আমিও একসময় আরো অগুনতি মানুষের মত স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতাম। অনেকের মতই ভাবতাম বাংলাদেশ একদিন সত্যিকারের একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়ে উঠবে। ধর্ম নিয়ে কোন বৈষম্য থাকবে না। পরধর্মসহিষ্ণু, অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি দেশ হবে। যেখানে থাকবে সব ধরণের মত ও চিন্তার স্বাধীনতা। তথাকথিত হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের যে জাল আমরা বুনে চলেছি তা একদিন পূর্ণতা পাবে। আরো অনেক বামপন্থায় বিশ্বাসী কর্মী সমর্থকদের আমিও বিশ্বাস করতাম আমাদের দেশ একদিন তার ‘হারানো’ ঐতিহ্য ফিরে পাবে। তবে ছোটবেলা থেকেই বামপন্থার প্রতি অনুরক্ত হওয়া সত্ত্বেও কোনদিন ধর্মকে আমার শুধুই উৎপাদনব্যবস্থা বা শ্রেণী বিভক্ত সমাজের উপজাত হিসেবে মনে হয়নি। এটিকে চিরকাল আমার কাছে একটি আলাদা সত্ত্বা বলেই মনে হয়েছে। মানবমনের চির অনিশ্চয়তাবোধ আর অজানার প্রতি ভয় থেকে যার জন্ম। একইভাবে সব ধর্মকেই একপাল্লায় মাপতে আমার যথেষ্ট আপত্তি আছে। সব ধর্মেরই বিবর্তন, নতুনের সাথে মানিয়ে নেয়া, সংস্কার প্রবণতা এক নয়।

বামঘেঁষা ঐতিহাসিকদের একাংশ যখন বাংলায় ইসলামের প্রসারের কারণ হিসেবে হিন্দুধর্মের প্রচলিত জঘন্য বর্ণভেদকে দায়ী করেন তখনো আমি দ্বিমত পোষন করি। প্রথমত বাংলায় জাতিভেদ বা বর্ণভেদের আগমন সেন আমলে। এর আগে সমগ্র বাংলাতেই এর অস্তিত্ব ছিল না। ব্রাহ্মণ্যবাদের আবির্ভাব বাংলায় সেন আমলে। তারাই প্রথম বাংলায় এই ব্রাহ্মণ নামক পদার্থটির আমদানিকারক যার সাথে আসে জাতিভেদ। তৎকালীন কনৌজ নামক অঞ্চল থেকে তারা এই ব্রাহ্মণদের বাংলায় নিয়ে আসেন। তবে সেন শাসন কখনোই পূর্ব বাংলার খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। তাই বাংলায় ইসলামের তথাকথিত নরম রূপ বা সুফিবাদের প্রভাবে ও ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে দলে দলে হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করেছে কথাটি সত্য নয়। বাংলায় ইসলামের আগমন তরবারির হাত ধরে। শুধু বাংলায় কেন সারা বিশ্বেই চিত্রটি এক। বাংলায় বরং জাতিভেদ শক্ত ভিত্তি পায়। ইসলামী শাসনামলেই। ইসলামী শাসকদের সাথে উত্তর ভারত থেকে আগত পারিষদ ও কর্মচারীদের হাত ধরেই বাংলায় এর প্রতিষ্ঠা।

বাংলায় ইসলামের দৃঢ় অবস্থানের প্রধান কারণটি শাশ্বত। সেই রাজ অনুগ্রহ তথা শাসকের আনুকূল্য লাভ। পাশাপাশি কোনো ধর্মের প্রধানত হিন্দুধর্মের শক্তিশালী আনুষ্ঠানিক অবস্থান না থাকা, এর পাশাপাশি গণধর্মান্তরকরণ ত রয়েছেই। তরবারির মাধ্যমে যেহেতু এর আগমন তাই এটি খুব স্বাভাবিক। এ অঞ্চলের মানুষ সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই সহজিয়া এনিমিস্টিক ধর্ম পালন করত। যে কারণে বৌদ্ধ তন্ত্রযান এখানে শক্ত ভিত্তি পেয়েছিল। যার বেশিরভাগই পরে হিন্দুধর্মে আত্তীকরণ হয়। যদিও এর কোন সুদৃঢ় বৃহৎ আঞ্চলিক রূপ ছিল না। এর অবশিষ্ট এখনো বাংলার দক্ষিণাচলে প্রচলিত হিন্দুধর্মে খুঁজে পাওয়া যায়। এই সহজিয়া মতবাদের আর একটি অংশ হচ্ছে বাউল সম্প্রদায়। তাই বামঘেঁষা পন্ডিতেরা ইসলামের প্রসারের পেছনে যে নিম্নবর্গের মানুষের উচ্চবর্ণ এর হাতে চরম লাঞ্ছনাকে দায়ী করেন তা খন্ডিত সত্য।

এখানে একটি কৌতুহলদ্দীপক বিষয়ের অবতারণা করতে চাই। যেই উত্তর ভারতে এই জঘন্য জাতিভেদ প্রথার প্রচলন সবচেয়ে বেশি সেখানে ইসলাম বাংলার মত এরকম প্রসার লাভ করেনি। সেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা মূলত শহরাঞ্চলেই বেশি। তারা বেশিরভাগই মুঘল, পাঠান, আরব, পারসিক শাসক, অমাত্য, কর্মচারী ও সৈনিকদের বংশধর। তাদের প্রায় সবার ভাষাই উর্দু। যা ছিল মুঘল সেনানিবাস এর ভাষা। এমনকি যেই দক্ষিনভারতে হিন্দি ভাষার তেমন প্রচলন নেই সেখানেও মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভাষা প্রধানত উর্দু। হিন্দু ধর্মের শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি থাকাতেই উত্তর ভারতের চিত্র বাংলা থেকে ভিন্ন। যদিও সেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ভীষণবভাবেই জাতি ও বর্ণভিত্তিক।

যাইহোক মূল কথায় ফিরে আসি। বিশ্বাস করুন আমি যদি সত্যিই আরো অনেক প্রগতিশীল নেতাকর্মীর মত ভাবতে পারতাম তাহলে খুবই ভাল লাগত। তবে বাংলাদেশ একদিন অর্থনৈতিক ভাবে আরো সমৃদ্ধি লাভ করবে এই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি তুলনামূলক টেকসই গণতন্ত্র ও সুশাসনও হয়তবা পাবে। কিন্তু দৃঢ় অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় বৈষম্যহীন ব্যবস্থা অর্জন করবে এটা কোনোভাবেই ভাবতে পারছিনা। শুধুমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হবার কারণেই তা সম্ভব নয়। আর অন্য কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো মুসলিম দেশে যা হয়নি তা বাংলাদেশেও হবার কোন কারণ নেই। বামঘেঁষা ও প্রগতিশীল ঐতিহাসিকদের অনেকেই এই ধর্মীয় বিদ্বেষের জন্য ব্রিটিশ শাসকদের দায়ী করে থাকেন। হ্যাঁ এসবের শুরু সেই আমলেই। কিন্তু এর উদগাতা হচ্ছেন অনেক বামপন্থীর কাছেই হিরো তিতুমীর বা হাজী শরীয়তুল্লাহ। এর আগ পর্যন্তও মানে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ অবধি বাংলার নব ধর্মান্তরিত মুসলমানেরা এক ধরণের সহজিয়া ধর্মই পালন করত। তারা প্রায় সব লোকজ পূজার্চনায় অংশগ্রহণ করত, মন্দিরে মানত করত এমনকি মেয়েরা শাঁখা সিঁদুর পর্যন্ত ব্যবহার করত। তারা অনেকটাই নামকাওয়াস্তে মুসলমান ছিল। তিতুমীরই সর্বপ্রথম এদেরকে ঠিক করার দায়িত্ব নেন। তিনি খাঁটি ইসলাম প্রবর্তনের পাশাপাশি ব্রিটিশদের উচ্ছেদ করে একধরণের খেলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে হাজী শরীয়তুল্লাহও অনেকটা একই কাজ করেন। এসবের আগে অনেক গ্রামে এমনকি নামাজ পড়ানোর লোকও ছিল না। যাই হোক ব্রিটিশরা মুসলমানদের এসব ধর্মান্ধ প্রয়াসে ঘিঁ ঢেলেছে মাত্র। তো এই সমন্বয়বাদীতা মানে তথাকথিত হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের উপর প্রথম আঘাত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের একাংশের হাত থেকেই এসেছে। যেই সত্যটা অনেকেই এড়িয়ে যেতে চান।

এ জায়গায় এসে অনেকেই ইসলামের নানা মত বা রূপের কথা বলে একধরণের সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করেন। কিন্ত এই সব মতই শেষপর্যন্ত ভীষণভাবে অসহিষ্ণু তা তারা বুঝতে চান না। অন্যান্য দেশের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখব ইরানে পার্সি বা বাহাইদের উপর চরম নিপীড়ন, আফগানিস্তানে বা পাকিস্তানে কালাশ সম্প্রদায়ের জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, মধ্যপ্রাচ্যে ইয়াজিদি ও খ্রিষ্টানদের উপর চালিত গণহত্যা ও নির্যাতন, মুসলমানদের স্বপ্নের দেশ তুরস্কে আর্মেনিয়ান জেনোসাইড সবই কিন্তু ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন মতের অনুসারীদের হাতেই হয়েছে। প্রত্যেকটি ঘটনার পেছনে একমাত্র প্রণোদনা কিন্তু ধর্ম। যে তরুন তুর্কীরা তুরস্কে আরোপিত ধর্মনিরপেক্ষতা কায়েম করেছিল তাদের অনেকেই এই আর্মেনিয়ান গণহত্যার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। তাই যেসব প্রগতিশীল ব্যক্তিরা বাংলাদেশ একদিন সমগ্র দক্ষিন এশিয়ায় সবচেয়ে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে বলে স্বপ্ন দেখেন তাদের মত আমিও সেই স্বপ্ন দেখতে পারছিনা বলে দু:খিত। শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হবার কারণেই তা সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সাইলেন্ট এথনিক ক্লিনসিং, হিন্দু ও অন্যান্য আদিবাসীদের ক্রমাগত দেশত্যাগের কথা না হয় নাই বা বললাম।

আজকাল অবশ্য অনেকেই সাঁওতালদের সাম্প্রতিক বীরত্বপূর্ণ প্রতিবাদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে হিন্দুদের ক্রমাগত দেশত্যাগকে কাপুরুষতা বা পলায়নবাদীতা বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তাদের শুধু এটুকুই বলতে চাই সাঁওতালদের সংখ্যা পাকিস্তান আমলের শেষলগ্নেও কিন্তু সাত থেকে আটলাখের মত ছিল যা এখন এক লাখেরও কম। তারাও কিন্তু দেশত্যাগ করেছে। তাই জনমানসে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িকতা ও অসহিষ্ণুতাকে যতই রাজনীতির রঙ আর লুটেরাতন্ত্র বলে ঢাকার চেষ্টা করি তা আসল সত্যটাকে আড়াল করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। বীজ যদি মনের গভীরে পোঁতা থাকে তা উপযুক্ত পরিবেশ পেলে মহীরুহে পরিণত হবেই।

[905 বার পঠিত]