নাসা ছেড়ে আসা এক গণিতবিদের গল্প

খুব কম মানুষই ড. বশিষ্ঠ নারায়ণ সিং (Dr. Vasistha Narayan Singh) সম্পর্কে জানে। তিনি একজন বিখ্যাত গণিতবিদ। ভারতের বিহার রাজ্যের একটা অখ্যাত গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থান বাসান্তপুরের একটি প্রাইমারি স্কুলে তিনি লেখাপড়া শুরু করেন। এরপর পাটনার বিজ্ঞান কলেজ শেষে আমেরিকার University of California পড়তে চলে যান। এই গণিতবিদ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের থিউরি অব রিলেটিভিটি (E = MC2) কে চ্যালেঞ্জ করেন।

ড. বশিষ্ঠ নারায়ণ সিং জন্মগ্রহণ করেন বিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বাসান্তপুর নামক এক অখ্যাত দরিদ্র পরিবারে। সময়টি ছিল ২ এপ্রিল ১৯৪২। বাবা ছিলেন পুলিশ বাহিনীর সামান্য কনস্টেবল। একটি অখ্যাত স্কুল থেকে পড়ালেখা শুরু করলেও কলেজ ও স্কুল জীবনে তিনি রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে পাশ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ইউনিভার সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধের নাম ছিল- “Reproducing Kernels and Operators with a Cyclic Vector.

সময় ১৯৬০ সাল। বিহার কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পাটনায় একটি গণিত কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক প্রফেসর জন ল কেলি উপস্থিত ছিলেন (Prof John L. Kelley)। কনফারেন্সে প্রফেসর গণিত বিষয়ে পাঁচটি ভিন্ন ধরণের সমস্যা উপস্থাপন করেন। সে সেমিনারে বশিষ্ঠ নায়ারণ’ও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন পদ্ধতিতে সবগুলো সমস্যার সমাধান করে দেখান। গণিতের উপর তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করায় সেই মুহূর্তেই University of California, Berkeley তে পড়ার আমন্ত্রণ পান। আমন্ত্রণ পেয়ে বশিষ্ঠ বলেন “আমার জন্যে আমেরিকায় যাওয়া কষ্ট হবে।“ কারণ তিনি এসেছিলেন একটি দরিদ্র পরিবার থেকে। ভাশিষ্ঠার কথা শুনে প্রফেসর আশ্বাস দেন তিনি সব ধরণের সহযোগিতা করবেন। প্রফেসর তাঁর কথা রাখলেন। তিনি বশিষ্ঠর জন্যে বিমানের টিকিট, ভিসার ব্যবস্থা করে UCB তে নিয়ে যান।

UCB তে গিয়ে বশিষ্ঠ প্রফেসরের মান রাখলেন। ভাশিষ্ঠা কিছুটা লাজুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তবে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে নাসাতে যোগ দেন। নাসাতে যোগ দিলেও বশিষ্ঠ মনে প্রাণে একজন জাতীয়তাবাদী মানুষ ছিলেন। দেশের জন্যে করা, দেশের মানুষের জন্যে কিছু করা তাঁর স্বপ্ন ছিল। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু হওয়া ভিয়েতনাম যুদ্ধ, একই সমাজে আমেরিকান সমাজে হিপ্পি আন্দোলন তীব্র হওয়া, সব কিছু মিলিয়ে বশিষ্ঠর মনে হয়তো জাতীয়তাবাদী চেতনা আরও বেশি দানা বেঁধে উঠেছিল।

বশিষ্ঠর নামে একটা গুজব আছে যে, তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধানের কন্যার সাথে সম্পর্ক করেন এবং বিয়েও করতে চান কিন্তু পিতা-মাতার চাপে ভারতে এসে বিবাহ করতে বাধ্য হওন। ১৯৭১ সালে তিনি জাইপুরের এক আর্মি অফিসারের মেয়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কোন এক অজানা কারণে বিবাহিত জীবন বেশি দিন স্থানীয় হল না। স্ত্রী বশিষ্ঠকে ছেড়ে চলে যান।

নাসায় অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে বলা হয়েছিল- গণিতে যদি কোনো নোবেল পুরস্কার থাকতো তবে সেটা তার’ই প্রাপ্য ছিল। তিন বছর কাজ করার পর ১৯৭৩ সালে তিনি নাসা’র (NASA) চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে আসেন। ভারত ফিরে এসে প্রথমে ISI কলকাতায় শিক্ষকতা করেন। এরপর Indian Institute of Technology Kanpur and TIFR Bombay জয়েন করেন। এরপর ১৯৭৪ সালে Bhupendra Narayan Mandal University (BNMU) তে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন।

ভারত আসার স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি Schizophrenia ভুগতে থাকেন। ভারতের নামি-দামী হাসপাতালগুলোতে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। তাঁর চিকিৎসার ভরণ পোষণ চালানোর মতন ক্ষমতা তাঁর পরিবারের ছিল না। অন্যদিকে বিহার সরকার কোন দায়িত্ব না নেওয়ায় তাঁর অবস্থা আরও বেশি শোচনীয় পর্যায় পৌছায়। এক সময় তিনি মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। চার বছর তাঁর কোন খোঁজ ছিল না।

একদিন তার বড় ভাই ও অন্যরা গিয়ে নিশ্চিত হয় এই তাদের সেই বশিষ্ঠ! বশিষ্ঠকে যখন গ্রামে ফিরিয়ে আনা হয় তখন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে গ্রামের সকল মানুষ বশিষ্ঠর সাথে দেখা করতে ভিড় জমায়। আপনারা যদি কখনো রাসেল ক্রোর বিখ্যাত “A Beautiful Mind” মুভিটি দেখেন তাহলে হয়তো এই রোগ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন। এমন রোগে আরও কিছু মানুষও আক্রান্ত। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি নাম Dr. John Nash। তিনি Princeton Unieversity তে অধ্যাপনা করতেন। তার উপরই A Beautiful Mind সিনেমাটি করা।

বশিষ্ঠর একটা শখ আছে সেটা হল তবলা বাজানো। ভারতে যতোগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন সবগুলো’তে তার আন্তরিকতার ছাপ রেখে যান। ভারত সরকার বশিষ্ঠর এই দেশ প্রেম, ভারতমাতার জন্যে নাসা ছেড়ে চলে আসা কোন কিছুর প্রতিদান দেয় নি। কিন্তু সাধারণ মানুষ যারা বশিষ্ঠ সম্পর্কে জানেন তারা ভারতের গণিতের জীবিত লিজেন্ট হিসেবে বশিষ্ঠকে আখ্যায়িত করে থাকেন।

তথ্য-সহায়তায়-
Vashishtha Narayan Singh: One forgotten mathematics legend of India
Disturbed Genius in Penury : Former IIT Prof. Vasistha Singh
Youtube এর কিছু ভিডিও।

About the Author:

মুক্তমনা ব্লগার। ব্যক্তিগত ব্লগের ঠিকানা: https://songsoptok.net (সংশপ্তক.নেট)

মন্তব্যসমূহ

  1. বিপ্লব রহমান আগস্ট 14, 2018 at 7:02 পূর্বাহ্ন - Reply

    এই শুনি জন সম্পর্কে জেনে ভাল লাগলো। লেখনিটি বেশ নিরস মনে হল। 👌

  2. Ashim আগস্ট 11, 2018 at 3:23 পূর্বাহ্ন - Reply

    এই প্রথম ওনার কথা শুনলাম…জানতে পেরে ভালো লাগলো…

    ধন্যবাদ দাদা…

  3. শাহজালাল দেওয়ান আগস্ট 9, 2018 at 6:34 পূর্বাহ্ন - Reply

    সত্যই অসাধারণ একটি প্রতিবেদন। খুবই ভাল লাগলোা ধন্যবাদ সুব্রত শুভ দা।

  4. কাজী সানজাদ হোসেন আগস্ট 8, 2018 at 5:05 অপরাহ্ন - Reply

    বশিষ্ঠ সম্পর্কে জেনে ভালো লাগলো। ধন্যবাদ সুব্রত শুভ দা।

মন্তব্য করুন