সমকামী দম্পতির সন্তানেরা কতটা সুস্থ বা স্বাভাবিক ভাবে বড় হবে, গবেষণা প্রতিবেদনের আলোয় অন্বেষণ

আমি বড় হয়েছি, আমার মা এবং বাবার যুগপৎ ভালোবাসার মাধ্যমে। মার্তৃত্বের স্নেহডোলে, বাবার শাসনে বড় হওয়া, আমি জানতাম পরিবার হয়তো এমনি হয়। মানসপটে পরিবারের সংজ্ঞা এভাবেই তৈরী হয়েছিলো। কিন্তু বড় হতে হতে সেই সংজ্ঞা নানান সংজ্ঞা দ্বারা ঝালাই হতে থাকলো। কোনো পরিবারে হয়তো বিবাহ বিচ্ছেদের দরুন বা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় পিতা বা মাতার মৃত্যুতে সন্তান একক পিতা বা মাতার কাছে বড় হচ্ছে। কোথাও বা হয়তো একজন সন্তান তার এক পিতা ও কয়েকজন মায়ের স্নেহের আচলে বড় হচ্ছে (পাকিস্তান-বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে যেখানে একজন পুরুষের বহুবিবাহ করা স্বাভাবিক), কোথাও বা হয়তো যৌথ ফ্যামিলীর কল্যানে সন্তান অনেক আত্মীয় স্বজন পরিবেষ্টিত হয়ে বড় হচ্ছে। কোথাও বা হয়তো, সন্তানের কেও না থাকায় রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত এতিমখানায় সন্তান বড় হয়। এছাড়াও ইতিহাস ঘাটলে দেখি, একটা সময় এমন পরিবারও ছিল, যেখানে মা-বাবা বলতে কেও ছিল না, সন্তান হয়ে উঠত গোষ্ঠীর সম্পত্তি। বহুগামিতা ছিল খুব স্বাভাবিক। যেহেতু সন্তান সুনির্দিষ্ট কারোরই নয়, তাই প্রত্যেক সন্তানকেই সবাই ভালোবাসত।

যাইহোক, আধুনিক সময়ে নতুন এক পরিবারের উত্থান ঘটেছে। যে পরিবার পেয়ে যাচ্ছে সভ্য দেশগুলোতে বৈধতাও। সে পরিবারটির নাম হলো সমকামী পরিবার। পিতা-পিতা অথবা মাতা-মাতার এই পরিবারটি নিয়ে বিতর্ক তোলা খুবই সহজ। সন্তানের ক্রমবিকাশে সমলিঙ্গ পরিবার কী কোনোভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে? কী বলছে গবেষনাগুলো?

আমাদের সমাজ জুড়ে একটা মিথ প্রচলিত আছে যে; একজন সন্তানের পরিপুর্ণ বিকাশের জন্য মা এবং বাবা উভয়েরই প্রয়োজন। যদিও এই মিথের সত্যতার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এটা চুড়ান্তভাবে অপ্রমাণিত একটা বিষয়। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়; কেন এই মিথ এতটা প্রচলিত?

আসলে এই মিথের সৃষ্টির পিছনে সেকেলে রক্ষণশীল ধারণাগুলোই বহুলাংশে দায়ী। আর একক পরিবার যেগুলো; যেখানে মুলত মা আর বাবা থাকে ; আর থাকে দুই চারটা সন্তান; ওই জায়গা থেকেও এই ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, সমকামী- বিদ্বেষ থেকেই এই জাতীয় ভাবনার জন্ম হয়।

৩ দশক ধরে পির রিভিউ করা জার্নাল কে পুনঃপরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা ২০১৭ সালের অস্ট্রেলিয়ার মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করেন একটি গবেষণা প্রতিবেদন। যেখান থেকে দেখা যায়, এর পুর্বের করা গবেষণা থেকে এটা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত যে; সমকামী পরিবারের বাচ্চারা ভালোই করে[1: pdf link] যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ল স্কুল দ্বারা ৭৯ টি পুর্বোক্ত গবেষনাকে পুনঃতদন্ত করে দেখা গিয়েছে যে, [২] সমকামী পরিবারের বাচ্চারা বেশ ভালোভাবেই যত্ন আত্তি পেয়ে বেড়ে উঠে২০১৪ সালে মার্কিন সমাজতাত্ত্বিক সংগঠন ৪০ টার উপরে গবেষণা প্রতিবেদন পুনঃনিরীক্ষণ করেছেন, [3] তারা সেখান থেকে দেখেছেন, সমকামী পরিবারের শিশুরা বেশ ভালোভাবেই বড় হয়২০১৩ সালে অস্ট্রেলীয় ইন্সটিউট অব ফ্যামিলী স্টাডিজ গবেষনা করে সমকামী দম্পতির সন্তানদের মধ্যে কোনো ধরনের নেতিবাচক ফলাফল দেখেন নি[৪] এর পুর্বে ২০০২ সালের ২০ টি গবেষনার উপর করা পুনঃপরীক্ষণ থেকে দেখা গিয়েছে, সমকামী দম্পতির সন্তানদের কার্যত কোনো পার্থক্য বিষমকামী দম্পতির সন্তানদের সাথে থাকে না [৫]

২০১৭ সালের গবেষনার গবেষকরা এর শিরোনাম দিয়েছেন,

“এটা বৈষম্য; সন্তানেরা ঠিক আছে। সমকামী পিতামাতাদের দরুণ সন্তানের কোনো ক্ষতি হয় না”।

একই সাথে তারা বলেছেন,

এই গবেষনার অন্বেষণ; পরিবারের উপর গবেষনা ও তার মনস্তত্ব্ বুঝতে সম্পুর্ণভাবে সহায়ক। তাদের মতে, সন্তানের সঠিক পরিচর্যা ও ইতিবাচক ক্রমবিকাশের জন্য পরিবারটি কিভাবে গঠিত হয়েছে তার তুলনায়, পরিবারের সদস্যদের একে উপরের সাথে বন্ডেজ ও সন্তানের মুল অভিভাবকের নিজেদের গুণাগুনটাই অধিক গুরুত্বপুর্ণ

২০১৪ সালে মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি দ্বারা একটি গবেষনা [৬] সম্পাদিত হয়েছিল; সেখান থেকে দেখা গিয়েছে, সমকামী দম্পতির সন্তানেরা বিষমকামী দম্পতির সন্তানদের তুলনায় স্বাস্থ্য ও সামাজিকতার দিক থেকে অধিকতর শ্রেয়বিএমসি পাব্লিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে বিষমকামী দম্পতির তুলনায় সমকামী দম্পতির সন্তানেরা স্বাস্থ্য, পারিবারিক বোঝাপড়া এসব সুচকে ৬ শতাংশ ভালো মার্ক অর্জন করে। [৭] যদি অনুভুতিগত চরিত্র আর শারীরিক কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যের বিষয়টা চিন্তা করা হয়, তবে সমলিঙ্গ আর বিষমলিঙ্গের সন্তান্দের মধ্যে কোনো পার্থক্যই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিছু গবেষণা থেকে এটাও দেখা গিয়েছে যে, বিষমকামীদের তুলনায় সমকামী দম্পতিরা তাদের সন্তানের সাথে অধিক সময় অতিবাহিত করে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষনার উপসংহারেও ঠিক একই ফলাফল প্রতীয়মান হয়েছিল। সেই গবেষণা অনুসারে সমকামী নারী দম্পতিরা বিষমকামী দম্পতির তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি সময় সন্তানের সাথে অতিবাহিত করে এবং মজার বিষয় যেটা দেখা গিয়েছে, বিষমকামী দম্পতির মায়েরা সন্তানের সাথে যে সময় অতিবাহিত করে, একদম তার সমতুল্য সময় অতিবাহিত করে সমকামী পুরুষ দম্পতিরা। হিসাবে যেটা বিষমকামী পুরুষ দম্পতির পিতার অতিবাহিত করা সময়ের দ্বিগুণ[৮] টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষনার প্রধান গবেষক ড. কেট পিকেট বলেছেন, তাদের গবেষনা থেকে দেখা গিয়েছে, সমলিঙ্গের পিতা-মাতারা তাদের সন্তানের সাথে দিনে গড়পরতায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করে যেখানে বিষমকামী দম্পতিদের মধ্যে এই হার গড়ে আড়াই ঘন্টা

যাইহোক বেশিরভাগ গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে যে এলজিবিটি পরিবারের পিতামাতাদের সুস্থ সুন্দর সুখী জীবন বিনিমার্ণের ক্ষেত্রে; বিষমকামী দম্পতির তুলনায় অধিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কারণ তাদের সন্তানদের সমাজে বিভিন্ন কটুবাক্য শুনতে হয়। স্টোনওয়ালের প্রতিবেদন অনুসারে, সমলিঙ্গের পরিবারের সন্তানদের মধ্যে যে অমিত সম্ভাবনার বীজ অঙ্কুরিত আছে, তা সমাজের অন্যদের বৈষম্যবাদী মানসিকতার জন্য বিনষ্ট হয়ে যেতে পারে অঙ্কুরেই। একারণে সমকামী দম্পতিদের অনেকেই তাদের সন্তানকে সমাজের এই কৃত্রিম হেয় থেকে বাচানোর জন্য, নিজেদের সমকামিতামুলক এই দাম্পত্যকে লুকিয়ে রাখেন।

প্রতিবেদনে এই সমস্যাটিকে সাময়িক উল্লেখ করে, তার সমাধান বাতলে দেওয়া হয়। এজন্য যেটা করতে হবে, তা হলো ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। যেমন বেশ কিছু বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে পরিবারের ছবি যুক্ত করার সময় সমকামী দম্পতির চিত্রও যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যে বার্তা পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা হলো, সমকামী পিতামাতারাও বিষমকামী পিতামাতার চেয়ে ভিন্ন নয়। একইসাথে আরেকটি বিষয় অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, আর তা হলো, বিদ্যালয়গুলোতে বিষয়টি নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

২০০৯ সালের ইয়োগোভ টিচার্স প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এর দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষক বলেছেন যে,

তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা, এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সময় ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং শুধুমাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষয়টির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা চালিয়ে যাবেন। [৯: pdf]

তথ্যসুত্রসমুহঃ

1) https://www.mja.com.au/system/files/issues/207_09/10.5694mja17.00943.pdf

2) https://whatweknow.law/columbia.edu/topics/lgbt-equality/what-does-the-scholarly-research-sayabout-the-wellbeing-of-children-with-gay-or-lesbian-parents

3) https://link.springer.com/article/10.1007/s11113-014-9329-6

৪) https://aifs.gov.au/cfca/publications/same-sex-parented-families-australia/childrens-wellbeing-same-sex-parented-families

৫) https://onlinelibrary.wiley.com/doi/abs/10.1111/1467-9450.00302

৬) https://minerva-access.unimelb.edu.au/handle/11343/43238

৭) https://bmcpublichealth.biomedcentral.com/articles/10.1186/1471-2458-14-635

৮) https://www.yahoo.com/news/same-sex-parents-spend-more-1281573969494070.html

৯) https://www.stonewallcymru.org.uk/sites/default/files/teachers_report_2014.pdf

১০) http://metro.co.uk/2018/02/14/evidence-shows-children-gay-parents-just-well-peers-7311754/?ito=cbshare

About the Author:

মন্তব্যসমূহ

  1. কাজী সানজাদ হোসেন মে 16, 2018 at 12:09 অপরাহ্ন - Reply

    ধন্যবাদ মুক্তমনা, অনেক কিছু শিখতে পারলাম।

  2. Juwel Rana মে 12, 2018 at 3:19 অপরাহ্ন - Reply

    মূল্যবান আলোচনা

মন্তব্য করুন