হিমালের দেশে

অন্নপূর্ণা যেদিন প্রথম দেখা দিল মেঘের চাদর ভেদ করে

নেপাল গিয়েছিলাম কয়েক সপ্তাহের জন্য হিমালয়ে ট্রেকিং করতে। পাহাড় আমার বড্ড প্রিয়, অভিজিৎ প্রায়ই অনুযোগ করে বলতো, ‘তিনমাস পরপর পাহাড়ের চাঙ্গে উইঠ্যা বইসা থাকতে পারুম না :)…’। কিন্তু সে জানতো আমাকে দমানো সম্ভব নয়, আর ‘তুমি থাকো, আমি যাই’ বললেও তো মন খারাপ করবে, তাই একটু পরেই জিজ্ঞেস করতো, ‘ওখানে ইন্টারনেট আছে?’।
আন্দিস, আল্পস, রকি, এপলশিয়ান পর্বতমালা ঘুরে যখন ভাবছি আমি তো পাহাড় দেখেছি তখন হিমালয় যেন আমাকে বিনীত হতে শেখালো, আবারও মনে করিয়ে দিল বিশ্বপ্রকৃতিতে আমাদের ক্ষুদ্রতা আর অজ্ঞতার সীমাহীন সীমানাটা।

হিমালয় নিয়ে দুটো ফেসবুক পোষ্ট দিয়েছিলাম কদিন আগে, আজ কাঠমান্ডু শহর এবং নেপালের মানুষদের নিয়ে বাকিটা লিখে(এবং আগের লেখাগুলোকে এখানে যুক্ত করে) এবারের মত নেপাল পর্বের ইতি টানবো। বারবার ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে রইলো এই কঠিন অপরূপের কাছে।

মাৎসাপুৎসা পর্বতের (ফিশটেইল পর্বতের নেপালি নাম) চূড়া

      নেপাল ১ঃ বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর তৈরি কিংবদন্তীর উপত্যকায়
      ————————————————————————

কাঠমান্ডু শহরটা দেখে দুঃখ পেলাম। হাজার হাজার বছর আগে বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন এই কিংবদন্তীর উপত্যকা। পদ্ম-পরিবেষ্টিত মনোমুগ্ধকর হ্রদের পানিতে ঢাকা ছিল সব। মঞ্জুশ্রী হঠাৎ দেখলেন ওপারে টিলার (আগেই বলেছিলাম নেপালে যাকে তাকে পাহাড় বলা যায়না) ওপর এক পদ্মফুল থেকে উজ্জ্বল আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে – ওনার কাছ থেকে সেটা দেখার শখ হলো। মঞ্জুশ্রী তার দুর্বার জ্ঞানের তরবারির আঘাতে সেই টিলার বুক চিরে কেটে দিলেন এক গিরিসঙ্কট, হ্রদের সব পানি হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল, জেগে উঠল সবুজ কাঠমান্ডু উপত্যকা। এরই চারপাশে গড়ে উঠল মানুষের বসতি আর মাঝের উর্বর জমিতে ক্ষেত খামার।

সাড়ে তিনশ সিঁড়ি বেয়ে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মন্দির সয়ম্ভূনাথ স্তুপায় উঠলে পুরো কাঠমান্ডু উপত্যকাটা দেখা যায়। এটি মূলত বৌদ্ধ মন্দির হলেও প্রচুর হিন্দুও একে পবিত্র স্থান বলে মনে করেন। কথিত আছে, মঞ্জুশ্রী যেখানে সেই পৌরাণিক পদ্মফুল এবং শিখাটি দেখেছিলেন সেখানেই নিজে নিজে গড়ে উঠেছে এই মন্দিরটি।

এই প্রাচীন মিথগুলো কিন্তু বেশ মজার। এরকম মিথ শুনলেই আমার জানতে ইচ্ছে হয় এর কোন ভিত্তি আছে কিনা। বিবর্তনের পথ ধরে বইটিতেও এরকম মিথ নিয়ে লিখেছিলাম অনেককিছু। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জ্ঞান থেকে দেখা যাচ্ছে যে, কাঠমান্ডু উপত্যকা আসলেই দশ লক্ষ বছর আগে এক বা একাধিক হ্রদের সমষ্টি ছিল। ভূতত্ত্ববিদেরা এখানে কুমীর, মাছ বা হিপোর মত বহু জলজ প্রাণীর ফসিলও খুঁজে পেয়েছেন। শেষ তুষার যুগে হিমালয়ের উপরাংশ হিমায়িত হয়ে গ্লেসিয়ারে ঢেকে যায়, পাহাড় থেকে বরফ গলা পানির স্রোত শুকিয়ে যেতে শুরু করে। তার ফলে কাঠমান্ডু উপত্যকার বড় হ্রদগুলোও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। এক সময় ছোট ছোট কয়েকটি হ্রদ ছাড়া সবই শুকিয়ে যায়, জেগে ওঠে উর্বর, সবুজ এক অপরূপ উপত্যকা।

৩০ হাজার বছর আগে কাঠমান্ডু হয়তো দেখতে এমন ছিল

অর্থাৎ, এখানকার মানুষেরা এইসব ফসিল দেখে অনেক আগেই বুঝে নিয়েছিলেন যে এই উপত্যকাটি একসময় পানির নীচে ছিল। সে সময়ের লব্ধ জ্ঞান এবং প্রিয় বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর কথিত ঐশ্বরিক শক্তির যৌথতায় তারা উড়ালেন কল্পনার ফানুস, আর মানুষের তৈরি অজস্র উপকথা, রূপকথার সমৃদ্ধ ভাণ্ডারে জমা পড়লো আরেকটি চমৎকার গল্প।

সে যাক, যে গল্প বলতে শুরু করেছিলাম তাতে ফিরে যাই – আজ সেই অপরূপ কাঠমান্ডুর কী অবস্থা! যেখানে সেখানে কুশ্রীভাবে ইট পাথরের বানানো ঘরবাড়ি, জনাকীর্ণ, দূষণ আর ধুলোর আবরণে ঢেকে থাকা একটা শহর যার বুকে বয়ে যাওয়া নদীগুলোও নাকি দূষিত। অথচ এই নদীগুলোর যেখানে উৎপত্তি, সেই হিমালয়ের হিমবাহগুলো আজও ধারণ করে আছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম (আর্কটিক ও আন্টার্কটিক অঞ্চলের পরে) বিশুদ্ধ পানির ভাণ্ডার।

স

হিমালয়ের হিমবাহঃ বিশুদ্ধ পানির উৎস

শুনেছি ২০১৫ এর সেই ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরে গ্রাম এবং পাহাড়ের বহু মানুষ শহরমুখী হয়েছে। আশেপাশের দেশগুলো, বিশেষত ভারত থেকে, মানুষ প্রতিনিয়ত জীবিকার সন্ধানে ভিড় জমানোর কারণেও কাঠমান্ডুর উপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নেপালের উদারনীতির কারণে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে বহু উদ্বাস্তু, তিব্বতি থেকে শুরু করে বাঙ্গালি পর্যন্ত অনেকেই।

বহুজাতির সম্মিলনে তৈরি হিমালের এই দেশ

তবে কাঠমান্ডু থেকে বেরিয়ে পড়লেই চিত্রটা আমূল বদলে যেতে শুরু করে। নাগরিক কোলাহল, যানবাহন, ধুলো, দূষিত পানি ছেড়ে যত দূরে যেতে থাকবেন ততই অকৃষ্ট প্রকৃতির আদিমতা ছুঁয়ে যেতে থাকবে আপনার শরীর মনে। সংরক্ষিত পাহাড়াঞ্চলের অধিবাসীরা নাকি কখনো গাছ কাটার কথা কল্পনাও করতে পারেননা, কোন গাছ প্রাকৃতিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে গেলেই নাকি শুধুমাত্র সেটা সংগ্রহ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

কয়েকশ বছরের পুরনো গাছ

প্রকৃতির সাথে তাদের গভীর সম্পর্কটা তাদের সব কথায় এবং কাজে দৃশ্যমান। যে ক’দিন পাহাড়ে ছিলাম, যে ক’দিন ট্রেক করেছি, যে ক’দিন টিপ টিপে বৃষ্টির মধ্যে গায়ে আটকে থাকা জোঁক ছাড়িয়েছে সে ক’দিন আমার নিত্যদিনের সাথী সেই মাইগ্রেনটা ধারে কাছে ঘেঁষারও সাহস পায়নি। আজকের এই কৃত্রিম যান্ত্রিকতার মাঝে অস্পর্শিত প্রকৃতির বিশুদ্ধতা যেন এক পরম বিস্ময় হিসেবেই থেকে গেল আমাদের কাছে!

পাহাড়ি নদী

তবে কাঠমান্ডু এবং পোখারা শহরের মেয়েদের দেখে যারপরনাই অবাক হয়েছি। আগেই শুনেছিলাম, কিন্তু তারপরও এতটা আশা করিনি। আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশের আর কোন শহরে মেয়েরা (হয়তো পাহাড়ী এলাকা বাদে) এতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কাঠমান্ডুতে আসার আগে দিল্লিতে ছিলাম ক’দিন। দিল্লি যেন কাঠমান্ডুর তুলনায় এ ব্যাপারে মধ্য যুগেই পড়ে আছে। আর ঢাকা শহরের কথা না হয় আর নাই বা বললাম।

কাঠমান্ডুতে মেয়েরা রাস্তা ঘাটে স্বাধীনভাবে হাঁটছে চলছে ফিরছে, স্কুটার, গাড়ি চালাচ্ছে, কাজ করছে সর্বত্র, দোকানে, অফিসে, রাস্তায়। যে যা ইচ্ছে পরছে, প্যান্ট, শার্ট, হাফ প্যান্ট, ফ্রক, শেলোয়ার কামিজ, শাড়ি। কিশোর কিশোরীরা ঘাড়ে হাত দিয়ে গল্প করতে করতে স্কুলে যাচ্ছে। ইভ টিজিং নেই! এমনকি রাতবিরেতেও একজন মেয়ের খালি রাস্তা ধরে একা হেঁটে বাড়ি ফিরতে সমস্যা নেই।

আমি কাঠমান্ডু থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে এক ফরেস্ট রিসর্টে ছিলাম। একদিন শহর থেকে ফিরতে প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। একজন বন্ধু আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে বলাতে আমি স্বভাবসুলভভাবেই ভীষণ আপত্তি জানিয়েছিলাম। তখন সে হেসে বলেছিল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে শুধুমাত্র কাঠমান্ডু বলেই রাজি হলাম এত রাতে একা যেতে দিতে’।

মেয়েরা পথেঘাটে স্কুটারে

সেদিন অনেক গল্প হলো ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে। সে আমাকে আশ্বস্ত করল, এত রাতে মেয়েদের চলাফেরায় কোন অসুবিধা নেই; তারা নাকি মেয়েদের অনেক সম্মান করে। তার ক্লাস টেনে পড়া একটা মেয়ে আছে আর ছোট এক ছেলে। মেয়েটা বড় হয়ে পাইলট হতে চায়। এছাড়াও অনেকের সাথে এ নিয়ে কথা হয়েছে, সবাইই মোটামুটিভাবে বলল, বিশ বছর আগেও মেয়েদের এতটা স্বাধীনতা ছিলনা। গ্রামাঞ্চলে অবস্থার ততোটা উন্নতি না হলেও, গত দুই দশকে বড় শহরে মেয়েদের অবস্থা আমূল বদলে গেছে। মজার একটা কথা বলল কয়েকজন, ‘আমাদের ধর্মটা আসলে অনেক ফ্লেক্সিবল, আমরা ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু বদলে নিতে পারি। যেমন ধরুন, মেয়েদের স্বাধীনতার ব্যাপারে ধর্মীয়ভাবে কিন্তু তেমন বাধা দেওয়া হয়না!’

আমি তো অবাক! নেপালের জনসংখ্যার ৮০ ভাগ তো হিন্দু! একই হিন্দু ধর্মই না ভারতেও? হিন্দু ধর্ম নারী-স্বাধীনতার ব্যাপারে উদার সেটা তো কোনদিনও শুনিনি। তাহলে ঘটনাটা কী? শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই নয় শুনেছি (এবং এই প্রায় দু’সপ্তাহে যা দেখলাম) এমনিতেই নেপালিরা মানুষ হিসেবে অপেক্ষাকৃত বন্ধুত্বপূর্ন, সৎ এবং সরল। নেওয়ারি (আর্য), প্রাচীন ভারতীয়, মোঙ্গোলিয়ান, ভুটানি, তিব্বতি থেকে শুরু করে বহু জাতি বাস করে সেখানে, একশরও বেশি ভাষাভাসির সহবাস সেখানে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে তেমন কোন উত্তেজনার কথাও শোনা যায়না। বহু হিন্দুই বৌদ্ধ মন্দিরেও যায়। এত গরিব একটা দেশ, কিন্তু রাস্তায় তেমন বেশি ভিক্ষুক দেখা যায়না। ওদিকে আবার সবাই কঠোরভাবে ট্রাফিক নিয়ম কানুন মেনে চলে, গাড়ি, বাস, হাজার হাজার স্কুটার সবাই নিজের নিজের লাইনে চলে। এত পাহাড়ি রাস্তা, এবং বহু রাস্তার অবস্থাই মাটির ধ্বস এবং বৃষ্টিতে তথৈবচ – আমাদের দেশের মত গাড়ি চালালে মৃত্যুর সংখ্যা কত যে হতো কে জানে।

কঠোরভাবে ট্র্যাফিক নিয়ম মেনে চলে কাঠমান্ডুবাসীরা

প্রায় প্রত্যেক ট্যাক্সি ড্রাইভার, গাইড এবং হোটেলের কর্মচারিরাই একই কথা বললেন, এই নতুন প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের চেয়ে রাজা বীরন্দ্রর সময়ের রাজতন্ত্রই ঢের ভাল ছিল। শুনে চমকে উঠেছিলাম প্রথমে, তারপরে কারণটা জেনে আশ্বস্ত হলাম। তাদের মতে আগে এক রাজার পরিবারের গুটিকয়েক সদস্য চুরি করতো আর এখন এই গণতান্ত্রিক সিস্টেমে হাজার হাজার নেতা রাতদিন পুকুরচুরির ব্যবসা খুলে বসেছে।

বলছিনা যে নেপালি জাতির মধ্যে খারাপ কিছু নেই – কুসংস্কার, জাতভেদ, পুরুষতান্ত্রিক মনোভঙ্গি, দুর্নীতি সবই আছে সেখানে। কিন্তু তারপরও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভাল দিকগুলো দেখলাম সেগুলো আমাদের উপমহাদেশের খুব বেশি অঞ্চলে বোধ হয় দেখা যায়না। কিন্তু কেন? দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অধিবাসী বলে তাদের বিভিন্ন জাতির মধ্যে সহযোগিতা এবং হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে ভিন্নভাবে? এমনিতেই অনেক শুনেছি যে পাহাড়ি মানুষেরা উদার হয়। এছাড়া, ভৌগোলিক কারণে (একদিকে হিমালয় আরেক দিকে ম্যালেরিয়ায় ভরা জঙ্গলে অধ্যুষিত) নেপাল কখনই তেমন কারো উপনিবেশ ছিল না, তাই কি তাদের মধ্যে তাঁবেদারি, দুর্নীতি, কেরানিগিরি আর দাসত্বের সংস্কৃতি তৈরি হয়নি? গৌতম বুদ্ধের জন্ম নেপালে, তাই বেশিরভাগই নেপালিই হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করে। তাহলে কি হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্ম মিলে এক ভিন্ন ধরণের স্বাধীন এবং সহিষ্ণু সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে নেপালে? অনেক খুঁজেও এ নিয়ে তেমন কোন গবেষণা বা লেখা পেলামনা। আপনাদের কারো অন্য কোন ব্যাখ্যা জানা থাকলে জানাবেন।


নেপাল ২ঃ এগুলো তো পাহাড় নয়, পর্বতও নয়, শুধুই ডাঁড়া
—————————————————————————————-

    নেপালে এসেছিলাম হিমালয়ের কাছে যাব বলে। কাঠমান্ডু থেকে পোখারায় ড্রাইভ করে এসে বড় বড় পাহাড় দেখে বেশ তৃপ্তি অনুভব করতে শুরু করেছি তখন নৌকার এক মাঝি বললো এগুলোকে তো আমরা পর্বত বলিনা, এগুলো শুধুই ডাঁড়া (হিল, টিলা)! ৬-৭-৮ হাজার ফুট উঁচু ‘পাহাড়’গুলো পাহাড় নয় শুধুই ডাঁড়া! কন্টেক্সট দেওয়ার জন্য বলি বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু শৃঙ্গ কেওক্রাডং এর উচ্চতা ৩২৩৫ ফুট। এর পরের আরেকটু উঁচুগুলোকে পাহাড় বলা যেতে পারে। আর নেপালিদের কাছে পর্বত মানে হিমাল, হিম অর্থাৎ বরফে আবাস যার। এখান থেকেই হিমালয় নামটা এসেছে – হিমের আলয়। অর্থাৎ কোন পাহাড় যদি এতটা উঁচু না হয় যার উপর বরফ বাসা বাঁধতে পারে তাকে এই পাহাড়ের দেশের মানুষেরা পর্বতের সম্মান দিতে রাজি নয়।

    হিমাল

    জিজ্ঞেস করলাম, ডাঁড়া আর পাহাড়ে পার্থক্য কর কিভাবে? উত্তরে রসিকতা করে বলল ‘তুমি যখন নীচ থেকে দাঁড়িয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখছ তখন সেটা পাহাড়, কিন্তু একবার উপড়ে উঠে যাওয়ার পর সেটা হয়ে যায় ডাঁড়া :)’। তাই তো, যাকে সহজেই অতিক্রম করা যায় তাকে কেনই বা আর ‘পাহাড়’ ডাকা?

    বর্ষাকাল বলে হিমালেরা সব লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। আষাঢ়, শ্রাবণ মাসে সূর্যের দেখা পাওয়াই ভার। সকালে উঠে দেখি সারা রাত মুষলধারে বৃষ্টির পরে সকালে সূর্যের তোড়ে মেঘের চাদর কিছুটা সরে গেছে। উত্তরে মেঘের সাথে মাখামাখি হয়ে থাকা এ কী দেখছি? আমার এতদিনের পৃথিবীটা যেন তার কক্ষপথে দাঁড়িয়ে গেল – এ তো অন্নপূর্ণা! শ্বাসরুদ্ধ বিস্মিত উপলব্ধিতে দেখলাম অবাকের বিস্তার। বিশাল, অভাবনীয়, অপরূপ – বুঝলাম নেপালিদের পর্বত নিয়ে এত গর্ব কোথা থেকে আসে। এরকম হিমাল তো আর নেই পৃথিবীর কোথাও। কোন ক্যামেরা বা কোন ভাষাই একে ধারণ করার ক্ষমতা রাখেনা। রকি, আন্দিজ, আল্পস পর্বতমালাগুলো তো নস্যি হিমালয়ের কাছে। অন্নপূর্না নিজেই পৃথিবীর দশম উঁচু পর্বত চূড়া। তার মালায় গাঁথা পর্বতগুলোর মধ্যে নাকি ১৩টারই উচ্চতা ৭০০০ মিটারের বেশি।

    অন্নপূর্ণার অপরূপ বিস্তৃতি

    নীচে তাকিয়ে দেখলাম ফিউয়া লেক… অন্নপূর্ণার ছায়ায় তাকে আজ কত ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। তার চেয়েও আরও ক্ষুদ্র ভেসে থাকা ছোট্ট নৌকাগুলো যেন প্রকৃতির বুকে মানুষের পদচিহ্ন একে দিচ্ছে। মেঘে, অন্নপূর্ণায় মাখামাখি, কে যে কার বুকে হারাচ্ছে কে জানে। বাড়ন্ত সূর্যের আলোর সাথে সাথে সবার রঙ বদলাচ্ছে প্রতি মিনিটে, চোখের সামনে সে কী এক রঙ বদলের খেলা! একি আসলেই খেলা নাকি আমার এই সামান্য মানবীয় চোখের ভ্রম? বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হয়তো হাসে আমাদের এই সীমাবদ্ধতায়, সীমার মাঝে অসীমের সীমা অনুভব করতে না পারার অপারগতায়।

    পোখারা শহরটা এই ফিউয়া লেকের চার পাশে গড়ে উঠেছে। লেকের উপর ভেসে থাকা নৌকাগুলো…

    ফিউয়া লেক, ডাঁড়ায় বেষ্টিত পোখারা শহর, পাহাড়, আর দূরের পর্বতে খেলে যায় সূর্যের আলো

    পোখারা শহরটা মূলত এখন একটা টুরিস্ট শহর, বর্ষাকাল বলে তেমন ভিড় নেই এখন। ছোটখাটো, পরিপাটি একটা শহর, মেঘহীন দিনে যে কোন জায়গা থেকে অন্নপূর্ণা পর্বতমালার বরফে ঢাকা অপরূপ শৃঙ্গগুলো দেখা যায়। এখান থেকেই অনেকে অন্নপূর্ণার বেসে বা উত্তর পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেকিং শুরু করেন। পাহাড়ের বহু মানুষ এখানকার ট্যুরিজম ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। অনেক তিব্বতি রিফিউজিও বাস করেন এখানে, ১৯৫৯ সালে তিব্বতে চীনের রাষ্ট্রীয় পলিসির সাথে একমত হতে না পেরে এনারা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

    পোখারায় একদিন আমাদের গাইড রাজেশকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের শহরে ব্যস্ত হাইওয়ের মাঝখানে আয়েশ করে গরুগুলো বসে থাকে,সরাওনা কেন?’। সে হেসে উল্টো প্রশ্ন করল, ‘আরে, সরাবো কেন? ওরা তো আমাদের শহরের সেকেন্ড ট্রাফিক !’

    এবারের মত ডাঁড়া আর পাহাড় বাওয়া শেষ। এবারের যাত্রা হিমালে, হিমের আলয়ে সব কোলাহল থেকে বের হয়ে……

      নেপাল ৩ঃ হিমালয়ের তুলনা শুধুমাত্র হিমালয় নিজেই
      —————————————————————————–

এর পরে আর রাস্তা নেই, শুধুই পাহাড় বেয়ে ওঠা

পাহাড় বেয়ে এই ওঠার যেন কোন শেষ নেই। পাহাড়ে-ডাঁড়ায়-হিমালে-শিখরে-সবুজে-নীলে-কুয়াশায় মাখামাখি, যেখানে ঝর্ণা আর গাছের পাতার শব্দ ছাড়া অন্য সবকিছু একাকার, জড় ও জীবের ভেদাভেদ যেখানে নেই হয়ে গেছে, স্থির হয়ে আছে স্তব্ধ চেনা কোলাহল, যেখানে চরাচর শুধুই শান্তিময়। কিছুক্ষণ পরপরই ‘মুখর নির্ঝরকলকল্লোলে’ অবিরাম ধেয়ে চলেছে একটার পর একটা জলপ্রবাহ – তাদের কেউবা হিমবাহ গলা পানি, কেউবা পর্বতের গায়ে গহ্বরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি – কিসের তারায় যেন তারা বয়ে চলেছে একইদিকে! তাদের যেন একটাই লক্ষ্য – মিলবে, গড়বে, প্রাণের হিল্লোল তুলবে সমুদ্রপানে ধেয়ে চলা নদীগুলোর বিরামহীন অদম্যতাকে।

সেই পর্বতমালা বেয়ে উঠছি, ভাবছি আর উঠছি।

এ ওঠার যেন শেষ নেই

কালিদাসেরা যে কেন হিমালয়কে দেবাত্মা ডেকেছেন, বারবার ফিরে গেছেন এই অপরূপের কাছে, ভারতীয় সাহিত্য, দর্শন, ধর্মে কেন একে দেখা হয়েছে মহত্ত্ব, উদারতা, বিশালতার প্রতীক হিসেবে তা হিমালয়ের বুকে পা দিয়ে না দাঁড়ালে, একে শরীর, মন চোখ দিয়ে অনুভব না করলে কোনভাবেই বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা না জেনেও জানতেন যে আমাদের এই ছোট্ট গ্রহে হিমালয়ের তুলনা শুধুমাত্র হিমালয় নিজেই।

প্রকৃতির এই বিশালতার ব্যাখ্যায় আজ আর কোন অচিন বিশ্বনাথের উপস্থিতি নেই। ওসব থাকলে মানুষের এই অনন্ত জিজ্ঞাসা এবং বিস্ময়ের একটা সহজ পলায়নপর সমাধান মিলত হয়তো! কিন্তু এই না-জানার রোমাঞ্চ এবং তাকে জানার প্রবল তৃষ্ণা থাকতো কি? তবে আজ আমরা যা জানি তা কিন্তু মোটেও কম রোমাঞ্চকর না।

দম শেষ

১০৪০০ ফুট ট্রেকিং করেছি এ পর্যন্ত। চমকে উঠলাম আইফোনের হিসেব দেখে, সে বলছে পরশু ৭০ তালা, কাল ১৭০ তালা, আজ ২৮০ তালা উঠেছি। যত উপরে উঠতে উঠতে দম ফুরাচ্ছে, যত মাধ্যাকর্ষন আর উচ্চতার সংঘর্ষে আমার ছোট্ট হৃৎপিণ্ডটার বেহাল দশা হচ্ছে, ততই যেন চোখের সামনে স্লো মোশানে দেখতে পাচ্ছি – হাজার কোটি বছর ধরে ভারতীয় প্লেট মহাসাগরে ভাসতে ভাসতে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে আসছে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে মেলার আশায়। তারপর আরও শত কোটি বছর ধরে চলছে তাদের দীর্ঘ মিলন খেলা। তারা ভেঙ্গেচুরে একে অপরের গভীরে ঢুকে পড়ছে আর সেই শ্লথ কিন্তু প্রবল মিলনের প্রচন্ডতায় ক্রমশ ধীর গতিতে উত্থিত হচ্ছে হিমালয় – অপরূপ অন্নুপূর্নার মালা, সাগরমাথা’র (এভারেস্ট পর্বতের স্থানীয় নাম) উন্নত শিখর, মাৎসাপুৎসা’র (ফিশটেইল পর্বতের নেপালি নাম) হিমেল চূড়া। এই বিশাল আজও বিশালতর হচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চতা আজও বেড়ে চলেছে খুউ-ব ধীরে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেন যে পৃথিবীর বাইরের স্তরটি ডিমের খোসার মত মসৃণ নয়। উত্তপ্ত ম্যাগমা দিয়ে তৈরি পৃথিবীর অন্তঃস্থলের (core) উপরে ভূত্বকের যে স্তরগুলো (crust) আমরা দেখতে পাই তা আসলে বেশ কতগুলো প্রকাণ্ড টেক্টনিক প্লেটে (লিথোস্ফেয়ার) বিভক্ত। এরা সবসময়েই একে অপরের থেকে সরছে — খুব ধীরে হাজার হাজার বছরের প্রক্রিয়ায়। সরতে সরতে তারা কখনো একসাথে হয় প্রবল থেকে প্রবলতর সংঘর্ষের মাধ্যমে, আবার কখনো ভেঙ্গেচূরে অভিমানে দূরে চলে যেতে থাকে। এই একত্রীকরণ এবং ভেঙ্গে পড়ার প্রক্রিয়া বারবার ঘটেছে পৃথিবীর সাড়ে চার বিলিয়ন বছরের ইতিহাসে। অর্থাৎ আজ আমরা যে মহাদেশগুলো দেখছি তার কোনটাই স্থির নয়।

পৃথিবীর চিড় খাত্তয়া পৃষ্ঠ

পৃথিবীর অভ্যন্তরে

মাত্র ৩০০ মিলিয়ন বছর আগেও প্যাঞ্জিয়া নামে সুপারকন্টিনেন্টে সবগুলো মহাদেশ একসাথে ছিল। ২০০ মিলিয়িন বছর আগে এই প্যাঞ্জিয়ার প্লেটগুলো ভাঙতে শুরু করে। আস্তে আস্তে এর নীচের অংশ ভেঙ্গে দক্ষিণে তৈরি হয়েছিল গন্ডোয়ানাল্যান্ড, যার মধ্যে ছিল আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, এন্টার্কটিকা, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইন্ডিয়া। ১৫০-১২০ মিলিয়িন বছর আগে ভারতীয় প্লেট গন্ডোয়ানা থেকে ভেঙ্গে বেরিয়ে যেতে শুরু করে। দক্ষিণে প্রায়-দক্ষিণ মেরুর কাছে তার অবস্থান থেকে সে বছরে ৯ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার করে সরতে শুরু করে উত্তর দিকে। উত্তরে আগাতে আগাতে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে আমাদের এই ভারতীয় প্লেটের প্রথম সংঘর্ষ ঘটতে শুরু করে ৫৫ মিলিয়ন বছর আগে এবং সেই সংঘর্ষ এখনো চলছে। ভারতীয় প্লেট এখনো এশিয়ার এই ইউরেশিয়ান প্লেটকে ভেতর পানে ধাক্কা দিয়ে চলেছে। তার মিলনের আকাঙ্ক্ষার যেন কোন শেষ নেই। দুই প্লেটের সেই প্রচন্ড শক্তিশালী সংঘর্ষ প্রক্রিয়ায় অপেক্ষাকৃত নরম ইউরেশিয়ান প্লেট দুমড়ে মুঁচড়ে ভারতীয় প্লেটের উপরে উঠে যেতে থাকলে তৈরি হতে শুরু করে হিমালয় পর্বতমালা। হিমালয় আজও বাড়ছে প্রায় ১ সেন্টিমিটার করে প্রতিবছর, ১ কিলোমিটার প্রতি মিলিয়ন বছর হারে।

ইউরেশিয়ান আর ইন্দো-ইউরোশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষ

প্যাঞ্জিয়া থেকে বর্তমান

যারা বলেন বাস্তবতায়, প্রকৃতিতে, বিজ্ঞানে, ‘মহাবিশ্বে, মহাকাশে, মহাকাল-মাঝে’ কাব্য নেই, আবেগ নেই, রোমাঞ্চ নেই তাদের জন্য মায়া হয়। এই প্রকৃতির মাঝেই, ক্ষণিকের অস্তিত্বের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় অনিয়মের নিয়ম, পরমের ছোঁয়া, বিস্ময়ের আনাগোনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা – আমাদের চেতনার মাঝেই তাদের অস্তিত্ব, আর তাদের মাঝেই আমরা খুঁজে পাই বেঁচে থাকবার মুহূর্তগুলোর নির্মল পরশ।

——
এখানে হিমালয় তৈরির কয়েকটা ছোট্ট ইউটিউব ভিডিও দেখতে পারেন

এই ভিডিওটিতে ভারতীয় প্লেটের প্যাঞ্জিয়া থেকে ভেঙ্গে এসে ইউরেশিয়ান প্লেটের সাথে সংঘর্ষের ফলে হিমালয় তৈরির ২০০ মিলিয়ন বছরের ইতিহাসের এনিমেশন দেখানো হয়েছে।

————————-

ট্রেকিং এর আরও কিছু ছবি

পাহাড়ে ডাঁড়ায় মেঘে মাখামাখি

প্রথম রাতের বিরতি

থেমেছি দুপুরের খাওয়ার জন্য

সূর্যাস্ত

বৃষ্টি আর জোঁকের মাঝে …

স্কুল শেষে ছেলেমেয়েরা পাহাড় বেয়ে বাড়ি ফিরছে

পাহাড়ি ঝর্ণা

এখনো স্থানীয়রা এভাবেই বোঝা বয়ে নিয়ে যান পাহাড়ের উপড়ে

[/caption]

পাহাড়ি মেয়েরা ক্ষেতে কাজ করছেন

অদম্য প্রাণের মেলা

পাহাড়ি নদী আর ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম

জোঁকে ধরা ভারবাহী ঘোরাগুলো

হাজারো ঝর্ণার ভিড়ে

পাহাড়ে বৃষ্টি নামছে

মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশার চাদর সরিয়ে

জীবনটা হাতে নিয়ে কোনমতে সেদিনের মত পুনহিল পৌঁছে…

ঝুলন্ত ব্রিজগুলো

আমাদের গাইড রাজেশের সাথে

গবেষক, লেখক এবং ব্লগার। প্রকাশিত বইঃ 'বিবর্তনের পথে ধরে', অবসর প্রকাশনা, ২০০৭।

একটি মন্তব্য

  1. বকলম সেপ্টেম্বর 24, 2018 at 7:29 অপরাহ্ন - Reply

    যুগপৎ দুখঃ আর অভিমান হলো লেখাটা দেখে। (পুরোটা এখনো পড়িনি)। ২০০৮ থেকে ২০১০ অব্দি আমি কাঠমান্ডুর স্থায়ী বাসিন্দা ছিলাম। তখন আমি মুক্তমনায় টুকটাক লিখি। একটা সামান্য লেখা হলেও অভি দা আর বন্যাপু অকারন প্রসংশা করতেন যাতে আরো লিখি। কথা চলছিল বন্যাপু, অভিজিত দা আর স্নিগ্ধা আপুরা মিলে কাঠমান্ডু আসবেন। কেন জানি আসা হলোনা। পরে আজিজ মার্কেটে অভিদা আর বন্যাপু সহকারে দেখা-কথা হলো। তখনো আলগোছে একবার নেপাল ভ্রমণ নিয়ে কথা হলো। কিন্তু সেই আরাধ্য ভ্রমণ আর হলোনা। পরে তো অভিদাই চলে গেলেন। নেপাল নিয়ে ভাবলেই আমার সেই অপূর্ণ ভ্রমণটার কথা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে। লেখাটা পুরো পড়ে আবার মন্তব্য করব আশা রাখি।

মন্তব্য করুন