(আগের পর্বের পর…)

৭.০ : চার্বাক-ষষ্ঠি

বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে চার্বাকের নামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রচলিত লোকগাথা বা লোকগাথার আদলে সংগৃহিত শ্লোক সংকলন হচেছ ‘চার্বাক-ষষ্ঠি’। পণ্ডিতদের মতে চার্বাকষষ্ঠি হলো বার্হস্পত্য-সূত্রের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা। প্রাচীন দর্শন গ্রন্থের রচয়িতারা চার্বাক মত উপস্থাপন করতে গিয়ে এই শ্লোকগুলিরও আশ্রয় নিয়েছেন ব্যাপকভাবে। ষষ্ঠি অর্থ ষাট। চার্বাকষষ্ঠিতে চার্বাকের নামে প্রচলিত প্রামাণিক লোকগাথাগুলি ষাটটি লোকায়ত শ্লোকে সংকলিত হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে চার্বাক-ষষ্ঠি। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় এই মূল চার্বাক-ষষ্ঠি বাংলা তর্জমাসহ উপস্থাপন করা হলো। .

[ সংগ্রহ সূত্র: সায়ন মাধবীয় সর্বদর্শনসংগ্রহ (প্রথম খণ্ড)- চার্বাকদর্শন / অমিত ভট্টাচার্য / সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, কলকাতা। ]

চার্বাক-ষষ্ঠি


গ্রাবোন্মজ্জনবদ্ যজ্ঞফলেহপি শ্রুতিসত্যতা।
কা শ্রদ্ধা তত্র ধীবৃদ্ধাঃ! কামাধ্বা যৎ খিলীকৃতঃ।। ১।।
[ পাথর ভাসতে থাকার মতো যজ্ঞের ফল বিষয়ে বেদের সত্যতাও অসম্ভব। ওহে বুদ্ধিমানেরা! সে সম্বন্ধে তোমাদের কী এমন বিশ্বাস যে কামের পথ অবরুদ্ধ করেছ? ]

কেনাপি বোধিসত্ত্বেন জাতং সত্ত্বেন হেতুনা।
যদ্ বেদমর্মভেদায় জগদে জগদস্থিরম্ ।। ২।।
[ কোন এক বোধিসত্ত্ব বেদের মর্ম উদ্ঘাটনের জন্য জন্মেছিলেন। যেহেতু সত্তা নামক হেতুর সাহায্যে তিনি জগতকে ক্ষণিক বলেছিলেন। ]

অগ্নিহোত্রং ত্রয়ী তন্ত্রং ত্রিদণ্ডং ভস্মপুণ্ড্রকম্ ।
প্রজ্ঞাপৌরুষনিঃস্বানাং জীবো জল্পতি জীবিকাম্ ।। ৩।।
[ (বৃহস্পতি বলেন-) হোম, বেদবিহিত কার্যকলাপ, পাশুপত ব্রত ও ভস্ম তিলক হলো প্রজ্ঞাশক্তিহীন ব্যক্তিদের জীবিকা। ]

শুদ্ধির্বংশদ্বয়ীশুদ্ধৌ পিত্রোঃ পিত্রোর্যদেকশঃ।
তদনন্তকুলা দোষাদদোষা জাতিরস্তি কা।। ৪।।
[ যেহেতু পিতামাতার দুই বংশের একে একে শুদ্ধতা হলে শুদ্ধি হয় এবং একইভাবে অনন্ত বংশভেদ তাই দোষবশত নির্দোষ জন্ম কোথায় আছে? ]

কামিনীবর্গসংসর্গৈর্ন কঃ সংক্রান্তপাতকঃ।
নাশ্নাতি স্নাতি হা মোহাৎ কামক্ষামমিদং জগৎ ।। ৫।।
[ কামিনীগোষ্ঠীর সংসর্গে কে না পাপে আক্রান্ত হয়? হায়, মোহবশে এই জগতে কাম্য ফলের অভাব সত্ত্বেও (ব্রতপার্বণে) খায় না, স্নান করে। ]

ঈর্ষ্যয়া রক্ষতো নারীর্ধিক্ কুলস্থিতিদাম্ভিকান্ ।
স্মরান্ধত্বাবিশেষেহপি তথা নরমরক্ষতঃ।। ৬।।
[ কামান্ধ ভাবের পার্থক্য না থাকলেও যারা ঈর্ষাবশত মেয়েদের আটকে রাখে আর পুরুষদের নিবৃত্ত করে না, কুলের মর্যাদার বিষয়ে দাম্ভিক সেই লোকেদের ধিক্ । ]

পরদারনিবৃত্তির্যা সোহয়ং স্বয়মনাদৃতঃ।
অহল্যাকেলিলোলেন দম্ভো দম্ভোলিপাণিনা।। ৭।।
[ পরস্ত্রী থেকে যে নিবৃত্ত থাকা- সেটা হলো দম্ভ। বজ্রপাণি ইন্দ্র অহল্যার সঙ্গে কামক্রীড়ায় তৎপর হয়ে স্বয়ং তা উপেক্ষা করেছেন। ]

গুরুতল্পগতৌ পাপকল্পনাং ত্যজত দ্বিজাঃ।
যেষাং বঃ পত্যুরত্যুচ্চৈর্গুরুদারগ্রহে গ্রহঃ।। ৮।।
[ ওহে ব্রাহ্মণের দল! তোমরা এমন, যাদের পতি চাঁদের গুরুপত্নী সম্ভোগে অত্যন্ত আগ্রহ। অতএব গুরুপত্নী সম্ভোগে যে পাপ তার কল্পনা ত্যাগ কর। ]

পাপাৎ তাপা মুদঃ পুণ্যাৎ পরাসোঃ স্যুরিতি শ্রুতিঃ।
বৈপরীত্যং দ্রুতং সাক্ষাৎ তদাখ্যাত বলাবলে।। ৯।।
[ পাপ থেকে মৃতের তাপ, পুণ্য থেকে আনন্দ- এই হচ্ছে বেদ। দ্রুত প্রত্যক্ষ হচ্ছে এর বিপরীত ভাব। অতএব সবল ও দুর্বল কোনটা তোমরাই বল। ]

সন্দেহেহপ্যন্যদেহাপ্তের্বিবর্জ্যং বৃজিনং যদি।
ত্যজত শ্রোত্রিয়াঃ সত্রং হিংসাদূষণসংশয়াৎ ।। ১০।।
[ অন্যদেহ লাভ করা বিষয়ে সন্দেহ সত্ত্বেও যদি পাপ বর্জনীয় হয়, তবে ওহে বেদপাঠকের দল, হিংসাদোষের সন্দেহ থাকায় যজ্ঞ ছেড়ে দাও। ]

যস্ত্রিবেদবিদাং বন্দ্যঃ স ব্যাসোহপি জজল্প বঃ।
রামায়া জাতকামায়াঃ প্রশস্তা হস্তধারণা।। ১১।।
[ ত্রিবেদজ্ঞ পণ্ডিত তোমাদের আরাধ্য ব্যাসদেবও বলেছেন- কামার্ত রমণীর হস্তধারণ যুক্তিযুক্ত। ]

সুকৃতে বঃ কথং শ্রদ্ধা সুরতে চ কথং ন সা।
তৎ কর্ম পুরুষঃ কুর্য্যাদ্ যেনান্তে সুখমেধতে।। ১২।।
[ সুকৃতি বিষয়ে তোমাদের শ্রদ্ধা কেন, স্ত্রী সম্ভোগে তা নেই কেন? পুরুষের সেই কাজ করা উচিত যার শেষে আনন্দ বা সুখ বাড়ে। ]

বলাৎ কুরুত পাপানি সন্তু তান্যকৃতানি বঃ।
সর্বান্ বলকৃতান্ দোষানকৃতান্ মনুরব্রবীৎ ।। ১৩।।
[ জোর করে পাপ কর, সে-সব তোমাদের না-করা হিসেবে থাকবে। মনুই তো বলেছেন- বলপূর্বক সব কিছু করে ফেলা তো না-করা দোষ। ]

স্বাগমার্থেহপি মা স্থাস্মিংস্তৈর্থিকা বিচিকিৎসবঃ।
তং তমাচরতানন্দং স্বচ্ছন্দং যং যমিচ্ছথ।। ১৪।।
[ ওহে সম্প্রদায়ভুক্তগণ! নিজেদের শাস্ত্রের এই অর্থ বিষয়েও সন্দিগ্ধ থেকো না। যা যা চাও স্বচ্ছন্দে সেই সেই আনন্দ ভোগ কর। ]

শ্রুতিস্মৃত্যর্থবোধেষু ক্কৈকমত্যং মহাধিয়াম্ ।
ব্যাখ্যা বুদ্ধিবলাপো সা নোপেক্ষ্যা সুখোন্মুখী।। ১৫।।
[ বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্রের অর্থবোধের বিষয়ে মহাজ্ঞানীদের মধ্যে কোথায় ঐকমত্য রয়েছে? ব্যাখ্যা বুদ্ধিবলের উপর নির্ভরশীল। সুখের অভিমুখী ব্যাখ্যা উপেক্ষণীয় নয়। ]

যস্মিন্নস্মীতি ধীর্দেহে তদ্দাহে বঃ কিমেনসা।
ক্বাপি তৎ কিং ফলং ন স্যাদাত্মেতি পরসাক্ষিকে।। ১৬।।
[ যে দেহে আছি বলে জ্ঞান হচ্ছে, তা পুড়িয়ে ফেললে পাপে তোমাদের কী হবে? অন্য কিছু যার সাক্ষী, সেই আত্মাতে ফল হলে আত্মা হওয়ার সুবাদে অন্য কোথাও কি তা হতে পারে না? ]

মৃতঃ স্মরতি জন্মানি মৃতে কর্মফলোর্ময়ঃ।
অন্যভুক্তৈর্মৃতে তৃপ্তিরিত্যলং ধূর্তবার্তয়া।। ১৭।।
[ মৃত ব্যক্তি পূর্বজন্মগুলি স্মরণ করে, মৃত ব্যক্তিতে কর্মফলের পরম্পরা বর্তায়, অন্যদের খাওয়ার ফলে মৃতের তৃপ্তি হয়- এধরনের বজ্জাতি-পূর্ণ কথায় লাভ নেই। ]

জনেন জানতাহস্মীতি কায়ং নায়ং ত্বমিত্যসৌ।
ত্যাজ্যতে গ্রাহ্যতে চান্যদহো! শ্রুত্যাতিধূর্তয়া।। ১৮।।
[ বেদ অতিমাত্রায় ধূর্ত। আশ্চর্য! যে লোক ‘আমি আছি’ এইভাবে দেহকে জানে, ‘এটি তুমি নও’ এইভাবে তাকে তা ছাড়তে ও অন্য কিছুকে ধরতে প্রেরণা যোগায়। ]

একং সন্দিগ্ধয়োস্তাবদ্ ভাবি তত্রেষ্টজন্মনি।
হেতুমাহুঃ স্বমন্ত্রাদীনসঙ্গানন্যথা বিটাঃ।। ১৯।।
[ উভয়পক্ষে সন্দেহের মধ্যে একটি অবশ্যই হবে। তার মধ্যে ঈপ্সিত বস্তুর প্রাপ্তি হলে ধূর্তেরা নিজেদের মন্ত্র প্রভৃতিকে তার কারণ বলে, অন্যথা হলে সেগুলোর অঙ্গহানি উল্লেখ করে। ]

একস্য বিশ্বপাপেন তাপেহনন্তে নিমজ্জতঃ।
কঃ শ্রৌতস্যাত্মনো ভীরো! ঋারঃ স্যাদ্ দুরিতেন তে।। ২০।।
[ ওহে ভীরু! সকলের পাপের ফলে অন্তহীন তাপে বেদে প্রতিপাদিত যে একমাত্র আত্মা ডুবে যাচ্ছে, তোমার পাপে তার কী ভারবৃদ্ধি হবে? ]

কিং তে বৃন্তহৃতাৎ পুষ্পাৎ তন্মাত্রে হি ফলপ্রদঃ।
ন্যস্য তন্মূর্ধ্ন্যনন্যস্য ন্যাস্যমেবাশ্মনো যদি।। ২১।।
[ বৃন্ত হতে সংগৃহীত পুষ্পে তোমার কী প্রয়োজন? কারণ কেবল সেখানে তাতে ফল ধরে। যদি পাথরের মাথাতেই তা রাখবার উপযুক্ত হয় তবে তা নিজের মাথায় রাখ। ]

তৃণানীব ঘৃণাবাদান্ বিধূনয় বধূরনু।
তবাপি তাদৃশস্যৈব কা চিরং জনবঞ্চনা।। ২২।।
[ স্ত্রীলোকের সম্বন্ধে ঘৃণাসূচক কথাগুলোকে তৃণের ন্যায় পরিহার কর। তুমিও সেইরকম হওয়ায় দীর্ঘকাল তোমার লোকঠকানো কেন? ]

কুরুধ্বং কামদেবাজ্ঞাং ব্রহ্মাদ্যৈরপ্যলঙ্ঘিতাম্ ।
বেদোহপি দেবকীয়াজ্ঞা তত্রাজ্ঞাঃ কাধিকার্হণা।। ২৩।।
[ ওহে মূর্খের দল! ব্রহ্মা প্রভৃতিও যা লঙ্ঘন করেননি, কামদেবের সেই আজ্ঞা পালন কর। বেদও দেবতার আজ্ঞা। সে বিষয়ে বেশি সম্মান কেন? ]

প্রলাপমপি বেদস্য ভাগং মন্যধ্ব এব চেৎ ।
কেনাভাগ্যেন দুঃখান্ন বিধীনপি তথেচ্ছথ।। ২৪।।
[ যদি বেদের অংশবিশেষকেও প্রলাপোক্তি বলেই মেনে থাক, তবে কোন্ দুর্ভাগ্যবশে দুঃখকর বিধানগুলোকে তেমন স্বীকার করছ না? ]

শ্রুতিং শ্রদ্ধত্থ বিক্ষিপ্তাঃ প্রক্ষিপ্তাৎ ব্রূথ চ স্বয়ম্ ।
মীমাংসামাংসলপ্রজ্ঞাস্তাং যূপদ্বিপদাপিনীম্ ।। ২৫।।
[ ওহে মীমাংসায় পরিপক্ক বুদ্ধিমানের দল! তোমরা বেদকে শ্রদ্ধা কর। আবার পরাস্ত হয়ে হাড়িকাঠে বাঁধা হাতি দান করতে বলছে- এমন বেদকে নিজেরাই প্রক্ষিপ্ত বল। ]

কো হি বেদাস্ত্যমুষ্মিন্ বা লোকে ইত্যাহ যা শ্রুতিঃ।
তৎপ্রামাণ্যাদমুং লোকং লোকঃ প্রত্যেতু বা কথম্ ।। ২৬।।
[ কে জানে পরলোকে (সুখ) আছে কি-না- এইভাবে যে বেদ বলেছে, তাকে প্রমাণ ধরে নিয়ে পরলোক সম্বন্ধে লোকে কীভাবে বিশ্বাস করবে? ]

ধর্মাধর্মৌ মনুর্জল্পন্ অশক্যার্জনবর্জনৌ।
ব্যাজান্ মণ্ডলদণ্ডার্থী শ্রদ্দধায়ি মুধা বুধৈঃ।। ২৭।।
[ ধর্ম অর্জন ও অধর্ম বর্জন করতে পারা যায় না। কৌশলে রাষ্ট্রের দণ্ড আদায়ের প্রয়োজনে সে সম্বন্ধে বলতে গিয়ে মনু বৃথাই পণ্ডিতদের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছেন। ]

ব্যাসস্যৈব গিরা তস্মিন্ শ্রদ্ধেত্যদ্ধা স্থ তান্ত্রিকাঃ।
মৎস্যস্যাপ্যুপদেশ্যান্ বঃ কো মৎস্যানপি ভাষতাম্ ।। ২৮।।
[ ব্যাসদেবের কথায় সে বিষয়ে আস্থা হয়েছে- এইভাবে নিশ্চয় তোমরা যুক্তিবাদী বটে! তোমরা মাছেরও উপদেশের পাত্র। তোমাদের সঙ্গে, এমনকি মাছেদের সঙ্গে, কে কথা বলবে? ]

পণ্ডিতঃ পাণ্ডবানাং স ব্যাসশ্চাটুপটুঃ কবিঃ।
নিনিন্দ তেষু নিন্দৎসু স্তুবৎসু স্তুতবান্ ন কিম্ ।। ২৯।।
[ ঐ ব্যাস পাণ্ডবদের চাটুকারিতায় পটু কবি ও পণ্ডিত। তারা নিন্দা করতে থাকলে সে নিন্দা করেনি কি? তারা প্রশংসা করতে থাকলে সে প্রশংসা করেনি কি? ]

ন ভ্রাতুঃ কিল দেব্যাং স ব্যাসঃ কামাৎ সমাসজৎ।
দাসীরতস্তদাসীদ্ যন্মাত্রা তত্রাপ্যদেশি কিম্ ।। ৩০।।
[ ঐ ব্যাস ভ্রাতৃবধূর প্রতি নাকি কামবশে আসক্ত হয় নি। তখন দাসীর সঙ্গে সে যে রত ছিল, তাতেও কি মা আদেশ করেছিলেন? ]

দেবৈর্দ্বিজৈঃ কৃতা গ্রন্থাঃ পন্থা যেষাং তদাদৃতৌ।
গাং নতৈঃ কিং ন তৈর্ব্যক্তং ততোহপ্যাত্মাধরীকৃতঃ।। ৩১।।
[ দেবতা ও ব্রাহ্মণদের লেখা বইগুলো যাদের কাছে তাঁদের সমাদর সম্বন্ধে পথনির্দেশ, তারা গোরুকে প্রণাম জানিয়ে তার থেকেও কি নিজেদের স্পষ্টভাবে ছোট করে নি? ]

সাধুকামুকতামুক্তা শান্তস্বান্তৈর্মখোন্মুখৈঃ।
সারঙ্গলোচনাসারাং দিবং প্রেত্যাপি লিপ্সুভিঃ।। ৩২।।
[ যাদের মন শান্ত, তারা যজ্ঞে উন্মুখ হয়ে মরেও সেই স্বর্গলাভ করতে চায় যেখানে সারবস্তু হল হরিণনয়না অপ্সরা। তারা ঠিকভাবেই কামুকতা ছাড়েনি। ]

কঃ শমঃ ক্রিয়তাং প্রাজ্ঞাঃ! প্রিয়াপ্রীতৌ পরিশ্রমঃ।
ভস্মীভূতস্য ভূতস্য পুনরাগমনং কুতঃ।। ৩৩।।
[ ওহে প্রকৃষ্ট অজ্ঞের দল! শান্তি আবার কী? প্রেয়সীর প্রীতি উৎপাদনের জন্য পরিশ্রম কর। ভস্মীভূত জীবের পুনরাগমন কীভাবে হবে? ]

উভয়ী প্রকৃতিঃ কামে সজ্জেদিতি মুনের্মনঃ।
অপবর্গে তৃতীয়েতি ভণতঃ পাণিনেরপি।। ৩৪।।
[ ‘অপবর্গে তৃতীয়া’ এইভাবে যিনি বলছেন, সেই পাণিনি মুনিরও অভিপ্রায় হল- স্ত্রী ও পুরুষ এই দুই ব্যক্তির (অথবা ধর্ম ও অর্থ এই দুই বিষয়ের) কামে আসক্ত থাকা উচিত। (পাণিনি সূত্রের প্রকৃত অর্থ- ফলপ্রাপ্তি বোঝালে ব্যাপ্তি অর্থে তৃতীয়া বিভক্তি হয়। বিকৃত অর্থ করা হচ্ছে- মোক্ষ বিষয়ে তৃতীয় অর্থাৎ স্ত্রী পুরুষ ভিন্ন নপুংসক নিযুক্ত থাকবে অথবা মোক্ষের বিষয়ে তৃতীয় পুরুষার্থ অর্থাৎ কামই উপযোগী। ]

বিভ্রত্যুপরি যানায় জনা জনিতমজ্জনাঃ।
বিগ্রহায়াগ্রতঃ পশ্চাদ্ গত্বরোরভ্রবিভ্রমম্ ।। ৩৫।।
[ উর্ধ্বলোকে যাওয়ার জন্যে (গঙ্গায়) ডুব দিয়ে লোকেরা- সামনে যুদ্ধ করতে গিয়ে পিছিয়ে যায়, এমন ভেড়ার সদৃশ্য লাভ করে। ]

এনসানেন তির্য্যক্ স্যাদিত্যাদিঃ কা বিভীষিকা।
রাজিলোহপি হি রাজেব স্বৈঃ সুখী সুখহেতুভিঃ।। ৩৬।।
[ এই পাপে তীর্যক প্রাণী হবে- ইত্যাদি কী বিভীষিকা! নিজের সুখের উপকরণে ঢোঁড়া সাপও রাজার মতো সুখী। ]

হতাশ্চেদ্ দিবি দীপ্যন্তি দৈত্যা দৈত্যারিণা রণে।
তত্রাপি তেন যুধ্যন্তাং হতা অপি তথৈব তে।। ৩৭।।
[ নিহত হয়ে যদি কেউ স্বর্গে খেলা করে, তবে দৈত্যদের শত্রু বিষ্ণুর হাতে সেইভাবেই নিহত হয়ে সেই দৈত্যগুলো সেখানেও তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করুক। ]

স্বং চ ব্রহ্ম চ সংসারে মুক্তৌ তু ব্রহ্ম কেবলম্ ।
ইতি স্বোচ্ছিত্তিমুক্ত্যুক্তির্বৈদগ্ধী বেদবাদিনাম্ ।। ৩৮।।
[ সংসারদশায় নিজে ও ব্রহ্ম আছে, কিন্তু মুক্তিতে কেবল ব্রহ্ম- এই হলো বেদবাদীদের নিজের উচ্ছেদ নামক মুক্তি সম্পর্কে উক্তির বাহাদুরি। ]

মুক্তয়ে যঃ শিলাত্বায় শাস্ত্রমূচে সচেতসাম্ ।
গোতমং তমবেক্ষ্যৈব যথা বিত্থ তথৈব সঃ।। ৩৯।।
[ চেতনদের পাষাণত্ব প্রাপ্তি নামক মুক্তির জন্য যে শাস্ত্র রচনা করেছে, সেই গোতমকে বিচার করে যেভাবে জানছ, সে ঠিক তাই করবে। ]

দারা হরিহরাদীনাং তন্মগ্নমনসো ভৃশম্ ।
কিং ন মুক্তাঃ কুতঃ সন্তি কারাগারে মনোভুবঃ।। ৪০।।
[ হরি, হর প্রভৃতির পত্নীরা নিরন্তর তাঁদের সম্বন্ধে মনোনিবেশ করেও কেন মুক্ত নয়? কেন তারা কামের কারাগারে থাকে? ]

দেবশ্চেদস্তি সর্বজ্ঞঃ করুণাভাগবন্ধ্যবাক্ ।
তৎ কিং বাগব্যয়মাত্রান্ন কৃতার্থয়তি নার্থিনঃ।। ৪১।।
[ যদি কৃপালু, সত্যবাক্, সর্বজ্ঞ কোন দেবতা থেকে থাকেন, তবে কেবল বাক্য ব্যয় করে আমাদের মতো প্রার্থীদের কৃতার্থ করেন না কেন? ]

ভবিনাং ভাবয়ন্ দুঃখং স্বকর্মজমপীশ্বরঃ।
স্যাদকারণবৈরী নঃ কারণাদপরে পরে।। ৪২।।
[ অন্যেরা কারণবশত আমাদের শত্রু হয়। সংসারীদের আপন কর্মজনিত দুঃখও ঘটতে প্রবর্তনা দিয়ে ঈশ্বর অকারণে আমাদের শত্রু হয়ে পড়বেন। ]

তর্কাপ্রতিষ্ঠয়া সাম্যাদন্যোন্যস্য ব্যতিঘœতাম্ ।
নাপ্রামাণ্যং মতানাং স্যাৎ কেষাং সৎপ্রতিপক্ষবৎ।। ৪৩।।
[ যেহেতু যুক্তির অপ্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে সাদৃশ্য আছে, সেহেতু পরস্পরের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এমন কোন্ মতগুলি সৎপ্রতিপক্ষ নামক দোষে দুষ্ট হয়ে প্রামাণ্যহীন হবে না? ]

অক্রোধং শিক্ষয়ন্ত্যন্যৈঃ ক্রোধনা যে তপোধনাঃ।
নির্ধনাস্তে ধনায়ৈব ধাতুবাদোপদেশিনঃ।। ৪৪।।
[ যে ক্রোধী তপস্বীরা অপরকে ক্রোধের অভাব বিষয়ে শিক্ষা দেয়, তারা নির্ধন হওয়ায় ধনের জন্যই ধাতুবিষয়ক কথার উপদেশ দেয়। ]

কিং বিত্তং দত্ততুষ্টেয়মদাতরি হরিপ্রিয়া।
দত্বা সর্বং ধনং মুগ্ধো বন্ধনং লব্ধবান্ বলিঃ।। ৪৫।।
[ তোমরা কেন ধন দাও? এই হরিপ্রিয়া লক্ষ্মী, যে দাতা নয় তার উপর সন্তুষ্ট। মূর্খ বলি সব ধন দান করে বন্ধন লাভ করেছিল। ]

দোগ্ধা দ্রোগ্ধা চ সর্বোহয়ং ধনিনশ্চেতসা জনঃ।
বিমৃজ্য লোভসংক্ষোভমেকদ্বা যদ্যুদাসতে।। ৪৬।।
[ এইসব লোক ধনীকে দোহন করে, মনে মনে তার অপকারও করে। লোভের চাঞ্চল্য ত্যাগ করে যদি কেউ উদাসীন থাকে, তো দু’একজন। ]

দৈনস্যায়ুষ্যমস্তৈন্যমভক্ষ্যং কুক্ষিবঞ্চনা।
স্বাচ্ছন্দ্যমৃচ্ছতানন্দকন্দলীকন্দমেককম্ ।। ৪৭।।
[ অচৌর্য বা চুরি না করা দৈন্যের আয়ু বাড়ায়। না খাওয়া (উপবাস) হল জঠরকে বঞ্চনা করা। সুখের একমাত্র অঙ্কুর যে স্বেচ্ছাচার- তাই অবলম্বন কর। ]

অত্র চত্বারি ভূতানি ভূমিবার্য্যনলানিলাঃ।
চতুর্ভ্যঃ খলু ভূতেভ্যশ্চৈতন্যমুপজায়তে।
কিণ্বাদিভ্যঃ সমেতেভ্যো দ্রব্যেভ্যো মদশক্তিবৎ।। ৪৮।।
[ (চার্বাক মতানুসারে-) পৃথিবী, জল, অগ্নি ও বায়ু- এই চারিটিই ভূত। কিণ্ব বা বৃক্ষবিশেষের নির্যাস ইত্যাদির বিকার বা পরিণাম থেকে মদশক্তির ন্যায় উক্ত চারিটি ভূত থেকেই দেহে চৈতন্য জন্মে। ]

অহং স্থূলঃ কৃশোহস্মীতি সামানাধিকরণ্যতঃ।
দেহঃ স্থৌল্যাদিযোগাচ্চ স এবাত্মা ন চাপরঃ।
মম দেহোহয়মিত্যুক্তিঃ সম্ভবেদৌপচারিকী।। ৪৯।।
[ আমি স্থূল, কৃশ- ইত্যাদি রূপে আত্মা ও দেহের সামানাধিকরণ্য হয়। দেহই স্থূল বা কৃশ হয় বলে দেহই আত্মা শব্দের বাচ্য। দেহ ভিন্ন অন্য কোন আত্মা নেই। ‘আমার দেহ’ এরূপ প্রয়োগ ঔপচারিক বা গৌণ।]

পশুশ্চেন্নিহতঃ স্বর্গং জ্যোতিষ্টোমে গমিষ্যতি।
স্বপিতা যজমানেন তত্র কস্মান্ন হিংস্যতে।। ৫০।।
[ জ্যোতিষ্টোমাদি যজ্ঞে নিহত পশুর যদি স্বর্গলাভ হয়, তবে যজ্ঞকারী যজমান কেন তার পিতাকে হত্যা করে না? ]

মৃতানামপি জšত’নাং শ্রাদ্ধং চেৎ তৃপ্তিকারণম্ ।
গচ্ছতামিহ জšত’নাং ব্যর্থং পাথেয়কল্পনম্ ।। ৫১।।
[ শ্রাদ্ধ যদি মৃত ব্যক্তিদের তৃপ্তির কারণ হয় তবে এই পৃথিবীতে পর্যটনকারী মানুষের পথের সম্বল ভোজ্য দ্রব্যাদির প্রদান ব্যর্থ। ]

গৃহস্থকৃতশ্রাদ্ধেন পথিতৃপ্তিরবারিতা।
নির্বাণস্য প্রদীপস্য স্নেহঃ সবর্ধয়েচ্ছিখাম্ ।। ৫২।।
[ নির্বাপিত প্রদীপে তেল ঢাললে তার শিখা প্রদীপ্ত হওয়া উচিত। গৃহস্থ ঘরে বসে শ্রাদ্ধ করলেই পথে ভ্রাম্যমাণ ব্যক্তির অবারিত তৃপ্তি হোক। ]

স্বর্গস্থিতা যদা তৃপ্তিং গচ্ছেয়ুস্তত্র দানতঃ।
প্রাসাদস্যোপরিস্থানামত্র কস্মান্ন দীয়তে।। ৫৩।।
[ স্বর্গস্থিত পিতৃগণ যদি দানের দ্বারা তৃপ্তি লাভ করেন, তবে প্রাসাদের উপরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে এই গৃহে কেন দান করছেন না? ]

যদি গচ্ছেৎ পরং লোকং দেহাদেষ বিনির্গতঃ।
কস্মাদ্ ভূয়ো ন চায়াতি বন্ধুস্নেহসমাকুলঃ।। ৫৪।।
[ আত্মা যদি দেহ হতে মুক্ত হয়ে পরলোকে গমন করে তবে পুনরায় বন্ধুস্নেহে ব্যাকুল হয়ে কেন প্রত্যাবর্তন করে না? ]

যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেদ্ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।
ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ।। ৫৫।।
[ যতদিন বাঁচবে, ততদিন সুখে বাঁচবে। ঋণ করে হলেও ঘৃত পান করবে। ভস্মীভূত দেহের পুনরাগমন কোনভাবেই হতে পারে না। ]

স্বদারপরদারেষু যথেচ্ছং বিহরেৎ সদা।
গুরুশিষ্যপ্রণালীং চ ত্যজেৎ স্বহিতমাচরন্ ।। ৫৬।।
[ নিজ স্ত্রী এবং পরস্ত্রী নির্বিশেষে যথেচ্ছ বিহার করবে। নিজের হিতসাধনে গুরুশিষ্য প্রণালী ত্যাগ করবে। ]

অশ্বস্যাত্র হি শিশ্নন্তু পত্নীগ্রাহ্যং প্রকীর্তিতম্ ।
ভণ্ডৈস্তদ্বৎ পরঞ্চৈব গ্রাহ্যজাতং প্রকীর্তিতম্ ।
মাংসানাং খাদনং তদ্বদ্ নিশাচরসমীরিতম্ ।। ৫৭।।
[ অশ্বমেধ যজ্ঞে অশ্বের শিশ্ন পত্নীগ্রাহ্য বলে ভণ্ডরা প্রচার করেছেন। অন্যান্য পর-ব্যবহৃতসামগ্রী গ্রহণের কথাও ভণ্ডরা বলেছে। মাংস ভক্ষণের কথাও নিশাচরেরা বলেছে। ]

অঙ্গনালিঙ্গনাজন্যসুখমেব পুমর্থতা।
কণ্টকাদিব্যথাজন্যং দুঃখং নিরয় উচ্যতে।
লোকসিদ্ধো ভবেদ্ রাজা পরেশো নাপরঃ স্মৃতঃ।। ৫৮।।
[ স্ত্রীলোকের আলিঙ্গনাদিজন্য সুখই হল পুরুষার্থ। কণ্টকাদিজন্য দুঃখই হল নরক। লোকপ্রসিদ্ধ রাজা হলেন পরমেশ্বর। অন্য কোন ঈশ্বর নেই। ]

ত্যাজ্যং সুখং বিষয়জন্ম পুংসাং
দুঃখোপসৃষ্টমিতি মুর্খবিচারণৈষা।
ব্রীহীন্ জিহাসতি সিতোত্তমতণ্ডুলাঢ্যান্
কো নাম ভোস্তুষকণোপহিতান্ হিতার্থী।। ৫৯।।
[ পুরুষের বিষয়ভোগজন্য সুখ যেহেতু দুঃখ মিশ্রিত সেহেতু তাকে পরিত্যাগ করতে হবে- এটা নেহাৎই মূর্খের বিচার। এমন হিতার্থী কে আছেন- যিনি তুষকণাযুক্ত বলে পরিষ্কার উত্তম তণ্ডুলপূর্ণ ধান্য পরিত্যাগ করেন? ]

লোকায়তমতেহপ্যেবং সংক্ষেপোহয়ং নিবেদিতঃ।
অভিধেয়তাৎপর্যার্থঃ পর্যালোচ্য সুবুদ্ধিভিঃ।। ৬০।।
[ অভিধেয়, তাৎপর্য পর্যালোচনা করে বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ কর্তৃক সংক্ষেপে লোকায়তদের মত বিবৃত হল। ]

ইতি চার্বাকষষ্টিঃ সমাপ্তা।

.
(চলবে…)

[আগের পর্ব: চার্বাক ও লোকায়ত] [*] [পরের পর্ব: লোকায়ত ও আন্বীক্ষিকী]

[114 বার পঠিত]