অনন্ত

অনন্তের সাথে আমার প্রথম পরিচয় কবে মনে নেই, ২০০৩, ২০০৪? তবে মনে আছে, ২০০৬ সালে যে বার দেশে গিয়েছিলাম তখন ও ঢাকায় এসেছিল আমার আর অভির সাথে দেখা করতে। ২০০৭ সালে আমার বিবর্তনের পথ ধরে বইটার ইনডেক্স বানিয়ে দিয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘আর ধৈর্য নেই, ইনডেক্স ছাড়াই বই হোক’; ও জোর করেছিল, বলেছিল, ‘না দিদি তাহলে ভাল দেখাবে না, আমি ঢাকায় গিয়ে কয়েকদিন থেকে বানিয়ে দিচ্ছি।’ ২০০৯ সালেও ঢাকায় দেখা করতে এসেছিল, কিছুতেই নেবেনা, জোর করে ফিরতি পথের বাসের ভাড়াটা গুঁজে দিয়েছিলাম ওর পকেটে; বলেছিলাম, ‘তুমি ছাত্র মানুষ, দিদির কাছ থেকে নিতে কি অসুবিধা?’ শুনেছি আমাদের উপর আক্রমণের পরে হাসপাতালে এসে বসে ছিল আমার মায়ের পাশে দু’দিন। আমি দেশ ছাড়ার পর ইমেইল করে বলেছিল, আমি পড়ি না পড়ি, আমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ও আমাকে প্রতিদিন সকালে উঠে একটা করে ইমেইল করবে। এখনো ভেবে কষ্ট লাগে যে, তখনো বেশী কিছু করার মত ক্ষমতা ছিলনা আমার শারীরিকভাবে, তবে বাবু হত্যার পর দেশ ছাড়তে বলেছিলাম ওকে অনেক করে। অনন্ত উত্তরে বলেছিল, ‘আমি চলে গেলে অসুস্থ বাবাকে দেখবে কে?’; ‘তুমি মরে গেলে বাবাকে কে দেখবে সেটা ভেবেছ’? জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি।

তবে অনন্ত তার প্রতিজ্ঞা রেখেছিল – সেদিন সকালেও ওর কাছ থেকে একটা ইমেইল পেয়েছিলাম। ওকে সেদিন উত্তর দেওয়া হয়নি, তার আগেই ওর মৃত্যুর খবর এসেছিল। মনে হয়েছিল আবার যেন নতুন করে সেই ২৬ শে ফেব্রুয়ারির পুনরাবৃত্তি ঘটছে, আমার দেড় মাসের সেরে ওঠা ধুলায় মিলেমিশে যাচ্ছে এক নিমেষে! ইতিহাসের বিচারে ওরা ঠিক কি ভুল তাতে আসলে কিছুই এসে যায়না; কিন্তু যুগে যুগে অনন্তদের বারবার খুন হতে হয়। হয়তো এটা প্রমাণ করার জন্যই তারা প্রশ্ন করে, জানতে চেয়ে, ভুল করে, আবার বুঝে শুনে ভুলকে শোধরানোর চেষ্টা করে সচেতন একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে চায়।

গবেষক, লেখক এবং ব্লগার। প্রকাশিত বইঃ 'বিবর্তনের পথে ধরে', অবসর প্রকাশনা, ২০০৭।

মন্তব্যসমূহ

  1. সোহেল ইমাম মে 23, 2018 at 11:23 অপরাহ্ন - Reply

    অভিজিৎ রায়কেও ব্যক্তিগত ভাবে চিনতামনা, অনন্তকেও না, কিন্তু যখনই এদের কথা শুনি একটা অদ্ভুত বিষাদ বড় ভারি হয়ে বুকের ওপর চেপে বসে। ক্ষতিটা যেন শুধু একটা শোক সংবাদের সীমা ছাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত একটা ভয়ঙ্কর শূন্যতাকে মেলে ধরে।

  2. গীতা দাস মে 14, 2018 at 2:22 অপরাহ্ন - Reply

    আমার কিছু স্মৃতি আছে অভিজিৎ, নীলয় ও অনন্তের সাথে । লিখতে পারি না। কেমন যেন ঘোলাটে লাগে চোখ।

  3. যুক্তি পথিক মে 13, 2018 at 3:06 অপরাহ্ন - Reply

    মৃত্যুগুলো মাঝে মাঝে উপলব্ধি করি।

    যেন অভিজিৎ হয়ে যাই,অনন্ত হয়ে যাই।
    রক্ত! লাল রক্ত!

    দিদি,আপনি আমাদের এখনো সামনে আছেন।আমরা এগিয়ে যাবোই।

    এই রক্ত জমবে না আমাদের হৃদয়ে!

  4. নীলাঞ্জনা মে 12, 2018 at 10:50 অপরাহ্ন - Reply

    অভিদা আর অনন্ত একই ছবিতে। এই ছবিটা দেখলে চোখ বন্ধ করে ফেলি।

  5. বিপ্লব রহমান মে 12, 2018 at 9:46 অপরাহ্ন - Reply

    এই ছবির দিকে তাকাতে পারি না, তাকানো যায় না। যদিও জানি, অভি দা অনন্ত, তারা কেউই মরে নাই।

মন্তব্য করুন