দায়িত্ব কে নিবে? কেন নিবে অথবা নিবে না? ​

লিখেছেন: পুলক রোহিঙ্গা শুনলেই আমরা দুইভাগে ভাগ হয়ে যাই। একপক্ষের মতে ‘৭১ এ ভারত যেমন বাংলাদেশী আশ্রয় দিয়েছিল ঠিক তেমন করেই আশ্রয় দেওয়া উচিত মানবিক কারণে আর অন্যপক্ষের মতে নিজের দেশের মানুষেরই ভাত-কাপড় জোটে না, অযথাই আবার ঝামেলা বাড়ানো। এমনকি তাদের মাদক সংশ্লিষ্ট কাজের দিকেও আঙ্গুল তোলেন অনেকেই। কোন যুক্তি তর্কে যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস পড়ে নেওয়া ভালো। ​

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাল ও ঘটনাঃ

১৭৮৪: বার্মা রাজা বোদাপায়া আরাকান নামক স্বতন্ত্র রাজ্য দখল করেন এবং অনেকে জীবনের ভয়ে বাংলায় পালিয়ে আসে। ​
১৭৯০: ব্রিটিশদের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা কে কক্সবাজারে রিফুজি হিসেবে থাকতে দেওয়া হয়। ​
১৮২৪-১৯৪২: ব্রিটেন এর দখলে বার্মা এবং রোহিঙ্গারা ভারত বর্ষের অনেক জায়গাতেই কাজের জন্য যেতে থাকে। ​
১৯৪২: জাপান বার্মা দখল করে। তখন স্থানীয় অন্য ধর্মাবলম্বীরা মুসলিমদের উপর চড়াও হয় কারণ তাদের মনে এই ধারণা ছিল যে ব্রিটিশ শাসনে মুসলিমদের অনেক উপকার হয়েছিলো। ​
১৯৪৫: বার্মা জাতীয়তাবাদী নেতা অং সান (অং সান সুকির পিতা) ও ব্রিটিশ বাহিনী মিলে আবার বার্মা দখল করে। ​
১৯৪৮: সরকার এবং আরাকান’দের মধ্যে রেষারেষি বাড়তে থাকে, অনেকে মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে চায় অঙ্গরাজ্য হিসেবে। বার্মা সরকার তখন বিষয়টা খুব কঠোর হাতে দমন করে এবং সরকারি চাকরি থেকে সব রোহিঙ্গা কে
সরিয়ে দেওয়া হয়। ​
১৯৭৭: ৬০’এর দশকে কিছু রোহিঙ্গা সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসার পর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। ​
১৯৭৮: বাংলাদেশের সাথে বার্মার চুক্তি হয় এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা ফেরত যায়। ​
১৯৮২: রোহিঙ্গা দের কে বার্মা সরকার অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করে।
১৯৯১: আবার ২.৫ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে ‘৭৭ এর মত একই কারণে। ​
১৯৯২- ১৯৯৭: লাখ দুয়েক এর মত ফেরত নেয় মায়ানমার সরকার।
২০১৬: রোহিঙ্গা দের বিদ্রোহী গ্রুপ হারাকাহ- আল- ইয়াকিন কয়েকজন বর্ডার গার্ড কে হত্যা করে এরপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনে আবার ২৫০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে।
২০১৭ এর ঘটনা তো সবারই জানা। ​

গোটা পৃথিবী চায় যে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিক, সব মিডিয়া এ ব্যাপারে সরব এবং বাংলাদেশেরও অনেক মানুষ চায় এটা হোক। এবং অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনাকে উদাহারন হিসেবে বলেন। রোহিঙ্গা দের উপর যা হচ্ছে সেটা অমানবিক এবং হৃদয় বিদারক। এবং তাদের বিভিন্ন খারাপ কাজের যে খবর আসে মিডিয়া তে সেগুলোর বেশির ভাগই পেটের দায়ে অথবা কোন উপায় না থেকে। ​

Ethnic Cleansing – এর নাম শুনেছেন আপনারা? মায়ানমারে কি কোন যুদ্ধ লেগেছে? যুদ্ধে শরণার্থী হয়, রিফুজি হয় কিন্তু একটা দেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে একটা প্রদেশের মানুষকে মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে দখল করার পাঁয়তারায় সেখানে শরণার্থী শব্দটা কি আসে? চাপ আসার কথা মায়ানমারের উপর আসছে বাংলাদেশের উপর! উল্টো দেশের মানুষ সায় দিচ্ছে। কোন নোবেল বিজয়ীর দিকে তাকিয়ে আছেন আপনারা যার বাপ নিজেই নির্যাতক ছিল? কোন মুসলিম দেশের গুণগান গাইছেন যারা মুখের বুলি ছুড়েই খালাস। প্লেন পাঠায়ে নিয়ে যায়না কেন? সিরিয়ায় মানুষ মরে যুদ্ধে সেখানে জার্মানি এগিয়ে আসে মুসলিম দেশ আসে না তারা আবার গান গায়। সবচেয়ে বড় কথা ভাই যুদ্ধ তো হচ্ছে না, আশ্রয় কেন? নির্বিচারে মানুষ মারার প্রতিবাদ না করে বর্ডার খুলে দিচ্ছি না কেন এটা নিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে! ৫ লাখ রোহিঙ্গা তো পালছি অনেক দিন। মুসলিম দেশ গুলোকে বলেন যে আগে ৫ লাখ করে নিক তারপর কথা বলুক।বাংলাদেশে একটা কাশ্মীর বানানোর খুব ইচ্ছা? ​

আমাদের দেশেও Ethnic Cleansing হয় কিন্তু সব সংখালঘু একজায়গায় থাকে না জন্য হাজার হাজার সংখ্যা’টা একবারে চোখে পড়ে না। ভারতে কত বাংলাদেশি পালিয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে হিসাব জানেন? আর ‘৭১ এ ভারত কেন করেছিল সেটা বুঝতে গেলে ইতিহাসের সহজ হিসাবের সাথে রাজনীতিও বুঝতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অন্যের অপরাধের দায়িত্ব যদি আমি নেই তাহলে কি উল্টো আমি ঐ অপরাধটাকে সাপোর্ট করছিনা?

About the Author:

মুক্তমনার অতিথি লেখকদের লেখা এই একাউন্ট থেকে পোস্ট করা হবে।

মন্তব্যসমূহ

  1. সোহেল ইমাম অক্টোবর 8, 2017 at 9:12 অপরাহ্ন - Reply

    পড়লাম। ভালো লিখেছেন।

  2. মনজুর মুরশেদ সেপ্টেম্বর 22, 2017 at 1:19 পূর্বাহ্ন - Reply

    বাংলদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন খুব হয়, কিন্তু “আমাদের দেশেও Ethnic Cleansing হয়” বললে আসলে Ethnic Cleansing-র গুরুত্বকে ছোট করা হয়! ভেবে দেখবেন কেন।
    লেখার মূল বক্তব্যের সাথে সহমত।

  3. বিপ্লব রহমান সেপ্টেম্বর 21, 2017 at 8:33 পূর্বাহ্ন - Reply

    রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করছি, আমার মনে হয় না রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আর কোনদিন মিয়ানমার ফেরৎ যাবেন, সে কূটনীতিক হেডমই আসলে বাংলাদেশের নাই। লোক দেখানো কিছু প্রত্যাবাসন হয়তো হতে পারে মাত্র। আর মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ সাহায্যের বিজ্ঞাপন তো আছেই।

    সে ক্ষেত্রে আট-দশ লাখ অদক্ষ উদ্বাস্তুর ভার বহন করতে হবে বাংলাদেশকেই, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি ছাড়াও রয়েছে জংগি রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে আইএস এদেশে জেঁকে বসার। এসবের প্রত্যক্ষ প্রভাব এখনই পড়তে শুরু করেছে কক্সবাজার ও পার্বত্যচট্টগ্রামে। আর দিন গেলে শরণার্থীদের বংশবৃদ্ধিও হয়ে দাঁড়াবে আরেক সমস্যা।

    ভাবনাটিকে উস্কে দেওয়ায় লেখককে ধন্যবাদ। লেখার শিরোনামের বানান ত্রুটি খুবই পীড়াদায়ক, এডমিন, অনুগ্রহ করে দেখবেন?

মন্তব্য করুন