আমার মায়ের বেঁচে থাকার দিনের সংখ্যা হ্রাস হচ্ছে। নব্বই ছুই-ছুই করছে। মা এখন বার্ধক্যজনিত শারিরীক কষ্টে আছে। খেতে পারছে না। বমি হয়ে যাচ্ছে। আজ সকালে পোলাও চালের এক চামচ ভাত খেয়েছে। এখন সন্ধ্যা। আর কিছু খেতে পারছে না। জীবন ধরে রেখে কষ্ট করা অমানবিক, অর্থহীন। ত্বড়িৎ জীবনাবসানই শ্রেয়। তাই মায়ের জীবনাবসানে আমার কোন খেদ নেই। আমার মায়ের কষ্টমুক্তিতেই আমার পরম আনন্দ। টেলিফোনে আমি একটা সুসংবাদের অপেক্ষায় আছি - ‘তোমার মায়ের জীবন শেষ হলো।’

মন তবু কাঁদে। চোখ ভিজে আসে। আমার মা বড় ভাগ্যবতী। আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মিনু অকল্পনীয় যত্ন করে যাচ্ছে। মা এখন তালে-বেতালে কথা বলছে। কখনও বলছে - এটা কাদের বাড়িতে আছি? ‘আলোটা নিভিয়ে দাও’ না বলে বলছে - কাঁচিটা নিভিয়ে দাও। আবার কখনও বলছে - গাইটাকে খাবার দিচ্ছো না কেনো?

আমার কথা ইদানীং আর বুঝে না। মিনু পূনরাবৃতি করলে মা উত্তর দিতে পারে। শরীরে ব্যথা, উত্তর দিতে কষ্ট। সারাক্ষন ‘ওহ, আহ্‌’ শব্দ। আমি কথা বললেই ‘ওহ, আহ্‌’ শব্দগুলো কষ্ট করে চেপে থাকে।গত একটা বছর যাবৎ একটি বারের জন্যও বলেনি - তিনি ভালো নেই। যখনই বলি - মা, এখন কেমন আছো - মায়ের একই উত্তর - ‘আমি ভালো আছি।’ ভালো নেই বললে আমার খারাপ লাগবে সেজন্যই এই মিথ্যার আশ্রয়। বিদেশ-বিভূইয়ে আমার মন খারাপ হবে সে জ্ঞানটুকু এখনও আছে। সেজন্যই ‘আমি ভালো আছি’ মিথ্যাটুকু বলে আমাকে একটু ভালো রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা। এজন্যই এরা ‘মা’, ‘জননী’, ভিন্ন প্রজাতির মানুষ।

ফোন করতে দেরী হলেই মিনুকে জিজ্ঞেস করবে - দুদিন যাবৎ ফোন আসছে না কেনো? আমি একটা কথা বলে যেতে যাই। কী সে মূল্যবান শেষ কথা? মিনু আজ সেটাই মনে করিয়ে দিলো - ‘আপনি কয়েকদিন যাবৎ কী বলতে চাইছিলেন, এখন বলেন।’ মা বললো - “সবাই ভালো থাকিস, বাবা।” এটাই এত গুরুত্বপূর্ণ কথা? এটুকু বলার জন্যই এতো আকুতি, অস্থিরতা!

এই মহাবিশ্বে প্রাণীজগৎ বড়ই নগন্য একটা কিছু। এরা আনন্দ, ভালোবাসা, প্রেমপ্রীতি, আবেগ, অনুভূতি নিয়ে কিছুদিন সচল থাকে। তারপর নক্ষত্রের ধূলি কণার ধূলি কণায় হারিয়ে যায়। আমিও আবেগ-অনুভূতি বাইরের কেউ নই। মায়ের অতিসামান্য, “সবাই ভালো থাকিস, বাবা” চারটি শব্দ আমারও চোখ অশ্রুসিক্ত করে। বিবর্তনে সৃষ্ট কোটি কোটি প্রাণের সঞ্চার হলেও আবেগ-অনুভূতি সম্পন্ন ক্ষুদ্রাংশ এখনও টিকে আছে। বাকীরা বিবর্তনের পথ ধরে এগুতে পারেনি।

মহাবিশ্বে আমাদের সৌরমণ্ডলের প্রধান ধূলিকণার নাম সূর্য। ছোট ছোট ধূলিকণাগুলোঃ বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন, এবং প্লোটো। প্রতিটি ধূলিকণার আছে ছোট ছোট ধূলিকণা, যেমন পৃথিবীর আছে, চন্দ্র। এছাড়া আরো ছোট আছেঃ ধুমকেতু, উল্কাপিণ্ড। স্বর্গ (Heaven) এবং নরক (Hell) নামে কোত্থাও কিছু নেই। এসব ঠাকুরমার ঝুলির রূপকথা মাত্র।