দুই বিদ্রোহীর মৃত্যু

By |2012-09-30T20:36:18+00:00সেপ্টেম্বর 8, 2012|Categories: ইতিহাস, গল্প, সমাজ, সংস্কৃতি|15 Comments

রাণী ১ম এলিজাবেথ

রাজা ১ম এবং ৬ষ্ঠ জেমস্

রাজা ২য় এবং ৭ম জেমস্

১৬০৩ খ্রীষ্টাব্দে ইংল্যান্ডেশ্বরী কুমারী রাণী প্রথম এলিজাবেথের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমসকে ইংল্যান্ডের প্রথম জেমস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। শতবর্ষের উপরে ইংল্যান্ডকে শাসনকরা ইংরেজ-ওয়েলশ বংশীয় টুডোরদের শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে পুরাণো শত্রু স্কটিশদের রাজার শাসনকালের সূচনার মধ্য দিয়ে। প্রোটেস্ট্যান্ট ইংল্যান্ডের জন্য এর কোন বিকল্পও তখন ছিলনা। জেমস-১,৬ নিজেকে ইংল্যান্ড অথবা স্কটল্যান্ডের রাজা হিসেবে নয় বরং দুই সম্মিলিত রাজ্যের বা যুক্তরাজ্যের অধিপতি বলতেই পছন্দ করতেন। জেমসের স্বপ্ন ছিল এক রাজার অধীনে একটি একক রাজ্য যার পার্লামেন্টও হবে একটি এবং একই আইন সর্বত্র বলবৎ হবে। স্কট বা ইংরেজ দুপক্ষই এর বিরোধী ছিল। আইনগতভাবে স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ড তখনও একই রাজার অধীনে দুইটি স্বাধীণ রাজ্য ছিল–আরও পষ্ট করে বলতে গেলে দুই রাজ্যের পার্লামেন্ট এবং অন্যান্য শাসনতান্ত্রিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠা স্বতন্ত্র ছিল। জেমস ইংলিশ পার্লামেন্টের কাছে অনুরোধ করে তাকে “কিং অব গ্রেট ব্রিটেন” উপাধি দেবার জন্য। কিন্ত কমন্সরা রাজার এই অনুরোধ রাখতে রাজি ছিল না। জেমস “বাই স্ট্যাচিউট” বা পার্লামেন্টারী লেজিসলেচারের বদলে রাজকীয় অধিকারবলে বা “বাই প্রোক্লেমেশন” উপাধিটি গ্রহণ করেন। তবে তাঁর দুই রাজ্যকে এক করবার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। জেমসের স্বপ্ন পূরণ হয় তাঁরই নাতনী স্টুয়ার্ট বংশের শেষ নিঃসন্তান রাণী এ্যানের রাজত্বকালে ১৭০৭ সালে। এ্যানের বাবা দ্বিতীয় জেমস (প্রথম জেমসের নাতি এবং তৎপুত্র প্রথম চার্লসের দ্বিতীয় পুত্র এবং দ্বিতীয় চার্লসের ছোট ভাই) ছিলেন ক্যাথলিক। ১৬৮৮ সালের এক রক্তপাতহীণ বিপ্লবে তিনি সিংহাসনচ্যুত হন। এরপর ১৭০১ সালে এ্যাক্ট অব সেটলমেন্ট পাশ করা হয় এবং নিয়ম করা হয় যে ব্রিটেনের সিংহাসনে কোন রোমান ক্যাথলিক বসতে পারবেনা। জেমসের নির্বাসিত ক্যাথলিক পুত্র জেমস ফ্রান্সিস এডওয়ার্ডকে (যিনি “দ্য ওল্ড প্রিটেন্ডার” নামে খ্যাত) এইভাবে লাইন অব সাকসেশন থেকে বাদ দেওয়া হয়। তাঁর সমর্থকদের অর্থাৎ বিশেষত: এ্যানের মৃত্যুর পর প্রোটেস্ট্যান্ট জার্মান হ্যানোভার বংশীয়দের শাসনের সূচনার পর যারা স্টুয়ার্ট বংশের বৈধ পুরুষতান্ত্রিক লাইনকে ব্রিটেনের রাজক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে চায় তাদের বলা হত জ্যাকোবাইট (“জেমস” নামটির ল্যাটিন ফর্ম হল “জ্যাকব”–উল্টোভাবে “জ্যাকবের” এ্যাংলিসাইজড ভার্শন হল “জেমস”)।জেমসের প্রোটেস্ট্যান্ট বড় মেয়ে মেরী এবং মেয়ের জামাই উইলিয়াম অব অরেঞ্জ (রাজা তৃতীয় উইলিয়াম) যুগ্নভাবে দেশের রাজা-রাণী ঘোষিত হন। এই নিঃসন্তান রাজকীয় দম্পতির মৃত্যুর পর রাণী হন উইলিয়ামের শ্যালিকা–মেরীর ছোট বোন এ্যান। এ্যানের মৃত্যুর পর ব্রিটেনের সিংহাসনের একমাত্র প্রোটেস্ট্যান্ট উত্তরাধিকারী জার্মানীর হ্যানোভারের নির্বাচক বা ইলেক্টর গিওর্গ লুডইগকে রাজা প্রথম জর্জ হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এভাবে ব্রিটেনে স্কটিশ স্টুয়ার্ট বংশের শাসনের পরিসমাপ্তি এবং জার্মান হ্যানোভারিয়ান রাজবংশের সূত্রপাত ঘটে।
ইউনিয়ন অব দ্য ফ্ল্যাগস্
রাজা ১ম জর্জ
রাজা ২য় জর্জ

জার্মান গিওর্গ বা জর্জ কিভাবে ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হলেন তার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজণ মনে করি। প্রথম স্টুয়ার্ট রাজা জেমস-১/৬ এর মেয়ে এলিজাবেথ বিয়ে করেন জার্মান শাসক ফ্রেডেরিক-৫, ইলেক্টর পালাতিনকে। তাঁদের মেয়ে সোফিয়া আবার বিয়ে করেন ব্রুন্সউইক-লুনেবার্গ এর ডিউক বা হ্যানোভারের ইলেক্টর আর্নেস্ট অগাস্টাসকে। তাঁদেরই পুত্রসন্তান হলেন গিওর্গ বা জর্জ। ১৭১৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর জর্জ ইংল্যান্ডের মাটিতে পা ফেলেন এবং ২০শে অক্টোবর ওয়েস্টমিনিস্টার এ্যাবেতে তাঁকে ব্রিটেনের রাজমুকুট পড়ানো হয়। জ্যাকোবাইটরা স্বাভাবিকভাবেই জার্মান জর্জকে বা তাঁর উত্তরসূরীদের রাজা বলে স্বীকার করেনি। তারা পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় জেমসের ছেলে জেমস ফ্রান্সিস এডওয়ার্ড (জ্যাকোবাইটদের হিসেবে রাজা তৃতীয় এবং অষ্টম জেমস) বা ওল্ড প্রিটেন্ডারকে এবং নাতি চার্লস এডওয়ার্ড স্টুয়ার্ট বা বনি প্রিন্স চার্লিকে (যিনি “দ্য ইয়ং প্রিটেন্ডার” নামেও খ্যাত) ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী মনে করত। ১৭৪৩ সালে চার্লসের বাবা তাঁকে প্রিন্স রিজেন্ট হিসেবে ঘোষনা করে তাঁর পক্ষে কাজ করবার অধিকার দেন। ১৭৪৫ সালে তিনি জলপথে স্কটল্যান্ডে গিয়ে সেখান থেকে দক্ষিণে ইংল্যান্ড আক্রমণ করবার জন্য একটি জ্যাকোবাইট আর্মি গঠন করেন। অবশেষে ১৭৪৬ সালের ১৬ই এপ্রিল কুলোডেন মুরে চার্লসের নেতৃত্বে জ্যাকোবাইট বাহিনী এবং দ্বিতীয় জর্জের কনিষ্ঠ পুত্র কাম্বারল্যান্ডের ডিউকের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে জ্যাকোবাইটরা শোচণীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং ইয়ং প্রিটেন্ডার পালিয়ে যান। প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ জ্যাকোবাইট আহত বা নিহত হয় এবং সরকারী পক্ষে মাত্র ৫০ জন নিহত এবং ২৫৯ জন আহত হয়। রাজার বাহিনীর যুদ্ধপরবর্তী প্রতিক্রিয়া এবং দমন-পীড়ন এতই নৃশংস ছিল যে কাম্বারল্যান্ডের ডিউককে কাম্বারল্যান্ডের কশাই উপাধি দেওয়া হয়। রাজা দ্বিতীয় জর্জের বিরূদ্ধে রাজদ্রোহীতামূলক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে অনেক উচ্চবংশীয় স্কটিশ লর্ডকেও মুন্ডচ্ছেদের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে দু’জনের ঘটনা এখানে বলব। ১৭৪৬ সালের ১৬ই অগাস্ট লন্ডনের টাওয়ার হিলে কিলমার্নকের আর্ল এবং লর্ড বালমেরিনোর প্রাণদন্ড কার্যকর করা হয়।
কাম্বারল্যান্ডের কশাই

লর্ড বালমেরিনো

বনি প্রিন্স চার্লি

কিলমার্নকের আর্ল

আর্থার এলফিনস্টোন, ৬ষ্ঠ লর্ড বালমেরিনো একসময় রাজা জর্জের ঘোড়-রক্ষকদের কর্নেল ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের দলে যোগদান করেন। যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাঁকে গ্রেফতার করে টাওয়ার অব লন্ডনের বাইওয়ার্ড দুর্গে আটক রাখা হয়। বিচারে তাঁর এবং তাঁর বন্ধু কিলমার্নকের আর্লের রাজদ্রোহের অপরাধে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে প্রাণদন্ডের আদেশ হয়। ওয়েস্টমিনিস্টারে তাঁদের বিচারের রায় ঘোষনার পর টাওয়ারের এক কক্ষে একদিন দুই বন্ধু একত্রে পানাহার করছিলেন। লাল সুরার ঘোরে কিছুটা মাতাল আর স্বভাবগতভাবেই খুবই সাহসী বালমেরিনোকে বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছিল। বন্ধু কিলমার্নককে তিনি উপদেশ দিলেন শিরশ্ছেদের ব্লকে মাথা রাখবার পর খুবই ধীর-স্থির থাকবার জন্য–শরীর যাতে একটুও নড়া-চড়া না করে। অন্যথায় কুড়ুল ঘাড়ের বদলে অন্য কোথাও আঘাত করে জ্বালা-যন্ত্রণা শতগূণ বাড়িয়ে দিতে পারে। আবার এক কোপে মুন্ড নামানোর বদলে দশ কোপও লাগতে পারে–সেইটিও খুবই ভয়ংকর একটি অবস্থা।তিনি আরও বললেন চরম মুহুর্তে দাঁত দিয়ে সজোরে ঠোট কামড়ে রাখবার জন্য–শরিরীক স্থিরতার জন্য সেইটি সহায়ক হবে।উপদেশ যিনি দান করলেন তিনি নিজেই ঠিক মতন সেই উপদেশ অনু্যায়ী চলতে পারলেন কিনা সেইটি আমরা দেখব। যাই হোক, নিজের গলা বরাবর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বন্ধুর সাথে আরও এক বোতল মদ্যপানের অনুরোধ করলেন হিজ লর্ডশীপ–একসাথে এইটিই তাঁদের শেষ সুরাপান।

কুলোডেন মুরের যুদ্ধ

কুলোডেন মুরের যুদ্ধকে প্রচলিত অর্থে ইংরেজ আর স্কটিশদের মধ্যকার জাতিগত সংঘর্ষ বলাটা ঠিক হবেনা। কারণ এই যুদ্ধে একটি ব্রিটিশ সেনাবাহিনী (হ্যানোভারিয়ান জার্মানও নয়) মোকাবেলা করে সিংহাসনচ্যুত স্কটিশ স্টুয়ার্ট বংশীয় রাজা দ্বিতীয় জেমসের নাতি বনি প্রিন্সের নেতৃত্বাধীন জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের যারা জাতিগতভাবে ছিল স্কট (তবে খুবই কমসংখ্যক ইংরেজ জ্যাকোবাইটও ছিল যারা ছিল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী)। যুদ্ধগুলোর শেষ পর্যায়ে রাজা জর্জের অনুগত ব্রিটিশ বাহিনীতে লয়ালিস্ট স্কটিশদের সংখ্যা জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের চেয়ে কম ছিলনা। কুলোডেনে ডিউক অব কাম্বারল্যান্ডের ১৬ টি পদাতিক ইউনিটের মধ্যে ৪ টি ছিল স্কটিশ। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনীর কমপক্ষে অর্ধেক অফিসার আর উপরের সারির সৈনিকরা ছিল স্কটিশ।প্রকৃতপক্ষে রাজা জর্জের সেনাবহিনী ব্রিটেনের রাজ্যদ্বয়ের অখন্ডতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছে বললে ভুল হবেনা–অন্যদিকে জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন স্কটিশ রাজ্য।

লর্ড বালমেরিনো ১৭১৩ সালে শেরিফমুরের যুদ্ধের পর রাজা দ্বিতীয় জেমসের ছেলে “ওল্ড প্রিটেন্ডার” এর সমর্থক জ্যাকোবাইটদের দলে যোগদান করেন। যুদ্ধের পর তিনি কিছুসময়ের জন্য নির্বাসনে থাকেন।১৭৩৩ সালে তাঁর বাবা পঞ্চম লর্ড বালমেরিনো ছেলের জন্য রাজকীয় ক্ষমার ব্যবস্থা করেন এবং তিনি স্কটল্যান্ডে ফিরে আসেন। ১৭৪৫ সালের জ্যাকোবাইট বিদ্রোহে যেসকল অভিজাত স্কট সর্বপ্রথম ইয়ং প্রিটেন্ডারের দলে যোগ দেন বালমেরিনো ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের সাথে তিনি মার্চ করে ডার্বিতে যান, ফলকির্কের যুদ্ধে লড়াই করেন–কিন্ত অবশেষে কুলোডেন মুরের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পুরোপুরি পরাজয়ের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

উইলিয়াম বয়ড, কিলমার্নকের চতুর্থ আর্ল স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শিক্ষালাভ করেন। ১৭১৫ সালের বিদ্রোহে তিনি পিতার মতন রাজা জর্জকে সমর্থন দিলেও ১৭৪৫ সালে তিনি বালমেরিনোর মতন জ্যাকোবাইটদের দলে যোগ দেন। তাঁর এই দল বদলের কারণটি যে ঠিক কি ছিল সে সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ একমত নন। হয়ত কোন ব্যক্তিগত অপমান বা সুন্দরী স্ত্রীর প্রভাবে অথবা আর্থিক দৈন্যদশা এর কারণ হতে পারে। তবে তৃতীয় কারণটি বেশী সম্ভাব্য বলে মনে হয়। বয়ড পরিবারের সদস্যরা যারা বিগত চারশ বছর যাবৎ কিলমার্নকের আর্ল বা জমিদার নামে পরিচিত তাদের বাসস্থান ছিল ডিন প্রাসাদ। বিখ্যাত স্কটিশ রাজা রবার্ট ব্রুস (প্রথম রবার্ট) ব্যানকবার্নের যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কৃতিত্বের পুরষ্কার হিসেবে উইলিয়ামের পূর্বপুরুষ রবার্ট বয়ডকে কিলমার্নক আর পশ্চিম কিলব্রিডের জমিদারী প্রদাণ করেন। ১৭৩৫ সালের এক অগ্নিকান্ডে এই প্রাসাদের একটি বিরাট অংশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় কিন্ত তারপরের দু’শ বছর এটিকে আর মেরামত করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে উইলিয়ামের আর্থিক দুর্দশাকে নির্দেশ করা হয়। সুন্দরী এ্যানকে বিবাহের পর উইলিয়ামের অর্থের প্রয়োজণ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ১৭১৫ সালের বিদ্রোহে পিতার রাজাকে সক্রিয় সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের কাছে একটি পেনসন দাবী করেন। এইটি অনুমোদনও করা হয়। কিন্ত পরবর্তীকালে ইংরেজ লর্ড উইলমিংটন পেনসনটি বন্ধ করে দেন। এই বিষয়টিকে হয়ত উইলিয়াম বয়ড ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অপমান হিসেবে নিয়েছিলেন। হয়ত আর্থিকভাবে চরম দুর্দশাগ্রস্ত কিলমার্নক ভেবেছিলেন যে বনি প্রিন্সের দলে যোগদান করাটা ভবিষ্যতে লাভজনক হবে–ঠিক যেভাবে তাঁর পূর্বপুরুষ রবার্ট ব্রুসের পক্ষে লড়াইয়ের পুরষ্কার হিসেবে পুরো জমিদারী এবং অখন্ড আভিজাত্য লাভ করেন। তা সে যে কারণই হোক না কেন, তিনি ব্রিটিশ রাজ দ্বিতীয় জর্জের পক্ষ ত্যাগ করে চার্লস এডওয়ার্ড স্টুয়ার্ট বা ইয়ং প্রিটেন্ডারের দলে যোগ দেন। চার্লস তাকে তাঁর প্রিভি কাউন্সেলর বা ব্যক্তিগত উপদেষ্টা, হুসার গার্ডের কর্নেল এবং অবশেষে জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দেন।বালমেরিনোর মতন তিনিও ফলকির্কের যুদ্ধে লড়াই করেন–কিন্ত অবশেষে কুলোডেন মুরের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পুরোপুরি পরাজয়ের পর একইভাবে তিনি কাম্বারল্যান্ডের নেতৃত্বাধীণ ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে বন্দী হন। কুলোডেনের আগে যেসব যুদ্ধ হয়েছিল তার ফলে বন্দী বিদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কিছুটা হলেও দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এর কারণ হল যুদ্ধের চরম ফলাফলের ব্যাপারে কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তা ছিল। কুলোডেনের যুদ্ধে জ্যাকোবাইট বিদ্রোহীদের পুরোপুরিভাবে পরাজিত করবার পর তাদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রতিশোধমূলক আক্রমণের আশংকা আর রইল না।জর্জের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট তখন কিছু বিদ্রোহীকে বিচার ও শাস্তি প্রদাণের মাধ্যমে উদাহরণ সৃষ্টি করতে সংকল্পবদ্ধ হল। দুর্ভাগ্যক্রমে বালমেরিনো এবং কিলমার্নক এই বাছাইকরা কিছু অভিজাত বিদ্রোহীর কাতারে পড়ে গেলেন।

১৭৪৬ সালের ২৮শে জুলাই হাউস অব লর্ডস বিচারের দিন ধার্য করল। আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র পাঠ করবার পর অভিযুক্তদের গিল্টি অর নট গিল্টি প্লিড করতে বলা হয়। কিলমার্নক গিল্টি প্লিড করে নিজেকে রাজার দয়ার উপর ছেড়ে দেন। কিছুটা হঠকারী আর সাহসী বালমেরিনো “গিল্টি প্লিডিং” এর লিগাল টার্মটি বুঝতে না পেরে নিজের পক্ষে ওকালতি করতে শুরু করলে তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয় যে সেইমুহুর্তে তাঁর “হ্যাঁ” অথবা “না” বলা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। তখন তিনি নিজকে নিরপরাধ হিসেবে প্লিড করেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘায়িত হয়। যাই হোক, বিচারে কিলমার্নক, বালমেরিনো এবং তৃতীয় আরেক আর্ল ক্রোমার্টির রাজদ্রোহের অপরাধে বিভৎস “হ্যাংগিং, ড্রয়িং এ্যান্ড কোয়ার্টারিং” এর মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড হয়। কিলমার্নক গিল্টি প্লিড করে আশা করেছিলেন যে এইটি তার পক্ষে যাবে– তিনি রাজার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাভিক্ষা করে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন কিন্ত চিঠিটি অফিশিয়ালি এনডোর্স করবার জন্য প্রয়োজণীয় স্বাক্ষর তাতে ছিল না। ফলাফলস্বরুপ স্বাক্ষর সংগ্রহের পরও মাত্র দশ মিনিটের জন্য ডেডলাইন অতিক্রান্ত হয়ে বিষয়টি রাজকীয় প্রেরোগেটিভের আওতার বাইরে চলে যায় এবং বিষয়টি পরবর্তী পার্লামেন্ট কর্তৃক এনডোর্স হবার কোনও উপায় ছিলনা–কারণ এর পরবর্তী অধিবেশন ছিল তাঁদের প্রাণদন্ডের নির্ধারিত সময়ের মাত্র ৩ দিন পর । রাজা জর্জ পরে আক্ষেপ করে বলেচিলেন যে তিনি আগে জানতে পারলে হয়ত অধিবেশনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই আহ্বান করতেন এবং হাউস অব লর্ডসকে প্রভাবিত করে ক্ষমাভিক্ষার একটি স্পেশাল স্যাংকশন পাশ করাতেন যার আওতাতে তিনি তিনজনের প্রাণদন্ডই মওকুফ করে অন্য শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।

কিলমার্নকের ভুলের কারণে আইনানুসারে অবশিষ্ট দুইজনের (বালমেরিনো এবং ক্রোমার্টি) মাত্র একজন রাজকীয় ক্ষমার আওতাতে পড়ল। দুই আর্লেরই প্রভাবশালী বন্ধুগণ রাজাকে তাঁদের প্রাণভিক্ষার জন্য তদবীর শুরু করলেন। কিন্ত ক্রোমার্টির পারিবারিক দুরাবস্থা এবং তাঁর স্ত্রীর একটি পুত্রসন্তান প্রসব (প্রকৃতির আজব খেয়ালে যার কপালে ছিল কুড়ুল আকারের একটি জন্মদাগ) লোকজনের মধ্যে সহানুভূতির জন্ম দিল যাকিনা তাঁর পক্ষে কাজ করল আর দুর্ভাগ্যক্রমে এর সাথে যুক্ত হয়ে বালমেরিনোর বিপক্ষে কাজ করল তাঁর নট গিল্টি প্লিড–যিনি জ্যাকোবাইটদের পক্ষে যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টিকে বিচারের কোন পর্যায়েই ভুল বলে স্বীকার করেননি। এই দুই আর্লের জীবনভিক্ষার জন্য বিভিন্ন পক্ষের দরখাস্ত আর তদবীরের সংখ্যার প্রাবল্যে রাজা দ্বিতীয় জর্জ বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে তিনি বলে ওঠেন “পরম করুণাময় যিশু, তুমি আমাকে সাহায্য কর–লর্ড বালমেরিনোর পক্ষে কিছু বলবার মতন কি কেউই নেই??” দুর্ভাগ্যক্রমে সময়ের দাবী এবং জনমত উভয়ই তখন এধরণের উদার অনুভূতির বিপক্ষে ছিল–বিশেষত: বালমেরিনোর মতন একজন অপরাধী যেকিনা আদালতে ঔদ্ধত্যের সাথে তাঁর রাজনৈতিক অপরাধসমূহের ন্যায্যতা প্রতিপাদনের চেষ্টা করেছে তাঁকে ক্ষমা করাটা একই ধরণের অপরাধের জন্য অনুতাপকারী অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হত। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত ক্রোমার্টিকে ক্ষমা করে দেওয়া হল কিন্ত বালমেরিনোর জন্য আদালতের রায় বলবৎ রইল। রাজা তাঁর অধিকার প্রয়োগ করে শুধুমাত্র পদ্ধতি শিথিল করে বিভৎস “হ্যাংগিং, ড্রয়িং এ্যান্ড কোয়ার্টারিং” এর পরিবর্তে “শিরশ্ছেদ” এর মাধ্যমে প্রাণদন্ডে পরিণত করলেন।

প্রিয় বন্ধু কিলমার্নকের সাথে সুরাপানের পর কিছুকাল অতিক্রান্ত হয়েচে। টাওয়ারের বন্দীশালায় প্রিয়তমা পত্নী শার্লটের সাথে বসে বালমেরিনো রাতের আহার সারছেন।এমন সময় টাওয়ারের লেফটেন্যান্ট তাঁর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। বালমেরিনো তাঁকে ভেতরে আসবার অনুরোধ করলেন।লেফটেন্যান্ট প্রাপ্ত আদেশানুসারে বালমেরিনোর প্রাণদন্ডের তারিখ এবং পদ্ধতিগত বিবরণী সূক্ষাতিসুক্ষভাবে পাঠ করলেন। বেচারী শার্লট স্বামীর জীবনের শেষ কিছুদিন একত্রে ডিনারের অনুমতি পেয়েছিলেন। লেফটেন্যান্টের বিবরণী পাঠ শুনে তিনি খিঁচুনি দিতে দিতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। বলামেরিনো খুবই রাগান্বিত আর বিরক্ত হয়ে লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন :”মাই ডিয়ার লর্ড, দিলেতো তুমি তোমার স্টুপিড ওয়ারেন্ট দিয়ে আমার লেডির ডিনারটা বরবাদ করে…”

১৮ ই আগস্ট, সোমবার, ১৭৪৬ সাল। টাওয়ার হিলে দুই বিদ্রোহীর প্রাণদন্ড কার্যকরের জন্য বিশাল আয়োজন করা হল। সকাল দশটায় বিশাল বেদীর ওপর ওক কাঠের তৈরী শিরশ্ছেদের ভারী ব্লক স্থাপন করে সেইটি কালো ভেলভেট কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হল।কয়েক বস্তা কাঠের গুড়ি এর পাশ ঘিড়ে বেদীর ওপর ছিটিয়ে দেওয়া হল।শিরশ্ছেদের পর রক্ত এবং শ্লেষ্মা জমে পুডিং এর মতন হয়ে বেদীর কাঠের ফাঁক-ফোকরে আটকে থাকে। এদের পরিষ্কার করা খুবই কষ্টকর। কাঠের গুড়ি সহজেই গাঁজলা গাঁজলা রক্ত আর শ্লেষমার দলা শুঁষে নিয়ে শেওলার কার্পেটের মতন বেদীর কাঠের সাথে আলগা-আলগি আটকে থাকে। যাইহোক, দু’টো কফিন এনে এরপর বেদীর ওপর রাখা হল। একটি কফিনের গায়ে স্বর্ণনির্মিত একটি প্লেটের ওপর খোদাই করে লেখা :”গুলিয়েলমাস কোমেস ডি কিলমার্নক, ডিকোলাতাস XVIII অগাস্তি, আয়েতাত সুয়াএ XLIII” অর্থাৎ “কিলমার্নকের কাউন্ট উইলিয়াম, ১৮ অগাস্ট মুন্ডচ্ছেদের মাধ্যমে প্রাণদন্ড কার্যকর হইয়াছে, তাহার ৪৩ বৎসর বয়সকালে”।প্লেটের ওপর আর্লের একটি সীলমোহর এবং কফিনের ছয়টি হ্যান্ডেলের ওপর ছয়টি মোহর বসানো। অপর কফিনটির গায়েও একইভাবে প্লেটের ওপর খোদাই করে লেখা:” আর্তুরাস ডোমিনাস ডি বালমেরিয়ন,ডিকোলাতাস XVIII অগাস্তি, আয়েতাত সুয়াএ LVIII” অর্থাৎ ” বালমেরিনোর লর্ড আর্থার,১৮ অগাস্ট মুন্ডচ্ছেদের মাধ্যমে প্রাণদন্ড কার্যকর হইয়াছে, তাহার ৫৮ বৎসর বয়সকালে”।প্লেটের ওপর ব্যারনের একটি সীলমোহর এবং কফিনের ছয়টি হ্যান্ডেলের ওপর ছয়টি মোহর বসানো। বেদীটিতে আসতে হত টাওয়ার হিলের একটি ছোট বাসার ভেতর দিয়ে যেইটি প্রাণদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মৃতদেহ সৎকারের জন্য প্রয়োজণীয় কিছু কাজের জন্য বিশেষভাবে বানানো হয়েছিল। আর্লদ্বয়ের ইচ্ছানু্সারে ব্লকটি বেদীর ওপর দু’ফুট উঁচু করে বানানো হয়েছিল এবং ছিন্নমস্তক যাতে বেদীর ধুলা-ময়লা আর কাঠের গুড়ির ওপর গড়াগড়ি না খায় সেজন্য এর নীচে একটি লাল ভেলভেটের কাপড়ের টুকরো বিছিয়ে রাখা হল। কুড়ুলের কোপের প্রতিক্রিয়া বলকে কিছুটা কমানোর জন্য বেদীর নীচে একটি শক্ত কাঠের সোজাসুজিভাবে মাটিতে গাঁথা গুড়ি দিয়ে ঠেঁস দিয়ে ব্লকের তলা বরাবর রাখা হল ।

সাড়ে দশটা নাগাদ সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হলে দু’জন শেরিফ তাদের অফিসারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে টাওয়ারে পৌঁছল। এর প্রবেশদ্বারে সজোরে তিনবার আঘাত করে তারা বন্দীদ্বয়ের দেহ দাবী করল। টাওয়ারের লেফটেন্যান্ট উইলিয়ামসন বালমেরিনো এবং কিলমার্নককে সাথে সাথে শেরিফদের উপস্হিতির কথা জানালেন।লর্ড কিলমার্নক তখন মাত্র যাজক মিস্টার ফস্টারের সাথে প্রার্থনা শুরু করচিলেন। যেহেতু তাঁর পদমর্যাদা বালমেরিনোর চাইতে উপরে সেজন্য রীতি অনুসারে তাঁর প্রাণদন্ড আগে কার্যকর করার কথা। শেরিফদের উপস্থিতির কথা জেনে তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। শান্ত গলায় তিনি বলে উঠলেন: “জেনারেল, আমি যাবার জন্য প্রস্তুত।” টাওয়ারের সিড়ি দিয়ে নীচে নামবার সময় এর মাথায় তিনি দেখতে পেলেন প্রিয় বন্ধু বালমেরিনোকে।তাঁরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন।বালমেরিনো বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে বললেন:” আমরা একসাথে অনেক যুদ্ধেই গিয়েচি।কিন্ত বন্ধু আমার, আজকে তোমাকে সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়ে আমি আন্তরিকভাবে দু:খিত।” বন্দীদ্বয়কে এরপর টাওয়ার-গেটে শেরিফগণের কাছে সমর্পণ করা হল।

বেদীতে পৌঁছনোর পর কিলমার্নক দেখলেন তাঁর প্রাণদন্ড দেখবার জন্য প্রায় শ’খানেক লোকের সমাগম হয়েছে। তিনি বেশ শান্ত গলায় নিজের দোষ স্বীকার করে রাজা জর্জের সাকসেশনের বৈধতাকে মেনে নিলেন। তিনি জনতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন যে সামান্য এবং বিচ্ছিন্ন একটি বিরতি ছাড়া রাজা জর্জের প্রতি সবসময় তাঁর আনুগত্য ছিল আর আজকে সেই সামান্য বিরতির জন্য এই ভয়ংকর স্থানে তাঁকে আসতে হলেও তিনি সকলসময়ের চাইতে বেশীভাবে রাজার প্রতি আনুগত্য অনুভব করচেন। বেদীতে ওঠবার সময় তিনি খুবই দৃঢ়তা প্রদর্শণ করেছিলেন যদিও তাঁর ভেতরে ভেতরে ছিল ভয়ংকর নিশ্চিৎ মৃত্যুর ভীতি আর সেজন্য তিনি মৃদু কাঁপছিলেন। তাঁর চারপাশ ঘিরে যেন বেদনার একটা তীব্র কুয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল আর তাঁর তীক্ষ-তীব্র মানসিক যাতনা তাঁর চোখ-মুখ ঠিকরে ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল। কতই অর্থহীণ মানুষের জীবন–নাকি অর্থপূর্ণ–যেই অর্থের জন্য তাঁকে শুকরের মতন কুঁপিয়ে জবাই করা হচ্ছে? তাঁর দেহকে বিকৃত করা হচ্ছে।কতই না ক্ষুদ্র মানুষের জীবন– সেই ক্ষুদ্র জীবনেই তাঁর সমস্ত অর্জন আর চাওয়া-পাওয়া–যার হিসেব তিনি মেলাবার সু্যোগই পেলেন না।এই ক্ষুদ্র জীবনকে কেটে-ছেঁটে ক্ষুদ্রতর করা কি অর্থ বহন করে? নাকি তাঁর জীবনের সমস্ত না মেলানো হিসেব, সমস্ত অপূর্ণ কামনা-বাসনার সন্তষ্টি বিধানের জন্য আরেকটি নতুন জীবনে তিনি আজকে প্রবেশ করছেন? ন্যায়বিচার কি মহাবিশ্বের শ্বাশ্বত নিয়ম–নাকি মানবজন্ম আশির্বাদ আর অভিশাপের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে? তিনি আসলেই জানেন না।কিন্ত তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে তাঁর আজকের পরিণতি তাঁর প্রাপ্য। তিনি বিশ্বাস করেন ন্যায়ের শ্বাশ্বত নিয়মকে। কালো একটি ভেলভেটের স্যুট ছিল তাঁর পরণে আর তাঁর চোখে ছিল তীব্র বিষন্ন যন্ত্রণার ছাঁপ। তাঁকে দেখে বেদীর কাছাকাছি অবস্হানকারী অনেক দর্শকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। এমনকি জল্লাদ পর্যন্ত এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল যে ঠিকঠাকভাবে তার কাজ করবার জন্য কয়েক পেগ কড়া সুরা পান করে নিল।

মিস্টার ফস্টারের সাথে মৃদুস্বরে কিছু বললেন কিলমার্নক। এরপর প্রথানুসারে জল্লাদ আর্লের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করল। কিলমার্নক তাকে ক্ষমা করে একটি পার্সভর্তি কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে চরম সময়ে সাহসের সাথে নিজ কর্তব্য সম্পাদনের অনুরোধ করলেন। এরপর হিজ লর্ডশীপ তাঁর ওপরের স্যুট খুলে ফেলে নীচে পরিহিত কাপড়কে নিজের ঘাড় থেকে টেনে কাধের নীচে নামিয়ে দিয়ে উন্মুক্ত করে দিলেন। এরপর তিনি কাপড় দিয়ে শক্ত করে নিজের চুলকে এমনভাবে বাঁধলেন যাতে তাঁর ঘাড় উন্মুক্ত অবস্থাতেই থাকে।এরপর তিনি জল্লাদকে নির্দেশ দিলেন যে বেদীতে মাথা রাখবার দু’মিনিট পর যখন তিনি সিগন্যাল হিসেবে তাঁর হাত থেকে একটি রুমাল ফেলবেন ঠিক তখন যাতে সে তাঁর ঘাড় বরাবর কোপ বসিয়ে দেয়। এরপর তিনি ব্লকের ওপর গলা বসিয়ে দুই হাত দিয়ে এর পাশ চেপে ধরলেন (তাঁর এক হাতে ছিল একটি নীল রুমাল)। জল্লাদ তাঁকে ব্লক থেকে হাত দুরে রাখতে অনুরোধ করল–কারণ এতে তাঁর হাত কাটা যেতে পারে অথবা এইটি কোপের গতি কমিয়ে তার কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কেউ একজন তখন বলে উঠল যে তাঁর ওয়েস্টকোটের কিছু অংশ তাঁর ঘাড়ের ওপর এসে রয়েছে। কিলমার্নক তখন ব্লক থেকে উঠে সেইটি ঠিক করে আবার মাথা রাখলেন। এইবার সবকিছু ঠিকঠাক আছে।যাজক ফস্টারের একজন চাকর আরেকটি বড় লাল কাপড়ের খন্ড নিয়ে ব্লকের নীচে যত্নসহকারে সাবধানে ধরে রাখল যাতে কোপ দেওয়ার পর মাথাটি এর ওপর পড়ে। ব্লকে মাথা রাখবার কিছুক্ষণ পর কিলমার্নক রুমাল ফেলে সিগন্যাল দিলেন–তাঁর দেহ একেবারে স্থিরাবস্থাতে ছিল। জল্লাদ ঘাড় বরাবর সজোড়ে একটি কোপ দিল। মাথা সাথে সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করল। শুধুমাত্র খুবই পাতলা একটি চামড়ার সাথে মাথাটি ঝুলে ছিল। জল্লাদ তাঁর কোমড়ে গোজা ছোট এবং ধারালো একটি ছুরি দিয়ে সেইটি কেটে মাথা সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন করে দিল। চাকরটি রুমালে করে বিচ্ছিন্ন মাথাটি নিয়ে বালতির পানি দিয়ে ধুয়ে কফিনের ডালার ওপর রাখল।কিছুক্ষণপর ধড়হীণ দেহ থেকে রক্তপাত থেমে গেল এবং চুইয়ে চুইয়ে কিছু বিঁজলা-বিঁজলা শ্লেষ্মা বেরিয়ে আসল। প্রথানুসারে, কিলমার্নকের সেলের ওয়ার্ডেন মৃতদেহের গলা থেকে কিছু মাংস কেঁটে নিয়ে গেলেন যাকিনা আজ দুপুরের মাংসের ঝোলে মেশানো হবে। এরপর হিজ লর্ডশীপের দেহকে ধুয়ে কফিনে তার ছিন্নমস্তকের সাথে রেখে এর ডালা বন্ধ করে বধ্যভূমি থেকে সরিয়ে ফেলা হল। শুরু হল অপর আসামীর প্রাণদন্ডের আয়োজন।

এবার চলুন ফিরে আসা যাক সাহসী আর হঠকারী স্বভাবের অপর আসামী বালমেরিনোর কথায়। তাঁকে বিচারের উদ্দেশ্যে যখন ওয়েস্টমিনিস্টার হলে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন হচ্ছিল তখন টাওয়ার অব লন্ডনের জেইলার মিস্টার নর্বার্ট ফাউলার একটু বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। এর কারণ হল চিরাচরিত নিয়মানুসারে মার্চ করিয়ে আসামীকে আদালতে নেবার নিয়মের কিছুটা ব্যাত্যয় হয়েছিল বালমেরিনোর ক্ষেত্রে। হাজার হলেও আর্থার এলফিনস্টোন পুরো ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত বংশীয় লর্ড। তাঁর জন্য ঘোড়ায় টানা কোচ-গাড়ীর বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। টাওয়ার থেকে ওয়েস্টমিনিস্টার হলে সাধারণত: আসামীকে মার্চ করিয়ে নিয়ে যাওয়া হত। ফাউলারের দায়িত্ব ছিল সমস্ত সময় আসামীর সাথে সাথে থাকা–মার্চের সময় তাঁকে এসকোর্ট করা। হিজ লর্ডশীপ ফাউলারের এই কিংকর্তব্যবিমুঢ় অবস্থার অবসান ঘটালেন তাঁকে কোচে নিজের পাশে বসতে অনুরোধ জানিয়ে। তিনি ফাউলারের সাথে থাকা শিরশ্ছেদের ভোঁতা কুড়ুলটিকে কোচের ভেতর থেকে প্রথমে খেয়াল করেননি। প্রাচীণ প্রথানুসারে বিচার শেষে ফাউলার যখন আসামীকে নিয়ে হলের গেট থেকে বের হবেন তখন কুড়ুলের ধার আসামীর মুখ বরাবর থাকবার অর্থ হল–তাঁর প্রাণদন্ড হয়েছে, এর ধারটি আসামীর মুখের বিপরীতে থাকবার অর্থ হল আসামী প্রাণভিক্ষা পেয়েছে। জনতা এই চিন্হ দেখবার জন্য রায়ের দিন হলের গেটে ভীর করে দাড়িয়ে থাকে।

যাইহোক, হিজ লর্ডশীপের আমন্ত্রণে হতভম্ব এবং একইসাথে সম্মানিত মিস্টার ফাউলার কোচে উঠতে গিয়ে তাঁর ষোড়শ শতকীয় মাথা কাঁটার অস্ত্রের পাঁচ ফুট লম্বা কাঠের বাট দিয়ে অসতর্কভাবে বালমেরিনোর পায়ে বসিয়ে দিলেন এক ঘা । বালমেরিনো তাঁকে দিলেন এক ধমক:”জেন্টলম্যান, আপনাকে একটু সাবধান হতে হবে– নতুবা আপনার ঐ ড্যামন্ স্টুপিড কুড়ুলটা আমার পায়ের হাড় ভেঙ্গে ফেলবে।” সে যাইহোক, বালমেরিনোর বোধহয় দশ ইঞ্চি লম্বা এবং বিশ ইঞ্চি চওড়া ব্লেডের ঐ কুড়ুলটার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। বিচার প্রতি সেশনে কয়েক ঘন্টা ধরে চলত। তাই এর মাঝে প্রায়ই পানবিরতি থাকত। ওয়েস্টমিনিস্টারের নীচ তলার একটি পানশালায় ফাউলার এবং কিছু উকিলকে নিয়ে তিনি বেশ জমিয়েই শেপার্ড পাইয়ের সাথে সুরাপান করে ধোয়া টানতেন। তিনি যখন জেইলারের সাথে কথা বলতেন তখন আঙ্গুল দিয়ে কুড়ুলের ধারের ওপর খেলা করতেন আর অন্য কেউ তাঁদের বাক্যালাপ শুনতে আসলেই তিনি কুড়ুলের ব্লেডটিকে তাদের মুখ বরাবর একটি হাতপাখার মতন ঘুড়িয়ে দিতেন।

বিচারের রায়ের দিন ক্রোমার্টি, কিলমার্নক আর বালমেরিনো এই তিন আসামীকে প্রায় একই সময় আদালতে হাজির করা হয়। লর্ড হাই স্টুয়ার্ড বালমেরিনোকে জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি নিজের স্বপক্ষে কিছু বলবার জন্য আগের দিন যে অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন সে সম্পর্কে তাঁর আইনজীবীদের পরামর্শ কি? উত্তরে বালমেরিনো বললেন তাঁর আইনজীবীদের মত হল যে–তাঁর পক্ষে যাবে এমন কোন যথেষ্ট কারণ আসলেই নেই এবং সেজন্য তিনি তাঁর যেকোন ধরণের আপত্তি ফিরিয়ে নিয়ে বিচারকসভাকে অযথা কষ্ট দেওয়ার জন্য সবিনয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করছেন। আসামীরা এরপর নিজেদের কোর্টের দয়ার ওপর ছেড়ে দিলেন। প্রধাণ বিচারক লর্ড লার্ডউইক তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে নাতিদীর্ঘ একটি বক্তব্য রেখে নিম্নোক্ত রায়ের মাধ্যমে এর সমাপ্তি টানলেন:
” আইনের বিচার এই যে এবং এই বিচারসভার সিদ্ধান্ত আপনাদিগের সম্মতিতে বা অসম্মতি উভয়ক্ষেত্রে প্রদাণ করে যে, আপনারা আপনাদিগের পদমর্যাদা অনুসারে–মাননীয় উইলিয়াম-কিলমার্নকের আর্ল, জর্জ-ক্রোমার্টির আর্ল এবং আর্থার-লর্ড বালমেরিনো টাওয়ারের যেখান হতে এস্থানে এসেছেন ঠিক সেখানে ফিরে যাবেন এবং সেখান থেকে আপনাদেরকে বধ্যভূমিতে স্লেজে শুইয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে, কারণ আপনারা ভূপৃষ্টে হাঁটবার যোগ্য নন। স্লেজটি ঘোড়ার লেজের সাথে উল্টোভাবে বাধা থাকবে–কারণ সেটি আপনাদের বাঁকা চরিত্রকে নির্দেশ করবে, সেখানে আপনাদের ফাঁস পড়িয়ে পৃথিবী আর স্বর্গের মাঝে ঝুলিয়ে অর্ধ্বমৃত করা হবে কারণ আপনারা এর কোনটারই যোগ্য নন, এরপর জীবিতাবস্থাতেই আপনাদের পেট চিড়ে নাড়ি-ভূড়ি বের করে আপনাদের চোখের সামনেই আগুনে পোড়ানো হবে, এরপর আপনাদের জননেন্দ্রীয়কে কেঁটে বিচ্ছিন্ন করে আগুনে ফেলে দেওয়া হবে কারণ আপনারা সন্তান জন্ম দেবার অযোগ্য এবং আপনাদিগের ইতোমধ্যে জন্ম নেওয়া নির্দোষ সন্তানেরা আপনাদের পাপের বোঝা বহন করবে, এরপর আপনাদের হৃৎপিন্ড কেঁটে টুকরো টুকরো করে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে কারণ মহান রাজার প্রতি বিদ্রোহকে আপনারা হৃদয়েই লালন করেছেন এবং সবশেষে আপনাদের দেহ থেকে মস্তক কেটে বিচ্ছিন্ন করা হবে কারণ আপনাদের হৃদয়ে লালিত রাজদ্রোহের জন্ম এবং উন্নতি হয়েছে সেখানেই। এরপর আপনাদের দেহকে কেটে চার খন্ডে বিভক্ত করে রাজার নির্দেশ সাপেক্ষে মাথাসহ জিরাপানিতে সেদ্ধ করে শহরতলী এবং লন্ডন ব্রিজের বিভিন্ন অংশে প্রদর্শনের জন্য খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখা হবে। পরম করুণাময় যীশু আপনাদিগের আত্মাকে মুক্তিপ্রদাণ করুন।”

রায়ের দিন সকাল থেকে প্রথানুসারে তাঁরা অভুক্ত ছিলেন। তাঁদের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল শুকরের লার্ডমেশানো ওটের পরিজ, লবন মেশানো চর্বিযুক্ত পর্ক চপ , ঠান্ডা রাইয়ের রুটি, পনির এবং সেগুলোকে ওয়াশ ডাউন করার জন্য তীব্রস্বাদের ড্রাই জিন। গোগ্রাসে খাওয়া সারলেন তিন আসামী। কয়েক পেগ তিক্ত স্বাদের কড়া জিন আকন্ঠ পান করে পিপাসা মেটালেন। পেটে কিছু সুরা পড়াতে একটু আগের ভয়াবহ রায় তাঁদের কাছে বেশ হালকা হয়ে গেল। এক যাদুকরী বস্ত এই সুরা। তাঁরা টাওয়ারে রওয়ানা দেবার এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবার আগে যেটুকু সময় পেলেন–নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন কিভাবে এবং কোন পদ্ধতি অনুসরণ করে রাজা জর্জের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন ও সুপারিশ করা যায়। আমরা আগেই জেনেছি যে ক্রোমার্টি এক্ষেত্রে সফল হন এবং কিলমার্নক ও বালমেরিনোর আবেদন নাকচ হয়ে যায়। যদিও রাজা তাঁর অধিকার প্রয়োগ করে শুধুমাত্র পদ্ধতি শিথিল করে বিভৎস “হ্যাংগিং, ড্রয়িং এ্যান্ড কোয়ার্টারিং” এর পরিবর্তে “শিরশ্ছেদ” এর মাধ্যমে প্রাণদন্ডে পরিণত করেন। এখানে একটি মজার বিষয় না উল্লেখ করলেই হয়। হ্যানোভার রাজবংশ পিতা আর পুত্রের বিরোধের জন্য বিখ্যাত ছিল । প্রথম জর্জ আর দ্বিতীয় জর্জের মধ্যে ছিল সাপে-নেউলে সম্পর্ক।তাঁরা একই সময় প্রতিদ্বন্দ্বী অপেরা বা সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন পর্যন্ত করতেন। একবারতো প্রিন্স অব ওয়েলস (পরবর্তীকালে দ্বিতীয় জর্জ) এর আনুকুল্যে বিখ্যাত ইটালিয়ান কাসত্রাতো ফারিনেল্লির একটি অপেরা রাজকীয় সংগীতজ্ঞ গিওর্গ হ্যান্ডেলের সংগীত সভা পন্ড করে দিয়ে সুপার হিট হয় । আবার দ্বিতীয় জর্জ এবং তৎপুত্র প্রিন্স অব ওয়েলস একে অপরের পিছে সু্যোগ পেলেই লেগে যেতেন। ক্রোমার্টির বেঁচে যাবার অন্যতম কারণ ছিল প্রিন্স অব ওয়েলস ফ্রেডেরিকের সুপারিশ। ফ্রেডেরিক পরবর্তীকালে বলেছিলেন যে তিনি ক্রোমার্টির পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন লেডি ক্রোমার্টির পিতা স্যার উইলিয়াম গর্ডনের একটি কাজের প্রতিদান হিসেবে। কি সেই কাজ? বুড়ো স্যার উইলিয়াম তাঁর মৃত্যুশয্যা থেকে উঠে এসে চিপেনহ্যামের নির্বাচনে তাঁর বাপের (রাজা দ্বিতীয় জর্জ) বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

চলুন আবার ফিরে আসি কিলমার্নকের শিরশ্ছেদের ঠিক পরপর।বেদীর ওপর রক্তজমা কাঁঠের গুড়িগুলো গাট্টাগোট্টা কতক চাকড়ানী হাত দিয়ে তুলে ঝুড়িতে ভরতে লাগল আর তারপর বালতি বালতি পানি ঢেলে বধ্যভূমিকে পুরোপুরি পরিষ্কার করে নতুন গুড়িকাঁঠ ছড়িয়ে দিল তারা। জল্লাদের সাদা পোশাক রক্তের ছিটায় লাল হয়ে গিয়েছিল। সেও পোশাক পাল্টে নিল। এই প্রস্ততিপর্ব চলাকালীন অবস্থাতে লেফটেন্যান্ট উইলিয়ামসন বালমেরিনোর কামরায় উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রস্তুত হবার জন্য আদেশ করলেন। লর্ড বালমেরিনো তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন:”আমি বুঝতে পারছি–লর্ড কিলমার্নক আর নেই”। এরপর তিনি কিলমার্নকের প্রাণদন্ডের পুরোপুরি বিবরণ শুনলেন এবং জল্লাদের দক্ষতায় সন্তোষ-জ্ঞ্যাপন করলেন। লেফটেন্যান্টকে উদ্দেশ্য করে তিনি আবারও বলে উঠলেন:” আমি আপনাদেরকে আর অপেক্ষা করাতে চাইনা। আমি আমার জীবনকেও আর দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছুক নই।” এরপর তিনি লেফট্যান্যান্টকে তাঁর দলসহ হাসিমুখে স্যালুট দিলেন। তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। একমাত্র তাঁর চোখেই বিন্দুমাত্র পানির আভাস পাওয়া গেলনা। বধ্যভূমির দিকে তাঁরা রওয়ানা হলেন। কিলমার্নকের প্রাণদন্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া চলাকালীন অবস্থাতে এই অসমসাহসী সৈনিক দু’দু’বার সামান্য রুটি আর এক গ্লাস রেড ওয়াইন পানের মাধ্যমে নিজেকে সতেজ করেছেন এবং বন্ধুদের স্বর্গের এক ধাপ ওপরে তাঁর নামে টোস্ট করতে বলেছেন। পুরো সময়টুকু (লেফটেন্যান্ট উইলিয়ামসন আসবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত) তিনি তাদের সাথে খোশগল্প করেছেন এবং লেফটেন্যান্টের কম্পানি তাঁকে নিতে আসবার পর অশ্রুবিহীণ নয়নে এবং হাসিমুখে তাঁদেরকে বিদায় দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন তাদের সাথে তাঁর এই শেষ দেখা নয়। এ জীবনের পরে যে অনন্ত জীবন আছে সেখানে তাঁরা আবারও মিলিত হবেন। কোনকিছুই আর পারবেনা তাঁদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে।

লর্ড বালমেরিনোকে এরপর এসকোর্ট করে বধ্যভূমির কাছাকাছি একটি ছোট কক্ষে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে তিনি তাঁর জীবনের শেষ একটুকরো রুটি এক গ্লাস বোর্দো সুরাতে চুবিয়ে খেলেন। তিনি সৈনিকের লাল-নীল রঙের রেজিমেন্টাল ইউনিফর্ম পড়ে ছিলেন। তিনি প্রিটেন্ডার সেনাদলে থাকা অবস্থায় এটি পড়তেন। তাঁর ইউনিফর্মের নীচে ছিল একটি পশমী শার্ট–যেটিকে তিনি তাঁর কাফন বলে অভিহিত করেছিলেন। যাইহোক, লেফট্যানান্ট উইলিয়ামসন এরপর ছোটখাট একটা বক্তব্য শেষে প্রথানুসারে বলে উঠলেন “ঈশ্বর রাজা জর্জকে রক্ষা করুন”। সাথে সাথে বালমেরিনো প্রতিবাদী কন্ঠে চিৎকার করে বলে উঠলেন ” ঈশ্বর রাজা জেমসের উপর তাঁর আশীর্বাদ বর্ষণ করুন!”, সেই লোকটি যাকে স্কটিশ সিংহাসনে বসাবার ব্যর্থ যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন তিনি। এরপর তাঁকে সেখান থেকে বধ্যভূমিতে এসকোর্ট করে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি উপস্থিত সেনা কম্পানিকে স্যালুট দিয়ে বেদীর সিড়ি বেয়ে অসম সাহসিকতার সাথে দ্রুত উঠে গেলেন। জনতা অবাক হয়ে দেখতে লাগল এই বীর সৈনিককে। বেদীর ওপর উঠে তিনি প্রথমে কিছুক্ষণ হেটে বেড়ালেন এবং জনতাকে উদ্দেশ্য করে মাথা নুইয়ে বো করলেন। এরপর তিনি ছোট একটি খাপ থেকে চশমা বের করে একটি কাগজে লেখা বক্তৃতা পাঠ করলেন। সেখানে তিনি হাউস অব স্টুয়ার্টের প্রতি তাঁর পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করলেন।
দুই বিদ্রোহী

জল্লাদ জন থ্রিফ্ট খুব নার্ভাস পৃকৃতির লোক ছিল। কিলমার্নকের মাথা নামানো ইতোমধ্যে তার স্নায়ুর ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছিল। তাছাড়া ব্রিটেনে বেশীরভাগ প্রাণদন্ড হত অনভিজাত লোকজনের এবং এর উপায় ছিল ফাঁসী। তাঁর ক্যারিয়ারে মাত্র একবার সে এক লর্ডের শিরশ্ছেদের সময় সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। কিলমার্নকের মুন্ডচ্ছেদই তার জীবনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ কাজ। সে ঢকঢক করে প্রায় ৪ পেগ কনিয়াক সুরা পান করে নিল। প্রথানুসারে থ্রিফ্ট বালমেরিনোর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করতে যেতেই তিনি তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। তিনি বললেন এর কোন প্রয়োজণীয়তা নেই। এরপর আরেকটি প্রথা অনুসারে তিনি জল্লাদকে তিনটি গিনি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করে বললেন:
” বন্ধু–জীবনে আমার কখনই খুব একটা টাকা-কড়ি ছিলনা। তোমাকে দেবার জন্য এটুকুই আমার আছে। যদি আরও কিছু দেওয়া যেত তাহলে মনে শান্তি পেতাম। তোমার জন্য এর সাথে আমার কোট আর ওয়েস্ট কোটটি শুধু যোগ করতে পারি।”
কুড়ুল এবং ব্লক
দন্ড কার্যকর

সাথে সাথে তিনি তাঁর পোষাকগুলো খুলে কফিনের ওপর রেখে দিলেন। এরপর তিনি তাঁর উইগ খুলে সেটি টাওয়ারে তাঁর দ্বাররক্ষককে দিয়ে দিলেন এবং একটি স্কটিশ নাইটক্যাপ এমনভাবে পড়ে নিলেন যাতে তাঁর লম্বা চুল বের না হয়ে থাকে। এরপর তিনি জল্লাদ থ্রিফ্টের কাছ থেকে কুড়ুলটা নিয়ে এর ধার নিজ আঙ্গুল দিয়ে পরীক্ষা করলেন। কুড়ুলটি জল্লাদকে ফিরিয়ে দিয়ে এরপর তিনি শিরশ্ছেদের ব্লকের দিকে এগোলেন। মাথা ঠিক জায়গা মতন রেখে তিনি জল্লাদকে বললেন যে তিনি যখন হাত ব্লকের দু’পাশ থেকে নামিয়ে রাখবেন সেটিই হবে কোঁপানোর ইঙ্গিত। তিনি নার্ভাস থ্রিফ্টকে উৎফুল্ল করবার উদ্দেশ্যে বললেন যে তাঁর গলার কিছু অতিরিক্ত মাংস সে ভাগ হিসেবে নিতে পারে। এরপর ব্লকে আবার মাথা রেখে তিনি ছোট-খাট একটি প্রার্থণা করে হাত নামিয়ে জল্লাদের উদ্দেশ্যে ইঙ্গিত করলেন। লর্ড বালমেরিনোর ক্ষেত্রে কিলমার্নকের ঘটনার ঠিক বিপরীত ঘটল। সিগন্যাল দেবার পর তিনি নিজের শরীরকে সামান্য নড়ালেন। এরমধ্যে থ্রিফ্টের প্রায় মুর্ছা যাবার অবস্থা। সে কাঁপতে কাঁপতে কুড়ুল উচিয়ে ধীরে বালমেরিনোর ঘাড় বরাবর দিল এক কোপ। বালমেরিনোর ঘাড়ে একটা বড় ঘা মাত্র দেখা দিল। জল্লাদের সহকারী আর দর্শকদের মধ্যেকার কিছু লোক তখন বাধ্য হয়ে ঘড় ঘড় শব্দ করে চিৎকাররত বালমেরিনোর পা এবং মাথা ব্লকের ওপর চেপে ধরল। এর মধ্যেই তিনি একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে রাগত: চোখে দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে থ্রিফ্টের দিকে তাকালেন। ফলাফলস্বরূপ জল্লাদ আরও ভড়কে গেল। সে আবারও বালমেরিনোর ঘাড় বরাবর বসালো এক কোঁপ। ওঁক ওঁক ঘড় ঘড় শব্দ বের হয়ে আসল বালমেরিনোর মুখ থেকে আর সমানে রক্ত এবং কফযুক্ত বমি হড়হড় করে বেরিয়ে আসতে থাকল তাঁর মুখ দিয়ে। ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতে থাকল। জল্লাদের সহকারী তাড়াতাড়ি আরেক পেগ কনিয়াক নিয়ে আসল। সেটি পান করে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সে আরও পাঁচবার কোপ দিল বালমেরিনোর ঘাড় বরাবর। শেষের কোঁপটি বালমেরিনোর থুতনির নীচের অংশ কেঁটে নিয়ে আসল। সেটি তাঁর ধড়ের সাথে আটকে রইল। ফিঁনকি দিয়ে লাল রক্ত বেরিয়ে এসে বেদীর চারপাশ ভাসিয়ে ফেলল। মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে কাপড়ের ওপর পড়ল। ওয়ার্ডেন খুব চেষ্টা চালালো থুতনির মাংসল অংশটা পাবার জন্য। কিন্ত সেটি ধড়ের সাথে লেগে থাকায় তা আর সম্ভব হলনা। প্রাণদন্ডের পর্ব শেষ হবার পর শুরূ হল ধোয়া-ধুয়ি আর সৎকারের পর্ব।

তথ্যসূত্র::
•G .Abbott (2002) The Executioner Always Chops Twice: Ghastly Blunders on the Scaffold
•J .Kellaway (2002) The History of Torture and Execution: From Early Civilization through Medieval Times to the Present
•H. Colburn (1833) The London literary gazette and journal of belles lettres, arts, sciences, etc
• M.Barthop (1982). The Jacobite Rebellions 1689–1745. Men-at-arms series #118. Osprey Publishing.
• Brown, S. J. (1997). William Robertson and the Expansion of Empire. Cambridge University Press.

• Patterson, Raymond Campbell (1998). A Land Afflicted: Scotland & the Covenanter Wars, 1638–90.

• Cowan, Ian (1976). The Scottish Covenanters, 1660–1688. London.

• Duffy, Christopher (2003). The ’45: Bonnie Prince Charlie and the Untold Story of the Jacobite Rising. Cassel.

• Harrington, Peter (1991). Chandler, David G.. ed. Culloden 1746, The Highland Clans’ Last Charge. Campaign series #12. Osprey Publishing.

• Gibson, John G. (2002). Old and New World Highland Bagpiping. McGill-Queen’s University Press.

• Harris, Tim (2005). Restoration: Charles II and his Kingdoms, 1660–1685. London.

• Harris, Tim (2006). Revolution: The Great Crisis of the British Monarchy, 1685–1720. London.

• Lockhart, George (1817). The Lockhart papers: containing memoirs and commentaries upon the affairs of Scotland from 1702 to 1715. 2. London.
• Maclean, Fitzroy (1991). Scotland, A Concise History. Thames and Hudson.
.
• Magnusson, Magnus (2003). Scotland: The Story of a Nation. Grove Press.
• Monod, Paul Kleber (1993). Jacobitism and the English People, 1688-1788. Cambridge University Press.
• Pickering, W. (ed.) (1881). An Old Story Re-told From The “Newcastle Courant”. The Rebellion of 1745..

• Prebble, John (1962). Culloden. Atheneum.

• Prebble, John (1973). The Lion in the North. Penguin Books.

• Reid, Stuart (1996). British Redcoat 1740–1793. Warrior series #19. London: Osprey Publishing.

• Reid, Stuart (1996). 1745, A Military History of the Last Jacobite Rising. Sarpedon.

• Reid, Stuart (1997). Highland Clansman 1689–1746. Warrior series #21. Osprey Publishing.

• Reid, Stuart (2002). Culloden Moor 1746, The Death Of The Jacobite Cause. Campaign series #106. Osprey Publishing.

• Reid, Stuart (2006). The Scottish Jacobite Army 1745–46. Elite series #149. Osprey Publishing.

• Roberts, John Leonard (2002). The Jacobite Wars: Scotland and the Military Campaigns of 1715 and 1745. Edinburgh: Edinburgh University Press.

• Sadler, John (2006). Culloden: The Last Charge of the Highland Clans. NPI Media Group.

• Smith, Hannah (2006). Georgian Monarchy: Politics and Culture. Cambridge University Press.

• Smurthwaite, David (1984). Ordnance Survey Complete Guide to the Battlefields of Britain. Webb & Bower.

• M.Pittock (2006) .Poetry and Jacobite Politics in Eighteenth-Century Britain and Ireland (Cambridge Studies in Eighteenth-Century English Literature and Thought)
• J.Thomas (2010)The Universal Dictionary of Biography and Mythology

মুক্তমনা ব্লগার

মন্তব্যসমূহ

  1. তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 11, 2012 at 4:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    @আদিল মাহমুদ,
    বেচারী জেন গ্রে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে কুৎসিৎ রাজনীতির বলি হয়ে যেতে হয় তাঁকে। নীচের ন্যাটজিওর অতিসাম্প্রতিক ডকুটি দেখতে পারেন। এতে টাওয়ারে জেনসহ আরও দুইজনের শিরশ্ছেদের খুবই পূঙ্খানুপুঙ্খ আর সচিত্র লোমহর্ষক বর্ণণা আছে। Bloody Tales Of The Tower.
    আর এই বিখ্যাত ক্লাসিক ছবিটি:
    Lady Jane (1986)
    দুই হতভাগ্য রাজপুত্রের ঘটনা নিয়ে ২০০৫ এর ছবি প্রিন্সেস ইন দ্য টাওয়ার।
    প্রথমটি পাবেন Tvfreeload। দ্বিতীয় আর তৃতীয়টি piratebay তে।

  2. আদিল মাহমুদ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 11:58 অপরাহ্ন - Reply

    ঘটনাটি আগেই পড়েছিলাম। মৃত্যুদন্ড প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের বহু কথা হয়েছে আগে।

    স্কটিশ, আইরিশদের সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্ক ঠিক কেমন ছিল? স্কটিশ আইরিশরা কি কখনো স্বাধীন ছিল? আজকের দিনেও সম্পর্কটা ঠিক পরিষ্কার না।

    লন্ডন টাওয়ারে রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ দুই রাজকুমারী সম্পর্কে লিখবেন নাকি?

    • তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 10, 2012 at 1:31 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আদিল মাহমুদ,
      আয়ারল্যান্ডের একটা অংশ হল স্বাধীণ রাষ্ট্র রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড। অপরটি অর্থাৎ নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভূক্ত। এখানে বলে রাখা ভালো যে ব্রিটিশ শব্দটি ইংলিশ, স্কটিশ, আইরিশ এবং ওয়েলশ্ এই চার জাতির জন্যই প্রযোজ্য। আপনি সম্ভবত: ইংরেজদের সম্পর্কে বলতে চেয়েছেন। আয়ারল্যান্ডে বহু আগে থেকেই কোন নিজস্ব রাজতন্ত্র ছিলনা। ট্যুডোর আমলে সেখানে ইংরাজ আধিপত্য
      প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১৭৭ থেকে ১৫৪১ সাল অবধি এটি ছিল একটি জমিদারী বা লর্ডশীপ। ইংল্যান্ডের রাজা ছিলেন আয়ারল্যান্ডের লর্ড। আইরিশ পার্লামেন্ট ছিল স্বতন্ত্র। স্হানীয়ভাবে একজন লর্ড লেফটেন্যান্ট
      আয়ারল্যান্ডের লর্ডের প্রতিনিধিত্ব করতেন। ১৫৪১ সালে আইরিশ পার্লামেন্ট ট্যুডোর রাজা অষ্টম হেনরীকে আয়ারল্যান্ডের রাজা ঘোষনা দেন এবং এভাবে আইরিশ রাজতন্ত্রের সূচনা হয়। ১৮০১ সালে স্বাধীণ আইরিশ রাজতন্ত্র তাদের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত অনুসারে তৎকালীন কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেইনের সাথে যুক্ত হয়ে কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেইন এবং আয়ারল্যান্ডের সূচনা করে। বর্তমান ইউনিয়ন জ্যাক কিভাবে তিন দেশের পতাকা মিশিয়ে তৈরী হয়েছে পোস্টে সেটির একটি ছবি আছে। স্কটল্যান্ডের বিষয়টি ছিল ভিন্নতর। তাদের নিজস্ব পার্লামেন্ট এবং রাজা ছিল। আর এই রাজ্যের সাথে ইংরাজের ছিল জাতশত্রুতা। তবে তাদের ভেতর বিয়ে-শাদী হত। ইংল্যান্ডের রাণী ১ম এলিজাবেথ চিরকুমারী এবং নিঃসন্তান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ইংলিশ পার্লামেন্ট রাণীর ভাগ্নে স্কটল্যান্ডের রাজা ৬ষ্ঠ জেমসকে ইংল্যান্ডের ১ম জেমস্ ঘোষনা করে। তবে, দুই রাজ্য এবং এদের পার্লামেন্ট বহুকাল পৃথক থাকে–রাজা শুধু স্কটিশ। ব্রিটেনের রাজারা কখনই ইংরেজ ছিলনা–তারা প্রথমে ছিল ফরাসী, তারপর ওয়েলশ, তারপর স্কটিশ এবং অদ্যবধি জর্মন।

      টাওয়ারে বন্দী এবং নিজেদের আপন চাচার হাতে গুম-খুন হওয়া দুই হতভাগ্য রাজকুমারের কাহিনী
      সত্যই করুণ কিন্ত চমকপ্রদ। ভবিষ্যতে এ নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে।

      • আদিল মাহমুদ সেপ্টেম্বর 11, 2012 at 3:08 পূর্বাহ্ন - Reply

        @তানভীর হানিফ,

        স্কটিশদের সাথে ব্রিটিশদের সবসময়ই ক্যাঁচাল ছিল, মানে তারা বার বার পরাধীন হয়েছে এটাই মনে হয়।

        ব্রিটিশ রাজপরিবার ফলো করা রীতিমত কঠিন পরীক্ষার মত, আগেও আমাদের কথা হয়েছে। জেমস, জন, রিচার্ড, এডওয়ার্ড, চার্লস…কই থেকে যে কই যায়…

        দুই বালিকা রাজকুমারী নিয়ে লেখেন দেখি। শুনেছি ইংরেজ মূলুকে সকলে বিশ্বাস করে না যে চাচাই আসল খুনী, এ যুগেও নাকি সেই চাচার ফ্যান ক্লাব আছে যারা প্রমান করার চেষ্টা করে যে উনি আসলে নির্দোষ। ঘটনার ৩০০ বছর পর মনে হয় ২টা ছোট কংকাল এক সিঁড়ি ঘরের নীচের খোপে পাওয়া যায়, কিন্তু ১৯৩০ সালে নাকি পরীক্ষায় প্রমান হয়েছে যে সেগুলি সেই দুই বালিকার নয়।

        ম্যারি এনের শিরোচ্ছেদ ঘটনাও জানতে চাই।

        • তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 11, 2012 at 3:22 পূর্বাহ্ন - Reply

          @আদিল ভাই,
          ব্রিটিশ হবে না। ইংরেজ হবে। ১৬০৩ সালে স্কটল্যান্ডের রাজাকে ইংল্যান্ডের রাজা ঘোষনা করা হয়।
          তাহলে কি বলা যায় ইংরেজরা আসলে স্কটিশদের শাসনাধীণে চলে যায়? পশ্চিমা বিধিব্যবস্থা আসলে
          ঠিক ততটা সরল নয়।

          রাজকুমারী নয়–রাজকুমার। কনস্পিরেসি থিওরীটির বিষয়ে জানতুম না। খোজ নিয়ে দেখব।

          ম্যারি এ্যান বলতে কি মাগী আঁতোয়ানেতের কথা বুঝিয়েছেন?

          • আদিল মাহমুদ সেপ্টেম্বর 11, 2012 at 3:57 পূর্বাহ্ন - Reply

            @তানভীর হানিফ,

            সেই রানীর নাম ছিল জেন গ্রে, ৯ দিনের জন্য রানী ছিলেন, তারপর টাওয়ারের চত্ত্বরে কূড়ালের বাড়িতে শিরোচ্ছেদ।

            কন্সিপিরেসি থিয়োরী ও সেই রানীর সামান্য কথা নীচের ভিডিওতে পাবেন।

            httpv://www.youtube.com/watch?v=Za0_aLcfNGU

  3. তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 11:29 অপরাহ্ন - Reply

    @সৈকত চৌধুরী,
    কমেন্ট করা যাচ্ছে না কেন–বুঝতে পারছিনা।

  4. সৈকত চৌধুরী সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 10:51 অপরাহ্ন - Reply

    পড়েছি। শাস্তিদানের পদ্ধতি এত বর্বর কেন ছিল জানি না। ইংল্যান্ডে তখন রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অপরাধীদের প্রথমে অন্ডকোষ সহ লিঙ্গচ্ছেদ করে তারই সামনে তা পোড়ানো হত। এরপর নাড়িভূড়ি বের করে দেহকে চারভাগে ভাগ করে চারটি স্থানে ঝুলিয়ে রাখা হোত।

    প্রথানুসারে, কিলমার্নকের সেলের ওয়ার্ডেন মৃতদেহের গলা থেকে কিছু মাংস কেঁটে নিয়ে গেলেন যাকিনা আজ দুপুরের মাংসের ঝোলে মেশানো হবে।

    বিভৎস। এটা জানা ছিল না। এ তো ক্যানিবেলিজম!

    • তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 13, 2012 at 11:56 অপরাহ্ন - Reply

      @সৈকত চৌধুরী,
      আধুনিক ইউরোপের প্রাথমিক যুগে ক্যানিবালিজম ভালোভাবেই প্রচলিত ছিল। তবে সেখানে অন্যান্য অইউরোপীয় সভ্যতার মতন ভোজনের উদ্দেশ্যে নরহত্যা করা হত এমনটি নয়। তারা বরঞ্চ সেসব ক্যানিবালদেরকে স্যাভেজ বলত।কিন্ত ইউরোপে নরমাংস বিষয়ে ট্যাবু থাকায়–এর প্রতি অনেকের অসুস্থ আকর্ষণও ছিল। রিচার্ড সাগের সাম্প্রতিক একটি বইয়ে ইউরোপীয় ক্যানিবালিজমের ঐতিহাসিক বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই ঊনবিংশ শতকের জর্মানীতেও বধ্যভূমিতে নিয়মিত রক্তপান হত। একবার এক আসামীর মুন্ডচ্ছেদের মূহুর্তমধ্যে–ধরটি মাটিতে পড়বারও আগে এক রোগী এর উপর ঝাপিয়ে পড়ে কাঁটা গলায় মুখ বসিয়েই গরম গরম রক্ত সরাসরি পান করা শুরু করে। আমাদের দেশে যেমন গরুর মাংসে মহিষের মাংস মিশানো হয়–অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে বরাহমাংসের সাথে অনেক সময়ই নরমাংস মিশানো হত। শহরের জল্লাদের সাথে কশাইয়ের ভালোই বোঝাপড়া ছিল (অনেক জল্লাদই আবার তার পেশাগত জীবনের প্রথমভাগে কশাই ছিল)। আপনি ভল্তেয়ারের কাঁদিদ পড়ে থাকলে যুবতীদের স্তন কেঁটে ঝলসিয়ে খাবার বিষয়ে তাঁর অস্বাভাবিক অবসেসিভ মনস্তত্ব লক্ষ্য করতে পারেন। ১৬৭২ সালে ডাচ প্রধাণমন্ত্রী জোহান ডি উইটকে লিনচিং করা হয়। After the arrival of Johan de Witt, the city guard was sent away on a pretext to stop farmers who were supposedly engaged in pilfering. Without any protection against the assembled mob, the brothers were dragged out of the prison and killed next to a nearby scaffold. Immediately after their deaths, the bodies were mutilated and fingers, toes, and other parts of their bodies were cut off. Other parts of their bodies were eaten by the mob (or taken elsewhere, cooked and then eaten).

  5. আল্লাচালাইনা সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 8:48 অপরাহ্ন - Reply

    🙂 টোর্চারাস ৃত্যদন্ডু নিয়ে আপনার এই ফ্যাসিনেশনের ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং-ই বটে! তবে এইটার এতোটা নগ্ন রুপ দেখতে অতীতে যাওয়াটাও অপ্রয়োজনীয়। কয়েকদিন আগে একটা ভিডিও দেখেছিলাম আফগানিস্তানে পরকীয়ার অভিযোগে এক নারীকে পিছন ফিরিয়ে বসিয়ে মাথায় পিঠে ফাকা করে দেওয়া হচ্ছে কালাশনিকভের ম্যাগজিন এবং শ তিনের লোক গোল হয়ে ঘিড়ে দাড়িয়েছে এই কান্ড দু চোখ ভরে দেখে নেওয়ার উপলক্ষ্যে। প্রথম গুলিতে নারীটির ভুমিতে পতন যখন হয় শতিনেক পাগড়ি পরিহিত শুষ্মামন্ডিত শুকরছানা তখন ঘোত ঘোত করে চেচিয়ে ওঠে, গেস হোয়াট- আল্লাহু অকবার আল্লাহু অকবার।

    একই ব্যাপার ঘটেছিলো ঢাকাতেও, আমীনবাজারে যখন শপাঁচেক জনতা রাতের আধারে পিটিয়ে ইট দিয়ে হাত পায়ের আঙ্গঅল ছেঁচে দিয়ে হত্যা করে ছয়জন নিরপরাধ ছাত্রকে যাদের মধ্যে কয়েকজন আবার ছিলো অনুর্ধব ১৮ শিশু!

    এই ব্যাপারগুলো এতো বেশী দেখতে হয়েছে সংবাদে পত্রিকায় যে অনেকেই হয়তো সম্পুর্ণই মানিয়ে নিয়েছে এই বাস্তবতার সাথে যে এগুলো থাকোতে যাচ্ছে, তথাপিও আমাকে কেনো যেনো এখনও এগুলো অনেক অনেক ডিস্টার্বড বোধ করায় 🙁

    • তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 9:56 অপরাহ্ন - Reply

      @আল্লাচালাইনা,
      এগুলো আমার কাছে হয়ত ফ্যাসিনেটিং কিন্ত নিশ্চয়ই ডিস্টার্বিং। তবে এই ফ্যাসিনেশানের সাথে ইতিহাসও সম্পৃক্ত। লক্ষ্য করবেন-পশ্চিমা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ। আবার, এর সামাজিক বা সাংস্কৃতিক যে পটভূমি সেটির প্রতিও আমি কিউরিয়াস। ১৯০০ সালের সুইডেন বা ১৯৩৮ সালের অত্যাধুনিক জর্মানীতে কি কারণে মৃত্যুদন্ডের জন্য কুড়ুল এবং ব্লক ব্যবহার করা হয় এবং সেই একই সময়কালের ব্রিটিশ বা মার্কিনেরা কেন সেটিকে মধ্যযুগীয় পণ্থা মনে করেন–এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুঘটক, প্রেক্ষাপট কি–এগুলো আমার আগ্রহের বিষয়। ঊনবিংশ শতকের মোটামুটি আধুনিক ডেনমার্কের কথাই ধরা যাক:
      In Denmark the young Hans Christian Andersen saw parents getting their sick child to drink blood at the scaffold. So popular was this treatment that hangmen routinely had their assistants catch the blood in cups as it spurted from the necks of dying felons.

  6. আদিল মাহমুদ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 8:03 অপরাহ্ন - Reply

    চমতকার লেখা মনে হচ্ছে। পরে সময় করে পড়ছি।

    আপনি কি আমার ব্লগের চড়ুই ভাই? ঊনি এসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ।

    • তানভীর হানিফ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 8:48 অপরাহ্ন - Reply

      আদিল ভাই,
      ঠিক বলেছেন। আমি ইতিহাসে বিশেষঅজ্ঞ। কিন্ত ভোজনরসিক হতেতো আর বাবুর্চি হওয়া
      লাগেনা 😉

      • আদিল মাহমুদ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 10:28 অপরাহ্ন - Reply

        @তানভীর হানিফ,

        আপনাকেই এখানে খুজছিলাম। চালিয়ে যান…

  7. কৌস্তুভ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 6:18 পূর্বাহ্ন - Reply

    বীভৎস উপাখ্যান। রাজাদের এই পরষ্পর **মারামারির ইতিহাস খুবই ক্লেদাক্ত।

    তবে আপনার লেখার স্টাইলটা খানিকটা ইতিহাসবইয়ের মত, একটু সরস হলে আরাম হত।

মন্তব্য করুন