ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ—ক্যুয়ো ভাদিস!

By |2018-02-27T18:55:40+00:00ফেব্রুয়ারী 27, 2018|Categories: ধর্ম, ব্লগাড্ডা|1 Comment

অথঃ গসাগু-কথা

৫, ১০, ১৫, ২০, . . . এই কটি সংখ্যার কথাই ধরা যাক। এদের মধ্যে সাধারণ সংখ্যা কিছু আছে কি?

আছে: ১ আর ৫। গসাগু করলে হবে ৫। প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকে গসাগু শেখানোর সময় ১-এর কথা বলা হয় না। কেন না, ওনাকে ধরলে আর না ধরলে ফলে কোনো পার্থক্য হয় না। ১ X ৫ = ৫-ই হবে। আর সমস্ত সংখ্যার মধ্যেই ১ আছেন। দুনিয়ায় এমন কোনো অখণ্ড সংখ্যা হয় না, যা ১-এর গুণিতক নয়; কিংবা ১ যার গুণনীয়ক নয়। অতএব উপরোক্ত সংখ্যাত্রয়ের মধ্যে সাধারণ সংখ্যা হিসাবে ৫-এর কথা বলাই যথেষ্ট এবং যথার্থ।

ধর্ম টর্ম নিয়ে আলোচনা করতে বসে অঙ্কের কথা পাড়ছেন কেন?

পাড়ছি একটাই কারণে। যদি উপরের অঙ্কের সমস্যাটা বুঝে থাকেন, তাহলে এবার ভেবে দেখুন, ঠিক ওরকমই, ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে সাধারণ গুণনীয়ক কিছু আছে কি?

আছে: ধর্ম।

সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র আপত্তি উঠে আসবে—কী বলছেন মশাই? ধর্ম মানেই সাম্প্রদায়িকতা? ধার্মিক হলেই কেউ সাম্প্রদায়িক হয়ে যান? জানেন, . . .—সঙ্গে সঙ্গে দুচারজন ধার্মিক অসাম্প্রদায়িক প্রসিদ্ধ মানুষের নাম তোড়ে উচ্চারিত হতে থাকে।

অথচ, না বললেও হত। ১০ বা ১৫ যেমন ৫ নয়, তেমনই ধার্মিক হলেই তিনি সাম্প্রদায়িক কিংবা মৌলবাদী হয়ে যাবেন—এটাও কেউ বলে না, বা মনে করে না।

তাই যদি হয়, বার বার কথাটা ওঠে কেন? কেন এই শব্দগুলো এক নিশ্বাসে উচ্চারিত হয়?

হয়, কেন না, ১০ বা ১৫ পেতে হলে ৫-এর থাকাটা যেমন নিতান্তই আবশ্যক, তেমনই সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ সমাজে থাকতে হলে ধর্ম থাকাটাও সমাজে জরুরি। ইসলাম ধর্মের কোনো অস্তিত্ব বা আবেদন না থাকলে দুনিয়ায় আইসিস, বোকো হারাম, আল কায়দা, ইত্যাদির জন্মই হত না। জন্ম সম্ভব ছিল না। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম না থাকলে আর এস এস-এর জন্মও ঘটত না। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অস্তিত্বই থাকত না। আম্বেদকরকেও জাতিপ্রথা বিলোপের জন্য আন্দোলন করতে হত না! এমনতর অনেক।

আসুন, কথাটাকে আর এক দিক থেকেও বোঝার চেষ্টা করি। যে কোনো সামাজিক সক্রিয় পরিঘটনার দুটো দিক থাকে: তত্ত্ব ও প্রয়োগ। সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদেরও এই দুটো দিক আছে। ধর্ম হচ্ছে তার তাত্ত্বিক দিক। দাঙ্গা হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ। কোনো তত্ত্বই শাস্ত্রের পাতায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে না। আর, তত্ত্ব ছাড়া ক্রিয়া হয় না। ঠিক তেমনই, ধর্মও শুধু পুজো-আচ্চা, তীর্থ, তর্পণ, ধ্যান, সেজদা, হজ, বলি, কুরবানিতে শেষ হয়ে যায় না। আরও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। উঠতে চায়। আপন শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করতে চায়। তার জন্য আসলে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে। ছলে বলে কৌশলে। তাই বলছিলাম, ধর্মীয় ধ্যান ধারণা বিশ্বাস ছাড়াও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না। আবার দাঙ্গার পেছনে থাকে কিছু স্থির এবং দৃঢ় বিশ্বাস—আমরা ভালো, ওরা খারাপ; আমরা ওদের নিকেশ না করলে ওরাই একদিন আমাদের নির্মূল করে দেবে; ওদের ধর্মটাই এই রকম; ইত্যাদি।

এই হল সাম্প্রদায়িকতার তত্ত্ব আর প্রয়োগের কলকাঠি।

আর একটা কথা। ফ্যাসিবাদের মধ্যেও কীভাবে ধর্ম একটি গুণনীয়ক হিসাবে ঢুকে আছে, সেটা আমরা পরে দেখতে পাব। এখনই ধৈর্য হারাবেন না।

 

“ফিরকে দঙ্গে হোন্দে নহি করওয়ায়ে যান্দে হান”

হ্যাঁ, একদম ঠিক বলেছেন। আপনার সাথে আমিও সম্পূর্ণ একমত। কোনো ধর্মই সোজাসুজি মানুষকে দাঙ্গা করতে শেখায় না। বলে না, মানুষ মার; ভিন্ন ধর্মীকে বধ কর। বরং ধর্ম মাত্রই মানুষকে কাছে টানতে শেখায়, ভালোবাসতে বলে। সেই শুভ প্রয়াস ব্যর্থ করে দিচ্ছে রাজনৈতিক শক্তিগুলো। আধুনিক যুগের ক্ষমতার রাজনীতিই ধর্ম বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে সরল বিশ্বাসী মানুষকে খেপিয়ে তুলে দাঙ্গা বাধিয়ে দিচ্ছে। ভারি চমৎকার কথা বললেন। অনেক কাল আগে, সেই ১৯৮৭ সালে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনাচক্রে চণ্ডীগড়ে কিছু দিন থাকার সুবাদে স্থানীয় পাঞ্জাব ট্রিবিউন পত্রিকার সামনের পৃষ্ঠায় পাঞ্জাবি বয়ানে প্রকাশিত একদিনের একটা শিরোনাম আজও আমি ভুলতে পারিনি: “ফিরকে দঙ্গে হোন্দে নহি, করওয়ায়ে জান্দে হান!” সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় না, করানো হয়!!

কথাটা মেনে নিয়েই আসুন একটু বিশ্লেষণ করি। না না, আবেগ তাড়িত হয়ে রাজনীতিকে গাল পেড়ে আমরা আমাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারি না। ওটা সহজ কাজ, কিন্তু কাজের কাজ নয়। আর আসল কাজ তো নয়ই। তাই চিন্তাশীল শুভমনস্ক মানুষ হিসাবে আমাদের ভাবতে হবে, বুঝতে হবে, সাম্প্রদায়িকতার কার্যকারণ খুঁজতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে।

আপনাকে বলছি আপনারই উপরের কথার মধ্যে দুটো পরস্পর বিরোধী বাক্যাংশকে লক্ষ করতে। খুঁজে পাচ্ছেন না? আচ্ছা, আমিই দেখিয়ে দিচ্ছি। একদিকে আপনি বলছেন, ধর্ম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়, আর এক দিকে বলছেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে দেয়। তা, তাদের খেপাতে গেলেই তো তখন যার যার ধর্মের ভালোবাসার শিক্ষাগুলি বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা। দাঁড়াচ্ছে কি? মানছেন তো যে দাঁড়ায় না!

এবার ভাবুন, কেন দাঁড়াচ্ছে না।

কিংবা, ধর্মীয় বিশ্বাসগুলোকেই বা তারা মানুষকে খেপিয়ে তুলতে কাজে লাগাচ্ছে কীভাবে? সেই সব বিশ্বাসকে চাগিয়ে তুললেই তো প্রেম প্রীতি ভালোবাসার উষ্ণ প্রস্রবণ জেগে ওঠার কথা। উঠছে না যে! তার মানে সেই বিশ্বাসসমূহের মধ্যেই এমন কিছু কিছু উপাদান আছে যার উপযুক্ত ব্যবহারের দ্বারা এক ধর্মবিশ্বাসী মানুষকে উত্তেজিত করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের বিরুদ্ধে হিংস্র যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া যায়!

বাঃ, এটা কিন্তু সঠিকভাবে আন্দাজ করেছেন। সমস্ত ধর্মে সব রকমের নিদানই আছে। ধর্ম গ্রন্থ খুলে পড়লেই দেখবেন, তাতে প্রেম ভালোবাসার কথাও আছে, ঘৃণা বিদ্বেষের কথাও আছে। যে যার পছন্দ মতো বেছে নেয়। খ্রিস্টধর্ম বাইবেল হাতে নিয়ে আফ্রিকার কালো মানুষদের জমি দখলেও সাহায্য করেছে, আবার ভারতে এসে দলিত জনজাতির মধ্যে স্কুল হাসপাতাল স্থাপন করেছে, কুষ্ঠ রোগীর সেবাও করেছে। ব্রুনো, গ্যালিলেওও খ্রিস্টান ছিলেন, তাঁদের হত্যাকারী নির্যাতনকারীরাও খ্রিস্টান ছিল। যিশুর বাণী বাইবেল প্রেমকথা কাউকেই নিরাশ করেনি। প্রত্যেকেই নিজের নিজের দরকার অনুযায়ী বাণী বা উপদেশ খুঁজে পেয়েছিলেন। কিংবা পরে যাঁরা ধর্মীয় চিন্তার আলোকে এঁদের মূল্যায়ন করেছেন, যিনি ব্রুনোর পক্ষ নিয়েছেন তিনি বাইবেলের প্রেম বিতরণের কথাগুলির উপর জোর দিয়েছেন। আক্ষেপ করেছেন, এত সুন্দর সুন্দর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন ওঁরা ব্রুনোকে অমন নিষ্ঠুরভাবে মারলেন, গ্যালিলেওকে কেন ওই রকম অসম্মান করলেন। আর যাঁরা চার্চের পক্ষাবলম্বন করেছেন, তাঁরা দেখাতে চেষ্টা করেছেন, ব্রুনো এবং গ্যালিলেও কোথায় কীভাবে ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করেছিলেন! তাঁরা নিরীহ খ্রিস্টানদের সরল বিশ্বাসকে কত ভাবে আঘাত করেছেন! ইত্যাদি। শাস্ত্রোল্লেখের প্রশ্নে কোনো পক্ষই ভুল বলেননি।

ইসলাম ধর্মের বাণীও কোনো পক্ষকেই হতাশ করে না। মানুষে মানুষে প্রেম, সমাজ জীবনে শান্তি, ভিন্ন ধর্মীর প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বজনীন সাম্য, সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ব—এক দিকে এসবও যেমন আছে, অপর দিকে ভিন্‌ধর্মীকে হয় ইসলামে ধর্মান্তরিত করা, অথবা তাকে কাফের হিসাবে কোতল করা এক পুণ্যের কাজ হিসাবে স্বয়ং আল্লাহ্‌র নির্দেশ হিসাবেই দেওয়া আছে। ধর্মযুদ্ধে জিতলে গাজী আর মরলে শহিদ! নারীকে সর্বপ্রকারে গৃহে আবদ্ধ ও শরীর আবৃত করে অবদমিত করে রাখ—এও যেমন বলা আছে, আবার নারীকে সম্মান দাও, লেখাপড়া শেখাও—একথাও ওতে বলা হয়েছে। যে যা করে সেটাই কিন্তু শাস্ত্র সম্মত। আপনি যা-ই করুন, শাস্ত্রবিরোধী কাজ করার আপনার হাতে কোনো উপায় কোনো ধর্মগ্রন্থ রাখেনি।

না, আপনাকে দোষ দিচ্ছি না। আপনি ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছেন, আর হ্যাঁ, আমিও শুনেছি—এই পুণ্যভূমিতে পবিত্র হিন্দু ধর্ম নাকি প্রতিটি মানুষের মধ্যেই ভগবানকে দেখেছে। নর = নারায়ণ! দ্বন্দ্বসমাসে নরনারায়ণ! এই সেদিনও আপনি এক কম্প্রকণ্ঠ যুবকের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছেন: দরিদ্র ভারতবাসী আমার ভাই, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই! অপর এক জৈন প্রৌঢ়ের নরম শান্ত কণ্ঠে বাণী উবাচ হয়েছিল, কেউ নীচ জাতি নয়, ওরা হরিজন! আর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ক্লাশে সে কি গুরু গম্ভীর ভাব সম্প্রসারণ: সোহহং = আমিই সে! তত্ত্বমসি = তুমিই সে, আদি আদি। সে মানে কে? সে মানে ব্রহ্ম, স্বয়ং পরম ব্রহ্ম। অহম ব্রহ্মাস্মি! আপনি আমি সকলেই সেই পরম ব্রহ্ম। আমি আপনি সেই একই ব্রহ্মে লীন। আমাতে আপনাতে আর তাতে কোনো ভেদ নেই। যতক্ষণ বুঝিনি ভেদজ্ঞান; একবার বুঝলেই সমস্ত ভেদজ্ঞান লুপ্ত হয়ে একেবারে অভেদ। জলের মধ্যে চিনি যেমন গুলে যায়, আর আলাদা করে চেনা যায় না, আপনি আর আমিও তেমনই পরমার্থ জ্ঞান লাভ করে ব্রহ্মে বিলীন হই। তাকে এক রকম আধ্যাত্মিক ব্রহ্ম-দ্রবণ বলা যায়!

আচ্ছা বলুন তো, তারপরেও সেই ধর্মের এক বর্ণগোষ্ঠী কী করে বলল, অপর গোষ্ঠীর সেই ধর্মেরই মন্দিরগুলোতে প্রবেশের অধিকার নেই? তাহলে তো ব্রহ্মই ব্রহ্মকে মন্দিরে ঢুকতে দিচ্ছে না! তবে কি সব ব্রহ্ম সমান নয়? গুজরাতের গান্ধীনগর শহরের সীমানায় এক বসতির কাছে বিজ্ঞপ্তি—হরিজন পল্লী। যেতে যেতে রিকশায় আমার সঙ্গী বুঝিয়ে দিলেন, আগে এই জায়গাকে বলা হত ডোম পাড়া। এখন বলে হরিজন পল্লী। এদের বাড়ির মহিলারাই আমাদের ভদ্র পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে। তবে কি ছোঁওয়াছুঁয়ির ভেদভাব চলে গেছে? তা যায়নি। বর্ণ হিন্দুরা এখনও ওদের হাতের জল খায় না। তবে ডোম বা চণ্ডালের বদলে হরিজন নামটা খুব সুন্দর। সেদিক থেকে নিশ্চয়ই খানিকটা অগ্রগতি হয়েছে বলে মানবেন নিশ্চয়ই! হ্যাঁ হ্যাঁ, মানব না কেন? ভাষা বা শব্দ প্রয়োগে বিপুল অগ্রগতি সাধন হয়েছে। যেমনটা ওই ব্রহ্মের বেলায় হয়েছিল। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুই এগোয়নি।

আমাদের সেই সব মনীষীরাও খুব সচেতন ছিলেন। যা কিছু ঠান্ডা গরম বলেছেন, তা ওই ছোঁওয়াছুঁয়ির বিরুদ্ধে। চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের মতো শূদ্রাণির হাতে ব্রাহ্মণের জল পান নাটকের বার্ষিক প্রদর্শনী। জাতপাত ভেদাভেদ নিয়ে তাঁরা কেউ টুঁ শব্দটিও করেননি। অদ্বৈত বেদান্তও জাতিভেদ প্রথার ক্ষেত্রে স্পর্শক হয়ে বেরিয়ে গেছে! সেই মহান বৃত্তের ভেতরে ঢুকে জ্যা হওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। শূদ্রকে ব্রহ্মাস্মি-র বাইরের উঠোনেই বসিয়ে রেখে গেছে!

এসব শুনলে বা জানলে মন খারাপ হয়ে যায়! হ্যাঁ, সে তো বটেই। সব ধর্মেই কিছু না কিছু খারাপ দিকও আছে। তবে কি না, আমাদের ভালোটাকে নিতে হবে, খারাপ জিনিসগুলোকে বাদ দিতে হবে।

খারাপ মানে? ধর্মে কিছু জিনিসকে খারাপ বলার মানে জানেন? ভগবান বা আল্লাহ্‌র তরফে যে সব জিনিস ধর্মীয় বাণী হয়ে এই নশ্বর ধরার ধুলিতে নেমে এসেছে, তাদের একটাকেও খারাপ বলার অর্থ হল, ভগবান বা আল্লাহ্‌ অন্তত এক আধটা খারাপ কাজ করেছে। বাপ রে! যেই না বলেছেন, ওয়াশিকুর রহমান বাবু কিংবা নরেন্দ্র দাভোলকর উপর থেকে মুচকি হাসি হেসে উঠবেন। আসুন আসুন। মৃত্যুপুরীতে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। ত্রিশূল বা চাপাতি আপনার আত্মাকে খুব দ্রুত পরমাত্মার সাথে মিলিয়ে দেবে! ব্রহ্মাস্মিতার সুযোগ না পেলেও ভস্মাস্মিতার সুবর্ণ সুযোগ হাতে এসে যাবে!

তাই বলছিলাম, দাঙ্গা নিজে থেকে না হলেও, দাঙ্গা কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা সংগঠিতভাবে করানো হলেও, দাঙ্গা যে করানো যায়, তার সহায়ক অনেক উপচারই ধর্মের কাঠামোয় বিদ্যমান। সমস্ত ধর্মের কাঠামোতে। সেই সব জিনিস না থাকলে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সাধ্য ছিল না ধর্মের নামে মানুষকে খেপিয়ে তোলার।

 

ধর্ম মানে জিরাফ?

কিন্তু এবার অন্য একটা তথ্যের দিকে চোখ ফেরানো যাক।

ধর্মের ধ্রুপদী শাস্ত্রীয় কাঠামোতে পরধর্ম বিদ্বেষ অন্তস্থিত (in-built) হয়ে থাকলেও অনেক দেশেই পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষজন দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করেছে। একে অপরের ধর্মাচরণে সাহায্যও করেছে, আবার কখনও কখনও ঝগড়াঝাঁটি মারপিটও করেছে। কিন্তু তারা কখনই সংগঠিতভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে মেরু বিভাজন ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করেনি। শাস্ত্র শিকেয় তুলে রেখে কোনো এক অদৃশ্য ঈশ্বরের উদ্দেশে ফুল বেল পাতা জমা দিয়ে ধূপ মোমবাতি জ্বেলে তারা অবশেষে নিত্যদিনের জীবন জীবিকার সংগ্রামে একে অপরের সহায়ক হয়ে দিন কাটিয়েছে। ধর্মের তত্ত্বকে তেমন ভাবে গ্রহণ করেনি বলেই তার ব্যবহারিক রূপে দাঙ্গাও সর্বজনীন ও সর্বকালীন হয়ে উঠতে পারেনি। যদি হতে পারত, এতদিনে মানব প্রজাতি এই পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।

মন্দির মসজিদে মোল্লা পুরোহিতের রাজত্ব কায়েম থাকলেও সুফি বাউলরাই গ্রামে গঞ্জে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম চর্চাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেই চর্চায় মাঠের ধান আর আশমানের ঈশ্বরে কোনো ধর্মীয় ভেদরেখা অঙ্কিত হয়নি। গায়ের ঘাম আর চোখের পানিতে সব একাকার হয়ে রয়েছে। এমনটা বাস্তবে ঘটেছিল বলেই আরবের পণ্ডিত আল-খোয়ারিজমি-র পক্ষে হিন্দু গণিত (তার শূন্যের ধারণা ও স্থানমান পাতন পদ্ধতি সহ) আরব হয়ে ইউরোপ অবধি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বাগদাদে উপনিষদের পাঠ শোনার জন্য হিন্দু পণ্ডিত আচার্য কনকের ডাক পড়েছিল। রামায়ণ মহাভারত সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদের প্রতি মুসলমান রাজাদের মধ্যে আগ্রহ জন্মেছিল এবং তাদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য অনুদান পাওয়া গিয়েছিল।

আর সঙ্গীত? ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল ধারাকে রক্ষা করেছেন যাঁরা, তাঁদের এক বড় অংশই মুসলমান। তাঁরা এক আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে স্বীকার করেন না। আর হিন্দুস্থানি সঙ্গীত মানেই হল তাতে শিব দুর্গা কালী কৃষ্ণ প্রমুখর সরব উপস্থিতি। তাঁরা এই গানগুলি ধরলেন এবং করলেন কীভাবে? তাঁদের ধর্ম বিশ্বাসে লাগল না? গা রি রি করে উঠল না?

না। লাগল না। কোন আপত্তি জেগে উঠল না। অন্তত তেমন কিছু ঘটেছে বলে প্রমাণ নেই। জিরাফ না দেখলেও জিরাফে বিশ্বাস স্থাপন করা যায়। তারপর দৈনন্দিন কাজেকর্মে আর জিরাফ নিয়ে না ভাবলেও চলে। অদৃশ্য ঈশ্বরও তাই। না দেখলেও তাকে বিশ্বাস করা যায়। দিনের কোনো এক সময় তার উদ্দেশে প্রণাম বা সালাম জানিয়ে রাখা যায়। একটা লেবু বা বাতাসা, দুটো নকুলদানা, চারটে ফুল নিবেদন করে কিংবা একটা সুগন্ধী ধুপ জ্বালিয়ে রেখে দিলেই কাজ শেষ। তার পর আর তাকে নিয়ে সারা দিন না ভাবলেও কোনো অসুবিধা নেই। “সাঁইয়া, তু মুঝে সমঝা দেঁ, অব মুঝে ক্যায়া করনা . . .” বলে মুদারার গান্ধার থেকে ধৈবতে চলে গেলেই আর ভাবনা নেই! ঈশ্বর আল্লাহ্‌ তখন সবই সুরের তুরীয় দ্রবনে গলে মিলেমিশে হারিয়ে গেছে! এর তসবি আর ওর উপবীতের তখন গলায় গলায় কী ভাব!

এইভাবেই জীবন চলে যাচ্ছিল। ইতিহাসের কিছু ধূসর পৃষ্ঠা উলটে দেখুন। ইসলামের প্রবল প্রতাপের কালে যখন সে আরব থেকে বেরিয়ে মধ্য প্রাচ্যের মরুদেশ জয় করে পারস্য আফঘানিস্থান পর্যন্ত একশ শতাংশ জনগণকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে ফেলে অবশেষে এই ভূভারতে এল, প্রায় সাতশ (১১৯২-১৮৫৭) বছর ধরে একটানা রাজত্ব করে ইংরেজদের কাছে পরাভূত হওয়ার সময় পর্যন্ত সে এক চতুর্থাংশ জনমণ্ডলিকেও ইসলামিত করে উঠতে পারল না। এই ঘটনাটা এই দেশে কত জন লক্ষ করেছেন? কত জন এই ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজেছেন? উত্তর ভারতের রাজপুত রাজারা দলে দলে সুলতান ও মোগল সম্রাটদের সহায়তা করেছে, তাদের সেনাপতি হয়েছে। না করলে সুলতান ও মোগলরা এত দিন এখানে নির্বিঘ্নে রাজত্ব করতে পারতই না। কিন্তু, কই? তাদের তো মুসলমান হতে হয়নি! তারা এমনকি তাদের কন্যা বা ভগ্নিদের মোগল সম্রাটদের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে, আত্মীয়তা সম্বন্ধ পাতিয়েছে। এবং এই সবই করেছে নিজেদের সামন্তী পাট্টা বাঁচিয়ে সুখে থাকার জন্য। তারাও তার জন্য মুসলমান হয়ে যায়নি, তাদের কন্যা বা ভগ্নিরাও মুসলিম বাদশাহর হারেমে গিয়ে নিজস্ব ধর্ম চর্চা বজায় রেখেছে।

তার মানে হল, আজ হঠাৎ করে যে ধর্মীয় সত্তাকে সঙ্কটগ্রস্ত বা বিপন্ন বলে মনে হচ্ছে, সেদিন তা হয়নি। শাসকেরও মনে হয়নি, শাসিতেরও মনে কোনো ভয় ছিল না। তার ফলে উভয় পক্ষই ধর্মকে জিরাফের মতোই স্বীকার করেও জীবনের নিত্যকর্ম থেকে প্রায় সরিয়ে রাখতে পেরেছিল। তত্ত্ব এবং কর্ম—উভয়ক্ষেত্রেই! অচেতনে তারা ধর্ম বিশ্বাসী থেকেও, জীবনের অনেক আচরণেই ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলেও, সচেতন জীবন যাত্রায় পারস্পরিক মেলামেশায় উৎসব অনুষ্ঠানে সুখে দুঃখে ধর্মীয় ভিন্নতাকে দূরে সরিয়ে রেখে চলতে পেরেছিল। তারা এই ভয় সেদিন পায়নি যে এর ফলে তাদের ধর্ম বিপন্ন হবে বা সঙ্কটে পড়ে যাবে!!

আজ সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। আজ জিরাফ যেমন বিপন্ন প্রজাতি, বিলীয়মান প্রাণী, ধর্মও তেমনই বিপন্ন সংস্কৃতি, বিলুপ্তপ্রায় পরিঘটনা। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তারা সকলেই তাই আজ তটস্থ—কিসে কী হয়ে যায়! আত্মরক্ষায় সে এখন তাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যত তার সঙ্কট বাড়ছে, ততই সে মরিয়া হয়ে উঠছে, সামান্যতম বিরোধী কাউকে বা কিছু দেখলে সে ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে। আর তারপর সেই মরণ ভয় থেকেই সে হিংস্র আক্রমণ করতে চাইছে।

যা বলেছেন। একেবারে হক কথা! আক্রমণ করতে চাইলেই তো আর করা যায় না। এখন তো রাজার শাসন নেই, কাজির বিচার নেই। সব দেশেই—সে ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান যাই হোক না কেন—আইন আছে, সরকার আছে, রাষ্ট্র আছে, থানা-পুলিশ আছে, বিচার ব্যবস্থা আছে। হিংসাত্মক কিছু করতে গেলেই তো বাধা পাবে। অন্তত পাওয়ার কথা। সেখানেও তার ভয় থাকার কথা। তাহলে সে সাহস পাচ্ছে কোত্থেকে?

এই আমাদের দেশেই তো আরএসএস তিন বার আইনত নিষিদ্ধ হয়েছে। তিন বারই সে দেশের আইনকানুন মেনে চলার মুচলেকা দিয়ে তবে আবার কাজ করার অধিকার ফিরে পেয়েছে। মনুসংহিতার দোহাই পেড়ে বা শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতার জোরে সে আজ আর ইচ্ছামতো কাজ করে যেতে পারে না। ইচ্ছে হল আর কেউ গরুর মাংস খেয়েছে বলে আওয়াজ তুলে তাকে মেরে ফেললাম—এরকম তার করতে পারার কথা নয়। তবুও পারছে কীভাবে? সেই সব খুনিদের বিচার ব্যবস্থার হাত থেকে ছাড়িয়ে আনছে কারা? তাদের হিরো বানাচ্ছেই বা কারা? পহলু খানের খুনিদের ধরা গেল না কেন?

বাংলাদেশের কথাও এই প্রসঙ্গে ধরা যেতে পারে। পাকিস্তানের কবল থেকে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ইসলাম ধর্মের নামাঙ্কিত “পবিত্র” সব সংগঠন “আল বদর” “রাজাকার” ইত্যাদিই শুধু বদনাম অর্জন করে গর্তে মুখ লুকায়নি। পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়ে ন্যক্কারজনক নানা ক্রিয়াকলাপ করার জন্য জামাত শিবির সহ ইসলাম ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সংস্থাকেই সাধারণ মানুষ বয়কট করেছিল এবং ভাষার প্রবল সেন্টিমেন্টের সামনে ধর্মের তথাকথিত “অনুভূতি” পালিয়ে গিয়ে জন্নত দোজখ যেখানে পেরেছে ঢুঁ মেরেছে। সেই তারাই এখন আবার নতুন নাম বা নামাবলি গায়ে দিয়ে আবার সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তালিকা তৈরি করে যুক্তিবাদী ব্লগারদের অক্লেশে খুন করে যাচ্ছে। পাকিস্তান আমলের কট্টর ধর্মীয় প্রশাসনের আমলে আরজ আলী মাতুব্বর অনেক ঝক্কি ঝামেলা মোকাবিলা করেও গোটা জীবন কাটিয়ে যেতে পারলেন। আর আজ স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রে রাজা হায়দার থেকে শুরু করে পর পর চোদ্দ জন ব্লগারকে মুক্তচিন্তার কথা বলার জন্য নৃশংসভাবে খুন হতে হল ধর্মীয় উন্মাদদের হাতে! এর ব্যাখ্যা কি আপনি পেয়েছেন? বুঝতে পারছেন, কোন খুঁটির জোরে এরা লড়ছে?

সহজেই মালুম, এই দুঃসাহস এরা নিজেদের শক্তির জোরে, বা, ধর্মের কিংবা শাস্ত্র গ্রন্থের নামে পাচ্ছে না। নিছক গীতা বা কোরানের দোহাই দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটানো যাচ্ছে না। ধর্মগ্রন্থগুলো স্রেফ প্রতীকী ব্যানার হিসাবে সামনে আছে। কিন্তু এরা সাহস এবং প্রশ্রয় পাচ্ছে সেখান থেকে, যেখান থেকে তাদের বাধা পাওয়ার কথা ছিল। পাচ্ছে তাদের কাছ থেকে যাদের থেকে তার বিরোধিতার মোকাবিলা করার কথা। অর্থাৎ, রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, শাসক দল, ইত্যাদি। ধর্মের নামে এই যে লাগামহীন সন্ত্রাস, তার বেলায়ও আবার সেই “হোন্দে নহি করওয়ায়ে যান্দে হান”! ইহাঁ ভি, উধর  ভি!

 

ধর্ম সঙ্কট কেন?

ঠিকই। এখানে এই প্রশ্ন দুটো ওঠাও খুব স্বাভাবিক। ধর্মই বা সত্তা-সঙ্কটে পড়ল কেন? আর যারা এর হিংসাত্মক কার্যকলাপে পেছন থেকে মদত দিচ্ছে, তারাই বা তা দিচ্ছে কেন?

আসুন, একটা একটা করে উত্তর খুঁজি।

প্রথমে ধর্ম থেকে শুরু করি।

ধর্ম সঙ্কটে পড়েছে জ্ঞানের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার দরুন। মধ্য যুগ পর্যন্ত সারা পৃথিবীতেই একটা সময় ছিল যখন ধর্মতন্ত্রই মানুষ ও সমাজের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ধারণ করত। জ্ঞান বিজ্ঞান ইতিহাস নীতি-নৈতিকতা শিল্পচর্চা নান্দনিকতা ইত্যাদি। মান্যবর ধর্মতাত্ত্বিকরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর যে টীকা টিপ্পণী লিখে রাখতেন, তাতে এই সমস্ত জিনিসের ব্যাপারে দিক নির্দেশ থাকত। সূর্য ঘোরে কিনা, চাঁদ জ্বলে কিনা, শনি ঘাগড়া পরেছে কিনা—সব ওনারাই জানিয়ে দিতেন। তার বাইরে অন্য কিছু জানার বা বলার জো ছিল না। সচরাচর কেউ এই সব কথায় সন্দেহ করত না। চুপচাপ মেনে নিত। সরল বিশ্বাসে। তাতে অসুবিধা খুব একটা হত না। তবে, কোনো কারণে কেউ অন্য রকম মত জানালে বা এই সব নির্দেশে এতটুকু সন্দেহ ব্যক্ত করলে তার জীবনকে সত্যিই নরক বানিয়ে দেওয়া হত। তাই চাইলেও, বা, ভিন্ন কিছু জানলেও, ভয়ে কেউ কিছু বলত না।

আর মধ্যযুগের শেষ দিকে এসে যাঁরা অন্য কথা বলতে চেষ্টা করেছিলেন—এই যেমন, রজার বেকন, মিগুয়েল সার্ভেতো, জিওরদনো ব্রুনো, তোমাসো ক্যাম্পানেল্লা, গ্যালিলেও গ্যালিলেই, প্রমুখ—তাঁদের রোমান চার্চ কী হাল করে ছেড়েছিল, এখন সকলেই জানেন। সেই পুরনো কাসুন্দি আর ঘাঁটছি না।

কিন্তু ইতিমধ্যে কয়েকটা সমস্যা হয়ে গেল। একদিকে এত সব কাণ্ড করেও বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে রোখা গেল না। নতুন জ্ঞাত তথ্যগুলো, জ্ঞানের নতুন কুসুমগুলো প্রথমে ইউরোপে কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়ল। তারপর তার বাইরে তিন মহাদেশ পাঁচ মহাসাগর পেরিয়ে দিকে দিকে। বাইবেলে যে অনেক ভুল খবর আছে, চার্চের কর্তারা যে অনেক ভুল সিদ্ধান্তকে এতকাল ধরে মদত দিয়ে এসেছেন, তা আর চাপা রইল না। শোনা যায়, ১৬৩৩ সালে গ্যালিলেও নাকি পোপের নিযুক্ত মূর্খ বিচারকদের প্রদত্ত আজীবন জ্ঞানচর্চা বর্জিত গৃহবন্দিত্বের আদেশ শোনার পরে অস্ফূট স্বরে বলেছিলেন, eppur sie mouve, অর্থাৎ, এর পরও সে ঘুরছে, সেটাই শেষ অবধি সত্য হয়ে দাঁড়াল। সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ঘুরতেই লাগল। অন্য গ্রহগুলোও পৃথিবী নয়, সূর্যকেই প্রদক্ষিণ করাটা বেশি পছন্দ করে চলল। চার্চ, বাইবেল, ঈশ্বরের ফতোয়ার তিল মাত্র তোয়াক্কা না করেই!

শুধু কি তাই? আইজ্যাক নিউটন নামে এক খ্রিস্ট ভক্ত বিজ্ঞানী জটিল জটিল সব আঁক কষে বের করলেন সেই ঘোরার ভেতরকার রহস্য এবং নিয়ম। এডমন্ড হ্যালি আবার সেই সব সূত্র প্রয়োগ করে দেখিয়ে দিলেন, একটা ধূমকেতু ৭৫ বা ৭৬ বছর বছর বাদে বাদে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর আকাশে দেখা দেবে; আর হ্যালি মারা যাওয়ার কিছু দিন পর সে সত্যিই এসে হাজির হল। এবং তারপর আরও বেশ কয়েক বার রোমান গির্জা, পোপ সকল এবং আমাদের নাকের ডগার উপর দিয়ে সে ঝাঁটা নাচিয়ে ঘুরে গেছে। বিজ্ঞান আশ্রয় এবং প্রশ্রয় না দিলে এতটা বেয়াদপি সে দেখায় কী করে?

কোপারনিকাস থেকে শুরু করে নিউটন পর্যন্ত মাত্র এক-দেড়শ বছরেই এত কিছু নতুন জিনিস জানা হয়ে গেল যে সবাই বলতে লাগল, ইউরোপে এত কাল ছিল এক অন্ধকার যুগ। রেনেশাঁস এসে সেই অন্ধকার দূর করেছে। ইংল্যান্ডের এক কবি আবার বললেন, সব কিছু এত কাল গভীর অন্ধকারে ঢাকা ছিল, ভগবান নিউটনকে পাঠিয়ে দিলেন, তবেই তো চারদিকে আলো ঝলমল করে উঠল। তার মানে ধর্মের একচ্ছত্র দাপটের সময়কালকেই তো লোকে দুষছে অন্ধকার যুগ বলে। খ্রিস্টধর্ম এইভাবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে পড়তে লাগল জ্ঞানের জগতে আঁধার সৃষ্টিকারী শক্তি হিসাবে। হায় হায়!!

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই লক্ষ করেছেন, এই জন্য আজকাল একদল ধর্ম প্রেমিক বিজ্ঞানের ইতিহাস বিশ্লেষক দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন, না, না, তোমরা যতটা অন্ধকার বলছ, সেই সময় অতটা গাঢ় তমসা ছিল না। তখনও লোকে জ্ঞান চর্চা করতে পেরেছে। মধ্যযুগেও তো হাওয়া কল, জল সেচন কল, ইত্যাদি উদ্ভাবন হয়েছে, গণিতে কিছু কিছু কাজ হয়েছে, বীজগণিত এবং ত্রিকোণমিতি জন্ম লাভ করেছে, সাহিত্য ও সঙ্গীত রচিত হয়েছে, ইত্যাদি। ইউরোপের কয়েকটা প্রসিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থাপিত হয়েছিল খ্রিস্টধর্মের প্রচারকদের উদ্যোগেই। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, পারি, ইত্যাদি। সমস্ত সময়টা তাহলে আর আঁধার ঘেরা হয় কী করে?

কী বলছেন, মশাই? আপনিও এই কথাটা নিয়ে চিন্তিত? আমি বলছি শুনুন, এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। সেকালে যেটুকু জ্ঞানের আলোর উদ্ভাস দেখতে পাচ্ছেন, এ হচ্ছে মানব সভ্যতার স্বাভাবিক গুণ। মানুষের শ্রম মেধা বুদ্ধি ও বুদ্ধিজাত সংস্কৃতির ফল। মানুষ স্যাপিয়েন্স হওয়ার আগে থেকেই, পুরনো প্রস্তর যুগ থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে যৌথ সংগ্রামে এরকম—হয়ত নিবু নিবু—আলো হাতেই একটু একটু করে এগিয়েছে। মধ্য যুগেও, ধর্মের যাঁতাকলে মানুষের বোধ বুদ্ধিকে পিষ্ট করে রাখার সর্বপ্রযত্ন প্রয়াস সত্ত্বেও, সমস্ত কিছু আর চেপে রাখা সম্ভব হয়নি। সত্যটা বুঝতে হলে আপনাকে দেখতে হবে, কতটুকু ক্ষেত্রে কিছু বিকাশ হয়েছিল, আর কতটা চেপে রাখা হয়েছিল। গ্রিকদের সমগ্র জ্ঞানভাণ্ডার হারিয়ে গেল কেন? আরবদের থেকে অনুবাদে ফেরত না পেলে তো সমস্তই বিলুপ্ত হয়ে যেত। নতুন জ্ঞানের আলো ফোটার সময় তাকে চার্চ এত বাধা দিয়েছিল কেন? আলোর পূজারীরা অন্ধকারকেই ধরে রাখতে চাইবে কেন? ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারল কেন? গ্যালিলেওকে অসম্মানিত করে তাঁর বিজ্ঞানচর্চাকে আটকাতে গিয়েছিল কেন? সত্যিকারের আলোর পূজারীরা কি কখনও আলোর দিশারীদের বিরোধিতা করতে পারে?

অর্থাৎ, ধর্মের প্রথম সঙ্কট হল এই যে সে আর নিশ্চিন্ত মনে অজ্ঞতা অন্ধতা কট্টরতা রূপী অন্ধকারের উপাসনা করে যেতে পারল না। এদিক থেকে ওদিকে এর হাতে ওর হাতে জ্ঞানের প্রদীপ একটা একটা করে জ্বলে উঠতে শুরু করল। আর তারপর সেগুলোর কোনো কোনোটা মশাল হয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ঈশ্বর বাইবেল যিশু—কে কোথায় থাকবে, কতটা থাকবে, সব অনিশ্চিত হয়ে গেল। তারা আর জ্ঞানের প্রতীক বা আধার বা স্তম্ভ নয়, কষ্টিপাথর নয়, বরং তারাও এখন থেকে যুক্তি তথ্য সাপেক্ষ সমাজতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে পড়ল।

ধর্মের আর এক সমস্যা হল, সমাজে তার খুঁটিগুলি বড্ড আলগা হয়ে গেছে। সহস্রাধিক বছর ধরে তার পৃষ্ঠপোষক ছিল সামন্তবাদী শাসকরা। সারা পৃথিবী জুড়েই রাজা জমিদার ব্যারন বাদশাহরা ছিল ধর্মের ধারক ও বাহক। রাজা বাদশাহরা ছিল ঈশ্বরের পার্থিব প্রতিনিধি। আর ঈশ্বর ছিল রাজা বাদশাহদের স্বর্গীয় প্রবর্ধন! দুইয়ে মিলে দু-পক্ষেরই ভারি সুবিধা ছিল। দেশের রাজাকে দেখে লোকে ভাবত, এই দুনিয়ারও একজন রাজা আছে। কত রকম তার নাম = ঈশ্বর, ভগবান, আল্লাহ্‌, গড, ইয়াহবে, . . .। আর ঈশ্বরের পক্ষে এত বড় দুনিয়াকে চালানো কি মুখের কথা! তাই স্থানীয় পাইক হিসাবে পাইকারি হিসাবে এখানে ওখানে রাজাকে বসিয়ে রাখা হত! আর এই দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়ার ফলে ধর্মকে আর খাওয়াপরার সমস্যা নিয়ে ভাবতে হত না। দান ধ্যান বেতন ভাতা পুরস্কার ইত্যাদির সাহায্যে মন্দির মসজিদ গির্জার যাবতীয় খরচ উঠে আসত। ইউরোপে চার্চের প্রধানরাই রাজার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করত। মধ্য প্রাচ্যে রাজাই একাধারে ধর্মীয় ও পার্থিব শাসন কর্তা। খলিফা।

যখন থেকে সমাজে বদল ঘটে গেল, সামন্ততন্ত্র বহু দেশেই উৎখাত হয়ে গিয়ে ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটল, ধর্মের অন্ধকারের ভূমিকা স্মরণ করে দেশে দেশে সেকুলার বা ধর্মনিস্পৃহ সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা উঠে এল, রাষ্ট্রীয় সমস্ত কার্যকলাপকে ধর্ম থেকে মুক্ত করা প্রশ্ন এসে গেল, ধর্মীয় কাঠামোর পায়ের তলার মাটি টলমল করে উঠল। সরকারি কাজেকম্মে নাক গলাবে না, এই শর্তে ইংল্যান্ডের নবোত্থিত বুর্জোয়া রাষ্ট্র তবু চার্চকে বেতন ভাতা দিয়ে পুষবে বলে কথা দিয়েছিল এবং এখনও সেই কথা সে মেনে চলেছে। ফ্রান্স এমন এক কাণ্ড করে বসল যে ধর্ম আজও সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফরাসি বিপ্লবে শ্লোগান উঠল, আমাদের ধর্ম কম্ম অনেক হয়েছে, আর চাই না, এবার চার্চগুলিকে উঠিয়ে দাও; ওরা দেশের প্রচুর জমিজমা দখল করে রেখেছে, ওগুলো আমাদের জনগণের স্বার্থে ভালো কাজে লাগাতে হবে। কত যে গির্জা দখল হয়ে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বনে গেল, কতগুলো গির্জায় যে আর্ট মিউজিয়াম বসে গেল—তার ইয়ত্তা নেই।

পরবর্তীকালে অবশ্য অন্যান্য দেশের বুর্জোয়ারা শাসন ক্ষমতায় আসীন হয়ে  বুঝেছে, ফ্রান্সের মাটিতে বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। ধর্ম জিনিসটা অত খারাপ নয়। একটু সামলে সুমলে রাখতে পারলে ভারি সুন্দর কাজে দেয়! ঈশ্বর বা স্বর্গের নামে শোষণ নির্যাতনকে অনেকাংশে ভুলিয়ে দিতে পারে। একটা আফিম আফিম ভাব আছে। শুধু তেজি ঘোড়ার মতো বেঁধে রেখেই সাবধানে খেলাতে হবে।

এইখানে পাদদেশে না নেমেও একটা পাদটীকা দিয়ে রাখি। ঈশ্বরে বিশ্বাস একটা শক্তিশালী আবেগ, যার বলে আপনি কোন মন্দির মসজিদ গির্জার নাম একবার শুনলেই সে আপনার পকেটে কিংবা হাতব্যাগে হাত ঢুকিয়ে দেবে, টাকাপয়সা বের করে আনবে এবং সামনে রাখা দান-বাক্সের মধ্যে ফেলে দিতে উদ্বুদ্ধ করবে। আর সেই প্রক্রিয়ায় তখন এত টাকা জমে ওঠে যে সেই সেই ভগবানের আধ্যাত্মিক সর্বশক্তির উপর আর ভরসা না করে মনুষ্য নির্মিত তুচ্ছ পার্থিব তালাচাবিকে ডেকে আনতে হয় তাকে রক্ষা করার জন্য।

এ এক ভয়ানক সমস্যা। সমাজের উপর খবরদারি শুধু যে করা যাচ্ছে না তাই নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রের খবরদারি মেনে চলতে হচ্ছে। একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার চাইতে এ নিশ্চয় ভালো। কিন্তু এত কাল যে নিজে অন্যদের উপর খবরদারি করে এসেছে, তার পক্ষে অন্যের অভিভাবকত্ব মেনে চলা খুবই অস্বস্তিকর! আর জনসাধারনের একটা অংশের মধ্যে, শিক্ষিত সচেতন যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদের মধ্যে ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচার বা ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বরূপ উন্মোচন ক্রমশই শক্তিশালী হচ্ছে। সারা পৃথিবীতেই ধর্মে আস্থাহীন বা নাস্তিকদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। মন্দির মসজিদ গির্জায় যাতায়াতকারী লোকসংখ্যা (কোথাও পরম অঙ্কে, বেশির ভাগ জায়গায় আনুপাতিক হারে) লাগাতার কমে যাচ্ছে। ধর্ম নিয়ে রসিকতা এবং কার্টুন এখন পৃথিবীর অন্যতম উচ্চফলনশীল রসসাহিত্য। টিকি তিলক টুপি দাড়ি—এখন সাধারণ লোকের মনে যতটা সম্ভ্রম জাগায়, তার চেয়ে ঠোঁটে অনেক বেশি হাসির উদ্রেক করে! আপনিও এটা লক্ষ করেছেন, তাই না? তার মানে সঙ্কট কোথায় নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন!

আরও এক জ্বালা এই যে এক কালে ধর্ম যাকে আটকাতে গিয়েছিল, আজ প্রতি পদক্ষেপে তার কাছে হাত পেতে বহু জিনিস নিতে হচ্ছে। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি। ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট গরু বা ঘোড়ার গাড়ির বদলে বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট রেলগাড়িতে এখন ঠাকুর মশাই, বড় ইমাম সাহেব কিংবা স্বয়ং পোপ মহাজনকেও চেপে ঘুরতে হয়। ধর্ম মানুষকে কী দিতে পারে তা এত দিনে জানা হয়ে গেছে। বিপদে আপদে সান্ত্বনা বা স্তোক বাক্য শোনানো ছাড়া তার পক্ষে আর কিছু যে দেওয়া সম্ভব নয়, তা সকলেই জানে। সকলেই মানে কিনা অবশ্য বলা মুশকিল। তা মানুক চাই না মানুক, অসুখ বিসুখ হলে পবিত্র জর্ডন নদীর জলের ঝাপটা, কিংবা জমজমের পানির ছিটে, অথবা মা গঙ্গার জলের স্পর্শ কতটা কী করতে পারে আপনিও জানেন, আমিও জানি। বিষধর সাপে মন প্রাণ ঢেলে কামড় দিলে মা মনসার সামনে হত্যে দিয়ে পড়েই থাকুন, আর মাজারের ফুলের রেণুই ছড়িয়ে দিন, ফলাফল কাউকেই বলে দিতে হবে না। বিজ্ঞান এই সব জায়গায় ম্যাজিকের মতো কাজ করে থাকে। বসন্ত কলেরা ম্যালেরিয়া—এক কালে কত গ্রাম কে গ্রাম উজার করে দিত। একশ বছর আগেকার গল্প উপন্যাসে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ ছড়িয়ে আছে। আজ সেই সব ঘটনা ইশপ বা পঞ্চতন্ত্রের গল্প বলে মনে হয়। বিজ্ঞান রোজ রোজ এত রকমের খেল দেখাচ্ছে যে আজকাল পাণ্ডা পুরুত ইমাম পাদ্রিকেও সেই সব খেলা দেখতে এবং দেখাতে হচ্ছে। অলৌকিক অপ্রাকৃতিক অতিপ্রাকৃতিক যত রকমের ঘটনার কথা জানা যেত—ভূত, দত্যি দানো, রাক্ষস, জ্বিন, পরী, ফেরেস্তা, দেবদূতদের আনাগোনা—সকলেই এখন বিজ্ঞানের তাড়া খেয়ে খেয়ে লোকালয়ের বাইরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। যে ধার্মিক ভূত বা অপদেবতার ভরে বিশ্বাস করে, সেও তার নিজের মেয়ের উপর কেউ ভর করেছে জানলে মনোচিকিৎসকের কাছেই আগে দৌড়য়। যে সত্যিই বিশ্বাস করে, রামকৃষ্ণের ভাব সমাধি হত, সেও নিজের ছেলের ওরকম সমাধিভাব দেখলে স্নায়ুচিকিৎসকের কাছে গিয়ে এপিলেপসির নিদান চায়!

বিজ্ঞানের কাছে প্রতি পদক্ষেপে এই পরাজয় আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না! বাইবেল থেকে শুরু করে সমস্ত ধর্মগ্রন্থে কত সুন্দর করে সাজানো ছিল এই বিশ্ব সংসার। সেই পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে হঠিয়ে দিল বিজ্ঞান! মানুষ ছিল ভগবানের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। বিজ্ঞান এসে বলে দিল, সেও নাকি বানর গরিলা শিম্পাঞ্জির মতো প্রাণীদের মতোই কোনো এক প্রাচীন পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তনের পথে ধাপে ধাপে আবির্ভূত হয়েছে। অন্য সব কিছু বাদ দিলেও বস্তুজগত সৃষ্টির দায়িত্ব থেকে ঈশ্বরকে সরানো যাবে না বলেই ভেবেছিলেন ওনারা। ও হরি, বিজ্ঞান দেখিয়ে দিয়েছে, বস্তুজগত সৃষ্টির কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সে নিজেই অনাদি অনন্ত দেশে কালে বিদ্যমান। এবং তার সমস্ত অংশই গতিময়, পরিবর্তনশীল।

উঃ, গতিকেই শেষ অবধি আঁকড়ে ধরেছিলেন তাঁরা। এই স্থাণু বিশ্বের সমগ্র বস্তুনিচয় গতি পেল কোত্থেকে? বল, বল! তোমাদের বিজ্ঞানেই তো বলেছে, স্থির বস্তু তো আর কোনো বাহ্যিক বলের ধাক্কা ছাড়া গতিশীল হতে পারে না। তাহলে এই স্থির বিশ্ব গতিশীল হওয়ার মতো উপযুক্ত ধাক্কা পেল কার কাছ থেকে? প্রশ্নটা এক কালে খুবই জটিল প্রশ্ন ছিল। নিউটনের মতো পণ্ডিত মানুষও এই প্রশ্নের সামনে পড়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। কোনো সমাধান পাননি। আরিস্ততল যে সমাধান দিয়েছিলেন সেটাও তাঁর পছন্দ হয়নি। ভগবান রোজই একবার করে গ্রহ নক্ষত্রগুলোকে ধাক্কা দেন। আর তারা চলতে থাকে। নিউটনের গতিসূত্রের সঙ্গে এই দৈনন্দিন ধাক্কার তত্ত্বকে মেলান যায় না। সেই জন্য তিনি শেষ অবধি বলেছিলেন, ঈশ্বরই বিশ্ব সৃষ্টির গোড়াতে এক রাম ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলেন। তারই ঠেলায় দুনিয়ার সমস্ত কিছুই নিত্য চলমান। যে যার নিয়ম মেনে নিজ নিজ কক্ষ পথে।

ফ্রান্সের অষ্টাদশ শতাব্দের বস্তুবাদীরা অবশ্য বিজ্ঞানের সাহায্য ছাড়াই এই তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, গতি বস্তুরই নিহিত স্বধর্ম। তা আবার বাইরে থেকে যোগান দিতে হবে কেন? তা এমনিতেই বস্তুর মধ্যে নিজে থেকেই গোড়া থেকেই আছে। অতএব ভগবানের এই ব্যাপারে গোড়ায়ও কিছু করার ছিল না, রোজ রোজও কিচ্ছুটি করার নেই! যাচ্চলে। শেষ পর্যন্ত গতিও হাতছাড়া হয়ে গেল ঈশ্বরের।

হ্যাঁ, সেও ঠিক। উনিশ শতক থেকে বিজ্ঞান যত এগোতে লাগল, ততই বস্তুর নতুন নতুন গতির খবর আসতে লাগল। গ্যাসীয় পদার্থে, জলীয় দ্রবণে অণুগুলি সদাই চঞ্চল। কঠিন পদার্থেও অণুগুলি স্পন্দমান। আকাশের যত দূরেই তাকাই, দেখি কেউ থেমে নেই। পরমাণুর ভেতরে তাকানো শুরু হল বিশ শতকের গোড়ায়। সেখানেও ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন, গ্লুওন, কোয়ার্ক—কারোরই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে না! তাহলে এই বিশ্ব সংসারে স্থির ছিল কে, যাকে শ্রীশ্রীভগবান রাম ধাক্কা দিয়ে চালু করে দিয়েছিল? ফলে শুধু দর্শন নয়, বিজ্ঞানও জানিয়ে দিল, বস্তু জগত সৃষ্টির মতোই গতি সৃষ্টির জন্যও কোনো ঈশ্বর জাতীয় কাউকে আর লাগছে না! এক কথায় বলতে গেলে, ভগবানজির শেষ আশ্রয় স্থলটুকুও ধর্মীয় বিশ্বাসের আওতার বাইরে চলে গেছে!

তারপর থেকেই মন্দিরে মসজিদে মাইকের তারস্বরে চিৎকার বেড়ে গেছে। ভগবান রেগে নিয়ে সেই যে স্বর্গোদ্যানের চিলেকোঠায় দরজা বন্ধ করে মুখ লুকিয়ে বসে আছে, ভক্তরা দেখছে, ডাকলে সে কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না, হয়ত বিশ্বাসীদের আর্তনাদ শুনতেও পাচ্ছে না। আর ভক্তরা ভাবছে, জোরে জোরে মাইক বাজিয়ে মন্ত্র পড়লে বা আজানের আওয়াজ দিলে যদি ঈশ্বর বা আল্লাহ্‌ শুনতে পায়!

পাচ্ছে কি? মনে তো হয় না।

কী ভয়ানক এই ত্রি-সঙ্কট! এর হাত থেকে আজ আর বিশ্বের কোনো ধর্মেরই পরিত্রাণ নেই। তাদের বেঁচে থাকার এখন একমাত্র উপায় মৃত্যুর দিনক্ষণকে কোনো রকমে আরও কিছু দিন পিছিয়ে দেওয়া। তার জন্য প্রয়োজনে যারা যুক্তি তথ্যের ভিত্তিতে সত্যের পতাকা হাতে এগিয়ে চলেছে, তাদের হাতের মশাল কেড়ে নিয়ে সেই অভিযান মাঝপথে বা পথের এক একটা মোড়ে থামিয়ে দেওয়া।

 

রাষ্ট্রীয় মদতে ধর্ম সন্ত্রাস

এই বার অন্য দিকটাতে তাকানো যাক। ভারত থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পাকিস্তান আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের শাসকগোষ্ঠী কেন এই ধর্মীয় সন্ত্রাসে মদত দিচ্ছে? আজ থেকে বিশ বা ত্রিশ বছর আগে এই সব দেশে তো এরকম ঘটনা এত ব্যাপক হারে ঘটতে দেখা যায়নি। এখন কী হল?

এদের বেলায় হচ্ছে এক অনিরসনীয় আর্থসামাজিক সঙ্কট। যা থেকে এদের কেউ পরিত্রাণের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যে ধনতন্ত্র এতদিন ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করছে, সে এখন নানা রকম সমস্যায় ভুগছে। তার সমস্ত উৎপাদিত পণ্যের বাজার নেই। তাদের বহু পণ্য অবিক্রীত হয়ে গুদামে পড়ে থাকছে। ফলে সেই বাজারের বড় হিস্যা ধরা নিয়ে এক একজন উৎপাদকের মধ্যে কী ভীষণ দ্বন্দ্ব! তারাই আবার সারা বিশ্বের কাঁচা মালের উৎস ভাণ্ডারগুলি দখল করে নিতে চায়। সে তেল হতে পারে, নিম গাছের অণু হতে পারে, নদীর পেয় জল হতে পারে, বিভিন্ন ধাতুর খনিজ আকরিক হতে পারে, জঙ্গলের কাঠ হতে পারে। সবই তারা নিঃস্ব করে পেতে চায়, কিন্তু চায় যে অনেকেই। ধনপতিদের মধ্যে এই নিয়েও তীব্র বিসম্বাদ!

ধনদাররা যত দখল করে নিতে চায়, সাধারণ মানুষ ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের চাকরির বাজারেও টান পড়েছে। বেকারের সংখ্যা প্রবলভাবে হু হু করে বেড়ে চলেছে। এক একটা দেশে বিদেশি শ্রমিকের বিরুদ্ধে সেই দেশের জনসমষ্টিকে খেপিয়ে তোলা হচ্ছে। মার্কিন ধনকুবেররা চায় তাদের অফিসের কাজ ভারত পাকিস্তানের মতো সস্তার শ্রমশক্তিকে ব্যবহার করে করিয়ে আনতে। তাদের শ্রমিকরা চায়, দেশের কাজ দেশেই করাতে হবে। তা নিয়েও দ্বন্দ্ব প্রতিদ্বন্দ্ব বাড়ছে। বিক্ষোভ হচ্ছে। মিছিল হচ্ছে। ধর্না জমায়েত হচ্ছে। প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে জোরে জোরে।

মধ্য চাষিও ফসলের দাম পাচ্ছে না। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নিয়ে কৃষিতে যে বিনিয়োগ করছে, তোলা ফসল বিক্রি করে সেই খরচও পুরোটা তুলতে পারছে না, লাভ করা তো দূরের কথা। বিজয় মাল্য রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্ক থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা শোধ না করে ব্যবসা লাটে তুলে দিয়ে কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রেখে দেশ ছেড়ে পালাতে চাইলে সরকার তাকে সুরক্ষিত পাহারায় বিমান বন্দরে পৌঁছে দেয়। নীরব মোদীকে আরও বেশি টাকা নিয়ে পালাতে দিয়েছে। আধার লিঙ্ক সহ। আর সাধারণ চাষিকে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা ঋণ শোধের অক্ষমতায় আত্মহত্যা করতে হচ্ছে।

ভূ-পরিবেশ ক্রমশ দুষিত হয়ে চলেছে। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভেজাল সুখাদ্য, প্রতিদিনের বিশুদ্ধ পানীয় জল, বুক ভরে নিশ্বাস প্রশ্বাস চালাবার মতো নির্মল বায়ু—কোনো কিছুই ধনতন্ত্র আজ আর সাধারণ মানুষের জন্য অব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় ফেলে রাখতে রাজি নয়। উচ্চফলনশীল শস্য চাষের স্বার্থে রাসায়নিক সার, কীটনাশক আর সংরক্ষক-দ্রব্যের দীর্ঘমেয়াদি এজমালি ক্রিয়ায় এবং দ্রুতখাদ্য হিসাবে আমাদের উদরে যে অন্তিম উপচার প্রবেশ করে, তা একই সঙ্গে রসায়ন শাস্ত্রের এমন কিছু সদস্যকে বয়ে আনে, যা আমাদের শরীরকে বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে দিতে চায় না। স্থূলতা, কর্কট, স্মৃতিভ্রংশ, পার্কিন্সনি রোগ—ইত্যাদি এখন সারা পৃথিবী জুড়ে মনুষ্যসৃষ্ট এক সংগঠিত মহামারী রূপে আত্মপ্রকাশ করে চলেছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও বর্জ্য পদার্থের সম্মিলিত চাপে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। যার ফলে প্রতি বছর প্রতি দিন প্রতি ঘন্টায় কিছু না কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির অসময় অপ-বিলোপন চলছে। জীব বাস্তুতন্ত্র এক অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সব কিছু মিলিয়ে কোনো কোনো বিজ্ঞানীর মতে পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব আর বড় জোর একশ বছর।

আর এই সব ঘটনার এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, মেঘ বৃষ্টি ভূমিকম্প ঘুর্ণিঝড়ের মতোই এরকম যাবতীয় সমস্যার চরিত্র এবং সমাধানের উপায় প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশের রামপালে সুন্দরবনের গা ঘেঁসে তাপবিদ্যুত কারখানা স্থাপন করলে যে জল ও বায়ু দুষণ হবে তা স্থানীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তা ভারতের বুকেও আছড়ে পড়বে। ভারত যদি তিস্তার জল আটকে হিমালয়ের ভঙ্গুর বুকে জলবিদ্যুত প্রকল্প নির্মাণ করতে যায় এবং তার দ্বারা নিজস্ব সীমানায় জল বেশি ব্যবহার করতে চায়, তাতে শুধু  বাংলাদেশকেই বেকায়দায় ফেলা হবে এমন নয়; অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চ-তিস্তার সংলগ্ন অববাহিকায় বাড়তি সঞ্চিত জলের যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে তার ফলে যে কোনো সময় একটা ভাঙন সৃষ্টি হয়ে নিম্ন-তিস্তা অববাহিকায় প্রলয় ঘটে যাবে। এগুলো আজ আর সম্ভাবনা মাত্র নয়, অপ্রত্যাশিত দুর্বিপাকও নয়। সুপরিজ্ঞাত তত্ত্বজাত ঘটনা। ফরাক্কা বাঁধের ফলে শুধু বাংলাদেশের পদ্মাই শুকিয়ে যায়নি, ভারতের বুকেও মালদা এবং মুর্শিদাবাদ জেলায় যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়ে চলেছে তা এই বহুদেশিক সমস্যার দিকে অঙ্গুলীনির্দেশ করছে। সুতরাং, যারা এই সব সমস্যার সমাধানের দাবিতে এগিয়ে আসবেন, তাদের আন্দোলনের চরিত্রও প্রথম থেকেই অসীমান্তিক। তার সাফল্যের সম্ভাবনা শক্তি এবং প্রতিশ্রুতিও তাই অনেক বেশি।

স্বভাবতই, ভুক্তভোগী মানুষ যতই এই সব ঘটনার কথা জানতে পারছে, ততই সে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। দেশে দেশে কালে কালে। হওয়ারই কথা। যারা এই সমস্ত সমস্যার কারক এবং জন্মদাতা, তারাও তা জানে। তাদের তাই আগে থেকে সাবধান হয়ে রাস্তা খুঁজে বের করতে হচ্ছে, কীভাবে এই সব বিক্ষোভকে প্রশমিত করা যায়, বিপথগামী করা যায়। এক কথায় প্রকাশ করতে গেলে, সাধারণ মানুষের নজর কীভাবে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।

গত একশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই নজর ঘোরানোর প্রযুক্তি সারা দুনিয়ার দুস্ট শাসকদের হাতে একটিই। তা হল, কিছু ফালতু বা অমূলক অভিপাদ্যের দিকে সংবেদনশীল জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের উত্তেজিত করা। দেশ বিপন্ন। জাতি বিপন্ন। ধর্ম বিপন্ন। তার জন্য কিছু “শত্রুপক্ষ”-এর ছবি তৈরি করাও দরকার, যাদের এই সব বিপদের অপ্রতিরোধ্য আবাহক হিসাবে প্রতিপন্ন করা যায়!

আরও লক্ষণীয়: এই সমস্ত “বিপন্নতা”-র মধ্যে আবার ধর্মের “বিপন্নতা” সংক্রান্ত গর্জনাদ গসাগু হিসাবে বাকিগুলোর সাথে ভারি চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যায়!

বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? আচ্ছা, প্রথমে এই উদাহরণটা দেখুন।

এই মুহূর্তে প্রায় সমস্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত দেশে “ইসলাম বিপন্ন”  আওয়াজ তুলে দিলে, সেই সব দেশের আপামর জনগণকে দিয়ে অনেক রকম দুরাচার গ্রাহ্য করিয়ে নেওয়া যায়। করতে উৎসাহও দেওয়া যায়! কে কী কেন কবে কোথায়—কিছুই না জেনেও নাগরিকদের এক বিরাট অংশ ধরেই নেবে, নিশ্চয়ই বিপন্ন, না হলে আর ওরা বলছে কেন? সত্যিই ইসলাম বিপন্ন কিনা—এও যেমন তাদের অধিকাংশই ভাববে না, ইসলাম বিপন্ন হলেই বা তাতে আমার কী হাতিঘোড়া এসে যায়—সেই কথাটাও তারা আর ভেবে দেখতে চাইবে না। “অত সময় কই মশাই? আগে, এক্ষুনি, যে ইসলামকে বিপদে ফেলেছে, তার মাথাটা কচাৎ করে কেটে ফেলি গে’। তারপর আপনার ওসব যুক্তি তর্ক নীতিকথা শুনব’খন।” এরকম একটা গণ প্রক্ষোভ (mass hysteria) তাদের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ তৈরি হয়ে যায়! তালিবান আল কায়দা আইসিস বোকো হারাম ইত্যাদি ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলো ঠিক এই কৌশলেই তাদের যাবতীয় কুকর্ম করে চলেছে। আর পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে দেশ জাতি আর ধর্মের বিপন্নতাকে একই মৌল সমসত্ব বিপন্নতা হিসাবে দেখানো খুবই সহজ কাজ। আর এরকম অবস্থা একটা দেশে একবার তৈরি করতে পারলে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের প্রশ্ন, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার—এক কথায় মানুষের সমস্ত গণতান্ত্রিক স্বাধিকার ভোগ করার সুযোগ কেড়ে নেওয়া যায়।

আর আজকাল কে না জানে, এই যাবতীয় ইসলামি জঙ্গি সন্ত্রাসী সংস্থাগুলোকে তৈরি করে টাকাপয়সা নিরাপত্তা দিয়ে চালু রেখেছে আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের “শান্তি ও গণতন্ত্র প্রিয়” সরকার। সেই রাষ্ট্রীয় মদত। আল কায়দা তালিবান থেকে শুরু করে আজকের আইসিস পর্যন্ত সব কটি ইসলামি সন্ত্রসবাদী শক্তিই আমেরিকার যুদ্ধ মেশিনের আড়াল-সন্তান।

বাংলাদেশে অন্য নামে, এক আধটা যুক্তিবাদী নাস্তিক বক্তব্য সম্পন্ন ফেসবুক পোস্ট দেখিয়েও, সেখানকার ইসলামিক সংগঠনগুলি ঠিক এই কাজই করে চলেছে। তাদের পেছনেও আছে বাংলাদেশ সরকারের প্রচ্ছন্ন মদত ও সুরক্ষা। ওদেশেও গণতন্ত্রকে বধ করার নাটক একই সঙ্গে অভিনীত হয়ে চলেছে।

এবার ভারতের কোনায় কোনায় দেখুন। একই ছবি। পাকিস্তান জুজু দেখিয়ে, কাশ্মীরের ঘটনা দেখিয়ে ভারতের “অখণ্ডতা বিপন্ন” বলে হাঁক দিলেই অধিকাংশ মানুষের যুক্তিবুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়। পাকিস্তান কী করেছে, তার ক্ষমতা কদ্দুর, দুচারটে জঙ্গি হানা করে বা জঙ্গি গ্রুপ ঢুকিয়ে এত বড় একটা দেশের অখণ্ডতা সত্যিই খণ্ড খণ্ড করতে পারে কিনা—এই ধরনের সমস্ত কার্যকর প্রশ্নগুলো তোলার কথা মানুষ ভুলে যায়। কিংবা, মুম্বাইয়ের সাত তারকা হোটেলে জঙ্গিরা এত বিপুল অস্ত্রশস্ত্র জমা করল কীভাবে, সীমান্ত রক্ষীরা কী করছিল—সেই সমস্ত জরুরি প্রশ্ন তুলতেও ভুলে যায়। অন্য কেউ সেই সব প্রশ্ন তুলে দিলে বা বলতে চাইলে, তাকে পাকিস্তানের দালাল বলে গাল পেড়ে আবার একই কথা বলে যাওয়া যায়!

এ এক ধরনের গণ বিভ্রান্তি (mass hallucination), একটা কাল্পনিক চিত্রকে বাস্তবের ছবি বলে মনে করা এবং তার ভিত্তিতে সামষ্টিক উত্তেজনা প্রদর্শনমূলক আচরণ করা। এই উগ্র আচরণ যখন চারদিকে পরিদৃশ্যমান হয়ে ওঠে, অন্য মত, বিপরীত চিন্তা, ভিন্ন অবস্থান নেবার অধিকার—কোনো কিছুকেই তা মাথা তুলতে দেয় না। যুক্তির ফুসফুস এক অসহায় শ্বাসরোধী অবস্থায় তখন হাঁসফাস করতে থাকে।

উঁহু, আপনি এই জিনিসটা বোধ হয় লক্ষ করতে ভুলে গেছেন। এই উগ্র দেশপ্রেম জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির নামে গণ বিভ্রান্তি তৈরি করার পক্ষে একটা সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অবকাঠামো অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছে। সেটা হচ্ছে পাকিস্তান আর কাশ্মীরের সঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যার অস্তিত্ব। আর হিন্দুত্বের মোড়কে মুসলিম ধর্মের এবং ধর্মবিশ্বাসীদের বিরোধিতা। অর্থাৎ, আবার সেই ধর্ম নামক গুণনীয়কটি এসে গেল। গণ বিভ্রান্তিই বলুন, আর গণ প্রক্ষোভ—উভয়েরই পেছনে রয়েছে সেই ধর্মের পক্ষ-বিপক্ষ খেলা। সেই তোমরা আর আমরা। তোমারটা শান্তির নাম করে সন্ত্রাস; আর আমারটা সন্ত্রাস রুখবার নাম করে জঙ্গিপনা! এখানে আমার গায়ের এবং গলার জোর বেশি। অতএব আমার কথাটাই সত্য। বা, আধুনিক অধুনোত্তর পরিভাষায় পরাসত্য (post-truth)!

কিন্তু এমন অনেক দেশ তো আছে, যেখানে হয়ত ধর্ম সরাসরি কোনো উত্তেজনার বারুদ হিসাবে কাজ করেনি, সেখানেও কি তার একটা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে?

অবশ্যই থাকে।

জার্মানিতে হিটলার যে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, তার মধ্যে যে ইহুদি-খ্রিস্ট ধর্মের বিরোধকে কাজে লাগানো হয়েছিল, তার কথা কি ভুলে গেলেন? হ্যাঁ, ইহুদি সেখানে জাতিসত্তারও প্রতীক বটেই। অনেকেই জাতিসত্তায় ইহুদি হলেও ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিলেন। তাতেই বা কী হল? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের খান সেনারা যেমন বাঙালি মুসলমানকে মুসলমান বলে মনে করত না, তার জাতিসত্তাকেই প্রাধান্য দিয়ে তাদের ইসলামের শত্রু বলে ভাবত এবং প্রচার করত, হিটলারের আমলেও অনেকটা এই রকমই ব্যাপারটা ঘটেছিল। “হুঁ হুঁ বাওয়া, খ্রিস্টান সেজে ভেবেছ আমাদের চক্ষে ধুলো দেবে? কক্ষনও না। তোমার সাদা-ধূসর চোখের মণি, তোমার নামের শেষে -স্টাইন, তোমার নামের মধ্যাংশে জোসেফ ডেভিস আইজ্যাক প্রমুখ শব্দ বলেই দিচ্ছে তুমি ইহুদি ধর্মপথের পথিক। আমরা ওটাকে ঘৃণা করি। সেই ঘৃণা আমরা আমাদের জাতির মধ্যে ছড়িয়ে দেব। বিশুদ্ধ খ্রিস্টানরা তোমাদের ভেজালকে মেনে নেবে না। আর্য রক্তকে তোমাদের দ্বারা কলুষিত হতে দেবে না!” এই ভাবেই সেদিন হিটলারের নাৎসি প্রচার যন্ত্র জাতিবাদ, জাতীয়তাবাদ আর নৃজাতিসত্তার সাথে ধর্মকে মিলিয়ে মিশিয়ে খিচুরি পাকিয়ে বৃহত্তর জার্মান জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছিল। আর সেই গণ বিভ্রান্তির জালে পড়ে আম জার্মানরা অধিকাংশ তখন বেশ কয়েক বছরের জন্য জীবন সংগ্রামের আসল আসল মুদ্দা থেকে এই নকল মুদ্দার দিকে নিজেদের নজরকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে ধর্মের মতো নেশাপ্রদ দ্রব্য আর হয় না। এলএসডি মারিজুয়ানা তো কোন ছাড়!

 

ফ্যাসিবাদ আসছে

ধর্মীয় নেশার আসলে কাজ কী? এবার সেই জায়গাটা আমাদের বুঝে নিতে হবে। আমরা আগেই দেখিয়েছি, ধর্ম যে এক নিরুপায় অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে তার অন্যতম প্রধান ও প্রথম কারণ তার জ্ঞানের জগত থেকে উত্তরোত্তর বিচ্ছিন্নতা। যা কিছু সে বলে, যা কিছু সে প্রচার করে—তার সবই মিথ্যার উপর, বর্জিত জ্ঞানের উপর দাঁড়িয়ে। তার ঈশ্বর ধারণা, স্বর্গ-নরক পাপ পুণ্য ধারণা, আত্মা-পরমাত্মা শেষ বিচার জন্মান্তরের ধারণা, তার আচার বিচার প্রথা প্রকরণ, তার নৈতিক নির্দেশনা, পবিত্র অপবিত্র ভেদাভেদ বোধ, তার খাদ্যবস্তুর হালাল হারাম বিভাজন, তার পুরুষ নারী সম্পর্ক অধিকার ও দায়িত্ব সংক্রান্ত ভাষ্য, তার বস্তুজগত সম্পর্কিত ব্যাখ্যা—এক কথায় বলতে গেলে, এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে দাঁড়িয়ে আছে একগুচ্ছ বিশুদ্ধ ভুলের সুসজ্জিত রঙ্গমঞ্চে।

হ্যাঁ, সে তো বটেই। ভুল থেকেই আমরা জানার কাজ শুরু করি এবং ধীরে ধীরে ভুলগুলিকে এক এক করে ঝেড়ে ফেলে সঠিক জ্ঞানের দিকে পা ফেলে এগিয়ে যাই। মানব জাতির জ্ঞানজগতের ইতিহাস হচ্ছে অজ্ঞতা থেকে সত্য জ্ঞানের দিকে অগ্রগতি। সেই অর্থে ভুল করাটা কোনো দোষের কথা নয়। এগোতে পারলেই হল।

কিন্তু মুশকিল কী জানেন? এই অগ্রগতির প্রশ্নটিই ধর্মের এক প্রকাণ্ড অপস্থিতি (anti-thesis)। তার শাস্ত্র, তত্ত্ব, বিচার, প্রথা, সবই প্রাচীন এবং সে সব যত প্রাচীন তত পবিত্র এবং শ্রদ্ধার্হ। সেখানেই সে স্থিত থাকাটাকে তার পরম কর্তব্য মনে করে। সেই সব ছেড়ে এগোলেই তার পতন। তার এই স্থৈতিক অবস্থানই তার জ্ঞানরহিত স্থবিরতার গ্যারান্টি। আর জ্ঞানরহিত বলেই ধর্মের পক্ষে এক রকম অন্ধতা ও যুক্তিহীনতার জন্ম দান করা সহজ ও সম্ভব হয়ে ওঠে। সচেতনভাবে ধর্ম চর্চা করার সঙ্গে তাই অন্ধতা গোঁড়ামির শিকার হয়ে ওঠা এক স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখা দেয়। এর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি বা অসৎ পরিকল্পনা নেই। এই তার ভবিতব্য। এমনটাই এর অমোঘ নিয়তি। ধর্মীয় বিশ্বাসের গণ্ডী থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে না পারলে অন্ধতা ও গোঁড়ামির থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আর যত তার সঙ্কট বাড়ছে, ততই সে এই ভবিতব্যকে আরও জোরে, আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরছে।

আধুনিক শোষণমূলক ধনতান্ত্রিক সমাজ এই সব ঐতিহাসিক সত্য ও শিক্ষাগুলিকে বেশ ভালোভাবেই আত্মসাৎ করতে পেরেছে। ফরাসি বিপ্লবের চাইতে ইংল্যান্ডের বিপ্লবই তার কাছে অধিক পছন্দসই। ধর্মকে ওরা একেবারে উচ্ছেদ করে ফেলেনি। কিছুটা জায়গা ছেড়ে রেখেছিল। আবার জার্মানির বুর্জোয়া বিপ্লবকে সে আরও বেশি পছন্দ করে। যেখানে কান্ট ফিখটে শেলিং হেগেল প্রমুখদের হাত ধরে ধর্মের সাথে আপসকে এক প্রচ্ছন্ন তাত্ত্বিক দার্শনিক পরিচ্ছদে আবৃত করেই বুর্জোয়ারা সমাজ পুনর্গঠনে হাত লাগিয়েছিল। নাস্তিক নিৎসেও ধর্মকে এক ভাবে কাজে লাগানোর কথা বলে যান স্রেফ শ্রমিক বিপ্লবের সম্ভাবনাকে রুখবার অচেতন প্রয়োজনবোধ থেকেই। এক সার্ত্রকে বাদ দিলে অস্তিবাদী দর্শনও জার্মানির মাটিতে বসে ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বকে জড়িয়ে ফেলে।

মানব জাতির ইতিহাস ভারি রসিক এবং নির্দয়।

আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত মারণ যজ্ঞ স্বরূপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা লক্ষ করে একদল মানবতাবাদী চিন্তাবিদ বিজ্ঞান এবং যুক্তিশীলতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ধর্ম এবং ঈশ্বরের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়লেন। আরও বেশি বেশি করে তাঁরা আধ্যাত্মিকতার জয়গান গাইলেন। যা মানুষকে আরও অন্ধতা ও গোঁড়ামির দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে গেল। সেই অন্ধতা আর গোঁড়ামি আবার মিথ্যা দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢেলে ঢেলে উত্তেজনার উত্তাপ বাড়িয়ে সেই সব দেশগুলিকেই আরও নিশ্চিতভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে আপ্লুত করে দিল! হিটলার আর মুসোলিনিকেও সেই অন্ধতা আর কট্টরতা দারুণভাবে সাহায্য করেছিল তাদের ফ্যাসিস্ত রাজ কায়েম করার কাজে। ধর্মের কাছে শান্তি চেয়ে তাঁরা পেলেন আরও ব্যাপকতর হিংসা।

আজ ভারতের বুকেও আমরা সেই একই খেলা দেখতে পাচ্ছি।

এক বিরাট সংখ্যক সাধারণ মানুষ ধর্মীয় ভাবাবেগের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। গো-ভজনা, মুসলমান বিদ্বেষ, কাশ্মীর নিয়ে গা-গরম দেশপ্রেম, পাকিস্তান বিরোধী জিগির, ইত্যাদি পরিবেশনের ক্যালেন্ডার দেখলেই তা বোঝা যাচ্ছে। সেই মনমোহনের আমল থেকেই ভারতীয় পুঁজিবাদ খুব দ্রুত অর্থনীতি রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। স্বাধীনতা উত্তর কালে যতটুকু সীমিত গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো গড়ে উঠেছিল, সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার প্রভাবে যে সামান্য একটা জনমুখী অর্থব্যবস্থার ঠাটবাট তৈরি করা হয়েছিল, ১৯৯১-উত্তর “উদার”-নীতির আমলে সেই সমস্ত ভেঙে দিয়ে ভারতীয় পুঁজিবাদ তার দাঁত-নখ বের করে ফেলেছে। আর কংগ্রেসি রাজনীতিতে যে ঢিলেঢালা ভাব ছিল, বিজেপি তা কাটিয়ে উঠে দ্রুত সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে শাসক দলীয় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেলতে চাইছে। প্ল্যানিং কমিশন ভেঙে দেওয়া, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাথায় দালাল বসানো, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সঙ্ঘের লোকজনকে নিযুক্ত করা, বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে নেবার প্রচেষ্টা, পার্লামেন্টের বাইরে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া—এসব এখন যেন সাধারণ ঘটনায় পর্যবসিত।

গোপাল গান্ধী ২০১৪ সালে (তখনও মনো আমল) সিবিআইয়ের প্রতিষ্ঠাদিবসের ভাষণে অভিযোগ করেছিলেন, একটা কর্পোরেট পরিবার (রিলায়েন্স গ্রুপ) দেশের সমস্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদের সিংহভাগের মালিক ও নিয়ন্ত্রক হয়ে বসেছে। দিল্লির সরকার তাদের কথায় ওঠবোস করে চলেছে। সেই অভিযোগ আরও সাংঘাতিকভাবে এখন মূর্তরূপ ধারণ করেছে। তবে হ্যাঁ, একটা নয়, একাধিক কর্পোরেট গ্রুপ। আম্বানির পাশাপাশি আদানি, বেদান্ত, এশার, মাল্য, রামদেব, ইত্যাদিরাও এই সার্বিক লুটের খেলায় এখন টিম হিসাবেই হাজির। এই লুটের অংশ হিসাবেই সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তারা ফেরত দিচ্ছে না, সেই অবস্থাতেই আবার ঋণ নিচ্ছে এবং মোদীর বদান্যতায় পেয়েও যাচ্ছে। ছত্তিসগড়ে অ্যালুমিনা সহ বিবিধ খনিজ আকরিক উৎসের উপর বিনি পয়সায় দখল নেবার জন্য আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে পাহাড় জঙ্গলের যথেচ্ছভাবে ইজারা বন্টন চলছে। কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্যে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার একর জমি পাতঞ্জলিকে বিনা পয়সায় দান করা হচ্ছে তার ব্যবসাকে বাড়িয়ে তোলার জন্য। এইভাবেই ২০১৬-১৭ সালে বড় নোট বাতিলের হিংস্র আগ্রাসনে দেড় শতাধিক নাগরিককে হত্যা করে এক ধাক্কায় কয়েক লক্ষ কোটি টাকা মানুষের পকেট থেকে জবরদস্তি কেটে এনে ব্যাঙ্কের শূন্যপেট ভরানোর ব্যবস্থা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বাধা সত্ত্বেও জোর করে সর্বত্র আধার কার্ড বাধ্যতামূলক করে জনসাধারণের ব্যক্তিগত তথ্য ভারত সরকার হয়ে আমেরিকান সরকারের মহাফেজখানায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি একটা বিল আনা হয়েছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে বৃহৎ ব্যাঙ্কগুলি দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছলে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত অর্থ থেকে টাকা কেটে তাকে রক্ষা করা হবে। এ যেন এক বিপ্র-অভিস্রবণ প্রক্রিয়া (reverse osmosis) চলছে, যেখানে বিপুল পুঁজির মালিক আম্বানি-আদানি-নীরবদের অনাদায়ী ঋণের বোঝার ভার কার্যত বইতে হবে নিঃস্বপ্রায় আম জনতাকে।

সরকার এবং শাসক দল এই সব চূড়ান্ত জনস্বার্থ হত্যাকারী পদক্ষেপগুলোকে লোকচক্ষুর থেকে আড়াল করে রাখতে এবং সাধারণ মানুষকে অন্য দিকে মাতিয়ে দিতে চাইছে, যাতে তারা খানিকটা বোঝার পরও এর দিকে যথেষ্ট মনঃসংযোগ না করে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও মনন-বিভাজন, গোরক্ষার হুজুগ, লাভ জেহাদ রোখা, পাকিস্তান বিরোধী জিগির, ইত্যাদির নামে যত্রতত্র হামলা চালিয়ে সঙ্ঘ পরিবার তাদের নানা রকম সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে এক উগ্র ধর্মান্ধ হিংস্রতার জন্ম দিয়ে চলেছে। দেশীয় ঐতিহ্যের নাম করে প্রাচীন কালজীর্ণ জাতপাতের ঘৃণা বিদ্বেষকে নতুন করে চাগিয়ে তুলে বিভিন্ন প্রান্তে দলিতদের উপর বর্বর আক্রমণ ও অবমাননার ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের মতোই ভারতেও একের পর এক নরেন্দ্র দাভোলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম কালবুর্গি, গৌরী লঙ্কেশ প্রমুখকে হত্যা করে এরা যুক্তিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রতিবাদী মুখগুলোকে ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করছে।

 

আমাদের দায়

যাঁরা এই সব দুর্যোগ দেখে একে রুখবার কথা ভাবছেন, তাঁদের উপায়ের কথাও ভাবতে হবে। অযুক্তি কুযুক্তি অন্ধতা অজ্ঞতা এবং হিংসার জবাব দিতে হবে যুক্তি তথ্য সত্য জ্ঞানের প্রবলতর চর্চার মাধ্যমেই। শেষ পর্যন্ত তার শক্তি অনেক বেশি। ইতিহাসে এই শক্তিই শেষ অবধি টিকে যায় এবং বিজয় লাভ করে। আমরা জানি, ব্রুনোর হত্যাকারী গ্যালিলেওর নির্যাতনকারীদের নাম মানুষ বহু কাল আগেই ভুলে গেছে; ব্রুনো গ্যালিলেওরা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন! বাইবেলের বিদ্যা এখন শিশুদের হাস্যরসের অফুরান জোগানদার। আর তাঁদের নিরলস অকুণ্ঠ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান ভাণ্ডার মানব জাতির যৌথ সম্পদ হয়ে রয়ে উঠেছে। আমাদেরও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রাম মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও জীবন-জীবিকার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি যুক্তিবাদের চর্চাকে আরও শক্তিশালী করবে, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রচার ও প্রচারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করবে। এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই এক দিন সাধারণ মানুষ শুধু তাদের ভুলটা ধরে ফেলবে না, এই সব বিভ্রান্তি প্রচারের নিগূঢ় উদ্দেশ্যও ধরে ফেলবে!

এত দূর এসে ধর্ম সম্পর্কে মার্ক্স এবং মার্ক্সবাদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

কেন না, এই সময়ে এসে এক সমস্যা হয়ে গেছে একালের মার্ক্সবাদীদের, আমাদের মতো দেশের বামপন্থীদের। তাঁরা যেন রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। ধর্ম সম্পর্কে মার্ক্সের লেখা একটা ছোট অনুচ্ছেদ তাঁদের এই বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এক সময় তাঁরা অনুচ্ছেদের শেষ বাক্যটির উদ্ধৃতি দিতেন। “ধর্ম হচ্ছে জনগণের আফিম।” ওতে যে আরও কিছু বাক্য আছে, তা যেন তাঁরা ভুলে থাকতেন। আর এখন আবার, এই বাক্যটিকেই তাঁরা সযত্নে ভুলে থাকতে চান। এখন তাঁরা কেবলই বলতে চান, এই তো দেখ, মার্ক্স ধর্মের বিরোধিতা করেননি; তিনি বলেছেন, ধর্ম হচ্ছে গরিবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন পৃথিবীর হৃদয়, ইত্যাদি। যে যা ধর্ম কর্ম করতে চায় করুক না, আমরা তাতে আপত্তি করছি না। ধর্ম নিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা না করলেই হল।

যাতে লোকে স্পষ্ট করে বোঝে, এই জন্য তাঁরা উদাহরণ দিয়েও বলেন, নরেন মোদীর মতো করে ধর্ম করবেন না, নরেন দত্তর মতো করে ধর্ম করুন। অবাক হয়ে দেখছি, গত বিশ বছরে ভারতের মার্ক্সবাদীদের মধ্যে বিবেকানন্দের চর্চা হঠাৎ যেন বেশ বাড়াবাড়ি রকম বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতা চলছে, কোন বামপন্থী দল কত বেশি বিবেকানন্দ ভক্ত সাজতে পারেন! কিংবা আধুনিক সাংবাদিকদের ভাষা নকল করে বলা যায়, এই সব বামপন্থীরা এখন সঙ্ঘ পরিবারের হাত থেকে বিবেকানন্দকে হাইজ্যাক করে আনতে চাইছেন!

পাঠকদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে আগেই বলে রাখি, বিবেকানন্দ নিয়ে আমার কোনো বীতরাগ নেই। দেশকাল ভাবনা পত্রিকায় ২০১৫ সালের শারদ সংখ্যায়, বা মুক্তমনা ওয়েবসাইটে ২০১৬ সালে আমার বিবেকানন্দ সম্পর্কিত প্রবন্ধ/পোস্ট পড়লেও এটা বোঝা যাবে। চিন্তায় বিবেকানন্দের ১৮২ ডিগ্রি উল্টোদিকে অবস্থান করলেও আমি মনে করি, তাঁর থেকে আমরা মার্ক্সবাদীরাও অনেক কিছু শিখতে পারি, নিতে পারি। প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর কিছু মূল্যবান এবং সঠিক পর্যবেক্ষণ আছে। তাঁর বাংলা গদ্য ভাষার বাচন শৈলী এবং তীক্ষ্ণতা ভয়ানক শক্তিশালী। সর্বোপরি, মঠ মিশন নির্মাণে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা থেকেও আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় কিছু আছে। আমরা বস্তুবাদী যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক এমনকি মার্ক্সবাদীরাও আজ অবধি ওরকম কিছু একটা জনগ্রাহ্য গণপ্রতিষ্ঠান ভারতের বুকে গড়ে তুলতে পারিনি। অথচ, ১৮৯৭ সালের নরেন দত্তের তুলনায় আজ আমাদের সকলের সম্মিলিত শক্তি অনেক বেশি।

প্রশ্নটা আসলে হল, বিবেকানন্দ থেকে নেওয়া, দুর্বিপাকে পড়ে তাঁকে ব্যবহার করা নয়। আজকের সমস্যা বিবেকানন্দের উদার ধর্ম দিয়ে মোদী কোম্পানির কট্টর ধর্মকে মোকাবিলা করা নয়। যাঁরা বুঝে বা না বুঝে এটা করতে চাইছেন, তাঁরা আবার অন্য দরজা দিয়ে ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছেন। আর, সমাজে যতক্ষণ ধর্ম বিশ্বাস থাকবে, ততক্ষণ সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ এবং তার ভিত্তিতে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার শক্তি সঞ্চয়ের প্রধান মূলধনটি গসাগু স্বরূপে হাতের সামনে উপস্থিত থাকবে। আর তারই লসাগু হিসাবে ধর্মীয় হিংস্রতা সমাজের বুকে টিকে থাকবে।

মার্ক্সের বক্তব্যও আসলে তাই। আফিম জাতীয় নেশায় আচ্ছন্ন মানুষকে সেই নেশা থেকে মুক্ত করতে হবে। যে সমস্ত পার্থিব দুঃখ দুর্দশার কবলে পড়ে তারা ধর্মের স্বর্গীয় প্রতিশ্রুতিতে আস্থা এবং সান্ত্বনা খোঁজে, তার বিরুদ্ধে বাস্তব সংগ্রামে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

সেই সাথে মনে রাখা দরকার, এই উক্তি মার্ক্স যবে করেছিলেন (১৮৪৩), তখনও তিনি মার্ক্সবাদী হননি। সদ্য হেগেলের ভাববাদের প্রভাব কাটিয়ে উঠে তিনি ফয়ারবাকের মানবমুখী বস্তুবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন মাত্র। তাঁর বয়ানে বাচনে ও বিশ্লেষণে তখনও হেগেল ফয়ারবাকের প্রভাব সুস্পষ্ট। তথাপি তিনি সেদিনই দেখিয়েছিলেন, ধর্মকে নিছক যুক্তি আর তথ্য সমৃদ্ধ বিতর্ক দিয়ে দুর্বল করা যাবে না। মতাদর্শিক বিতর্ক তো চালাতেই হবে; পাশাপাশি, আর্থসামাজিক মুদ্দার ভিত্তিতে গণ সংগ্রামের ময়দানে সাধারণ মানুষকে নামিয়ে তার মাধ্যমেই ধর্মীয় কুসংস্কার ও বিশ্বাসের আফিম থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে। একটা সার্থক দাবি আদায়কারী মানুষের সংগঠিত দল নিজেদের ঈশ্বরের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী বলে চিনতে শিখবে। এই দুটো মিলে একটা অবিভাজ্য কর্মসূচি। এর কোনো একটাকে বেছে নিয়ে অন্যটাকে বাদ দিতে গেলেই ভুল হবে।

ওরা ওদের লুটতরাজ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির কাজটা দিব্যি গুছিয়ে করে চলেছে। এবার থেকে সঠিক পথ চিনে নিয়ে আমাদের কাজটাও আমাদের সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। ■

 

 

 

 

একটি মন্তব্য

  1. Mohammad Basel মার্চ 5, 2018 at 11:15 অপরাহ্ন - Reply

    মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়লাম।

মন্তব্য করুন