প্রাণীর প্রতি আমাদের নৃসংশতা; রক্তে খেলে যায় আদিম নিষাদ

By |2018-11-19T23:45:33+00:00নভেম্বর 19, 2018|Categories: ব্লগাড্ডা|1 Comment

কোনো এক টিভি চ্যানেলে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। জাতীয় ইঁদুর নিধন সপ্তাহ না কি যেন একটা চলছে। সপ্তাহের উদ্বোধন করছেন একজন সাংসদ।প্রশাসনের লোকেরা হয়ত অনেক সরকারী অর্থের শ্রাদ্ধ করে বেশ কয়েকটি নেংটি ইঁদুর সংগ্রহ করে সাংসদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। ইঁদুরগুলোর লেজ বাঁধা।বন্দি ইঁদুরগুলো এদিক ওদিক ছুটে পালাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। সাংসদের হাতে ছোটখাটো একটা লাটি। প্রাণভয়ে ছুটে পালানো একটা ইঁদুরকে সাংসদ টার্গেট করলেন। তারপর একসময় বাড়ি বসিয়ে দিলেন। সাংসদের নিশানা অব্যর্থ। সেকেন্ডের মাঝে ইঁদুরটি ঠান্ডা হয়ে গেল। বাস, নিধন সপ্তাহের শুভ উদ্বোধন হয়ে গেল। কোনো প্রাণী হত্যারও যে একটা অফিসিয়েল সপ্তাহ থাকতে পারে তা অতি নির্বোধ হওয়ার কারণেই সম্ভবত প্রথম জানলাম।

আচ্ছা, এই মারামারির ব্যাপারগুলো এভাবে টিভিতে না দেখালে হয়না? হোকনা সে মানবজাতির চরম শত্রু তবু প্রাণীতো। একটা প্রাণীকে এভাবে ক্যামেরা সামনে নিয়ে হত্যা করে কোটি কোটি দর্শকের সামনে তা প্রদর্শণ করার বাহাদুরিটা কোথায়?

ইঁদুর ক্ষতিকর প্রাণী নিঃসন্দেহে। এগুলো মানুষের খাদ্য ভান্ডারের একটা  উল্লেখযোগ্য অংশ চুরি করে নেয়। প্রতিবছর ইঁদুরের পেটে যে পরিমান শষ্য যায় তা দিয়ে নাকি ইথিওপিয়ার মত একটি দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের খাদ্যসংকট মেটানো সম্ভব। এ থেকেই বুঝা যায় ইঁদুর আমাদের খাদ্যভান্ডারের কতবড় অবৈধ অংশীদার। সুতরাং আমাদের স্বার্থেই এই হিস্যাদারদের সংখ্যাটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এতে দ্বিমতের অবকাশ নেই। অবশ্য এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে ইঁদুর শুধু শুধু আমাদের খাদ্যেই ভাগ বসাচ্ছেনা মানুষের কল্যাণে কিছু অবদানও রাখছে। মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্নের হুমকি নিয়ে আবির্ভুত অনেক দুরারোগ্য ব্যধির প্রতিষেধক এবং প্রতিকারক আবিষ্কারের পেছনে এই ইঁদুরকুলেরও একটা বড় সেক্রিফাইস রয়েছে। অসংখ্য প্রজাতির জীব জানোয়ার পাখ পাখালি আমাদের খাদ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত। আমাদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই এদেরকে আমাদের হত্যা করতে হবে এ বাস্তবতা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। জীবহত্যা মহাপাপ এই আপ্তবাক্য এখন অসার। এটা মান্য করা আর অনশন করে করে আত্মহত্যা করা সমার্থক কারণ জীবনধারণের জন্য আমরা অন্য প্রাণীকে আমাদের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য। যারা নিরামিষভোজী তারাও লতাপাতা উদ্ভিদ খাচ্ছেন। লতাপাতারও প্রাণ আছে এগুলোও প্রাণী। কিন্তু এইসব মারা কাটা হত্যার ব্যাপারগুলো একটু আড়াল রেখে করলে হয়না? এতেও কি একটুখানি মানবিকতার ছাপ রাখা যায়না? এই অসহায় প্রাণীগুলোরও আমাদের মত জীবন আছে ক্ষুধা নিদ্রা অনুভূতি আছে।যৌন চাহিদা আছে। বেঁচে থাকার আকুতি আছে। এদেরকে মাটিতে ফেলে কয়েকজন মিলে ঝাপটে ধরে আল্লাহু আকবার বা বল হরি বলে যখন ছুরি রামদা চালানো হয় তখন কি তাদের মনে আল্লাহ হরি  খুব মহানুভবরূপে আবির্ভুত হন? পাশ্চাত্তের দেশগুলো নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছে কত কম কষ্টে এই আবোলা প্রাণীগুলোকে হত্যা করা যায়। তাদের স্টান পদ্মতিটি পশুর জন্য কম কষ্টদায়ক বলে স্বীকৃত। বিশাল বিশাল ষ্টোর গ্রোসারিতে টনকে টন মাংস বিক্রি হচ্ছে কিন্তু দেখা দূরে থাক কেউ জানেওনা কোথা থেকে কীভাবে এই মাংস আসছে। জানার প্রয়োজনই কী? তাদের ক্রয়কৃত মাংস যথেষ্ট হাইজেনিক কি না তা নিয়েও তাদের চিন্তা নেই কারণ এ ব্যাপারটি খুব বিশ্বস্থতার সাথে দেখভাল করে ফুড এন্ড ড্রাগ এডমেনিষ্ট্রেশন।

বিভিন্ন প্রাণী এমনকি সামান্য কীট পতঙ্গের ব্যাপারেও উন্নত বিশ্ব কতটা উদার এবং মানবিক এ সম্পর্কিত একটা ঘটনার কথা বলি। বছর তিনেক আগের কথা। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের। আমেরিকার ফ্রী-ওয়েগুলো খরস্রোতা নদীর মত বেগবান এবং প্রাণচঞ্চল।এগুলোর পাশে দাঁড়ালে কেবল শো শো একটা শব্দ শুনা যায়। হাজার হাজার যানবাহন নির্ধারিত গতিতে ছুটে চলছে। কোনো হর্ণ নেই কোলাহল নেই। সেই ব্যস্থতম ফ্রী-ওয়ে গুলোর একটি একদিন পাক্কা পনের মিনিটের জন্য স্থবির হয়ে গেল। কয়েক মিনিটের মাঝেই ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হল। একটা প্রবল স্রোতস্বী নদীতে হঠাৎ বাঁধ দিয়ে দিলে যে অবস্থা হবে ঠিক তাই হল। ফ্রী-ওয়ের ট্রাফিক উপচে পড়ল লোকেল সড়কগুলোতেও। কর্মস্থলে এক সেকেন্ড দেরিতে কার্ড পাঞ্চ করলে যেখানে কোয়ার্টার পয়েন্ট খেতে হয় আর পনেরো মিনিটের উপার্জন গচ্ছা দিতে হয় সেখানে পনের মিনিট আমেরিকানদের জন্য কত মূল্যবান তা অবশ্যই অনুমেয়। আর এই পনের মিনিটের স্থবিরতার কারণ কি জানেন? পিঁপড়া। কয়েক মিলিয়ন বা ট্রিলিয়ন সংখ্যার এক ডেঁয়েপিঁপড়া বাহিনীর রাস্তার একপাশ থেকে আরেক পাশে যাওয়ার দৃশ্য পুলিশের চোখে পড়ে, অথবা কেউ তাদের ইনফর্ম করে। অগনন পিঁপড়া গাড়ির চাপায় পিষ্ট হচ্ছে কিন্তু পিঁপড়াগুলোর মিছিল থামছেনা কিন্তু এমন আত্নহনন বা হত্যাযজ্ঞতো দীর্ঘক্ষণ চলতে দেয়া যায়না তাই পুলিশ বাধ্য হয়ে রাস্তাই বন্ধ করে দিল। পিঁপড়া মিছিলের শেষ সদস্যটি রাস্তা অতিক্রম করে যাওয়া পর্যন্ত হাজার হাজার যানবাহনকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হল। যদিও সামনের গাড়িগুলো ছাড়া কেউ বুঝতেও পারেনি যানজটের কারণটা কী। পরে ওইদিন সংবাদ মাধ্যমে ঘটনাটি জানা যায়।

এতো গেল পিঁপড়া কাহিনী এবার বলি হাঁসের কথা।যারা আমেরিকাতে গাড়ি চালান তাদেরকে প্রায়শ এই হাঁসদের সামনে পড়তে হয়। গাড়ি চালাচ্ছেন হঠাৎ দেখলেন রাস্তা পার হতে দাদা ঠাকুরদা ছেলেপুলে মায় এক দুদিনের বাচ্চা সহ এক দঙ্গল বুনোহাঁস নেমে পড়েছে রাস্তায়। হেলেদুলে আপন মর্জিমত তারা হেঁটে যাচ্ছে।দুদিক থেকে যে বিশাল বিশাল গাড়ি ছুটে আসছে এদিক দিয়ে তাদের ভ্রুক্ষেপও নেই।ভাবখানা যেন এই বাপের বেটা হলে চালাও গাড়ি আমাদের উপর দিয়ে। না কেউ এমন সাহস করেনা এমনকি কেউ একটা হর্ণ বাজিয়েও তাদের উত্যুক্ত করেনা।

প্রতিটি শহরেই আছে অনেকগুলো ‘প্যাট স্টোর’ যেখানে কেবল পশুপাখির প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিই বিক্রি হয়।শুধু কি পোষা? ওয়াইল্ড বার্ডেরও প্রচুর খাদ্য থাকে যা পাখিপ্রেমিরা কিনে নিয়ে তাদের আঙ্গিনায় ছড়িয়ে দেন।ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আকাশ থেকে আঙ্গিনায় নেমে আসে।খাওয়া দাওয়ার পর  তাদের গোসলেরও ব্যবস্থা থাকে সুদৃশ্য ‘বার্ড বাথ’ গামলায়।বুনো পাখিরা খাওয়া দাওয়া করে জল ছিটিয়ে কিচির মিচির শব্দে আনন্দোৎসব করে আর পাখিপ্রেমীগণ তা উপভোগ করেন।এ এক অদ্ভুত আনন্দ।শুধু প্যাটস্টোর নয় বড় বড় প্রতিটি স্টোরেই আলাদা প্যাট ডিপার্টমেন্ট থাকে। পশু পাখির রিহ্যাবিলাইটেশন সেন্টার আছে সর্বত্র। একটা পাখির ছানা বাসা থেকে নিচে পড়ে গেছে তাকে মানুষ নিজ গরজেই রিহ্যাব সেন্টারে দিয়ে আসে। আপনার আঙ্গিনায় ইঁদুরের উপদ্রব বেড়ে গেছে আপনি ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারে যোগাযোগ করলেই ওদের লোকজন এসে বিশেষ ফাঁদ পেতে ইঁদুরগুলোকে ধরে নিয়ে গিয়ে কোনো জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসবে। অবশ্য ঘরে ইঁদুরের উৎপাত হলে এদের মারার জ্ন্য বিষাক্ত খাবার বা নানা ধরণের ট্রেপ ব্যবহার করা হয়। রাস্তাঘাটে হঠাৎ কুকুরের উপদ্রব হলে পুলিশের রেসকিউ ইউনিট বিশেষ লেসো ব্যবহার করে কুকুরগুলোকে ধরে রিহ্যাবে পাঠিয়ে দেয়। রিহ্যাবে সেবা সুশ্রুষা চিকিৎসাদি করে তাদের সুস্থ করে তোলার পর সেখান থেকে অনেকে এদের এডাপ্ট করে নেন।লেসো দিয়ে পুলিশের কুকুর ধরার দৃশ্য দেখে আমাদের দেশের শহরগুলোর কুকুর নিধনের নির্মম দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে আর তখনই ওদের সাথে আমাদের এক সমুদ্র তফাৎটা স্পষ্ট ধরা পড়ে।

আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই দৃষ্টান্তগুলো হয়তো বেখাপ্পা মনে হতে পারে কিন্তু মনে রাখতে হবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো এক দুই দিনে এই মূল্যবোধ অর্জন করেনি এজন্য তাদেরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কিন্তু আমাদেরতো শুরু করতে হবে।সভ্যতার মিছিলে আমরা অনেক পেছনের সারিতে এটা মেনে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে।আর এই শুরুটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে মিডিয়াকে। মিডিয়াকে আগে শিক্ষিত এবং সভ্য হতে হবে। তাদেরকে আগে শিখতে হবে কোনটি প্রচারযোগ্য আর কোনটি নয়।একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যাক। সারি সারি লাশের ছবি দেখালে তাদের পত্রিকার বা চ্যানেলের গ্রাহক বাড়বে ঠিক কিন্তু এই ছবিগুলো যে শিশুদের বা দুর্বলচিত্তের মানুষের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তাও তাদের ভেবে দেখতে হবে। আমি আমেরিকাতে আছি কুড়ি বছর হয় এই কুড়ি বছরে দুর্ঘটনায় বা আততায়ীর গুলিতে কত অগনন প্রাণ ঝরে পড়েছে কিন্তু কোনো টিভি চ্যানেল বা পত্রিকাতে একটি লাশের ছবিও আজ অবধি দেখিনি।ইনসেটে ড্রাইভিং লাইসেন্সে ব্যবহৃত বা পারিবারিক এলবামের কোনো ছবি দেখানো হয় কিন্তু লাশের ছবি তা বিকৃতই হোক আর অবিকৃতই হোক কখনো নয়।মার্কিন মিডিয়ার এই দৃষ্টান্তটি অনুসরণ করতে হলে কি আমেরিকার মত উন্নত দেশ হতে হবে?এটাতো স্রেফ মানসিকতার ব্যাপার। আমি একটা পত্রিকার বা টিভি চ্যানেলের মালিক আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার মিডিয়ায় কোনো লাশের ছবি প্রকাশ হবেনা।কোনো হত্যা বা নৃশংসতার ছবি যাবেনা, বাস, হয়ে গেল। এই সিদ্ধান্ত পালন করতে গিয়ে বিশাল কোনো ঝুঁকিতো আমাকে নিতে হচ্ছেনা। আলাদা কোনো ফান্ডও এজন্য বিনিয়োগ করতে হচ্ছেনা। লাশের ছবি না দেখলে পাঠক দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবে? শুরু করেই দেখুন।অনেক টিভি চ্যানেল আবার খুব ঘটা করে একটা পশুকে মাটিতে ফেলা থেকে শুরু করে পুরো কুরবানির দৃশ্যটি লাইভ প্রচার করে থাকে,এগুলো অসভ্যতা এবং বর্বর মানসিকতারই পরিচায়ক।।

পশু পাখি কীট পতঙ্গের সাথে আমরা যে অমানবিক আচরণ করছি তার কী প্রভাব সমাজজীবনে পড়ছে তা নিয়ে কি আমাদের দেশে গবেষণা হয় বা হচ্ছে? হওয়া অত্যন্ত জরুরী।আমাদের সমাজে হত্যা প্রবনতা কেন দিন দিন বেড়েই চলেছে কেন নিষ্টুরতমভাবে মানুষ মানুষকে খুন করছে তার শিকড় সন্ধান প্রয়োজন। ছোট ছোট হত্যা দেখতে দেখতে বড় বড় হত্যাও ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে যায়।এজন্য দেশের ভেতরে অসংখ্য হত্যাকান্ড ক্রসফায়ার গুম ইত্যাদি আমাদেরকে তেমন আর বিচলিত করেনা।এর কারণ একটাই আমাদের মননের গভীরেও একটা এন্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে।গ্রামদেশে একটা প্রবাদ আছে-কঁচু কাটতে কাটতে হাত বাড়ে।এটি একটি চমৎকার সত্যকে প্রকাশ করছে।আজ যে শিশু কিশোরটি সাপ ব্যাঙ ইঁদুর মারছে কিছুদিন পর সে বাদর মারবে। তারপর হয়তো একদিন মানুষও মেরে বসবে। মারা যখন অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায় তখন ইঁদুর বাঁদর আর সহোদরে কী ব্যবধান থাকে?  অসংযত এবং অসচেতন জীবনপদ্মতি আমাদের সমাজজীবনে কেমন প্রভাব বিস্তার করছে তা উন্নত বিশ্বের সাথে আমাদের  একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

আমাদের দেশে মানুষ হত্যার মাঝে জবাই করে হত্যা একটি বহুল পরিচিত পদ্মতি। কিন্তু উন্নত বিশ্বে এটা অকল্পনীয়। এমনকি লাটি দিয়ে পিটিয়ে কাউকে হত্যা করার কথাও কেউ চিন্তা করতে পারেনা। অথচ আমাদের দেশে অহরহ হচ্ছে।দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে মারা হচ্ছে। একটা শিশুকে গাছের সাথে বেঁধে কয়েকজন যুবক অমানুষিক নির্যাতন করে তাকে হত্যা করছে আর একজন সেই হত্যাকান্ডের ভিডিও করছে। অথবা সামান্য চুরির অপরাধে ধৃত কিশোরকে পুলিশ উন্মত্ত জনতার হাতে ছেড়ে দিচ্ছে আর জনতা আদিম উল্লাসে তাকে পিটিয়ে হত্যা করছে।আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে হোয়াটস এপে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণ-পিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা মহামারির আকার ধারণ করছে। ভারতের সামাজিক অবস্থা আর আমাদের সামাজিক অবস্থাতো একই।সামান্য গুজবে বা সামান্য অপরাধে মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে এভাবে হত্যা করার প্রবনতা আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের  মাঝেও ছিল বলে মনে হয়না।কিন্তু সভ্যতার এই সোনালী প্রহরে এসেও আমরা করছি এর কারণ কী? কারণ ঐ যে পূর্বোল্লেখিত প্রবাদ কঁচু কাটতে কাটতে হাত বাড়ে অথবা সম ভাবাপন্ন আরেক গ্রামীণ প্রবাদ ‘দেখ দেখা শিখ শিখা। অর্থাৎ দেখতে দেখতেই শেখা হয়। যে শিশুটি দেখছে বিশালকায় একটি গরুকে বা মহিষকে অথবা ছাগলকে মাটিতে ফেলে তার চার পা কে শক্তভাবে চেপে ধরে গলাটাকে টান টান করে ছুরি দিয়ে তাকে জবাই করা হচ্ছে বা বিশাল রামদা দিয়ে বলি দেয়া হচ্ছে,কাঁটা শ্বাসনালি দিয়ে বিভৎস শব্দের সাথে টকটকে লাল রক্তের ধারা বইছে  প্রথমে এই নারকীয় দৃশ্য দেখে শিশুটি ভয় পাবে আতংকিত হবে কিন্তু আস্তে আস্তে তার ভয়ডর কমতে থাকবে তারপর কৈশোরে এসে সেও একদিন একই কাজে অংশ গ্রহণ করবে এবং এই কাজ করে নিজেকে সত্যিকারের পুরুষ ভাবতে শিখবে। একটি পশু জবাই বা বলিতে অংশগ্রহণ করে যে কিশোর যুবকটি নিজের পৌরষত্বকে আবিষ্কার করে সে জিঘাংসিত হয়ে বা অন্য যেকোনো কারণে কাউকে হত্যা করতে হলে তাকে গলা কেটে বা জবাই করে হত্যা করতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এটাইতো স্বাভাবিক। আর পিটিয়ে মারা? সেটাও শৈশব থেকে আমাদের মজ্জাগত হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে শিয়াল,বনবিড়াল,সাপ গুইসাপ মারাতো আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। সাংসদ ভদ্রলোক কর্তৃক ইঁদুর মেরে ইঁদুর নিধন সপ্তাহের উদ্বোদন সেই পিটিয়ে মারা সংস্কৃতিরই বাস্তব উপস্থাপনা।কিন্তু তার এই ইঁদুরকান্ড টিভি দেখা একটি শিশুর জন্য খুব মহৎ কোনো দৃষ্টান্ত হলনা বা তিনি নিজে যে উন্নত কোনো সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করছেন তারও প্রদর্শন হলনা। উক্ত সাংসদ ভদ্রলোক যদি কিছুমাত্র সচেতন এবং মানবিক হতেন তবে একটি জীবন্ত ইঁদুরকে হত্যা না করে একটি ডামি ব্যবহার করে প্রতিকীভাবেও তা করতে পারতেন।

উন্নত বিশ্বের একটি শিশু জানেওনা  যে চিকেনটি সে প্রতিদিন খাচ্ছে তা কীভাবে জীবন্ত মোরগ থেকে মাংসে প্রক্রিয়া করা হয়।এসব দেশে প্রকাশ্যে কোনো প্রাণীহত্যা করা আইনত দন্ডনীয়।তাই কোনো প্রাণীহত্যার দৃশ্য শিশুর কল্পনাতেও স্থান পায়না।আর পিটিয়ে মারা? না, এই নির্দয়তাও এই শিশুদের মানসিকতায় অকল্পনীয়। স্কুলপাঠ্যে বা টিভি চ্যানেলের কার্টুন সিরিজে কীট পতঙ্গ পশু পাখিকে এমন বন্ধুবৎসল সব চরিত্রে উপস্থাপন করা হয় যা দেখে দেখে প্রকৃতি জগতের সাথে শিশুদের একটা মায়াবী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তার শিশুমনও কীট পতঙ্গ পশু পাখি ইত্যদিকে তার নিজের মত সৃষ্টির এক একটি অপরিহার্য অংশ বলে গ্রহণ করে নেয়। সুতরাং এদেরকে মারারতো প্রশ্নই আসেনা। উন্নত দেশে যত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় তার বেশিরভাগই হয় চোর ঢাকাত দুর্বৃত্ত বা কথিত ‘লোন উলফ’দের  দ্বারা। সেটাও তাদের লাইফ ষ্টাইল থেকে উদ্ভুত কিন্তু কোথাও জবাই করে গলা কেটে বা পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেনা। কেননা জন্ম থেকেই এই অমানুষিক প্রেক্টিসের সাথে তাদের কোনো পরিচয়ই গড়ে ওঠেনি।

আমাদের সমাজের ক্রমবর্ধমান খুনে মানসিকতাকে বদলাতে হলে একেবারে গোড়া থেকে কাজ শুরু করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের চোখে যেন একটি হত্যাকান্ডের ঘটনাও চোখে না পড়ে তার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের স্মৃতি থেকে সকল লাশের ছবি মুছে ফেলতে হবে। স্কুলপাঠ্যে এমনসব পাঠ সংযোজন করতে হবে যার মাধ্যমে বিশাল এই প্রকৃতির গাছপালা লতাপাতা কীট পতঙ্গ পশু পাখির প্রতি শিশুদের ভালবাসা জন্মে। প্রকৃতিকে ভালবাসতে শিখলে শিশুরা মানবিক হয়ে গড়ে উঠবে। কিন্তু যেই দেশে রাজনৈতিক হীনস্বার্থে ভোটব্যাংকে শিশুদের মগজ বন্ধক দেয়া হয় সেইদেশের শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের মাঝে শিশুদেরকে মানবিক শিক্ষাদানের উপলব্ধি কখন জাগবে?

পরম আনন্দের কাজ নিজে জানা এবং অন্যকে জানানো। এই আদর্শকে ধারণ করেই লেখালেখি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জানা এবং জানানোর মিশন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় উপন্যাস 'কালোজোব্বা'। আরও কিছু প্রকাশের অপেক্ষায়।

একটি মন্তব্য

  1. বিজন ঘোষ নভেম্বর 20, 2018 at 8:20 পূর্বাহ্ন - Reply

    লেখাটির জন্য লেখক কে ধন্যবাদ।
    চলচিত্রে sex and violence বলে একটা কথা আছে। বিভিন্ন দেশ এই দুটির বিষয়ে তাদের দেশের censor board দ্বারা নজর রাখে। অর্থাৎ তারা নীতি গত ভাবে মেনে নিয়েছে যে এই দুটির বাড়াবাড়ি দেশের ক্ষতি করে। অনুন্নত দেশেও এই সেন্সর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অদ্ভুত, চলচিত্রে সেক্স এর ব্যপারে তারা কড়া বিরোধিতা করে এবং বাস্তব জীবনেও জনসমক্ষে এর বিরোধিতা করে। কিন্তু violence এর ব্যাপারে সিনেমা তে আপত্তি থাকলেও বাস্তব জীবনে এই ব্যপারে তাদের কোন হেল দোল নেই। এইখানেই এদের দ্বিচারিতা।

মন্তব্য করুন