অগাষ্ট মাসে চট্রগ্রামে একটি ছোট হোটেলে নাস্তা করতে বসে পরোটার সাথে ডিম মামলেট চাইলাম। ওয়েটার বলে মামলেট হবে না ওমলেট খান। আমি অবাক কেন হবে না? সহজ উত্তর পেয়াজের দাম বেশি।পেয়াজের দাম তখন ৭০/৮০টাকা। কেন হঠাৎ পেয়াজের দাম বেড়ে গেল জানি না। কিন্তু বেড়ে গেছে এটা বাস্তব।

আরো কিছু উদাহরণ দেখে নিতে পারি। এক সময় গ্রামীনফোন কথা বলার জন্য ১০টাকা প্রতি মিনিট কেটেছে। তার পর মোবাইল কোম্পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের মধ্যে প্রতিযোগীতা শুরু হয় তারা কলরেট কমাতে থাকে। আমরা গ্রাহকরা ভালই প্রতিযোগীতায় কিছুটা সুযোগে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। আর বাহবা দিতে থাকি এই তো মুক্ত বাজারের সুবিধা। কিন্তু এই সুবিধা খুব বেশিদিন থাকেনি। মোবাইল কোম্পানি গুলো জোট বেঁধে একটা এসোসিয়েশন তৈরী করে নেয়, সিদ্ধান্ত নিয়ে একটা সর্বনিম্ন রেট ধার্য করে দেয়।

একদিন সকালে দোকানে নাস্তা করতে গিয়ে দেখি পরোটার দাম আট টাকা। ৫টাকা থেকে ৬টাকা, ৬টাকা থেকে ৮ টাকা। আমি তার পর একে একে হোটেল পরিবর্তন করতে থাকি। কিন্তু অবাক বিষয় সব হোটেলেই পরোটা ৮টাকা করে। জানতে পারলাম হোটেল এসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা এখন থেকে ৮টাকা করে পরোটা বেঁচবে,৭টাকা করে সিঙ্গাড়া এবং ৮টাকা করে সমোচা। ভূক্তা হিসেবে আমি এখন ৮টাকা করে পরোটা খেতে বাধ্য হচ্ছি।

এক শিক্ষক তার বাসায় ছাত্র পড়ানোর সময় ঘোষনা দিলেন সামনের মাস থেকে সবাইকে জনপ্রতি ৬০০টাকা করে দিতে হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এর কম নেব না, ছাত্র জানতে চাইল কারা সিদ্ধান্ত নিলেন? এবার চতুর শিক্ষক তার ভুলটা বুঝতে পারলেন তার পর অন্য কথা অন্য কথা। আসল কথা হলো এই কলেজের কিছু শিক্ষক এক সাথে হয়ে ছাত্র পড়ানোর একটা নুন্যতম টাকা ধার্য করেছেন।এই শিক্ষকরা যেহেতু ব্যবসায়ী তাই অন্য ব্যাবসায়ী থেকে এই সিন্ডিকেটের বিষয়টা রপ্ত করে দুষের কিছু করেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিযোগীতার বাজারে আসলেই কি প্রতিযোগীতা হয়? হলে তা কি করে হচ্ছে? প্রতিযোগীতার জন্য দাম কমানোর উদাহরন হিসেবে প্রায়ই মোবাইল কোম্পানি গুলোর কথা শুনি। কিন্তু পক্ষান্তরে আমাদের দেশের ঔষধ কিন্তু প্রতিযোগীতা মূলক বাজারেই আছে তাদের কি অবস্থা? একই রকম দেখতে ওরস্যলাইন এসএমসি এবং এসএনসি । পার্থক্যটা ধরতে পারলেন? SMC এবং SNC । এমন অনেক কোম্পানিকেই একই পন্য উৎপাদনের অনুমুতি দেয়া আছে। একই সমপরিমান ওরস্যালাইনে সব উপাদান যদি সমান ভাবে দেয়া থাকে তবে কোম্পনি ভেদে তার দাম কি করে এত পার্থক্য হয় এবং একটার চেয়ে অন্যটার দাম অর্ধেক হতে পারে? অর্থাত প্রতিযোগীতায় টিকতে তারা পন্যের মান কমিয়ে দিচ্ছে। ঔষধের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের ব্যপারে যদি কোম্পানি গুলো প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের সাথে ধোকা দিতে পারে তাহলে অন্য পন্যগুলোর অবস্থা কোথায় আছে?

গত কয়েক দিন আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত নকল,ভেজাল,মেয়াদ উত্তির্ণ ঔষধ বিক্রি করার দায়ে কয়েকটি দোকানে সিলগালা করে দেয়, এবং ভেজাল ঔষধ জব্দ করে নেয়। কিন্তু ফল কি হলো?
“এই পরিস্থিতিতে দুপুরে কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন ঔষধ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক। বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “যেসব ব্যবসায়ীকে জেল জরিমানা করা হয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত করতে তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী সাত দিনের মধ্যে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
এখন উপায় কি?

মুক্তবাজারের যে সকল সুবিধার কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলা হচ্ছে বাস্তবে কি তাই আছে?

কয়েক দিন আগে সকল সিএনজি ও ফুলয়ে পাম্পের মালিকরা তাদের এসোসিয়েশনে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের পাম্প ধর্মঘটের ডাক দেয়। বন্ধ করে দেয় দেশের সব ফুয়েল পাম্প। কারন কি? তাদের কমিশন বাড়তে হবে।কোন একটা রাস্তার পরিবহন মালিক মিলে তাদের বাস বন্ধ রাখে তাদের ভাড়া বাড়াতে হবে? (হাসপাতালের ডাক্তার থেকে শিক্ষক সবাই এই এসোসিয়েশনের মাধ্যমে তাদের দাবী কিছু যৌক্তিক এবং বেশির ভাগ অযৌক্তিক দাবীর জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে,বন্ধ করে দেয়া হয় শিক্ষা এবং চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্র্ণ সেবা খাত।)

মুক্তবাজারে যে প্রতিযোগীতার স্বপ্ন আমরা দেখেছি আসলে সেখানে কতটুকু প্রতিযোগীতা কি আছে?

তার মানে কি মুক্তবাজার একটা নিদ্রিষ্ট সময় পরে আর মুক্ত থাকে না। তারা প্রতিযোগীতার বদলে সিন্ডিকেট করায় দক্ষ হয়ে উঠে। প্রতিদন্ধিতার বদলে তারা একে অন্যের সিন্ডিকেটের সহযোগী হয়ে উঠে। একটি গনতান্ত্রিক সরকারের সময় সরকার দলের প্রতিনিধিরা তাদের সমর্থকরা দেশে শক্ত অবস্থান থাকার পরেও যদি নানা রকমের এসোসিয়েশন করে বাজারকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে তবে এই সিন্ডিকেটকে কেবল রাজনৈতিক ভাবে দেখলেই হবে না,ভিন্ন ভাবে দেখতেই হবে। সহজ সূরে বলা যেতেই পারে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রন রাখতে পারছে না। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রন করতে গেলে ব্যবসায়ীরা বলবে তারা মুক্তবাজারে সুবিধা পাচ্ছে না। তারা ব্যবসা করতে পারছে না। বিশ্বব্যাংক চিৎকার করবে সরকার ব্যবাসয়ীদের উপর খবদরারি করছে…. ইত্যাদী ইত্যাদি।

যে সরকারই আসুক ব্যবসায়ীদের এই সিন্ডিকেটের ভেতর দিয়েই তাকে দেশ শাসন করতে হবে। ব্যবসয়ীদের সাথেই আঁতাত কর চলতে হবে। বিগত দুই বছর সেনা শাসনের সময়েও পন্যের দাম ঠিক রাখতে বিডিয়ার শপ খুলতে হয়েছিল। তার পরও পন্যের দাম ছিল নাগালের বাইরে। অতএব এই সিন্ডিকেটকে সক্রিয় রেখে কোন পদ্ধতিতেই বাজার নিয়ন্ত্রন করা যাবে না।

অতএব এটাকে সহজে সরকারে ব্যর্থতা বলে চালাতে আমি রাজি নই। এটা মুক্তবাজারের ব্যর্থতা। মুক্তি বাজারের বিকাশের একটা সীমা অবশ্যই আছে এবং এই সীমা অতিক্রম করলে মুক্তিবাজার পদ্ধিতি আর জনবান্ধব থাকবে না। একটি নিদ্রিষ্ট সময় পরে প্রতিযোগীতার কোন অবস্থান থাকবে না পন্যের দাম আবার বাড়তে থাকবে। এবং ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে কোন পন্যের দাম কেমন বাড়বে।

একটা সময় ছিল যখন চাল,ডাল,লবন তেল বিক্রি করতো ছোট ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতে বসে বা বাজারের চালার নিচে বসে এসব বিক্রি করতো। এখনো হয়তো করে কিন্তু কম। এখন এসেগেছে সুপার স্টোরের যুগ। একই দোকানে,মাছ,মাংস ডিম ডাল কলা পেপে থেকে হারপিক সাবান,জামা,জুতা,গহনা,ডলার সবই পাবেন। যে কোন মফস্বলে এখন কম করে চার পাঁচটা সুপার শপ আছে। সুপার শপ গুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে এবং এই সুপার শপের চার পাশের ছোট ব্যবসায়ীরা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। একটা বড় সুপার শপ অন্তত ৫০টা ছোট দোকানের ক্রেতাকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন ছোট পূজির এই দোকান গুলোর কি হবে? প্রতিযোগীতায় টিকতে হলে ক্ষুদ্র ব্যসায়ীদের কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। ক্রমান্ময়ে বিনিয়োগ করতে না পারলে পুঁজিবাদী বাজারে টিকতে পারবে না। এখন তাদের পক্ষে কি রাতারাতি কোটি টাকা বিনোয়াগ করা সম্ভব? সম্ভব নয় । তাহলে তাদের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুক্ষিন হবে।

এই প্রতিযোগীতায় টিকতে হলে তাদের ও সুপার শপের মতো বিনিয়োগ করতেই হবে। ধরে নিতে পারি তাদেরএকটা পথ খোলা আছে ৫০জন মিলে যদি একটি সুপার শপ প্রতিষ্ঠা করা।মুক্তি বাজারে এভাবেই যৌথ বিনিয়োগের দিকে যেতে হচ্ছে। ব্যক্তি স্বাতন্ত্রতার কথা যতই বলা হোক ব্যবসার ক্ষেত্রে তা মোটেও সুখকর নয়। পুঁজির এই একই জায়গায় সন্নিবেশ ভাল কোন লক্ষন নয়। এই পুঁজি বড় হতে হবে একসময় দেশের সীমা পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজার দখল করতে থাকে। বৃহত্তর পুঁজির কাছে অসহায় হতে থাকে রাষ্ট্র কাঠামো।

“বিশ্বে যত পণ্য ও সেবা উৎপন্ন হয়, তার প্রায় এক-চতুর্তাংশ উৎপাদন করে বহুজাতিক কোম্পানি। অনেক কোম্পানির বিক্রির পরিমাণ এত বেশি যে কোনো কোনে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদও এর তুলনায় তুচ্ছ। ২০০৯ সালে ওয়াল মার্টের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৪১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই বছর বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদ ছিল মাত্র ৮৯.৩ বিলিয়ন ডলার।”

অর্থনীতির ছাত্র আমি কখনোই ছিলাম না, তাই তাত্বিক আলোচনায় যাওয়ার আমার পক্ষে সম্ভব না তাই উদাহরন দিয়ে ব্যক্তকরার চেষ্টা করেছি।

পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে সরকার নিজেই পেঁয়াজ আমদানীকরে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে টিসিবির মাধ্যমে খোলাট্রাকে পেয়াজ বিক্রি শুরু করতেই একদিন আশি থেকে ৫০টাকায় নেমে আসল। সব দোকানে তখন ৫০ করে বিক্রি হচ্ছে। হঠাৎ ব্যবসায়ীরা কি করে এত কম দামে বিক্রি করছে? তাহলে আগে বেশি দামের বেচার কারন কি? কারন খুবই সহজ, আপনিও জানেন আমিও জানি,সিন্ডিকেট।

প্রতিবছরই সংযমের মাস রমজান আসলে বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু গত রমজানটা কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। চিনি,তেল,চাল,ছোলা,ডালের দাম বাড়েনি। টিসিবির খোলা ট্রাকে করে এসব বিক্রি করার জন্য দোকানদাররা সিন্ডিকেট করতে পারেনি।

চালের দাম,ডালের দাম,সয়াবিনের দাম বেড়ে গেলে সরকারকেই আমদানীর দ্বায়িত্ব নিতে হয়। সরকাকেই যদি ব্যবাসা করতে হয়, আমদানী করতেহয়,সরকারকেই যদি ট্রাকে করে মালামাল বিক্রি করে জনগনের চাহিদা মেটাতে হয় তাহলে মুক্তবাজার নিয়ে এত লাভঝাপ করার কি আছে? এই সংকট উত্তরনে মুক্তবাজারের কি কৌশল আছে?

আমি প্রতিযোগীতার বিপক্ষে না, আমার অবাধ বাজারকে নিয়ন্ত্রনহীন করে দেবার পক্ষেও না। ছোট শিশুকে মাঠে খেলতে ছেড়ে দিলেও মা যেমন তাকে নজরে রাখে, একটু বেশি দূরে গেলেই আবার ধরে নিয়ে আসে। বাজারের অবস্থাটাও আমি এভাবেই দেখি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ যতই চিৎকার করুক আমাদের দেশের বাজার আমাদের সরকার কতৃক নিয়ন্ত্রীত হতে হবে।

[47 বার পঠিত]