পার্থিব

পার্থিব
অনন্ত বিজয় দাশ ও সৈকত চৌধুরী

প্রকাশক : শুদ্ধস্বর
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি, ২০১১
বইমেলা স্টল নম্বর : ২৫৩, ২৫৪
মুদ্রিত মূল্য : ২২৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৩৫
প্রচ্ছদ : শিবু কুমার শীল
———————————-
উৎসর্গ

প্রণতি জানাই
বাংলার তিন নক্ষত্রোজ্জ্বল আলোকবর্তিকার প্রতি

আরজ আলী মাতুব্বর
আহমদ শরীফ
হুমায়ুন আজাদ

———————————

সূচিপত্র

ভূমিকা
মহাপ্লাবনের বাস্তবতা
‘মিরাকল-১৯’-এর উনিশ-বিশ!
ভগবদ্গীতায় বিজ্ঞান অন্বেষণ এবং অন্যান্য
ঈশ্বর ও ধর্ম প্রসঙ্গ : সংশয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে

———————————–
ভূমিকা

To explain the unknown by the known is a logical procedure; to explain the known by the unknown is a form of theological lunacy.- David Brooks

পার্থিব জগতের জল, বায়ু, আহার্যের স্বাদ নিয়ে আমরা জীবজগতের সকলেই পার্থিব জগতে বেঁচে আছি। জগতের রূপ-রস-গন্ধ আমাদের মনকে ভরিয়ে তুলে, আনন্দ জোগায়। আমাদের ভালো-মন্দ-সুস্থতা-অসুস্থতা সবকিছুই এই পার্থিব জগতকে কেন্দ্র করে। ধরা যাক, দেখা সাক্ষাতের সময় আমরা একে অপরকে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন? প্রত্যুত্তর আসে ভালো আছি অথবা ভালো নেই। এই ভালো থাকা বা না-থাকা সবই ইহজাগতিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে। আমরা সুখস্বপ্ন-কল্পনায় দেখি-জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, বিত্তশালী হওয়া, ব্যাপক পরিচিতি লাভ ইত্যাদি। এ সবই কিন্তু পার্থিব জগতে চাই। শোনা যায় কেউবা স্বপ্নে স্বর্গ-নরক দেখেছেন। স্বর্গের অতি মনোমুগ্ধকর পানাহার, অবাধ স্বাধীনতা অথবা নরকের আগুনে দগ্ধ পাপী-তাপীর তীব্র কষ্টের রেশ কিন্তু এই ইহজগতেই আমরা পেয়ে থাকি। কোথাও এমন কিছু কল্পনা করতে পারি না, যা ইহজগতে নেই। বোধকরি, কোনো না কোনোভাবে এই বস্তুজগতকে কেন্দ্র করে আমাদের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনার পরিধি। এরপরও অনেকে বলেন অতিপ্রাকৃত শক্তি অথবা ঈশ্বর (গড, আল্লাহ, ইয়াহুয়া, ভগবান ইত্যাদি) কোনোভাবেই পার্থিব জগতের অধীন নয়। কিন্তু ঈশ্বরের যে সকল বৈশিষ্ট্য ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে যেমন, সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞানী, সর্বস্থানব্যাপী বিরাজমান ইত্যাদি। ওগুলো যেমন শক্তিমত্তা এই বস্তুজগতেরই অধীন। শক্তিমানদের প্রতি বেশিরভাগ মানুষ ভীতি-শ্রদ্ধা-সম্ভ্রম বজায় রেখে চলে। মানুষ গর্বভরে পাঠ করে, ‘বীরভোগ্য বসুন্ধরা’। জ্ঞান অন্বেষণের স্পৃহা সকল মানুষেরই আছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতা থাকায় সে সর্বজ্ঞানী হতে পারে না। আর স্থান-কাল-পাত্র তো বস্তুজগতের অধীন। এভাবে ঈশ্বরের সংজ্ঞায় ‘ঈশ্বর’কে ভাঙলে বুঝা যায় অতিপ্রাকৃতের শিরোমণি ঈশ্বর সামান্য ‘তৃণসম’ মানুষের চিন্তার একটু বর্ধিতরূপ মাত্র। এজন্যই হয়তো পার্থিব জগতের জ্ঞানী-গুণী-বিজ্ঞানী-দার্শনিকেরা বলেন-অতিপ্রাকৃত-অপার্থিব-অলৌকিক বলতে কিছুই নেই। যা আছে, তা এই পার্থিব মানুষেরই কাল্পনিক সৃষ্টি। আরো বলেন পার্থিব জগতে বিশ্বাসী কিংবা পার্থিব জগতে অবিশ্বাসী নির্বিশেষে পার্থিব জগতের সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, জড়, বিশ্ব-মহাবিশ্বের সবকিছুই পার্থিব প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত। তবু শোনা যায়, মানুষই না-কী অপার্থিবের কল্যাণে একমাত্র আশরাফুল মখলুকাত! কিন্তু দীর্ঘকালের কঠোর অধ্যাবসায়ে লব্ধ বিজ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিক মনন ভিন্ন কথা বলে। বলে পৃথিবীর যাবতীয় অপার্থিবতা আমাদের মধ্যেই বিরাজমান। সবকিছু পার্থিব কারণেই সৃষ্ট। এও বলে পার্থিবতা সম্পর্কে সকলের ধারণা স্পষ্ট না থাকা এবং পার্থিবতা সম্পর্কে এখনো সবকিছু না জানার কারণে ভয়ে, লোভে, লালসায়, ভণ্ডামি, সস্তা প্রচারের মোহে আবিষ্ট হয়ে পার্থিবতা ভুলে অপার্থিবতার জয়গান গেয়ে বেড়াই আমরা। অলৌকিকতার পায়ে মাথা নত করে আত্মসন্তুষ্টি লাভ করি। গুটিকয়েক শোষক শ্রেণীর প্রতিভূকে ঈশ্বরের অবতার বানিয়ে আমাদের একমাত্র পার্থিব জগৎ তাদের জন্য উৎসর্গ করি। এতে মনুষ্য জীবনের তি ভিন্ন লাভ মোটেই হয় না। যুগ যুগ ধরে রক্ত পানি করা শ্রমে উপার্জিত অর্থ অপার্থিবতার ধ্বজাধারীরা লুটে নেয়। আমাদের অপ্রাপ্তি, আর্তনাদ, ক্ষোভ, চোখের পানি, হাহাকার-সবই অপার্থিবতার দেয়ালের নীচে চাপা পড়ে যায়। ধরণীতে জনগণতন্ত্র শেকলবদ্ধ হতে থাকে অপার্থিবতার কারাগারে। মানুষের বৌদ্ধিক মুক্তি, যৌক্তিক মনন দূর আকাশে পাড়ি জমায়।

আমাদের এই গ্রন্থে দীর্ঘকাল ধরে জনমানসে অবস্থিত কিছু অপার্থিব বিষয়সমূহকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আশা করি, সত্য উদ্ধরণের এই সৎ-প্রচেষ্টাকে নঞ্চর্থক অর্থে গ্রহণ করবেন না। বরং আপনার বিজ্ঞানমনস্কতা আর বিজ্ঞানসচেতনার পাঠে ক্ষীণমাত্র ভূমিকা রাখতে পারলে আমাদের শ্রম সার্থক বলে ধরে নিব। এছাড়া গ্রন্থে সন্নিবেশিত প্রবন্ধ সম্পর্কে যে কোনো ভিন্নমত, মতদ্বৈততা আমরা জানতে আগ্রহী।

এ গ্রন্থের সবগুলো প্রবন্ধই বাংলা ওয়েব ব্লগ মুক্তমনা’য় (www.mukto-mona.com) বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছিল। এর বাইরে আরো কয়েকটি বাংলা ওয়েব সাইট, ব্লগ-এ প্রকাশিত হয়েছিল। প্রচুর সংখ্যক পাঠক তাদের মূল্যবান অভিমত জানিয়ে আমাদেরকে ঋদ্ধ করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব, মুক্তমনা ওয়েব সাইটের মডারেটর, বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায় এবং বন্যা আহমেদ, তাদের ঐকান্তিক তাগাদা আর স্নেহবৎসল পরামর্শ, সহযোগিতা ছাড়া এ গ্রন্থের প্রবন্ধগুলি মোটেই রচিত হত না। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিল-এর সকল সদস্য বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সুহৃদ শ্রী লিটনচন্দ্র দাস, মনির হোসাইন, চিন্ময় ভট্টাচার্য, মাহমুদ আলী, হাসান শাহরিয়ার, সামসুল আমীন, অসীম দাস-যাদের সাথে এক সময়ের নিত্য তর্ক-বির্তক আর আড্ডার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এ গ্রন্থের ভিত। তাই আমাদের এই প্রাণপ্রিয় বন্ধুদের নামোল্লেখ ব্যতীত সন্তুষ্টি নেই। উল্লেখ করতে হয় আমাদের অগ্রজপ্রতিম মাহবুব সাঈদ মামুন এবং কল্যাণ কুমার বিশ্বাস-এর নাম। অন্তরালের এ প্রাজ্ঞ মানুষদ্বয়ের যুক্তি আর মুক্তচিন্তার প্রতি উৎসাহ, আগ্রহ, কর্মচঞ্চল মানসিকতা আমাদের ভিতর নানা সময়ে অনুঘটকের মত কাজ করেছে। পরিশেষে স্বীকার করি অত্যন্ত পরিচিত উদ্যমী প্রকাশক শুদ্ধস্বরের টুটুল ভাই (আহমেদুর রশীদ টুটুল) ব্যতীত এত অল্প সময়ের ভিতর এ গ্রন্থ আলোর মুখ দেখা সম্ভব ছিল না। কাজেই টুটুল ভাইয়ের পাওনা কৃতিত্বটুকু প্রদানে আমাদের বিন্দুমাত্র কৃচ্ছতাসাধনের ইচ্ছা নেই।

বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের শুভকামনায়–

অনন্ত বিজয় দাশ
[email protected]

এবং

সৈকত চৌধুরী
[email protected]
২ জানুয়ারি, ২০১১

[95 বার পঠিত]