২০১৬ থেকে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের প্রবণতা এবং আইসিস আর তালিবানের তুলনামূলক ভূমিকা

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্য কোনদিকে যাচ্ছে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাপ্তরিকভাবে কোন ডাটাবেইজ কারণ ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টার (এনটিসি) সন্ত্রাসের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তথ্য প্রতিবেদন পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। যাইহোক যুক্তরাষ্ট্র এখন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ট ডাটাবেইজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈশ্বিক গতি প্রকৃতি নিয়ে বিশ্লেষণ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সন্ত্রাসবাদের তথ্য জানতে মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক প্রতিবেদনকেই ব্যবহার করে থাকে। ইরিন মিলার এবং মাইকেল ডিস্টলার ২০১৬ সালে প্রথমবারের মত ইরাক এবং আফগানিস্তানে বিপুল জনসাধারণের উপর বিস্ফোরক নিয়ে সন্ত্রাসী আক্রমণের উপর প্রতিবেদন পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তথ্য ও উপাত্তসহ প্রকাশ করে। লেখকদ্বয় ইরাক এবং আফগানিস্তানে আইসিস এবং আইসিস সমর্থিত তালিবান এবং অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের আক্রমণের আলোকপাত করেন। প্রধান প্রধান কয়েকটি হামলার নমুনা নিচের তথ্যচিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করা হল এবং সেই সাথে দেখা গেল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এই প্রতিবেদনে নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।

২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলায় ইরাকে এবং আফগানিস্তানে যত মানুষ নিহত হয়েছে তার পরিমাণ সারা পৃথিবীতে সংঘটিত সন্ত্রাসী আক্রমণে মৃতের সংখ্যার ৪৬ শতাংশ। এই সময়ে এই দুই দেশের মোট মৃতের সংখ্যার মধ্যে ইরাকে ১৩ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ১৫ শতাংশ মানুষ সন্ত্রাসী আক্রমণে নিহত হয়। আফগানিস্তানে মৃতের পরিমাণ বাড়ার পিছনে কারণ হল জঙ্গীযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সেনাবাহিনীর পরিচালিত অভিযানের ফলাফল। নিহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ হয় ২০১৪ সালে যখন ইরাকে ইসলামিক স্টেট এবং আফগানিস্তানে তালিবান জঙ্গিবাহিনীদের জঙ্গি তৎপরতা দ্রুত বাড়তে থাকে। তালিবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা এবং হামলায় মৃতের পাহাড় জমতে থাকে এবং ২০১৫ সালে মৃতের সংখ্যা বাড়তেই থাকে এবং ২০১৬ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। পক্ষান্তরে আইসিস নিয়ন্ত্রিত ইরাকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ২০১৫ সালে কিছুটা কম থাকলেও ২০১৬ সালে ভয়ানক আকার ধারণ করে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হামলার সূচকে দেখা যাচ্ছে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সন্ত্রাসী হামলা এবং হামলা থেকে মৃতের পরিমাণ অমতে থাকে। কারণ এই সময়ে আইসিস এবং তালিবান ইরাক, আফগানিস্তানের বাইরে তাদের কার্যক্রম বিস্তার করতে বেশি ব্যস্ত ছিল। এই সময়ে নাইজেরিয়া এবং পাকিস্তানেও সন্ত্রাসী হামলার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

Figure One: Key Trends in Terrorism: Worldwide and In Iraq and Afghanistan
Total fatalities in terrorist attacks in Afghanistan, Iraq, and worldwide, 2000 – 2016

২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী তথা ইরাক এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত মানুষের পরিমাণ

২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইরাক এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তু
Source: Erin Miller and Michael Distler, Mass Casualty Explosives Attacks in Iraq and Afghanistan, START Background Report, University of Maryland, June 2017,

এই প্রতিবেদনে কোন হামলার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে কীভাবে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা যায় বা সন্ত্রাসী কারা সেটা সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এখানে সিরিয়ায় আইসিস সন্ত্রাসীদের সম্পর্কেও কোন তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে প্রতিবেদন থেকে গেছে অসম্পূর্ণ ফলে সঠিক পরিপ্রেক্ষিতের সন্ত্রাসী প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য জানা আমাদের জন্য দুরূহ হয়ে পড়েছে কারণ স্টার্ট ডাটাবেইজ আসাদের শাসনামলের সন্ত্রাসীদের উত্থান এবং কার্যক্রম সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে এবং এসম্পর্কিত কোন তথ্য দিতে পারে না। তদুপরি এই প্রতিবেদন পরিষ্কার করেছে যে আইসিস হল জিহাদি জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠন বৃহত্তর হুমকির ক্ষুদ্র একটা অংশ-মাত্র। দ্বিতীয় লেখচিত্রে দেখতে পাবো বিপুল পরিমাণ সন্ত্রাসী হামলার পরিসংখ্যান যেটাকে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের জনযুদ্ধ।
Figure 2: Key Metrics for Suicide and Vehicle Bombings

Five countries that experienced the most suicide and vehicle bombings, 1970 – 2016

Source: Erin Miller and Michael Distler, Mass Casualty Explosives Attacks in Iraq and Afghanistan, START Background Report, University of Maryland, June 2017,

২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইরাকে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে তার মধ্যে ৭৮ শতাংশের ক্ষেত্রে কোন তথ্য প্রমাণ নেই যে কোন জঙ্গীগোষ্ঠী জঙ্গি হামলা করেছিল। বাকি ২২ শতাংশের মধ্যে ৯২ ভাগ হামলা করেছে আইসিস, আল-কায়েদা এবং তারা সেইসব হামলার দায় স্বীকার করেছিল। সাবেক মাহদি আর্মি বা বর্তমানের আসাইব আহল আল-হাক বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ধার্মিক মানুষের দল’ দুই শতাংশ হামলার জন্য দায়ী এবং অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে ছদ্মবেশী জঙ্গিদল ৩৯ শতাংশ হামলা পরিচালনা করেছে কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যমতে ৯৫ ভাগ হামলার সাথে তালিবান জড়িত। একই সময়ে ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখা আফগানিস্তানে ২ শতাংশ জঙ্গি হামলা চালিয়েছে এবং হাক্কানি নেটওয়ার্ক ১ শতাংশ হামলার জন্য দায়ী। অন্যান্য ছোটখাটো জঙ্গিদলগুলো মিলে ১ শতাংশ হামলা করেছে। এই তথ্য-উপাত্ত সতর্ক করে দিচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু আইসিস ইরাক এবং সিরিয়ার শহরাঞ্চলে তাদের কার্যক্রম সীমিত করলেও আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই কারণ বৃহৎ পরিসরে তারা সন্ত্রাসী হামলা জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথবা এমন হতে পারে ইরাক এবং সিরিয়া অঞ্চল ইতিমধ্যে বিভিন্ন ছোটখাটো জঙ্গীগোষ্ঠী বিদ্যমান এবং জাতিগত দ্বন্দ্বে এত-বেশি অস্থির যে আইসিস সেখানে খুব সুবিধা করতে পারেনি। কারণ ইরাক এবং সিরিয়াতে ধর্মীয় বিভেদ এবং জাতিগত দাঙ্গা আগে থেকেই গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবাদের গতি প্রকৃতির প্রতিবেদন থেকে সন্ত্রাসী আইসিসের হামলার সংখ্যা নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রের বা সন্ত্রাস-বিরোধী জোটের দ্বিধান্বিত হওয়ার সুযোগ নেই। আইসিসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশের পতন ঘটলেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেল। সন্ত্রাসবাদের হামলার দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিতে পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের সব দেশ এবং সর্বোপরি মুসলিম দেশগুলো এই ঝুঁকি মুক্ত নয়। জঙ্গিবাদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে যেকেউ কিন্তু এর নেতিবাচক নির্বিশেষে মুসলিম জনসাধারণ।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জঙ্গিবাদের গবেষক ইরিন মুলার গবেষণা সহযোগী শিহান কেইন, উইলিয়াম কামেরার এবং ব্রেইন উইংগেনরথ’র সহযোগিতায় ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের স্টার্টের প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ২০১৬ সালের আগস্টে। প্রতিবেদনে গবেষকদল জোরালোভাবে ইসলামিক স্টেট এবং তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।

২০০২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামিক স্টেট এবং তাদের সমমনা জঙ্গিদলগুলো ৪৯০০ বা তার ততোধিক সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করেছে। এই হামলাগুলোতে ৩৩০০০ এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন আরও ৪১০০০ নিরীহ মানুষ। জঙ্গি হামলায় ইসলামিক স্টেটের নিজেদের জঙ্গি সদস্যরাও আত্মঘাতী বোমা-হামলায় নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছে স্থাপনা, গাড়ি বা জনাকীর্ণ মানুষের সাথে। আইসিস ১১০০০ মানুষকে অপহরণ করে টাকার জন্য গোপন-স্থানে জিম্মি করে রাখে, কখনো বা মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাপী যত জঙ্গি হামলা হয়েছে যেগুলোর হামলাকারী চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি তার পরিমাণ ১৩ শতাংশ। ঠিক একই সময়ে ২৬ শতাংশ মানুষের জঙ্গি হামলায় মৃত্যু হয়েছে, ২৮ শতাংশ মানুষ আহত হয়েছে বা চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে এবং ২৪ শতাংশ মানুষকে অপহরণ করে জিম্মি হিসেবে বন্দী রাখা হয়েছিল। এই রিপোর্টে পরে শুধু আইসিস এর তথ্যের উপর আলোকপাত করা হয়েছে।

৩ নং লেখচিত্রে দেখা যাচ্ছে ইরাক এবং সিরিয়াতে আইসিস এবং আইসিস সমর্থিত জিহাদি সংগঠনের উপস্থিতি তুলনামূলক-ভাবে কমে গেছে। একই সাথে দেখা যাচ্ছে ইরাক এবং সিরিয়াতে তাদের কার্যক্রম পড়তির দিকে। একই সাথে সেখানে তারা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে এবং আইসিস সমর্থিত অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীদের উপর তাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যেকোনো সময়ের তুলনায় কম।

Figure Three: ISIS Role in Worldwide Attacks: 2002-2015
Attack Patterns of ISIL-Related and Non-ISIL-Related Terrorist Attacks, 2002-2015



Attack Patterns of ISIL-Related and Non-ISIL-Related Terrorist Attacks, 2002-2015
Source: Erin Miller, Sheehan Kane, William Kammerer, and Brian Wingenroth: Patterns of Islamic State-Related Terrorism, 2002–2015; START, August 2016

৩ নং লেখচিত্র অনুযায়ী আইসিসের তুলনামূলক তথ্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় পূর্বের পরিসংখ্যান থেকে বর্তমানে ইরাক এবং সিরিয়া তথা বিশ্বব্যাপী আইসিসের সন্ত্রাসী হামলার পরিমাণ কম হয়েছে। আইসিস এবং আইসিস সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীদের সামগ্রিক তথ্য দেখা যাচ্ছে ৪ নং লেখচিত্রে। ইরাক এবং সিরিয়াতে তারা পরাজিত হয়ে ভার্চুয়ালি হয়ত টিকে থাকবে অথবা তারা অন্যকোন জঙ্গিদলের ভিড়ে নিজেদের মিশিয়ে ফেলবে।

Figure Four: The Role of Key ISIS “Affiliates”
Ten Most Active ISIL Affiliates, 2014-2015Attack Patterns of ISIL-Related and Non-ISIL-Related Terrorist Attacks, 2002-2015



Source: Erin Miller, Sheehan Kane, William Kammerer, and Brian Wingenroth: Patterns of Islamic State-Related Terrorism, 2002–2015; START, August 2016
Figure Four: The Role of Key ISIS “Affiliates”

Ten Most Active ISIL Affiliates, 2014-2015

All Organizations Classified as ISIL “Affiliates” in the START Study, 2014-2015

Map of ISIS Proper in Syria and Iraq and ISIS Affiliates Outside the Key Zone of Combat

Source: Erin Miller, Sheehan Kane, William Kammerer, and Brian Wingenroth: Patterns of Islamic State-Related Terrorism, 2002–2015; START, August 2016

সংক্ষেপে বলা যায়, ইরিন মিলার, মাইকেল ডিস্টলার, শিহান কেন, উইলিয়াম কামেরার এবং ব্রায়ান উইঙ্গেনরথ গবেষণার মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করছেন, ইরাকে বা সিরিয়াতে আইসিসের যাকিছুই ঘটুক না কেন, জিহাদ এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্বরূপ বিশ্বব্যাপী একই রকম এবং এর হুমকি বারংবার ফিরে আসবে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুগে যুগে স্থায়ী থাকবে।

মূল প্রবন্ধ‍-Global Trends in Terrorism Through 2016 and the Relative Role of ISIS and the Taliban
By Anthony H. Cordesman

মন্তব্যসমূহ

  1. Ashim আগস্ট 11, 2018 at 3:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    জঙ্গিবাদ নিপাত যাক….

    যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায় এখানে ছোটবেলা থেকেই মাদ্রাসাগুলো থেকে জঙ্গিবাদ, জিহাদ শেখানো হয় যা নিয়ন্ত্রন করতে না পারলে বাংলাদেশ কখনোই প্রকৃতপক্ষে শান্তির দেশ হবে না…..

  2. সাজ্জাদ সবুজ আগস্ট 7, 2018 at 9:21 পূর্বাহ্ন - Reply

    ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে যেসব উগ্রপন্থী ছেলেগুলো হামলা চালালো ওরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলো ‘পিস টিভি’ থেকে, এই চ্যানেল যেটা জাকির নায়েকের ছিলো বাংলাদেশে অনেক মানুষ এমনকি নারীরাও দেখতেন (যদিও না বুঝে)।

মন্তব্য করুন