লিখেছেন: মাহিন মাহমুদ

এনলাইটেনমেন্ট হচ্ছে এমন একটি দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন যেটা সপ্তদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপে খুব প্রভাবশালী ছিল। আজকের আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি হল এই এনলাইটেনমেন্ট আন্দোলন যা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে সমাজের উন্নয়নের মূল হাতিয়ার বলে চিহ্নিত করে। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট শুরু হয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে। আইজ্যাক নিউটনের মত বিজ্ঞানীরা এবং জন লকের মত দার্শনিকরা পুরনো সমাজ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে থাকেন তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ ও গতির সূত্র পৃথিবীকে প্রাকৃতিক সূত্র দ্বারা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, যদিও এর আগে কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিও চেষ্টা করেছিলেন ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে বৈজ্ঞানিকভাবে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করার, কিন্তু নিউটনই প্রথম গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হন। অপরদিকে দার্শনিক জন লক ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই তাঁর লেখার মধ্যে জোরালো ভাষায় দাবি করতে থাকেন যে, যদি কোন সরকার জনগণের জীবনের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় কোন কাজ করতে পারে না, সেই সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার অধিকার জনগণের আছে। সেই সময়টাতে সাধারণ জনগণও সন্দেহ করতে আরম্ভ করে ঈশ্বরের অস্তিত্বে; যেই ঈশ্বরের নাম ভাঙ্গিয়ে চার্চ ও রাজ-পরিবার তাঁদেরকে শাসন ও শোষণ করে আসছে, সেই ঈশ্বর বলে আদৌ কিছু আছে কিনা। জনগণ ভাবতে শুরু করল, “এতদিন ঈশ্বরের দ্বারা নিজেদের চিরন্তন ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করে আসছিলেন যেই অত্যাচারী রাজারা আর দিন-রাত শুধু আমাদের নরকের ভয় দেখিয়ে আসছিলেন, সেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব যদি না থাকে, তবে কেন এইসব রাজাদের শাসন ও চার্চকে আমরা মানব?”। ধর্মের আসল উদ্দেশ্য ও শাসকগণের ধর্মকে ব্যবহার করে সহজ-সরল মানুষকে শোষণের কারণ যখন ইউরোপের মানুষ বুঝতে শুরু করল, সেই তখন থেকেই ইউরোপ চিরদিনের জন্য বদলে গেল।

ধর্মগুরুরা মানে চার্চের যাজকরা বিপদ বুঝে তখন নিজেদের পুরনো কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারনা বদলাতে লাগলেন। নতুন নতুন দার্শনিক ও রাজনৈতিক মতবাদ দিতে শুরু করলেন ইউরোপের বুদ্ধিজীবী মহল। জন লক, ডেভিড হিউম, মন্তেস্কু, থমাস হবস, জ্যা জ্যাক রুশো, ভলতেয়ার প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক মতবাদ দিয়ে রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করলেন। জন লক বললেন যে, যেই সম্রাট ইংরেজ জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে পারে না তাঁকে সরিয়ে দেয়ার অধিকার জনগণের আছে। দার্শনিক রুশো তাঁর বিখ্যাত ‘সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট’ বইতে বললেন যে, সমাজ সব জনগণের সাধারণ ইচ্ছার ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে। ফরাসি দার্শনিক মন্তেস্কু ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ দিলেন, এর মানে হল রাজা বা মন্ত্রীর মত এক ব্যাক্তির হাতে সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা চলবে না। নির্বাহী, বিচারিক ও প্রশাসনিক- এই তিন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দিতে হবে। আমেরিকার বুদ্ধিজীবীরা এই ধারণাগুলিকে গ্রহণ করে আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্র গঠনের সময় প্রয়োগ করেন। আমেরিকার প্রতিনিধিগণ ইউরোপের রাজনৈতিক নতুন নতুন ধারনাগুলি ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের সময় ব্যবহার করেন। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পুরো ভুমিকাতেই থমাস জেফারসন জন লকের রাজনৈতিক মতবাদ তুলে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান এনলাইটেনমেন্টের মৌলিক ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তাঁর রচনায় এনলাইটেনমেন্টের মূল ধারণাগুলিকে সহজ ভাষায় তুলে ধরেন যাতে সাধারণ মানুষ পড়ে বুঝতে পারে।

ছবি: ইন্টারনেট থেকে

ইউরোপে আগে রাজত্ব করতেন চার্চের যাজক ও রাজারা; যারা দোহাই দিতেন বাইবেলের ঈশ্বরের, যিনি সমসময়ই জনগণের উপর ক্ষেপে আছেন। এনলাইটেনমেন্টের বুদ্ধিজীবীরা জনগণের চোখ খুলে দেন ও ইউরোপকে এই কাল্পনিক বদমেজাজি ঈশ্বর থেকে মুক্তি দেন। রাজারা আর ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে ক্ষমতা ভোগ করতে পারল না। দার্শনিকরা জনগণকে বোঝালেন যে, বিজ্ঞান ও যুক্তি দিয়েই জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা যায়। দার্শনিকরা মানবিক মূল্যবোধকেই তাঁদের লেখালেখিতে তুলে ধরেন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ যে মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের পথে বাধাস্বরূপ তাঁরা তা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, এই বুদ্ধিজীবীরা খুবই স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন, অর্থ বা ক্ষমতার লোভে শাসকগোষ্ঠীর দালালি করেননি। সৎ বুদ্ধিজীবীদের জন্যই ইউরোপ এনলাইটেনমেনটের মাধ্যমে এমন যুগে প্রবেশ করেছিল যা আজকের আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি স্বরূপ। এনলাইটেনমেনটের যুগকে ‘এজ অফ রিজন’ বা যুক্তির যুগও বলা হয়।

আমাদের দেশে এরকম যুগ যে কবে আসবে কে জানে?

 

তথ্যসুত্রঃ
১. Outram, Dorinda (2006), Panorama of the Enlightenment, Getty Publications, p. 29, ISBN 978-0892368617
২. “The Age of Enlightenment: A History From Beginning to End: Chapter 3”. publishinghau5.com. Archived from the originalon 3 March 2017. Retrieved 3 April 2017.