কেন মানুষ সমকামী বিষমকামী বা উভকামী হয় সে বিষয়টা নিয়ে সাধারণ জনগণের মধ্যে রয়েছে অনেক রকম আগ্রহ, প্রশ্ন এবং ধোয়াশা। তবে বর্তমান অবস্থায় গবেষণাগুলো মানুষের যৌনতা বুঝার ক্ষেত্রে নব জানালার উন্মেষ ঘটিয়েছে।

সমকামিতা আদৌ জিনগত জিনা তা নিয়ে ক্রস কালচারাল প্রমাণ থেকে প্রাথমিক আলোচনা করা যাক। প্রাথমিক প্রশ্ন হতে পারে, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স জিনিসটা কী?

ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স হলো, কোনো প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কয়েকটি গবেষনা আর তার ফলাফলকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা। এরকম তুলনা করে যখন একটি সিদ্ধান্তে পৌছানো হয়, তখন বলা হয়, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স থেকে এটা প্রমানিত অমুক বিষয়টি সঠিক।

আর্কাইভ অব সেক্সুয়াল বিহেভিয়ার যৌনাচারণ প্রসঙ্গে এক গবেষনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে [১]; যার শিরোনাম ছিল “যৌনতার ধাঁধা”। আলবার্ট্রার লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের [২] গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, ক্রস কালচারাল ইভিডেন্স থেকে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সাধারণ জেনেটিক ফ্যাক্টর, পুরুষের সমলিঙ্গে যৌনতা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।[৩]

উত্তর মেক্সিকোর প্রাচীন সম্প্রদায় আছে যাদেরকে বলা হয় জাপোটেক (Zapotec) সম্প্রদায়। এ সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে দেখা যায় তারা পুরুষের প্রতি যৌনতাড়িত হয়। তারা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবেও বিবেচিত: তাদের মধ্যে যারা আচরণগতভাবে পুরুষ প্রকৃতি প্রদর্শন করে তারা পরিচিত মুক্সে নুগুইও (Muxe nguiiu) নামে আর যেসব মুক্সে পুরুষ নারী আচরণ প্রদর্শন করে তারা পরিচিত মুক্সা গুনাহ (muxe gunaa) নামে। পশ্চিম সংস্কৃতিতে তারা স্বতন্ত্র্যভাবে গে এবং রূপান্তরিত নারী হিসেবে পরিচিত হবে।

জৈবিকভাবে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের প্রতি আকর্ষণকে বলা হয় পুরুষ এণ্ড্রোফিলিয়া। এবিষয়টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে দেখা যায়। এরকম পুরুষ এণ্ড্রোফেলিয়া দেখা যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রস্তাবনা করা হয়েছে, একই মায়ের একাধিক বড় ভাই থাকার কারণকে। যেখানে বলা হয়েছে, একাধিক বড় ভাই থাকলে, ছোট ভাইয়ের সমকামী হবার সম্ভাবনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। পুরুষের বড় ভাই থাকার সাথে তার সমকামিতার কী সম্পর্ক তা বিস্তৃতপরিসরে জানতে বিজ্ঞানযাত্রায় প্রকাশিত আর্টিকেল পড়তে পারেন (ক) এবিষয়টি পাশ্চাত্য [৪] আর সামোয়া সংস্কৃতি[৫] উভয়তেই সুস্পষ্টরূপে দেখা যায়।

পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সমকামী ও বিষমকামীদের তুলনা করলে একটা অদ্ভুৎ ফলাফল দেখা গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, সমকামীরা তাদের প্রিয় মানুষ গুলো থেকে, তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, এমন আশঙ্কায় ভুগেন। এ আশঙ্কার হার বিষমকামীদের চেয়ে তুলনামুলক বেশি[৬] সামোয়া দ্বীপে গবেষনায় দেখা গিয়েছে, তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত ফাফাফাইন, যারা জৈবিক ভাবে পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তারা শৈশবে সামোয়ার বিষমকামীদের তুলনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেশি ভুগে।[7] বিবর্তনের গতিপ্রক্রিয়ায় কেন সমকামিতা বিলুপ্ত হলো না, তা বিস্তৃতপরিসরে অনুবাদ হিসেবে রুপবান ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।(খ) পশ্চিমা এবং সামোয়া উভয় সংস্কৃতিতে এই প্যাটার্ন পাওয়ার পর গবেষকরা একেবারে ভিন্ন সংস্কৃতির দিকে নজর দেন। মেক্সিকোর ওয়াস্কা রাজ্যে তারা গবেষনা করেন।

১৪১ জন বিষমকামী নারী, ১৩৫ জন বিষমকামী পুরুষ এবং ১৭৮ জন মুক্সের (৬১ জন মুক্সে নুগুইয়ু এবং ১১৭ জন মুক্সে গুনা) উপর গবেষনা করা হয়। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সে তাদের দুশ্চিন্তা, বিভিন্ন মর্মবেদনা কেমন ছিল তা নিয়েই প্রশ্ন করা হয়।

বিষমকামীদের সাথে তুলনা করার পর দেখা গিয়েছে মুক্সেদের শৈশবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তুলনামুলক উচ্চতর। একই বিষয় দেখা গিয়েছে কানাডা ও সামোয়ার সমকামীদের (গে) মধ্যে। সমকামী নারীরা যাদের মেক্সিকোয় মুক্সে গুনা বলা হয়, তারাও সমান্তরাল উদ্বিগ্নতায় ভুগেছে, বলে গবেষেনা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।

এ ফলাফলগুলোর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বিবেচনা করলে, সামাজিক অবস্থাকে এখানে ধর্তব্যের মধ্যে আনা যাবে না, কারণ পুর্বোক্ত গবেষনা দেখিয়েছে, এই উদ্বিগ্নতার বিষয়টি উত্তরাধিকার সুত্রে প্রবাহিত হয়, যা শিশুর স্বভাবে পরবর্তীতে প্রকট হয় [৮]। যাইহোক, জৈব মেকানিজম, এ প্রসঙ্গে আরেকটি ভিন্ন বিষয় জানিয়েছে, তা হলো নারীত্বসুচক হরমোন (female typical sex steroid hormone) জন্মপুর্ব ক্রমবিকাশমান থেকেই সক্রিয় হয়ে পুরুষ মস্তিষ্ককে নারীর মত গঠন করে, এবং যৌন অভিমুখিতা তৈরী করে, যা উদ্বিগ্নতা ও অনুরক্ততাকে প্রভাবিত করে। [৯] এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, সমকামিতার সাথে উদ্বিগ্নতার একটা সংযোগ আছে, আর উভয়ের সাথে কমন ফ্যাক্টর হরমোনের সংযোগ আছে।

তবে এসবকিছুর উপরে আরো একটি পর্যবেক্ষণ আছে, তা হলো, আনবিক জিনপ্রকৌশল থেকে দেখা গিয়েছে এক্স ক্রোমোজমের শীর্ষে অবস্থিত এক্সকিউ২৮ উদ্বিগ্নতার[১০] বহিঃপ্রকাশ এবং পুরুষ অনুরক্ততায়[১১] জড়িত থাকে। এই গবেষনা থেকে বুঝা যায় একই জিন দুই অভিব্যক্তি প্রকাশে দায়ী থাকে। জমজের উপর করা করা গবেষণা থেকে ইতোমধ্যে প্রমাণিত যে, পুরুষে সমলিঙ্গে আকর্ষণ [১২] এবং তার স্নায়ুপীড়ার জন্য (উদ্বিগ্নতা সৃষ্টিতে) জিনগত কারণ নিহিত রয়েছে।[১৩]

নিভৃতচারী সমকামী থেকে (closet gay) প্রকাশ্যে এসে জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে প্রায় সব সংস্কৃতির সমকামীরাই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হবার একটা আশঙ্কায় ভুগে। অর্থাৎ, সমকামিতা এবং উদ্বিগ্নতা এ যেন একে অপরের পরিপুরক। আর উভয়কেই নির্ধারণ করছে কমন ফ্যাক্টর। হোক তা একইরুপ হরমোন অথবা একই জেনেটিক মার্কার।

এবার পাঠক আসা যাক, সমকামিতার সাথে প্রকৃতপক্ষে জিন আছে কি নেই, সে প্রসঙ্গে।

১৯৯০ তে ডিন হ্যামার সর্বপ্রথম সমকামিতার সাথে জেনেটিক সংযোগ আছে, এরকম এক প্রস্তাবনা করেন।[১৪] যা তৎকালীন সময়ে স্যাম্পল বায়াজ ইস্যুতে বিতর্কিত হয়। পরবর্তীতে সরকারীভাবে তদন্ত করে দেখা হয়, হ্যামার কোনো রকম ছলচাতুরী করেন নি।[১৫]

২০০৩ সালে মানব ইতিহাসে দিগন্ত সৃষ্টিকারী হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট সম্পন্ন হয়। ২০০৭ সালে এই প্রজেক্টের হেড ফ্রান্সিস এস কলিন্সের সমকামিতা [১৬] নিয়ে বলেছেন, সমকামিতার জিন আছে, তবে শুধুমাত্র জিনই কোনো আচরণ প্রকাশের জন্য শতভাগ দায়ী তা ঠিক নয়।

২০১৪ এযাবৎকালে সমকামীদের উপর করা বৃহত্তর গবেষনায় [১৭] গবেষকরা দেখেন পুরুষ সমকামিতার জন্য ৮ নং ক্রমোজমের পেরিসেন্ট্রোমিক এলাকা আর এক্সকিউ২৮ দায়ী। এই ফলাফল কিন্তু ডিন হ্যামারের গবেষনাকে সমর্থন করেছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে করা এপ্রসঙ্গে সর্বশেষ গবেষনা, সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটায়। এই গবেষনা প্রতিবেদন ন্যাচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সমকামিতার জন্য দায়ী এরকম স্বতন্ত্র দুইটি জিন প্রাপ্তির খবর[১৮]। ২০১৭ সালের এই গবেষনা সম্বন্ধে বিস্তারিত পরিসরে পড়তে বিজ্ঞানযাত্রায় প্রকাশিত আর্টিকেল টা পড়া যেতে পারে(গ)।

এই যে এত তথ্য এত উপাত্ত এরপরেও কী আপনার মনে হয়, সমকামিতার সাথে জিনগত কোনো সংযোগ নেই? ওয়েল তাহলে কী আপনার মনে হয় না, আপনার কোনো চিকিৎসক অথবা নিদেনপক্ষে কোনো মনস্তাত্ত্বিকের কাছে যাওয়া উচিত।

তথ্যসুত্র

১) https://link.springer.com/journal/10508/46/1/page/1
২) http://people.uleth.ca/~paul.vasey/PLV/Lab.html
৩) https://link.springer.com/article/10.1007/s10508-016-0917-x
৪) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/15302549
৫) https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/28261795
৬) http://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0191886914001779
৭) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/27987088
৮) http://www.simonandschuster.com/books/The-Nurture-Assumption/Judith-Rich-Harris/9781439101650
৯)http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19210806
১০) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/22231481
১১) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/25399360
১২) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19172387
১৩) http://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/19588238
১৪) http://science.sciencemag.org/content/275/5304/1251.2
১৫) https://www.newscientist.com/article/dn26572-largest-study-of-gay-brothers-homes-in-on-gay-genes/
১৬) http://educateforlife.org/homosexuality-hardwired-concludes-dr-francis-s-collins-head-human-genome-project/
১৭) https://www.cambridge.org/core/journals/psychological-medicine/article/genomewide-scan-demonstrates-significant-linkage-for-male-sexual-
১৮) https://www.nature.com/articles/s41598-017-15736-4

ক) https://bigganjatra.org/fraternal-birth-order-effect/

খ) https://roopbaan.org/2018/05/11/সমকামিতার-বিবর্তনগত-কোনো/

গ) https://bigganjatra.org/genes-for-homosexuality/

অতিরিক্ত তথ্যসুত্রঃ
https://www.scientificamerican.com/article/cross-cultural-evidence-for-the-genetics-of-homosexuality/

[324 বার পঠিত]