এক)
প্রথম যখন এখানে আসি কিছুই ভালো লাগত না আমার।সবকিছুই অপরিচিত মনে হতো।সবকিছুতেই নিয়ম কানুন-সবকিছুই একটি শৃংখলে আবদ্ধ।অথচ বাসায় আমি খুব স্বাধীন ছিলাম,যদিও আমার জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ ছিলো এবং আমি কখনো ঐ ঘরের বাইরে যেতে পারতাম না।তারপরও আমি অনেক কিছুই করতে পারতাম।আমাকে কেউ বিরক্ত করতো না।কিন্তু এখানে অনেক কিছুই আমাকে মেনে চলতে হয়;-ঠিকমতো গোছল করতে হয়,খেতে হয় নিয়ম করে;আর আড্ডা দিতে হয় ক্রমাগত যা আমি কখনো সহ্য করতে পারি নি।সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার হচ্ছে ঐ কক্ষটিতে অনেকের সাথে আমাকে থাকতে হতো-পাঁচজনের সাথে।ওরা কেউই আধুনিক ছিলো না;গ্রাম্যতা ছিলো ওদের চোখেমুখে;-আচরণেও।আমাকে ওখানে থাকতে হবে বলে আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো।আমি বোধহয় কিছুক্ষণ কান্নাকাটিও করেছিলাম।আমার সাথে আমার মা এসেছিলো;-বড় ভাইয়া এসেছিলেন যিনি কখনোই আমাকে সহ্য করতে পারেননি।ছোটবেলা থেকেই আমি একা একা একটি আবদ্ধ ঘরে বেড়ে উঠেছি।বোধ হয় আমার একরোখা স্বভাবের পেছনে দায়ী ছিলো ওই আবদ্ধ পরিবেশই।তবে আমি কিন্তু নিঃসংগ ছিলাম না।আমার আশেপাশে ছিলো প্রচুর বই যেগুলোর একটাকেও আমি বুঝতে পারি নি কোনদিন।কেননা বইগুলো শুধু কথা বলতো;-প্রচুর কথা বলতো;আর প্রচুর তথ্য দিতে থাকতো;আমি বিরক্ত হতাম। একদিন সহ্য করতে না পেরে আমি কিছু বইতে আগুন লাগিয়ে দেই;-তারপর থেকে আমার কক্ষে বই আসাও বন্ধ হয়ে যায়।সেদিন থেকেই আমার কক্ষের সমস্ত কোলাহল নিঃস্তব্দতায় পরিণত হয়।আর সেই নিঃস্তব্দ পরিবেশেই আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করি;-বইয়ের কোলাহল না থাকলেও ঠিক কোথায় যেন কোলাহল হতো।পরে আমি বুঝতে পারি ওটা ছিলো আমারই কথা।ঠিক কথা নয়-অসংলগ্ন চিৎকার চেঁচামেচি।যখন আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম-সেটা বুঝেছি বড়ো ভাইয়ার হাতে মার খাওয়ার পর-আমি শান্তু হয়ে গেলাম;-খুব শান্ত;ভালোমানুষদের মতো। শান্ত এবং নিশ্চুপ। আমি এতোটাই শান্ত হয়ে গিয়েছিলাম যে মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।প্রায়ই দেখতাম আমার জানালার কাছে উঁকি দিয়ে তিনি আমাকে লক্ষ্য করছেন।আমি না দেখার ভান করতাম।নিঃস্তব্দতা আমাকে গ্রাস করে ফেলেছিলো।তখনই আমি বোধহয় কিছুটা যুক্তিবাদী হয়ে পড়েছিলাম।বারবার আমার মনে হতো আমি কেন এই ঘরে আটকে আছি;আমাকে কেন বাইরে যেতে দেয়া হয় না;আমি তো পুরোপুরি সুস্থ। আমি চিন্তা করতে পারি; নানাব্যাপারে আমার মতামত দেয়ার ক্ষমতা আছে।অথচ ওরা আমাকে পাগল বলে;-কয়েকবার গিয়েছিলাম মানসিক ডাক্তারের কাছে।তাকেই বরং আমার পাগল মনে হতো।ভাইয়াকেও আমার পাগল মনে হতো;-নইলে মানুষ কিভাবে মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে পেটায়!মাকে আমার মনে হতো ভীরু পাগল যিনি সব কিছুকেই সহ্য করে গেছেন এবং আমার বন্দীদশাকেও।তারপর বাবা,-তাকেও আমার পাগল মনে হতো;-সাধারণ পাগল নন-বদ্ধ পাগল।সারাদিন কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতেন একটা কালো কোট গায়ে দিয়ে।আমার মনে হতো একটা শয়তান দৌঁড়াচ্ছে আশে পাশে।তার মক্কেলরা আসতো;ওগুলোকে আমি দু চোখে দেখতে পারতাম না।ওরা এসেই আমার ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিতো।ওদের কৌতূহলী চোখগুলো আমাকে কষ্ট দিত খুব।আমি জানালা আটকাতে পারতাম না।কেননা অনেক আগেই ওটার খিল ভেংগে দেয়া হয়েছে যেন পরিবারের লোকজন দেখতে পারে আমি কী করছি।আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে কিছু ছিলো না।একদিন দুইদিন করে করে অনেক দিন…অনেক অনেক দিন আমি এরকম দর্শনীয় বস্তু হিসেবে ঐ ঘরে কাটিয়েছি।তারপর একদিন একজন দর্শকের চোখে অকস্মাৎ আংগুল ঢুঁকিয়ে দিয়েছিলাম।সুঁই থাকলে ভালো হতো।কিন্তু আমার ঘরে ওরকম কিছুই রাখা হয় নি।লোকটি ব্যাথায় নিচে বসে পড়ে কাতরাতে থাকে আর ঠিক তখনই আমি ভাইয়াকে ছুটে আসতে দেখি।তিনি এসেই আমাকে পেটাতে থাকেন।আমি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাই।জ্ঞান ফিরলে দেখি আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে বিছানার সাথে।আমি চুপচাপ পড়ে থাকি।এবং আবার নিঃস্তব্দ হয়ে যাই।এর কিছুদিন পর আমাকে এখানে আনা হয়;-একটি এম্বুলেন্সে করে।আমি বেশ খুশি হয়ে উঠেছিলাম।বাবা বলেছিলেন ওখানে আমি স্বাধীনতা পাবো,অনেক বন্ধু পাবো;বাইরে বেরূতে পারবো;কেউ আমাকে বিরক্ত করবে না। মাকেও দেখলাম বেশ খুশি হয়ে উঠছেন।আর বড় ভাইয়া, যদিও গম্ভীর ছিলেন, খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন।আমাকে ওখানে রেখে যখন ওরা ফিরে আসছিলো ঠিক তখন বড় ভাইয়া, জীবনের প্রথম বারের মতো, আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন।তার হয়তো কান্না পাচ্ছিলো;তবে তিনি কাঁদেন নি।আমি কেঁদেছিলাম।ভাইয়া যে আমাকে ভালোবাসেন তাই আমি কেঁদেছিলাম।

দুই

ওরা চলে গেলে আমাকে একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।ওখানে চারজনকে আমি দেখতে পাই।আমাকে একটি বিছানা দেখিয়ে দেয়া হয়।আমি গিয়ে ওখানে বসি।ডাক্তার আর নার্সরা মিলে আমার সম্বন্ধে কী কী যেন বলতে থাকে;তারপর আমার শরীরে আশ্চর্য নল (যদিও ওটাকে আমি চিনতাম কিন্তু ওটার নাম যে স্টেথোস্কোপ তা আমি পরে জানতে পেরেছি) লাগিয়ে আমাকে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে বলেন।আমি নিঃশ্বাস নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়ি;কেননা এর আগেই আমাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়া হয়।

ঘুম ভাঙ্গলে আমি প্রথমেই শুনতে পাই কেউ একজন উচ্চঃস্বরে গান গাইছে।কেমন একটা গ্রাম্য গান।আমাকে উঠতে দেখেই বোধ হয় লোকটি গান থামিয়ে দেয়।তারপর ওদের মধ্যে একজন এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে-‘কিরে ঘুম ভাঙ্গছে তর?বহুত ঘুমাইছস’। লোকটিকে আমার ভালো লাগে না।আমি চুপ করে থাকি।তখন ওরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকে।কালোমতো লোকটা বলতে থাকে, তুই আইসা তো আমাগো হগলতের ডিস্টার্ব করলি।আমি বলি, আমি তো কিছুই করি নি তোমাদের।এবার সবাই কেমন জোরে জোরে হাসতে থাকে।একজন বলে, ঐ হালার পো দেহি শুদ্ধ কতা কয়।কিরে তুই এমনে কতা কস কে?আমি কোন উত্তর দেই না।সবচেয়ে রোগা লোকটা আমার কাছাকাছি এসে কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে;তার সারা মুখে ফকিরদের মতো শাদা দাড়ি।সে আমাকে সালাম দেয় বেশ ভংগিমা করে।আমি সালামের উত্তর নেই।ওরা হো হো করে হেসে উঠে;শুধু ফকিরটি হাসে না।সে কাঁদতে থাকে;কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমার একটা মাত্র মাইয়া;তুই ওরে ফেরত দে।আমি বলি, আপনার মেয়েকে তো আমি নেইনি।লোকটি এবার আমাকে বেশ জোরে থাপ্পড় দেয়।বলে,বদমাশি করছ কুত্তার বাচ্চা;দে ফেরত দে।আমার টেহা ফেরত দে।পাঁচশ টেহা নিছস।বলতে বলতে লোকটি কান্নায় ভেংগে পড়ে।তারপর হাতের কড়ে হিসাব মিলাতে থাকে।একশ…একশ পঞ্চাশ টেহা পঞ্চাশ পয়সা।আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি।ওরা আমাকে ঘিরে ধরে।গায়কটি আবার গান ধরে-ও……ওরে নীল দইরা…ও। আমার ডান পাশের গাল ফুলে উঠছে।আমি সিদ্ধান্ত নেই এদেরকে বশে আনতে হবে।ঘুরে দাঁড়িয়ে ফকিরটাকে সজোড়ে থাপ্পড় দেই।সবাই হতভম্ব হয়ে যায়।একজন কক্ষের এক কোণায় দৌড়ে গিয়ে ওর শিশ্ন বের করে মুঠোয় নিয়ে লাফাতে থাকে।আমার বমি চলে আসে।ফকিরটি এবার আমার দিকে তেড়ে আসতে থাকে।আমি পালাতে চেষ্টা করি।কিন্তু অন্যরা আমাকে ধরে রাখে।তারপর আমাকে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি দিতে থাকে।

তিন)

তারপর অনেক দিনে কেটে গেছে…………কতোদিন?-আমি নিশ্চিত নই।হয়তো অনেক দিন।প্রথম প্রথম মা বাবা আসতেন।তারপর ওদেরকে আর দেখি নি কখনো;হয়তো মারা গেছেন অথবা আমার এখানে আসার প্রয়োজন বোধ করেন না।আমিও ওদেরকে আর অনুভব করি না।তবে ভাইয়ার কথা মনে পড়ে খুব।আমি ভেবেছিলাম তিনি আসবেন।কিন্তু কখনোই তিনি আসেন নি।ওসব নিয়ে অবশ্য আমি বেশিক্ষণ ভাবি না।আমার এখানে বিস্তর কাজ পড়ে আছে;আমার উপর দ্বায়িত্ব পড়েছে প্রতি সন্ধ্যায় আমার কক্ষের লোকদের একটি করে গল্প শোনানোর।আমি সারাদিন বসে বসে মনে মনে গল্প বানাই আর ঠিক সন্ধ্যায় গল্প শুনাতে বসে যাই।ওরা আমাকে ঘিরে থাকে।আমি ওদের মাঝখানে বসে গল্প বলতে থাকি।আমার এ সুখ্যাতি অবশ্য ডাক্তারদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে;ওদের কেউ কেউ আমার গল্প শুনতে আসে।কিন্তু যে ব্যাপারটি আমাকে কষ্ট দেয় তা হচ্ছে যখন আমার কক্ষের বাসিন্দারা আমার গল্প শুনে হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে যায় তখনও ডাক্তারগুলো একটুও হাসে না;ওরা বিষণ্ণ গম্ভীর হয়ে থাকে।আমার মনে হতে থাকে ডাক্তারগুলো বোধহয় গল্প বুঝে না অথবা হাসতে জানে না অথবা ওগুলো পাগলে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই।এখানকার যিনি সবচেয়ে বড়ো ডাক্তার অর্থ্যাৎ পরিচালক তিনি আমাকে একদিন বললেন আমার গল্প লেখা উচিৎ।তিনি ওগুলো ছাপানোর ব্যবস্থা করবেন।আমাকে বেশ কিছু কাগজ আর কলম দিয়ে একটি নির্জন কক্ষ আমার জন্য বরাদ্দ করে দিলেন।সপ্তাহে দু’তিন ঘন্টার জন্য আমি ওখানে থাকতে পারবো।কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি ওখানে কিছুই লিখতে পারি নি;আমার মনে হতো আমি আবার নিস্তব্দতায় ফিরে যাচ্ছি।মনে হতো ওটা একটা কবর।আর আমি কবরে আটকা পড়ে দম বন্ধ হয়ে মরতে বসেছি।আমি চিৎকার করে উঠতাম।কিন্তু আমার মনে হতো হয়তো এখুনি ভাইয়া ছুটে আসবে।আমাকে মারতে থাকবে খুব।তাই আমি চিৎকার বন্ধ করে দিতাম।তখনই বাইরে পাহারায় থাকা দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সটি ছুটে আসতো।এবং আমার মনে হতো ঐ নার্সটির জন্যই আমি চিৎকার করতাম।কেননা আমি চেঁচামেচি না করলে নার্সটি ঘরে আসবে না।কেননা,নার্সটিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছিলাম।নার্সটি ওসব কিছুই জানতো না।আমি যখন তাকে জড়িয়ে ধরতাম আমার ভেতর যেন অপার্থিব সুগন্ধী ঢুকে যেত গলগল করে।আমি তাকে ছাড়তে চাইতাম না।সেই আমাকে ছেড়ে দিতো কিছুক্ষণ পর।এরকম সময়ে কেউই ভালো থাকতে পারে না;বিশেষত, আমি যখন কারো প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি।আমিও ভালো ছিলাম না।আমার গল্প বলা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো।আমি অস্থির হয়ে উঠলাম।আমার কক্ষের সবাই আমার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো।ফকিরটি, যার নাম আক্কাচ আলী, আমার জন্য কী কী সব দোয়া দরূদ পড়তো;আমার হাসি পেত খুব।আমি অপেক্ষা করতাম সপ্তাহের ঐ দিনটির জন্য যখন আমাকে ঐ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হবে আর আমি চেঁচামেচি করে নার্সটিকে নিয়ে আসবো আমার কক্ষে।এভাবেই আমি নিঃশেষিত হচ্ছিলাম।আমার মধ্যে দেখা দিল এক নতুন স্বাভাবিকতা-আমি কিছুই লিখতে পারছিলাম না;কোন গল্পও সৃষ্টি করতে পারছিলাম না।আমি বোধহয় সুস্থ হয়ে উঠছিলাম।ডাক্তারদের কথা বার্তাও সেরকমই মনে হচ্ছিল।আর আমি তখন প্রাণপনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আমি যেন সুস্থ হয়ে না উঠি।আমি অভিনয় করা শুরু করলাম পাগলামির।কিন্তু সেটা বেশ কষ্টসাধ্য এবং আমার পক্ষে দুরূহ।এভাবেই আমার গল্প হয়ে উঠতে লাগলো সরল খাপছাড়া বর্ণনাবহুল কিন্তু ঘটনাহীন।আর তারপর আমি হারিয়ে ফেললাম আমার লেখার ক্ষমতা।আমি যেন স্বাভাবিক সুস্থ হয়ে উঠলাম।একদিন যখন আমি চেঁচামেচি করে নার্সটিকে ঘরে নিয়ে এলাম,যখন আমার সারা শরীর আলোড়িত হচ্ছিল অপার্থিব সুগন্ধে ঠিক তখনই একজন ডাক্তার ছুটে এলেন।তিনি আমাকে জোর করে নিয়ে গেলেন আর তার দুদিনপরই আমাকে বিদায় করে দেয়া হলো।আমার বিরূদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিলো আমি না-কি সুস্থ হয়ে গেছি।অথচ আমি জানি আমি সুস্থ হতে চাইনি।আমি অসুস্থ থাকতে চেয়েছিলাম।খুব বেশী অসুস্থ থাকতে চেয়েছিলাম।এতো বেশি যেন মৃত্যুর পরও আমি সুস্থ হয়ে না উঠি।কিন্তু কী অদ্ভূত!দেখুন আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি।খুব সুস্থ।দেখুন—এই যে—দেখুন।

[92 বার পঠিত]