বর্তমান সময়ে সাঈদির স্থান  নিয়েছেন মিজানুর রহমান আজহারি। তাঁর একটা ভিডিও দেখলাম ফেইসবুকে। অবাক হয়ে দেখলাম প্রায় ১২ মিনিটের এই ভিডিও সম্পূর্ণটাই মিথ্যাচার।  ভেবে দেখলাম এই অশেষ বিনোদন থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা ঠিক হবেনা। এই ভিডিও এর ফেইস বুক লিংক এটা, ওখানে প্রায় সাতচল্লিশ হাজার রিয়েক্ট আর ৬ হাজারের মত মন্তব্য পড়েছে!

ভিডিওটি  নিচে দিলাম-

ভিডিও এর ২ মিনিট ১৫ সেকেন্ড থেকে দেখেন। মোটামুটি তিনি যা বলেছেন তা সংক্ষেপে বলছি-

আমেরিকায় একটা কনফারেন্স হয়েছিল, পৃথিবীতে যত ধর্মগ্রন্থ আছে তার সবগুলো থেকে ১০ মিনিট করে আবৃত্তি করা হবে। এই কনফারেন্সের উদ্দেশ্য ছিল এটা চেক করা যে কোন ধর্মগ্রন্থের আবৃত্তি সবচেয়ে চমৎকার হয়।  দশ মিনিট করে সময়, সবাই বসেছে। বিচারকের সামনে দুটি বাটন, সবুজ বাটন আর লাল বাটন। সবুজ বাটনে চাপ দিলে আবৃত্তি শুরু, লাল বাটনে চাপ দিলে আবৃত্তি শেষ।  প্রথমে শুরু হল গীতা পাঠ, সেটা যথারীতি দশ মিনিট পরে শেষ, এরপর ডাকা হল ত্রিপিটক, সেটাও যথারীতি শেষ।  এভাবে দশাতির, এরপর গ্রন্থ সাহেব, এরপর জেন্দাবেস্তা। এরপর ডাকা হল পোপকে বাইবেল পড়ার জন্য।  এই পোপ ভ্যাটিক্যান সিটিতে থাকে।  দশ মিনিট।  সবশেষে এলো মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কোরানের পালা, আসলেন মিশরের ক্বারি আব্দুল বাসিত।   এই ক্লিন শেভড ক্বারি কোরান পড়া শুরু করলে বিচারকরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে দশ মিনিট শেষে লাল বাটনে ক্লিক করার কথা ভুলে গেলেন।  এভাবে ১৫ মিনিট, ২০ মিনিট, ২৫ মিনিট, ৩০ মিনিট হয়ে গেল, লাল বাতি চাপে না। এটা দেখে অর্গানাইজিং কমিটির প্রধান চেয়ার থেকে উঠে এসে বিচারকদের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলে, …What’s the hell are you doing here? What’s wrong with you? লাল বাতি চাপস না ক্যান? ধাক্কা দেয়ার পর বিচারক ভুত দেখার মত চমকে উঠে বলে, কী, লাল বাতি, নীল বাতি, কোন বাতি! হুস নাই! ওর হুস নিয়া গেছে কে?  আবার আব্দুল বাসিতের তেলাওয়াতের দিকে তাকিয়ে আবার বেহুশ। না পেরে বিচারক দাঁড়িয়ে বলে, ও আব্দুল বাসিত, তোমার জন্য কোনো টাইম লিমিট নাই, যত মনে চায় পড়ে যা।  এভাবে ৪০ মিনিট সময় নিয়ে সুরা আর রহমান তেলাওয়াত করলেন।  শেষে ঐ বিচারকের উপর তিনটি মামলা হল। যেহেতু আন্তর্জাতির কম্পিটিশন, তাই আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা, সুইজারল্যান্ডের দি হেগে মামলা। হ্যান্ডকাপ পরিয়ে বিচারককে নেয়া হয়েছে।  পরে ঐ বিচারককে কোরানের প্রতি এহেন পক্ষপাতিত্ব নেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হল। বিচারক ব্যাখ্যা দিলেন – যখন জোব্বা পরা আব্দুল বাসিত মাইকের সামনে এসে কী যে একটা টান দিলেন, এর সাথে সাথে আমার হুশ নাই। আমি কী সাগরের উপর, নাকি মহাশূন্যে, নাকি জমিনের অতল গহ্বরে, আমি কোথায় বসে আছি, আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, আমি নিজেই জানি না, আমার সময়ের কোনো জ্ঞান নাই, আমার হিতাহিত বুদ্ধি নাই, আমার নার্ভাস সিস্টেম ফল ডাউন করেছ। আমার শরীরে ভাইব্রেশন শুরু হয়েছে, কাঁপুনি শুরু হয়েছে। এই ব্যাখ্যায় সেই  বিচারক উদ্ধার পান।  বেকসুর খালাসের ব্যবস্থা এই বিচারককে করে দিয়েছে কে? উপস্থিত জনতা জবাব দিল, আল্লাহ!

৫মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের পরে আজহারি কোরান হাতে নিলেন, ৮ মিনিটে গিয়ে উপস্থিত জনতা আর আবেগ ধরে রাখতে পারে নি, শ্লোগান দিতে শুরু করে।  শুধু কমন সেন্স ব্যবহার করে এই বক্তব্যের মিথ্যাচার বুঝা সম্ভব:

১। যেখানে মুসলমানদের পক্ষ থেকে একজন ক্বারি আব্দুল বাসিত এই প্রতিযোগিতায় গেলেন সেখানে তাঁর বিপরীতে স্বয়ং পোপ চলে এসেছেন বাইবেল পড়তে।  আব্দুল বাসিত একজন ক্বারি মাত্র, তাঁর যোগ্যতা হচ্ছে তিনি কোরান শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন, তিনি এমনকি আলিমও না (আমি নিজেও একজন ক্বারি)।  আবার এটি এমন একটি প্রতিযোগিতা যেখানে সবুজ বাতি আর লাল বাতিও রয়েছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে যেমন বাচ্চাদের  নাচ, গান, বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়।   ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মগুরু হচ্ছেন পোপ, তিনি সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটির রাষ্ট্রপ্রধান, তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয় কোন দেশ ভ্রমণে গেলে। এসব  বেনামি-উদ্ভট প্রতিযোগিতায় তিনি নেমে পড়বেন, এটা কীভাবে সম্ভব?  যদি কাবার ইমাম মুসলমানদের পক্ষে থাকতেন তাহলে এমন কল্পনা নাহয় একটু মেনে নেয়া যেত।

২।  এরকম প্রতিযোগিতা কি আদৌ সম্ভব?  প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের আলাদা আলাদা  পঠন-শৈলী আছে যা না বুঝলে এর মধ্যে কী মাধুর্য আছে তা বুঝা অসম্ভব।  অথচ মাত্র একটি ধর্মগ্রন্থ ঠিকমত পড়া শিখতে প্রচুর সময় লেগে যায়, একেকটা ধর্মগ্রন্থ আবার একেক ভাষায়।  আপনি স্প্যানিশ ভাষার গানের সাথে বাংলা গানের  একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন?  সবচেয়ে বড় কথা, ওখানে কী যোগ্যতায় বিচারক নির্ধারণ করা হয়েছিল?

৩। এবার শোনেন আব্দুল বাসিতের কণ্ঠে সুরা আর রহমানের তেলাওয়াত এই লিংক থেকে। জ্ঞান হারালে কিন্তু আমি দায়ী না, হাহ হা।  বাসিতের তেলাওয়াত বিখ্যাত, কিন্তু আপনি আমাদের দেশের অসংখ্য ক্বারি পাবেন যাদের কণ্ঠ তাঁর চেয়ে ভাল শোনায়।   কণ্ঠ বা সুমধুরতা কোন ধর্মগ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেনা। আপনি যদি গজবের আয়াত যেখানে বলা হয়েছে, ইসলামে অবিশ্বাস করায় চিরদিন জাহান্নামে জ্বালানো হবে, জাহান্নামে পুঁজ খাওয়ানো হবে, (এরকম অরুচিকর আয়াত আসলেই আছে) – এগুলো সুর করে পড়লে কেমন আজব লাগে তা বুঝতে পারতেন যদি আরবি ভাষা কিছুটা জানতেন।

৪। প্রতিযোগিতায় নির্দিষ্ট সময় বরাদ্ধ থাকলেও বিচারক ইচ্ছা করলে সে সময় বাড়াতে পারেন, এটা অন্যায় নয়, অপরাধ তো নয়ই।

৫। জরথ্রুস্টবাদিদের দুটি ধর্মগ্রন্থ কিভাবে পাঠ করা হল? –  জেন্দাবেস্তা ও দশাতির। দশাতির ধর্মগ্রন্থটিকে গুরুত্ব দেয়া হয়না, মনে করা হয় এটি মাত্র ৩ বা ৪শ’ বছর আগে জালিয়াতি করে তৈরী করা হয়েছিল।

৬। সে অপরাধে মামলা হল আন্তর্জাতিক আদালতে, হাহ হাহ হা! আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা কী নিয়ে হয় সে ব্যাপারে আজহারি যদি একটু জানতেন! আন্তঃরাষ্ট্রীয় ইস্যু, গণহত্যা এসব গুরুতর ব্যাপার রেখে আন্তর্জাতিক আদালত ঐ ধর্মগ্রন্থ পাঠ প্রতিযোগিতার বিচারকের বিচার করবে। এমন আজব কিছু কখনো শুনেছেন?  ঐ বিচারককে নাকি হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে সেখানে নেয়া হয়েছিল!

৭। আন্তর্জাতিক আদালতের সদর দপ্তর দা হেগ নেদারল্যান্ডে, সুইজারল্যান্ডে নয়। শ্রোতাগণ যখন আহম্মক হয় তখন তথ্যগত ভুল কোন ব্যাপারই না।

এতগুলো কথার মধ্যে ঠিক কোন কথাটি তিনি সত্য বলেছেন? খুঁজে দেখেন তো!

এবার ভিডিও এর একদম প্রথম থেকে শুনেন। সংক্ষেপে বলছি

মক্কায় একটি এজুকেশন কনফারেন্স হয় ১৯৮০ সালে যাতে মরিস বুকাইলি যোগদান করেন। সেখানে তিনি শুনলেন আরব শাইখরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন কোরানে কোন ভুল নাই। আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, পারলে ভুল বের করে দেখাও। বুকাইলি কনফারেন্স শেষে ফ্রান্সে এসে বলে, পৃথিবীর সকল বইয়ে ভুল আছে, আমার বাইবেলে ভিতরেও কত গোজামিল আর কোরানের ভিতরে বুঝি ভুল নাই, আমি মরিস বুকাইলি কোরানের ভুল ধরে ছাড়ব। পরে বুকাইলি দেখতে পেলেন কোরান আরবি ভাষায় লেখা, তিনি ফোন দিলেন সৌদি আরবের এক প্রফেসরকে, বললেন তিনি প্রতি বছর সামারে দুই মাসের ছুটি পান, প্রতি বছর দুই মাস এসে আরবি ভাষা শিখতে চান।   এভাবে কোরানের ভুল ধরার জন্য পাঁচ বছর সেখানে গিয়ে আরবি শেখেন। পাঁচ বছর শেষে তিনি দেখতে পেলেন কোরানের সব কিছু বুঝেন। কিন্তু যতই পড়েন অবাক হোন, পাগল হয়ে যান।  কোরানে মহাশুন্যের কথা,  পাহাড়ের কথা, মরুভূমির কথা, এম্ব্রায়লজি, বোটানি, হিউম্যান এনাটোমি সবকিছু আছে। অথচ বুকাইলি একটা ভুলও খুঁজে পান নি। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নাম রেখে দিলেন সুলাইমান।

সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। মরিস বুকাইলি ১৯৭৩ সালে সৌদি রাজপরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক হিসাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, রাজা ফয়সালের সময়। । তিনি মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের পরিবারের চিকিৎসার দায়িত্বও নিয়েছিলেন।  কোরানকে ভুল প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে তিনি আরবি শিখেন নাই। পেশাগত কারণেই শিখতে হয়েছিল কিছুটা।  আর ৫ বছরে দুই মাস করে আরবি ভাষা তো দূরের কথা, কোরান পড়াই শিখা কষ্ঠকর। আরবি শিখেই কোরান বুঝা যায় না, কোরানের অনেক অনেক শব্দ বর্তমানে প্রচলিত নয়।

মরিস বুকাইলি অত্যন্ত ধান্দাবাজ ধরণের লোক ছিলেন। তাঁর সময়ে ইউরোপে শিক্ষা-দীক্ষার বিস্তারের ফলে খ্রিস্ট ধর্মের লোকেরা বাইবেলে পাওয়া মিরাকলকে গুরুত্ব দেয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। কিন্তু তিনি দেখলেন আরবের মুসলমানরা শিক্ষার ক্ষেত্রে খুবই কাঁচা, আবার ধর্মের ব্যাপারে তাদের রয়েছে ব্যাপক অনুভূতি।  এদিকে আবার রয়েছে রাজপরিবারের অনুগ্রহ পাবার তাড়না। তাই তিনি এক কুমতলব আটলেন।   কোরানকে বিজ্ঞানময় বলে ঘোষণা দিয়ে লেখালেখি ও বক্তব্য দেয়া শুরু করলেন।  কোরানের বিভিন্ন আয়াতের অভিনব ও বিকৃত তফসির হাজির করলেন, বিজ্ঞান বের করেই ছাড়লেন এগুলো থেকে। অথচ কোরানের অসংখ্য তফসির করা হচ্ছে হাজার বছর থেকে, যেগুলো আমরা এখন ইচ্ছা করলেই পড়তে পারি।  সামান্য কয়েক বছর আরবি শিখেই নাকি বুকাইলি কোরানে মহাপন্ডিত হয়ে উঠেছিলেন।  অথচ আমরা পড়লেই কোরানের আয়াতে আয়াতে পাই হাস্যকর ও অবৈজ্ঞানিক ব্যাপারগুলো। কোরানের সাত আকাশ, ছয়দিনে মহাবিশ্ব তৈরী, পানির উপর আল্লাহর সিং হাসন,  খুটি ছাড়া আকাশ ধরে রাখা, আসহাবে কাহাফের কয়েকশত বছর গুহায় ঘুমানো, নুহ নবির ৯৫০ বছর বেচে থাকার কথা বলা হয়েছে। আবার আল্লাপাক জাহান্নামে আগুনে জ্বালিয়ে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি মাঝেমাঝে রোমান্টিকও হয়ে উঠেছেন, সুরা ইউসুফে ইউসুফ জুলেখার রগরগে প্রেম কাহিনীর বিবরণও দিয়েছেন, জুলেখা ইউসুফের প্রেমে অস্থির হয়ে তাঁকে ধরতে গিয়ে তাঁর জামার পেছন দিকটা ছিড়ে ফেলেছিলেন- এসব হাস্যকর ননসেন্সে ভর্তি একখানা গ্রন্থ।  কোরানের কোন কোন আয়াতকে অহেতুক অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। সমগ্র কোরানে যা লেখা হয়েছে তাতে গুরুত্ব বহন করে এমন আয়াত আছে হাতে গোণা, বেশিরভাগই ননসেন্স, এগুলো কোন কাজে লাগে বুঝা মুশকিল। আবার এমন আয়াত স্বয়ং আল্লাপাক কেন নাজিল করলেন তা শিশুকালেও আমি বুঝি নাই। বুকাইলি এসব আয়াত থেকে বের করে দেখিয়েছেন বিজ্ঞান। মুসলমানদের অন্ধকার যাত্রায় এরকম অবদান রাখায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

না, মরিস বুকাইলি কখনো ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তাঁকে ইসলাম গ্রহণ করতে, টুপি মাথায় দিয়ে নামাজ পড়তে কেউ কোথাও দেখেনি।  সৌদি আরবে দীর্ঘদিন থাকলে হজ্ব করেন নি।  নাম পরিবর্তন করে তাঁর নাম ‘সুলাইমান’ রাখা শুধু গুজব নয়, এক উদ্ভট মিথ্যাচার।

প্রায় ১২ মিনিট ধরে এই নির্জলা মিথ্যা কিভাবে বলতে পারলেন আজহারি?

লিখেছেন: ইমরুল ক্বাইস