আমার বড় ভাই মানব নকশাল আমলের বিপ্লবী ছিলেন। সদ্য প্রয়াত বাবা আজিজ মেহেরের (৮৬) সাবেক দল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (মতিন-আলাউদ্দীন) সক্রিয় ক্যাডার ছিলেন। হাইস্কুলে পড়ার সময় ভাষানীর সন্তোষের সম্মেলন করেছিলেন। এইসব করতে গিয়ে সে সময় শত্রু পক্ষের গুলি লেগেছিল তার পায়ে। এখনো তার পায়ে সেই চিহ্ন রয়েছে।

সাতের দশকে আমার ভাই সব ছেড়ে দিয়ে পপ সম্রাট আজম খানের গানের দলে যোগ দেন। তিনি ছিলেন তার অন্যতম গিটারিস্ট। সে সময় গুলিস্তানে চো চিংচো চাইনিজ রেস্তোরাঁয় আজম খানের সংগে অনেক কনসার্ট করেছিলেন।

এখনো চোখ বুজলে শৈশবের সেই ভাইকে যেন দেখি, লম্বা চুল দাড়ি, নোংরা বেল বটম প্যান্ট, রঙচঙ শার্ট, সরু কালো মোর সিগারেট ফুকতে ফুকতে গিটার বাজিয়ে গাইছেন- রেল লাইনের ওই বস্তিতে!…

আজম খানের জনপ্রিয় সব গান রেকর্ড বন্দি হওয়ার আগেই সে সময় আমি মানব ভাইয়ের গলাতেই শুনেছি। বিডিনিউজে কাজ করার সময় আজম খানের সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম। পরে “আজম খানের মুক্তিযুদ্ধ” নামে মুক্তমনাসহ বিভিন্ন সাইটে ব্লগ নোট লিখেছিলাম, সেখানে মানব ভাইয়ের কথা কিছু বলেছি, গুগোল করলে সে লেখাটি বোধহয় পাওয়া যাবে।

সেই ভাই বড় হতে হতে, দূরাগত হতে হতে, অনেক বছর আরব দেশে, প্রায় বেদুইন হয়ে গিয়েছিলেন!

গত বছর এই আগস্টেই হঠাৎ টেলিফোন – দুবাই হসপিটালে আমার ভাই কোমায় আছেন! তার ব্রেইন স্ট্রোক করেছে, হার্ট ফেইল করেছে, এখনতখন অবস্থা! বিদেশ বিভূঁইয়ে একা, নিষ্প্রাণ, সাবেক বিপ্লবী, সাবেক আজম খানের গিটারিস্ট, প্রকৌশলী মেসবাহুর রহমান মানব পক্ষাঘাতে অতি বিপন্ন।

একমাস পর মেডিকেল সায়েন্সকে চমকে দিয়ে মানব ভাই চোখ মেলে তাকালেন, দুবাই থেকে ঢাকা, ডাক্তার, নার্স, তার সহকর্মীদের সংগে টেলিফোনের পর টেলিফোন! আমার ভাতিজা অনিন্দ্য সেও খুব ভাল গিটারিস্ট। ভাইয়ার কাছেই গিটারে তার হাতেখড়ি।

সেই ভাইকে দেশে ফিরিয়ে আনতে অনিন্দ্য, তার মা আর আমার বোনেরা অনেক কাঠখড় পোড়ায়। দুমাসের অবিরাম চেষ্টার পর সেই ভাইকে দেশে ফিরিয়ে আনি আমরা। এরপর ল্যাব এইড হাসপাতালে তার অনেক চিকিৎসা, ডাক্তার, থেরাপিস্ট, নার্স, অষুধের বক্স।

হুইল চেয়ার বন্দি ভাইয়ের সেভিং ও স্নানের দায়িত্ব এখন আমার। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ব্লগপোস্ট, পত্রিকা থেকে তাকে পড়ে শোনাই, একসাথে ডিসকভারি দেখি, নানান বিষয়ে গল্প করি। গত ১০ আগস্ট বাবা চলে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে মুক্তমনায় লেখা নোটটি পড়ে শোনাই। সেই লেখাটি শুনতে শুনতে ভাইয়া চোখ মোছেন। পার্টির দিনের অনেক অজানা কথা বলেন।

আজ দুপুরে মিরপুর সিআরপি হাসপাতাল থেকে ভাইকে বাসায় আনতে আনতে এই সব নানা এলোমেলো কথা মনে হয়। আর নকশাল আমলের বিস্তৃত আরেক শ্লোগানও মনে পড়ে বেখাপ্পা ভাবে:

তোমার নাম! আমার নাম!
ভিয়েতনাম! ভিয়েতনাম!…

[190 বার পঠিত]