লিখেছেন: মাহিন মাহমুদ

প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ধর্মগুলো যদিও দাবি করে মানুষকে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তার আইন মেনে চলতে হবে, নিজের প্রবৃত্তি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা যাবে না। তাদের এই দাবির কারণ, মানুষ যদি নিজের নিজের প্রবৃত্তি অনুসরণ করে চলে তবে তা মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে আনে। তাই এই প্রবন্ধে আমরা দেখব, ধর্মগুলি কি আদৌ মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করে নাকি ধর্মীয় আইনগুলিই আসলে প্রবৃত্তির অনুগামী?  

প্রিয় পাঠক, আপনারা যদি  ধর্মীয় আইন নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন, ধর্মের আইনগুলো অধিকাংশই প্রবৃত্তি নির্ভর, যুক্তি নির্ভর নয়। উদাহরণস্বরূপ, পুরুষের বহুবিবাহ একটি প্রবৃত্তি নির্ভর আইন যেখানে পুরুষের বহুগামী প্রবৃত্তিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে কিন্তু নারীর বহুবিবাহ-কে নিষিদ্ধ করে নারীর বহুগামী প্রবৃত্তি-কে দমন করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত যে নারীরাও বহুগামী।(১) (২) (৩) পাঠক আবার ভাববেন না আমি নারীর বহুগামিতা-কে সমর্থন করছি। তাছাড়া নারী বা পুরুষের বহুগামিতা-কে যদি যুক্তি দিয়েও বিচার করি তবে আমরা দেখব সমাজ-কে তা শুধু বিশৃঙ্খলা ও বৈষম্যের দিকে নিয়ে যাবে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞান আমাদের এটাই দেখিয়েছে যে, আদিম কালে সম্পদ আহরণকারী পুরুষরাই বহুগামিতায় লিপ্ত হওয়ার ক্ষমতা রাখত আর গরীবরা নিঃসঙ্গ থেকে যেত। 

আরও একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ধর্মীয় আইন আমাদের বলে ব্যাভিচারি-কে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে কিংবা কঠিন শাস্তি প্রদান করতে। এই ধরনের আইনও কিন্তু প্রবৃত্তি নির্ভর আইন। কোন পুরুষ বা নারীকে ব্যভিচার করতে দেখলে আমাদের খারাপ লাগার কারণ হচ্ছে যৌন ঈর্ষা। সমাজের যেসব পুরুষ ভালবাসা থেকে উৎসারিত দৈহিক মিলনের বিরোধী, তাঁরা ব্যভিচারীর উপর ক্ষিপ্ত হন কারণ সমাজ মনে করে, মানুষ যদি সমাজে ভালবাসাজনিত দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় তবে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি অকেজো হয়ে পড়বে। বিয়ের কাজই হচ্ছে প্রতিটি পুরুষের জন্য কমপক্ষে একটি নারী সঙ্গী বরাদ্দ করা। যদি সমাজে কোন একটি বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক কে মেনে নেয়া হয় তবে আরও অনেক নারী-পুরুষ এতে আগ্রহী হবেন। এতে করে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি তখন ঐচ্ছিক হয়ে পড়বে। তখন দেখা যাবে যেসব পুরুষ প্রেমভালবাসা করতে অপটু তাঁরা কোন নারী সঙ্গী পাবেন না এবং এই বাস্তবতা কিন্তু আমরা ইউরোপ ও আমেরিকা-তে অহরহ দেখতে পারব। অনেক পুরুষ আছেন যারা মেয়েদের সাথে কথা বলতে সাহস পান না, লজ্জা ও ভয়ে কুঁকড়ে যান, ভাল লাগার কথা মুখ ফুটে বলতে পারেন না, তাঁরা সারা জীবন ভার্জিন থেকে  যাবেন(যদি না এরা বেশ্যা গমন না করে থাকেন)। তাই পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক কোন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপদস্বরূপ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যান্ত্রিক যৌনতায় বিশ্বাসী কারণ এটা অনেক বেশী সহজলভ্য। পয়সা থাকলেই পতিতালয়ে যেতে পারেন একজন পুরুষ, পয়সা আরও বেশী থাকলে দুই-তিনটি বিয়েও করতে পারেন। কিন্তু সারা জীবনে একটি প্রেম করা এইসব পুরুষদের পক্ষে সম্ভব নয়। এইজন্যই পুরুষতান্ত্রিক ধার্মিক সমাজে ধর্ষণ বেশী হয়, কারণ পুরুষের সেই যান্ত্রিক যৌন আচরণ। একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা একজন মানবতাহীন পুরুষের পক্ষে খুব সহজ, কিন্তু সেই পুরুষকে যদি বলা হত ঐ নারীটির মন জয় করে তাঁর সাথে দৈহিক মিলন করতে, তবে কিন্তু ধর্ষকামী পুরুষ তা কখনওই পারত না। প্রেম করতে সৎ সাহস লাগে আর ধর্ষণ করতে লাগে দুঃসাহস। তাই দেখতে পাবেন, পুরুষতান্ত্রিক ও ধার্মিক সমাজ ধর্ষণ নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নয় বরং তাঁরা প্রেমিক-প্রেমিকাকে চুম্বনরত অবস্থায় দেখলে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাঁদের হেনস্থা করতে থাকে। বিভিন্ন ধর্মীয় পণ্ডিতরা ধর্মীয় সম্মেলনে প্রেমের প্রতি বিষোদগার করতে থাকেন কারণ প্রেম যদি একবার সমাজে সম্মানের চোখে দেখা শুরু হয় ও তা সেই সমাজের সংস্কৃতি-তে জায়গা করে নেয়, তবে ধর্ষকামী পুরুষদের পক্ষে দৈহিক চাহিদা মেটানোর মত কোন নারী জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ধার্মিকরা নাস্তিকদের হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন, কারণ ধর্ম-এ কোন অবিশ্বাসী যদি ধর্মের সমালোচনা করেন তাঁকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই ধর্মীয় বিধানটি কিন্তু সম্পূর্ণ মানুষের মনের আদিম ধ্বংসাত্বক প্রবৃত্তি কারণ আদিম মানুষেরা তাঁদের বিরোধী কোন গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকত এমনকি সুযোগ পেলে গুপ্তহত্যাও করত। এই প্রবৃত্তি দ্বারাই অনুপ্রাণিত ধর্মগুরুরা এই ধরনের প্রবৃত্তি নির্ভর আইন চালু করেছিলেন। একজন যুক্তি নির্ভর মানুষ কখনওই পারে না বিপরীত যুক্তি দেয়া মানুষকে হত্যা করতে, কারণ সে জানে মত প্রকাশ কোন অপরাধ নয়। স্বাধীন মত প্রকাশ যদি অপরাধ হয় তবে মানুষ কখনওই চাইবে না মুখ ফুটে নিজের কথা বলতে, এতে করে সমাজের ক্ষতি হবে। হত্যা করে কখনওই ভিন্নমতকে ভুল প্রমাণিত করা যায় না বরং মানুষ হত্যাকারী-কেই সন্দেহ করে এবং নিহত মত প্রকাশকারীদের লেখা পড়তে উৎসাহিত হয়। কিন্তু ধার্মিকেরা হত্যা করা ছাড়া অন্য কোন উপায় অবলম্বন করতে জানে না। এর কারণ লেখকদের হত্যা করতে না পারলে ধর্মের  প্রবৃত্তিনির্ভর মানবতাবিরোধী আইনগুলো সামান্য যুক্তির ভারেই অকেজো প্রমাণিত হয়ে যায়। তাই ধার্মিকদের-কে ধর্মীয় আইনে উৎসাহিত দেয়া হয় যে, “যত বেশী পার নাস্তিক কতল কর!” অন্য ধার্মিকেরাও এতে উৎসাহ দেয়  এবং মনে করে তাঁদের ধর্ম বুঝি বেঁচে গেল!

ধর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বর্গের লোভ ও নরকের ভয়। আদিম কাল থেকেই মানুষের মনে মৃত্যুর প্রতি ভয় কাজ করত এবং এখনও সেই প্রবৃত্তি শক্তিশালী। মানুষ চায় অমর হতে এবং সীমাহীন সুখ ভোগ করতে। লোভ মানুষের একটি ক্ষতিকারক প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তির কারণেই মানুষ পৃথিবীতে নানা দুর্নীতিতে, খুন-খারাপিতে লিপ্ত হয়। ধর্ম এই প্রবৃত্তি-কেই কাজে লাগিয়ে স্বর্গ ও নরকের সৃষ্টি করে। যেকোন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে শাস্তি-কে ভয় পাওয়া যেহেতু তা কষ্টদায়ক। লোভ ও ভয় এই দুই আদিম ও অকৃত্রিম প্রবৃত্তির উপরেই ধর্ম আজ মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখছে। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতি তাই ধরম-কে আশ্রয় করে টিকে আছে, কারণ এই পরকালের লোভ ও ভয়-কে কাজে লাগিয়ে খুব সহজে ক্ষমতায় টিকে থেকে দুর্নীতি করা যায়, কিন্তু সত্যিকার মানুষের উন্নতির  জন্য কাজ করা অনেক বেশী কষ্টের। এইসব অসৎ রাজনীতিবিদরা ব্যাক্তি জীবনে আসলে নাস্তিক, জনগণের জন্য পরিশ্রম করতে তাদের কষ্ট লাগে। তাই ধর্ম-ই তাদের সহজে ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার।

এরকম প্রত্যেকটি ধর্মের আইনগুলি আমি বিশ্লেষণ করে দেখাতে পারি তাঁদের অধিকাংশ-ই মানব প্রবৃত্তি নির্ভর, কিন্তু তাঁর ভার আমি পাঠক-কেই দিতে চাই কারণ পাঠক-কে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া আমি পছন্দ করি না। পাঠক নিজেই ধর্মগ্রন্থগুলি পাঠ করুক এবং নিজের বিচার বুদ্ধি ব্যবহার করতে শিখুক।

এখন কোন কোন পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে ধর্ম কেন প্রবৃত্তি নির্ভর আইন বানাল? এর উত্তর হচ্ছে যেই সময় ধর্মগুলি মানুষ সৃষ্টি করেছে, সেই সময় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যুক্তি দিয়ে সমাজ পরিচালিত হত না। মানুষ তখন তাদের প্রবৃত্তির উপর নির্ভর করত। কোন কোন ভাল প্রবৃত্তি দিয়ে বানানো ধর্মীয় আইন, যেমন ধরা যাক- সবসময় সত্য কথা বলবে, গুরুজনদের সম্মান করবে ইত্যাদি মানুষের উপকারেই এসেছে। কিন্তু মানুষ যেহেতু মানসিকভাবে আদিম ও মধ্যযুগে নাবালক ছিল তাই তাঁদেরকে খারাপ প্রবৃত্তির উপরও নির্ভর করতে হয়েছে। এখন দেখুন পাঠক, নতুন কোন প্রভাবশালী ধর্ম আর তৈরি হচ্ছে না। কোন ভণ্ড ধর্মীয়গুরু বা নেতারা ধর্ম বানানোর চেষ্টা করলেও বিজ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে তাদের মুখোশ খুলে দেয়া যাচ্ছে। পুরনো ধর্মের অনুসারীরাই কেবল দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে অর্থ ও ক্ষমতার জোরে।

তাই আমরা দেখতে পারছি যে, ধর্মের খুব কম আইন-ই আছে যেগুলো যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ধর্ম মুখে মুখেই বলে, তাঁদের আইন সৃষ্টিকর্তা-প্রেরিত মানব মনের পশু প্রবৃত্তিগুলির বিরোধী, কিন্তু গভীরভাবে একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবেন, ধর্ম নিজেরাই আসলে মানুষের পশু প্রবৃত্তির বাইরে যেতে পারে না। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সমাজ কখনো ধর্মের অপরিবর্তনীয় আইন দ্বারা দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব হয় না, একদিন না একদিন ঐ সমাজ হয় ধর্ম থেকে বেরিয়ে এসে বিজ্ঞান ও যুক্তির পথে চলতে শুরু করবে, নয়ত পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মত  ব্যর্থ, দরিদ্র ও মানবিক মুল্যবোধহীন নরক্তুল্য রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

তথ্যসুত্রঃ

১) R. R. Baker, & , M. A. Bellis, Human sperm competition: Ejaculate manipulation by females and a function for the female orgasm, Animal Behavior, 46, 887–909.

২) Women choose symetrical men as affair partmers more than asymetrical men – quoted on Randi Thornhil‘s most important finding, (Ref. David Buss, The Evolution Of Desire – Revised 4th Edition, Basic Books , 2003)

৩) Sarah Blaffer Hrdy, Empathy, Polyandry, and the Myth of the Coy Female, in Ruth Bleier, ed., Feminist Approaches to Science, New York: Pergamon, pp. 119-146, 1986