হার্ভি ওয়াইনস্টিনের পরিণতি এবং যৌনাচারী বাংলার কুলকগণ

By |2017-12-26T08:18:14+00:00ডিসেম্বর 26, 2017|Categories: ব্লগাড্ডা|0 Comments

হার্ভির দুর্ভাগ্য , তিনি বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেননি, করলে আজ তার ভাগ্যে অমন পরিণতি হতো না। অবাঁধ যৌনাচারের দেশ বলে, আমরা যে দেশগুলোকে কথায় কথায় গাল পাড়ি, সেই দেশেই ধরা খেলেন হার্ভি। নামীদামী অভিনেত্রীদের অভিযোগের মুখে, অস্কার বোর্ড থেকে বহিস্কৃত হার্ভি এখন পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

যে দেশে নারী রয়েছে সর্ব্বোচ্চ সন্মানের আসনে; নানা বিধি নিষেধে, সামাজিক আচারে বিশিষ্ট, সেখানে লেখক-প্রযোজক-পরিচালক-প্রকাশক-গায়ক-পৃষ্ঠপোষকদের দ্বারা যৌন হয়রানির ঘটনা কি ঘটে না? ঘটে। কিন্তু আলোর মুখ দেখে না। বলছি বাংলাদেশের কথা। এখানে কথা বলার অপরাধে মানুষ খুন হয়, কিন্তু ধর্ষণ-খুনের অপরাধে, অপরাধীরা থেকে যায় অধরা।

যে দেশে একজন লেখক দাবীদার প্রকাশ্যে নারীর বয়স বেঁধে দিয়ে শয্যায় পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তখন কি সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোতে পুরুষের অবস্থানকে প্রকাশ করে দেয় না? দেয় । সেই ক্ষমতার কাঠামোকে ধরে রাখার জন্য, অন্য অনেকে এগিয়ে এসে, একে সামন্ত যুগের চেয়ে ‘মাচ মৌর বেটার’, পুঁজিবাদের জয়যাত্রার গল্প বলবেন , এতেও অবাক হবার কিছু নেই।

ক্ষমতার কাঠামোতে পুরুষ। শিল্প-সাহিত্য-মিডিয়া-চলচ্চিত্র -প্রকাশনা সব – পুরুষের অধিকারে । আত্মপ্রকাশের তাড়নায় , কমবেশী সবাই তারিত। নারীও চায় নিজের প্রকাশ। ব্যস, ও পথে গেলেই কিছু না কিছু মূল্য তো দিতে হয়। অনেকে দেয়। অনেকে সরে পড়ে। অনেকে লড়ে যায়। হয়ত বলা হবে, ধর্ষণ তো আর করা হচ্ছে না। কিন্তু এ এমন এক পরিবেশ, যেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শরীর দেয়া অলিখিত এক শর্ত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে অনেকের নাম যে পত্রিকায় আসেনি, তা নয় । এসেছে। কিন্তু ঐ রাঘব বোয়ালরা থেকে গেছে অধরা।

খুব প্রাসঙ্গিক বলে , নিজের অভিজ্ঞতার গল্পটি এখানে দেয়া গেল।

জাতীয় পর্য্যায়ে অতি অখ্যাত সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকলে, এলাকায় খ্যাতি প্রাপ্ত একটি সাংস্কৃতিক ছিল আমাদের। সাহিত্যের নামে , একটা সংকলনও বের করতাম মাঝে মধ্যে। এই সময়েই শরীর নিয়ে কারবারিদের একজন লেখক, যিনি কিনা আমাদের সংগঠনের সাথেও যুক্ত ছিলেন। উনার নাম ধরে নিলাম , আজম।

ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি। কচি ডাবের পানি, কচি পাঁঠার মাংস, কচি মুরগী স্যুপ সবার পছন্দ? আজম বিবাহিত হলেও, কচি নারীর শরীর ছিল তার অতি পছন্দের। আর এই পছন্দের মাংসটি পাবার জন্য সে ব্যবহার করত, বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাথে তার সম্পর্ককে।

আজমের স্ত্রী একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে অভিযোগ করল, আপনাদের সংগঠন করেই আমার স্বামী আজ অন্য মেয়েদের খপ্পড়ে পড়েছে। সংসার ভাঙ্গল বলে । লেখাপড়া জানি না, এই দুই বাচ্চা নিয়া কই যামু?

সন্দেহপ্রবণ নারীরা সব সময় তাদের স্বামীকে সন্দেহের চোখে দেখে। কথাটা আজমের মুখে প্রায়ই শুনতাম। আর ভাবতাম, বিয়ে না করে ভালই করেছি। তবুও বৌদির অভিযোগ যাচাই করার জন্য , একদিন আজমকে নিয়ে, একটা মিষ্টি দোকানে বসে গল্প জুড়ে দিলাম।

আকারে ইঙ্গিতে নিজের সাজানো গুপ্ত বাসনা প্রকাশ করে দেবার পর, আজম কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, সত্যি বলছেন!

বললাম, বিয়ে করিনি। আর কত?

ব্যস। আজম যা বলল, তার সারমর্ম্ম এই, সে ভয়ে ভয়ে আমাকে যা বলতে সাহস পায়নি, তা হল, চাইলেই আমরা কচি কচি মেয়ে ভোগ করতে পারব। আর এই ক্ষেত্রে আমার সহযোগিতা পেলে, শিকারের সংখ্যা সে বাড়িয়ে তুলতে পারবে। তখন দু’জনে মিলে ভোগ করার পথে আর কোন বাঁধা থাকবে না।

কীভাবে? জিজ্ঞেস করলে, সে উত্তরে, সংগঠনের কয়েকটি মেয়ের নাম উল্লেখ করে বলল, ওদের কবিতা ছাপাব, ওদের রেডিও বা টেলিভিশনে নিয়ে যাব। ওখানে আমার ‘লাইন’ আছে। ওরাও পাবে, আমরা তার আগেই ……। হাহাহা। মিষ্টি খেতে খেতে সেকি হাসি!

সব শোনার পর, আজমকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করেছিলাম। আরও কিছু করেছিলাম, তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার জন্য।

মজার ব্যাপার হল, তার সাথে দীর্ঘ আঠারো বছর পর দেখা হয়েছিল। আমাকে বাসায় নিয়ে গেলে, আমি সুযোগ পেয়ে বৌদিকে, কেমন আছেন, জিজ্ঞেস করতেই ফিসফিস করে বললেন, কয়লা ধুইলে কি আর ময়লা যায়?

তার মানে, এখনও?

হ। একটা পত্রিকা বের করে। ঐটাই তার শেষ সম্বল এখন।

এই যদি হয় আজম নামের অখ্যাত এক লেখকের কাহিনী , তবে যারা কিছু করে খেয়ে , অনেকের চোখে পড়ে গেছে, তাদের বেলায় কী হবে?

দু’পাতা পাঠ করে, ধরাকে সরা জ্ঞান করে, এটা-ওটার সাথে যুক্ত থেকে, এরওর সাক্ষাৎকার ছেপে, এরওর বই ছেপে দিয়ে, লেখালেখির প্রশংসাপত্র দিয়ে – কত কত পথই তো রয়েছে দৃষ্টি আকর্ষণ করার। কিছুটা খ্যাতি পেয়ে গেলে, তখন বয়সের ফ্রেমে নারীর শরীরকে বেঁধে দিয়ে, কচি মাংস ভক্ষণের উৎসবে মেতে উঠার উগ্র ঘোষণা দেবার পরও , সমাজের চোখে ওরা নিষ্পাপ থেকে যায় ।

কিন্তু কেন? লেখক বলে? শিল্পী বলে? কবি বলে? সাহিত্যিক বলে? চলচ্চিত্রের লোক বলে? রেডিও-টেলিভিশনের লোক বলে? নাট্যঙ্গনের লোক বলে? গায়ক-গায়িকা বলে? সংগঠনের নেতা বলে? প্রকাশক বলে?

এই নীরবতার পেছনেও কি সেই খ্যাতির মোহে কাতর থাকার উগ্র বাসনা? অর্থাৎ বিরাগভাজন না হয়ে, চোখের আলোয় আসার পথটুকুকে উন্মুক্ত রাখা? বই প্রকাশ, সাক্ষাৎকার, রেডিও-টেলিভিশনের লোভ কি এতটাই অন্ধ করে দেয় যে, পুঁজির, পুঁজের গন্ধ না পাওয়া নব্য দুনিয়াদারিরা তখন , অতীতের সবকিছুকে বাতিল করে দিয়ে, অতি আধুনিক হয়ে উঠে। এইটাই আধুনিক, সঙ্গমের উগ্র বাসনাটুকুকেও নিয়ে আসে বাজারে।

সঙ্গম তো বাজারে বিক্রি হবার মত কোন পণ্য নয়। এইটা বুঝার জন্যও কি পাঠশালায় যেতে হবে?

অতীতে নারীদের ভাবা হতো নরদের সম্পত্তি। আর এখন ভাবা হয় পণ্য। এই যে আজকের কথা বলা হল, এই যুগটারে কয় পুঁজিবাদের যুগ। এই পণ্যবাহী বেনিয়া সমাজের রক্ষকরাই এ যুগের পুণ্যজন অর্থাৎ রাক্ষস। আর এই যুগরে যখন কেউ কেউ বলেন, মাচ মৌর বেটার, তখনও কি এই কথার মানে বুঝার জন্য গুরু ধরতে হবে?

সূত্র: http://www.bbc.com/news/entertainment-arts-41594672

About the Author:

মুক্তমনা ব্লগার

মন্তব্য করুন