(১)
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে সর্বত্র ইস্যুভিত্তিক, আদর্শভিত্তিক বিতর্ক। ভিন্নমতের উৎসকি-এই প্রশ্নটা যেকোন তর্ককারীকে প্রশ্ন করলে, স্বভাবসিদ্ধ উত্তর আসবে অন্যপক্ষের অজ্ঞতা। মার্ক্সবাদী হলে বলবে শ্রেণী অবস্থান-অর্থাৎ আমরা সমাজের সে ক্লাসে অবস্থান করি- সেই ক্ষুদ্র কোনের দৃষ্টিতে দেখা অভিজ্ঞানই মতপার্থক্যের কারণ। অন্যদিকে ধার্মিকরা প্রত্যেকেই পরিবার এবং সমাজ থেকে যা শিক্ষা এবং নৈতিকতার আচরন পায়, সেই খুঁটি ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। আমরা যুক্তিবাদিরা তাদের যুক্তিহীন প্রথানির্ভর আচরনের জন্যে “নিম্নমানের” বা নীচুবুদ্ধির মানুষ বলে মনে করি।

কিন্ত ভিন্নমতের উৎস কি তাই? অন্যপক্ষের অজ্ঞতা? আমরা কি কখনো গভীরে গিয়ে ব্যপারটা নিয়ে ভেবেছি?

(২)
সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত যে কোন সিদ্ধান্তই আমরা নিই না কেন-সেটা ঠিক না বেঠিক আমরা কি করে বুঝবো? একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, এই ঠিক বা বেঠিক ব্যপারটা পরম কিছু না। সবটাই স্থান-কাল-এবং তার পরেও জীবনের উদ্দেশ্য নির্ভর।

উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক -আমাদের একটা উদ্দেশ্য “সৎ থাকা” ।
এখান থেকেই শুরু করি-কারন এই উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বিমত থাকা সম্ভব না। এবার ধরা যাক দাঙ্গার সময় অন্য ধর্মের কেও আপনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। দাঙ্গাকারীরা -যারা আপনার ধর্মের লোক-আপনার বাড়িতে এলে কি আপনি তাদের সত্যি কথা বলবেন? সৎ কথা বলতে গিয়ে তাদের ধরিয়ে দেবেন খুনিদের কাছে? ৯৯% ক্ষেত্রেই, দেখা যাবে, আপনি সততার থেকে “প্রাণ” বাঁচানোর “উদ্দেশ্য” কে ওপরে রেখেছেন।

অর্থাৎ যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই অনেকগুলো উদ্দেশ্যের “সংঘাত” থাকে। আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। ভারতে মাওবাদিদের বা নক্সালদের কার্যকলাপ। “খতম” লাইন ঠিক কি না-তাই নিয়ে ভারতের কমিনিউস্টদের মধ্যেই আছে দীর্ঘ বিতর্ক। এবং তার মূলে গেলে দেখা যাবে-সেই স্থান-কাল পাত্র। অর্থাৎ বিহার, ঝারখন্ড বা ঐ ধরনের আদিবাসিদের গ্রামে লোকেরা যে অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে বাঁচে, তাতে হাতে বন্দুক নিয়ে খতম লাইনে যাওয়াটাকে অনেকেই যৌত্বিক বলে মনে করে। অন্য স্থানে এবং কালে অবস্থান করা কোলকাতার সৌখিন বামবাবুরা তাদের যুক্তিকে “ভুল” বলে প্রমাণ করবে কি করে? এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখায় যে মাওবাদিদের হাতে মারা গেছে সেই সর্বহারা শ্রেণীর লোকজন। আর তোলা দিয়ে টিকে আছে ঠিকাদাররা। তাহলে কমিনিউজমের কি হইল?

আসলে স্টালিন থেকে অধুনা “শহিদ” কিশেনজির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে-আদর্শের থেকেও “বেঁচে” থাকার চেষ্টাটাই সিদ্ধান্তকে সব থেকে বেশী প্রভাবিত করে। এই বেঁচে থাকা গোষ্টিগত ভাবে বা ব্যক্তিগত ভাবে হতে পারে। একজন সেনা নিজের প্রাণ দেয়, দেশের লোককে বাঁচাতে। এতে নতুন কিছু নেই। প্রতিটা প্রজাতিই এই ভাবে বাঁচার চেষ্টা করে। ভারতের মাওবাদিদের কমিনিউস্ট ভাবলে ভুল হবে -এদের অধিকাংশই অত্যাচারিত আদিবাসী। হাতে বন্দুক পেয়ে, একটু ভাল ভাবে বাঁচার চেষ্টা করছে।

(৩)
তাহলে জীবনের সব উদ্দেশ্যই কি “জৈবিক” যুক্তিবাদে সিদ্ধ?

আজকাল অনেকেই “চাইল্ডলেস বা চয়েস” থাকছে। এর পেছনে কি কোন বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে? অনেকেই ভাবতে পারেন, পৃথিবীতে এত লোক-এই ট্রেন্ড ও সেই “গোষ্টিগত” ভাবে বাঁচার প্রয়াস। রসদ বাঁচিয়ে। সমস্যা হচ্ছে এই প্রবণতা বেশী ইউরোপের উন্নতদেশগুলিতে-যেখানে জনসংখ্যা দ্রুত হারে কমছে-কিন্ত তাদের লোক দরকার!

তাহলেত চাইল্ডলেস বাই চয়েস রাষ্ট্র বা জৈবিক- কোন যুক্তিবাদেই সিদ্ধ না। তবে চাইল্ড লেস বাই চয়েসের পুরুষ মহিলারা ভুল? তাদের অধিকার নেই নিজের পছন্দের ওপর?

অথবা ধরুন আত্মহত্যার অধিকার। কিছু কিছু দেশ দিয়েছে, অধিকাংশ দেশ দিচ্ছে না। আমারা জীবন শেষ করার অধিকার আমার নেই! এটাই অধিকাংশ রাষ্ট্রের আইন। এর পেছনে যুক্তি এই যে “প্রাণ” এত মহার্হ্য যে প্রাণটা যার, তারো অধিকার নেই সেই প্রাণ নেওয়ার। অর্থাৎ “প্রাণের” মূল্যই অন্তিম ” উদ্দেশ্য” হিসাবে ধরা হচ্ছে। মাওবাদিদের খতম লাইনের বিরুদ্ধেও সেই “প্রাণের” দামের যুক্তিটাই সবার আগে আসে।

কিন্ত এটা কি ধরনের যুক্তিবাদ? সব প্রাণই ত মরণশীল-ক্ষণস্থায়ী। সেই ক্ষণস্থায়ী, মরণশীল প্রাণকে আমরা এত মুল্যবান হিসাবে দেখি কেন?

ইতিহাসই বোধ হয় কারন। প্রানকে ” ক্ষণস্থায়ী মরণশীল” আলোকে দেখতে গিয়ে স্টালিন-হিটলার যা করেছেন, সেটাই যথেষ্ট বোঝার জন্যে প্রাণ কেন মুল্যবান। কিন্ত তাই যদি হয় তাহলে চাইল্ড লেস বাই চয়েস বা আত্মহত্যার অধিকার কিভাবে সিদ্ধ হয়?

(৪) এই সমস্যাগুলোর মূল এই যে জীবনের আসলেই কোন পরম উদ্দেশ্য নেই। থাকতে পারে না। কারন প্রতিটা জন্মই ক্ষনস্থায়ী। সবকিছুর মৃত্যু অবধারিত। নক্ষত্র, পৃথিবী মানুষ-সবকিছুই একদিন শেষ হবে।

মুশকিল হচ্ছে এইভাবে ভাবতে গেলে, বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় ভাল কিছু করার ইচ্ছাও। থাকে না নৈতিকতার ভিত্তি।

ফলে দেখা যাবে সব ধর্মীয় দর্শনে নানান রকমের রূপকথা সৃষ্টী করে মানুষকে “আশ্বস্ত” করা হয়েছে, নশ্বর জন্ম ক্ষনস্থায়ি বটে-কিন্ত স্বর্গের জীবন চিরস্থায়ী। বৌদ্ধ ধর্মের পুনঃজন্মবাদও ঠিক একই কারনে। যদি কেও জানে এটাই একমাত্র জীবন এবং পরম উদ্দেশ্য বলে কিছু থাকতে পারে না-কোন ধর্মীয় দর্শনের ভিতই দাঁড়াবে না। নৈতিকতার ভিত ও থাকবে না। ফলে পরজন্ম বা স্বর্গের অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্মগুলো মানুষকে তার জীবনে উদ্দেশ্য নিয়ে আশ্বস্ত করায়। স্বর্গ বা পরজন্ম যতই অযৌত্বিক গাঁজাখুরি হোক না কেন-নৈতিকতা ভিত্তিক সামাজিক বিন্যাসের বিবর্তনে এদের গুরুত্ব আছে। কারন জীবনে উদ্দেশ্য না থাকলে নৈতিকতার কোন দর্শনই টেকে না। আর জীবনের পরম উদ্দেশ্যের যেহেতু কোন যুক্তিবাদি বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই-সেহেতু জীবনের সব উদ্দেশ্যই আপাত, ক্ষণস্থায়ী এবং কিছুটা অযৌত্বিকও বটে। সামাজিক বিবর্তনে ধর্মের আগমন মূলত এই পথেই। কারন পশুকুলে “জীবনের উদ্দেশ্য” জৈবিক-তাদের এত ভাবতে হয় না। কিন্ত মানব সমাজের প্রতিষ্ঠাতে শুধু জৈবিক উদ্দেশ্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে ঈশ্বর, স্বর্গ, অনন্ত জীবনের ধারনাগুলি “নির্বাচিত” হয়-কারন তা নীতিভিত্তিক সমাজের ভিত্তিপ্রস্তর ছিল এক সময়।

১০০% যৌত্বিক জীবন বলে তাই কিছু সম্ভব না। আমদের প্রত্যেকেরই জীবনের উদ্দেশ্য আছে যার কিছুটা জৈবিক [ জিনের সূত্রে পাওয়া] কিছুটা সামাজিক ( যা ধর্ম , পরিবার বা সামাজিক আইন থেকে এসেছে) এবং বেশ কিছুটা নিজেদের স্বতন্ত্র চিন্তা। আবার আমাদের জীবনকালের মধ্যেই এই উদ্দেশ্যের বিবর্তন হয়। যৌবনে যে কমিনিউস্ট গেরিলা হওয়ার স্বপ্ন দেখে, পৌঢ়কালে সে মহানন্দে বণিক হিসাবে অর্থ সংগ্রহে ব্যস্থ। জীবনে ধাক্কা পেয়ে আস্তিক থেকে নাস্তিক, নাস্তিক থেকে আস্তিক হয় লোকে। সবার মনেই কিছু দ্বন্দ থাকে। যার মনে যত বেশী চিন্তার দ্বন্দ থাকবে, সে তত দ্রুত বেশী আরো গভীর উপলদ্ধি্র জগতে প্রবেশ করতে সমর্থ হবে। কারন মনে দ্বন্দ না থাকলে নতুন চিন্তার সংশ্লেষ অসম্ভব।

এই সমস্যাটি ও নতুন কিছু না ভারতীয় দর্শনে। অদ্বৈতবাদিরা “মায়ার” ধারনা – জগৎ মিথ্যা, ব্রহ্ম সত্য-অথবা এই বর্তমান জগত আসলেই “আপাত সত্য” -এই ধারনা বহুদিন থেকেই বহন করত। সমস্যা হচ্ছে, ভারতের ইতিহাসের ওপর মায়াবাদের প্রভাব ঋণাত্মক। নিউটন, কোপার্নিকাসদের জন্ম নালন্দাতে না হয়ে, হয়েছে ইউরোপে। কারন, সব দর্শনের এবং ধারনার ধাত্রীভূমি হচ্ছে মানুষ। সুতরাং মানুষের বস্তুবাদি “সারভাইভালের” উন্নতি না করে,কোন দর্শন বা ধারনাই টিকতে পারে না। সুতরাং আমরা চাই বা না চাই- একটা “অযৌত্বিক” বিশ্বাস নিয়ে আমাদের চলতেই হবে। আর সেটা হচ্ছে সবার ওপর মানুষ সত্য। এর কষ্টিপাথরেই বিচার করতে হবে সমস্ত ধর্ম, আদর্শ এবং দর্শনকে।

[6 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন: