নয়, পাশাপাশি কিছু প্যারাসাইটিক সংক্রমণের উদাহরণ নিয়েও আলোচনা করা হয়েছিল। আমার একটা প্রিয় উদাহরণ দেই। উদাহরণটি বহুবারই আগে দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞানের দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট তার বিখ্যাত ‘ব্রেকিং দ্য স্পেল’ বইটিতে উদাহরণটি ব্যবহার করেছেন[6]। আমাদের অনেকেই কোন কোন পিপড়াকে দেখেছি – সারাদিন ধরে ঘাসের নীচ থেকে ঘাসের গা বেয়ে কিংবা পাথরের গা বেয়ে উপরে উঠে যায়, তারপর আবার ঝুপ করে পড়ে যায় নিচে, তারপর আবারো গা বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে – এই বেআক্কেলে কলুর বলদের মত পণ্ডশ্রম করে পিপড়াটি কি এমন বাড়তি উপযোগিতা পাচ্ছে, যে এই অভ্যাসটা টিকে আছে? কোন বাড়তি উপযোগিতা না পেলে সারাদিন ধরে সে এই অর্থহীন কাজ করে সময় এবং শক্তি ব্যয় করার তো কোন মানে হয় না। আসলে সত্যি বলতে কি – এই কাজের মাধ্যমে পিপড়াটি বাড়তি কোন উপযোগিতা তো পাচ্ছেই না, বরং ব্যাপারটি সম্পূর্ণ উলটো। গবেষণায় দেখা গেছে পিপড়ার মগজে থাকা ল্যাংসেট ফ্লুক নামে এক ধরনের প্যারাসাইট এর জন্য দায়ী। এই প্যারাসাইট বংশবৃদ্ধি করতে পারে শুধুমাত্র তখনই যখন কোন গরু বা ছাগল একে ঘাসের সাথে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। ফলে প্যারাসাইট টা নিরাপদে সেই গরুর পেটে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। পুরো ব্যাপারটাই এখন জলের মত পরিষ্কার – যাতে পিপড়াটা কোন ভাবে গরুর পেটে ঢুকতে পারে সেই দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ঘাস বেয়ে তার উঠা নামা। আসলে ঘাস বেয়ে উঠা নামা পিঁপড়ের জন্য কোন উপকার করছে না বরং ল্যাংসেট ফ্লুক কাজ করছে এক ধরনের ভাইরাস হিসবে – যার ফলশ্রুতিতে পিঁপড়ে বুঝে হোক, না বুঝে তার দ্বারা অজান্তেই চালিত হচ্ছে।

চিত্র: ল্যাংসেট ফ্লুক নামের প্যারাসাইটের কারণে পিঁপড়ের মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন পিঁপড়ে কেবল চোখ বন্ধ করে পাথরের গা বেয়ে উঠা নামা করে। ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোও কি মানুষের জন্য একেকটি প্যারাসাইট?

এ ধরণের আরো কিছু উদাহরণ জীববিজ্ঞান থেকে হাজির করা যায়। যেমন,

– জলাতঙ্ক রোগের সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। পাগলা কুকুর কামড়ালে আর উপযুক্ত চিকিৎসা না পেলে জলাতঙ্ক রোগের জীবাণু মস্তিষ্ক অধিকার করে ফেলে। ফলে আক্রান্ত মস্তিষ্কের আচরণও পাগলা কুকুরের মতোই হয়ে ওঠে। আক্রান্ত ব্যক্তি অপরকেও কামড়াতে যায়। অর্থাৎ, ভাইরাসের সংক্রমণে মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।

– ল্যাংসেট ফ্লুক নামে এক ধরনের প্যারাসাইটের সংক্রমণের ফলে পিঁপড়া কেবল ঘাস বা পাথরের গা বেয়ে উঠা নামা করে। কারণ এই প্যারাসাইটগুলো বংশবৃদ্ধি করতে পারে শুধুমাত্র তখনই যখন কোনো গরু বা ছাগল একে ঘাসের সাথে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। ফলে প্যারাসাইট নিরাপদে সেই গরুর পেটে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

উপরের উদাহরণগুলো সবারই কম বেশি জানা। এ উদাহরণগুলোই শেষ নয়। প্রকৃতিতে এ ধরণের উদাহরণ আছে বহু। হচ্ছে বিশ্বাসের ভাইরাস নিয়ে যখন ভিন্ন ব্লগে তর্ক-বিতর্ক চলছিলো, ঠিক সে সময়ই প্যারাসাইটিক সংক্রমণের উদাহরণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিচার প্রবন্ধ প্রকাশ করে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন পত্রিকা, যেটি হয়তো ডামাডোলের ভিড়ে অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। আমার এবারকার এ লেখায় সে প্রবন্ধটি থেকে কিছু উদাহরণ সামনে আনতে চাই। প্রবন্ধটি লিখেছেন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক কার্ল ঝিমার। ২০১৪ সালের সর্বশেষ সংখ্যাটির (ভলিউম ২২৬, সংখ্যা ৫; নভেম্বর ইস্যু) প্রবন্ধটির শিরোনামই হচ্ছে ‘মাইন্ড সাকারস’[7]। সেই প্রবন্ধটি থেকে আরো কিছু আকর্ষণীয় উদাহরণ –

– এক ধরণের কাঁকড়া আছে, (sheep crab), যাদের উপর প্যারাসাইটিক বার্নাক্যাল নামের এক ধরণের প্যারাসাইটের আক্রমণ হলে সে কাঁকড়াগুলো ‘ফেমিনাইজড’ হয়ে পড়ে। তাদের দাঁড়া (claw)র বৃদ্ধি থেমে যায়। তাদের পেট বৃদ্ধি পেয়ে অনেকটা ‘জরায়ু’র মত হয়ে উঠে, যার ফলে পরজীবী বার্নাকেলগুলো সেখানে দিব্যি আশ্রয় করে বেঁচে থাকে। সেখান থেকে জন্ম হয় আরো অসংখ্য নতুন শিশু বার্নাক্যালের, নতুন নতুন হোস্টকে সংক্রমণ করার জন্য তৈরি হয়ে ওঠে তারা।

– টক্সোপ্লাসমা গোণ্ডি(Toxoplasma gondii) নামে এক ধরণের প্যারাসাইট ইঁদুরের মস্তিষ্ক সংক্রমণ করে ফেললে সেই হতভাগ্য ইঁদুরেরা বিড়ালকে ভয় পাওয়ার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বিড়াল দেখে পালিয়ে যায় না, ফলে সেগুলো বিড়ালের সহজ শিকারে পরিণত হয়। সেসমস্ত ইঁদুরকে বিড়াল কামড়ালে প্যারাসাইট গুলো নির্বিঘ্নে বিড়ালের পেটে গিয়ে আশ্রয় লাভ করে, এবং সেখানে বংশবৃদ্ধি করে।

– লুকোক্লোরিডাম প্যারাডক্সিন (Leucochloridium paradoxum) নামের এক ধরণের পরজীবীর সংক্রমণে শামুক আক্রান্ত হলে , তাদের মধ্যেও একধরণের আত্মহত্যার প্রবণতা জেগে উঠে। তারা গাছের গা বেয়ে উঠতে থাকে তার তাদের শুঁড়গুলো এমনভাবে নড়তে থাকে যে পাখিরা এদেরকে সুস্বাদু কোন পোকা বলে ভুল করে আর ঠোকর দিয়ে খেয়ে ফেলে। প্যারাসাইটগুলো পাখির পেটে গিয়ে ডিম পাড়ে, বংশবৃদ্ধি করে, তারপর পাখির বিষ্ঠার সাথে বের হয়ে অন্য শামুকের খাদ্যে পরিণত হয়, এবং এভাবে খুঁজে পায় নতুন হোস্ট। কমপ্লিট সাইকেল! এনিয়ে একটি চমৎকার ভিডিও দেখা যাক –

httpv://www.youtube.com/watch?v=6o5OjV2VLfY

– গুবরে পোকা। যেগুলোকে ইংরেজিতে খুব সাধারণভাবে ‘লেডি বাগ’ বলা হয়। Dinocampus coccinellae নামের এক ধরণের বোলতা হুল ফুটিয়ে দিলে সেই গুবরে পোকাগুলো বোলতাদের ‘বডিগার্ডে’ পরিণত হয়ে যায়। দেখা গেছে বোলতা হুল ফোটানোর সময় গুবরে পোকার ভিতরে কিছু ডিমও পেড়ে যায়। সেই ডিম থেকে শূককীট বের হলে গুবরে পোকাগুলো তাদের রক্ষা করে এমনকি নিজের দেহকে শূককীটের জন্য খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

– এমনকি সাধারণ ম্যালেরিয়ার জীবাণুও (প্লাস্মোডিয়ায়ম প্যারাসাইট) এক ধরণের হোস্ট হিসেবে মশাকে ব্যবহার করে। মশার ভিতরে এই প্যারাসাইটগুলো প্রাথমিক জীবনচক্র সম্পন্ন করে, তারপর মশা কোন সুস্থ মানুষকে কামড়ালে তার দেগে গিয়ে রোগ ছড়ায় অর্থাৎ বংশবৃদ্ধি করে।

এধরণের আরো অনেক মজার মজার উদাহরণ দিয়েছেন কার্ল জিমার তার ‘মাইন্ড সাকারস’ প্রবন্ধটিতে।

ঝিমারের দেয়া উদাহরণগুলোর বেশ কিছু আমার আগেই জানা ছিল, তাই খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না আমার কাছে। কিন্তু যে ব্যাপারটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল তা হল, লেখক ডকিন্সের ‘সেলফিশ জিন’ এবং ‘এক্সটেণ্ডেড ফেনোটাইপ’ নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। পরজীবীরা কিভাবে অন্য জৈবতন্ত্রের দখল নিতে পারে তা সেলফিশ জিন এবং এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। কার্ল ঝিমার বলেছেন, যখন ১৯৮২ সালে ‘এক্সটেন্ডেট ফেনোটাইপ’ নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন ডকিন্স, বইটি সময়ের বিচারে অনেক অগ্রগামী ছিল। তখন বিজ্ঞানীদের হাতে এতো উদাহরণও ছিল না। কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানীরা জানতেন যে যদি ডকিন্সের ধারণা সঠিক হয়, তাহলে প্যারাসাইটের মধ্যে অবশ্যই কিছু জিন থাকবে, যেগুলো হোস্টের পরিচয়সূচক কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণ করা জিনগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে বা বদলে দেবে। বত্রিশ বছর পর বিজ্ঞানীরা অবশেষে এই ব্ল্যাকবক্সের রহস্য উন্মোচন করতে সমর্থ হয়েছেন। এবং বলা বাহুল্য সেটা ডকিন্সের সেই ধারণাকেই পোক্ত করেছে যা তিনি বলছিলেন ১৯৭৬ সাল থেকেই। ঝিমার বলেছেন,

How mutations and natural selection could give rise to such creepy powers is a particularly intriguing puzzle for evolutionary biologists. One useful concept for thinking about it comes from biologist Richard Dawkins, author of the landmark book The Selfish Gene.

In that book Dawkins argued that genes evolve to make copies of themselves more successfully. Our bodies may be important to us, but from our genes’ point of view, they are nothing more than vehicles to get themselves intact into the next generation. The entire collection of the genes that make up you or me is called our genotype. The sum total of all the bodily parts and functions that our genotype creates to advance its cause—you or me—is called our phenotype….

Dawkins first developed these ideas in his 1982 book The Extended Phenotype. In many respects it was a book far ahead of its time. In the 1980s scientists had carefully studied only a few examples of parasites manipulating their hosts’ behavior. But if the hypothesis was correct, there had to be genes within the parasites that trumped the genes in the hosts themselves that normally controlled their actions.

Thirty-two years later, scientists are finally opening the black box of parasite mind control. Frederic Libersat of Ben-Gurion University and his colleagues, for example, are dissecting the sinister attacks of the jewel wasp, Ampulex compressa. The wasp stings a cockroach, transforming it into a passive zombie. The wasp can then walk its drugged victim into a burrow by the roach’s antenna, like a dog on a leash. The roach is perfectly capable of movement. It just lacks any motivation to move on its own behalf. The wasp lays an egg on the roach’s underside, and the roach simply stands there as the wasp larva emerges from the egg and digs into its abdomen.

What is the secret hold that the wasp has over its victim? Libersat and his colleagues have found that the wasp delicately snakes its stinger into the roach’s brain, sensing its way to the regions that initiate movements. The wasp douses the neurons with a cocktail of neurotransmitters, which work like psychoactive drugs. Libersat’s experiments suggest that they tamp down the activity of neurons that normally respond to danger by prompting the cockroach to escape.

যারা মনে করেন ‘সেলফিশ জিন’ বইটিতে ডকিন্স যা লিখেছিলেন তা কেবলই ধারনা, কল্পকথা কিংবা বড়জোর স্রেফ একাডেমিক ‘তত্ত্বকথা’, তাদের আমি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো (এখানে এবং এখানে) পড়ে দেখতে বলব। ডকিন্সের সেসমস্ত যুগান্তকারী ধারণার প্রমাণ যে বিজ্ঞানীরা হাতে কলমে পেতে শুরু করেছেন, তা এই প্রবন্ধগুলো থেকে স্পষ্ট হয়। ব্যাপারটি আমি আলোচনায় আনছি এ কারণেই যে আমার ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটিও রিচার্ড ডকিন্সের মেমেটিক্স এবং এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপের ধারণার উপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছিল। প্রাসঙ্গিক কারণে ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারটাকেও সে কাঠামোতে ফেলেই যাচাই করা হয়েছে। আমি জানি, বিশ্বাসকে ভাইরাসের সাথে তুলনা করলে অনেকেই রাগ করেন, কিন্তু বিশ্বাসের সাথে যে ভাইরাসের প্রবল সাযুজ্য আছে তা তো মিথ্যে নয়। বরং ব্যাপারটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আর গুরুত্বপূর্ণ বলেই মিম এবং মিমপ্লেক্স নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে গবেষণাপত্র লিখছেন, জনপ্রিয় বইপত্র প্রকাশ করছেন। সুসান ব্ল্যাকমোরের ‘মিম মেশিন’[8], ডেনিয়েল ডেনেটের ‘ব্রেকিং দ্য স্পেল’[9], রিচার্ড ব্রডির ‘ভাইরাস অব মাইন্ড’[10] কিংবা ডেরেল রে’র ‘দ্য গড ভাইরাস’[11] কিংবা ক্রেগ জেমসের ‘দ্য রিলিজিয়ন ভাইরাস’[12] শিরোনামের বইগুলো সেই সাক্ষ্যই দেয়। আমার বইটি কোন আকাশ কুসুম কল্পনা নয়, কিংবা নয় কোন নতুন কিছু, বরং বইটি আধুনিক কালের বিজ্ঞানীদের ধ্যান ধারণা,কষ্টার্জিত জ্ঞান এবং এ সংক্রান্ত প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করেই লেখা।

চিত্র: সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু গবেষক, বিজ্ঞানী এবং লেখক উগ্র ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ‘ভাইরাস’ এবং ‘মেমপ্লেক্স’ এর সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছেন।

বিশ্বাসের ভাইরাস

আমি আমার বইয়ে প্রশ্ন করেছি, দীর্ঘদিনের জমে থাকা প্রথাগত বিশ্বাসগুলোও কি অনেকটা ভাইরাসের মতো কাজ করে না? ধর্মের ফ্যানাটিক সেবকেরা অনেকটা প্যারাসাইটাক্রান্ত জম্বিদের মতোই তাদের বিশ্বাস রক্ষার জন্য প্রাণ দেয়, বিধর্মীদের হত্যা করে, টুইন টাওয়ারের উপর হামলে পড়ে, সতী নারীদের পুড়িয়ে আত্মতৃপ্তি পায়, বেগানা মেয়েদের পাত্থর মারে…। এগুলো আমরা হরহামেশাই সমাজে দেখি। এক ভদ্রলোকের শেয়ার করা পোস্ট থেকে গতকাল দেখলাম এই ভিডিওটি। এক সুইসাইড টেরোরিস্টকে গ্রেফতার করেছে পার্শ্ববর্তী দেশের সেনাবাহিনী। সেই বোমাবাজ-সন্ত্রাসীকে প্রশ্ন করা হয়েছে তাকে যদি ছেড়ে দেয়া হয় তবে আবারো তিনি টেরোরিজমের মাধ্যমে মানুষ মারবেন কিনা। টেরোরিস্ট উত্তর দিয়েছেন হ্যা, আল্লাহর ইচ্ছায় অবশ্যই তিনি আবারো জিহাদে যাবেন। মানুষের উপর হামলা করবেন। তিনি জিহাদের নামে সাধারণ মানুষ হত্যাকে মোটেই অন্যায় মনে করেন না। এমনকি শিশু হত্যা করতেও তার বুক কাঁপে না। যারা জিহাদ সমর্থন করে না, তাদের সবাইকেই বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া জায়েজ আছে তাঁর কাছে। প্রশ্নকর্তা একসময় বাধ্য হয়ে সেই বোমাবাজকে জিজ্ঞাসা করলেন বাসায় তার মা বোন আছে কিনা, তিনি বিয়ে করেছেন কিনা ইত্যাদি। জিহাদি বোমাবাজ জবাবে যা বললেন, তা একেবারে মণিমুক্তা। তিনি স্পষ্ট করে বললেন যে, তার বিয়ে করার দরকার নেই। কারণ, পরকালে তার জন্য বাহাত্তরটি হুরি তো অপেক্ষা করেই আছে:

যারা ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভাইরাসের সাথে সংযুক্ত করতে নারাজ কিংবা দ্বিধান্বিত থাকেন, তাদের উপরের এই ভিডিওটি বারে বারে দেখা উচিৎ। মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কতটুকু ভাইরাসাক্রান্ত হলে কাল্পনিক হুরির নেশায় জিহাদ কতল কোন কিছু করতেই তাদের বাঁধে না। মনোবিজ্ঞানী ডেরেল রে তার ‘The God Virus: How religion infects our lives and culture’ বইয়ে সে জন্যই বোধ হয় বলেছেন,

‘জলাতঙ্কের জীবাণু দেহের ভিতরে ঢুকলে যেমন মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বিকল হয়ে যায়, ঠিক তেমনি ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোও মানুষের চিন্তা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তৈরি হয় ভাইরাস আক্রান্ত মননের’।

ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, এ ধরণের ভাইরাস আক্রান্ত মনন কেবল এই একটি দুটি নয়, অজস্র। আর বলতে দ্বিধা নেই, তাদের এই মস্তিস্ক-সংক্রমণের মূল উৎস ধর্ম তথা ধর্মীয় জিহাদি শিক্ষা। নেমাটোমর্ফ হেয়ারওয়ার্ম যেমনি ভাবে ঘাস ফড়িংকে আত্মহত্যায় পরিচালিত করে, ঠিক তেমনি ধর্মের বিভিন্ন আক্রমণাত্মক বাণী এবং জিহাদি শিক্ষা মানব সমাজে অনেকসময়ই ভাইরাস কিংবা প্যারাসাইটের মত সংক্রমণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী করে তলতে পারে, এবং করেও। নাইন-ইলেভেনের বিমান হামলায় উনিশ জন ভাইরাস আক্রান্ত মনন ‘ঈশ্বরের কাজ করছি’ এই প্যারাসাইটিক ধারণা মাথায় নিয়ে হত্যা করেছিলো প্রায় তিন হাজার সাধারণ মানুষকে। হিন্দু ফ্যানাটিকেরা আবার ‘রাম জন্মভূমি’র অতিকথন বুকে নিয়ে ধ্বংস করেছিল প্রাচীন বাবরি মসজিদ। গুজরাতে লাগিয়েছিল নৃশংস দাঙ্গা। এ ধরণের উদাহরণ অনেক। পেশোয়ারেও আমরা দেখলাম, স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তালিবানেরা সাক্ষীগোপাল হিসেবে উপস্থাপন করেছে সহী বুখারির হাদিস এবং নবী মুহম্মদের কিছু কাজ কারবার। সারা বিশ্ব এতে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে এই ঘটনার পর পরই। কিন্তু পাকিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানকে ‘অনৈসলামিক’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামাবাদের বহুল আলোচিত লাল মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল আজিজ। তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন এই বলে, ‘হয়তো ভারত, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আলেমদের ডেকে আনবেন। কিন্তু এই অভিযান যে অনৈসলামিক, তা আমি তাঁদের প্রমাণ করে দেব’[13]। এগুলো সব মূলধারার পত্র-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছে। আমি হাওয়া থেকে কিছু লিখিনি, এসংক্রান্ত ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের কাজ, তাদের একাডেমিক বইপুস্তক, জার্নাল থেকেই রেফারেন্স দিয়েছি। উদাহরণ এবং অভিমত টানা হয়েছে সমাজে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনাগুলো থেকেই।

চিত্র: বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, নেমাটোমর্ফ হেয়ারওয়ার্ম নামে এক প্যারাসাইটের সংক্রমণে ঘাস ফড়িং পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে (বামে), ঠিক একইভাবে বিশ্বাসের ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত আল-কায়দার ১৯ জন সন্ত্রাসী যাত্রীবাহী বিমান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো টুইন টাওয়ারের উপর ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর (ডানে)।

চিত্র: হিন্দু মৌলবাবাদীরা একসময় ভারতে  রাম-জন্মভূমি মিথ ভাইরাস বুকে লালন করে ধ্বংস করেছে শতাব্দী প্রাচীন বাবরি মসজিদ।

ইকনিউমেন (Ichneumon) প্রজাতির একধরণের প্যারাসিটোয়েড বোলতা আছে। এরা স্বভাবে খুব অদ্ভুত। অদ্ভুত না বলে নিষ্ঠুর বলাই বোধ হয় সঠিক হবে। এই বোলতাগুলো হুল ফুটিয়ে শুঁয়োপোকাকে প্যারালাইজড করে ফেলে এবং সেটার দেহের ভিতরে ডিম পাড়ে । অর্থাৎ, শিকারকে সরাসরি হত্যা না করে দৈহিকভাবে অবশ করে দিয়ে সেই শিকারের দেহকে ব্যবহার করে প্রজন্ম তৈরিতে। এই ডিম ফুটে যে শূককীট বের হয়, তা শিকারের দেহের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খেয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। স্ত্রী বোলতাগুলো তার শিকারের প্রত্যেকটি স্নায়ু গ্রন্থি সতর্কতার সাথে নষ্ট করে দেয় যাতে তাদের শিকার পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে। ডকিন্স এই ইকনিউমেন প্রজাতির বোলতার উদাহরণটিকে তার গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি রবিন উইলিয়ামসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘এই প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখলেই বোঝা যায় যে পরম করুণাময় ঈশ্বরের মতো কোন পরিকল্পনাকারী দ্বারা এই মহাবিশ্ব তৈরি হলে তিনি একজন স্যাডিস্টিক বাস্টার্ড ছাড়া আর কিছু হবেন না’ । এই ঢালাও নিষ্ঠুরতা দেখে এক সময় বিচলিত হয়েছিলেন চার্লস ডারউইনও। তিনি প্যারাসিটোয়েড বোলতাগুলোর বীভৎসতা দেখে মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন –

‘আমি ভাবতেই পারিনা, একজন পরম করুণাময় এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কোন ঈশ্বর এইভাবে ডিজাইন করে তার সৃষ্টি তৈরি করেছেন যে, ইকনিউমেনগুলোর খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য একটি জীবন্ত কিন্তু প্যারালাইজড শুঁয়োপোকার প্রয়োজন হয়’।

প্যারাসাইটিক ধর্মগুলো তার অনুসারীদের কাছ থেকে ইকনিউমেন প্যারাসিটোয়েড বোলতার মতোই যেন সবকিছু শুষে নেয়। দেখা যায় একটি বিশেষ ধর্মের অনুসারী বান্দারা তাদের আরাধ্য এই প্যারাসাইটিক ধর্মটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বহু কিছুই করে থাকে – দিনে একাধিকবার প্রার্থনা করা, প্রতি সপ্তাহে একবার হলেও উপাসনালয়ে যোগদান করা, যতদূর সম্ভব ধর্মীয় আইন-কানুন-রীতি-নীতি মেনে চলার চেষ্টা করা, পাশাপাশি অন্য ধর্মের সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ঈমান শক্ত করা, বহু টাকা খরচ করে মন্দিরে পশুবলি বা কোরবানি দেয়া,খৎনা করা, হিজাব পরা, টিকি রাখা, দাঁড়ি রাখা, মৃত্যুর আগে মক্কা, মদিনা, কাশী গয়া পুরীর মতো পূণ্যস্থানে ভ্রমণ করা, চারপাশে আর দশজনকেও একই ধারণায় সংক্রমিত করতে চেষ্টা করা ইত্যাদি। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সায়েন্টোলজি, মরমন, জেহোভাস উইটনেস, হরেকৃষ্ণ, ইউনিফিকেশন চার্চ, ড্রুজ, ইয়াজাদি, অমিসসহ সকল ধর্ম এবং কাল্টই একই কায়দায় তাদের অনুসারীদের মস্তিষ্ককে সংক্রমিত করে, এবং করে আসছে। গোত্রাধিপতিদের কথাকে শিরোধার্য করে তার একনিষ্ঠ অনুগামীরা বিধর্মীদের হত্যা, ডাইনী পোড়ানোতে কিংবা সতীদাহে মেতে উঠে, কখনো গণ-আত্মহত্যায় জীবন শেষ করে দেয়, এমন উদাহরণ কিন্তু কম নয়। জোন্সটাউন ম্যাসাকার (১৯৭৮), সোলার টেম্পল (১৯৯৪-১৯৯৭), হেভেন্স গেট (১৯৯৭) সহ বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ আমরা অনেকেই জানি, যেখানে গোত্রাধিপতির কিংবা ধর্মগুরুর কথায় তাদের মুরিদেরা হাসিমুখে আত্মাহুতি দিয়েছিল নিজস্ব বিশ্বাসকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। এর পেছনে কারণ কি, সেটা জানতে হলে আমাদের একটু জিন, মিম এবং মেমেটিক্স ইত্যাদি সম্বন্ধে দু’চার কথা বলে নিতে হবে।

জিন এবং মিম

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘জিন’ বংশগতির ক্ষুদ্রতম একক। জিনের মধ্যে থাকে সংরক্ষিত তথ্য। জীববিজ্ঞানের বইয়ে জিনের যে ছবি দেয়া থাকে, তা থেকে দেখা যায় জিন ডিএনএ’র নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। ডিএনএ তা হলে কি? সোজা কথায় ডিএনএ হচ্ছে চারটি ভিন্ন প্রকৃতির নিউক্লিওটাইডে তৈরি অণু, যাদের বিন্যাস জীবের জিনগত বৈশিষ্ট্যের নিয়ামক। আমার মাথায় কোঁকড়া চুল থাকবে না টাক থাকবে, গায়ের রঙ কালো হবে না সাদা, সেটা জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলোই নির্ধারণ করে দেয়। এখন, ডিএনএর ক্ষেত্রে আমরা তথ্য বলতে যেটাকে বুঝি সেটা আসলে ‘রাসায়নিক নির্দেশাবলী’। এই নির্দেশাবলী থেকেই কিন্তু কোষ বুঝতে পারে কিভাবে কিছু বিশেষ ধরণের প্রোটিন তৈরি করা যাবে, যার ফলে দেহের উপাদানগুলো টিকে থাকতে পারে। এই নির্দেশাবলীকেই চলতি ভাষায় ‘ব্লুপ্রিন্ট’ বা নীলনকশা বলা হয়, যদিও কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন ‘রেসিপি’ শব্দটাই বরং এক্ষেত্রে অধিকতর সঠিক[14]। তবে এর বাইরে আরেকটি ব্যাপার থাকে যেটা ছাড়া পুনরাবৃত্তি বা কপির ব্যাপারটা ঘটবে না। মোটিভেশন বা প্রেষণা। এটা এক ধরনের প্রোগ্রামের মত, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে নিজেকে পুনরাবৃত্তির জন্য পরিচালিত করে।

জিনের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাসের তুলনা করলে দেখা যায়, সেটাও কাজ করে অনেকটা একই রকমভাবেই। ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার আচরণের মধ্যেও নানা তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। আর থাকে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী, যে নির্দেশাবলীকে ঐশ্বরিক মনে করে পালন করে যায় এর অনুগত সেবকেরা। সেবকদের সেই বিশ্বাসগুলো ছড়িয়ে দেবার পেছনেও থাকে মোটিভেশন বা প্রেষণা।

DNA-genes-radio-controlled-চিত্র: বর্ধিত স্কেলে দেহকোষ, ক্রোমোজোম, ডিএনএ এবং জিন

বিশ্বাস বা ধ্যান ধারণা ছড়ানো এবং জিনের প্রতিলিপির মাঝে যে দারুণ একটা সাদৃশ্য আছে, সেটা প্রথম নজরে পড়ে খ্যাতনামা বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্সের। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, বিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি অনেকটা জিনের পুনরাবৃত্তির মতোই। তিনি এর নামকরণ করেন, ‘mnemonic gene’ বা সংক্ষেপে meme (মিম)[15]। ডকিন্স তার সেলফিশ জিন বইয়ে লেখেন[16],

‘আমাদের এই নতুন রেপ্লিকেটরের জন্য একটা নাম দরকার। একটি বিশেষ্য – যা সাংস্কৃতিক প্রবাহের একক কিংবা অনুকরণের একক হয়ে উঠবে। মিমিম (Mimeme)-এর একটি গ্রীক উৎস আছে, কিন্তু আমার দরকার এমন এক মনোসিলেবল শব্দ যা কর্ণকুহরে জিনের মত ধ্বনি তুলবে। আমার মনে হয় আমার বোদ্ধা-বন্ধুরা আমায় ক্ষমা করতে পারবেন যদি আমি মিমিমকে মিম (meme) নামে ডাকি’।

বস্তুত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উপর ভিত্তি করেই এই মিমের ধারণা দাঁড় করিয়েছিলেন ডকিন্স। ডারউইনের বহু আগে থেকেই অবশ্য বিজ্ঞানীরা জানতেন, বিশ্বজগতের অনেক কিছুকে আমরা আলাদা আলাদা নামে জানলেও এরা আসলে একই অবস্থার রকমফের। যেমন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তার বিখ্যাত E= mc^2  সমীকরণের সাহায্যে দেখিয়েছেন, ভর এবং শক্তিকে আমরা আলাদা মনে করলেও এরা আসলে একই জিনিস। আইনস্টাইনের আগে বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে এবং জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল বুঝেছিলেন যে তড়িৎ এবং চুম্বকত্ব আসলে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ ছাড়া কিছু নয়। ষাটের দশকে আব্দুস সালাম, স্টিভেন ওয়েনবার্গ, এবং শেলডন গ্লাসোও আমাদের দেখিয়েছিলেন ‘তাড়িতচৌম্বক’ বল এবং ‘দুর্বল নিউক্লিয়’ বলকেও একই সুতায় গাঁথা যায়। এদেরকে এখন অভিহিত করা হয় ‘তাড়িত দুর্বল’ বল নামে। এমনকি এদের অনেক আগে রেনে ডেকার্ট এবং পিয়েরে দ্য ফার্মা আমাদের জানিয়েছিলেন, বীজগণিত এবং জ্যামিতি – জ্ঞানান্বেষণের দুটি শাখা হিসেবে বিবেচিত হলেও তারা আসলে একই কথাই বলছে, যদি তাদের সমাধানগুলো পরখ করে দেখা হয় অভিনিবেশ সহকারে। কাজেই উপরের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুটি ধারণা কিংবা বিষয়কে আলাদা ভাবা হলেও কোন না কোন চিন্তাশীল মনন এসে আমাদের জানিয়ে দিয়ে গেছেন বিষয়গুলো আসলে ভিন্ন নয়।

রিচার্ড ডকিন্সও জিন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনুধাবন করলেন যে, জিনের মধ্যে যে তথ্যের রূপান্তর এবং পুনরাবৃত্তি ঘটে, সেরকমটি ঘটে মানব সমাজের সংস্কৃতির মধ্যেও। দেহ থেকে দেহান্তরে যেমন জিনের প্রতিলিপি ঘটে, ঠিক তেমনি মন থেকে মনান্তরে প্রতিলিপি ঘটে চলে মিমের। ঘটে সংস্কৃতির বিবর্তন। এই বিবর্তনের সবকিছুই উপকারী তা নয়। বহু অপকারি এবং ক্ষতিকারক অপবিশ্বাসও ছড়ায়, টিকে থাকে যেভাবে প্রকৃতিতে টিকে থাকে বহু অপকারী অণুজীব। আসলে এ সব বিশ্বাসের প্রসার ঘটে অনেকটা ভাইরাসের মতো করে। রিচার্ড ডকিন্স এ ধারনাটিকে জনপ্রিয় করলেও ব্যাপারটা রিচার্ড ডকিন্সেরও আগে নজরে পড়েছিল বিজ্ঞানী এফ. টি. ক্লোকের। তিনি মিম শব্দটি তৈরির অনেক আগেই একে ‘সাংস্কৃতিক নির্দেশাবলী’ (cultural instruction) হিসেবে চিহ্নিত করেন। ক্লোক তার ১৯৭৫ সালে লেখা একটি গবেষণাপত্রে অভিমত দেন, ‘এই সাংস্কৃতিক নির্দেশাবলী আসলে প্যারাসাইটের মতোই পরাশ্রয় বা হোস্টের ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। অনেকটা হাঁচির মাধ্যমে ফ্লু ভাইরাস যেমন ছড়ায়- ঠিক তেমনিভাবে এটি প্রোপাগেট করে। সর্বোত্তম ক্ষেত্রে আমরা হয়তো তাদের সাথে একটা সিম্বায়োটিক সম্পর্কে পৌঁছে যাই, আর নিকৃষ্টতম পরিস্থিতিতে আমরা হয়ে উঠি তার সেবাদাস’[17]

১৯৭৬ সালে ‘সেলফিশ জিন’ বইটি লেখার সময় অধ্যাপক ডকিন্স ক্লোকের এই ‘সাংস্কৃতিক নির্দেশাবলী’র ব্যাপারটা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। ডকিন্স অভিমত দেন যে ক্লোক আসলে আমাদের ব্রেনে থাকা মিমকেই তার ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। ডকিন্স অবশ্য ধারনাটিকে অনেক বিস্তৃত করেন, একে জিনের অনুরূপ ‘দ্বিতীয় রেপ্লিকেটর’ হিসেবে চিহ্নিত করেন, চিহ্নিত করেন সাংস্কৃতিক বিবর্তনের চালিকা-শক্তি হিসেবে। পরে সুসান ব্ল্যাকমোর তার ‘মিম মেশিন’ বইয়ে এই ‘দ্বিতীয় রেপ্লিকেটর-এর ধারনাটিকে বিস্তৃত করেন চারপাশের সাধারণ সব উদাহরণের মাধ্যমে। এই তবে সেখানে যাবার আগে সাধারণ পাঠকদের জন্য একটু বিবর্তন নিয়ে আলোচনা সেরে নেয়া যাক।

বিবর্তন ব্যাপারটা আসলে কী? সাদামাঠা ভাবে বিবর্তন বলতে আমরা বুঝি পরিবর্তনকে। আমরা নানারকম পরিবর্তনের সাথে এমনিতেই পরিচিত। প্রকৃতির নানা রকম পরিবর্তন আমরা হর-হামেশাই দেখি। ভূত্বকের পরিবর্তন হয়, নদী নালা, খাল বিল শুকিয়ে যায়, অগ্ন্যুৎপাতে শহর ধ্বংস হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে, গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এ অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলে যায়, কিংবা সুপারনোভা বিস্ফোরণে গ্রহাণুপুঞ্জ ধ্বংস হয় – এসব উদাহরণের সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। কিন্তু এগুলো সবই জড়জগতে পরিবর্তনের উদাহরণ। জীবজগতকে অনেকদিন ধরেই রাখা হয়েছিলো সমস্ত পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। কারণ মনে করা হত ঈশ্বরের সৃষ্টি জীবজগৎ সর্বাঙ্গীণ সুন্দর, আর নিখুঁত। তাই এদের কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সকল জীব, সকল প্রজাতি সুস্থির, আবহমান কাল ধরে অপরিবর্তিত আছে এবং থাকবে। ডারউইন এবং ওয়ালেসের প্রস্তাবিত বিবর্তনতত্ত্ব মূলতঃ জীবজগতের অপরিবর্তনীয়তার এই মিথটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাদের তত্ত্বই প্রথমবারের মত বৈজ্ঞানিকভাবে দেখিয়েছে যে জীবজগতও আসলে স্থির নয়, জড়জগতের মত জীবেরও পরিবর্তন হয়, যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পরিবর্তনের হার খুবই ধীর। জীববিজ্ঞানে একে অভিহিত করা হয় জৈব বিবর্তন নামে।

কীভাবে বিবর্তন কাজ করে? এটা বলতে গেলেই কিন্তু চার্লস ডারউইনের অবদানের কথা সামনে এসে পড়বে। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’ নামে যে গ্রন্থ রচনা করেন, তাতে তিনি প্রথমবারের মত ব্যাখ্যা করেন প্রকৃতিতে বিবর্তন ঠিক কীভাবে ঘটছে। বিবর্তনের পিছনে চালিকা শক্তি হল প্রাকৃতিক নির্বাচন’ বা ন্যাচারাল সিলেকশন বলে একটা ব্যাপার। প্রাকৃতিক নির্বাচন ব্যাপারটা কিন্তু ভারি মজার। রোমান্টিক ব্যক্তিরা হয়ত এতে রোমান্সের গন্ধ পাবেন। জীব জগতে স্ত্রীই হোক আর পুরুষই হোক কেউ হেলা ফেলা করে মেশে না। মন-মানসিকতায় না বনলে, প্রকৃতি পাত্তা দেবে না মোটেই। প্রকৃতির চোখে আসলে লড়াকু স্ত্রী-পুরুষের কদর বেশী। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃতি যোগ্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে বেছে নেয় আর অযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাতিল করে দেয়, ফলে একটি বিশেষ পথে ধীর গতিতে জীবজন্তুর পরিবর্তন ঘটতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ডারউইন বুঝেছিলেন, রেপ্লিকেশন, মিউটেশন এবং ভ্যারিয়েশনের সমন্বয়ে যে সিলেকশন প্রক্রিয়া চলমান – সেটি জীবজগতের জনপুঞ্জে পরিবর্তনের জন্য দায়ী। তিনি একে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার ফলে প্রজাতির উদ্ভব এবং বিবর্তন ঘটতে থাকে।

ডকিন্স এবং পরবর্তী বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখলেন, মানব সংস্কৃতির বিবর্তনও ঘটে অনেকটা এরকম ডারউইনের দেখানো পথেই। মানব জাতির উন্মেষের পর থেকেই বিভিন্ন ধ্যান ধারণার মধ্যে সংঘাত হয়েছে, প্রতিযোগিতা হয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক ধ্যান ধারণা হারিয়ে গেছে বিস্তৃতির আড়ালে, অনেক ধ্যান ধারণা আবার সফলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। অর্থাৎ সোজা কথায় ধারণার বিস্তারের মধ্যেও জীববিজ্ঞানের মতো রেপ্লিকেশন, মিউটেশন, কম্পিটিশন, সিলেকশন, অ্যাকিউমুলেশন প্রক্রিয়া কাজ করে। ব্যাপারটা এতোটাই চমকপ্রদ যে, বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান লেখক ম্যাট রিডলী এটাকে যৌনসঙ্গমের মাধ্যমের প্রজাতির বিস্তারের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি তার সাম্প্রতিক ‘The Rational Optimist’ বইটার প্রথম অধ্যায়টার নামই রেখেছেন ‘When Ideas Have Sex’। সেখানে তিনি সংস্কৃতির বিবর্তনের উদ্ভবের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন[18] – ‘The answer, I believe, is that at some point in human history, ideas began to meet and mate, to have sex with each other’. ম্যাট রিডলির চমৎকার একটা আলোচনা আছে একই শিরোনামে [When ideas have sex] টেড টকে, সেটাও দেখে নেয়া যেতে পারে:

httpv://www.youtube.com/watch?v=OLHh9E5ilZ4

যৌনতার ব্যাপারটা ‘মেটাফোরিক সেন্সে’ হলেও ধ্যান ধারণাগুলো কিভাবে বিস্তার করে এবং স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে ফেলে সেটা কিছুটা হলেও বোঝা যায় এ সকল আলোচনা থেকে।

 

মিম এবং মেমেটিক্সের কিছু সমস্যা এবং তার উত্তর

এখন কথা হচ্ছে – জিনের মতোই মিম কাজ করে, এটা আমরা বলছি। কিন্তু একথার বলার মানে এই নয় যে জিন এবং মিম পুরোপুরি এক হতে হবে। আসলে জিন শব্দটা থেকেই বুৎপত্তি লাভ করে মিম এসেছে বলে অনেকে ধরে নেন মিমের গঠন, প্রকৃতি, কাজ কারবার সবকিছুই জিনের শতভাগ সমরূপ হবে। কিন্তু তা আসলে নয়। সুসান ব্ল্যাকমোর তাঁর ‘মিম মেশিন’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন জিনের মতোই মিম কেবল একটি রেপ্লিকেটর, কিন্তু তারপর মিমের কর্মপদ্ধতির অনেক কিছুই আসলে জিন থেকে ভিন্ন। তিনি তার বইয়ে পরিস্কার করেই বলেন (মিম মেশিন, পৃঃ):

‘আমরা অ্যানালজি হিসেবে জিনকে ব্যবহার করতে পারি, কিন্তু মিম এবং জিনকে একই ভাবা খুব ভুল হবে। এর চেয়ে বরং আমাদের বিবর্তনতত্ত্বের মৌলনীতির (Fundamental Principles of Evolutionary Theory) উপরেই নির্ভর করতে হবে যেটা মিমের কাজ বুঝার জন্য আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে’।

এ সহজ ব্যাপারটা সবাই সহজে বুঝতে না পারার ফলে এবং মিমের বুৎপত্তিগতভাবে একটা ‘বায়াস’ থেকে যাবার ফলে এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। শুরু হয়েছিল ভুল প্রশ্ন এবং ভুল ব্যাখ্যা করার উৎসব। মিমের প্রকৃতি না বুঝলে ছুড়ে দেয়া প্রশ্ন আসলে ভুল দিকে চলে যেতেই পারে। সেজন্যই পারভেজের এবং সেই সাথে নাস্তিকের ধর্মকথারও কিছু প্রশ্ন একেবারেই ভুল দিকে চলে গেছে। পারভেজ তো করেছেনই, নাস্তিকের ধর্মকথাও করেছেন। জিনের প্রমাণ আছে, কিন্তু মিমের অস্তিত্বের কি কোন প্রমাণ আছে? পিঁপড়ার মাথায় প্যারাসাইটিক সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, বিশ্বাসীদের মাথায় কি সে ধরনের কোন আলামত আছে? প্রশ্নের ছক ঘোরাফেরা করছে অনেকটা এ চক্রেই। কিন্তু তারা হয়তো জানেন না যে সংক্তান্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হয়েছে অনেকে আগেই। যেমন, সুসান ব্ল্যাকমোরের লেখা ‘মিম মেশিন’ বইটির পঞ্চম অধ্যায়টির নাম ‘থ্রি প্রবলেমস উইথ মিমস’। এই অধ্যায়ে মিম সংক্রান্ত এ ধরণের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন লেখিকা। বইটির ভূমিকায় জুয়ান ডেলিয়াসের একটি কাজের উল্লেখ করে অধ্যাপক ডকিন্স লেখেন,

‘জিন আবিষ্কার করতেই মানুষের বহুদিন লেগেছে। মিমের জগৎ এখনো তাদের ওয়াটসন এবং ক্রিককে খুঁজে পায়নি, এমনকি অভাববোধ করছে তাদের মেন্ডেল-এরও। যেখানে জিনের সঠিক অবস্থান সুচারুভাবে ক্রোমোজমের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে সেখানে মিমের অবস্থান ধারনা করা হয় রয়েছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। জিনের চেয়ে মিম খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম (যদিও নিউরোবায়োলজিস্ট হুয়ান ডেলিয়াস তার একটি গবেষণাপত্রে আমাদের একটি ছবি দিয়েছেন মিম পাওয়া গেলে তা দেখতে ঠিক কি রকমের হতে পারে)’।

আমি জানি না মিমের ভৌত অস্তিত্ব সত্যই কখনো প্রমাণিত হবে কিনা। হুয়ান ডেলিয়াসের মত বিজ্ঞানীরা হয়তো আশাবাদী, কিন্তু আমি মনে করি সেটা পাওয়া না গেলেও সমস্যা নেই। হিগস কণা প্রাপ্তির বহু আগে থেকেই বিগ ব্যাং এর প্রমিত মডেলের সঠিকতা সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা নিঃসন্দেহ ছিলেন। কারণ, এই মডেলের সাহায্যে মহাবিশ্বের রহস্যের অনেক কিছু সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যা পূর্ববর্তী অন্য মডেলে অনুপস্থিত ছিল। প্রকৃতির চারটি মৌলিক বলকে একসূত্রে গাঁথথে সক্ষম হয়েছে স্ট্রিং তত্ত্ব, আমরা সবাই তা জানি। কিন্তু সবাই এটাও জানে যে, স্ট্রিং এর খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি পরীক্ষণের মাধ্যমে। কিন্তু পাওয়া যায়নি বলেই কেউ সেটাকে অবৈজ্ঞানিক বলে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, কারণ স্ট্রিং তত্ত্বের সাহায্যে অনেক কিছু ব্যাখ্যা দেয়া যাচ্ছে যা অন্য অনেক মডেল দিয়ে সম্ভব হচ্ছে না। ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়, আমরা সেগুলো ‘প্রত্যক্ষভাবে’ পর্যবেক্ষণ করতে পারিনি, কিন্তু প্রমিত মডেলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সেগুলো। আমার মতে মিমতত্ত্বের সাহায্যেও বিশ্বাসের বিস্তার এবং সংক্রমণের এমন কিছু দিক স্পষ্ট করা গেছে যা পূর্ববর্তী অন্য অনেক মডেলেই সেটা সম্ভব হয়নি। আর তাছাড়া জিনের ক্ষেত্রেও যদি ধরি, তাহলে আমরা দেখব ডেনিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী উইলহেম জোহানসেন যখন প্রথম ইংরেজি ভাষায় ‘জিন’ শব্দটির প্রস্তাব করেছিলেন, তখন ব্যাপারটার অর্থ সর্বসাধারণের মাঝে একই রকম ছিল না। একেকজন একেক রকম অর্থ বুঝতেন। এমনকি একই ব্যক্তিও কনটেক্সট অনুযায়ী ভিন্নরকম অর্থ করতেন[19]। এমনকি আজকের দিনেও জিনের গাঠনিক একক রসায়ন ইত্যাদি নিয়েও কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ আছে, বিশেষ করে জেনেটিসিস্ট এবং মলিকিউলার বায়োলজিস্টরা জিনের একক নিয়ে ঐকমত পোষণ করেন না[20]। কিন্তু কেউ যদি বলে যেহেতু জিনের এককের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারা যাচ্ছে না, অতএব পুরো জেনেটিক্সই বাতিলের খাতায়, তাহলে যেমন শোনাবে, মিম এবং মেমেটিক্স নিয়ে পারভেজদের উপসংহারগুলোও তেমনই।

আমার বইয়ের বক্তব্য এবং প্রবন্ধগুলো মিমের ভৌত অস্তিত্ব প্রাপ্তির উপর নির্ভরশীল ছিল না। আমি কোন গাণিতিক প্রমাণ বা ল্যাবওয়ার্কের উপর গবেষণাগ্রন্থ লিখিনি, লিখেছি একটি জনপ্রিয় ধারার বই যেখানে বিশ্বাসের সংক্রমণকে ভাইরাসের মাধ্যমে, অর্থাৎ একটা রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে – ইংরেজিতে যাকে বলে ‘মেটাফর’। মেটাফর হলেও আমি মনে করি এটি খুব শক্তিশালী মেটাফর। কেউ বাস্তবতা বলে স্বীকার না করলেও অন্ততঃ বাস্তবতার খুব কাছাকাছি বলে তাকে মেনে নিতেই হবে। রিচার্ড ডকিন্স ব্যাপারটা সেলফিশ জিনে তো বলেছিলেনই, বলেছিলেন তার একটি পেপারেও। ‘ভাইরাসেস অব দ্য মাইন্ড’ (১৯৯১) নামের এ পেপারটি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের ওয়েব সাইটে পাওয়া যাবে অনলাইনে[21]। পরে এ ধরনের অনেক পেপারই লেখা হয়েছে। ডকিন্স নিজেও কিছু জার্নালে এবং বইয়ে তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেন[22]। লেখা হয়েছে ভিন্ন লেখকের অনেক বইও। সেসব বইয়ের লেখকদের অনেকেই ধারণাটিকে শক্তিশালী এবং সফল বলে রায় দিয়েছেন। যেমন মনোবিজ্ঞানী ডেরেল রে তার ‘The God Virus: How Religion Affects Our Lives and Culture’ বইয়ে (পৃষ্ঠা ১৩) এ প্রসঙ্গে বলেন[23],

‘স্পিনোজা থেকে ভলতেয়ার,ফুয়েরবাক থেকে মার্ক্স পর্যন্ত অনেকেই ধর্ম নিয়ে এবং সমাজে এর ভূমিকা নিয়ে ভেবেছেন। কিন্তু রিচার্ড ডকিন্সের ‘ভাইরাসেস অব দ্য মাইন্ড’ রচনাটির আগে জৈববৈজ্ঞানিকভাবে ধর্মের মডেলকে এত পরিস্কারভাবে বোঝা যায় নি, বোঝা যায়নি কিভাবে এটি এপিডেমিওলজির প্রেক্ষাপটে অনেকটা ফ্লু-ভাইরাসের মতোই মানুষকে সংক্রমিত করে’।

কাজেই শক্তিশালী মেটাফর এবং তুলনার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে, বিশেষত সেটা যদি বাস্তবতাকে এত লাগসই ভাবে তুলে ধরতে পারে। কার্ল মার্কস এক সময় ধর্মকে অপিয়ামের সাথে তুলনা করেছিলেন। ধর্মের সম্মোহনী শক্তি বোঝাতেই এটা করেছিলেন তিনি। এখন কেউ যদি এর সমালোচনায় লেখে, অপিয়াম হচ্ছে এলকালয়িড গ্রুপের একটা ড্রাগ – যে গ্রুপে আছে মরফিন এবং কোডিন। ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে এগুলো মস্তিস্কের স্নায়ুকে বিকল করতে পারে। কিন্তু ধর্মকে কি ল্যাবে পরীক্ষা করে এরকম কিছু পাওয়া গেছে? অপিয়ামের রাসায়নিক উপাদান বাস্তবে পাওয়া গেছে, ধর্মের ক্ষেত্রে কি সেরকম কিছু পাওয়া গেছে? এ ধরনের প্রশ্ন কেউ শুরু করলে পুরো ব্যাপারটা হাস্যকর লেভেলে চলে যাবে। সেটাই গেছে। ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ কথিত ধার্মিক ব্যক্তির মস্তিষ্কে থাকা সেই ভাইরাসের এধরণের কোন প্রমাণাদি কি আছে?’ আমার কাছে এ অনেকটা সেরকমের হাস্যকর প্রশ্ন। মার্ক্স যেমন ধর্মকে অপিয়ামের মতো সম্মোহনী শক্তিধারী মনে করেন, আমি মনে করি ধর্ম অনেকটাই ভাইরাসের মতো সংক্রামক। কেন ধর্ম ভাইরাসের মতো সঙ্ক্রামক মুহাম্মদ গোলাম সরোয়ার তাঁর লেখায় [অভিজিৎ রায়ের “বিশ্বাসের ভাইরাস” নিয়ে একটি অপ্রাসঙ্গিক – অবৈজ্ঞানিক সমালোচনার পাঠ প্রতিক্রিয়া] ইতোমধ্যেই খুব ভাল ভাবে দেখিয়েছেন। আমিও আমার বইয়ে এবং প্রবন্ধে মেমেটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা এবং অজস্র উদাহরণ হাজির করেছি। আমার মনে হয় নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য এটুকুই আপাতত যথেষ্ট।

 

ইউনিভার্সাল ডারউইনিজম

লেখার এই পর্যায়ে এসে আমি একটু ডারউইনবাদের সার্বজনীন প্রেক্ষাপট নিয়ে বাড়তি দু’চার কথা বলব। ১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন তাঁর ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’ গ্রন্থের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশ করেন। সে সময় তত্ত্বটি কেবল জৈবজগতের জন্য প্রযুক্ত বলে ভাবতেন বিজ্ঞানীরা। সেই তত্ত্বটি প্রকাশের দেড়শ বছর পরে আজ আর তারা সেভাবে ভাবেন না। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব আজ কেবল সঙ্কীর্ণ জৈব বাস্তবতা নয়, সম্ভবত এটি একটি মহাজাগতিক বাস্তবতা। আমাদের সৌরজগতের পৃথিবী নামের গ্রহটিতে প্রাণের বিকাশ ঘটেছে আমরা জানি। যদি মহাবিশ্বের বুকে অন্য কোন গ্রহে প্রাণের বিকাশ ঘটে থাকে সেটা হয়তো ডারউইনীয় তত্ত্বকে অনুসরণ করেই ঘটবে বলে অনুমান করা যায়। মহাজগতের ব্যাপারটা না হয় বাদ থাকুক, এই পৃথিবীর বুকেও কোন কিছুর বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে ডারউইনীয় কাঠামোতে বিশ্লেষণ করার যে ট্রেণ্ড আজ লক্ষ্য করা যায় তা ডারউইনিজমকে ‘ইউনিভার্সাল’ হিসেবে গ্রহণ করার কারনেই। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব বাজারে আসার পঞ্চাশ বছরের মাথায় আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী জেমস বলডুইন অভিমত দিয়েছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচন ব্যাপারটা কেবল জৈব জগতের নিয়ম নয়, বরং একে গ্রহণ করতে হবে জীবন এবং মননের সর্বত্র প্রয়োগের কথা মাথায় রেখে[24]। এটাই সম্ভবত সূচিত করেছিল ইউনিভার্সাল ডারউইনিজমের প্রথম ভিত্তিমূল। আজ তো আমরা বিবর্তন তত্ত্বের প্রয়োগ এতো জায়গায় লক্ষ্য করি যে, এ নিয়ে আলাদাভাবে কথা বলারই প্রয়োজন বোধ করেননা কেউ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞান, সামাজিক জীববিদ্যা, বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞান, বিবর্তন চিকিৎসাবিদ্যা, বিবর্তনীয় জ্ঞানতত্ত্ব, আণবিক বিবর্তন, বিবর্তনীয় ভাষাতত্ত্ব সহ নানা শাখার উদ্ভব ঘটেছে বিবর্তনের কাঠামোতে এগুলো বিশ্লেষণ করার তাগিদেই। ডারউইনের তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটছে রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি জ্যোতির্বিজ্ঞানেও। কারণ ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের একটি সার্বজনীন অবয়ব আছে।

আসলে ডারউইন ১৮৫৯ সালে অরিজিন অব স্পিশিজ বইটির মাধ্যমে যা প্রস্তাব করেছিলেন তা আসলে ছিল এক ধরণের ‘বিবর্তনীয় এলগোরিদম’। এলগোরিদম ব্যাপারটা প্রোগ্রামিং এর সাথে জড়িত। যারা কম্পিউটার প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করেন, তারা জানেন ইফ-এলস ব্লক (if-else block) যে কোন কম্পিউটার প্রোগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ডারউইনও আসলে এ ধরণের একটা অ্যালগোরিদিমের ‘সুডোকোড’ আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। তিনি প্রজাতির উদ্ভবের পেছনে জানেন ইফ-এলস ব্লকের মতোই এক ধরণের এলগোরিদম প্রস্তাব করেন – যদি এই এই এই … পারিপার্শিক অবস্থা বা ‘কন্ডিশন’ নিষ্পন্ন করে, তাহলে জৈবজগতে প্রজাতির উন্মেষ একটি বাস্তবতা। এভাবেই প্রজাতির উদ্ভব ঘটে, সূচিত হয় জৈবজগতে বিবর্তনের ক্রমধারা।

কিন্তু ডারউইনের বলা সেই ‘ইফ-দেন-এলস’ ব্লকের কন্ডিশনগুলো কি ছিল? ডারউইন খুব সোজাসাপ্টা ভাবে দেখিয়েছেন যে, যদি ‘হেরিডিটি’, ‘ভ্যারিয়েশন’ এবং ‘সিলেকশন’ … প্রক্রিয়াগুলো সিস্টেমে বজায় থাকে, তাহলে প্রজাতির উদ্ভব একটি জৈব বাস্তবতা। এটা এমনিতেই ঘটবে কোন মহাপ্রাক্রমশালী সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই।

ডারউইনের এই বিবর্তনীয় অ্যালগরিদম একেবারেই অন্ধ এবং ‘মাইণ্ডলেস’। রিচার্ড ডকিন্স একে অভিহিত করেছেন ‘ব্লাইণ্ড ওয়াচমেকার’ হিসেবে[25]। প্রকৃতিতে যেটাকে আমাদের ‘ডিজাইন’ বলে মনে হয়, সেরকম বৈশিষ্ট আপনা থেকেই উদ্ভূত হবে যদি এই অ্যালগোরিদম স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে যেতে পারে। ডেনিয়েল ডেনেট এ ব্যাপারটিকে বর্ণনা করেছেন – ‘কোন মননশীল সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই বিশৃঙ্খলা (কেওস) থেকে ডিজাইনের সৃষ্টি’ হিসেবে[26]

এই অ্যালগোরিদমের পাশাপাশি আরেকটি ব্যাপার আসবে। জীবও জড় জগতে একটি প্রাকৃতিক ধর্ম প্রদর্শন করে যার নাম ‘স্বতঃ সংগঠন’ বা সেলফ অর্গানাইজেশন। স্বতঃ সংগঠন বলতে বিভিন্ন বস্তুর নানা ধরনের নকশায় বিন্যস্ত হওয়ার কথা বোঝানো হয়। আর চমৎকারিত্বপূর্ণ ও গাণিতিক এই নকশা তৈরি হয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে, কোনো ধরনের মিরাকল বা অলৌকিকতা ব্যতীত। এই স্বতঃসংগঠনের কারণেই ঠাণ্ডায় জলীয়-বাষ্প জমে তুষার কণিকায় পরিণত হওয়া, লবণের মধ্যে কেলাস তৈরি, কিংবা পাথুরে জায়গায় পানির ঝাপটায় তৈরী হওয়া জটিল নকসার ক্যাথেড্রালের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে বিরল নয়।

সূর্যমুখী ফুল এবং পাইন ফলের পাতা প্রভৃতির মধ্যে সুবর্ণ অনুপাত এবং ফিবোনাচি রাশিমালার প্রকাশ ঘটে স্বাভাবিকভাবেই। সূর্যমুখীর পাঁপড়ি, পদার্থের মধ্যকার ইলেকট্রনের বিন্যাস, চৌম্বককণার আহিত সমাবেশে পাওয়া যায় ডবল স্পাইরাল প্যাটার্নের খোঁজ। ‘Self-Made Tapestry’ নামের বইটিতে লেখক ফিলিপ বল বিভিন্ন জীব ও জড় বস্তুর প্রাকৃতিকভাবে নানা ধরনের নকশায় বিন্যস্ত হওয়ার উদাহরণ দেখিয়েছেন অসংখ্য চিত্র সহকারে[27]। আশেপাশের বিভিন্ন জটিলতা দেখে যারা কোন পরিকল্পণাকারীর খোঁজ করেন, তার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করতে পারে তাঁর বইয়ে উল্লেখিত জটিলতাগুলো, যেগুলো একদমই নিজে নিজে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে । সত্যি কথা হলো, বিভিন্ন জীবিত জৈবতন্ত্রে সন্ধান পাওয়া নকশা একই সাথে জড় সিস্টেমেও দেখতে পাওয়া যায় এবং এগুলো পদার্থ বিজ্ঞান রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানের মৌলিক সূত্র দিয়েই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। প্রসঙ্গতঃ, আমি আর রায়হান আবীর মিলে অবিশ্বাসের দর্শন’ নামে একটা বই লিখেছিলাম কয়েক বছর আগে[28]। বইটিতে এ ধরনের ‘ইউনিভার্সাল ডারউইনিজম’ –এর নানা প্রয়োগ দেখানো হয়েছিল। আঁদ্রিয়ান বেজান (Adrian Bejan) একটি আকর্ষণীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন ‘Design in Nature: How the Constructal Law Governs Evolution in Biology, Physics, Technology, and Social Organization’ শিরোনামে। সেখানেও তিনি দেখিয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের সূত্র মেনে কিভাবে প্রকৃতিতে ‘ডিজাইনের’ উন্মেষ ঘটে। বস্তুত ডেনিয়েল ডেনেটের সেই উক্তি – ‘কোন মননশীল সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই কেওস থেকে ডিজাইনের সৃষ্টি’ ব্যাপারটা এখানেও প্রাসঙ্গিক। আসলে বিবর্তনের নিয়মগুলো সার্বজনীন বলেই এটা সম্ভব হয়।

এখন কথা হচ্ছে জড় ও জীবজগতে যদি ডারউইনের এলগোরিদম একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়, তবে মানব সমাজেও এর আগমন বিচিত্র কিছু নয়, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা মানব সমাকে ডারউইনীয় কাঠামোতে বিশ্লেষণ করার কাজ বেশ কিছুদিন হল শুরু করেছেন। আমি নিজেও ক’ বছর আগে একটা বই লিখেছিলেম ‘ভালবাসা কারে কয়?’ নামে[29]। কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখেছি – ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে সমাজ ব্যাখ্যার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারটা অনেকেই সহজে মেনে নেন না। যদিও অন্য সকল প্রাণীকে জীবজগতের অংশ হিসেবে মানতে তাদের আপত্তি নেই, এমনকি ডারউইনীয় বিবর্তনের প্রয়োগ ছাড়া যে পিঁপড়েদের সমাজ থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জিদের সমাজ পর্যন্ত কোন কিছুরই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়- সেটিও অনেকেই মানেন, কিন্তু মানুষকে ডারউইনীয় বিশ্লেষণের বাইরে রাখতেই অনেকে পছন্দ করেন। হয়তো তারা ভাবেন, হাতি, গণ্ডার, শিম্পাঞ্জি কিংবা গরিলা – এসকল প্রাণীরা যতই উন্নত হোক না কেন, তারা তো আর মানুষের মতো কবিতা লিখতে পারে না, পারেনা গলা ছেড়ে গান গেতে, কিংবা পারেনা স্থাপত্যকর্ম বা কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করতে, তাই মানুষ বোধ হয় অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারে আলাদা, অনন্য। এ থেকে তারা সিদ্ধান্ত টানেন যে, ডারউইনীয় বিশ্লেষণ মানব সমাজের জন্য প্রযোজ্য নয়। এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতাগুলো আমরা জানি। আসলে অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকাটা মানব সমাজে ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে কখনোই বাতিল করে না। সব প্রাণীরই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যার নিরিখে মনে হতে পারে যে তারা হয়তো অনন্য। যেমন, বাদুড়ের আল্ট্রাসনিক বা অতিশব্দ তৈরি করে শিকার ধরার এবং পথ চলার ক্ষমতা আছে, যা অনেক প্রাণীরই নেই। মৌমাছির আবার পোলারাইজড বা সমবর্তিত আলোতে দেখার বিরল ক্ষমতা আছে, যা আমাদের নেই। এধরণের অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকার পরেও কেউ কিন্তু বলছে না যে বাদুড় বা মৌমাছিকে জীববিজ্ঞানের বাইরে রাখতে হবে। তাহলে মানুষের ক্ষেত্রেই বা অযাচিত ব্যতিক্রম হবে কেন? বিখ্যাত সামাজিক জীববিজ্ঞানী পিয়ারি এল ভ্যান দেন বার্গি (Pierre L. van den Berghe) সেজন্যই বলেন –

‘নিঃসন্দেহে আমরা অনন্য। কিন্তু আমরা স্রেফ অনন্য হবার জন্য অনন্য নই। বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে – প্রতিটি প্রজাতিই আসলে অনন্য, এবং তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবেশের সাথে অভিযোজন করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের বিবর্তনের ফলশ্রুতিতেই উদ্ভূত হয়েছে’।

মানব সমাজের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য কিংবা জটিলতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবজগতেরই অংশ। কিন্তু এটাই আমরা ভুলে যাই। ধার্মিকেরা অনেকে নিজেদের ‘আশরাফুল মখলুকাত’ ভেবে নিয়ে অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারেই আলাদা ভেবে প্রবল আত্মতৃপ্তি অনুভব করে। অনেক প্রগতিশীলেরা মুখে ধার্মিকদের থেকে চিন্তায় চেতনায় ভিন্ন দাবী করলেও সুযোগ পেলেই ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে সামাজিক বিশ্লেষণের বাইরে রাখতে চান, যা প্রকারান্তরে নিজেদের অন্য জীব থেকে পৃথক ভেবে ‘স্বর্গীয়’ আনন্দের স্বাদ নেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এই অযাচিত আত্মতৃপ্তিই অনেক সময় যৌক্তিক চিন্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হয়ে উঠে অচলায়তন বৈজ্ঞানিক ভাবনার বিকাশে। আমি খুব জোরালো ভাবেই বলব – মানব সমাজের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য কিংবা জটিলতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আমরা মানুষেরা শেষ পর্যন্ত জীবজগতেরই অংশ। মানব সমাজে প্রেম, ভালবাসা, আত্মত্যাগ, ঘৃণা,সংঘাত, পরার্থপরায়ণতা, সৃজনশীলতা এমনকি নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের মত উপাদানগুলোও বিবর্তনের পথ ধরেই সৃষ্ট হয়েছে, কখনো প্রাকৃতিক নির্বাচনকে পুঁজি করে, কখনোবা যৌনতার নির্বাচনের কাঁধে ভর করে। এই ব্যাপারটি বুঝলে মেমেটিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বাসের বিশ্লেষণকে অবৈজ্ঞানিক কিংবা অসার মনে হবে না মোটেই।

আর মেমেটিক্সের প্রয়োগের উদাহরণ বাস্তবেই অনেক ক্ষেত্রে আছে। মানব সমাজে ভাষার উৎপত্তি, বিবর্তন এবং বিলুপ্তি এমনি একটি ভাল উদাহরণ। প্রজাতির মতো ভাষাও যে বিবর্তিত হয়, এবং তাদের মধ্যে যে থাকে অদ্ভুত সাযুজ্য, সেটা অনেক আগেই ভাষাবিদদের নজরে পড়েছিল। ডারউইনের পূর্বসূরি ব্রিটিশ জজ স্যার উইলিয়াম জোনস ১৭৮৬ সালে লক্ষ্য করেন গ্রিক, সংস্কৃত এবং ল্যাটিন ভাষার মধ্যে এত অদ্ভুত মিল আছে যে তাদের উদ্ভব একই উৎস থেকে হতেই হবে। ডারউইন উইলিয়াম জোনসের এই কাজের কথা জানতেন হয়ত, কিন্তু তিনি তার জীবদ্দশায় কোন ভাষাকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেখেননি। কিন্তু না দেখলেও জীবজগতে ফসিল রেকর্ডের মতোই ভাষার ফসিল তথা ইতিহাস জেনে তার সিদ্ধান্তে আসতে কোন অসুবিধা হয়নি। তাই তার ‘অরিজিন অব স্পিশিজ’ বইয়ে ডারউইন লিখেছিলেন[30]

‘স্পিশিজের মতোই ভাষা যখন একবার বিলুপ্ত হয়ে যায়, আর কখনোই ফিরে আসে না’।

বৈদিক যুগে যে সংস্কৃত ভাষার চল ছিল তা প্রাচীন পুরাণ ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি আমাদের চোখের সামনেই আমরা আমাদের একসময়কার বাংলার প্রবল প্রতাপশালী লেখ্য রূপ ‘সাধু ভাষা’কে বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেখছি। আমাদেরই ছোটবেলায় বহু গল্প, উপন্যাস, কবিতা এবং পাঠ্যপুস্তকে সাধুভাষার অস্তিত্ব পাওয়া যেত প্রবলভাবেই। দৈনিক ইত্তেফাক বহুদিন সাধুভাষায় খবর পরিবেশনের ঐতিহ্য চালু রাখলেও একটা সময় সেই প্রজেক্টে ইস্তফা দিতে বাধ্য হয় বিবর্তনের নিয়মেই। এখন সলিমুল্লাহ খানের মত কারো কারো কলাম ছাড়া সাধু ভাষার খোঁজ কোথাওই পাওয়া যাচ্ছে না। এখনই বোঝা যায়, আজ থেকে পঞ্চাশ বা একশ বছর পরে সাধু ভাষার নাম গন্ধ কোথাও থাকবে না, আমাদের উত্তরসূরিরা হয়তো এই মৃত লেখ্য রীতির ইতিহাস জানবেন প্রাচীন বইপত্র থেকে। এভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে প্রজাতির মত ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। একটি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে উত্তর আমেরিকার ইন্ডিয়ান ভাষার আশি শতাংশ কেবল প্রৌঢ়দের দিয়েই ব্যবহৃত হয়[31]। সেই প্রজন্মের লোকেরা মারা গেলে সে ভাষায় আর কেউই কথা বলবে না। একইভাবে শতকরা ৯০ ভাগ অস্ট্রেলীয় ভাষা এবং সম্ভবত সারা পৃথিবী জুড়ে পঞ্চাশ শতাংশ সামগ্রিক ভাষা এখন ‘বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি’তে পরিণত হতে চলেছে[32]। সুসান ব্ল্যাকমোর তার বইয়ে মিমের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো ব্যাপারটিকে খুব সফলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

কেবল ভাষাই নয়, এ ধরণের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হাজির করেছেন সুসান ব্ল্যাকমোর তার বইয়ে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে আমরা চিন্তামুক্ত থাকতে চাইলেও কখনোই আমরা তা পারিনা। যখনই চিন্তা বাদ দিব ভাবি, কোন না কোন চিন্তা মাথায় বুদ্বুদের মতোই আবির্ভূত হয়। যারা মেডিটেশন করেন তারা অনেক কসরৎ করেন ধ্যানের মাধ্যমে চিন্তামুক্ত রাখার জন্য। আসলে মিম আমাদের মস্তিষ্কে রেপ্লিকেটর হিসেবে কাজ করে এবং অন্য মিমের সাথে প্রতিযোগিতা করে বলেই এটি ঘটে। অনেকটা আমরা বাগান পরিষ্কার করার পর দিন কয়েকের মধ্যেই কোনাকাঞ্চি আবার আগাছায় ছেয়ে যায় যেমন, অনেকটা সেরকমের।

তবে সুসানের বইয়ে সবকিছু ছাপিয়ে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে মিমের ফলশ্রুতিতে মানুষের ‘বৃহৎ মস্তিস্ক’ তৈরি হবার অনুকল্পটিকে। আমরা জানি মস্তিষ্ক মানুষের খুবই ব্যয়বহুল একটি প্রত্যঙ্গ। মানব মস্তিষ্কে আছে একশ বিলিয়ন নিউরন আর পাঁচশ ট্রিলিয়ন সিন্যাপ্সিসের মহাসমাবেশ। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্ক হয়ে গেছে অনাবশ্যক রকমের বড়। মস্তিষ্ককে চালাতে শরীরের সবচেয়ে বেশি শক্তি ব্যয় হয়, দেখা গেছে দেহের শতকরা বিশভাগ শক্তিই চলে যায় আমাদের এই ‘কুমড়ো-পটাশ’ মোটা মাথাকে চালাতে গিয়ে । মস্তিষ্ক শুধু শক্তি-খেকোই নয়, পাশাপাশি আবার রীতিমত জিন-খেকোও বটে। আমাদের দেহের সবচেয়ে বেশি জিনের পরিস্ফুটন ঘটে এই মাথাতেই। আমাদের দেহে জিনের সংখ্যা তেইশ হাজারের মত, একটা বোধ বুদ্ধিহীন কেঁচোর চেয়ে খুব একটা বেশি নয়। কিন্তু পার্থক্য আছে জিনের পরিস্ফুটন বা এক্সপ্রেশনে। প্রায় সত্তুরভাগ জিনের পরিস্ফুটন ঘটে এই মাথাতেই, যা আবার প্রকারান্তরে নিয়ন্ত্রণ করে পাঁচশ ট্রিলিয়ন সার্কিটের অবিশ্বাস্য বড় এক নেটওয়ার্ক। অনেকটা মশা মারতে কামান দাগার মতোই ব্যাপার স্যাপার।

এহেন বড় মাথার সমস্যা কেবল বড় নেটওয়ার্ক তৈরিতেই হয়নি, সেই সাথে শরীরবৃত্তীয় সমস্যাও তৈরি করেছে। বড়-মাথাওয়ালা সন্তান জন্মদানের জন্য সম্ভবত: মেয়েদের শরীর মানব সমাজে সেভাবে প্রস্তুত ছিলো না। মানব প্রজাতিতে একটা সময় অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মস্তিষ্কের বিবর্তন আর বিবর্ধন ঘটেছিল, তার সাথে মেয়েদের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ – যেমন জরায়ু, যোনিপথ প্রভৃতি সেভাবে বিবর্ধিত হতে পারেনি। তাই ইতিহাসের পথপরিক্রমনায় বহু নারীকে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। আসলে সিজারিয়ান-অপারেশন সহ শল্যচিকিৎসার বিভিন্ন আধুনিক রক্ষাকবচগুলো আবিষ্কারের আগে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়েদের মৃত্যুহার ছিলো আশঙ্কাজনক-ভাবেই বেশি। জীবজগতের আর কোন প্রজাতির কোন সদস্যকে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেতে হয়নি, হয় না। আমি আমি আমার আগেকার ‘মানব মস্তিষ্কের আনইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ শিরোনামের লেখাটিতে দেখিয়েছিলাম একজন নিখুঁত ডিজাইনার সবকিছু দেখে শুনে ডিজাইন এবং পরিকল্পনা করে বানাননি বলেই এগুলো নিখুঁতভাবে তৈরি হয়নি, এতে রয়ে গেছে ক্লুজ, তথা বিবর্তনগত জোড়াতালির নানা ছাপ[33]। তবে ক্লুজ হলেও বৃহৎ মস্তিষ্কের কিছু বিবর্তনীয় সুবিধা আছে। এই বৃহৎ মস্তিষ্কের কারণেই মানুষ অন্য সকল প্রাণীর উপর দেদারসে রাজত্ব করতে পারছে। কিন্তু ঠিক কখন থেকে মানুষের মস্তিষ্ক দেহের অনুপাতে এতটা বিবর্ধিত হতে শুরু করল? সুসান ব্ল্যাকমোর মনে করেন, মানুষ মেমেটিক্সের ব্যবহার তথা অনুকরণ প্রবৃত্তি যখন থেকে সফলভাবে ব্যবহার করতে শুরু করল, তখন থেকেই মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিত হয়েছে এতো দ্রুত হারে। তিনি লিখেছেন[34]

‘All this pressure for better imitation creates more people who are good at spreading memes- whether the memes are ways of making tools, rituals, clothes or whatever. As imitation improves, more new skills are invented and spread, and these in turn create more pressure to be able to copy them. And so it goes on. In few million years, not only have memes changed out of all recognition but the genes have been forced into creating brains capable of spreading them – big brains.’

সুসান ব্ল্যাকমোরের অভিমত হল, কেবল জিনই যে সবসময় মিমের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে তা নয়, মানব সভ্যতার একটা পর্যায়ে এসে একটা সময় মিমও জিনের উপর দখলদারিত্ব করেছে। আর তা করতে গিয়েই জন্ম হয়েছে মানুষের বৃহৎ মস্তিষ্কের। সুসান ব্ল্যাকমোর তার এই অনুকল্প সঠিক কিনা তা জানার জন্য বেশ কিছু পরীক্ষণের প্রস্তাব করেছেন, যেগুলো নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ শুরু করেছেন করছেন। কাজেই মিম এবং মেমেটিক্সকে পারভেজ এবং নাস্তিকের ধর্মকথা যেভাবে অবৈজ্ঞানিক বলে উড়িয়ে দিতে চাইছেন, সেটা সেরকম নয় বলেই আমি মনে করি।

এখানে মূল ব্যপারটি হল, বিশ্বাস ব্যাপারটাকেও আমি মেমেটিক্স-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এবং ইউনিভার্সাল ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ করেছি, অভিনব বা অদ্ভুত কিছু বলিনি। এমন নয় যে বিশ্বাসের ব্যাপারটা আমি গায়ের জোরে অস্বীকার করেছি। বরং উলটো। আমি বইয়ে বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপটেই ধর্মের উৎস এবং বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছি। এমনকি এই আধুনিক যুগেও কীভাবে নতুন ধর্ম তৈরি হয়, কীভাবে ধর্মের অনুসারী তৈরি হয়, কীভাবে মানুষ নবী রাসুলকে বিশ্বাস করতে শেখে তা একটা চমৎকার উদাহরণের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন কার্গো কাল্ট (Cargo Cult) নিয়ে গবেষণা করে । ‘কার্গো কাল্ট’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে বর্তমান ধর্মবিশ্বাসগুলোর একটি সম্মিলিত নাম- যারা কার্গো- জাহাজগুলোকে স্বর্গীয় দূতের পাঠানো সামগ্রী মনে করতো। জাহাজের ইউরোপিয়ান নাবিকেরা কীভাবে রেডিও শোনে, কেন কোনো সারাইয়ের কাজ করতে হয় না, রাতে কী করে আলো জ্বালায়- এ সবই দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসীরা অদ্ভুত বিস্ময়ে দেখত। তাদের কাল্টপ্রধান জন ফ্রাম চিরতরে চলে যাবার আগে সেসময় অনেকগুলো ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন- দ্বিতীয়বারে জাহাজভর্তি সামগ্রী আনবে ও সাদা আমেরিকানদের চিরকালের মতো দ্বীপ থেকে বিতাড়িত করা হবে ইত্যাদি বলে। ঠিক যেমন আপনার পরিচিত বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ যেভাবে অপেক্ষা করে আছে পুনরুত্থিত যিশুখ্রিস্ট কিংবা ইমাম মাহাদির জন্য, ঠিক তেমনি কার্গো কাল্টের আদিবাসীরাও দীর্ঘ পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে জন কখন আসবে তাদের মুক্তি দিতে। এ ধরণের অনেক উদাহরণই আমার বইয়ে আছে।

আমার বইয়ে এবং আগেকার অনেক লেখাতেই বিশ্লেষণ করেছি যে, বিশ্বাসের একটা প্রভাব ছিল মানব সভ্যতার উন্মেষকালে। অভিজ্ঞ লোকজনের কথা, গোত্রাধিপতিদের উপদেশ মেনে চলার ফলে প্রকৃতিতে টিকে থাকা সহজ হয়েছে, এটা কিন্তু অনেকভাবেই প্রমাণিত। সেজন্যই এখনো ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় বড়দের কথা মেনে চলার, তাদের কথা শোনার। আমার মনে আছে আমি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম যে কবিতা ‘নার্সারি রাইম’ হিসেবে মুখস্থ করেছিলাম সেটি ছিল এরকমের –

‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি

সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি

আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে

আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে’।।

এই যে ‘গুরুজনেরা যে আদেশ করবেন’ সেটা ‘ভাল মনে করে যেতে হবে’ সেটা ছোটবেলা থেকেই আমাদের মস্তিস্কে ঢোকানো হয়। এর কারণ আছে। শিশুদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই একটা সময় পর্যন্ত অভিভাবকদের সমস্ত কথা নির্দ্বিধায় মেনে চলতে হয়। ‘নদীর পাড়ে যায় না, ওখানে কুমির থাকে’, ‘চুলায় হাত দেয় না, হাত পুড়ে যাবে’, ‘না ধুয়ে আপেল খায় না, পেট খারাপ করবে’ – বড়দের দেয়া এই ধরনের অভিভাবকদের দেয়া উপদেশাবলি আমরা বংশপরম্পরায় বহন করি – কারণ এ উপদেশগুলো সঠিকভাবে পালন করলে আমরা প্রকৃতিতে সফলভাবে টিকে থাকতে পারি, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। যে শিশুরা অভিভাবকের অবাধ্য হয়ে নদীর পারে গেছে হয়তো কুমীরের খাদ্য হয়েছে, যে শিশু মায়ের উপদেশ না শুনে আগুনে হাত দিয়েছে, অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে, তারা কোন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেখে যেতে পারেনি। প্রজন্ম সফলভাবে রক্ষা করতে পেরেছে সে সমস্ত শিশুরাই যারা অভিভাবকদের কথা বিশ্বাস করেছে, তাদের উপদেশের অবাধ্য হয়নি। ফলে বিবর্তনগতভাবে একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে শিশুদের উপর যে অভিভাবকদের কথা, গুরুজনদের উপদেশ, গোত্রাধিপতিদের নির্দেশ পালন করতে হবে, নইলে টিকে থাকতে সমস্যা হবে। এখন কথা হচ্ছে – তারাই যখন অসংখ্য ভাল উপদেশের পাশাপাশি আবার কিছু মন্দ অর্থহীন কিংবা কুসংস্কারাচ্ছন্ন উপদেশও দেয় – ‘মঙ্গলবারে মন্দিরে পাঁঠাবলি না দিলে অমঙ্গল হবে’, কিংবা গোত্রাধিপতি যখন বলেন, ‘সূর্যগ্রহণের সময় নামাজে কুসূফ পড়তে হবে, নইলে সূর্য আর আকাশে উঠবে না’ – তখন শিশুর পক্ষে সম্ভব হয় না সেই মন্দ বিশ্বাসকে অন্য দশটা বিশ্বাস কিংবা ভাল উপদেশ থেকে আলাদা করার। সেই মন্দ-বিশ্বাসও বংশপরম্পরায় সে বহন করতে থাকে অবলীলায়। গুরুজনদের উপদেশ বলে কথা! সব বিশ্বাস হয়তো খারাপ কিংবা ক্ষতিকর নয়, কিন্তু অসংখ্য মন্দ বিশ্বাস অনেক সময়ই জন্ম দিতে পারে ‘বিশ্বাসের ভাইরাসের’। তখন গোত্রাধিপতিদের কথাকে শিরোধার্য করে তার একনিষ্ঠ অনুগামীরা বিধর্মীদের হত্যা করা শুরু করে, ডাইনি পোড়ানোতে কিংবা সতীদাহে মেতে উঠে, কখনো গণ-আত্মহত্যায় জীবন শেষ করে দেয় কিংবা বিমান নিয়ে সোজা হামলে পড়ে টুইন টাওয়ারের উপর। অথবা, শুরু করে পেশোয়ারে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের উপরে নির্বিচারে গনহত্যা। কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়ে কার্টুনিস্টদের উপর।

জাতীয়তাবাদও কি তবে ভাইরাস হয়ে উঠতে পারে না?

পারভেজ তার লেখায় প্রশ্ন করেছিলেন, বিশ্বাস যদি ভাইরাস হয়, তবে জাতীয়তাবাদের মতো ব্যাপারগুলোও তাইলে ভাইরাস হবে না কেন। আমি আমার কোন লেখার কোথাও বলিনি যে সেটা ভাইরাস হতে পারবে না। হিটলার মুসলিনীর মতো শাসককে কি আমরা অতীতে দেখিনি যারা দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলেছিল? আসলে যে কোন ধারণাই ছড়ায় একই ভাবে – মেমেটিক্সের নিয়ম মেনে মানব মস্তিষ্ককে পুঁজি করে ছড়ায় এক হোস্ট থেকে অন্য হোস্টে। আর স্বাভাবিকভাবেই কখনো কখনো কোন কোন ধারনা হয়ে উঠতে পারে ভাইরাসের মতোই বিধ্বংসী, কিংবা ক্ষতিকর। আমার চোখে যে কোন ধারণা – সেটা জাতীয়তাবাদ হোক, উগ্র দেশপ্রেম হোক, সমাজতন্ত্র এমনকি গণতন্ত্রও ভাইরাস হয়ে উঠতে পারে। মস্তিষ্কের ‘আনইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ এবং প্রকৃতিজাত ক্লুজের কথা যে উপরে আলোচনা করেছি, তার ফলশ্রুতিতেই বিশ্বাস ব্যাপারটা ভুলপথে মানুষকে চালিত করতে পারে, এবং করেও। কারণেই মানুষ যে নিজের প্রিয় ধারনা, বিশ্বাস এবং আদর্শের জন্য, এমনকি কোন বড় ধর্মগুরু, নেতা-নেত্রীর কথায় অকাতরে প্রাণ দিতে সক্ষম এবং দেয়, এর উদাহরণ তো ইতিহাসেই আছে অজস্র।

সুসান ব্ল্যাকমোর তার ‘মিম মেশিন’ বইয়ে ধর্ম ছাড়াও আরো অনেক বিশ্বাসকে মিমপ্লেক্সের আলকে বিশ্লেষণ করেছেন[35]। তার বইয়ের ১৫ তম অধ্যায়টির নাম – ‘রিলিজিয়ন এজ মিমপ্লেক্স’। ঠিক এর আগের অধ্যায়টির নাম ‘মিমস অব দ্য নিউ এজ’। সেখানে অ্যালিয়েন এবডাকশন থেকে শুরু করে মরণপ্রান্তিক অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যৎ-দর্শন সহ অনেক অপবিশ্বাসকেই মিমের সাহায্যে বিশ্লেষণ করেছেন, এবং ব্যাখ্যা করেছেন সেগুলো অসত্য হবার পরেও কেন মানবসমাজে সেগুলো ঠিকে থাকে। ধর্মের ব্যাপারটাও একই রকমের। অন্য অনেক অপবিশ্বাসের মত ধর্মীয় বিশ্বাসও সামাজে টিকে আছে নানা কারণেই। ধর্মের প্রাচীন শাসন অনুশাসন, রীতিনীতি আর প্রথাগুলো আসলে তার নিজের অস্তিত্বের জন্য সহায়ক, মানব সমাজের জন্য নয়। আসলে মোটা দাগে, এই অপবিশ্বাসগুলো সমাজের জন্য ক্ষতিকর হওয়া সত্ত্বেও অনেকটা ভাইরাসের মতোই টিকে থাকে আর ছড়িয়ে পড়ে এক হোস্ট থেকে অন্য হোস্টে।

এখন ধরুন আজ এক গবেষক ‘এইচআইভি ভাইরাস’ নিয়ে কিংবা ‘ইবোলা ভাইরাস’ একটি বই লিখলেন। এখন কেউ হয়তো তাকে একইভাবে অভিযুক্ত করতে পারেন, ভাই আপনি ‘ফ্লু ভাইরাস’ নিয়ে লেখেননি কেন ? আমার প্রতি পারভেজের অভিযোগ অনেকটা এরকমের। কিন্তু এটি একটি অর্থহীন প্রশ্ন। হাজার হাজার ভাইরাস আছে পৃথিবীতে, আছে হাজার হাজার রোগ ব্যাধি। তবে কথা হল – সব ভাইরাসই সমান বিপজ্জনক না। আজ পৃথিবীতে এইচ.আই.ভি কিংবা ইবোলা ভাইরাসকে যে রকম গুরুত্ব দেয়া হয় নিরাময়ের জন্য, এইডস কিংবা ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য যে রকমের অর্থ, মেধা, শ্রম নিয়োগ করা হয়, তার সিকি ভাগের এক ভাগও ডায়রিয়া কলেরা কিংবা মামুলি ফ্লুর মত রোগ জীবাণু কিংবা এর পিছনের ভাইরাস নির্মূলের জন্য ব্যয় করা হয় না। এর তো অবশ্যই কারণ আছে। কারণ খুব স্পষ্ট – সব ভাইরাসই মানব সভ্যতার জন্য আজ সমান হুমকি না। সব ভাইরাসই একই রকম বিধ্বংসী না। বিজ্ঞানীরা ভাইরাস নির্মূলে কমনসেন্সের চর্চা করেন, আবেগের না। তাই সব ভাইরাসকে সমান গুরুত্ব দেবার মতো কিছু নেই। আমি না হয় ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ নিয়ে লিখেছি, পারভেজ আলম কিংবা অন্য কেউ চাইলে জাতীয়বাদের ভাইরাস নিয়ে লিখতে পারেন, কেউ মানা করেছে না কিন্তু। যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল আমি বিশ্বাস এবং তার বিস্তারকে ডারউইনীয় কাঠামোতে ফেলে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছি। আমি যেহেতু ডারউইনীয় নিয়মকে একটি ইউনিভার্সাল নিয়ম মনে করি, কাজেই ব্যাখ্যা-প্রতিব্যাখ্যার কাঠামো থেকে ডারউইনের নিয়ম বাদ পড়লে তা আমার কাছে অসম্পূর্ণই মনে হয়।

বিশ্বাস, অবিশ্বাস, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ সবই না হয় বাদ দেই – একটি সাধারণ কৌতুক যেভাবে ছড়ায় সেটাই আমরা এখানে বিবেচনা করি।

কৌতুক যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে

একটা জোক বলা যাক। জোকটা এরকমের :

ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স সুদূর আফ্রিকান এক আদিম ট্রাইবে প্রকৃতি বিবর্তন এবং সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েছেন, সেখানে তিনি একবছর থাকবেন আর তার নতুন বই লিখবেন ‘আউট অফ আফ্রিকা’ নিয়ে। তিনি আফ্রিকান ট্রাইবের মধ্যে বাস করে তাঁদের সংস্কৃতির অনেক কিছু শিখছেন, আবার তাঁদেরও শেখাচ্ছেন অনেক কিছু – বিশেষত: পশ্চিমা জগতের বিজ্ঞান, কারিগরি, প্রযুক্তির কিছু দিক। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন খবর পাওয়া গেল ট্রাইবের নেতার স্ত্রীর এক সন্তান হয়েছে, কিন্তু গায়ের রঙ ধবধবে সাদা! ট্রাইবের সবাই হতবাক। প্রফেসরকে আলাদা কয়রে ডেকে নিয়ে ট্রাইবের সর্দার বললেন – ‘হুনেন প্রফেসর সাব, এইখানে আপনেই আছেন একমাত্র এইরকম সাদা । আমরা এর আগে কোন সাদা চেহারার মানুষই দেখি নাই। কোইত্থিকা কী হইছে, এইডা বুঝতে জিনিয়াস হওন লাগে না।’

প্রফেসর একটু ভেবে বললেন, ‘না, না চিফ। আপনি ভুল বুঝছেন। প্রকৃতিতে এরকম ঘটনা মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। বিজ্ঞানে আমরা এটাকে বলি Albinism। এই যে আপনার উঠানে দেখেন সবগুলা ভেড়া সাদা, খালি একটা ভেড়া কালো রঙের। প্রকৃতিতে এরকম হয় মাঝে সাঝে, আপনি শান্ত হন।

ট্রাইবের সর্দার বেশ কিছুক্ষণ ধরে চুপ থেকে ডকিন্সকে বললেন, ‘শোনেন, আপনের লগে একটা ডিলে আসি। আপনে ভেড়া নিয়ে আর কাউরে কিছু কইয়েন না, আমিও সাদা শিশু লইয়া আপনেরে কিছু কমু না!’

কেমন লাগলো এ কৌতুকটা? আমি নিশ্চিত কৌতুকটা যদি আপনি পড়েন, এবং যদি আপনার ভাল লাগে, হয়তো আপনি সেটা আপনার অন্য কোন বন্ধুকে গিয়ে বলবেন। এভাবেই কৌতুক ছড়ায়। আমি আসলে আপনার মস্তিষ্ককে এই জোকের হোস্ট হিসেবে ব্যবহার করছি। অনেকটা ভাইরাসের মতোই কিন্তু। এই লেখার পাঠক যত বাড়বে, তত মানুষ এ কৌতুকটি পড়বেন, এবং সেই সাথে বাড়বে হোস্টের সংখ্যাও। সেই সাথে বাড়বে কৌতুকটি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও।

আধুনিক প্রযুক্তি এসে আমাদের এই কৌতুক ছড়ানোর কাজ খুব সহজ করে দিয়েছে। এই কৌতুকটা ফেসবুকে দেওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যে শ খানেক লাইক আর গণ্ডা খানেক শেয়ারের বন্যায় ভেসে যায়। ফেসবুক খুব ভাল ক্রাইটেরিইয়া বোঝার জন্য কোন কৌতুক ‘লাইকেবল’ আর কোনটা নয়। কোনটা টিকে থাকবে, আর কোনটা হারিয়ে যাবে বিস্তৃতির আড়ালে। একটা কৌতুক প্রচণ্ড রকম শেয়ার হয়েছিল ফেসবুকে একসময়, জোকটা এরকমের:

জুকার্নায়েকের বড় আশা ছিল তিনি মৃত্যুর পর বেহেস্ত-বাসী হইবেন। তা আশা করবেনই বা না কেন? এতদিন ধরে আল্লাহর পথে জিহাদ করছিলেন, নানা ভাবে বিবর্তনের বিরুদ্ধে গীবত গাইছেন, বিভিন্ন লেকচারে আল্লা আল্লা আর ইসলাম ইসলাম কইরা ফ্যানা তুইলা ফেলাইলেন, কোরআনের মইধ্যে বিজ্ঞান পাইলেন, পৃথিবীর আকার পাইলেন উটের ডিমের লাহান, উনি বেহেস্তবাসী না হইলে হইবো কে?

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর ঈশ্বর আরেক। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ঈশ্বরের শেষ বিচারে জুকার্নায়েকের বেহেস্তে স্থান হইলো না। স্থান হইলো দোজখে। তবে হাজার হলেও তিনি স্বনামখ্যাত জুকার্নায়েক। ঈশ্বর তাকে ডেকে নিয়ে দয়াপরাবশতঃ বললেন, তোমাকে দোজখের বিভিন্ন প্রকৃতি ঘুরাইয়া দেখানো হবে। তোমার যেটা পছন্দ বেছে নেওয়ার তৌফিক দেয়া হইল, জুকার্নায়েকজী!

মন্দের ভাল, কি আর করা। জুকার্নায়েককে প্রথম একটা ঘরে নিয়ে যাওয়া হইল। সেখানে এক পাপিষ্ঠকে উলঙ্গ করে চাবুক কষা হচ্ছে। আর চাবুকের বাড়ি খেয়ে পাপিষ্ঠ ব্যাটা তারস্বরে চ্যাঁচাচ্ছে। জুকার্নায়েক দেখে বললেন, কতক্ষণ এ ব্যাটাকে চাবুক মারা হবে? উত্তর আসলো এক হাজার বছর। এর পর এক ঘণ্টা বিরতি। তারপর আবার … জুকার্নায়েক শুনে বললেন, নাহ এটা আমার জন্য নয়, চলুন অন্য ঘরে যাই।

দ্বিতীয় ঘরে গিয়ে জুকার্নায়েক দেখলেন, সেখানেও এক ব্যক্তিকে ধরে গরম কড়াইয়ে বসিয়ে পোড়ানো হচ্ছে, আর ব্যথার চোটে উহ আহ করছে। জুকার্নায়েক সে ঘর থেকেও বিদায় নিয়ে বললেন, আরো অপশন কী আছে দেখা যাক।

তৃতীয় ঘরে গিয়ে দেখেন এক লোককে উলঙ্গ করে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে, আর এক সুন্দরী তন্বী হাঁটু গেড়ে বসে ভদ্রলোকের ‘উহা’ মুখে নিয়ে মনিকা লিউনস্কির মতন মুখমেহন করে চলেছেন। কিছুক্ষণ টেরা চোখে অবলোকন করে জুকার্নায়েক ভাবলেন, এটা তো মন্দ নয়। নিজেকে চেনবাধা ভদ্রলোকের জায়গায় কল্পনা করে আমোদিত ভাব নিয়ে ঈশ্বরকে বললেন, এই দোজখই আমার পছন্দের।

ঈশ্বর ঘুরে সুন্দরী তন্বীর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কাজ শেষ। এখন থেকে জুকার্নায়েক পরবর্তী এক হাজার বছর ধরে এই সার্ভিস দেবেন।

একটি সার্থক কৌতুক আসলে একটি সার্থক মিমের উদাহরণ। চিন্তা করে দেখুন – একটা জোক আসলে কিছুই নয়, কেবল কতগুলো তথ্যের সমাহার। অথচ সেটাই পুনরাবৃত্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আমার আপনার মস্তিষ্ক তথা হোস্টের প্রেষণার মাধ্যমে।

একটি কৌতুক, তা যত সরলই হোক না কেন, মিমের কাজ বোঝার জন্য খুব ভাল একটা উদাহরণ। কৌতুকের মত গান বা কবিতার কথাও বলা যায়। মানব সভ্যতার উন্মেষের পর থেকে অজস্র গান এবং কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু সব গান বা কবিতাই স্থায়িত্ব পায়না, পায়না পাঠকপ্রিয়তা। ‘ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাব’, কিংবা ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ – এ সমস্ত কবিতার চরণ যেরকম মুখে মুখে ফেরে, সব কবিতার চরণই কি এভাবে পুনরাবৃত্ত হতে পারে? কবিতার মতো সঙ্গীতের ব্যাপারটাও তেমনি। গীতিকার এবং সুরকারেরা অজস্র গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন, কিন্তু সব গান সব সুর আমরা গুন গুন করি না। তাই সব গান টিকে থাকে না। যেগুলো হারিয়ে যায় বিবর্তনের নিয়মেই হারিয়ে যায়। আর যেগুলো টিকে থাকে সেগুলোর কিছু অন্তর্নিহিত কাঠামো আর কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণেই টিকে থাকে। হয়তো সহজ সুর, মনকে নাড়া দিয়ে যাওয়া কিছু শব্দ, মানব আবেগকে উদ্বেলিত করার ক্ষমতা ইত্যাদি হয়তো এর পেছনকার কিছু বৈশিষ্ট্য। আমি অফিসে যাবার পথে গাড়ির রেডিওতে পপ মিউজিকের একটা চ্যানেল শুনতে শুনতে যাই। একদিন একটা গান হচ্ছিল রেডিওতে, Kanye West এর “Hey Mama”।

গাড়ি পার্ক করে এলিভেটর দিয়ে উপর উঠতে উঠতে গুন গুন করছিলাম। গুনগুনানি সংক্রমিত করে ফেললো পাশের জনকে। সেও গুন গুন করতে লাগলো। সারাদিন আমার মাথায় কেবল হে মামা, হে মামা ঘুরতে লাগলো। আর সেটা সংক্রমিত করলে আমার সহকর্মীদেরও। অফিসে আমার পাশের জনকে লাঞ্চ আওয়ারে দেখলাম কানে হেডফোন গুঁজে “Hey Mama” শুনছে আর আর টেবিলে তাল ঠুকছে। অফিস সেরে বাসায় আসার পর খাওয়ার টেবিলে গুন গুন করছিলাম একই গান। আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলে, ‘কি সারা দিন খালি হে মামা, হে মামা করছ, তাও গানের যদি গলা থাকতো…’। আমি মনে মনে বলি, ‘গলা ছাড়াই মিম যেভাবে ছড়াচ্ছে, আর গলা থাকলে না জানি কি হত…’। রাতে ঘুমানোর সময় দেখলাম আমার মেয়েও তার ঘরে হেডফোন লাগিয়ে ‘হে মামা’ ‘হে মামা’ শুনছে। মেমেটিক্সের ‘ক্ষ্যমতা’ দেখে যে কেউ হতভম্ব হতে বাধ্য!

এধরণের ব্যাপার স্যাপার বিথোফেন বা মোৎসার্টের সুরের ক্ষেত্রেও খাটে। বিথোফেনের ফিফথ সিম্ফোনি কি কেবলই চার নোটের সমাহার নাকি একটা সার্থক মিম? যারা মিমের কাজ ইতোমধ্যেই বুঝে গেছেন, তাদের অনেকেই কিন্তু বলবেন, এগুলো যেভাবে পুনরাবৃত্তি হয় মস্তিষ্কের হোস্ট থেকে হোস্টে, যারা সুরচর্চা করার প্রাথমিক সময়ে তারা যেভাবে সেগুলো শেখেন, অন্যকেও শেখান, তাতে এটা মিম হিসেবেই বিবেচিত হবার যোগ্য। সেজন্যই আমরা দেখি, রিচার্ড ব্রডি, ডকিন্স, ডেনেট সহ যারা মিম নিয়ে লিখেছেন সবাই ফিফথ সিম্ফোনিকে মিমের উদাহরণ হিসেবে বিচার করেছেন।

তবে গান, সুর কিংবা কৌতুক মিম হলেও এগুলোকে ঠিক সেভাবে ‘ভাইরাস’ বলা যাবে না। কারণ এর মধ্যে ভীতিকর কোন নির্দেশনা নেই, নেই কোন অনিষ্টের আলামত। সেগুলো যদি যুক্ত হয় তবে মিমের অবস্থা কী দাঁড়ায় সেটা আমরা দেখব পরের অনুচ্ছেদে।

ভয়াল নির্দেশিকা

যারা প্রথম প্রথম ইমেইল ব্যবহার শুরু করেন, তাদের প্রায় সবাইকেই একটা বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ধাতস্থ হতে হয়। স্প্যাম এবং চেইন ইমেইল। আমি যখন প্রথম প্রথম হটমেইল এবং ইয়াহু মেইল ব্যবহার করা শুরু করা শুরু করেছিলাম, তখন প্রায় প্রতিদিনই গাদা খানেক ইমেইল পেতাম, যেগুলোর নীচে লেখা থাকতো ‘দয়া করে অন্তত ৫ জনকে মেইলটি ফরওয়ার্ড করুন, নইলে সমূহ বিপদ। এক ভদ্রলোক এই ইমেইল পেয়েও চুপ করে বসে ছিলে। তাকে দুই দিনের মাথায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে…’ ইত্যাদি। আমার বন্ধুদের অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সেটা তার অন্য বন্ধুদের কাছে ফরওয়ার্ড করে দিতেন। যারা আমার মতো একটু সংশয়বাদী ধাঁচের তারা হয়তো মুচকি হেসে ট্র্যাশে চালান করে দিতেন। তবে ‘বিশ্বাসী মস্তিষ্কের’ কাছে এই চেইন ইমেইলগুলো একেকটি সার্থক ভাইরাস। দেদারসে তারা সেগুলো তাদের বন্ধু তালিকার সবাইকে চালান করে দিতেন। এমনও হত যে, সেই একই ইমেইল আবার ঘুরে ঘুরে আমার কাছে চলে আসতো মাস খানেক পর চেইনের আকার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়ে।

তো এই যে আমি নিজেকে এত সংশয়বাদী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করাচ্ছি, সেই আমিও একবার ‘রাম ধরা’ খেয়ে গিয়েছিলাম। তবে চেইন ইমেইলের ক্ষেত্রে নয়, আরেকটি ক্ষেত্রে। সেই গল্প বলি।

তখন সবে মাত্র চাকরিতে ঢুকেছি আটলান্টার একটা ছোট কোম্পানিতে। একদিন সকালে অফিসে গিয়ে ইমেইল খুলেই দেখি একটা ইমেইল। ইংরেজিতে লেখা ইমেইলের বাংলা করলে দাঁড়াবে এরকমের:

প্রিয় প্রাপক,

খুব জরুরী। এইমাত্র পেলাম। আপনি আপনার সহকর্মীদের মধ্যে বিলি করুন।

নতুন ড্রাইভিং জরিমানা প্রবর্তন করা হয়েছে জর্জিয়ায় ২০০৮ থেকে।

১। কারপুল লেন – ১ম বার ১০৬৮.৫০ ডলার জরিমানা, প্রযুক্ত হবে ৭/১/০৮ তারিখ থেকে। যে হাইওয়েতে টিকেট খাচ্ছেন, সেই হাইওয়েতে পুনর্বার যাবেন না। কারণ, ২য়বার সেটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ৩য় বার তিনগুণ জরিমানা দিতে হবে। চতুর্থ-বার লাইসেন্স সাসপেন্ড।

২। ভুল লেন বদল – জরিমানা ৩৮০ ডলার। সলিড লেন কিংবা ইন্টারসেকশন ক্রস করবেন না।

৩। ইন্টারসেকশন ব্লক করলে – ৪৮৫ ডলার।

৪। রাস্তার শোল্ডারে ড্রাইভ করলে – ৪৫০ ডলার।

৫। কনস্ট্রাকশন এলাকায় সেলফোন ব্যবহার করলে জরিমানা করা হবে। ৭/১/০৮ তারিখ থেকে দ্বিগুণ হবে।

৬। গাড়িতে সিট বেল্ট ছাড়া কোন প্যাসেঞ্জার থাকলে ড্রাইভার এবং প্যাসেঞ্জার উভয়েই পুলিশের তরফ থেকে টিকেট পাবেন।

৭। রাস্তায় স্পিড লিমিটের মাত্র ৩ মাইল উপরে গেলেই টিকেট দেয়া হবে।

৮। ডিইউআই = জেল। দশ বছরের জন্য ড্রাইভিং রেকর্ডে এর উল্লেখ থাকবে।

৯। ৭/১/০৮ তারিখ থেকে সেলফোন ‘হ্যান্ডস ফ্রি’ থাকতে হবে। টিকেট ২৮৫ ডলার।

যথার্থ ভয়াল নির্দেশিকা, তাই না? আমার মত মানুষও ভীত হয়ে পড়ল। দেখলাম সহকর্মীদের সবাই ব্যাপারটা নিয়ে দারুণ উদ্বিগ্ন। আমি খুব সতর্কতার সাথে গাড়ি চালিয়ে অফিসে যেতাম। কারণ যে জরিমানার কথা ইমেইলে লেখা আছে, সেটা দিতে হলে পাকস্থলী আমার গলা দিয়ে বের হয়ে আসবে। আমিও আমার কাছের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনদের সেটা ফরওয়ার্ড করে দিলাম। অযাচিত ফাইনের গ্যাঁড়াকলে পরিচিতরা পড়ুক – কেই বা চায়!

কিন্তু তিন চার দিনের মধ্যেই একটা নির্ভরযোগ্য ওয়েব সাইট থেকে জানলাম পুরো ব্যাপারটাই বোগাস! ভুয়া ইমেইল। কিন্তু এর মধ্যেই এটা কয়েকশ লক্ষ বারের উপরে বিনিময় করা হয়েছে। চারিদিকে যাকেই জিজ্ঞাসা করেছি, সবাই এই ইমেইল পেয়েছেন, এবং তারাও আমার মতো এতদিন আতঙ্কিত ছিলেন।

এই ইমেইলটা নিঃসন্দেহে একটা সফল মিম, যা আমাদের মস্তিষ্কের আবেগ এবং যুক্তিকে ব্যবহার করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসের মতো। ছড়িয়ে পড়ার জন্য যা যা বৈশিষ্ট্য দরকার সবই ছিল ইমেইলটায় –

– এটি ছিল বিশ্বাসযোগ্য

– এটি ছিল প্রাসঙ্গিক

– এটি বহন করেছিল ভয়াল বার্তা।

– সহজেই অন্যের মধ্যে সঞ্চালনযোগ্য

এ ধরণের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকলে ধ্যান ধারণা ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ে কেন – এটা বুঝলে ধর্ম যে একটা ভাইরাস সেটাও বোধগম্য হবে আশা করি। প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী থাকে, যেগুলো না মানলে নরকের ভয়, শাস্তির ভয় দেখানো হয়, সেই নির্দেশাবলীগুলোকে যতদূর সম্ভব প্রাসঙ্গিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং বিভিন্ন উপায়ে মানুষের মধ্যে সঞ্চালন করার প্রয়াস নেয়া হয়। এভাবেই সংক্রমিত হয় বিশ্বাসের ভাইরাস, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

ভাইরাস আক্রান্ত মনন

প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস অধ্যয়ন করলে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ এর বহু উপকরণ পাওয়া যায়। বহু সভ্যতার কথা আমরা ইতিহাস বইয়ে পাই যেখানে কোন নতুন প্রাসাদ কিংবা ইমারত তৈরি করার সময় সেই জায়গায় শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হত; এটা করা হত এই ধারণা থেকে যে, এটি প্রাসাদের ভিত্তি মজবুত করবে। অনেক আদিম সমাজেই বন্যা কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কুমারী উৎসর্গ করার বিধান ছিল; কেউ কেউ সদ্য জন্মলাভ করা শিশুদের হত্যা করত, এমনকি খেয়েও ফেলত। প্রাচীন মায়া সভ্যতায় নরবলি প্রথা প্রচলিত ছিলো। অদৃশ্য ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে মাথা কেটে ফেলে, হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলে, অন্ধকূপে ঠেলে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হত। ১৪৪৭ সালে গ্রেট পিরামিড অব টেনোখটিটলান তৈরির সময় চার দিনে প্রায় ৮০,৪০০ বন্দিকে ঈশ্বরের কাছে উৎসর্গ করা হয়েছিলো। কোন কোন সংস্কৃতিতে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে অন্য মহিলা এবং পুরুষদেরও তার সাথে জীবন্ত কবর দেওয়া হত, যাতে তারা পরকালে গিয়ে পুরুষটির কাজে আসতে পারে। ফিজিতে ‘ভাকাতোকা’ নামে এক ধরনের বীভৎস রীতি প্রচলিত ছিল যেখানে একজনের হাত-পা কেটে ফেলে তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেই কর্তিত অঙ্গগুলো খাওয়া হত। আফ্রিকার বহু জাতিতে হত্যার রীতি চালু আছে মৃত-পূর্বপুরুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্য। এগুলো সবই মানুষ করেছে ধর্মীয় রীতি-নীতিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, অদৃশ্য ঈশ্বরকে তুষ্ট করতে গিয়ে। এগুলোকে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ছাড়া কি বলা যায়? ইতিহাসের পরতে পরতে অজস্র উদাহরণ লুকিয়ে আছে- কীভাবে বিশ্বাসের ভাইরাসগুলো আণবিক বোমার মতোই মারণাস্ত্র হিসেবে কাজ করে লক্ষ কোটি মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়েছে। ধর্মযুদ্ধগুলোই তো এর বাস্তব প্রমাণ। প্রমাণ। ১০৯৫ সালে সংগঠিত প্রথম ক্রুসেড এর কথাই ধরা যাক। সে সময় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয় এবং বাস্তুচ্যুত করা হয়। জেরুজালেমের প্রায় প্রতিটি অধিবাসীকে হত্যা করা হয়েছিল শহর ‘পবিত্র’ করার নামে। তৃতীয় ক্রুসেডে তিন হাজার জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ক্রুসেডের সময় সেন্ট বার্ণাড ফতোয়া দিয়েছিলেন – ‘প্যাগানদের হত্যার মাধ্যমেই খ্রিষ্টানদের মাহাত্ম্য সূচিত হবে। আর যিশুখ্রিস্ট নিজেও এতে মহিমান্বিত হবেন।’ এই ক্রুসেডগুলো কি ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’-এর উদাহরণ নয়? ১২০৯ সালে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট উত্তর ফ্রান্সের আলবেজেনসীয় খ্রিষ্টানদের উপর আক্ষরিক অর্থেই ধর্মীয় গণহত্যা চালিয়েছিলেন। স্রেফ চেহারা দেখে বিশ্বাসী এবং অধার্মিকদের মধ্যে পার্থক্য করতে অসমর্থ হয়ে পোপ তখন আদেশ দিয়েছিলেন – ‘সবাইকে হত্যা কর’। পোপের আদেশে প্রায় বিশ হাজার বন্দিকে চোখ বন্ধ করে ঘোড়ার পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর বার শতকের দিকে সাড়া ইউরোপ জুড়ে আলবেজেনসীয় ধর্মদ্রোহীদের খুঁজে খুঁজে হত্যার রীতি চালু হয়। ধর্মদ্রোহীদের কখনো পুড়িয়ে, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে কখনো বা শিরচ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। পোপ চতুর্থ ইনোসেন্ট এই সমস্ত হত্যায় প্রত্যক্ষ ইন্ধন যুগিয়েছিলেন। কথিত আছে ধর্মবিচরণ সভার সংবীক্ষক (Inquisitor) রবার্ট লী বোর্জে এক সপ্তাহে ১৮৩ জন ধর্মদ্রোহীকে হত্যার জন্য পাঠিয়েছিলেন। ইতিহাস কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক ডেথ’ এর সময়(১৩৪৮- ১৩৪৯) বহু ইহুদীকে সন্দেহের বশে জবাই করে হত্যা করা হয়। পোড়ানো দেহগুলোকে স্তূপ করে মদের বড় বড় বাক্সে ভরে ফেলা হয় এবং রাইন নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তারপর ধরা যাক মধ্যযুগে ডাইনি হত্যার নামে নারীদের হত্যার অমানবিক দৃষ্টান্তগুলো। সে সময় (১৪০০ সালের দিকে) চার্চের নির্দেশে হাজার হাজার রমণীকে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করে পুড়িয়ে মারা শুরু হয়। এই ডাইনি পোড়ানোর রীতি এক ডজনেরও বেশি দেশে একেবারে গণহিস্টেরিয়ায় রূপ নেয়। সে সময় কতজনকে যে এরকম ডাইনি বানিয়ে পোড়ানো হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। সংখ্যাটা এক লক্ষ থেকে শুরু করে ২০ লক্ষ ছড়িয়ে যেতে পারে। ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়ের’ মতই ডাইনি বাছতে গিয়ে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় করে দেয়া হয়েছে। সতের শতকের প্রথমার্ধে অ্যালজাস (Alsace) নামের ফরাসি প্রদেশেই প্রায় ৫০০০ জন ‘ডাইনি’কে হত্যা করা হয়, ব্যাম্বার্গের ব্যাভারিয়ান নগরীতে ৯০০ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়। ডাইনি পোড়ানোকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ধর্মীয় উন্মত্ততা সে সময় অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ম্লান করে দিয়েছিল। শুধু নারীরা নয়, খ্যাতিমান বিজ্ঞানী দার্শনিকেরাও রেহাই পাননি রক্তলোলুপ চার্চের কোপানল থেকে। জিওর্দানো ব্রুনোর মত দার্শনিককে বাইবেল-বিরোধী সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব সমর্থন করার অপরাধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয় সে সময়, গ্যালিলিওকে করা হয় অন্তরিন। আর আমাদের উপমহাদেশে তো ধর্মীয় কুসংস্কার ছিল রীতিমত ভয়াবহ। পনের শতকে ভারতে কালীভক্ত কাপালিকের দল মা কালীকে তুষ্ট করতে গিয়ে ২০ লক্ষ মানুষকে জবাই করে হত্যা করেছিল। আর ছিল সতীদাহ। কেবল ১৮১৫ থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে ৮১৩৫ নারীকে সতীদাহের নামে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় (প্রতিবছর হত্যা করা হয় গড়পড়তা ৫০৭ থেকে ৫৬৭ জনকে)। মৌলবাদী খ্রিষ্টানরা ইদানীংকালে ডাইনি পোড়ানো বাদ দিলেও অ্যাবরশন ক্লিনিকগুলোর উপর রাগ যায়নি এখনো। ১৯৯৩ থেকে আজ পর্যন্ত ‘আর্মি অব গড’ সহ অন্যান্য গর্ভপাত বিরোধী খ্রিস্টান মৌলবাদীরা আট জন ডাক্তারকে হত্যা করেছে। ক’বছর আগেও (২০০৯ সালে) নৃশংসতার সর্বশেষ নিদর্শন হিসেবে খ্রিস্টান মৌলবাদী স্কট রোডার কর্তৃক ডঃ জর্জ ট্রিলারকে হত্যার ব্যাপারটি মিডিয়ায় তুমুল আলোচিত হয়। ন্যাশনাল অ্যাবরশন ফেডারেশনের সরবরাহকৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৭ সালের পর থেকে আমেরিকা এবং ক্যানাডায় গর্ভপাতের সাথে জড়িত চিকিৎসকদের মধ্যে ১৭ জনকে হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়, ৩৮৩ জনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়, ১৫৩ জনের উপর চড়াও হওয়ার এবং ৩ জনকে অপহরণের ঘটনা ঘটে। ইতিহাসের পাতা থেকে এ ধরণের শতাধিক নমুনা আমরা হাজির করেছিলাম ‘অবিশ্বাসের দর্শন’[36] এবং ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’[37] বইয়ে। কাজেই এগুলোর পুনরুল্লেখ করা এখানে নিষ্প্রয়োজন। কেবল বলা হল এ কারণেই যে ধর্মীয় নির্দেশনা অতীতে ভাইরাসরূপে কাজ করেছে, এখনো এর প্রভাব আছে পুরোমাত্রায়।

পারভেজ সাহেব স্বীকার করুক আর নাই করুক, আমার চোখে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বহু জায়গায় মুক্তচিন্তার মানুষজনের উপর ক্রমাগতভাবে ইসলামের তাগুদি সেনাদের আক্রমণ, ব্যঙ্গচিত্র আঁকার জন্য কার্টুনিস্টদের উপর আক্রমণ, ধর্মের সমালোচনামূলক লেখালিখি এবং চলচ্চিত্র বানানোর কারণে আক্রমণ এবং আগ্রাসনের প্রকোপটা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস আক্রান্ত মননের’ ফসল ছাড়া কিছু মনে হয়নি। শাহবাগ আন্দোলনের উত্তাল সময়গুলোতে মুফতি জসিমের নির্দেশে সাতজনের দল গঠন করে থাবা বাবাকে পল্লবী থানার সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থের বাণী এবং ধর্মগুরুদের দিকনির্দেশনা কীভাবে আজও জিহাদি প্রেরণা হিসেবে কাজ করে যায় ভাইরাস-আক্রান্ত মননের মাঝে- তার একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ ছিল রাজীব হত্যার ঘটনাটি। যারা ভাবেন, এই আগ্রাসনের পেছনে কোন ধর্মীয় উন্মাদনা বা প্রেষণা কাজ করেনি, পুরোটাই কেবল ‘পলিটিকাল কিলিং’ কিংবা ‘শাহবাগ আন্দোলন কে ভিন্নদিকে ঘোরাবার অভিসন্ধি’ টাইপের কিছু ছিল, তারা বোকার স্বর্গে বাস করেছেন। তারা ইসলামিস্টদের সাইটগুলো (দেখুন এখানে, কিংবা এখানে), সাইটে বর্ণিত কোরান হাদিসের আয়াত এবং ব্যাখ্যাগুলো পর্যালোচনা করলে বুঝবেন, এই ‘মিম’ এর অনুসারীরা সত্যই মনে করে রসুলকে কেউ অবমাননা করলে কিংবা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

রাজীবকে হত্যাকারীরা নিজেদের স্বীকারোক্তিতেই বলেছিল যে, ‘ঈমানী দায়িত্ব পালনের জন্য’ রাজীবকে হত্যা করা হয়েছে। তারা যেভাবে কিংবা যে কারণে রাজীবকে হত্যা করেছে, সেটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়, এর সমর্থন খোদ ধর্মগ্রন্থেই আছে, আছে পয়গম্বরদের বিবিধ কাজকর্মে। ইসলামিস্টরাই তাদের সাইটে সহিংস হাদিসের উল্লেখ করেছেন, তাদের কথা থেকেই আমরা জেনেছি, ইসলামের সূচনাকালে মহানবী মুহাম্মদ ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেসব সহিংস পন্থা ব্যবহার করেছিলেন, গুপ্তহত্যা ছিল তার অন্যতম। আবু আফাক, কাব ইবনে আশরাফ, আসমা বিন্তে মারওয়ান, আবু রাফে প্রমুখেরা ছিলেন এর অন্যতম শিকার। কিভাবে মহানবীর নির্দেশে এ গুপ্তহত্যাকাণ্ড সংগঠিত হত তা এখন ইন্টারনেটে সার্চ করলেই পাওয়া যায়। যেমন, নবী মুহম্মদের নির্দেশে গুপ্তহত্যার চল্লিশটি অথেন্টিক বিবরণ সংকলিত আছে উইকিইসলামে। মুক্তমনাতেও এ নিয়ে অনেক লেখা আছে (দেখুন এখানে)। তাই এখানে এর পুনর্বার উল্লেখ প্রয়োজনীয় নয়।

কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, মুহম্মদের পরবর্তীকালের অনুসারীরা মুহম্মদের প্রদর্শিত কাজগুলোই ভাইরাসের মত কপি করে করে একনিষ্ঠ-ভাবে পালন করেছেন বিভিন্ন সময়ে। ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ লেখার অপরাধে সালমান রুশদীকে হত্যার ফতোয়া দেয়া হয়েছিল খোমেনির পক্ষ থেকে ১৯৮৯ সালে। কয়েক বছর আগে আগে ডাচ চলচ্চিত্রকার থিও ভ্যানগগকে ও একইভাবে হত্যা করা হয় ‘ইসলামকে অপমান’ করার অজুহাতে। ডেনিশ কার্টুনিস্টদের উপরে সাম্প্রতিক হামলা এবং হত্যার পেছনেও একই মোটিভেশন কাজ করেছে যা করেছিল বাংলাদেশে থাবা বাবাকে হত্যার ক্ষেত্রেও। মূল অভিযোগ অবশ্যই তার ইসলামবিদ্বেষী লেখালিখির কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণের কিংবা ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকার। কেবল লেখার কারণে যেভাবে হুমায়ুন আজাদ কিংবা রাজীবকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা বোধ হয় রূপকথাকেও হার মানায়। নবী মুহম্মদের আমলে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ আবু রাফেকে হত্যার জন্য যেভাবে পাঁচজন সাহাবীর একটি দল গুপ্ত হত্যায় অংশ নিয়েছিল মুহম্মদের নির্দেশে, একই কায়দায় মুফতি জসিমের নির্দেশে সাতজনের দল গঠন করে থাবা বাবাকে পল্লবী থানার পলাশনগরের বাড়ির সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি। যারা এই অভূতপূর্ব সাদৃশ্য দেখেও না দেখার বা বোঝার ভান করেন, তারা হয় ‘বোকার স্বর্গে’ বাস করছেন, নয়তো নিজেদেরকেই প্রতারিত করে চলেছেন অহর্নিশি।

 

কেবল থাবা বাবার ঘটনাই কেবল নয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শার্লি এবদোর ঘটনা বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে রাজিবের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ লেখালিখির মতোই ‘মুহম্মদের ব্যঙ্গচিত্রের’ ঘায়ে ধর্মানুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসীরাও একই কাজ করেছে। কেন করেছে? কারণ তারা মনেই করে, আল্লাহ রসুলই নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন কেউ যদি ইসলামের অবমাননা করেন, তাকে মেরে ফেলতে হবে। নবী-রসুলদের ব্যঙ্গবিদ্রুপের শাস্তি যে মৃত্যুদন্ড এ সংক্রান্ত নানা হাদিস ফেসবুকেও ঘুরছে। যেমন এখানে এক ভদ্রলোক তার এই পোস্টে কিছু নমুনা হাজির করেছেন, কেউ চাইলে সেগুলো দেখে নিতে পারেন –

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাঃ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ কাব বিন আশরাফের ব্যাপারে কে আছো? কেননা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয়। তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামা দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি চান আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩৮১১}

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ যখন মক্কা বিজয়ের বছর মক্কায় প্রবেশ করেন,তখন রাসূল সাঃ এর মাথায় ছিল শিরস্ত্রাণ। তিনি মাথা থেকে তা খুললেন। সেসময় একজন এসে বললেন যে, ইবনে খাতাল কাবার গিলাফ ধরে বসে আছে। রাসূল সাঃ বললেন-তাকে হত্যা কর। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৭৪৯} ইবনে খাতালকে কেন কাবার গিলাফ ধরা অবস্থায়ও রাসূল সাঃ হত্যার নির্দেশ দিলেন? আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে বিস্তারিত ঘটনা উল্লেখ করে বলেন যে, লোকটি রাসূল সাঃ কে গালাগাল করত। {ফাতহুল বারী-২/২৪৮,আস সারেমুল মাসলূল-১৩৫}

হযরত আলী রাঃ থেকে বর্ণিত। এক ইহুদী মহিলা রাসূল সাঃ কে গালাগাল করত, মন্দ কথা বলত। তখন এক ব্যক্তি তার গলা চেপে ধরে, ফলে সে মারা যায়। তখন রাসূল সাঃ তার হত্যার বদলে হত্যাকে অগ্রহণীয় সাব্যস্ত করেছেন। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৬৪, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-১৩১৫৪,}

হযরত বারা ইবনে আজেব রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ একদা আব্দুল্লাহ বিন আতিক রাঃ কে আমীর বানিয়ে আবু রাফে ইহুদীকে হত্যা করতে পাঠালেন। আবু রাফে রাসূল সাঃ কে কষ্ট দিত এবং অন্যদের কষ্ট দিতে সাহায্য করত। আব্দুল্লাহ বিন আতিক বলেন, আমি তাকে প্রচন্ড আঘাত করলাম। কিন্তু হত্যা করতে পারিনি, তারপর তরবারীর ধারালো ডগা তার পেটে ঢুকিয়ে দিলাম এমনকি তা তার পিঠ ফুরে বেরিয়ে যায়। তখন আমি বুঝলাম যে, আমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছি। {সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩৮১৩}

সাহাবাগণ কর্তৃক রাসূল সাঃ কে অবমানকারীদের হত্যার নজীর:

১- ইবনে খাতালের দুই বাদি ছিল, যারা রাসূল সাঃ সম্পর্কে কুৎসামূলক গান গাইতো। মক্কা বিজয়ের দিন তাদেরও হত্যা করার নির্দেশ রাসূল সাঃ দেন। {আসাহহুর সিয়ার-২৬৬, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/৪৯৮} গান যদিও অন্যের বানানো, তবু গাওয়ার কারণে তাদের হত্যা করা হয়। সুতরাং যারা নিজেরাই বানিয়ে নোংরা কথা রাসূল সাঃ সম্পর্কে বলে,তাদের ব্যাপারে কি বিধান হবে তা সহজেই অনুমেয়।

২- এমনিভাবে মক্কা বিজয়ের দিন হুয়াইরিস বিন নাকীজ নামের এক কুলাঙ্গার যে রাসূল সাঃ কে কষ্ট দিত, তাকেও হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়। {আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৪/২৯৮} হুয়াইরিসকে হযরত আলী রাঃ হত্যা করেন। {আসাহহুস সিয়ার-২৬৪}

৩- মদীনায় আবু ইফক নামে এক কুলাঙ্গার ছিল। সে রাসূল সাঃ সম্পর্কে কুৎসামূলক কবিতা রচনা করে, তখন রাসূল সাঃ তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলে সালেম আমের নামে একজন সাহাবী তাকে হত্যা করেন। {সীরাতে ইবনে হিশাম-৪/২৮৫}

৪- বনী উমাইয়্যার এক কবি মহিলা ছিল। যার নাম আসমা বিনতে মারওয়ান। সে আবু ইফকের হত্যা দেখে ইসলামকে ঠাট্টা করে কবিতা রচনা করে। তখন রাসূল সাঃ তাকে হত্যার নির্দেশ দিলে উমায়ের বিন আদল আল খাতামী রাঃ তার ঘরে গিয়ে তাকে হত্যা করে আসেন। এ সংবাদ রাসূল সাঃ কে জানালে রাসূল সাঃ খুশি হয়ে বলেন- হে উমায়ের! তুমি আল্লাহ ও তার রাসূলকে সাহায্য করেছো। {সীরাতে ইবনে হিশাম-৪/২৮৬}

৫- গুরফা বিন হারেস আল কিন্দী নামের একজন সাহাবী ছিলেন। তিনি এমন ব্যক্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। যার সাথে এ চুক্তি ছিল যে, তার জান-মালের হিফাজতের দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের। বিনিময়ে সে ইসলামী রাষ্ট্রে কোষাগারে কর জমা দিত। ইসলামের পরিভাষায় যাকে জিম্মি বলা হয়। হযরত গুরফা বিন হারেস আল কিন্দী জিম্মি লোকটিকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। লোকটি জবাবে রাসূল সাঃ কে গালি দিল। হযরত গুরফা রেগে লোকটিকে সেখানেই হত্যা করে ফেলেন। এ সংবাদ হযরত আমর বিন আস রাঃ এর কাছে পৌঁছলে তিনি গুরফাকে বললেন, এ লোকের সাথেতো আমাদের অঙ্গিকার আছে। সে হিসেবে সে তো নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য। তুমি তাকে হত্যা করলে কেন? গুরফা জবাব দিলেন- “তার সাথে আমাদের অঙ্গিকার একথার উপর নয় যে, সে আল্লাহ ও রাসূল সাঃ কে গালাগাল দিবে আর আমরা তার হিফাজত করবো”। {হায়াতুস সাহাবা-২/৩৫১, উর্দু এডিশন}

গুস্তাখে রাসূলের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। ইজমায়ে উম্মতের দৃষ্টিতে কুরআন হাদীস, সীরাত ও ঐতিহাসিক গ্রন্থ এবং মুজতাহিদ ইমামদের ইজমা তথা সর্বসম্মত মতানুসারে এ কথা প্রমানিত হলো যে, রাসূল সাঃ কে কটূক্তিকারী, তার নরম দিলে চোট প্রদানকারী জালেম, নরাধম, নাস্তেক, মুরতাদের শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড।

 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, থাবা বাবাকে হত্যার পর আনসারুল্লাহটিমের বানানো যে ভিডিও ছাড়া হয়েছিল ইউটিউবে আর ফেসবুকে, সেটার কথা স্মরণ করা যেতে পারে এখানে। উপরে বর্ণিত এ ধরণের হাদিসগুলোর ভিত্তিতেই ঐ হত্যাকে জায়েজ করা হয়েছিল ভিডিওতে। ভিডিওতে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল, নবী মুহম্মদ যেভাবে কাব ইবনে আশরাফ, আসমা বিন্তে মারওয়ানের মত কবিদের হত্যা করেছিলেন ইসলামের আর নবীর বিষেদগার করার শাস্তি হিসেবে, ঠিক একই ভাবে থাবা বাবাকে মেরে ফেলাও জায়েজ হয়েছে। চিন্তা করে দেখুন প্রাচীন কালের অশিক্ষিত ধর্মাবতারদের বাণী বুকে করে যেভাবে থাবা বাবা হত্যায় মোটিভেটেড হয়েছে একটা অত্যাধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ কিছু ছাত্র – এ থেকে বোঝা যায় এই ‘ডেঞ্জারাস মিম’ কতটা শক্তিশালী। আবুরাফেকে হত্যার জন্য যেরকম ৫/৬ জনের সাহাবীদের দল গঠন করা হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় থাবা বাবাকেও হত্যা করা হয়েছে, এবং তারা প্রকাশ্যেই বলে – যে কারণে ব্লগার রাজীবকে হত্যা করা ফরজ ছিল, এবং তার সব সহযোগীদের ও হত্যা করা ফরজ। শার্লি এবদোর সাম্প্রতিক ঘটনাও একই ভাইরাসের সংক্রমণ দিয়ে প্রভাবিত বলে আমি মনে করি। তবে এ সব সহিংসতার পেছনে কেবলমাত্র ধর্ম নয়, জটিল বৈশ্বিক রাজনীতির খেলাও বহুলাংশে জড়িত।

এ নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ইহুদি নাসারা, আমেরিকা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব

নাস্তিকের ধর্মকথা, পারভেজ সহ অনেকেরই লেখার মূল সুরটি হচ্ছে, ধর্মকে এবং ধর্মীয় সহিংসতাকে বিশ্লেষণ করতে হলে ভাইরাস ফাইরাস নয়, রাজনীতি, সমাজ সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি দরকার। রাজনীতির ব্যাপারটা কেউ অস্বীকার করছে না। আমি যখন লিখি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হাজির করি বৈকি। আমার ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইয়েই কিন্তু আছে –

প্যালেস্টিনীয়দের বঞ্চিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে নগ্ন ভাবে সমর্থন করেছে তাও মুসলিম সমাজকে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে। এই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আর প্রতিহিংসার ব্যাপারগুলো ভুলে গেলে কোন আলোচনাই কখনও সম্পূর্ণ হতে পারে না’।

কিংবা একই বইয়ে এও বলেছি –

জনবিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র না পাওয়া কিংবা সাদ্দামের সাথে আল-কায়েদার কোনো সম্পর্ক না খুঁজে পাওয়া কিংবা জৈব-যুদ্ধাস্ত্র না পাওয়া সত্ত্বেও নির্লজ্জভাবে ইরাকের উপর যে আগ্রাসন চালিয়েছে তা শুধু যে আমেরিকার চিরচেনা সাম্রাজ্যবাদী চেহারাটাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে তা নয়, ইসলামি বিশ্ব এই আগ্রাসনকে যেকোনো কারণেই হোক ‘ইসলামের উপর আঘাত’ হিসেবে নিয়েছে। সেজন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেসমস্ত দেশেই ইসলামি আত্মঘাতী বোমা হামলার মাত্রাটা বেশি যে দেশের সরকার ইরাক যুদ্ধে বুশ-ব্লেয়ারকে নগ্ন ভাবে সমর্থন করেছে। প্যালেস্টাইনিদের বঞ্চিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে নগ্নভাবে সমর্থন করেছে তাও মুসলিম সমাজকে সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে। এই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া আর প্রতিহিংসার ব্যাপারগুলো ভুলে গেলে কোনো আলোচনাই কখনো সম্পূর্ণ হতে পারে না। আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ করাও বোধহয় এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে ধর্ম ও মৌলবাদকে লালন করে, পালন করে আর সময় বিশেষে উস্কে দেয় তার একটি বাস্তব প্রমাণ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিজ্ঞানীরা স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা করবে কি করবে না, কৃত্রিমভাবে সংযুক্ত জীবন রক্ষাকারী যন্ত্র তুলে ফেলা হবে কি হবে না, স্কুলে বিবর্তনবাদ পড়ানো হবে কিনা, আর হলে কী ভাবেইবা পড়াতে হবে, সবকিছুই সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। বিজ্ঞানীদের গবেষণা আর কাজকর্ম নৈতিক না অনৈতিক- এ নিয়েও উপযাজক হয়ে জ্ঞানগর্ভ মত দিতে এগিয়ে আসছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত অর্ধশিক্ষিত পাদ্রি আর যাজকেরা। যুদ্ধের আগে নবী-রাসুলদের মতোই ‘ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর’ শুনতে পেয়েছে সে দেশের প্রেসিডেন্ট; মিডিয়া, বৃহৎ পত্রিকা গোষ্ঠী আর প্রকাশক নির্ধারণ করে দিচ্ছে কোন্‌ খবরে আমরা বিশ্বাস করব, আর কোন খবর চেপে যাওয়া হবে। আসলে ‘মুক্ত বিশ্বের’ কথা মুখে বলে এভাবেই নাগরিক রুচি, চাহিদা, চেতনা আর পুরো জীবনধারাকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে ধর্মান্ধ শাসককুল আর ধনকুবের গোষ্ঠী…’

এগুলো কি রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বিশ্লেষণ নয়? এ ধরণের অনেক বিশ্লেষণই পাবেন পাঠকেরা যদি তারা বইটি পড়েন। হ্যাঁ, বইটি ‘পড়া’র উপর গুরুত্ব দিচ্ছি, কারণ, কারো ধারণা খণ্ডন করে লিখতে হলে আগে তার কাজ এবং বইটি পড়ে দেখা উচিৎ।

পারভেজ আলম সেই কাজটিই করেছেন যেটা আমি না ভাবলেও অনেকেই হয়তো অন্যায় বলে ভাববেন। উনি আমার বইটি পড়েননি (সেটা উনি লেখাতেই স্বীকার করেছেন), কিন্তু আমার ধারণা খণ্ডন করতে মাঠে নেমেছিলেন। শুধু নামেননি, আমাকে অযথা ট্যাগিং করেছেন। নিজে ব্যক্তিআক্রমণ শুরু করে পরে আমাকে দোষারোপ করেছেন মিথ্যাচারের এবং ব্যক্তি আক্রমণের, যেটা একেবারেই অন্যায়। যেটা ভাল লাগেনা সেটা পড়ব না – এই মনোভাবটা সরাসরি না হলেও নাস্তিকের ধর্মকথার লেখাতেও আছে। যেমন উনি তাঁর লেখার এক জায়গায় বলেছেন –

‘আমি মিমতত্ত্ব, বিশ্বাসের ভাইরাস নিয়ে আগ্রহবোধ করিনি। কারণ, মানব সমাজ- মানব প্রকৃতি- মানব ইতিহাসকে বুঝতে এইসব তত্ত্বকে আমার আবশ্যক মনে হয়নি। এর চাইতেও অন্য আরো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমাকে অধিক সন্তুষ্ট করে বলেই- এতে আগ্রহ পাইনি’।

এই মনোভাব বিপজ্জনক। যেহেতু এটা নিয়ে আগ্রহবোধ করেননা, তাই এটা পাতে নেয়া যাবে না, পড়ার চেষ্টা, জানার চেষ্টা করা যাবে না, কিন্তু না পড়েই বোধ করি আক্রমণ করা যাবে। আমার মতে, এই ধরণের অবিমৃষ্যকারিতার জন্যই কেবল দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ‘দলীয়’ কাঠামোতেই ঘোরাফেরা করে। বামেরা কেবল বামের কাঠামোতেই সব বিচার করবে, অন্য কিছু ‘পুঁজিবাদী ষড়যন্ত্র’, ডানেরা আবার যে কোন বাম বিশ্লেষণই অগ্রাহ্য করে, আওয়ামীলীগ তাদের দলীয় বুদ্ধিজীবীদের ছাড়া সবাইকেই রাজাকার বানায়, বিএনপি জামাত আবার তাদের তাঁবেদার দলকানা টোকশোজীবী ছাড়া কাউকে পড়ার বা জানার যোগ্য মনে করে না। কিছু মুমিন যে কোরান নামক মহাগ্রন্থ ছাড়া সবকিছুকেই বাতিল করে দেয় – এই মনোভাবও সেই সংকীর্ণ মনোভাব থেকেই উৎসারিত। জানতে হলে পড়তে হবে, পছন্দনীয় না হলেও। নাস্তিকের ধর্মকথার লেখা পড়ে কারো মনে হবে না যে তিনি কোরানের মতাদর্শে বিশ্বাস করেন। কিন্তু তারপরেও তিনি কোরান পড়েছেন, তার আয়াতগুলো কনটেক্সট অনুযায়ী বিশ্লেষণ করেছেন, কোরানে চার বিয়ে করার উল্লেখ আছে কিনা, দাসী সহবত করার প্রমাণ আছে কিনা, জিহাদ করার আহ্বান আছে কিনা – সব কিছুই উনি আগ্রহ নিয়ে পড়েছেন, জেনেছেন এবং কিছুক্ষেত্রে লিখেছেনও। অথচ যে কেউ বলতে পারে, মানব সমাজ- মানব প্রকৃতি- মানব ইতিহাসকে বুঝতে ১৪০০ বছর আগেকার একটা বই আমার আবশ্যক মনে হয়নি। এর চাইতেও অন্য আরও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমাকে অধিক সন্তুষ্ট করে। হয়তো সেটা ঠিক, কিন্তু উনি নিজেও জানেন ইসলামি সহিংসতাকে বুঝতে হলে, মুসলিমদের মানসজগতের সাথে পরিচিত হতে হলে কোরান হাসিদ না পড়লে বিশ্লেষণ পূর্ণ হবে না। পড়ার কোন বিকল্প নেই।

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে বিশেষত আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে যা বলা হয়, তার সাথে আমি একমত পোষণ করি, এবং এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই বলেই আমি মনে করতাম। আমি নিজেও কাশ্মীরীদের জন্য লিখেছি, প্যালেস্টাইনদের অধিকারের কথা বলেছি আমার বহু লেখাতেই, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিভাবে ধর্মের শোষণ জিইয়ে রেখেছে, অতীতে মৌলবাদকে ব্যবহার করছে তার উল্লেখ যথেষ্টই আছে আমার লেখায়। যেমন, ‘অলস দিনের ভাবনা’ নামের একটা লেখায় বলেছিলাম –

‘যারা আমেরিকার ‘গণতান্ত্রিক’ মূল্যবোধে উদ্বেলিত থাকেন তারা ভুলে যান এই গণতান্ত্রিক আমেরিকাই ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে স্বৈরশাসক শাহকে ক্ষমতায় বসায়, ভিয়েতনামে সৈন্য প্রেরণ করে গণহত্যা চালায়, ১৯৭৫-৭৬ এ ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে ক্যু করে সরিয়ে সুহার্তোকে ক্ষমতায় বসায়, আর পরবর্তীতে সুহার্তোর নির্বিচার গণহত্যাকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দান করে। প্রায় একই সময় স্বৈরশাসক পলপট – যিনি নিজ দেশে ১.৬ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী – তাকে পর্যন্ত নিজ স্বার্থে সমর্থন দান করে ‘অ্যান্টি-কমিউনিস্ট’ আমেরিকা। তারা একটা সময় এলসালভাদর এবং আর্জেন্টিনার স্বৈরশাসকদের সমর্থন করে, নিকারাগুয়ার গণতন্ত্র উৎখাত করে, জিয়াউল হকের মতো মৌলবাদী সরকারকে ‘মিত্র’ হিসেবে গ্রহণ করে, আর তার ওহাবী –ইসলাম বিস্তারে সাহায্য করে। চিলির স্বৈরশাসক পিনোচেটকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে, এমনকি সোভিয়েত রাশিয়ার আফগানিস্তান আক্রমণের ছয় মাস আগে থেকেই ওসামা বিন লাদেনকে সাহায্য আর সমর্থন যুগিয়ে ‘প্রকৃত লাদেন’ হিসেবে গড়ে তোলে এই গণতান্ত্রিক আমেরিকা। ইসলামী মৌলবাদের পীঠস্থান সৌদি আরব আর তার রাজতন্ত্রকে তো এখনো মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে চলেছে। সবকিছু না হয় বাদই দিলাম – ১৯৭১ সালে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানী গণহত্যা আর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ‘গণতান্ত্রিক আমেরিকার’ ভূমিকা কি ছিল তা সবাই জানে’।

এ ধরনের অনেক কিছু নিয়েই আমি অতীতে লিখেছি। কিন্তু –এ কথাও আমি স্পষ্ট করে বলব – মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সমস্যা হলেও আমি মনে করি না সেটা ইসলামি সন্ত্রাসবাদের কারণ। নিঃসন্দেহে তালিবান এবং আইসিসের উত্থানে আমেরিকার বড় সড় ভূমিকা ছিল অতীতে, নিঃসন্দেহে প্যালেস্টিনীয় মুসলিমেরা নিদারুণভাবে অত্যাচারিত। অস্বীকার করার জো নেই। কিন্তু সেরকম বাস্তুচ্যুত এবং অত্যাচারিত তিব্বতিরাও। চীনা শাসকেরা মিলিয়নের উপর তিব্বতি জনগণকে হত্যা করেছে, কঠোরভাবে নিশ্চিহ্ন করেছে তাদের স্বাধিকারের দাবীকে। তিব্বতিদের নেতা দালাই লামাকে আজ পালিয়েই বেড়াতে হয় এক দেশ থেকে দেশান্তরে। কিন্তু এতো কিছুর পরেও তিব্বতিদের মধ্যে আল কায়দা, আইসিস, বোকো হারামের মতো কোন জঙ্গি সংগঠন দেখা যায়নি। দেখা যায়নি সুইসাইড বোম্বারদের আধিক্য। আসলে চোখ বুজে থাকার চেষ্টা হলেও ইসলামি সন্ত্রাসবাদের উৎস মূলত ইসলামেই নিহিত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ একটা সমস্যা, কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কারণে কোরআনে ‘যেখানেই অবিশ্বাসীদের পাওয়া যাক তাদের হত্যা’ করার আয়াত, ‘তাদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হবার’ আয়াত, বিধর্মীদের উপর ‘জিজিয়া কর আরোপ করার’ আয়াত, ‘গর্দানে আঘাত করার’ আয়াত পয়দা হয়নি। ধর্মগ্রন্থগুলোতে নারীদের অবরুদ্ধ রাখার, উত্তরাধিকার কিংবা সাক্ষীসাবুদের ক্ষেত্রে বঞ্চিত করার, শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনা করার, কিংবা যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে সহবাসের আয়াত, অথবা ব্যভিচারী নারীদের পাথর ছুঁড়ে হত্যার নির্দেশ মার্কিনরা করে যায়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মহানবী মুহাম্মদ নিজে ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে বনি কুয়ানুকা, ৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বনি নাদির আর ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে বনি কুরাইজার ইহুদি ট্রাইবকে আক্রমণ করে তাদের হত্যা করেন। বনি কুয়ানুকার ইহুদিদের সাতশ জনকে এক সকালের মধ্যে হত্যা করতে সচেষ্ট হন (কিন্তু ‘ভণ্ড’ বলে কথিত আব্দুল্লাহ ইবনে ওবাইয়ের হস্তক্ষেপে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি), আর বনি কুরাইজার প্রায় আটশ থেকে নয়শ লোককে আব্দুল্লাহর বাধা উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেই ফেলেন, এমন কি তারা আত্মসমর্পণ করার পরও। হত্যার ভয়াবহতা এতই বেশি ছিল যে, ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর মতো লেখিকা, যিনি মুসলিম সমাজের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থানীয় হিসবে গণ্য হন, তিনি পর্যন্ত এধরনের কর্মকাণ্ডকে নাৎসি বর্বরতার সাথে তুলনা করেছেন। কিন্তু তারপরেও অনেকেই আবার আছেন যারা ইতিহাস এবং বাস্তবতা ভুলে কেবল আমেরিকাকেই সব সময় ইসলামি সন্ত্রাসবাদের উৎস বলে মনে করেন। হিন্দুদের সতীদাহের বলি হয়ে হাজার হাজার নারীকে পোড়ানো হয়েছিল অতীতে। এটা যেমন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য হয়নি, ঠিক তেমনি, মুসলিম বিশ্বে সমকামীদের ঘৃণা, সৌদী আরবে মেয়েদের ড্রাইভিং করতে না দেয়া, নাইজেরিয়ায় মেয়েদের ব্যাভিচারের জন্য পাথর মারা,মেয়েদের স্কুল থেকে উঠিয়ে নিয়ে বিক্রি করে দেয়া, কিংবা ইসলামের তাগুদি সেনাদের আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে কাফিরদের শিরোচ্ছেদ করা – কোনটাই কেবল মার্কিনদের জন্য হয়নি। মুসলিম ফান্ডামেন্টালিজম এবং সন্ত্রাসবাদের উত্থান যদি সমস্যা হয়ে থাকে, তবে সমস্যার মূল কারণ হলো, ফান্ডামেন্টালস অফ ইসলাম

কিন্তু যখনই নতুন কোন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে মূল ব্যাপারটা এড়িয়ে অনেক প্রগতিশীল বামপন্থি লোকজন নানাপদের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নিয়ে আসেন। এক বামপন্থি ঘরানার ভদ্রলোক আছেন (পারভেজ নন, নাস্তিকের ধর্মকথা তাঁকে চেনেন, উনার সাম্প্রতিক নানাবিধ কুযুক্তির সাথে পরিচয় আছে তাঁর), ফেসবুকে খুব এক্টিভ। একসময় সমকাল পত্রিকায় লিখতেন, সচলায়তনে ব্লগিং করতেন, পরে নানা ঘাটের পানি খেয়ে অবশেষে পুঁজিবাদী ঘরনার ‘নিরপেক্ষ’ পত্রিকা প্রথম আলোর কলামিস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যখনই ইসলামী সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটে, এই ভদ্রলোক নানা কায়দায় তাঁকে ঢাকার চেষ্টা করেন ইনিয়ে বিনিয়ে। যদিও ভারতে সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে সাথে সাথে বিজেপি কানেকশন কিংবা মোদী কানেকশন পেয়ে যেতে তার অসুবিধা হয় না, স্ত্রী-কানেকশন থাকার ফলে মেহেরজানের মতো ছবির পক্ষে ওকালতি করে সিরিজের পর সিরিজ লিখতেও সমস্যা হয় না, কিন্তু যত ঝামেলা লেগে যায় ইসলামের নামে বিশ্বে কোথাও সন্ত্রাস হলেই। নানাপদের হেজিমনি, শ্রেনীসংগ্রাম, পশ্চিমা শোষণ, সর্বহারা বিপ্লবের তত্ত্ব লাইম লাইটে চলে আসে তখন। মূল সন্ত্রাসের প্রেক্ষাপট যায় হারিয়ে। ফরহাদ মজহার যেমন একসময় বাংলা ভাই এবং জেএমবির সদস্যদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন তার ‘মার্কসীয়’ তত্ত্ব কপচিয়ে, প্রায়শই তেমন বিশ্লেষণ দেখা যায় তাঁর লেখাতেও। আমার মনে আছে ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে তাজ হোটেলে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটার পর পরই (উনি তখন সচলায়তনে খুব এক্টিভ) বড় সড় ব্লগ লিখে ফেলেছিলেন, যার মর্মাথ ছিল – যেহেতু এ ঘটনায় বিজেপি লাভবান হবে, কাজেই চোখ বুজে বলা যায় এটা তাদেরই কাজ। পরে অবশ্য ঠিকই বেরিয়ে গিয়েছিল ওটা ছিল ইসলামী সন্ত্রাসবাদী দল লস্কর-ই-তৈয়বার কাজ। হ্যা, বিজেপি যে সন্ত্রাস করেনা তা নয়, ভালই করে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস থেকে শুরু করে গুজরাতের দাঙ্গা কিংবা বর্তমানে মুসলিমদের জোর করে হিন্দুধর্মান্তকরণ পর্যন্ত বহু জায়গাতেই আরএসএস, বিজেপি প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক শক্তির ইন্ধন আছে, কিন্তু যেখানে ইসলামের নামে সন্ত্রাস হয় (দুর্ভাগ্যজনকভাবে সারা পৃথিবীতে এটাই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান) তখনই উনার কলম থেকে আগুনের ফুলকির মত নানাপদের বিপ্লবী ‘ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব আবির্ভূত হতে থাকে। শার্লি এবদোর ঘটনার পরে উনি স্ট্যাটাসে বলেছেন, ‘ঘৃণাপ্রসূত কার্টুনে মুসলমানরা নাই’!! এমন একটা ভাব, শার্লি এবদো কেবল মুহম্মদকে নিয়েই ঠাট্টা করেছে। তা কিন্তু নয়, শার্লি এবদো মুহাম্মদ ছাড়াও যীশু থেকে শুরু করে হিটলার, ওবামা, পোপ সবাইকে নিয়েই কার্টুন এঁকেছে বিভিন্ন সময়। খ্রিস্টান ধর্মযাজক এবং পোপদের বালক প্রীতি নিয়ে, হিটলার নিয়ে, মেরিকে নিয়ে, যীশুর ‘ভার্জিন বার্থ’ নিয়ে অসংখ্য কার্টুন তাঁরা এঁকেছে। তাদের কার্টুনে পৃথিবীর বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা আর বিখ্যাত লোকজনদের নিয়েও প্রকাশ পেয়েছে তাদের মশকরা। এমন কোন বিষয় আশয় নেই যা নিয়ে তারা ঠাট্টাতামাসা করেনি। অথচ দেখা যাচ্ছে ‘ঘৃণাপ্রসূত কার্টুন’ কেবল মুসলিমদের ঘাড়ে গিয়েই পড়ছে, আর বামপন্থি বিশ্লেষক সেটা নানা উছিলায় জায়েজও করছেন। ‘ঘৃণাপ্রসূত কাজে মুসলমানরা নাই’ বলে যে নারকীয় ম্যাতকার, সে দাবীটিই বা কতটা যৌক্তিক? তাদের নামাজেই ‘সূরা লাহাব’ এর মতো ঘৃণা-প্রকাশকারী বচন আছে। নামাজ শেষে মসজিদের ইমামের প্রতিটি খুতবাতেই ইহুদি নাসারা এবং বিধর্মীদের প্রতি বিদ্বেষের উদ্গীরণ ঘটে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের মতোই ! সমস্যা হয় কেবল বিপরীত কিছু ঘটলেই।

শার্লি এবদোর ঘটনা ঘটার সময় আমি একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম:

‘প্যারিসে আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে ১২ জনকে হত্যা করেছে ব্যাঙ্গানুভুতির ইমানে খাড়া হওয়া তাগুদি জিহাদীরা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সহি ইসলামের সাথে এর কোন সম্পর্ক খোঁজা হবে হারাম কাজ। ধর্মকে ‘ভাইরাস’ বলে আখ্যায়িত করাও হবে কবিরা গুনা’।

ব্যাস – এক অনুভূতিসম্পন্ন পুঙ্গবের অনুভূতিতে মারাত্মক চোট লেগে গেল। ভদ্রলোকের যুক্তি, যদিও তাদের মুখ দিয়ে আল্লাহু আকবর বের হয়েছিল, নবীজিকে ডিফেন্ড করার ইচ্ছে প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু যেহেতু তাদের মুখ ছিল মুখোশে ঢাকা, তাদের ‘মুসলিম’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবেনা। ভদ্রলোক মন্তব্যে লিখলেন –

ismail_hossain_comment

আমি নিশ্চিত এ ধরণের মন্তব্যের সাথে অনেকেই কমবেশি পরিচিত। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ক্ষুরে মাথা কামানো এ সমস্ত ব্যক্তিরা কেবল ইসলাম ছাড়া ইহুদি, নাসারা, অভিজিৎ, মোসাদ সবার সাথেই সম্পর্ক খুঁজে পান। ইসলামের ক্ষেত্রেই কেমন যেন দিশা হারিয়ে ফেলেন তাঁরা। শার্লি এবদোর ঘটনার পর এমনি কিছু আকর্ষণীয় মন্তব্যের সাথে পরিচিত হওয়া গেল। এক ভদ্রলোক মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ভোট দেয়ায় ইহুদিরা নাকি এই আক্রমণ করেছে। আর কার্টুন অফিসে হামলা করে দোষ দিয়েছে মুসলিমদের। আরেকজন বলছেন ওটা নাকি মোসাদের কাজ –

shorojontro_coments

যদিও আমরা জানি বাস্তবতা ভিন্ন। সার্লি এবদোর সাথে জড়িত সন্ত্রাসবাদীরা ইহুদী নন, মোসাদ নন, অভিজিৎও নন, তাদের পরিচয় মিডিয়ার বদৌলতে সবারই জানা হয়ে গেছে। নামগুলো এবং ধর্মীয় পরিচয় না হয় আবার আমি নাই বললাম। পারভেজ সম্প্রতি একটি লেখা লিখেছেন ইস্টিশন ব্লগে ‘সেই সন্ত্রাস, এই সন্ত্রাস’ শিরোনামে। লেখাটিতে পারভেজ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন। আলজেরিয়ার উপর ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, ফ্রেঞ্চ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার মুক্তিসংগ্রাম, ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠনের ইতিহাস থেকে শুরু করে তালিবান এবং আইসিসের মতো সংগঠন কীভাবে আমেরিকার কারণে তৈরি হয়েছে, বাশার আল আসাদবিরোধী ইসলামিস্টদের কিভাবে আমেরিকা এবং ন্যাটো অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে এ সমস্ত নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন পারভেজ, কেবল একটি বিষয় ছাড়া – ইসলামের সাথে এই সন্ত্রাসের সম্পৃক্ততা। অথচ মিডিয়াতেই এসেছে কোরান, হাদিস এবং মুহম্মদের বিবিধ সহিংস কাজের প্রভাব সন্ত্রাসীদের উপর আছে, আছে মুহম্মদ-অনুপ্রাণিত উদাহরণ, তাদের আল কায়দার সাথে সম্পৃক্ততা ছিল, জিহাদের প্রশিক্ষণ নিতে ইয়েমেনে গিয়েছে, আন্ডারওয়ার বোম্বারের সাথে তাদের একজন রুম পর্যন্ত শেয়ার করেছে, আনওয়ার আল আলাকির জিহাদী ভিডিও দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছে, এবং আল কায়দা প্যারিসের হামলার দায়িত্ব পর্যন্ত স্বীকার করেছে – এগুলো সবই মিডিয়ায় এসেছে; কেবল পারভেজদের ‘রাজনৈতিক’ বিশ্লেষণে সেগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় না। অসম্পূর্ণ এবং ভ্রান্ত বিশ্লেষণ বলে যদি কিছু থেকে থাকে সেটাকেই কি বলা উচিৎ নয়?

france-bomb1kulabali

ইসলামের দুর্দশা আর অপবাদের পেছনে ইসলামের কোন দায় নেই, দোষ নেই মুসলিমদের – পুরোটাই বাইরে থেকে চাপানো পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এবং ঔপনিনেশিকতার – এটাই হচ্ছে এ ধরণের ‘রাজনৈতিক’ বিশ্লেষণের মূল সুর। এ ধরণের বিশ্লেষণই অধিকাংশ ধর্মভীরু মডারেট মুসলিমেরা চায়, এটাই তাদের পছন্দনীয়। কেন এই বিশ্লেষণ তা বুঝতে মডারেট মুসলিমদের মানসপটটা বোঝা বোধ করি জরুরী।

সহি ইসলামের খোঁজে

ইসলামের নামে সন্ত্রাস হলেই চারিদিকে শুরু হয়ে যায় জিকির – ‘ইহা সহি ইসলাম নয়’, ইসলাম খুব শান্তিপূর্ণ, ইসলাম সন্ত্রাস সমর্থন করে না ইত্যাদি। মডারেট মুসলিমেরা ফেসবুকে জানান সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই, তারা ব্যাখ্যা দেন – এই সব সন্ত্রাসীরা সত্যিকারের সহীহ মুসলিম না, সে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার কারণে এইসব সন্ত্রাস হচ্ছে। ইসলাম কখনোই এসব সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না। লন্ডন, মাদ্রিদ, টুইন টাওয়ার, সিডনী, পেশাওয়ার, কানাডা, কিংবা শার্লি এবদো যেখানেই সন্ত্রাস ঘটুক না কেন, এই সব ঘটনার সাথে যে ‘সহি ইসলামের’ কোন সম্পর্কে নেই, তা ‘সহীহ মুসলিম থিওরী’র সাহায্যে খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন তারা। কিন্তু এই ‘সমীহ মুসলিম থিওরী’ যে একটা ফ্যালাসি তা খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন আশরাফুল আলম মুক্তমনায় প্রকাশিত ‘সহীহ মুসলিম থিওরীর পূর্বাপর এবং একটি কুপ্রস্তাব’ শিরোনামের একটি প্রবন্ধে। তার প্রবন্ধ থেকে কিছু লাইন তুলে দিচ্ছি –

‘যুক্তিশাস্ত্রে বলা হচ্ছে, ফ্যালাসি একটা এমন ধরনের যুক্তি, যা আসলে অপযুক্তি – অর্থাৎ সেটা কখনো সত্য আবার কখনো মিথ্যা। কাজেই, সত্য-মিথ্যার যাচাই-বাছাইয়ের কাজে সেই অপযুক্তি বা মানদণ্ড ব্যবহার করা যাবে না, যেহেতু সে সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে পারে না। তবে সেটা শুনতে বেশ অকাট্য যুক্তির মতই শোনায়, এবং আগে থেকে জানা না থাকলে অনেকেই এই অপযুক্তির খপ্পরে পড়ে খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন। যারা সামাজিক গণমাধ্যমে যুক্তি-তর্কের মাঠের খেলোয়াড়, তারা এইসব ফ্যালাসির খবর রাখেন বলেই ধারণা করি। এমন একটা ফ্যালাসিকে বলা হয় ‘নো ট্রু স্কটসম্যান’ ফ্যালাসি। এই ফ্যালাসি একটা আশ্চর্য্যজনক মেশিন, যার একপাশ দিয়ে আপনি যা ইচ্ছা তাই প্রবেশ করান, অন্যপাশে আপনার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বের করে আনা যাবে। আপনি বলতে চান যে, সকল বাংলাদেশী শিক্ষিত। কথাটা বলেই ফেললেন হয়তো কাউকে। সে আপনাকে একজন অশিক্ষিত বাংলাদেশি সামনে এনে দেখাল। আপনি বললেন, এই লোক তো আসলে সত্যিকারের বাংলাদেশী না, কাজেই তাকে গোণা হবে না। ব্যাস, প্রমাণিত হয়ে গেল যে, সকল বাংলাদেশীই শিক্ষিত। এভাবে আপনি সকল বাংলাদেশী দেশপ্রেমিক, সকল বাংলাদেশী শান্তিপ্রিয়, সকল বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা, সকল বাংলাদেশী রাজাকার, সকল রাজাকারই মুক্তিযোদ্ধা, এগুলো অনায়াসে প্রমাণ করতে পারবেন। আবার, ধরুন, এরশাদ বললেন, সব বাংলাদেশিই প্রেমিক। আপনি তখন প্রেমিক নন এমন একজন বাংলাদেশীর উদাহরণ দিলেন। তখন এরশাদ বলবেন, হুম, তার মানে সে আসলে প্রকৃত বাংলাদেশীই না। খেয়াল করে দেখুন, “সব বাংলাদেশিই প্রেমিক” এই কথাটাই একটি এবং অসংজ্ঞায়িত/অপ্রমাণিত কথা, এবং এই অপ্রমাণিত কথার উপর ভিত্তি করে “প্রকৃত বাংলাদেশীই না” সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত আবার প্রথমে বলা “সব বাংলাদেশিই প্রেমিক” কথাটাকে প্রমাণ করছে। এভাবে চললে আপনি যত উদাহরণই হাজির করেন না কেন, প্রথম বাক্য “সব বাংলাদেশিই প্রেমিক” কে ভুল প্রমাণ করতে পারবেন না। এই “নো ট্রু স্কটসম্যান” ফ্যালাসিকে বাংলায় ত্যানা প্যাচানি বলা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়ঃ উনি সহিহ মুক্তিযোদ্ধা নন, উহা আসল হিন্দুধর্ম নহে, ইনি প্রকৃত রাজাকার না, উনি খাঁটি নাস্তিক না, তিনি প্রকৃত আওয়ামী লীগার না, ইত্যাদি দাবী করা হচ্ছে। এর প্রায় সবই অপযুক্তি’।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে যাদের জন্য বলা তারা যুক্তি বোঝে না, বুঝলে বোধ করি আমাদের এ সমস্ত লেখালিখি করার দরকার পড়তো না। যারা যুক্তি বোঝে না, তাদের জন্য স্যাটায়ারই সই। আইসিসের জবাই করার খবর প্রকাশিত হবার পর আমি ফেসবুকে সহি ইসলাম নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেই, আর পেশোয়ারের ঘটনার পর সেটাকে আরেকটু আপডেট করে দিয়েছিলাম এখানে :

– মক্কা বিজয়ের পর, মহানবী নাকি কাবার সমস্ত মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন। তালিবানরাও প্রায় একই কায়দায় আফগানিস্তান দখলের পর ঐতিহাসিক বৌদ্ধমূর্তি ধ্বংস করেছিল। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– বাংলাদেশে পূজার সময় যেভাবে প্রতিমা ভাঙা হয়, চিটাগং এ লালনের মূর্তি ভাঙা হয় – এগুলোর সাথে ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ইসলামী জিহাদের নামে গত বারো শতক ধরে সারা পৃথিবীতে মিলিয়নের উপর মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– সৌদি আরবে মেয়েদের বাইরে কাজ করার অধিকার নেই, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নেই, ড্রাইভিং এর অধিকার নেই, নেই পুরুষদের সমান সাক্ষ্য কিংবা উত্তরাধিকারেও। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ইসলামে বহু বিবাহের বৈধতা আছে,মুসলিম বিশ্বে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখারও বিধান আছে। কিন্তু তাতে কি। ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ইরানে সম্প্রতি দত্তক নেয়া কন্যা শিশুকে বিয়ে করার আইন পাশ হয়েছে, কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– মুসলিম দেশে গার্ল উপভোগ, কিংবা যুদ্ধের সময় তাদের যুদ্ধবন্দিনী ধর্ষণ, মালে গনিমত হিসাবে বিধর্মীদের স্ত্রী-কন্যাদের দখল – কোন কিছুর সাথেই ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– পাকিস্তানে এত দিনের সিয়া সুন্নি বিরোধ, মারামারি, হানাহানি, লোকক্ষয় – ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– আইসিস, আল্ কায়দা, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, ইসলামিক জিহাদ, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, জেইস-মুহম্মদ, জিহাদ-এ-মুহম্মদ, তাহ-রিখ-এ-নিফাজ-সারিয়াত-এ-মুহম্মদ, আল-হিকমা, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া, জমিয়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজি), শাহাদাত ই আল হিকমা ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), শাহাদাত-ই আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি, শহীদ নসুরুল্লাহ আল আরাফাত বিগ্রেড, হিজবুত তাওহিদ, জামায়াত-ই ইয়াহিয়া, আল তুরাত, আল হারাত আল ইসলামিয়া, জামাতুল ফালাইয়া তাওহিদি জনতা, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, জুম্মাতুল আল সাদাত, শাহাদাত-ই-নবুওয়ত, আল্লাহর দল, জইশে মোস্তফা বাংলাদেশ, আল জিহাদ বাংলাদেশ, ওয়ারত ইসলামিক ফ্রন্ট, জামায়াত-আস-সাদাত, আল খিদমত, হরকত-এ ইসলাম আল জিহাদ, হিজবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, মুসলিম মিল্লাত শরিয়া কাউন্সিল, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর জিহাদ, জইশে মুহাম্মদ, তা আমীর উদদ্বীন বাংলাদেশ, হিজবুল মাহাদী, আল ইসলাম মার্টায়ারস বিগ্রেড ও তানজীম – এত শত জঙ্গিদল ইসলাম কায়েমের বাসনা নিয়ে জিহাদ, কতল সবই করে যাচ্ছে, কিন্তু এদের কারো কর্মকান্ডের সাথেই ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারের ওপর আল কায়দা আত্মঘাতী বিমান হামলা চালায়। এই হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়ে। মারা যায় ৩০০০ আমেরিকান নাগরিক। আক্রমণকারীদের নেতা মোহাম্মদ আতা নিজেও তার সুটকেসে কোরআন বহন করছিলেন। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত আতার কাছ থেকে পাওয়া তার শেষ নির্দেশাবলীগুলোও সেই সাক্ষ্যই দেয় যে, তারা পবিত্র আল্লাহ এবং ইসলামের প্রেরণাতেই এই জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন (Last words of a terrorist, Guardian UK দ্রঃ)। কিন্তু তাতে কি! ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০০২ সালে বালি বোম্বিং, ২০০৫ সালে লণ্ডন পাতাল রেল বোম্বিং, দিল্লিতে ২০০৮ সালে বোম্বিং, বোস্টন ম্যারাথন বোম্বিং, নিদাল হাসানের শুটিং – কোন কিছুর সাথেই ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০০৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রথা-বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা চালায় মৌলবাদী একটি দল। চাপাতি দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয় তার দেহ, যা পরে তাকে প্রলম্বিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০০৪ সালের ২রা নভেম্বর চিত্র পরিচালক থিও ভ্যান গগকে প্রকাশ্যে রাস্তায় গুলি এবং ছুরিকাহত করে হত্যা করা হয়; নারীবাদী লেখিকা আয়ান হারসি আলীকেও মৃত্যু পরোয়ানা দেওয়া হয়। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নামের একুশ বছরের যে যুবক জিহাদ করতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গ্রেফতার হয়ে বিশ্বব্যাপী পত্র-পত্রিকার আলোচিত খবর হয়েছিলেন। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি ঘটনা। সৌদি আরবের এক হতভাগ্য নারী তার এক স্কুল-বন্ধুর কাছে থেকে একটি ছবি আনতে গিয়ে সেই বন্ধু আর তার ৬ জন সাঙ্গপাঙ্গদের দ্বারা ধর্ষিত হন। সৌদি আইনে (যার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের শরিয়া), হতভাগ্য নারীটিই উল্টে বিচারের রায়ে দুশোটি বেতের আঘাত পেয়েছেন, কারণ, তিনি সুরা নিসায় (৪:১৫) বর্ণিত ‘চারজন লোকের ইতিবাচক সাক্ষ্য’ আনতে পারেননি। তাই শরিয়া মতে – ‘বিনা প্রমাণে’ ধর্ষনের অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেন যে তিনি ‘বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কে’ জড়িত ছিলেন। কিন্তু তাতে কি, এটার সাথে ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। সহি ইসলামের সাথে সম্পর্ক নেই রেইহানার ফাঁসির ঘটনারও।

– ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজীব হায়দার শোভনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ধৃত অপরাধীরা স্বীকার করে ‘ঈমানী দায়িত্ব’ পালনের জন্য ইসলামবিদ্বেষী এই ব্লগারকে তারা হত্যা করেছে। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– ২০১৪ সালের মে মাসে নাইজেরিয়ার বোর্নো এলাকা থেকে ২২৩ জন স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে মুসলিম জঙ্গি দল বোকো হারাম। বিবৃতিতে তারা বলে, ‘মেয়েদের স্কুলে যাওয়া উচিৎ না। বরং তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিৎ। কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– আইসিস আজ কোরান এবং সুন্নাহ মতাবেক বিধর্মীদের ধরে ধরে জবাই করছে। সম্প্রতি পাথর ছুঁড়ে হত্যা করেছে ওক দম্পতিকে, সমকামীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলছে, কিন্তু ‘সহি ইসলাম’ এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

– অস্ট্রেলিয়ার সিডনীর ক্যাফেতে আইসিসের পতাকাবাহী যুবকের জিহাদী জোশপূর্ণ কর্মকাণ্ড এবং মানুষজনকে জিম্মি হিসেবে আটকে রাখার সাথে সহি ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

পাক তালিবান প্রধান সহি বুখারির রেফারেন্স দিয়ে বলেছে, তাদের পেশোয়ারে গনহত্যা মুহম্মদের জীবনী এবং হাদিস শরিফ দিয়ে সমর্থিত। পেশোয়ারে যা তারা করেছে, তা ইসলামী ‘সুন্নত’।  কিন্তু তারপরেও ….

পেশোয়ারে স্কুলের নিরপরাধ ছাত্রছাত্রীদের গুলি করে হত্যার বর্বোরেচিত সাম্প্রতিক ঘটনার সাথেও ‘সহি ইসলামের’ নাকি কোন সম্পর্ক নেই।

আমার মনে কেন যেন সন্দেহটা ক্রমশঃ ফুলে ফেঁপে উঠছে — ইসলামের সাথেই বোধ হয় ‘সহি ইসলামের’ কোন সম্পর্ক নেই

**************

পুরো স্ট্যাটাসটাই ছিল একটা স্যাটায়ারের মেজাজে লেখা। আমার বক্তব্য ছিল – সহি ইসলাম জিনিসটা যখন মডারেট মুসলিমেরাই আমদানি করেছেন, তাদেরকেই সংজ্ঞায়িত করতে হবে ব্যাপারটা ঠিক কি! কিন্তু আগেই দেখানো হয়েছে এই সহিহ ইসলামের পুরো থিওরীটাই ফ্যালাসিতে আচ্ছন্ন। ওটাকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা অনেকটা ‘বিবাহিত ব্যাচলর’ কিংবা ‘চারকোনা বৃত্ত’ সংজ্ঞায়িত করার মতোই শোনায়, আর সেটা খুঁজে পাবার চেষ্টা অনেকটা ইউকর্ন খুঁজে পাবার মতোই কষ্টকর আর কম সম্ভাব্য। আমি ভেবেছিলাম, আমার স্ট্যাটাসের শেষ লাইনটি [ইসলামের সাথেই বোধ হয় ‘সহি ইসলামের’ কোন সম্পর্ক নেই] থেকেই বোঝা সম্ভব ছিল স্যাটায়ারের মেজাজটি ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা বোঝা যায়নি। পারভেজ তো বটেই, নাস্তিকের ধর্মকথাও সহি ইসলাম বলে যে কিছু নেই তা নিয়ে নিজেদের বড় সড় লেকচার দিয়েছেন। এর ধরকার ছিল না, কারণ সেটা আমি এমনিতেই জানি। নাস্তিকের ধর্মকথার মতোই আমি মনে করি – সহি হিন্দুইজম, সহি ইহুদি, সহি খ্রিস্টানিজম- এসব বলে কিছুই নাই। যেটা নেই তো নেই, কিন্তু যেটা আছে সেটা অস্বীকার করি কি করে? আমি মনে করি পারভেজ আলমের মতো আয়াতের ইন্টারপ্রেট খোঁজা মডার্ন সুফি ঘরনার মুসলিমরা যেমন ইসলামের ট্রেইট, ঠিক তেমনি বিন লাদেন কিংবা আইসিসের মতো ধর্মগ্রন্থের লিটারেল ইন্টারপ্রেটওয়ালারাও ইসলামের ট্রেইট। কাজেই ওদের কাজ ‘সহি ইসলামের’ সাথে সম্পর্কিত নয় ভাবাটাই হাস্যকর। প্রকৃত ইসলামের সাথে সন্ত্রাসীদের কোনোই সম্পর্ক নাই যারা মনে করেন, তাদের উদ্দেশ্যে এটাই বলা যায় যে, এই ‘সন্ত্রাসী’রা কিন্তু ভাবে যে তারাই সাচ্চা মুসলিম, যারা কিনা আল্লাহর দেওয়া অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। সেজন্যই পাক তালিবানেরা ছাত্রীদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সহজেই উপস্থাপন করতে পারে সহি বুখারির আয়াত। কুখ্যাত আইসিস কোরান সুন্না মেনে বিধর্মীদের গলা কাটছে বলে ঘোষনা দিতে পারে। কেউ আবার ‘ঈমানী দায়িত্ব’ পালন করতে থাবা বাবাকে কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রাখে, কেউ বা করে হুমায়ুন আজাদের মত মুরতাদদের ক্ষতবিক্ষত, আর কেউ কোরানে চুমু খেয়ে ওজু করে বিমান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে টুইন টাওয়ারের ওপর। শার্লি এবদোর হত্যাকারীরাও হত্যার সময় ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিয়েছিল, হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার পর প্রফেট রক্ষা পেয়েছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। এগুলো অস্বীকার করার চেষ্টা তো বোকামি। তারপরেও আমার বক্তব্য যদি অস্পষ্ট থাকে, আমি জীববিজ্ঞানী জেরি কয়েনের একটি প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতিও দিয়েছিলাম, যেটা অনেকটাই আমার বক্তব্যকে তুলে ধরে –

Well, if ISIS is not Islamic, then the Inquisition was not Catholic. The fact is that there are no defensible criteria for whether a faith is “true,” since all faiths are man-made and accrete doctrine—said to come from God, but itself man-made—that becomes integral to those faiths. Whatever “true faith” means, it doesn’t mean “the right religion: the one whose God exists and whose doctrines are correct.” If that were so, we wouldn’t see Westerners trying to tell us what “true Islam” is….

In the end, there is no “true” religion in the factual sense, for there is no good evidence supporting their claims to truth. ISIS is a strain of Islam that is barbaric and dysfunctional, but let us not hear any nonsense that it’s a “false religion.” ISIS, like all religious movements, is based on faith; and faith, which is belief in the absence of convincing evidence, isn’t true or false, but simply irrational.

প্যারিসে শার্লি এবদোর ঘটনার পর আসিফ মহিউদ্দীন একটি চমৎকার স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেই স্ট্যাটাসেই এই সহি ইসলাম বিষয়ে একটা সারসংক্ষেপ ধরা পড়ে:

প্যারিসে কার্টুনিস্টদের হত্যাকারী দুইজন ইসলামপন্থী অবশেষে পুলিশের হাতে মারা পরেছে। এই নিয়ে আমাদের দৈনিক সুবহে সাদিকের জনৈক বামাতি হাত পা ছুঁড়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছেন। হত্যাকারী ইসলামিস্ট জঙ্গিদের কেন হত্যা করা হলো? তাদের কী নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার নেই? ইউরোপ আমেরিকা এইসব কী শুরু করেছে? এ তো ইসলামের ওপর সরাসরি আঘাত! ইসলামের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ! বেচারারা একটু কাফের টাফের হত্যা করবে, তাতেও বাধা? তাদের কী কাফের মারার ধর্মীয় অধিকার নেই? ধিক্কার, তীব্র ধিক্কার!

ঐদিকে জার্মানির জনৈক মন্ত্রী মহোদয় দাবী করেছেন, প্যারিসের কার্টুনিস্ট হত্যার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

সেখানে জনৈক রসিক ব্যক্তির মন্তব্যঃ

– ও! আপনি বলতে চাচ্ছেন এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই? শুনে খুব নিশ্চিন্ত হলাম যে, এটা শুধুমাত্র গুটিকয় মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের কুকর্ম। তার মানে এখন থেকে আমি নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে ইসলামের সমালোচনা করতে পারি, তাই তো? কোন রকম ভীত না হয়ে ইসলামে নারীর অবস্থান, বিধর্মীদের সাথে সম্পর্ক, সমকামীদের প্রতি তার আচরণ নিয়ে কড়া সমালোচনামূলক ব্লগ লিখতে পারি, মুহাম্মদকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকতে পারি, তাই তো? আমার আর ভয় পেতে হবে না যে, ইসলাম মোহাম্মদ বা আল্লাহর সমালোচনা করার জন্য বা ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকার কারণে আমাকে হত্যা করা হবে। শুনে খুব ভাল লাগলো।

আরেক রসিকের মন্তব্যঃ

– হ্যাঁ অবশ্যই। ঠিক যেমন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের সাথে নাৎসিবাদের কোনরূপ সম্পর্ক নেই। যেমন মাইন কাম্ফের সাথে হলোকাস্টের কোন রকম সম্পর্ক ছিল না। ইসলামে বিশ্বাসীদের সাথেও সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নেই, যেমন ইহুদীদের হত্যার সাথে নাৎসিদের কোন সম্পর্ক ছিল না। বেশিরভাগ নাৎসিই ছিল শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাই নাৎসিবাদের প্রতি ঘৃণাত্মক সকল বক্তব্য, নাৎসিবাদের সকল সমালোচনা, হিটলারের কার্টুন, হিটলারকে নিয়ে সকল প্রকার রসিকতা বন্ধ করা উচিত।

মডারেট মুসলিমদের ভূমিকা

ইসলামের নামে কোথাও সন্ত্রাস হলেই আরো এক ধরণের ‘জনপ্রিয় যুক্তি’ ঘোরাফেরা করতে দেখি। বলা হয় সারা পৃথিবী জুড়ে এক দশমিক ছয় বিলিয়ন মুসলিম আছে, যাদের অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ। গুটিকয় সন্ত্রাসীর জন্য গোটা মুসলিম সমাজকে দোষারোপ করা হচ্ছে, ইত্যাদি।

আমি উপরের যুক্তির সাথে একমত না হলেও তাদের অনুভূতির সাথে একমত। মুসলিমদের গালিগালাজ করা আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়, এটা আমি করিও না কখনো। আমি আমার বহু লেখাতেই বলেছি যে আমি ইসলাম এবং মুসলিমের মধ্যে সচেতনভাবে একটা পার্থক্য করি। ‘ইসলাম’ আর ‘মুসলিম’ শব্দ দুটি আমার চোখে এক নয়। ইসলাম হচ্ছে আর ক’টি সাধারণ বিশ্বাসের মত একটি বিশ্বাসমাত্র যা কখনই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু ‘মুসলিম’ তো কোন বিশ্বাস নয়, মুসলিমরা হল রক্ত-মাংসের মানুষ – যাদের রয়েছে আশা, আকাঙ্ক্ষা, ভালবাসা আর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবার অধিকার। তাই ইসলামের কট্টর সমালোচক হয়েও আমি গুজরাত-কাশ্মীর-প্যালেস্টাইন ইস্যুতে নির্যাতিত মুসলিমদের পাশে এসে দাঁড়াতে কোন অনীহা বোধ করিনা। আমি অতীতে কাশ্মীর এবং প্যালেস্টাইনের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লেখা লিখেছি স্ট্যাটাস দিয়েছি, পিটিশন করেছি। গাজার উপর ইসরায়েলের বর্বর আক্রমণ চলছিল, তখন মুক্তমনা থেকেই আমি লিখেছিলাম – ‘ইসরায়েলের বর্বরতার সমাপ্তি হওয়া প্রয়োজন’ শিরোনামে লেখা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের সময় নগ্ন মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লিখেছিলাম ‘মার্কিন সভ্যতার বীভৎস ছবি’র মত প্রবন্ধ। শুধু আমি নই, আরো অনেকেই লিখেছেন (দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, কিংবা এখানে)। এই ‘মানবতাবাদী’ প্রেরণাটুকু আমরা সবসময় জাগিয়ে রাখতে চাই। আমরা চাই – জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের মানবতা জাগ্রত হোক।

মুসলিম মানেই যে ‘সন্ত্রাসী’ নয় এটি বোঝার জন্য তো কোনো দর্শন পড়ার দরকার নেই, আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তো যথেষ্ট হওয়ার কথা। আমার নিজেরই অনেক মুসলিম বন্ধু-বান্ধব রয়েছে। তাদের কেউই তো সন্ত্রাসী নন। কেউই বিন লাদেন নন, নন মোহাম্মদ আতা। তারা আমাদের বিপদে-আপদে খোঁজ-খবর নেন, বাসায় এসে গল্প-গুজব করেন, খাওয়া-দাওয়া করেন, এমনকি নামাজের সময় হলে এই কাফিরের বাসায় ‘পশ্চিম দিক কোনটা’ জানতে চেয়ে নামাজও পড়েন। এরা নিপাট ভালো মানুষ। তারা কোরআনের কোন আয়াতে ভায়োলেন্সের কথা আছে তা সম্বন্ধে মোটেও ওয়াকিবহাল নন, সেটা নিয়ে আগ্রহীও নন-তারা আসলে ‘স্পিরিচুয়াল ইসলামের’ চর্চা করেন। বিপদটা কখনোই এদের নিয়ে নয়। এরা সবাই শান্তি, ভালোবাসা আর সহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করেন। কিন্তু এই মূল্যবোধগুলো তারা যতটা না ইসলাম থেকে পেয়েছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ছোটবেলা থেকেই সামাজিক শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কারণ কোনোদিন কোরআনের বা ইসলামের চর্চা না করেও তো বহু মানুষ এই গুণাবলি বর্জিত নয়, এমন প্রমাণ ভূরি ভূরি হাজির করা যায়। কিন্তু এই ‘স্পিরিচুয়াল ইসলামের’চর্চাকারী দলের বাইরেও একটা অংশ রয়েছে যারা রীতিমতো আক্ষরিকভাবে কোরআনের চর্চা করেন, চোখ-কান বন্ধ করে কোরআনের সকল আদেশ-নির্দেশ মেনে চলেন আর কোরআনের আলোকে দেশ ও পৃথিবী গড়তে চান। বিপদটা এদের নিয়েই। কারণ কেউ যদি সামাজিক শিক্ষার বদলে কোরআনের সকল আদেশ-নির্দেশ চোখ-কান বন্ধ করে মেনে নেন তাহলে কী হবে ? সুরা আল-ইমরানের নিচের আয়াতটায় চোখ বোলানো যাক[38]

মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো অমুসলিম/কাফেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না (৩ : ২৮)।

শার্লি এবদোর ঘটনার পর ইংল্যান্ডের মুফতি আনজেম চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে মিডিয়ায়। উনি পরিস্কার করেই বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম এটা মিথ্যা কথা। ইসলাম অর্থ ‘সাবমিশন’। ইসলামে জ্বিহাদ কতল সবই আছে। আছে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আহবান। এগুলো ছাড়া ইসলাম অচল। আনজেম চৌধুরী কতটা গুরুত্বপূর্ন কিংবা সত্যিকার ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে কিনা সে তর্কে না গিয়েও বলা যায় এ ধরণের মুফতি এবং ইমামের অভাব নেই মুসলিম বিশ্বে এমনকি পশ্চিমেও। তাই তাদের মানসপটটা বোঝা জরুরী:

httpv://www.youtube.com/watch?v=lAFDC3ix7Oo

httpv://www.youtube.com/watch?v=HavvrcJXi5A

তবে এটা ঠিক সব মুসলমানই আনজেম চৌধুরী কিংবা এ ধরণের র‍্যাডিকাল লোকজনের প্রস্তাব মত সব মুসলিমই জিহাদ কতলে অংশ নেয়ার সাথে ইসলামকে মিলান না, কিংবা হিন্দু, খ্রিস্টান বা অধার্মিক প্রতিবেশীদের প্রতি বৈমাত্রেয়সুলভ আচরণ করেন না। কারণ তারা ধর্মগ্রন্থের বাইরে গিয়ে ‘কমসেন্সের’ চর্চা করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি ভাসা ভাসা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোরআনের চর্চা না করে কোরআনের সকল নির্দেশ আক্ষরিকভাবেই মেনে চলার সিদ্ধান্ত নেন আর অবশেষে সাম্প্রদায়িক ‘তালিবান’ হিসেবে বেড়ে ওঠেন, কিংবা আইসিসে গিয়ে যোগদান করেন তবে দোষটা কার হবে?

সুরা আল বাকারাহ থেকে আরেকটি আয়াতে আছে[39]

তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়। পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোনো একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর (২ : ২১৬)।

অথবা সুরা আন নিসা থেকে উদ্ধৃত করা যাক[40]

আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করতে থাকুন, আপনি নিজের সত্তা ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ের জিম্মাদার নন! আর আপনি অন্য মুসলমানদেরকেও উৎসাহিত করতে থাকুন। শীঘ্রই আল্লাহ কাফেরদের শক্তি-সামর্থ্য খর্ব করে দেবেন। আর আল্লাহ শক্তি-সামর্থ্যের দিক দিয়ে অত্যন্ত কঠোর এবং কঠিন শাস্তিদাতা (৪ : ৮৪)।

কোরআনের বর্ণিত নির্দেশ মতো জিহাদি জোশে উদ্বুদ্ধ হয়ে তালিবানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইহুদি-নাসারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আফগানিস্তান চলে যেতে অতীতে আমরা দেখেছি অনেককেই; সম্প্রতি আইসিসের একটা বড় রিক্রুটও এসেছে এই প্রেরণা থেকেই। কারণ ইহুদি-নাসারাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে, জিহাদ করাকে তারা আল্লাহর নির্দেশ বলেই মেনে নিয়েছিলেন। সার বিশ্বেই জঙ্গিসংগঠনগুলো ধর্মের কথা বলে জিহাদের কথা বলে, মুসলিমদের উপর অত্যাচারের কথা বলে লোক নিয়োগ করছে। এমনকি দেখা যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের একটা বড় অংশ ধর্মগ্রন্থ এবং নবী রসুলদের দেখানো পথ অনুসরণ করেন, তাদের কীর্তিকলাপ দিয়ে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করেন। সেজন্যই পেশোয়ারে ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্মম গণহত্যা চালিয়ে সাক্ষীগোপাল হিসেবে সহি বুখারির হাদিস এবং নবীর কাজের মাধ্যমে নিজেদের কাজকে ‘সুন্নত’ হিসেবে জাহির করতে তাদের কোন অসুবিধা হয় না। অসুবিধা হয় না চার্লি এবদোর কার্টুনিস্টদের হত্যা করে ‘প্রফেট হ্যাজ বিন এভেঞ্জড’ ধ্বনি দিয়ে জয়ধ্বনি করতে।

সন্ত্রাসীদের কারণে সকল মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলা না হলেও মডারেট মুসলিমদের একটি বড় সমস্যার কথা মিডিয়ায় উঠে আসছে। এমনিতে তারা আয়তনে নিঃসন্দেহে হাতী সাইজের – এক দশমিক ছয় মিলিয়ন বটে, কিন্তু ইসলামের সহিংসতার প্রতিবাদে তাদের প্রতিবাদে তাদের আকার পিঁপড়া থেকেও ক্ষুদ্র। সালমান রুশদির কল্লা চেয়ে, তসলিমার মুণ্ডু চেয়ে কিংবা মুহাম্মদের ব্যঙ্গাত্মক কার্টুনের বিপরীতে, কিংবা প্যালেস্টাইন-ইস্যুতে একজোট হয়ে মিটিং মিছিল এবং করতে তাদের যেভাবে দেখা যায়, তাদের সিকিভাগের একভাগও দেখা যায় না সভা সমাবেশ সংগঠিত করতে যখন আমেরিকার টুইনটাওয়ারে, ইংল্যান্ডের পাতাল রেলে, মাদ্রিদে, ভারতের তাজ হোটেলে কিংবা ফ্রান্সের শার্লি এবদোতে হামলা করা হয়। বরং ‘পশ্চিমাদের উচিৎ শাস্তি’ দেয়া গেছে ভেবে এক ধরণের প্রশস্তিই অনুভব করতে দেখি। সহিংস ঘটনার প্রতিবাদে কোন বায়তুল মোকারমের খতিবকে দেখা যায় না খুতবা দিতে কিংবা বাদ জুম্মা এগুলোর প্রতিবাদে সমাবেশের ডাক দিতে। শাহবাগের নাস্তিক ব্লগারদের কল্লা চেয়ে মিছিল করতে শফি হুজুরের দলকে যতটা তৎপর দেখা যায়, ঠিক ততটাই নীরব থাকেন তারা পৃথিবীতে ইসলামের নামে কোন সহিংস ঘটনা ঘটলে। তাদের অনেককেই দেখা যায় প্রচ্ছন্নভাবে সমর্থন করতে, এর সাথে ‘সহি ইসলামের’ সম্পর্ক নেই বলে দায়িত্ব শেষ করে দিতে। শার্লি এবদোর দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটার খবর বাংলা নিউজ পেপারগুলোতে প্রকাশ হবার পর নিউজের নীচে মন্তব্যগুলোতে চোখ রাখা যায়, তবে দেখা যাবে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘সোবহান আল্লাহ’ কিংবা ‘পশ্চিমাদের ঠিক শিক্ষা দেওন গ্যাছে’ টাইপের মন্তব্যের ছড়াছড়ি। দিগন্ত বাহার ফেসবুকে কিছু মন্তব্য জরো করেছিলেন যেটা দেখলেই ‘মডারেট মুসলিম’দের মানস ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে –

common_muslims reaction_aftercharlie hebdo

উপরের মন্তব্যকারী লোকগুলো কখনোই সন্ত্রাস করেনি, কখনো সন্ত্রাসের সাথে জড়িতও হবে না হয়তো, কিন্তু এদের মতো অনেকের দ্বারাই এই ‘শান্তিকামী’ এবং ‘মডারেট’ এক দশমিক ছয় বিলিয়ন’ পরিসংখ্যান ভরে আছে।

সুষুপ্ত পাঠক সম্প্রতি এমনি একজন বাংলাদেশি মডারেট মুসলিমের ছবি এঁকেছেন তার একটি লেখায়। লেখার শুরুটা এভাবে –

‘তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েন না, তবে জুম্মা সাধারণত মিস করেন না।… শুকরের চর্বি আছে এমন কোন প্রসাধন ব্যবহার করেন না তবে “ওকেশনে” মদ্য খান।… আধুনিকতার নামে মেয়েদের হাল ফ্যাশানের পোশাককে তিনি সাপোর্ট করেন না তবে তার মোবাইলে পর্ণ নিয়মিত আপডেট হতে থাকে।…হ্যা, তিনি এই গল্পের প্রধান চরিত্র মো: মডারেট ইসলাম। শিক্ষিত, পোশাকে-আশাকে পশ্চিমী, দাড়ি রাখেননি, গার্লফেন্ড আছে, বিয়ে বহির্ভূতভাবে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্কও এরিমধ্যে একাধিকবার হয়েছে কিন্তু তিনি লিভটুগেদার, সমকামিতার মত “পশ্চিমা সংস্কৃতিগুলো” আমাদের মত ইসলামী কান্ট্রিতে অনুপ্রবেশে করায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। মুসলমানের আসলই হচ্ছে আখলাক, মানে চরিত্র, কিন্তু প্রকৃত ইসলামী জ্ঞানের অভাবে মুসলিমরা আজ ইহুদী নাসারাদের দেখানো খোলামেলা জীবনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মো: মডারেট ইসলাম তাই আরো বেশি করে ইসলামকে আঁকড়ে ধরছেন। ইসলামী সংস্কৃতি, আদব-কায়দার উপর বেশি করে জোর দিচ্ছেন। আকাশ সংস্কৃতির এই যুগে ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্রে এমনিতেই আমাদের ঘরের মেয়েরা বেয়াল্লাপনা শিখছে রাত-দিন। এটা বড়ই আফসোসের কথা গোটা মুসলিম জাহানের জন্যই।

তার গল্পের শেষটা খুবই আকর্ষণীয়। এই ‘মডারেট’ বন্ধুর ফ্রেন্ড লিস্টের তালিকায় থাকা এক নাস্তিক বন্ধু প্রশ্ন করছে –

-বন্ধু, তুমি তো নাস্তিক কতলের আন্দোলনের সময় পোস্ট দিতা- নবীর সঙ্গে বেয়াদপী করা কুলাঙ্গার নাস্তিক ব্লগারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত যাতে কেউ ভবিষ্যতে কটূক্তি করতে সাহস না করে!

-হ্যা দিছি, কি হইছে?

-বেকো হারাম, তালেবানরাও সেই একই রকম সাজা দিছে- এর জন্য তারা কেন সহি মুসলমান হবে না?

-তুমি কি বলতে চাও?

-আমি বলতে চাই শরমের কি আছে এখানে?

-কিসের শরম?

-আমিও তো তাই বলি, কিসের শরম? আল্লার নবী বলছে, স্বয়ং আল্লা বলছে- এটাই তো যথেষ্ট- তাই না? মিয়া মডারেট, মাথায় কাপড় তুলতে তুলতে যে পিছন উদাম হয়ে যাচ্ছে সেই খবর আছে?…

মো: মডারেট ইসলাম সঙ্গে সঙ্গে তার নাস্তিক বন্ধুকে ব্লক করে দিলো।

এ ধরণের ‘মডারেট মুসলিম’ চরিত্র কিন্তু চোখ রাখলে আশে পাশে কম দেখা যাবে না। পেশায় চিকিৎসক এবং বিটিভির উপস্থাপক আব্দুন নূর তুষার (ড্রোন নিয়ে তার বিশেষজ্ঞীয় মতামতের কারণে দুর্মুখেরা ইদানীং তাকে ‘আব্দুন ড্রোন তুষার’ও ডাকা শুরু করেছেন) এমনি এক মডারেট মুসলিমের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ভদ্রলোক দেশ এবং দশের কথা ভাবেন, বিতর্ক করেন, চামে চিকনে ইসলামী ব্যাংকের অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন, আর ফেসবুকে উগ্র নাস্তিকদের দেদারসে গালিগালাজ করেন। যদিও উগ্র নাস্তিকেরা লেখালিখি কিংবা বড়জোর একে ওকে নিয়ে কার্টুন আঁকা-আঁকি করলেও দলবেঁধে কাউকে হত্যা করেন না, হত্যায় ইন্ধনও যোগায় না; কিন্তু তাতে কি! ‘উগ্র মোল্লা’ আর ‘উগ্র নাস্তিক’দের এক করে দেখার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই আছে। বিতার্কিক তুষারও সম্ভবত এই লাইনে কথা বলে বিতর্ক জিইয়ে রাখতে চান। তবে উগ্র নাস্তিক কিংবা কার্টুনিস্টদের সমস্যা মনে করলেও রসুনের গোঁড়া ইসলামিক ফান্ডামেন্টালিজমের উত্থান নিয়ে তিনি কখনো স্ট্যাটাস দেন না, কিংবা কষ্ট করে ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে দেখতে চান না এই সব ‘ঐশ্বরিক’ বইপত্রে সত্যই সন্ত্রাসের বৈধতা আছে কিনা। তিনি বরং ইসলামের নামে সন্ত্রাস হলেও ওটাকে ‘সহি ইসলাম নয়’ বলে ডিফেন্ড করেন, আর ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আর কি করার আছে’ বলে ইনিয়ে বিনিয়ে পরোক্ষ সমর্থন দেন। শার্লি এবদোর ঘটনার পর এগুলো বলেই এই স্ট্যাটাস প্রসব করেছেন। তবে এগুলো করা তুষারের জন্য নতুন কিছু নয়। এই ভদ্রলোক ফারাবী-রকমারি এপিসোডের সময়ও ফারাবির পরোক্ষ সমর্থক হিসেবে কাজ করছিলেন, কারণ তার মতে ‘নাস্তিক’রা খুব উগ্র, ফারাবীর থেকেও জঘন্য! মতিকণ্ঠ তখন তাঁকে নিয়ে নানাপদের স্যাটায়ারও করছিল

শার্লি এবদোর মর্মান্তিক ঘটনার পর দেয়া সেই স্ট্যাটসে এই মডারেট মুসলিম তুষার সন্ত্রাসবাদের কিংবা ইসলামিস্টদের মোটিভেশন সমালোচনা না করে পশ্চিমা কোন কোন দেশে হিজাব বোরখা প্রভৃতি কেন ব্যান ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন করে ইনিয়ে বিনিয়ে নানাপদের ত্যানা পেঁচিয়েছেন। ‘ইসলাম রক্ষা পেয়েছে’ ভেবে অনেকে আবার সেই স্ট্যাটাস শেয়ারও করেছেন মহানন্দে। সুষুপ্ত পাঠক এর একটি জবাব দিয়েছেন এখানে

জাঙ্গিয়া পরে হাঁটার অধিকার থাকলে বোরখা পরেও হাঁটার অধিকার চেয়েছেন “সহি”, “আসল”, “বিজ্ঞানসম্মত” মুসলমানদের অনলাইন প্রতিনিধিরা। ইউরোপের কোথায় কোথায় নাকি মুসলমানদের নামাজ-কালাম পড়তে দেয়া হয় না। তাদের ধর্ম-কর্ম করতে দেয়া হয় না। তর্কে যাবো না, তবে সৌদি আরবে কি জাঙ্গিয়া পরে হাঁটা যাবে? বিধর্মীদের ধর্ম পালনের অধিকার আছে? গির্জা-মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার আছে? যেহেতু আপনাদের ভাষায় “মুসলিম কান্ট্রি” আছে তারমানে বাকীগুলো সব “অমুসলিম কান্ট্রি”। “মুসলিম কান্ট্রির” যেমন একটা “ভাবগাম্ভীর্য” আছে, কথায় কথায় “এটা একটা মুসলিম কান্ট্রি- এখানে এসব চলবে না” বলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন, সেভাবে “অমুসলিম কান্ট্রি” তাদেরও তো “এখানে এসব চলবে না” টাইপ এলার্জি থাকতে পারে? অথচ প্রায়ই কান্নাকাটি শুরু হয়ে যায়- কেন মুসলমানদের পর্দা করতে বাধা দেয়া হয়!…

হ্যা, মডারেট তুষাররা (Abdun Noor Tushar) ছিঁদকাদুনের মত অভিযোগ করেছেন ফ্রান্সে মুসলিমদের নাকি পর্দা করতে বাধা দেয়া হয়। আসলে মুসলিমরা পর্দা করলে শিল্প-সাহিত্য-গান আর কবিতার দেশ ফ্রান্সের (সেখানে টাকার মধ্যে কবি-সাহিত্যিকদের ছবি ছাপা হয়!) কিছু যায় আসে না। মুসলিমদের ধর্ম পালন ও তাদের নারীদের বোরখা পরা নিয়ে মাথা ব্যথা থাকতো না- যদি না বোরখার নিচে বোমা লুকিয়ে “কাফের হত্যা” শুরু না হতো। তুষারদের কাছে বোরখা পরলেই সবাই জঙ্গি হয়ে যায় না- আমরাও সেটা মানি কিন্তু কোন বোরখাওয়ালি জঙ্গি আর কে জঙ্গি না সেটা বুঝতে হলে বোরখা না খুলে উপায় কি? খোদ সৌদি আরব কি কোন চোখ-মুখ ঢাকা সহি ইসলামী নারীর ছবি দেখে হজ করতে ভিসা দিবে?

তুষার এটা জানেন, কিন্তু জেনেও লেখেন বিপরীতটা। তুষার একটি গ্রাফ দিয়েছেন তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে, যার মাধ্যমে তিনি ‘প্রমাণ’ করতে চান মুসলিমরা শান্তিকামি, ইউরোপে যত সহিংসতার ঘটনা ঘটছে তার একভাগেরও কম করছে মুসলিমরা। অধিকাংশ মুসলিমরা যে শান্তিকামী তা আমরা অস্বীকার করছি না, কারণ আলহামদুলিল্লাহ সোবহান আল্লাহ বলার পরেও তারা হয়তো নিজেরা শার্লি এবদোর অফিসে কিংবা টুইন টাওয়ারে ঝাপিয়ে পড়ছে না। কিন্তু তুষার যেটা বলেননি সেটা হল, যে আর্টিকেল থেকে তিনি গ্রাফটি নিয়েছেন সেটাতে আমেরিকায় গায়ের উপর ফ্রিজ পড়া থেকে শুরু করে বাচ্চাদের বন্দুক থেকে গুলি ছুটে মৃত্যুর সাথে মুসলিম টেরোরিজমের তুলনা করা হয়েছে। চেচনিয়া সহ বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে সন্ত্রাসবাদীদের অংশও জরিত, সেটা চেপে যাওয়া হয়েছে। তারচেয়েও বড় কথা তুষার কি জানেন না, নাইন-ইলেভেনের মতো যতগুলো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, তার চেয়ে কয়েকশ গুন বেশি পরিকল্পনা প্রতিদিনই পুলিশ এবং ইন্টেলিজেন্স নস্যাৎ করছে। ঘটনা ঘটার আগেই যেগুলো নস্যাৎ হয়ে যায়, সেগুলো গ্রাফে আসবে কিভাবে? বাংলাদেশি যুবক নাফিস যখন ২০১২ সালে ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করছিল সেটা স্টিং-অপারেশনে আগে প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় সংগঠিত হতে পারেনি। শার্লি এবদোর ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ক্রিস্টোফার লি কর্নেল নামের এক কনভার্টেড মুসলিমের সন্ত্রাসের প্লট নস্যাৎ করা হয়েছেবেলজিয়ামের পুলিশও সম্প্রতি এ ধরণের টেরোরিজমের একটি প্লট নস্যাৎ করেছে। এই সমস্ত সুপ্ত সন্ত্রাসের কথা তুষারের দেয়া গ্রাফে কখনোই আসবে না। কিন্তু মসলিম সমাজের অবস্থা কতটুকু ভাল তা বোঝার জন্য আমাদের তুষারের দেয়া গ্রাফে নয়, রাখতে হবে অথেন্টিক পিউ পোলে মুসলিমদের উপর করা সার্ভে থেকে। পিউ পোল থেকে নেয়া নীচের গ্রাফগুলোতে চোখ বোলালেই ধূসর ছবিটা সম্বন্ধে আঁচ পাওয়া যায় কিছুটা –


 


উপরের গ্রাফগুলো ২০১৩ সালে চালানো জরিপ থেকে নেয়া। এর পরে আরো কিছু সার্ভে এসেছে, সব জায়গাতেই এই একই অবস্থা[41]। স্কেপ্টিক পত্রিকাতেও কেনেথ ক্রাউসের একটি চমৎকার লেখা এসেছে ‘Charlie Hebdo: Why Islam, Again?’ শিরোনামে। সে প্রন্ধটিও এ প্রসঙ্গে পড়া যেতে পারে। তিনি সেখানে সমীক্ষায় দেখিয়েছেন আজকে পৃথিবীতে ঘটা ধর্মীয় সহিংসতার অধিকাংশই (প্রায় ৭০ ভাগ) মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে সংগঠিত হয়। পাকিস্তান, ইরাক, নাইজেরিয়া হচ্ছে সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ।

বীর দর্পে মডারেট মুসলিমদের বড় সড় সংখ্যাকে সামনে আনা হচ্ছে বটে ‘কতিপয়’ সন্ত্রাসীর বিপরীতে দাঁড়া করানোর জন্য, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এসব মডারেট মুসলিমদের অধিকাংশই নিজ দেশে ইসলামী শাসন চাচ্ছে, স্ত্রীরা স্বামীর বাধ্য থাকবে বলে মনে করছে, সমকামীদের ঘৃণা করছে, ধর্মত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং ব্যভিচারের শাস্তি পাথর ছুঁড়ে হত্যাকে সঠিক বিধান বলে মনে করছে। তুষারের মতো ব্যক্তিরা নিজেকে মুসলিম ভেবে গর্ববোধ করেন, ইসলাম খুব ভাল ভেবে এক ধরণের অপার্থিব রোমান্স উপভোগ করেন কিন্তু উপরের অপকর্মগুলোর দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন বরাবরই। কিন্তু দায়িত্বটা অস্বীকার করে বালিতে মুখ গুঁজে থাকলে তো সমস্যার সমাধান হবেনা। সেটাই বলেছেন Frida Ghitis সিএনএ সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে [42]

‘Are all Muslims responsible? Are they guilty? No, of course not. Do they have a responsibility to help fight this growing threat? Yes, absolutely yes’.

তুষার এগুলো সবই জানেন কিন্তু জেনেও হিপোক্রিসি করেন। অবশ্য নিজের হিপোক্রিসি নিয়ে তাঁর অতটা চিন্তা নেই, যতটা চিন্তা তার মার্কিন এবং পশ্চিমাদের হিপোক্রিসি নিয়ে। সাধারণ পাঠকেরা কিন্তু সেটা খুব ভালই বোঝেন –

tushar_hypocricy1

শার্লি এবদোর ঘটনার পর আমেরিকার কমেডিয়ান বিল মার এই মডারেট মুসলিমদের নিয়ে কিছু কথা বলেছিলেন, যা হয়তো অনেকেরই ভাবনার খোরাক যোগাবে। তিনি বলেছেন[43]

‘আমি জানি অধিকাংশ মুসলিমই (শার্লি এবদোতে ঘটা) এ ধরণের আক্রমণ পরিচালনা করবেন না, কিন্তু লাখ লাখ মুসলিম এ ধরণের আক্রমণ ভিতর থেকে সমর্থন করে। তারা মুখে বলে তারা এ ধরণের সহিংসতা পছন্দ করে না, কিন্তু তাদের নবীকে নিয়ে ছোট খাট তামাসা করলেই সব ধরণের শর্ত থেকে তারা নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়’।

শার্লি এবদোর খবর প্রকাশ হবার পর নিউজের নীচে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘সোবহান আল্লাহ’ কিংবা ‘পশ্চিমাদের উচিৎ শিক্ষা দেওন গ্যাছে’ টাইপের মন্তব্যগুলো আরেকবার দেখুন, দীগন্ত বাহার ফেসবুকে যে মন্তব্যের ছবি দিয়েছেন, সেটাতে আরেকবার চোখ বোলান, বিল মার কেন একথা বলছেন সেটা বুঝতে অসুবিধা হবে না।

বিল মারকে না হয় কমেডিয়ান, এথিস্ট আর অমুসলিম বলে বাতিল করে দেয়া গেল, কিন্তু আসরা নোমানি কিংবা মজিদ নেওয়াজকে? ইরশাদ মানজি কিংবা আয়ান হারশি আলীর মত এরা কিন্তু ইসলাম ত্যাগের কোন ঘোষণা দেননি। নিজেদের মুসলিম বলেই পরিচয় দেন তারা। আসরা নোমানি আজ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন ওয়াসশিংটন পোস্টে, ‘Meet the honor brigade, an organized campaign to silence debate on Islam’ শিরোনামে। লেখিকা বলেছেন, অমুসলিমদের পক্ষ থেকে কেউ ইসলামের এই ধরনের সমস্যার কথা বলা হলে সাথে ‘ইসলামফোবিয়া’ ‘রেসিজম’ ইত্যাদির ধোঁয়া তুলে চলমান বিতর্ক বন্ধ করে দেয়া হয়, আর মুসলিমদের পক্ষ থেকে এ ধরণের রিফরমেশনের চেষ্টা করা হলে দেয়া হয় হত্যা হুমকি এবং কন্ঠরোধ। তাই হয়েছে জয়নব আল উয়াইজ এবং আসরা নোমানির ক্ষেত্রে। তিনি তার প্রবন্ধে অনেক উদাহরণ তুলে ধরেছেন। আর মজিদ নেওয়াজ নিজেই একসময় ইসলামিস্ট ছিলেন, সন্ত্রাসীদল হিজবুত তাহরীরের প্রাক্তন সদস্য। জিহাদ করতেন, পশ্চিমা সাম্রাজ্য ধবংস করাই ছিল তার মিশন। মিশরে ধরা পড়েন তিনি, জেল খাটেন, এ সময়ই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সংস্পর্শে আসেন তিনি। এ সময়ই তার মধ্যে এক ধরণের পরিবর্তন আসে। জেল থেকে বের হয়ে হিজবুত তাহরীরের সংশ্রব ত্যাগ করেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন Quilliam। মজিদ যেহেতু মডারেট ইসলাম, জিহাদী ইসলাম এক্সট্রিমিস্ট ইসলাম সব স্তর পেরিয়েই এ জায়গায় এসেছেন, তিনি মুসলিমদের এই মানসপটটা খুব ভাল বোঝেন। সি এন এন এ এণ্ডারসন কুপার সম্প্রতি তার অনুষ্ঠানে বেশ ক’বারই মজিদ নেওয়াজকে এনেছেন। পেশোয়ারের গণহত্যার পর মজিদকে সিএনএন-এ আনা হলে তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেন, “মডারেট মুসলিমরা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ আর উপনিবেশের বিরুদ্ধে যতটা সোচ্চার ঠিক ততটাই নীরব থাকেন ইসলামী সন্ত্রাসীদের দ্বারা কোন ঘটনা ঘটলে তার প্রতিবাদে। কই আমি তো মডারেট মুসলিমদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যায় টুইটার ফিড, হ্যাশটাগ ইত্যাদি আসতে দেখছি না। এটার বদল না হলে ইসলামের সমস্যা রয়ে যাবে”।

আমি মজিদের কথার সাথে একমত। আসলে মডারেট মুসলিমরা সংখ্যায় বিপুল স্থান অধিকার করে আছেন। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের প্রতি তাদের লাগাতার ঘৃণা (যার কিছু নিঃসন্দেহে যৌক্তিক) এবং একই সাথে ইসলামী সন্ত্রাসের ব্যাপারে তাদের নীরবতা আর নিস্তব্ধতা আসলে প্রমাণ করে এরা নিজেদের অজানতেই ব্যবহৃত হচ্ছেন ‘ভাইরাসের হোস্ট’ হিসেবে। সেজন্যই শার্লি এবদোর সাথে জড়িত দু-চারজন টেরোরিস্টকে হত্যা করলেও এ ভাইরাস টিকে থাকে, প্রস্তুতি নিতে থাকে ভিন্ন জায়গায় সংক্রমণের।

 

ধর্ম আসলেই একটি ভাইরাস

ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোর ডিএনএ কিংবা প্রোটিনের মতো কোন ভৌত রূপ হয়তো নেই, কিন্তু অন্য সকল ক্ষেত্রে এটা প্রকৃত ভাইরাসের মতোই কাজ করে। অধ্যাপক ভিক্টর স্টেঙ্গর তার ‘গড – দ্য ফলি অব ফেইথ’ বইয়ে ডেরেল রে’র গবেষণা থেকে ধর্মের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ করেছেন[44]

১) এটা মানুষকে সংক্রমিত করে।

২) অন্য ধারণার (ভাইরাসের) প্রতি প্রতিরোধ এবং এন্টিবডি তৈরি করে।

৩) কিছু বিশেষ মানসিক এবং শারীরিক ফাংশনকে অধিকার করে ফেলে, এবং সেই ব্যক্তির মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে সেই ব্যক্তির পক্ষে তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

৪) বিশেষ কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে ভাইরাসের বিস্তারে।

৫) বাহককে অনেকটা ‘প্রোগ্রাম’ করে ফেলে ভাইরাসের বিস্তারে সহায়তা করতে।

আরো একটি মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমরা অনেকেই শৈশবে সর্দি কাশি গলা ব্যথা সহ অনেক উপসর্গের সম্মুখীন হতাম। বড় হয়ে সেগুলো অনেকটাই কমে যায়। শিশুরা ভাইরাসাক্রান্ত হয় বেশি, কারণ পূর্ণবয়স্ক মানুষের চেয়ে অরক্ষিত শিশুকে কাবু করা সহজ। তাই শৈশবেই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে বেশীমাত্রায়। ঠিক একইভাবে ধর্মগুলোও ‘অরক্ষিত শৈশব’কে বেছে নেয় ভাইরাসের প্রসারে। ব্লগার আদিল মাহমুদ ‘ধর্মশিক্ষার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার সরল পাঠ’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ লিখেছিলেন মুক্তমনায়[45]

সিরিজটির প্রথম পর্বে তিনি দেখিয়েছেন ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার নামে কিভাবে শিশু-কিশোরদের ‘ব্রেন-ওয়াশ’ করা হয়। তিনি বাংলাদেশের সরকারী শিক্ষা বোর্ডের নবম-দশম শ্রেণীর ইসলাম-শিক্ষা বইটির (বর্তমান পাঠ্যসূচীতে বইটির শিরোনাম বদলে ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’ রাখা হয়েছে) কিছু স্ক্যান করা পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করেছেন, যা রীতিমত আতঙ্কজনক। বইটিতে ‘কুফ্‌র’ কী, ‘কাফির কারা’ এ সংক্রান্ত আলোচনা আছে, যা রীতিমত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত। অবিশ্বাসীরা হল কাফের; তারা অকৃতজ্ঞ, যাদের দুনিয়ায় কোন মর্যাদা নাই, তারা অবাধ্য ও বিরোধী, জঘন্য জুলুমকারী, হতাশ/নাফরমান। একই বইয়ের ৫৩ পাতায় বেশ গুরুত্ব সহকারে জিহাদ সম্পর্কিত শিক্ষা বর্ণিত হয়েছে। শুধু জিহাদের সংজ্ঞা নয়, কিভাবে এবং কাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা স্পষ্ট ভাষাতেই বর্ণনা করা হয়েছে রেফারেন্স সহকারে। বাংলাদেশের ইসলাম-শিক্ষা বইটির এই অংশটুকু পড়লে কিন্তু অনেকেরই মনে হবে বিন লাদেন, বাংলা ভাই, শায়খ রহমানদের সন্ত্রাসী বলা এই ধর্মশিক্ষার আলোকে মোটেই যুক্তিসংগত নয়। পাকিস্তানে নাকি শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, ‘এ ফর আলিফ, বি ফর বন্দুক’[46] । সে দেশের ভাইরাস–আক্রান্ত সেনাবাহিনী পরিণত বয়সে সুযোগ পেয়ে নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মারবে আর দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করবে, এ আর বিচিত্র কী! মর্নিং শোজ দ্য ডে! আমিও এ নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম মুক্তমনায় – ‘বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নতুন সংযোজন ‘ধর্ম ও নৈতিকতা’ নিয়ে কিছু কথা’ শিরোনামে।

ধর্মকে আসলে স্রেফ ভাইরাস হিসেবেই চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ধর্মের সংক্রমণ, পুনরুৎপাদন এবং প্যারাসাইটিক বৈশিষ্ট্যগুলো কেবল ভাইরাসের মধ্যেই দেখা যায়। এমনকি ভাইরাসের চিকিৎসার ব্যাপারটিও ধর্মের সাথে অনেকটাই মেলে। মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার তাঁর লেখায় খুব স্পষ্টভাবেই লিখেছেন –

ভাইরাসের চিকিৎসা। আমরা অনেকেই জানি এখন পর্যন্ত ভাইরাসের সরাসরি কোনও চিকিৎসা নেই। ভাইরাস চিকিৎসার একটি প্রধান দিক হচ্ছে প্রতিরোধ আর এই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে ভ্যাক্সিন। ভ্যাক্সিনের মূলনীতি হচ্ছে – যে ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে চাই, সেই ভাইরাসের বিষাক্ত অংশ বা Toxin অংশটুকু কে মেরে ফেলে বা দুর্বল করে সেই মৃত ভাইরাসটিকে মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ফলে মানুষের শরীর, মৃত ভাইরাস টির দেহ বৈশিষ্ট্য বা Physical morphology চিনে রাখে, ফলে ওই ভাইরাসের বিপরীতে মানুষের দেহের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় এক ধরনের মেমোরি তৈরি হয়। পরবর্তীতে যখনই সেই মানুষ বা প্রাণীটি একই ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হবে, দেহ সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে তার মেমরি কে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

ধর্মের বিরুদ্ধেও সরাসরি কোনও চিকিৎসা নেই। ধর্মের কালো দিকগুলো উন্মোচন করাকে আমি মনে করি ভাইরাসের টক্সিন বা বিষাক্ত অংশকে মেরে ফেলার মতই, যত বেশী মাত্রায় ধর্মের হানাহানি, সাম্প্রদায়িকতা, অবৈজ্ঞানিকতা কে তুলে ধরা যাবে, মানুষের মাঝে ততো বেশী প্রতিরোধ “মেমোরি” তৈরি হবে এবং মানুষ ধর্মের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ধর্মের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাক্সিন হচ্ছে ইহজাগতিকতার চর্চা, বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা। গড়ে তোলা।

আমরা ঠিক সেই কাজটাই করছি যেটা এ মুহূর্তে করা সবচেয়ে বেশি দরকার। ধর্মের অন্ধকার দিকগুলো ক্রমান্বয়ে তুলে ধরার প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ নেয়া – যাতে অন্ততঃ কারো কারো মধ্যে এই ক্ষতিকর ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। পারভেজের কি উচিৎ হবে সেই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করা? এই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হলে পৃথিবী এগুবে না, বরং পিছিয়ে পড়বে। শার্লি এবদোর মত ঘটনা যত ঘটবে তত বেশি বিশ্ব পোলারাইজড হয়ে উঠবে। যে দক্ষিণপন্থি মুসলিমবিদ্বেষী ধর্মান্ধ দলগুলো পৃথিবীতে রেসিজম বেঁচে খায়, তারাই শক্তিশালী হয়ে উঠবে ক্রমশঃ। এই উপমহাদেশেই কি আমরা বিজেপির উত্থান দেখিনি কেবল মুসলিম বিদ্বেষের উপর ভর করে? জার্মানিতে স্মরণাতীত কালের মধ্যে সবচেয়ে বড় ডেমনস্ট্রেশন হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। না সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে নয়, পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। দক্ষিণপন্থি থিঙ্কট্যাঙ্ক রুপার্ট মার্ডক এই সন্ত্রাসবাদের জন্য প্রতিটি মুসলিমকে দায়ী করে টুইটারে টুইট করেছেন। এগুলো কিসের আলামত? আমরা তো এরকম অসুস্থ পৃথিবী দেখতে চাই না, তাই না?

আমাদের সৌভাগ্যের বিষয় আমরা এর বিপরীত চিত্রও দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি মুসলিমদের মধ্য থেকেই। শার্লি এবদোর ঘটনার পর মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাতাহ সিসি প্রকাশ্যেই বলেছেন: ‘ইসলামি ধ্যান ধারণা পৃথিবীবাসিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ [corpus of [Islamic] texts and ideas that we have sacralized over the years are antagonizing the entire world ]। যে শার্লি এবদোর কার্টুনিস্টদের হত্যা করে এর কবর রচনা করবেন বলে ভেবেছিলেন সন্ত্রাসীরা, তা বুমেরাং হয়ে আজ ত্রিশ লক্ষ কপি প্রকাশিত হচ্ছে। ফ্রান্স বেলজিয়াম সহ ইউরোপের মানুষেরা লাইন দিয়ে তা কিনেছেন। ত্রিশ লক্ষ কপি মুহূর্তের মধ্যেই ফুঁরিয়ে গেছে। আমি বলব, এ বিজয় তো ভাইরাসের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এন্টিবডিরই।

আসলে ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ তথা অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার যে দূর করা দরকার পারভেজ নিজেও তা ভাল করে জানেন। তাই শার্লি এবদোর ঘটনার পরপরই তিনিও ‘মুহাম্মদের ছবি’র মতো যুগান্তকারী প্রবন্ধ লিখে ফেলেন, যেখানে নিজ দায়িত্বেই উদ্ধৃত করেন অসম সাহসী কথামালা –

‘ফ্রান্সের শার্লি হেবদো পত্রিকায় হামলার বিরুদ্ধে ঘৃণা জানাই। … মুহাম্মদের ছবি আঁকা যাবে না এটি একটি কুসংস্কার। দুনিয়ায় কেউ মুহাম্মদের কোন বদনামও করতে পারবে না এটি একটি মামার বাড়ির আবদার। আর কেউ বদনাম করলে তাকে মরতে হবে এটি একটি শশুর বাড়ির আবদার। ইউরোপ যেহেতু মুসলমানদের মামা অথবা শশুরবাড়ি নয় তাই কিছু অসভ্য ও অসহিষ্ণু সন্ত্রাসীর সন্ত্রাসের ফলে সকল ইউরোপবাসী মুসলমানদের ভুগতে হলে তা একটি দুঃখজনক ব্যাপার হবে’।

এই ব্যাপারটিতে পারভেজকে তার সাহসিকতার জন্য ধন্যবাদ জানাই। আর সেই সাথে জানাই পারভেজকে তার জন্মদিনের বিলম্বিত শুভেচ্ছা।

জীবন দীপান্বিত হোক, আর সমাজ হোক বিশ্বাসের ভাইরাস মুক্ত।

:line:

তথ্যসূত্র:

[1] অভিজিৎ রায়, বিশ্বাসের ভাইরাস, জাগৃতি প্রকাশনী, ২০১৪ (২য় সংস্করণ)।

[4] Peshawar killing consistent with Prophet Mohammed’s teaching: Pakistan Taliban, IndiaToday.in New Delhi, December 18, 2014

[6] Daniel C. Dennett, Breaking the Spell: Religion as a Natural Phenomenon, Penguin Books, 2006

[7] Carl Zimmer , Mindsuckers: Meet Nature’s Nightmare, National Geographic, November 2014

[8] Susan Blackmore, The Meme Machine, Oxford University Press, 2000

[9] Daniel C. Dennett, Breaking the Spell: Religion as a Natural Phenomenon, Penguin Books, 2006

[10] Richard Brodie, Virus of the Mind: The New Science of the Meme, Hay House, 2009

[11] Darrel W. Ray, God Virus, The: How Religion Infects Our Lives and Culture, IPC Press, 2009

[12] Craig A. James, The Religion Virus: Why We Believe in God, CreateSpace Independent Publishing Platform, 2013

[13] তালেবানবিরোধী অভিযান অনৈসলামিক: লাল মসজিদের খতিব, প্রথম আলো, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৪

[14] Richard Dawkins expounds the recipe analogy in The Blind Watchmaker (1986, pp. 295-296):

“A recipe in a cookery book is not, in any sense, a blueprint for the cake that will finally emerge from the oven…. a recipe is not a scale model, not a description of a finished cake, not in any sense a point-for-point representation. It is a set of instructions which, if obeyed in the right order, will result in a cake.

Now, we don’t yet understand everything, or even most things, about how animals develop from fertilized eggs. Nevertheless, the indications are very strong that the genes are much more like a recipe than like a blueprint. Indeed, the recipe analogy is really rather a good one, while the blueprint analogy, although it is often unthinkingly used in elementary textbooks, especially recent ones, is wrong in almost every particular. Embryonic development is a process. It is an orderly sequence of events, like the procedure for making a cake…

The genes, taken together, can be seen as a set of instructions for carrying out a process, just as the words of a recipe, taken together, are a set of instructions for carrying out a process”.

[15] Richard Dawkins, The Selfish Gene: 30th Anniversary Edition–with a new Introduction by the Author, Oxford University Press, USA; 30th Anniversary edition, May 25, 2006

[16] Richard Dawkins, The Selfish Gene. New York City: Oxford University Press, 1976.

[17] F. T. Cloak, Is a Cultural Ethology Possible? Human Ecology, Vol. 3, No. 3, 1975

[18] Matt Ridley, The Rational Optimist: How Prosperity Evolves, Harper Perennial, 2011

[19] David Haig, The Gene Meme, in Richard Dawkins. How a scientist changed the way we think. A. Grafen & M. Ridley (eds.) Oxford University Press, Oxford, 2006

[20] Susan Blackmore, The Meme Machine, Oxford University Press, 2000

[21] Richard Dawkins, Viruses of the Mind, http://vserver1.cscs.lsa.umich.edu/~crshalizi/Dawkins/viruses-of-the-mind.html (Page hosted by the Center for the Study of Complex Systems)

[22] [a] Richard Dawkins, Viruses of the mind, In Dennett and his Critics: Demystifying Mind (ed., Bo Dahlbom), pp 13-27, Wiley-Blackwell, Oxford.

[b] Richard Dawkins, Mind Viruses, In Ars Electronica festival, 1996

[c] Richard Dawkins, Burying the Vehicle, Behavioral and Brain Sciences, 17: 616-17

[23] Darrel W. Ray, God Virus, The: How Religion Infects Our Lives and Culture, IPC Press, 2009

[24] James Baldwin, Darwin and the Humanities, Baltimore, MD, Review Publishing, 1909

[25] Richard Dawkins, The Blind Watchmaker: Why the Evidence of Evolution Reveals a Universe without Design, W. W. Norton & Company, 1996

[26] Daniel C. Dennett, Darwin’s Dangerous Idea: Evolution and the Meanings of Life, Simon & Schuster, 1995

[27] Phillip Ball, The Self- Made Tapestry : Pattern Formation in Nature, New York, Oxford : Oxford University Press, 2001

[28] অভিজিৎ রায় এবং রায়হান আবীর, অবিশ্বাসের দর্শন, তৃতীয় সংস্করণ, জাগৃতি প্রকাশনী।

[29] অভিজিৎ রায়, ‘ভালোবাসা কারে কয়’, শুদ্ধস্বর, ২০১২

[30] Charles Darwin, Origin Of Species by Means of Natural Selection, 1859

[31] Susan Blackmore, The Meme Machine, পূর্বোক্ত।

[32] Steven Pinker, The Language Instinct: How the Mind Creates Language, William Morrow & Company, 1994

[33] অভিজিৎ রায়, মানব মস্তিষ্কের আনইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন, মুক্তমনা, মে ২১, ২০১২

[34] Susan Blackmore, The Meme Machine, পূর্বোক্ত।

[35] Susan Blackmore, The Meme Machine, পূর্বোক্ত।

[36] অভিজিৎ রায় এবং রায়হান আবীর, অবিশ্বাসের দর্শন, শুদ্ধস্বর, ২০১১ ( দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১২)

[37] অভিজিৎ রায়, বিশ্বাসের ভাইরাস, পূর্বোক্ত।

[38] কোরআন শরীফ (বঙ্গানুবাদ) ।

[39] কোরআন শরীফ (বঙ্গানুবাদ) ।

[40] কোরআন শরীফ (বঙ্গানুবাদ) ।

[41] Concerns about Islamic Extremism on the Rise in Middle East, Pew Research Poll, 2014

[42] Frida Ghitis, Murdoch, Rowling both wrong,CNN, 7:46 PM ET, Mon January 12, 2015

[44] Victor J. Stenger, God and the Folly of Faith: The Incompatibility of Science and Religion, Prometheus Books, 2012

[46] Kayes Ahmed, alif for Allah, bay for Bondook!, Opinion bdnews24.com; http://opinion.bdnews24.com/2012/06/02/alif-for-allah-bay-for-bondook/

[4981 বার পঠিত]