লিখেছেন: মাহিন মাহমুদ

মানুষ পৃথিবীর একমাত্র প্রজাতি যে কিনা নিজের দেহের ত্বকের রং নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। বাঘ, হরিণ, তিমি, গরু, মুরগি কিংবা মাগুর মাছ ইত্যাদি কোন প্রাণী কখনওই নিজের গায়ের রং নিয়ে অসন্তুষ্ট নয়, এর কারণ সম্ভবত তারা নিজেদের জীবনযাপন নিয়েই বেশী ব্যস্ত আর অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করার ক্ষমতাও তাদের নেই। কিন্তু মানব জাতির মস্তিষ্ক জীবনযাপন ছাড়াও নানান অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করতে সক্ষম; তার মধ্যে গায়ের রং নিয়ে চিন্তাভাবনা মানুষ এত বেশী করেছে যে এর থেকে জন্ম হয়েছে বর্ণবাদের এবং আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে এনে সাদা চামড়ার পশ্চিমারা তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করেছে। শরীরের চামড়া উজ্জ্বল ও সাদা বলে ইউরোপীয় ও আমেরিকানরা মনে করত তারা নিজেরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আর কালো মানুষেরা নিকৃষ্ট। তবে সেই দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে কিন্তু কালো মানুষদের প্রতি অবজ্ঞা কি আজও দূর হয়েছে? আমেরিকায় সাম্প্রতিক বর্ণবাদের ঘটনা, যেখানে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গকে পুলিশ শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে,  আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের মনে গায়ের চামড়া নিয়ে ক্ষতিকর এই চিন্তাভাবনা এখনও বন্ধ হয়নি। 

এর আগেও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা পান থেকে চুন খসানোর মাত্রায় অপরাধ করলেই পুলিশ গুলি করে হত্যা করত। ২০১৪ সালে এক আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ বালক, মাত্র ১২ বছর বয়সী তামির রাইস খেলনা বন্দুক নিয়ে খেলা করছিল পুলিশের সামনে; পুলিশ সেই ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে এবং তাদের যুক্তি ছিল তারা ঐ বন্দুককে আসল বন্দুক মনে করেছিল। এগুলি আসলে অজুহাত। পুলিশ এত বোকা নয় যে খেলনা বন্দুক দূর থেকে চিনবে না। কালো মানুষদের প্রতি ঘৃণা এত প্রবল যে, এদেরকে সহ্য করতে না পেরে আমেরিকান পুলিশ গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না।

পশ্চিমা দেশ থেকে সরে এবার আসি আমাদের উপমহাদেশে। আমাদের উপমহাদেশের মানুষদের সাদা চামড়ার প্রতি একটা অহেতুক অবসেশন বা আচ্ছন্নতা আছে। ভারত ও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের গায়ের রং কালো অথবা শ্যামলা। কিন্তু তারপরও এই অঞ্চলে সাদা মানুষদের প্রতি আলাদা সম্ভ্রমবোধ কাজ করে। বিয়ের সময় ছেলেরা সাদা চামড়ার মেয়ে খোঁজে, আর মেয়েরাও গায়ের চামড়া ফর্সা করার জন্যে নানারকম প্রসাধনী মাখে। ফেয়ার এন্ড লাভ্লি নামের গায়ের রং ফর্সা করার ক্রিম খুব প্রচলিত উপমহাদেশে (সম্প্রতি তারা নিজেদের খোলস পাল্টে ‘গ্লো এন্ড লাভ্লি’ নাম ধারণ করেছে, কিন্তু ভিতরের পদার্থ একই আছে)। অবশ্য জেনেটিক কারণে পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের রং উজ্জ্বল ও ফর্সা। ভারতীয় অঞ্চলের মানুষদের এই ফর্সা-চামড়া প্রীতির কারণ হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসনের কুফল ও মানুষের ভেতর ব্যাপক অশিক্ষা ও কুসংস্কার। শুধু সাধারণ মানুষ নয় সিনেমার অভিনেত্রীরাও আজকাল গায়ের চামড়া সাদা করতে শুরু করেছে। বলিউড অভিনেত্রী কাজল তাঁর শ্যামলা ত্বকের সৌন্দর্যের জন্য ‘ডাস্কি বিউটি’ নামে পরিচিত ছিলেন কিন্তু তিনিও তাঁর সৌন্দর্যে সন্তুষ্ট হতে না পেরে স্কিন ব্লিচিং বা চামড়া সাদা করেছেন যাতে তাঁর আগের সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। আসলে অশিক্ষা উপমহাদেশের সর্বস্তরে, সব পেশার মানুষের মধ্যেই বিরাজমান, তাই এইসব মূর্খরা না জেনে বুঝে নিজের ত্বকের রং সাদা করার জন্য স্কিন ব্লিচিং, নাক খাঁড়া করার জন্য প্লাস্টিক সার্জারি ইত্যাদি বিউটিফিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে যাচ্ছে যা আসলে মানুষের আসল সৌন্দর্য নষ্ট করে দিচ্ছে। তাই মানুষকে চামড়ার রং কেন ভিন্ন হয় সে সম্বন্ধে জানানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের সৌন্দর্য নিয়ে হীনমন্যতায় না ভোগে।

কেন আমাদের গায়ের রং ভিন্ন ভিন্ন হয়?

মানুষের পূর্বপুরুষরা নিরক্ষীয় অঞ্চলের কত কাছে বসবাস করতেন তাঁর উপরে নির্ভর করে মানুষের গায়ের রং কিরকম হবে। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি ত্বকের জন্য ক্ষতিকর এবং এই রশ্মির অধিক প্রভাবে ত্বকের ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। নিরক্ষীয় অঞ্চলের যত কাছে মানুষ বসবাস করে তত বেশী এই রশ্মির তীব্রতা থাকে এবং এর জন্যে ত্বকের সুরক্ষার দরকার হয়।

নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে দূরে যেসব মানুষের বসবাস, এই যেমন ধরুন নরওয়ে কিংবা সুইডেনে, সেখানে কিন্তু অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাব কম। সেইসব অঞ্চলে ত্বকের জন্য সুরক্ষার দরকার কম হয় এবং সেই অঞ্চলের মানুষের ত্বকে মেলানিন নামক উপাদান কম থাকে।

আমাদের শরীরে এই মেলানিন নামক পদার্থ থাকে, যা ত্বকের উপর একটি আবরণী সৃষ্টি করে। মেলানিন ত্বকের উপর সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ছাতার মত সুরক্ষা দেয়। ত্বকের মেলানিন তৈরি হয় সূর্যের উপর এই রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে। তাই স্কিন ট্যান কোন সুস্থ ত্বকের লক্ষণ নয়, বরং সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির ক্ষতিকর প্রভাবের ফল। 

স্কিন ব্লিচিং বা চামড়া ফর্সা করার প্রক্রিয়াঃ

কালো চামড়াকে অবজ্ঞা করার কারণে বাজারে নতুন নতুন রং ফর্সা করার নানান প্রসাধনী বের হয়। শুধু তাই নয় স্কিন ব্লিচিং এর জন্য নতুন ট্রিটমেন্টও এখন বাজারে চলে এসেছে। কিন্তু এই স্কিন ব্লিচিং কি আদৌ ত্বকের জন্য উপকারী?

স্কিন ব্লিচিং বা চামড়া ফকফকে সাদা করার জন্য যেসব পদার্থ ব্যবহার করা হয় তা খুবই বিষাক্ত। বিভিন্ন ধরনের ধাতু ব্যবহৃত হয় এই ট্রিটমেন্ট-এ যেমন- মার্কারি। এমনকি ফর্সা-ত্বক প্রত্যাশীদের চামড়ায় অতিমাত্রায় স্টেরয়েড ব্যবহার করেন ত্বকের চিকিৎসকরা, যা কিনা ত্বকের নানান সমস্যা সৃষ্টি করে।

আরেকটি খুব বেশী মাত্রায় ব্যবহৃত উপাদানের নাম হচ্ছে হাইড্রোকুইনোন। এই উপাদান যদি দীর্ঘদিন ত্বকে ব্যবহার করা হয়, তবে ত্বকে গাড়-বাদামী ছোপ ছোপ দাগ দেখা যাবে। তাঁর মানে ত্বক ফর্সা করতে গিয়ে উলটো ত্বকে কালো ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হবে।

এই হাইড্রোকুইনোন কিভাবে কাজ করে? এই উপাদানটি ত্বকের মেলানোসাইট নামক কোষ, যেটি কিনা মেলানিন উৎপাদন করে, সেই কোষকে ধ্বংস করে দেয় এবং ত্বকে মেলানিন উৎপাদন অনেক দ্রুত কমে যায়। ফলে আপনি পাবেন ধবধবে সাদা দুধে-আলতা গায়ের রং!

আমেরিকার এফডিএ, যারা ঔষধ অনুমোদন দেয়, তারা প্রেসক্রিপশন-এর বাইরে কোন ধরনের স্কিন ব্লিচিং ক্রিম ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছে।

স্কিন ব্লিচিং-এর ফলে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় তা হলঃ

  • চামড়ার সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • অবসন্নতা
  • আলোর প্রতি অতি-সংবেদনশিলতা
  • চামড়ায় চুলকানি 
  • চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া
  • চামড়ায় এলারজি দেখা দেওয়া
  • ভাগ্য খুব খারাপ হলে মার্কারি বিষক্রিয়াতে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া

তাই আসুন এই চামড়া সাদা করা বাদ দিয়ে নিজের মন-মানসিকতা উন্নত ও উদার করি এবং উন্নত মানসিকতার কিন্তু কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই!

 

তথ্যসুত্রঃ

১) https://www.theguardian.com/world/2018/apr/23/skin-lightening-creams-are-dangerous-yet-business-is-booming-can-the-trade-be-stopped

২) https://spokesman-recorder.com/2018/03/14/why-changing-your-skin-color-is-a-common-but-dangerous-move/

৩) https://www.healthline.com/health/skin-bleaching#side-effects