স্টেইটস্‌ অভ আর্টঃ এল ক্যামিনো রিয়েল, ক্যালিফোর্নিয়া (প্রথমার্ধ)

By |2013-01-28T04:37:24+00:00সেপ্টেম্বর 5, 2012|Categories: ভ্রমণকাহিনী, স্মৃতিচারণ|12 Comments

ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে ড্রাইভ করতে গেলে এ-দিক সে-দিক হয়ে বারেবারে ঘুরে ফিরে আসে একটা রাস্তা। নামটাও খানিকটা অন্যরকম। এল ক্যামিনো রিয়েল। রোদেলা সকাল, দুরন্ত দুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকেলে এই রাস্তায় পথ ধরে চলে গেছি মাইলের পর মাইল। কে জানতো, আমার পথ চলার কয়েক’শ বছর আগেই এই রাস্তাতেই পথ চলতে শুরু করে আজও এগিয়ে চলছে আরো এক যাযাবর। কালের সাক্ষী হয়ে অবিরাম চলতে থাকা সেই নিরলস যাযাবরের নাম ‘ইতিহাস’।

১৭৬৯ সালের কথা। তখনও ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে নিজেদের মত করে জীবন যাপন করছিলো স্থানীয় নেটিভ আমেরিকানর আদিবাসীরা। সে-বছর মধ্য জুলাইয়ের সাধারণ এক গ্রীষ্মকালীন দিনে, নেটিভদের সাদামাটা এক বসতিতে গিয়ে হাজির হন ফাদার ফ্রান্সিসকো গোমেজ আর ফাদার হুয়ান ক্রেসপি। উপস্থিত হয়েই তারা দেখতে পান ছোট্ট দুই শিশু মৃত্যু পথ যাত্রী। একজন মায়ের দুগ্ধপানরত অবস্থায় মারা যাচ্ছে, আরেকজন আগুনে পুড়ে। মৃত্যু পথ যাত্রী সেই শিশুদের একজনকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন ফাদার গোমেজ এবং সে মেয়ে শিশুর নাম রাখেন মারিয়া ম্যাগডালিনা। অন্যদিকে, ফাদার ক্রেসপি ধর্মান্তরিত করেন অন্যজনকে এবং তার নাম রাখেন মার্গারিটা।

কিন্তু, দেবদূত হয়ে হঠাৎ করে অবতীর্ণ হননি ফাদার গোমেজ আর ফাদার ক্রেসপি। তাদের অবতীর্ণ হবার সেই উপলক্ষ্য সুদূরপ্রসারী। তখনকার দিনের শক্তিশালী স্প্যানিশ সরকার ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে স্থানীয় নেটিভদের উপর আধিপত্য বিস্তারের নিমিত্তে সুবিশাল এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনার দুটো ধরণ,আর দুই ধরণের পরিক্ল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সেখানে পাঠানোও হয় দুই ধরণের মানুষ- মিশনারি এবং মিলিটারি। মিলিটারি করবে আক্রমণ আর মিশনারি করবে ধর্মান্তকরণ। তাদের সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলস্বরূপ, ১৭৬৯ সাল থেকে ১৮২৩ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করা হয় ২১টি মিশন। সবচাইতে দক্ষিণের মিশন স্যান ডিয়েগো এবং সবচাইতে উত্তরের মিশন স্যান ফ্র্যান্সিসকো।

              ছবিঃ ক্যালিফোর্নিয়ার মানচিত্রে মিশনগুলোর অবস্থান

এই সুদীর্ঘ এক হাজার কিলোমিটারজুড়ে, যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো মিশনগুলো, যেই রাস্তায় ঘোড়া ছুটিয়ে একদিন নির্মিত হয়েছে উপনিবেশ, সেখানটাতে জড়িয়ে আছে এক রাস্তার নাম। ক্ষমতাবানদেরর আধিপত্য আর দূর্বল নেটিভদের অস্তিত্ব্ব বিলীন হয়ে যাবার চাক্ষুস সাক্ষী হয়ে, আজও নীরবে নিশ্চুপ হয়ে থাকা সেই রাস্তার নামই এল ক্যামিনো রিয়েল। স্প্যানিশ এই নামের ইংরেজী অর্থ দ্যা রয়েল রোড। কিংস হাইওয়ে নামেও অনেক জায়গায় উল্লেখ আছে। কালের বিবর্তনে এল ক্যামিনো রিয়েলের অংশবিশেষ কোথাও কোথাও পরিবর্তিত হয়েছে (হাইওয়ে ১০১), কালো পিচ দিয়ে ঢেকে নির্মিত হয়েছে সভ্যতা। কিন্তু, পিচের নিচের ধূলোবালিতে ঠিকই লেপ্টে আছে ইতিহাস।

২১টি মিশনের প্রতিটির দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারের কাছাকাছি রাখা হয়েছে। সাধারণভাবে বলে গেলে এই তথ্যটির মধ্যে কোনো ইতিহাস নেই, রোমাঞ্চও নেই। কিন্তু, কেন সেটা পঞ্চাশ কিলোমিটারের কাছাকাছি রাখা হয়েছে, সেটা খুঁজতে গেলেই বের হয়ে আসবে ইতিহাস; চোখের সামনে ফুটে উঠবে ঘোড়ার উপর সওয়ার হয়ে চাবুক মেরে ছুটে চলা, এই কিছুদিন আগের পৃথিবীর মানুষগুলির ছবি। একদিনে ঘোড়ায় চড়ে স্বাভাবিকভাবে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করা যায় বলেই মিশনগুলোর দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারের কাছাকছি। এখনকার দিনের মত সেই সময় রাস্তায় রাস্তায় ম্যাগডোনাল্ডস্‌ আর সাবওয়ে ছিলো না, তাই মিশনগুলোকে একে অপরের উপর নির্ভর করতে হতো; খাবারের জন্য, বিশ্রামের জন্য। দিনে দিনে এক মিশন থেকে অন্য মিশনে পৌঁছাতে হতো মানুষজনদের।

এই এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পৃথিবীর রং-রূপ-সৌরভে তৃপ্ত যেমন হয়েছি, তেমনি আবার ঠিক কোন রূপকথার গল্প শুনিয়ে এ-মাটির মায়েরা তাদের কোলের শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় সেটা না জানতে পারায় অতৃপ্তও থেকেছি। আর বারে বারে মনে হয়েছে, মাত্র এক-জীবন সমান স্বল্প সময়ের জন্য, এই পৃথিবী অনেক বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর।

পুরো এক হাজার কিলোমিটারে দুই প্রান্তের দুটি মিশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা দুট শহরই (স্যান ফ্র্যান্সিসকো আর স্যান ডিয়েগো) সবচেয়ে নামীদামী। ঊল্লেখ্য, বর্তমান স্যান ফ্র্যান্সিসকো শহরের ভেতর যে মিশন আছে, সেটিই সর্ব উত্তরের মিশন নয়। শহর থেকে কিছুটা দূরে আরো দু’টি মিশন আছে। পাহাড় আর সমুদ্রের ধারে তিলে তিলে গড়ে উঠা শহর স্যান ফ্র্যান্সিসকো। তিলোত্তমা নগরী।

                  ছবিঃ শহর স্যান ফ্র্যান্সিসকোর রাস্তা

শহরের মাঝখানের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলা গাড়ী দেখে মনে হবে যেন পিরামিডের গা বেয়ে উঠে যাচ্ছে আকাশের পথে, কিছুক্ষণ পরের আবার মনে হবে পিরামেডের গা বেয়েই নেমে চলছে পাতালপুরীতে। পাওয়েল স্ট্রিট ধরে চলতে থাকা ক্যাবল কার-এ উঠে এই পিরামিড শহরে ঘুরতে গেলে মনে হয় এই বুঝি বেরিয়ে আসলো মিশরের রাজা কোনো এক ফারাও। কখনো আবার মনে হয়, পুরোটাই বুঝি এক ছেলেখেলার শহর। মনে হয়, সারা শহরজুড়ে কে বা কারা যেন লুকোচুরি খেলছে।

          ছবিঃ উপরে পাওয়েল স্ট্রিট (সৌজন্যে ক্রনিকল এবং প্যানোরামিক), নীচে টুইন পিক থেকে দেখা শহর

শহরের চূড়ায় উঠে একটু দূরে তাকালেই দু-দুটো ব্রিজ। বে-ব্রিজ আর গোল্ডেন গেইট ব্রিজ (বিস্তারিত এখানে)। শহর থেকে শুরু হওয়া বে-ব্রিজ জলসীমা পেরিয়ে অপর পাশের যে অঞ্চল্টাতে গিয়ে থেমেছে, সেখানকার পাহাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জগদ্বিখ্যাত এক বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাট বার্কলি। ছোট্ট শহর বার্কলি, অথচ বুকে ধারণ করে আছে মস্ত বড় এক জ্ঞানের কারখানা।

          ছবিঃ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাট বার্কলি ক্যাম্পাস

বে ব্রিজের আর গোল্ডেন গেইট ব্রিজ দুটোরই এক প্রান্ত এসে থেমেছে স্যান ফ্র্যান্সিসকো শহরে। কিন্তু, বে ব্রিজের অপর প্রান্তে যদি থাকে গোটা দুনিয়ায় নামী এক বিশ্ববিদ্যালয়, গোল্ডেন গেইট ব্রিজের অপর প্রান্তেও যদি সে-রকম জগদ্বিখ্যাত কোনো স্থাপনা না থাকে, তাহলে সেটা যে কেলেঙ্কারি ব্যাপার হয়ে যায়। গোল্ডেন গেইট ব্রিজের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে সসালিটো ভিলেজ। গতানুগতিক আমেরিকান ছোট্ট টাউনের ইমেজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা এই সসালিট ছবির মত সুন্দর, যেন তুলির আঁচড়ে তৈরী এক তীর্থস্থান। এখানে এসে ভীড় করেন শিল্প-সঙ্গীত-সাহিত্যেজগতের বিখ্যাতজনেরা। এখানকার পরিবেশ, মন মাতানো বাড়ীঘর, খানিক দূরে পাল তুলে চলতে থাকা জেলেদের নৌকা, ঋষির মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় শিল্পীর সৃষ্টিশীলতাকে বের করে আনে হৃদয়ের গভীর গহীণ থেকে। শিল্প আর শিল্পীর তীর্থস্থান সসালিটো।

          ছবিঃ উপরে গোল্ডেন গেইট ব্রিজের এক প্রান্ত থেকে দেখা শহর, নীচে পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা সসালিটো ভিলেজ, দূরে ডানে খুব ছোট করে দখতে পাওয়া স্যান ফ্র্যান্সিসকো শহর

একদা যে মিশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আজকের স্যান ফ্র্যান্সিসকো শহর, সেই মিশন ডলোরেস এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো স্থাপনা। শুধু শহরের নয়, গোটা ২১টি মিশনের মধ্যে শুধু এখানকার পুরোনো মিশন ভবনটিই ১৭৭৬ সালে যেভাবে স্থাপন করা হয়েছিলো, সেভাবেই আছে। বাকী সবগুলো মিশনই পুননির্মাণ করা হয়েছে। যদিও এখানে পুরোনো মিশনের সাথে সাথে নতুন করে স্থাপিত বেসিলিকা (basilica)ও রয়েছে।

      ছবিঃ মিশন ডোলোরেস, উঁচু চূড়াগুলো নতুন করে তৈরি বেসিলিকার। উপরের ছবিতে প্রথমে যে ভবনটি আছে সেটিই শহরের সবচেয়ে পুরোনো স্থাপনা

এই মিশনে প্রদর্শনীর জন্য যে সমস্ত সামগ্রী রাখা হয়েছে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের যে সমস্ত টুকরো গল্প উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটা আমেরিকার অন্য এলাকাগুলো থেকে আলাদা নয়। নেটিভদের সহজ-সরল জীবন-যাপন, তাদের রীতি-নীতিই সে ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূল অংশ। কিন্তু, যে সত্য প্রদর্শনীর স্টলে সাজিয়ে রাখা হয় না, যে ইতিহাস মুছে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে, সভ্য মানবের অসভ্যতা-বর্বরতার ইতিহাস, তিলে তিলে নেটিভদেরকে ধ্বংস করার ইতিহাস সেটা কোথাও বলা হয় না। কি-জানি, হৃদয় খুঁড়ে কেউই হয়তো বেদনা জাগাতে ভালোবাসে না!

                ছবিঃ অ্যাডবি- এই ঘরগুলো বানিয়ে সে-সময় আদিবাসীরা থাকতো

স্যান ফ্রান্সিসকো শহর থেকে চলতে শুরু করে একটু দক্ষিণের এগিয়ে যেতেই পড়বে ড্যালি সিটি। পুরোপুরি শহর বলতে যা বুঝায় এ-শহর সেরকম নয়। উঁচু উঁচু দালান নেই, বিশাল সুপার মার্কেট নেই। মূল শহরের মত অত কোলাহল থাকেনা এধরণের শহরে। কিন্তু, ছোট শহর হলেও বিশেষ এক কারণে একেবারেই আলাদা ড্যালি সিটি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধাপে ধাপে একের পর এক বাড়ি বানিয়ে তৈরী এ-শহর যেন সুদীর্ঘ-সুবিশাল এক স্টেডিয়াম। শহরবাসীরা গ্যালারিতে থাকা তাদের বাড়ীর জানালায় দাঁড়িয়ে হেয়ালি প্রকৃতির খেলা দেখে বেড়ায়। ড্যালি সিটির কোনো এক রাস্তা ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরের আরেক শহর প্যাসিফিকাতে ড্রাইভ করে গেলে মনে হবে, কল্পিত নগরী কোহে-ক্বাফ বুঝি এখানটাতেই। অনেক জায়গায় দেখেছি তুষার কিংবা কুয়াশার জন্য গাড়ী চালানো সম্ভব হয় না, কিন্তু এই ড্যালি সিটিতে তুষার কিংবা কুয়াশা নয়, মেঘের জন্য হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ী চালাতে হয়। প্যাসিফিকা এলাকায় পাহাড়ের গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত ঘরগুলো ঢেকে যায় মেঘে। পাহাড়, সমুদ্র, মেঘ, উপত্যকা সব মিলিয়ে এক পরাবাস্তব অনুভূতি, মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য পরিচিত পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে বুঝি কল্পনার কোনো জগতে এসে উপস্থিত হয়েছি।

              ছবিঃ উপরে ড্যালি সিটি (সৌজন্যে উইকি) নীচে প্যাসিফিকা

এবার মূল রাস্তার একটু বাইরে হাফ মুন বে নিয়ে বলবার পালা। হাফ মুন বে, বাংলা করলে দাঁড়াবে অর্ধচন্দ্র উপসাগর। আঁকাবাঁকা পাহাড় বেয়ে, মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা ধরে গিয়ে পৌঁছাতে হয় বিখ্যাত হাফ মুন বে প্রাঙ্গণে। প্রাঙ্গণ না বলে বিচ্‌ বলাই ভালো। অন্তত আমেরিকানরা সেটাই বলে থাকে। কিন্তু, এত সাধারণ মানের কিন্তু বিশেষভাবেখ্যাত সমুদ্র সৈকত খুব কমই দেখা যায়। অথচ, এরা যখন এর সৌন্দর্য বর্ণনা করে, মনে হয় হাফ-মুন বে মানে চাঁদের দেশের কাছাকাছি কিছু। আমেরিকায় সবকিছু ব্যবসা কেন্দ্রিক। এদেরকে যদি কেউ গিয়ে বলে, গোল আলু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি আলু– এটা দিয়ে একটা বিজ্ঞাপণ তৈরী করে দিতে। এরা প্রথমে বলবে, নো প্রবলেম স্যার। আগে আপনি আরাম করে বসুন। তারপর বলবে, আমরা ঠিক বুঝলাম না স্যার। এটা বিজ্ঞাপণ হতে যাবে কেন? এটাতো সবাই জানে যে গোল আলুই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি আলু। সবার আগে যিনি বিজ্ঞাপণ বানাতে গেছেন উনাকেই বিভ্রান্ত করে দেবে, তারপর আসবে কাস্টমারকে বিভ্রান্ত করার পালা। এদের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে খুঁজলে হয়তো ব্যাচেলর কিংবা মাস্টার্স অব বিভ্রম অ্যাডমিনিস্ট্রেশান জাতীয় ডিগ্রিও খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে হাফমুন বে সে যাই হোক না কেন, অর্ধ-পূর্ণ-স্বল্প যে চন্দ্রই হোকনা কেন, সাথে যে তার প্রশান্ত মহাসাগরটা আছে। অপূর্ব সেই সাগরই মন ভুলিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট।

এরপর এগিয়ে গেলে কিছু দূরে গিয়ে পড়বে আরেক বড় শহর স্যান হোসে। মাঝে পেরিয়ে আসতে হবে রেড ঊড্‌ সিটি, মাউন্টেইন ভিউ, পালো আলটো, সানিভ্যালসহ আরো অনেকগুলো ছোট ছোট শহর। এ-শহরগুলোতে সিলিকন ভ্যালি যে-জন্য বিশ্বখ্যাত, সেই আইটি কোম্পানীগুলো নিজেদের অফিস কিংবা ক্যাম্পাস নিয়ে বসেছে। গুগল, ফেইসবুক, মাইক্রসফট্‌, ওরাকলসহ অন্য নামকরা প্রায় সব কোম্পানীগুলোর অফিসই এই ছোট ছোট শহরগুলোতে। এর মধ্যে পালো আলটোতে আছে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যানফোর্ড। সমস্ত ইউএসএতে যথেষ্ট সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কিন্তু, নান্দনিকতা আর প্রাকৃতির সৌন্দর্যের বিচারে স্ট্যানফোর্ড এর ক্যাম্পাস তালিকায় প্রথম দিকেই থাকবে। পালো আলটোর আবার আরেকটা পরিচয়ও আছে। বলা হয়ে থাকে সিলিকন ভ্যালির বড়লোকেরা এখানেই বসবাস করে থাকেন। বড়লোক বললে ব্যাপারটা হয়তো পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে না। মনে প্রশ্ন এসে যায়, কত বড়লোক! ওভাবে না বলে বরং অন্যভাবে বলা যাক। আসলে এই পালো আলটোর মত এলাকাগুলোতে ফেইসবুকখ্যাত জাকারবার্গরা বসবাস করে থাকেন।

                ছবিঃ মন মাতানো স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

স্যান ফ্র্যান্সিসকো থেকে সব চাইতে নিকটবর্তী বড় শহর স্যান হোসে। বস্তুত, বড় শহরের তালিকা করলে স্যান হোসে শহরের অবস্থান ক্যালিফোর্নিয়া স্টেইটে তৃতীয়, স্যান ফ্র্যান্সিসকো এক ধাপ পিছিয়ে চতুর্থ। কিন্তু, বৈচিত্রের কারণে স্যান ফ্র্যান্সিসকো শহর সারা বিশ্বে অনেক বেশি সমাদৃত। স্যান ফ্র্যান্সিসকোর মত স্যান হোসে শহরও ২১টি মিশনের মধ্যে একটি। স্প্যানিশ স্যান শব্দের অর্থ সাধু, অর্থাৎ ইংরেজী সেইন্ট। মহিলা সাধু হলে স্যান্টা। বেশিরভাগ মিশনগুলোর নাম সাধুদের নামে নামকরণ হবার কারণে শহরগুলোর নামও স্যান বা স্যান্টা দিয়ে শুরু হয়ে থাকে। যেমন স্যান ফ্র্যান্সিসকো, স্যান হোসে, স্যান ডিয়েগো, স্যান্টা ক্লারা, স্যান্টা ক্রুজ, স্যান্টা বারবারা।

স্যান হোসে শহরের বিমানবন্দরে নামতেই চোখে পড়ে শোহর কর্তৃপক্ষের লাগানো ব্যানার। সেখানে লেখা আছে- স্যান হোসে, ক্যাপিটাল অব সিলিকন ভ্যালি। তালগাছের মাথায় থাকা বাবুই পাখির বাসার মত এখানে এসে বাসা বেঁধেছে আইটি কোম্পানিগুলো। এখানে রাস্তার নাম জাভা ড্রাইভ, সিসকো ওয়ে, এখানে ট্রেনের ভিতর থাকা পোস্টারে থাকে প্রোগ্রামিং কোড, এখানে রেস্টুরেন্টে খেতে বসা মানুষের আলাপের বিষয় সি প্লাস প্লাস, এখানকার মানুষের কাছে নন্দিত কিংবা নিন্দিত চরিত্র ইয়াহু সিইও, এখানকার ডিজিটাল ডিস্প্লেতে ফুটে থাকে ডিজিটাল সার্কিট। ট্রেনের ভিতর শহর কর্তৃপক্ষ বড় করে লিখে রেখেছে ফ্রি ওয়াই-ফাই। আশপাশের সবাই ল্যাপটপ নিয়ে ব্রাউজ করছে।

    ছবিঃ রেইল/ট্রেইনে বসে কার এসব পড়তে ভালো লাগে, তার উপর নীচের লাইনে বলা আছে Can’t solve this, but still work in tech?

স্যান হোসে শহরের ফার্স্ট স্ট্রিট ধরে চলতে থাকা ট্রেনে এগিয়ে যেতে যেতে গুণতে চেষ্টা করি রাস্তার পাশের আইটি কোম্পানীর সংখ্যা। বিশ পর্যন্ত গুণে থেমে যাই। খানিক দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে আনমনে ভাবতে চেষ্টা করি, কি আছে পাহাড়ের ওপারে, কোন সে দেশ সেখানে। হঠাৎ করে ‘ক্রপলি’ শব্দ শুনে চমকে উঠি। আমার স্টেশান, এখানটাতে নামতে হবে, এখানটাতেই আমার গেস্ট হাউজ।

(‘দ্বিতীয়ার্ধ, চলবে…’)

মইনুল রাজু (ওয়েবসাইট)
[email protected]

স্টেইটস্‌ অব আর্ট সিরিজের অন্যান্য পর্বগুলিঃ
:: নিউইয়র্ক (প্রথমার্ধ) :: নিউইয়র্ক (দ্বিতীয়ার্ধ) :: পোর্টল্যান্ড (ওরিগন) :: সিলিকন ভ্যালি (ক্যালিফোর্নিয়া) :: ওয়াশিংটন ডিসি :: ডেট্রয়েট (মিশিগান) :: রিচ্‌মন্ড (ভার্জিনিয়া) :: লস এঞ্জেলেস (ক্যালিফোর্নিয়া) :: কলাম্বাস (ওহাইও) :: গোল্ডেন গেইট ব্রিজ ::

About the Author:

"যেই-না আকাশ মাথার উপর তোমার রঙিন দেশে, সেই-সে আকাশ আমার দেশেও উড়ছে একই বেশে; এক আকাশের নীচে যখন এই আমাদের ঘর, কেমন করে আমরা বলো হতে পারি পর।"

মন্তব্যসমূহ

  1. শনিবারের চিঠি অক্টোবর 28, 2012 at 6:12 পূর্বাহ্ন - Reply

    আমি দ্বিতীয় পর্বটা আগে পড়েছি, তারপর প্রথমটা। সত্যি, অনবদ্য।

  2. কৌস্তুভ সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 6:25 পূর্বাহ্ন - Reply

    এই সামারে যাকেই দেখি সেই ক্যালিফোর্নিয়া যাচ্ছে। অভিদাও গেল দেখি। খাড়ান, আমিও…

    • মইনুল রাজু সেপ্টেম্বর 9, 2012 at 9:30 পূর্বাহ্ন - Reply

      @কৌস্তুভ,

      শিকাগোর দিকে আসলে আওয়াজ দিয়েন। 🙂

  3. অঙ্কন সেপ্টেম্বর 7, 2012 at 3:16 পূর্বাহ্ন - Reply

    আপনার পোস্ট পড়ে আমার দিনদিন আম্রিকাপ্রীতি বেড়ে যাচ্ছে|কবে যে আম্রিকা যেতে পারব কে জানে?

    • মইনুল রাজু সেপ্টেম্বর 7, 2012 at 11:37 পূর্বাহ্ন - Reply

      @অঙ্কন,
      চলে আসেন। এ-দেশ বেশ সুন্দর। অবশ্য শুনেছি, সাউথ আমেরিকান দেশগুলো আরো বেশি সুন্দর, যদিও কখনো যাওয়া হয়নি। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। 🙂

  4. […] মূল লেখার লিংক ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে ড্রাইভ করতে গেলে এ-দিক সে-দিক হয়ে বারেবারে ঘুরে ফিরে আসে একটা রাস্তা। নামটাও খানিকটা অন্যরকম। ‘এল ক্যামিনো রিয়েল’। রোদেলা সকাল, দুরন্ত দুপুর কিংবা পড়ন্ত বিকেলে এই রাস্তায় পথ ধরে চলে গেছি মাইলের পর মাইল। কে জানতো, আমার পথ চলার কয়েক’শ বছর আগেই এই রাস্তাতেই পথ চলতে শুরু করে আজও এগিয়ে চলছে আরো এক যাযাবর। কালের সাক্ষী হয়ে অবিরাম চলতে থাকা সেই নিরলস যাযাবরের নাম ‘ইতিহাস’। […]

  5. আকাশ মালিক সেপ্টেম্বর 6, 2012 at 6:47 পূর্বাহ্ন - Reply

    বারে বারে মনে হয়েছে, মাত্র এক-জীবন সমান স্বল্প সময়ের জন্য, এই পৃথিবী অনেক বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর।

    এ সুন্দর দেখতে সুন্দর চোখ লাগে। দু একটা জায়গায় বোধ হয় লিংক দিতে চেয়েছিলেন। আমি এখানে দিয়ে দিলাম আপনি পোষ্টে লাগিয়ে দিবেন।

    বে-ব্রিজ আর গোল্ডেন গেইট ব্রিজ (বিস্তারিত এখানে)
    মিশনগুলোর ভৌগলিক অবস্থান দেখতে পারবেন এখানে ক্লিক করুন।

    • মইনুল রাজু সেপ্টেম্বর 6, 2012 at 8:04 পূর্বাহ্ন - Reply

      @আকাশ মালিক,

      পরে লিঙ্কগুলো দেবার কথা ছিলো, কিন্তু ভুলে গেছি। 😛 অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। (Y)

  6. mahfuz সেপ্টেম্বর 6, 2012 at 5:52 পূর্বাহ্ন - Reply

    আমেরিকায় সবকিছু ব্যবসা কেন্দ্রিক।

    আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল, আর সুদকে করেছেন হারাম। :-s

  7. সাদিয়া মাশারুফ সেপ্টেম্বর 5, 2012 at 11:42 অপরাহ্ন - Reply

    কোন ভালো ভ্রমনকাহিনী বা জায়গার বিবরণ পরলে ভ্রমনের ক্ষুধায় কাতর হয়ে পরি,যদিও সে ক্ষুধা কখনো মেটে না।যাই হোক,লেখাটি অনেক ভালো লাগলো 🙂 দ্বিতীয়ার্ধের অপেক্ষায় রইলাম

    • মইনুল রাজু সেপ্টেম্বর 6, 2012 at 8:00 পূর্বাহ্ন - Reply

      @সাদিয়া মাশারুফ,
      আমি ভ্রমণক্ষুধা না মেটাতে পারলে অপরিচিত লোকজনের সাথে কথা বলি, তাদের সাথে গল্প শেয়ার করি। এ-দু’টো জিনিস আমার কাছে সমান প্রিয়। ধন্যবাদ আপনাকে। 🙂

মন্তব্য করুন