কোয়ালিয়াকে (Qualia) বোঝানোর জন্য অনেকগুলো উপায় অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে জিন্দা লাশ যুক্তি (zombie argument)। ব্যাপারটা নিজের মতো বর্ণনা করি।

ধরুন আপনার হুবহু কপি, একটি সচল (মানে চলাফেরা করে এমন) শরীর আপনার সামনে উপস্থিত। আপনার অনুভূতি আছে। কিন্তু আপনার কপির বিন্দুমাত্র কোনো অনুভব অভিজ্ঞতা নেই। আপনি প্রতি মুহূর্তে বর্ণ গন্ধ অনুভব করেন। আপনার চোখের সামনে বর্ণিল পৃথিবী। তার চোখের সামনে একটা কালো পর্দা। আপনি নিজের সত্তার সচেনতা উপলব্ধি করেন। আপনার কপিটির কোনো আত্মসচেতনতা বোধ নেই। তার নিজস্ব সত্তা বোধ বলে কিছুই নেই। কিন্তু তাতে তার আচরণে বা তার শারীরিক ফাংশনে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন নেই। তার সচল শরীরটি যেহেতু আপনার কপি, তার শরীরেও আপনার সচল শরীরের প্যাটার্ন, সিগন্যালগুলোই উপস্থিত। মস্তিষ্কে একই উপায়ে নিউরন ফায়ার হচ্ছে। ইন্দ্রিয় দিয়ে তথ্য ঢুকছে, মস্তিষ্কে বিশ্লেষণ হচ্ছে। হাত পা নড়ছে। কথাও সে বলছে।

তার সামনে লাল রঙ উপস্থাপন করলে তার চোখ সেই রঙের দিকে নিবিষ্ট হতে দেখা যাচ্ছে। তারপর সে বলছে ‘টকটকে লাল।’ কিন্তু এটা বলার জন্যে কিন্তু সে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় কোনো লাল রঙ দেখতে পাচ্ছে না। অনুভব করছে না। কারণ তার কোনো সত্তাবোধই নেই। কিন্তু রঙটার যে আলোক তরঙ্গ, সেটা তার চোখে দিয়ে ঢুকেছে। সেটা তার চোখের নিউরনগুলো দিয়ে বিশ্লিষ্ট হয়েছে। সেখান থেকে নিউরনের ফায়ারিং ছড়িয়ে পড়েছে মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশে। এই একই আলোক তরঙ্গের সাথে ‘টকটকে লাল’ শব্দটির একটি সম্পর্ক তার মস্তিষ্ক খুঁজে পেয়েছে, কারণ তার মস্তিষ্ক আপনারটিরই কপি। সেখান থেকে তার বাকসঞ্চালন অংশে তথ্য চলে গেছে, ও তার মুখ থেকে গুনে গুনে বের হয়েছে শব্দ দুটি – ‘টকটকে লাল।’ মস্তিষ্কের এই গণনাটি কোথাও কোনো অংশে কিন্তু কোনো প্রকার সচেতন অভিজ্ঞতা বা অনুভূতির উপর নির্ভর করে নি।

তাহলে কী দাঁড়ালো? আপনি ও আপনার হুবহু ভৌত কপি, দুজনই মানুষ। একজনের সচেতন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি আছে। আরেকজনের তেমন কিছুই নেই, স্রেফ জিন্দা লাশ সে। কিন্তু দুজনের আচরণের প্যাটার্নে, মস্তিষ্কের সিগন্যালে বা কোনো প্রকার কোনো ভৌত পরিমাপে আপনাদের দুজনের বিন্দুমাত্র কোনো পার্থক্য করা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে ঠিক কোন জাগতিক বস্তুটির কারণে আপনার সচেতন অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু আপনার কপি জিন্দা লাশটির নেই? উত্তর হচ্ছে – কোনো জাগতিক বস্তুতে পার্থক্যটি অবস্থান করে না। কারণ সংজ্ঞামতেই আপনার কপিটি আপনার হুবহু ‘জাগতিক’ কপি।

এই যুক্তিটি এটাই উপস্থাপন করে যে আমাদের ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা-অনুভবের ভৌত বা জাগতিক কোনো প্রকাশ বা ব্যাখ্যা নেই। কারণ আমাদের অস্তিত্বের কোনো পর্যবেক্ষণসাধ্য অংশই আমাদের ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা-অনুভবের উপর নির্ভর করতে বাধ্য না। যেমন একটা রোবটকে মানুষের মতো আচরণ করার জন্যে তার সত্যি সত্যি মানুষের মতো অনুভব করার বাধ্যবাধকতা নেই। মানুষের মতো আচরণ করা রোবটটি সত্যি সত্যি মানুষের মতো অনুভব করলেও সে মানুষের মতো আচরণ করবে, না করলেও সে মানুষের মতোই আচরণ করে যাবে। ফলে কোনো প্রকার জাগতিক বা পর্যবেক্ষণগত বিচারে বলা সম্ভব হবে না যে রোবটটি সত্যি সত্যি আমাদের মতো অনুভব করে কিনা। অর্থাৎ ‘ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা-অনুভব’ ব্যাপারটা সকল প্রকার ভৌত প্রকাশ ঊর্দ্ধ। আমাদের অভিজ্ঞতার এই অভৌত অংশটিরই নাম কোয়ালিয়া। আপনার এটা আছে। জিন্দা লাশের এটা নেই।

জিন্দা লাশ যুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা হচ্ছে এটা অনুমান করা যে ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা-অনুভব ব্যতিরেকেই একটি শরীরে স্বাভাবিক মানুষের কর্মকাণ্ড সংঘটন সম্ভব। তবে এটা মারাত্মক দুর্বলতা না, যদি আমরা ধরে নেই যে শরীর একটি যন্ত্রই কেবল, মস্তিষ্ক একটি কম্পিউটারের মতো গণনাই করছে কেবল। এক্ষেত্রে এটা আর মারাত্মক দুর্বলতা থাকে না এ কারণে যে আমরা একটা যন্ত্রের কাছে বা কম্পিউটারের কাছে ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা-অনুভূতি ‘নেসেসারিলি’ আশা করি না।

এখন যদি এই আর্গুমেন্টে কোয়ালিয়াকে মেনে নেই, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কোয়ালিয়া ভৌত ফাংশনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে কিনা। উত্তর হচ্ছে না। কারণ সংজ্ঞামতেই ধরে নেয়া হয়েছে যে কোয়ালিয়া ছাড়াও জিন্দা লাশ হুবহু আপনার মতো ভৌত সকল শারীরিক ক্রিয়া সহকারে সচল। ফলে কোয়ালিয়া শুধু অভৌতই নয়। এটা বাড়তি। এপিফেনোমেনন। এটা ভৌত ফেনোমেননের বাইরে উদ্ভূত ও বাইরেই সীমাবদ্ধ। ভৌত ফেনোমেননকে এটা কোনোভাবে পরিবর্তিত করে দিতে পারে না। অর্থাৎ আমাদের ফার্স্ট পার্সন অভিজ্ঞতা সেই অর্থে এক ধরনের থিয়েটারের মতো যেখানে দর্শক নাটককে পরিবর্তিত করে দিতে পারে না, কেবল দেখে যেতে থাকে। ফলে কোয়ালিয়াকে অস্বীকার করলেও বিজ্ঞানের কোনো কিছুই আসছে না বা যাচ্ছে না। বিজ্ঞান আরামসেই তার ভৌত অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারে এটার কোনো প্রকার অনুমান ব্যতিরেকে। যারা এটাকে একটা বৈধ ভৌত সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করবে, তাদেরকে এটাকে যাচাইযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

জিন্দা লাশ যুক্তির একটি কার্টুন

Image from: http://chaospet.com/2007/08/09/28-philosophical-zombies/

[129 বার পঠিত]