লংগদু সহিংসতার জের কাটতে না কাটতেই একের পর এক রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে ব্যপক হতাহতের খবর চমকে দিচ্ছে! এরমধ্যে রাঙামাটিই সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ। অতি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে বিপন্ন, লণ্ডভণ্ড পার্বত্য জনপদ।

একজন পাহাড়ি বন্ধু ফেসবুকে মাটিচাপা পড়া দুটি নিস্পাপ শিশু ভাইবোনের কাদামাখা নিথর দেহের ছবি পোস্ট করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে একটি মন্তব্য পড়েছে এরকম, ‘ছবিটি কেউ সরাবেন প্লিজ? আমি আর নিতে পারছি না!’

সবশেষ খবর বলছে, গতকাল (১৪ জুন) রাঙামাটি থেকে আরও ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ জেলায় পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫। বান্দরবান ও চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে উদ্ধার হয়েছে আরও তিনজনের লাশ। মঙ্গলবার রাতে নতুন করে পাহাড়ধসে কক্সবাজারের টেকনাফে দুজন, খাগড়াছড়িতে একজন ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় আরও একজন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে তিন পার্বত্য জেলা এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধসে মারা গেছেন ১৪০ জন। ১২-১৩ জুন রাতে শুরু হয় একের পর এক পাহাড় ধসের যজ্ঞ।

সবুজ মরুভূমি
আমরা যারা প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষার কথা বলি, তারা মানবাধিকারের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক কারণে তো বটেই, পরিবেশগত ঝুঁকির কারণেও বহুবছর ধরে পাহাড়ে বেআইনি বসতি স্থাপন বন্ধের কথা বলে আসছি। কিন্তু ভোটের হিসেব কষে পাহাড়ে আদিবাসী পাহাড়িদের সংখ্যালঘু করতে, বাঙালি সেটেলার ভোট বাড়াতে দিনের পর দিন সেখানে বহিরাগতদের বসতি দেওয়া হয়েছে। নদীভাঙা, হত-দরিদ্র বাঙালি এসব মানুষের পাহাড়-জঙ্গল-জলা সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা নেই। তাই বন উজার ও গাছ কেটে লাকড়ি সংগ্রহ করা তাদের প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বসতি গড়তে গিয়ে যথেচ্ছ পাহাড়-টিলা কাটা ছাড়াও রয়েছে বেআইনি ইটভাটার দৌরাত্ব।

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শহরের উপকন্ঠেই চোখে পড়বে পাহাড় কেটে নাশ করা এসব ইটভাটার দৌরাত্ব। এসব নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে কিছুদিন আগেও সাংবাদিক সহকর্মি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়েছেন।
আর দিনের পর দিন পাহাড় থেকে প্রাকৃতিক বন ও বড় বড় গাছ কাটার ফলে কথিত অরণ্যভূমি পার্বত্যাঞ্চল আসলে পরিনত হয়েছে সবুজ মরুভূমিতে। সেখানে বন বলতে সত্যিকার অর্থে খুব বেশীকিছু আর নেই, রয়েছে কিছু জঙ্গল।

পর্যটন নগরী রাঙামাটির কথাই বলা যাক। ছোট্ট এক রত্তি শহর ঘুরলেই চোখে পড়বে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা প্রায় দুশটি আসবাবপত্রের দোকান। শাল-সেগুন কাঠের দামী আসবাবপত্র সেসব দোকানে ঠাসা। রাঙামাটিবাসী কতো আসবাব ব্যবহার করেন? আর বিপুল সংখ্যক এতো দামী আসবাবের ক্রেতাই বা এই গরীব পাহাড়ের দেশে কারা? খোঁজ নিলেই জানা যাবে, এসব আসবাবের মূল ক্রেতা আসলে সেখানে বেড়াতে আসা শহুরে বাবুরা। যেহেতু গণমাধ্যম আগের চেয়ে অনেক বেশী সক্রিয়, তাই সরাসরি এখন দিনেদুপুরে কাঠ পাচার করা যাচ্ছে না। আসবাবপত্র বানিয়ে সেগুলোকে এখন পাচার করা সহজ হয়েছে। পাহাড়ের আসবাব আবার ঢাকাসহ বড় বড় শহরের শোরুমগুলোর শোভা বর্ধন করে চলেছে। আসবাবের আড়ালে কাঠ পাচার প্রতিযোগিতায় খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানও পিছিয়ে নেই।

আমরা বলি, সর্বজন!
এভাবে রাজনীতির নামে, ইটভাটার উন্নয়নের নামে পাহাড়ে বেআইনি বসতি ও বনভূমি উজার করার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে এইসব পাহাড় ধস। গাছ কাটার ফলে গাছের শেকড় আগের মতো মাটি জমাটবদ্ধ করে ধরে রাখতে পারছে না, সামান্য ভাড়ি বৃষ্টিতেই বেলেমাটির পাহাড়ে ধস নামছে। চাপা পড়ছে জনপদ, বসতঘর, সড়ক যোগাযোগ।

জনসংখ্যার চাপে আগের মতো এখন ১০-১২ বছর পতিত রাখার পর একই পাহাড়ে আবার জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ চাষাবাদ) চাষ করা সম্ভব হয় না। পাহাড়ি জুমিয়ারা মাত্র ৫-৬ বছর পর পর একই পাহাড়ে জুম চাষ করছেন। প্রান্তিক জুম চাষীদের জীবন ধারণের আর কোনো পথও খোলা নেই। ফলে পাহাড়গুলো উর্বরতা তো হারাচ্ছেই, ভূমি ক্ষয়ও বাড়ছে।

ভূমির ক্ষয় বাড়তে থাকায় নদী-জলাশয়গুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে।বান্দরবানের শংখ নদী ভরাট হতে হতে এমন দশা যে, সামান্য বৃষ্টি হলেই খোদ শহরের ভেতরেই নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে, নদী আর আগের মতো পানি ধরে রাখতে পারছে না।

বরাবরই পাহাড় ধসের ঘটনা কিছু না কিছু ঘটে আসছে, সে সবই ছিল বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু গত এক দশকে এতো বড় একটি ঘটনা নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এই ঘটনা প্রমান করে দিচ্ছে, পার্বত্যাঞ্চলে বেআইনী বসতি বেড়েছে। কাজেই পাহাড়ে বেআইনী বসতি ও বন উজাড় বন্ধ না হলে এমন প্রকৃতির প্রতিশোধ হতেই থাকবে।

৭১ এখন ১৭ হয়ে নেমেছে পাহাড়ে
এই সেদিন পালিত হলো কল্পনা চাকমা অপহরণের ২১ তম দিবস। অর্থাৎ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশ এতো বড় একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় বহন করে চলেছে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ির নিউ লাইল্যাঘোনা গ্রাম থেকে হিল ইউমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহৃত হন। কল্পনাকে উদ্ধারের দাবিতে সে সময় উত্তাল পাহাড়ে হরতালের মিছিলে চারজন পাহাড়ি ছাত্র জীবন দিয়েছেন। কল্পনার অপহরণের বিচার দাবি করে পাহাড় ও সমতলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠে। পরে সেসবও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।…

পুলিশের কোনো তদন্ত সংস্থাই এই ২১ বছরে অভিযুক্ত অপহরণকারী লেফটেনেন্ট ফেরদৌস ও তার সহযোগি ভিডিপি সদস্যদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি, রাঙামাটির আদালতে মামলার ডেটের পর ডেট পড়েছে। কাচালং, মাইনী, চেঙ্গী, মাতামুহুরি, শংখ ও কাপ্তাই লেকের জল আরো ঘোলা হয়েছে। কল্পনার বৃদ্ধ মা বাধুনি চাকমা একমাত্র মেয়ে হারানোর বেদনা নিয়ে গত হয়েছেন, তা-ও অনেকদিন হলো। আর কল্পনার জুমাচাষী ভাই ও অপহরণের প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দী কুমার চাকমা ২১ বছর ধরেই রাঙামাটি আদালতে ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন বিচারের আশায়।

এই প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে সেদিনের লংগদু সহিসংসতার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যে পাহাড়ে কল্পনার মতো একজন জলজ্যান্ত নারী নেত্রী গুম হয়ে যান, সে পাহাড়ে এমন সহিংস ঘটনা আসলে বার বার ঘটেই চলেছে, যদি না এখনই এর মূলে আঘাত করা না যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি নয়া উপনিবেশ?
খুব সংক্ষেপে জানিয়ে দেই, গত ১ জুন যুবলীগ নেতা নয়নের লাশ পাওয়া যায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায়। তার বাড়ি লংগদুতে। নয়ন পেশায় ভাড়ায় মটর সাইকেল চালক ছিলেন। পরদিন ২ জুন সেনা, পুলিশ ও ইউএনওর উপস্থিতিতে নয়নের লাশ নিয়ে মিছিল বের করে বাঙালি সেটেলাররা। মিছিলটি ছিল যথেষ্টই উস্কানিমূলক। এর কালো ব্যানারে নয়ন হত্যার জন্য “উপজাতীয় সন্ত্রাসী”দের দায়ী করা হয়েছিল, শুধু “সন্ত্রাসীদের” নয়। ওই মিছিল থেকেই লংগদুর চারটি পাহাড়ি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দুইশতাধিক বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে, আদিবাসী পাহাড়িদের। নৃসংশতা এমনই যে আশ্রয়হীন পাহাড়িরা এখনো আশেপাশের গ্রামে ও স্কুল ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। নিজেদের পোড়া ভিটায় ফিরে আসার সাহস পাচ্ছেন না। তারা ক্ষোভে-দুঃখে সরকারি ত্রাণও প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এরপরেও গত কয়েক বছরে পাহাড়ি জনপদে সহিংস হামলার সঙ্গে লংগদু হামলার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্যনীয়:

ক) এবার যুবলীগ নেতার হত্যার প্রতিবাদ মিছিল থেকে পাহাড়ি জনপদে আগুন দেওয়া হয়েছে। খ্) সেনা ও প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি সেটেলার সমাবেশকে উৎসাহিত করেছে, গ) নিহতর লাশ নিয়ে পাহাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে মিছিল করার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে!

এসব কারণে স্পষ্ট লংগদু সংঘাতের দায়ভার প্রশাসনের ওপর বর্তায়। বলাভাল, ১৯৭১ যেন ২০১৭ হয়ে নেমে এসেছে পাহাড়ে, সেনা-সেটেলার নিপীড়নের ধরণ এমনই। স্মরণে রাখা ভাল, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি সাক্ষরের আগে পাহাড়ি জনপদে অন্তত ১৩টি গণহত্যা হয়েছে। এরমধ্যে ১৯৮৯ সালের ৪ মে লংগদুর গণহত্যা অন্যতম। এবার লংগদু সহিংসতার মতো সেবারও সেনা-সেটেলার যৌথায়নে খুন, জখম, লুঠপাঠ আর আগুন দেওয়া হয়েছে পাহাড়ি গ্রামে। সেনা বাহিনীর গুলি আর সেটেলারদের দায়ের আঘাতে সাবেক কাউন্সিলর অনিল বিকাশ চাকমাসহ খুন হন অন্তত ৪০ জন নিরীহ পাহাড়ি নারী-পুরুষ। লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদে ২০ মে গঠিত হয় পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)। এই গণহত্যার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ নারী নেত্রী কবিতা চাকমা (এখন অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী) লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কবিতা, “জ্বলি ন উধিম কিত্তেই?” (রুখে দাঁড়াবো না কেন?)

এমনিভাবে, শান্তিচুক্তির আগে ও পরে সেনা-সেটেলার যৌথায়নে পাহাড়ে আগুন জ্বলছেই। স্পষ্টতই পাহাড়ে চুক্তি মেনে সেখানের ভূমি সমস্যার সমাধান ও পার্বত্যাঞ্চলকে বেসামরিকীকরণ, তথা অস্থায়ী প্রায় ৫০০ সেনা ছাউনি প্রত্যাহার ও আইন-শৃঙ্খলার কর্তৃত্ব বেসামরিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিলে পাহাড়ে পাকিপনা সহসাই বন্ধ হবে না। রাষ্ট্রের ভেতরে গড়ে ওঠা সেনা-সেটেলারের নেতৃত্বাধীন আরেক উপরাষ্ট্র যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, জাতীয় পার্টি নেই, বন্দুকের নলের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন নিরন্ন পাহাড়ি ও বাঙালি।

তাই পাহাড়ে সেনা-সেটেলার অপশক্তির অবসান না হলে সেখানে পাকিপনার সহসাই অবসান হবে, এমন আশা করাটাই যেন বোকামী। শান্তিচুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় দিন দিন পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।

এ অবস্থায়, আশু করণীয় রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরকীকরণ ও সেটেলারদের নিয়ন্ত্রণ তাই সময়ের দাবি।

বটম পয়েন্টে: লংগদু সহিংসতার পর একটি প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, শান্তিচুক্তির পর পাহাড়িরা কী কোনো বাঙালি গ্রামে আগুন দিয়েছে? একটি উদাহরণও কী এমন আছে? নেই। তাই লংগদু সহিংসতা থেকেই প্রশাসনকে শিক্ষা নিতে হবে। নইলে ভোটের অংক কষে ভাস্কর্য রাজনীতির পাশাপাশি লংগদুর ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ক্রমেই আরো রক্ত ঝরবে পাহাড়ে।আর পাল্টা আঘাত যে আসবে না, তারই বা গ্যারান্টি কী?

ছবি: প্রথমালো ও ডেইলি স্টার

[442 বার পঠিত]