সে বহুদিন আগের কথা। “জাকির নায়েক” নামে এক ইসলামী পণ্ডিতের ছাগলামি সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলাম। পাঠকেরা সেই ছাগলামির মর্মার্থ বুঝতে পারে “জাকির নায়েক একজন রামছাগল” নামে ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুলে ফেলল। যোগ দিলাম সেই গ্রুপে, পছন্দ হয়ে গেল রামছাগল পদবীটা। আমার সেই লেখার শিরোনাম ছিল “জাকির নায়েকের মিথ্যাচার: …”। এই ছাগুকে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও লেখার ইচ্ছা আছে। তবে সেই লেখাগুলোর শিরোনামের কোলনপূর্ব অংশটা হবে “রামছাগল বেত্তান্ত”। সে পরের কথা, আপাতত টেনশনে আছি এই কারণে যে রামছাগল খানার একটা এমবিবিএস ডিগ্রি রয়েছে। মেডিকেল কলেজে কি পড়ায়, যে এমন রামছাগলের জন্ম হতে পারে? মহানবী গুগলের (দঃ) দৈব নির্দেশনায় অবশেষে উত্তর মিলেছে। সেই উত্তর খুব একটা সন্তোষজনক হতো না, যদি না সম্প্রতি ভাল ভাল কিছু খবর পেতাম। উত্তরটা হচ্ছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান পড়ানো হয় না, আর যেহেতু জাকির নায়েক রামছাগল সেহেতু নিজ উদ্যোগে বিবর্তন শিক্ষা করার ক্ষমতাও তার নাই। আর ভাল খবরটা হচ্ছে সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করার কথা হচ্ছে। বর্তমানে মেডিসিন পড়াশোনার অবস্থা কেমন, এতে বিবর্তন অন্তর্ভুক্তির কারণ, ফলাফল এবং কতদূর কি অগ্রগতি হয়েছে সে নিয়েই আমার বর্তমান লেখা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অধিকাংশ শাখার মতো চিকিৎসাবিজ্ঞান গবেষণাতেও পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেই দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠ্যসূচিতেই বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান বিষয়ের ওপর কোন আবশ্যিক কোর্স নেই। অথচ ভ্রূণতত্ত্ব, জৈব রসায়ন, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি-র মতোই বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের একটি শাখা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর গুরুত্বও তাদের চেয়ে কোন অংশে কম না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস এর জার্নাল “প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস” (PNAS) এর ২৬ জানুয়ারি ২০১০ সংখ্যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আধুনিক বিবর্তন তত্ত্ব প্রয়োগ করে কিভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গণস্বাস্থ্য বিষয়ক নানা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয়া যায় সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অচিরেই অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।

ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ র‌্যান্ডাল্ফ নেসি বললেন, “চিকিৎসা সেবা ও গবেষণা উন্নয়নের জন্য বিবর্তনকে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়”। সাধারণভাবে আমরা জানি, বিবর্তনের মাধ্যমে কোন বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটতে অনেক অনেক প্রজন্ম লেগে যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান তো এতো দেরি সইবে না। তাহলে দেখা যাক, সময়ের এই স্বল্প পরিসরেও কিভাবে আমরা কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ জীবাণুর শক্তিমত্তা বাড়িয়ে চলেছি।

বিবর্তন তত্ত্ব প্রয়োগের সবচেয়ে বড় সুফল পাওয়া যাবে ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ ও ক্যান্সার চিকিৎসায়। কারণ ব্যাক্টেরিয়া ও ক্যান্সার কোষ উভয়েরই প্রজনন ক্ষমতা অত্যধিক বেশি। তার মানে স্বল্প সময়েই এদের একেকটি প্রজন্ম পার হয়ে যায় এবং এদের বিবর্তন আমরা চোখের সামনেই দেখতে পারি। একটি এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের পর মানবদেহের যে ব্যাক্টেরিয়াগুলো দুর্বল তারা সব মারা যায়, কিন্তু এমন কিছু ব্যাক্টেরিয়া থেকেই যায় যাদের দেহে এন্টিবায়োটিকটি প্রতিরোধের ক্ষমতা ছিল। এরা কয়েক ঘণ্টা বা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন সব ব্যাক্টেরিয়ার জন্ম দেয় যাদের সবার মধ্যেই উক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতাটি আছে। ফলে পূর্বের এন্টিবায়োটিকটি আর কাজে দেয় না। প্রয়োজন হয় আরও শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকের। এভাবে আমরা যতোই ওষুধ প্রয়োগ করছি ব্যাক্টেরিয়ার শক্তি ততোই বেড়ে চলছে। একই কথা প্রযোজ্য ক্যান্সার কোষ এবং তা নিধনের জন্য ব্যবহৃত কেমোথেরাপির বেলায়।

এছাড়া যে প্রক্রিয়ায় বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের পূর্বপুরুষ খুঁজে বের করেন ঠিক সেই প্রক্রিয়াতেই বিভিন্ন সংক্রামক রোগের জন্য দায়ী জীবাণু- যেমন: ফ্লু, সার্স এবং এইচআইভি- এর পূর্বপুরুষ খুঁজে বের করা সম্ভব। এর মাধ্যমে তাদের উৎপত্তি ও বিকাশ জানা যাবে এবং তাদের প্রতিরোধ করাটাও সহজ হয়ে যাবে। বিবর্তন তত্ত্ব প্রয়োগের মাধ্যমে অনেক ধরণের মেডিকল থেরাপির উদ্ভাবন সম্ভব। অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। এর ফলে সামান্য নোংরা কোন পরিবেশের প্রভাবেই আমাদের মধ্যে অ্যাজমা ও বিভিন্ন অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দেহে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিভিন্ন পরজীবীর ডিম প্রবেশ করানো হয় যাতে সে অনুযায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সফলতার জন্যও মানুষের সাথে বিভিন্ন পরজীবীর সহ-বিবর্তন নিয়ে সূক্ষ্ণ গবেষণা প্রয়োজন।

এছাড়া আরও অসংখ্যা উপায়ে বিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বন্যা আহমেদ তার “বিবর্তনের পথ ধরে” বইয়ের “চোখের সামনেই ঘটছে বিবর্তন” অধ্যায়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিবর্তনের এই সীমাহীন সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেই প্রসিডিংসের চূড়ান্ত গবেষণাপত্রের লেখক ছিলেন মোট ১৩ জন চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী। তারা বলেছেন, শুধু পাঠ্যসূচিতেই নয় বরং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভর্তি পরীক্ষাতেও বিবর্তন অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে হলে শিক্ষার্থীদেরকে বিবর্তনের প্রাথমিক ধারণা নিয়েই আসতে হবে, মেডিকেল কলেজে এসে তারা সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত পড়বে। অনেকটা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হলে যেমন পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের মৌলিক ধারণা নিয়ে আসতে হয় তেমন।

অনেক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক সায় দেয়ায় তাদের এই প্রস্তাবনা বাস্তবে রূপ লাভ করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেছে। অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অফ মেডিকেল কলেজেস এবং হাওয়ার্ড হিউজ মেডিকেল ইনস্টিটিউট “Scientific Foundations for Future Physicians” নামে একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচি এবং Medical College Admission Test (MCAT) এ বিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

উন্নত বিশ্বে যেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানও বিবর্তনের আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশে বর্তমানে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে পর্যন্ত বিবর্তন নেই। একসময় উচ্চ মাধ্যমিক জীববিজ্ঞানে এটি পড়ানো হতো, বেশ কয়েক বছর পূর্বে ধর্মীয় গোঁড়ামির কবলে পড়ে তাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এভাবে আমরা কেবল পিছিয়েই চলেছি, ঠিক যেমন ব্রিটিশদের রাজত্বকালে ব্যক্তিনিরপেক্ষ জ্ঞানকে ফিরিঙ্গি জ্ঞান আখ্যা দিয়ে বর্জন করার কারণে পিছিয়ে পড়েছিলাম।

তথ্যসূত্র:

Medical students may soon be tested on evolution – Eurekalert
(2010). “Evolution in Health and Medicine Special Feature.” Proceedings of the National Academy of Sciences 107(4).

পাঠ্যসূচিতে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে

Randolph M. Nesse এবং তার সহবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা তাদের “Making evolutionary biology a basic science for medicine” নামক গবেষণাপত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের কোন বিষয়গুলো পড়াতে হবে তার একটি তালিকা দিয়েছেন। সেই তালিকাটি এখানে হুবহু তুলে দিলাম:

1. A review of core principles of evolutionary biology.
2. Common misunderstandings about evolution: how to recognize and avoid them.
3. Evolutionary explanations: importance, formulation, testing.
4. Cooperation, kin selection, levels of selection.
5. Evolutionary genetics, signals of selection, drift, pleiotropy, demography, etc.
6. Evolutionary considerations in epidemiology, and genomewide association studies.
7. Life history theory applied to humans.
8. Senescence and late-onset diseases.
9. Reproduction, sexual selection, and related medical problems.
10. Antibiotic resistance and virulence evolution.
11. Coevolution, arms races, and related aspects of infectious diseases.
12. The ecology and evolution of emerging diseases.
13. Somatic evolution in cancer, and immunology.
14. Diseases of modern environments and the epidemiological transition.
15. Defenses, their regulation, and their costs.
16. Tradeoffs, at levels from genes, to physiology, to behavior.
17. Development as a product of and contributor to evolutionary change.
18. Facultative adaptations (phenotype plasticity) and related diseases.
19. Human evolution and ancestral environments.
20. Genetic differences among human populations and rates of evolutionary change.
21. Heritability and an understanding of how genes interact with environments.
22. Behavioral ecology, behavior, and the origins and functions of emotions.

[86 বার পঠিত]