মুহসীন হলের সেভেন মার্ডার

পূর্ব-পাকিস্তানের ছাত্রলীগ আর স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্রলীগের মধ্যে আছে আকাশ-পাতাল তফাৎ। শুধু ছাত্রলীগ নয় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও বর্তমান আওয়ামী লীগের বেলায়ও একই কথা খাটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ছাত্রলীগের গ্রহণযোগ্যতা বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন ছিল তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ডাকসু নির্বাচনে। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ জয় লাভ করতে পারেনি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের দিয়ে মুজিব বাহিনী সৃষ্টি হয় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিরাজুল ইসলাম খান, যিনি পরবর্তীতে’জাসদ’ ও ’জাসদ ছাত্রলীগ’ গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমান ছাত্রলীগ পূর্ব-পাকিস্তানের মোনায়েম খানের ছাত্র সংগঠন এন এস এফের মতন বিকশিত হচ্ছে। বর্তমান ছাত্রলীগকে দেখলে বোঝার উপায় নেই তাদের এক সময় গৌরবের ইতিহাসও ছিল। যারা পাকিস্তান আমলে ১১ দফার মতন দাবী উত্থাপন করেছে। শুধু তাই তৎকালীন স্বতন্ত্র সংগঠন হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর মতন নেতাকেও বিভিন্ন দাবী-দাওয়ায় সংগঠনটি চাপ প্রয়োগ করতে। কিন্তু সব কিছুই বদলে যেতে শুরু করে স্বাধীনতার পর। ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতার হাতে টেন্ডার তুলে দেওয়ায়; কালের বিবর্তনে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হয়। ১৯৭৪সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭জন ছাত্রলীগ নেতা খুন হয়। সাত খুনের মামলার প্রধান আসামী আর কেউ নয়; তিনি তৎকালীন ছাত্রলীগ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান! প্রতিপক্ষ গ্রুপকে খায়েল করতে শফিউল বেছে নেয় খুনের রাজনীতি। শফিউল ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

শফিউল আলম প্রধান

পরবর্তীতে পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে এই হত্যাযজ্ঞে শফিউল আলম প্রধান সরাসরি জড়িত। যদিও শফিউল আলম সব সময় বলে আসছেন তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই নারকীয় ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের তদন্তে বলা হয়। বিচার কাজ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর আমলেই বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ’৭৫-এর পর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। বরং জিয়া সরকার আমলে তাকে বিএনপিতে যোগদানের শর্তে ক্ষমা ঘোষণা করে মুক্তি দেওয়া হয়। জিয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে সারা জীবন জিয়াউর রহমানের দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। শুধু সাত খুনই নয় পরবর্তীতে সোনা ডাকাতির মামলায়ও শফিউল জড়িয়ে পড়েন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের দুরবস্থা নিয়ে বাংলা সাহিত্যের অনন্য গ্রন্থ ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’র লেখক সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দিন দৈনিক সংবাদে ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ কলামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে লিখেন ‘এইটি একটি মূর্খতা সম্প্রসারণ কেন্দ্র’। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আহমদ ছফার “গাভী বৃত্তান্ত “ বইয়ের নাম কারো অজানা নয়। গত বছর (২০১৭) সাংবাদিক ফজলুল বারী শফিউল আলমকে নিয়ে একটি কলাম লেখেন। সেখান থেকে ১৯৭৪ সালে ঘটনার বর্ণনা তুলে দেওয়া হল:

“এই ঘটনাটি চলুন আবার একটু জানি। ৪ এপ্রিল ১৯৭৪। দিবাগত রাত ১টা ২৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে প্রথম ২/৩ রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বে একদল অস্ত্রধারী সূর্যসেন হলের পঞ্চম তলায় ওঠে প্রথমে ৬৩৪ নম্বর রুমের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে কোহিনুর নাম ধরে ডাকতে থাকে। রুমের ভেতর থেকে এক ছাত্র পাশের রুমে যোগাযোগ করতে বলার পর অস্ত্রধারীরা পাশের ৬৩৫ নম্বর কক্ষের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কাধাক্কি করতে থাকলে দরজা খুলে দেন নাজমুল হক কোহিনুর। অস্ত্রধারীদের নির্দেশমতো মাথার ওপর হাত তুলে বের হন কোহিনুরসহ ওই রুমে থাকা আরো ছাত্র। অস্ত্রধারীদের অপর একটি যায় গ্রুপ ৬৪৮ নম্বর রুমে।

ওই রুম থেকে আরও ৩ জন ছাত্রকে একই কায়দায় বের করে নামিয়ে আনতে থাকে হলের নিচে। দোতলা পর্যন্ত নামার পর অস্ত্রধারীরা ২১৫ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে আরও ১ এক ছাত্রের খোঁজ করতে থাকলে বিপদ আঁচ করতে পেরে ওই ছাত্র জানালা ভেঙে দোতলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েন। অস্ত্রধারীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পলায়নরত ওই ছাত্রকে জানালা দিয়ে গুলি করতে থাকে। ছাত্রটি পালিয়ে যাওয়ার পর দু’রুম থেকে অস্ত্র তাক করে নিয়ে আসা ৭ সাত জন হতভাগ্য ছাত্রকে সূর্যসেন হল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় মুহসিন হলে। রাত ২টা চার মিনিট। মুহসিন হলের টিভি রুমের সামনের করিডরে ওই ৭ ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। রক্তে ভেসে যায় পুরো করিডর। রাত ২টা ১১ মিনিটে গুলিবিদ্ধ ওই ছাত্ররা ছটফট করতে করতে সেখানেই প্রাণ হারান। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর অস্ত্রধারীরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে রাত ২টা ২৫ মিনিটে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে সামান্য দূরে পুলিশ ফাঁড়ি। আর অন্যদিকে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। অস্ত্রধারীরা হত্যাযজ্ঞ শেষ করে রাত ২টা ২৫ মিনিটে ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়ার আড়াই ঘণ্টা পর ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ৭ (সাত) ছাত্রের লাশ ময়নাতদন্তের জন্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়।

মুহসিন হলে নিহত ছাত্রলীগের সেই নেতাকর্মীরা হলেন, (১) নাজমুল হক কোহিনুর, সোশিওলোজি এমএ ২য় পর্ব, গ্রাম বৈলা, রূপগঞ্জ। (২) মো. ইদ্রিস, এমকম ১ম পর্ব, ১১৫/১১৬ চক মোগলটুলী, ঢাকা। (৩) রেজওয়ানুর রব, প্রথম বর্ষ (সম্মান), সোশিওলোজি, ৩৯/২, পাঁচ ভাই ঘাট লেন, ঢাকা। (৪) সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ, প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, ৩৪ ঠাকুর দাস লেন, বানিয়ানগর, ঢাকা। (৫) বশিরউদ্দিন আহমদ (জিন্নাহ), এমকম ১ম পর্ব, ২৯ ডিস্ট্রিলারি রোড, ঢাকা। (৬) আবুল হোসেন প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, পাইকপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এবং (৭)) এবাদ খান, প্রথম বর্ষ (সম্মান) সোশিওলোজি, পাইকপাড়া, ধামরাই।“

বঙ্গবন্ধুর আমলে এই খুনি মশিউরের মৃত্যুদণ্ড ও অন্য অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন সাজা হলেও ৭৫-এর পটপরিবর্তনের ফলে জিয়ার আসলে সে মুক্ত হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদচাষ কিংবা মেধাবীদের অভি’দের মতন হাজারো তরুণের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া মতন কাজ জিয়াউর রহমান খুব নিষ্ঠার সাথে করেছিলেন। তবে আমাদের বিষয় শফিউলের খুনের মামলার বিষয় নয় বরং সাত খুনের ঘটনায় তৎকালীন ছাত্রলীগের ইতিহাস কার্যক্রম নিয়ে, যারা তাদের সাত খুনের প্রধান আসামী মুক্তির দাবীতে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। সাত খুনের মধ্য দিয়েই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ খুনের ধারাবাহিকতা শেষ হয় নাই! পরবর্তীতে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সংগঠক বাদলের মতন অসংখ্য নেতা ও কর্মী নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতেই খুন হন।

সাত খুনের ঘটনায় সারা বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দেয়।। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতন বিদেশী পত্রিকায় খবরটি ফলাও করে ছাপা হয়। ঘটনার পরবর্তী সময় বিভিন্ন সংগঠন এই খুনের বিচার দাবী করে এবং তৎকালীন সরকার বিষয়টাকে বেশ সিরিয়াসলি গ্রহণ করে। মজার বিষয় হল এই খুন যার নেতৃত্বে হয়েছে সেই শফিউল পরের দিন গ্রেফতার এড়াতে ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরীর সাথে সংগঠন হতে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে পত্রিকায় বিবৃতি দেন এবং শোক সভার আয়োজন করে। শোনা যায়, রাতে ৭ জনকে হত্যা করে সকালে ঢাকা মেডিকেলে লাশের পায়ের কাছে বসে এই ঘাতক শফিউল আলম প্রধানকে অনেকে কাঁদতে দেখেছিলো!

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে মহসিন হল, সূর্যসেন হল ও জহুরুল হক হলে পুলিশ, বিডিআর ও রক্ষীবাহিনী একসাথে তল্লাসি পরিচালনা করে। অন্যদিকে ছাত্রলীগ সারা দেশে শোক দিবসের আহ্বান করে। শফিউল আলম প্রধানসহ ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে তৎকালীন ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে। সাত খুনের বিচারের দাবী, খুনি সম্পাদকের মুক্তির দাবীতে ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এর মধ্যে ক্যাম্পাসে গ্রেনেড হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের এক ছাত্রী আহত হয়! ৪ এপ্রিলের সাত খুনের পর ও ৮ এপ্রিলের ক্যাম্পাসে গ্রেনেড হামলায় ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় প্রশাসন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৬ জুন পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া সারাদেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ হরতাল পালন করে। ছাত্রলীগ শুধু গ্রেফতারকৃতদের মুক্তিই দাবী করেনি; তারা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যান এবং সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয়। একজন খুনি সম্পাদকের জন্যে ছাত্রলীগ কতোটা সংগ্রাম করেছে তা আমরা পত্রিকা পাতাতে দেখতে পাই।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মনসুর আলী যিনি মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে (প্রথমে যোগাযোগ ও পরে স্বরাষ্ট্র এবং যোগাযোগ মন্ত্রী) দায়িত্ব পালন করেছেন । ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের গ্রেফতার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন-সরকার সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই মশিউর আলম প্রধানকে গ্রেফতার করেছে। ছাত্রলীগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্যেও বিরোধিতা করে।

শাসকদের ছায়ায় বাংলাদেশের কোন ছাত্র সংগঠনের ভাল কোন ইতিহাস নেই। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশ শাসক শ্রেণি সবসময় তাদের ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে ছাত্রলীগের (পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রলীগ নয়) ইতিহাস ও আদর্শের সাথে ছাত্র দলেও তেমন কোন তফাৎ নেই। টেন্ডার দখল হালাল করার জন্যে “জয় বাংলা” কিংবা “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগানে মুখরিত হয়। যার মূল উদ্দ্যেশই হল লুণ্ঠন। আর তাদের এই লুণ্ঠনে বলি হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও কর্মীরা। গত ৪০ বছরে (১৯৭২-২০১২) দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ জন ছাত্র। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ছাত্র মারা যান।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ভয়ংকর ছাত্র সংগঠন হচ্ছে শিবির যারা পূর্ব-পাকিস্তানে “ছাত্র সংঘ” নামে পরিচিত। স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের গণহত্যায় এরাই ছিল মূল সহকারী। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন কৌশলে এরা ক্যাম্পাসে একটিভ হওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা নাম পরিবর্তন করে নাম নেয় “ছাত্র শিবির”। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় ছাত্র শিবির ক্যাম্পাসগুলোতে রগ টাকার জন্যে বিখ্যাত হয়ে যায়।। ক্যাম্পাসগুলোতে রগ কাটা ও শিক্ষক হত্যার ধারা অব্যাহত রাখে শিবির। বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীর অধিকাংশ কর্মী এই সংগঠনের সাবেক সাথী। শিবির তার অপকর্ম ঢাকবার জন্যে সারা দেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন চেহারায় বিভিন্ন সংগঠনের জন্ম দেয়। ‘বহদ্দারহাট ট্রাজেডি’ জন্যে দেশ ব্যাপী তারা আবারও আলোচিত হয়।শিবির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের আটজন নেতা-কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। এছাড়া বিএনপি জামাতের আমলে বিভিন্ন শিক্ষক হত্যায় এই সংগঠন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।

বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজই হচ্ছে বড় দলগুলোর লাঠিয়াল হওয়া। এর বিনিময়ে এরা কেউ নেতা হয়, কেউ টেন্ডার হয় অন্যরা ক্যাম্পাসের হল গুলোতে ফাও খায়। এরা কতোটা ফাও খায় তা নিয়ে একবার একটা ব্লগও লিখেছি। আগ্রহীরা পড়তে পারেন-ফাও খাওয়া। বর্তমানে ছাত্র সংগঠনগুলো মানুষের গণশত্রুতে রূপান্তরিত হয়েছে। হল দখল, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হলে বসে পানির ব্যবসা, মাদকের ব্যবসা, রগ টাকতে ক্যাডার ভাড়া করা! কোনটাই বাদ যাচ্ছে না আজ ভার্সিটিগুলোতে। বর্তমান ছাত্রলীগ শিক্ষকদের উপর হামলা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর অত্যাচারসহ ন্যায় দাবী-দাওয়ায় যেভাবে হামলা করছে সেদিন আর বেশি দেরি নিয় যেদিন ছাত্র শিবিরের মতন ছাত্রলীগও সবার কাছে ভয়ানক সংগঠন হিসেবে আর্বিভুত হবে। ইতোমধ্যে বদরুলের ঘটনায় (প্রেমিকাকে কোপানো), কোটা আন্দোলনের শিক্ষার্থীর উপর হাতুড়ি পিটিয়ে ছাত্রলীগ হাতুড়ি লীগ সহ বিভিন্ন উপাধিদের ভূষিত হয়েছে। অতীতে জাহাঙ্গীর নগরের সেঞ্চুরি মানিক কিংবা ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর থার্টি ফার্স্ট নাইটে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছাত্রলীগ নেতা রাসেল, মামুন শাওন আক্তার বাঁধন নামক এক তরুণীকে যে বিবস্ত্র ও ধর্ষণের চেষ্টা করে সে ঘটনা কারও অজানা নয়। সে ঘটনায় সারা দেশে ধিক্কার ও নিন্দার ঝড় উঠেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক মৃত ঘোড়ায় পরিণত হয়েছে; যারা ইতিহাস আছে বর্তমান নেই, যার পূর্ব-পুরুষের কথা বলা ছাড়া নিজের কোন কথা নেই। সন্ত্রাসবাদ শুধু নিজেদের ধ্বংস করেনি সেই সাথে ধ্বংস হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন একটি প্রতিষ্ঠান। আর এই জন্য দায়ী-সরকারী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, আমি, আপনি সবাই। বর্তমান ছাত্রলীগ যদি এখনও অতীত থেকে শিক্ষা না নেয় তাহলে হয়তো আর বেশি দেরি নেই-জনসম্মুখে ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীরা গর্ব করে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়টা দিতে সংকোচ বোধ করবে। ত্যাগী ও দেশ প্রেমিক ছাত্রলীগের উচিত নিজের স্বার্থে, নিজেদের সম্মানের জন্যে সরকারের দাসত্ব ছেড়ে সংগঠন ও নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা। না হলে, অতি শীঘ্রই সংগঠনটি গণশত্রুতে রূপান্তরিত হবে। ভুলে যাওয়া উচিত নয়;”যারা লাথি মারে ইতিহাস তাদের মুছে ফেলে যারা লাথি খায় তারাই হাতমুঠো ক’রে উঠে দাঁড়ায়”-নবারুন ভট্টাচার্য

সহায়তায়:
শফিউল আলম প্রধানদের রাজনীতি- ফজলুল বারী
বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন হয়, সাজা হয় না-শরিফুল হাসান
পত্রিকার কপির ঋণ স্বীকার: PID, Ministry of Information

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. শাহজালাল দেওয়ান জুলাই 26, 2018 at 7:20 পূর্বাহ্ন - Reply

    ছাত্রলীগ শুধু ঘৃনাই পাবে…ওদের কাজ দেখে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে দিন দিন..

  2. নীলাঞ্জনা জুলাই 22, 2018 at 8:35 পূর্বাহ্ন - Reply

    ছাত্রলীগের কাছে আজ শিবিরও পরাজিত।

    • সুব্রত শুভ জুলাই 26, 2018 at 1:44 পূর্বাহ্ন - Reply

      শিবিরের মতন ভয়ংকর জঙ্গি গোষ্ঠীকে ছাত্রলীগ কখনো ছাড়িয়ে যেতে পারবে না।। এর মূল কারণ ছাত্রলীগের দৌড়- ঐ সরকারের লাঠিয়াল কিংবা টেন্ডার দখল করা পর্যন্ত।। শিবিরের সাথে মারামারিতে ছাত্রলীগের অসংখ্য কর্মী নিহত হয়েছে। কারণ শিবির ভয়ংকর।। আমার এলাকায় ছাত্রদল ও শিবির মারামারি করার সময় শিবির এসিড নিয়ে এসেছিল। এছাড়া শিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক হত্যা করেছে বিশেষ করে; চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিবির এখন প্রকাশ্যে সেভাবে নেই, তার মানে কেউ তাদের অভ্যাস ও ইতিহাস ভুলে যায় নাই।।

  3. বন্যা আহমেদ জুলাই 20, 2018 at 11:05 অপরাহ্ন - Reply

    ছাত্রলীগ নিয়ে এখনো আশা বাকি আছে?

    • সুব্রত শুভ জুলাই 21, 2018 at 12:34 পূর্বাহ্ন - Reply

      আপা, ছাত্রলীগ নিয়ে তো খোদ ছাত্রলীগই আশা করে না।। লেখার শেষে একটু উপদেশ দিলাম আরকি! 😀

  4. কাজী সানজাদ হোসেন জুলাই 18, 2018 at 6:28 অপরাহ্ন - Reply

    ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তান আর এখনকার বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্যটা কি? হ্যাঁ পার্থ্যক্য আছে বহু, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আপনার এই লেখাটা, রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, শোনা যায় তিনি নাকি খুব কড়াকড়িভাবে দেশ চালাতেন, তাহলে তখন ১১ দফা বা ৬ দফা আন্দোলন উত্থাপিত হলো কিভাবে? আবার ১৯৬৯ সালে একটা বড় আন্দোলন দেখে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং পরে আর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেবেন না বলে ঘোষণা দেন যদিও তিনি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে দেশের অবস্থা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে যান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনী সদর দপ্তরে খাজা ওয়াসিউদ্দীন নামের নাকি একজন বাঙ্গালী অফিসার কর্মকরত ছিলেন যার পদবী ছিলো লেফটেন্যান্ট-জেনারেল। যাই হোক ওটা কথা না, কথা হলো আইয়ুব খানের শাসনামলের সঙ্গে বর্তমান যুগের বাংলাদেশের শাসনের পার্থক্যটা কোথায়? আর আগামী ২৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান তার দল ‘তেহরিক-ই-ইনসাফ’ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন আবার এই নির্বাচন হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যেটায় দেশটির সাবেক প্রধান বিচারপতি নাসিরুল মুল্ক ‘কেয়ার টেকার প্রাইম মিনিস্টার অব পাকিস্তান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এগুলো দ্বারা কি বোঝায়? ষাটের দশকের আন্দোলন কিসের জন্য হত? আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দিয়েছিলো কারাগারে আটকানোর পরে আবার জেনারেল ইয়াহিয়া খানও তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে দেশকে খণ্ডিত করার জন্য আন্দোলনের অজুহাত এনে তাঁকে মারতেও পারতেন কিন্তু মারেননি।

মন্তব্য করুন