লিখেছেন: অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

“বাহিরপানে তাকায় না যে কেউ,
দেখে না যে বাণ ডেকেছে
জোয়ার-জলে উঠছে প্রবল ঢেউ” ।

connection with robot in laboratory

রবিবাবুর ‘আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’, একটি ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দবিন্যাস । তবুও, প্রাসঙ্গিক । বাঙালির সমাজে* আজ যাঁরা বুদ্ধিজীবী তকমায় ভূষিত, সাধারণ মানুষ যাঁদের বুদ্ধি-বিবেচনায় আস্থা জ্ঞাপন করেন, এখন তাঁরাও ক্লিশে হয়ে গেছেন । এবং, একইসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক’ও । আর এর একমাত্র কারণ হল, শুধুমাত্র সাহিত্য ও ভাষার অন্দরমহলে বৈদগ্ধ’কে বন্দি করে ফেলার আত্মবিনাশী প্রবণতা । আজও বাঙালি উনিশ শতকীয় নবজাগরণের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি । কেবলমাত্র ডক্টরাল থিসিসে নয়, একদিকে জীবনযাপনের নৈতিক নাক উঁচুপণায় ও অন্যদিকে সুচতুর গোঁড়ামিতে’ও । এ এক অদ্ভুত দ্বিধা জর্জর মানসিক অবস্থান, যা একইসঙ্গে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙাকে নিন্দা করায়, আবার, ‘বেদ-বেদান্ত ভ্রান্ত দর্শন’ বলা নাস্তিক বিদ্যাসাগরকে পরিত্যাজ্য করে রাখে । নইলে, বাল্যবিবাহ বন্ধের লড়াইয়ের দু’শো বছর পরে, NFHS4-এর তথ্যানুযায়ী আজকের পশ্চিমবঙ্গে, ১৫-১৯ বছর বয়সি মেয়েদের মধ্যে ১৮%-এর সন্তান জন্ম দেওয়ার রেকর্ড হয় ? আর পরিসংখ্যানের তালিকার ভিত্তিতে ভারতের মধ্যে এব্যাপারে আমরা দ্বিতীয়স্থানে আছি । এই অন্তর্বৈরিতা’ই বাঙালির অধঃপতনের আসল আত্মঘাতী অভিধা । আশ্চর্য হই এটা ভেবে যে, এই বাংলাতেই দু’বার নবজাগরণ ঘটেছিল – একবার চৈতন্যদেবের আমলে আর অন্যবার ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে যা বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং বৌদ্ধিক চর্চায় ও ব্যক্তিত্ব চর্চায় এনেছিল অভাবনীয় অগ্রসরমানতা। অথচ, আজ মনন জুড়ে শুধুই স্থবির বৈকল্য ও অতীত ভাঙিয়ে পয়সা করার উঞ্ছমনোবৃত্তি ছাড়া আর কোনও লক্ষন অবশিষ্ট নেই ।

নবজাগরণ ছিল একটি সাংস্কৃতিক অভিঘাত যা শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সংগীত, বিজ্ঞান, রাজনীতি, ধর্ম প্রভৃতির আঙ্গিকে এনেছিল মানবতাবাদী উচ্চারণ । প্রচলিত সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকারগুলির বিজয়কেতন উড়িয়েছিল নবজাগরণের অঙ্গীকার । ঐতিহাসিকরা, ইতালীয় রেনেসাঁসকেই সর্বপ্রধান বলে বিবেচনা করলেও, কয়েকজন পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তিত্ব ক্যারোলিংগীয় রেনেসাঁস, অটোনিয় রেনেসাঁস, টিমুরিড রেনেসাঁস, ইসলামী রেনেসাঁসের সঙ্গে বাংলার রেনেসাঁস, তামিল রেনেসাঁসকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন । কিন্তু, এসবই আজ ইতিহাসমাত্র । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবীর বুকে এই ইতিহাসের পালাবদল শুরু হয়েছিল । নিউক্লিয়ার শক্তি ও কম্পিউটারের ব্যবহার এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নজির । নবজাগরণ তো এরকম একটা বিষয় নয় যে, একদিন সকালে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে দেখা যাবে নবজাগরণ হয়ে গেছে । এটা একটা ধীরগতির সামাজিক ও মনস্তাত্বিক রূপবদল । কিন্তু, আজকে তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অকল্পনীয় দ্রুততায় ঘটে যাচ্ছে । আর, এই একুশ শতকের নবজাগরণে মানবতাবাদের পরিবর্তে আত্মপ্রকাশ করেছে ট্রান্সহিউম্যানিজমের ধারণা । প্রশ্নটা হল, ট্রান্সহিউম্যানিজম কী ? ট্রান্সহিউম্যানিজম হল ভবিষ্যতত্ত্বের একটি দার্শনিক প্রবাহ যা সৃষ্টি করতে চায়, নয়া-প্রযুক্তি আর জৈববিজ্ঞানের মিলনে, এক পরমাশ্চর্য মানুষ কিংবা মানবতর প্রজন্ম, যার মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা কোনও প্রাকারে সীমাবদ্ধ নয় । এই হল ভবিষ্যতের বিবর্তনকল্প, আজকের রেনেসাঁসের পদধ্বনি ।  জ্যোতিষের ভন্ডামি নয়, সার্থক সত্য ভবিষ্যতত্ত্বের উচ্চকিত অনাবিল গর্জন, যা উৎস, পরম্পর্য ও কার্য-কারণের ব্যপ্তিতে সফল করেছে কল্পবিজ্ঞনীর স্বপ্নকে । ‘দূরদৃষ্টি’ বা ইংরেজিতে বললে, ‘Foresight’- কথাটি প্রথম বলেছিলেন এইচ জি ওয়েলস, ১৯৩২ সালে । সেখান থেকেই আজকের এই ভবিষ্যতত্ত্বের আমদানি । ওয়েলস, ১৯০১ সালে প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত সৃষ্টি, ‘Anticipations of the Reaction of Mechanical and Scientific Progress Upon Human Life and Thought: An Experiment in Prophecy’ । এরপরেই তিনি The World Set Free-তে কল্পনা করেছিলেন পারমাণবিক বোমার এবং ‘The Shape of Things to Come’-এ তিনি আগামি পৃথিবীর কথা বলেছিলেন । এই ছিল ভবিষ্যতত্ত্বের আদি কথা । এখন সময় অনেক এগিয়ে গেছে । ‘The World Future Society’-এর মত ভবিষ্যপন্থীদের অসংখ্য সংগঠন আছে, লেখা হয়েছে বহু গ্রন্থ, যেমন, পিটার ফ্রাসের ‘Four Futures: Life After Capitalism’, মিশিও কাকুর, ‘The Future of the Mind: The Scientific Quest to Understand, Enhance, and Empower the Mind’ ও রেই কুরজয়েলের ‘The Singularity Is Near: When Humans Transcend Biology’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । প্রাসঙ্গিকতা দাবি করে, ওয়েলস-এর একটি বক্তৃতা, The Discovery of the Future, যা হুয়েশচ্যাস দ্বারা ১৯১৩ সালে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় । এখানে তিনি দু’ধরণের চেতনার কথা বলেছেন । এক ধরণের চেতনা যা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও নিজের অস্তিত্বের ব্যাপারে একেবারেই অপোগন্ড শ্রেণির চেতনা এবং অন্যটি, সংখ্যালঘিষ্ঠদের মধ্যেও এক ক্ষুদ্রতর গোষ্ঠীর চিন্তাস্তর, অর্থাৎ যারা অত্যাধুনিকতম প্রজ্ঞায় ভবিষ্যৎ কল্পনা ও রচনা দুই-ই করে। ওয়েলস বলছেন, “The former type of mind, when one gets it in its purity, is retrospective in habit, and it interprets the things of the present, and gives value to this and denies it to that, entirely with relation to the past. The latter type of mind is constructive in habit, it interprets the things of the present and gives value to this or that, entirely in relation to things designed or foreseen” । যদি খুব স্থূলভাবে বলা হয়, তাহলে, একটা চেতনা রক্ষণশীল বা প্রতিষ্ঠানসম্ভ্রমী যা অতীতকে টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতী এবং আরেকটা, প্রগতিবাদী বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী যা যাবতীয় অনড় অস্তিস্ত্বকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে গড়ে নেয় নতুন সমাজ, নতুন পৃথিবী । এবং এই দু’য়ের সংঘর্ষে অবশ্যম্ভাবী পতন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের এবং পরে এই সংখ্যাগরিষ্ঠরা কুঁইকুঁই করতে করতে এসে আশ্রয় নেয় নতুন দুনিয়াতে। এটাই অতীত দৃষ্টান্ত এবং ভবিতব্যও । কিন্তু কেন এই প্রকট দ্বিত্বতা, সেটা বোঝা খুবই দুষ্কর । কিন্তু যখনই, জীবনে অনিশ্চয়তার পরিবেশে পক্ষ-নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে মন দ্বিধাগামী হয়েছে তখনই যাবতীয় নৈতিকতা, ধর্মীয় আচরণ ও রাজনৈতিক আদর্শবাদের মধ্যে অনির্বচনীয় সংঘাত দেখা দিয়েছে । এই মন্থনে, একদল দোষারোপ করেছে আর ভেবেছে যে, অতীত নিয়মভঙ্গের ফলেই আজকের দোলাচল পরিণতি, অর্থাৎ, “they who break the law at any point break it altogether” । অন্যদল মনে করেছে যে, আজকের কর্মকান্ডই নিশ্চিত করবে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি, “let the dead past bury its dead”।

 

সমাজজীবনের এরকম দ্বিধাথরথর চূড়ে, চুলচেরা বিশ্লেষণে উক্ত দলদুটির মনস্তত্বের অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে জনসমক্ষে মানবিকতর সন্দর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হল প্রকৃত ভাবুকের কর্তব্য । বিদগ্ধের নিদর্শন, সমাজপ্রগতির প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধতা । কিন্তু, আজকে যখন ক্রমাগত এই দুটি চেতনার মধ্যবর্তী মোটা রেখা মুছে দিতে চাইছে রাষ্ট্রশক্তি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার পেশিশক্তিতে দখল করতে চাইছে চেতনার অন্যস্তরের আবাসভূমিগুলিকে এবং ব্যাপক সাফল্যও লাভ করছে, সেখানে ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর প্রায় কিছুই করার নেই আমাদের। এরকম আত্মসমর্পণের চেয়ে মৃত্যু ঢের সম্মানের । উনিশ শতকের ঘৃতঘ্রাণে মগ্ন ও উন্মুক্ত চেতনার প্রতি বক্রদৃষ্টিপ্রবণ বৌদ্ধিকতার লাচার বৈধব্যকে কুর্ণিশ জানাতেই হয়, কেননা, ভূমিকম্প এলেও পূতিগন্ধময় কাব্যের নর্তনকর্দন থেকে এর ফুরসৎ মেলা ভার । অন্যদিকে, বিজ্ঞানের পৃথিবী পৌঁছে গেছে ট্রান্সহিউম্যানিজমে । ১৯২৩ সালে জে বি হ্যালডেন, তাঁর, ‘Daedalus: Science and the Future’-এ সর্বপ্রথম ট্রান্সহিউম্যানিজমের বীজ রোপণ করেন । এবং স্বাভাবিকভাবেই সেটি নিন্দনীয়, বিকৃত, অশ্লীল এবং অপ্রাকৃততার তকমা লাভ করে । পরবর্তীকালে, জুলিয়ান হাক্সলি, যাঁকে ট্রান্সহিউম্যানিজমের প্রবক্তা বলে ধরা হয়, তিনি বলেছিলেন,  “Up till now human life has generally been, as Hobbes described it, ‘nasty, brutish and short’; the great majority of human beings (if they have not already died young) have been afflicted with misery… we can justifiably hold the belief that these lands of possibility exist, and that the present limitations and miserable frustrations of our existence could be in large measure surmounted… The human species can, if it wishes, transcend itself—not just sporadically, an individual here in one way, an individual there in another way, but in its entirety, as humanity.” । অনেকে ট্রান্সহিউম্যানিজমকে, উত্তর-মানবতাবাদ বলেও ব্যাখ্যা করেন । কিন্তু, ট্রান্সহিউম্যানিজম যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে জৈব-বিবর্তনজনিত ইন্দ্রিয়তর উত্তরণের পক্ষে কথা বলে সেখানে উত্তর-মানবতাবাদ কেবলমাত্র জৈব-বিবর্তনের পাশে দাঁড়ায় । ট্রান্সহিউম্যানিজমের অনেকগুলি অঙ্গীকার আছে, যেমন, গণতান্ত্রিক ট্রান্সহিউম্যানিজম, এক্সট্রোপিয়ানিজম, অমরত্ববাদ, উদারপন্থা, উত্তর-লৈঙ্গিকতা, উত্তর-রাজনৈতিকতা, একবচনবাদ, প্রযুক্তিবিদতা ও সাম্যবাদ ইত্যাদি । কিন্তু এটা আসলে মানুষকে প্রকৃতিপ্রদত্ত সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয় ও দানবীয় শক্তিশালী প্রজন্ম প্রসব করে । ট্রান্সহিউম্যানিজম প্রযুক্তি নির্ভর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মানবশরীরের বহিরঙ্গের পরিবর্তনই কেবল করে না, এটা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকেও পালটে দেয় । মানুষের যে পেরিফেরাল স্নায়ুতন্ত্র আছে, যা মস্তিষ্কের মাধ্যমে ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যগুলিকে নির্ধারণ করে, তাকে বদলে দেওয়াই ট্রান্সহিউম্যানিজমের উদ্দেশ্য । ন্যানোপ্রযুক্তি, জৈবপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ইন্দ্রিয়তর বিজ্ঞানের সাহায্যে এটা আজ সম্ভব । এ কাজে মূল সহায়ক, সিমুলেটেড বাস্তবতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অতিমানববুদ্ধি, থ্রি-ডি বায়োপ্রিন্টিং, মাইন্ড আপলোডিং, রাসায়নিক মস্তিষ্ক সংরক্ষণ এবং ক্রোনোনিক্সের মত অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনা। এবং এভাবেই মানবতর জীবের সৃষ্টি সম্ভব হবে নয়, হয়ে গেছে ।

 

নিল হার্বিসন হলেন প্রথম মানুষ যিনি তাঁর মাথায় লাগিয়েছেন একটি অ্যান্টেনা । এর সাহায্যে তিনি কেবল তাঁর জন্মসঙ্গী বর্ণান্ধতাকে পরাজিত করেছেন তাই-ই নয়, তিনি এই অ্যান্টেনার কম্পন ও তরঙ্গের মাধ্যমে এখন উপলব্ধি করতে পারেন, তড়িত-চুম্বকীয় বিকিরণ এবং স্যাটেলাইট প্রেরিত নানা সিগন্যাল ও তথ্যাবলী । তিনি হলে একজন ‘সাইবর্গ’ ।  সাইবর্গ হল, ‘a portmanteau of “cybernetic organism”, is a being with both organic and bio-mechatronic body parts’ । ১৯৬০ সালে ম্যানফেড ক্লিনেস ও নাথান ক্লাইন এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন । এটা কিন্তু বায়োরোবট বা বায়োনিক নয়, একেবারে জলজ্যান্ত মানুষ যিনি প্রযুক্তির ব্যবহারে ইন্দ্রিয়তর মানুষে পরিণত হয়েছেন । ডি এস হ্যালাসি তাঁর, ‘Cyborg: Evolution of the Superman’-এ লিখেছেন, “a “new frontier” that was “not merely space, but more profoundly the relationship between ‘inner space’ to ‘outer space’ – a bridge…between mind and matter” । অর্থাৎ, মানুষ এবং যন্ত্রের মিলনে অন্যতর মানব । এ যেন একেবারে এডগার অ্যালান পো’র ‘দ্য ম্যান দ্যাট ওয়াজ ইউজড আপ’ গল্পের নির্যাস । যদিও পরে ১৯১১ সালে, জ্যঁ দি লা হাইর এনেছিলেন মঙ্গল অভিযাত্রী নিকতালোপকে । সত্যজিতের প্রফেসর শঙ্কুর কাহিনীও এ ব্যাপারে কম যায় না । যাই হোক, কেবলমাত্র নিল নন, এই দলে আছেন বহু মানুষ । যেমন, মুন রিবাস, যিনি পদতলে সিসমিক সেন্সর বসিয়ে দুনিয়ার প্রথম মহিলা সাইবর্গের আখ্যা পেয়েছেন । এর সাহায্যে তিনি ভূমিকম্পের আভাস পান । তাছাড়া, মুন চোখে অত্যাধুনিক ক্যালাইডোস্কোপ লাগিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ঘুরেছিলেন এবং তিনমাস ধরে মানবমুখের পরিবর্তে আকৃতিবিহীন রঙচঙে আনাগোনা দেখেছিলেন । এমনকি তিনি স্পিডোমিটারের ব্যবহারে মানুষের নানাপ্রকার চলনের গতি মেপেছিলেন । পরে তিনি এটাকে কানের দুলের আকারে পড়েন যা তাঁকে ৩৬০ ডিগ্রির ধারণা প্রদান করে । এ দলে আছেন, রব স্পেনস, যিনি একটি দুর্ঘটনায় তাঁর একটি চোখ হারান । কিন্তু বর্তমানে তিনি ওয়্যারলেস ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে নিজের চোখটিকে প্রতিস্থাপন করেছেন এবং এখন তিনি প্রায় টার্মিনেটরের মতই সবকিছুই দেখতে পান । তাই-ই নয়, তাঁর এই থ্রিডি প্রিন্টেড চোখ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিখ্যাত ‘Eye Borg project’ । কেভিন ওয়ারিক বানিয়েছেন একটি রোবটিক হাত যা তাঁর মস্তিষ্কের সিগনালিং-কে অনুসরণ করে নড়াচড়া করে ।  লিজ পারিজ যিনি দ্বৈত-জিন থেরাপির মাধ্যমে বয়সকে কমাতে পেরেছেন । জেমস ইয়ং যিনি মেরুদণ্ডের পেশি-সঞ্চালনের প্রেক্ষিতে একটি হাত বানিয়েছেন ।  বেন গুয়ার্জেল, যাঁর নাম না করলেই নয়, তিনিই ছিলেন আধুনিকতম রোবট সোফিয়ার গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী । এই হল ট্রান্সহিউম্যান ভবিতব্য । নবজাগরণ ছাড়া একে আর কী আখ্যা দেওয়া যায় ? আমরা এক নতুন দুনিয়ার নতুন নাগরিকত্ব পেতে চলেছি ।

 

এখন সবচেয়ে দরকারি কথাটা হল, বর্তমানের কোভিড ১৯ অতিমারীতে ট্রান্সহিউম্যানের ভূমিকা । ক্রিশ্চিয়ানা লিন, টাইমস অফ ইসরায়েলে সদ্যপ্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ “Gene-editing, Moderna, and transhumanism” –এ লিখেছেন যে মডার্নার অভিজ্ঞতার অভাবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণাটি ব্যর্থ হবার সম্ভবনা প্রবল । তবুও এই প্রকল্পে ট্রান্সহিউম্যানিজমের অবিস্মরণীয় ব্যবহার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । মডার্না কোম্পানি আমেরিকায় বায়োডিফেন্স ও ডিফেন্স অ্যাডভান্স রিসার্চ প্রজেক্টে ট্রান্সহিউম্যানিজমের ব্যাপক ব্যবহার করে এম-আরএনএ-এর জিন সম্পাদনা করতে সফল হয়েছিল । সেজন্যই বোধহয় মার্কিন সরকারের এই আস্থা ।  তাছাড়া মডার্নার বিজ্ঞানীরা আহত সৈনিকদের শরীরে রোবটিক্সের মাধ্যমে, অর্থাৎ ব্রেন-টু-কম্পিউটার ইন্টারফেসের দ্বারা, ক্ষতগুলিকে নিরাময় করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও আরও শক্তিশালী অঙ্গে পরিণত করেছিল, করছে । যেন পেন্টাগন এখন সত্যিকারের মার্ভেলস বানাবার পথে এগিয়ে গেছে এবং সফল হয়েছে । এই কাজে চিন ও রাশিয়াও সামিল । ভারতে শুধু এসময় রামমন্দির নিয়ে উদগ্রীব দাপাদাপি দেখা যাচ্ছে। মানুষ আর মেশিনের ঐক্যবদ্ধ মিলনে যেখানে এক অপরাজেয় সৈনিকশাসিত ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে, সেখানে আজকের ভারতের পশ্চাদম্মন্যতা হতাশার জন্ম দিচ্ছে বৈকি । মনে পড়ে যাচ্ছে রাজা নেবুচাদনেজারের স্বপ্নমানবের কথা যাঁর, মাথা স্বর্ণের, বুক এবং হাত রৌপ্যনির্মিত, পেট ও জঙ্ঘা ব্রোঞ্জের, পা-গুলি লোহার এবং পায়ের পাতাদুটি লোহা ও মাটির মিশ্রণে তৈরি । আজকের দুনিয়াতে এই স্বপ্নমানবের বাস্তব রূপই হল ট্রান্সহিউম্যান । দুনিয়া এখন অন্যস্তরে এগিয়ে যাচ্ছে । আর্কটিক অঞ্চলে দ্য সভালবার্ড গ্লোবাল সীড ভল্ট-এ রাখা হচ্ছে দুনিয়ার অত্যাবশ্যকীয় শস্যের বীজগুলিকে । দ্য গিটহাব আর্কাইভ প্রোগ্রাম ২১ টিবির ফিল্মে সঞ্চিত করছে সারা দুনিয়ার যাবতীয় বুদ্ধিমত্তার ডিজিটাল ভার্সন । আর্কটিক অঞ্চলে গভীর মাটির তলায় এগুলো জমানো শুরু হয়েছে । পরমাণু বোমা ফেটে গেলেও এগুলি সংরক্ষিত হবে আগামি ১০০০ বছরের জন্য । অন্যদিকে, চাঁদে উপনিবেশ স্থাপনের হুড়োহুড়ি শুরু হয়েছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে । সেখানে আজকের ভারতবর্ষ স্বপ্ন দেখছে দুগ্ধনিসৃত স্বর্ণকণিকার, কাদামাটি লেপছে আদুল গায় আর দিচ্ছে সর্বরোগহর গোমূত্রের নিদান । অন্যদিকে বাংলায়, বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাস্তর রামমোহন টু নেহেরু সময়কাল থেকে নিজেকে মুক্তই করতেই পারছে না – ব্যতিক্রম কয়েকজন উন্নতমনা মানুষ যাঁরা চারু মজুমদার ও অমর্ত্য সেন নিয়ে চর্চা করছেন । বর্তমান সময় হল, লিনাস টরভাল্ডস, জিমি ওয়েলস, মেহেদি হাসান খান কিংবা অশোক সেন, মহান মহারাজ ও পার্থপ্রতীম মজুমদারের মত মানুষদের । বাদবাকিদের জন্য, টিভিপর্দায় বনেদিয়ানার লীলায়িত গুমর তো রইলই,

“মণি অতুলন ছিল যে গোপন সৃজনের শতদলে,
ভবিষ্যতের অমর সে বীজ আমাদেরি করতলে,
অতীতে যাহার হয়েছে সূচনা সে ঘটনা হবে হবে,
বিধাতার বরে ভরিবে ভূবন বাঙালীর গৌরবে”।

[*বাঙালির সমাজ বলতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কথা বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাঙালির সমাজ সম্পর্কে আমার সম্যক অভিজ্ঞতা নেই, তাই সে প্রেক্ষিতে কিছুই বলা অনৈতিক হবে। -অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়]

তথ্যসূত্রঃ

এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে , এবং অন্যান্যকিছুবইপত্তর