লিখেছেন: সাত্যকি দত্ত

এক
গতবছর ভরা শ্রাবণের এক উবুশ্রান্ত দিনে বোলপুর এসেছিলাম । পূর্বপল্লীর আটত্রিশ নম্বর প্লটের শ্যাওলা ধরা হলদে শান্তিনিকেতনি বাড়িটা এমন করে যে ফাঁকা পেয়ে যাবো , কল্পনা পর্যন্ত করিনি । মালিক থাকেন কোলকাতায় , দেখা শোনার লোক বলতে ভীতু ভীতু চেহারার এক বুড়ো । আসলে অনেক দিনেরই একটা ইচ্ছে ছিল শ্রাবণের শান্তিনিকেতন দেখবো , ইচ্ছেটা যদিও ধার করা , বোধহয় সুনীলের নীরার কাছ থেকে। সেদিন পার্ক ষ্ট্রীটের এর একটা কফি শপে বসে আনিন্দিতা যখন তার “বাউল বাঁশি” কবিতাটা শোনাচ্ছে , মনে আছে তাতে কিছু কথা ছিল এমন যে – বাউল তার বাঁশিটার সর্বাঙ্গে আলতো আঙ্গুল বুলাচ্ছে , যেন মাড় দিচ্ছে – উপমাটাকে আমার বড্ড আদুরে লেগেছিল । তারপর আর কি , এসপ্ল্যানেডের জ্যামে পঁয়ত্রিশ ডিগ্রীতে ভাজা হতে হতে কবিতারই আবেশে বাউল মনে ঠিক করে ফেলি , কাল ভোরের ট্রেনে বোলপুর , নিজের কাছে একটা যুক্তি সাজিয়ে নিলাম যে – সপ্তাটা পুরোটাই ছুটি তা ছাড়া কোলকাতার ফ্লাটে আমার অস্তিত্ব প্রমাণের দায়বদ্ধতাও নেই কারো কাছে , আর অভিষিক্তার সাথেও বেশ খানিকটা সময় কাটানো যাবে , অনেকদিন ধরেই যে তার নিমন্ত্রণ পাচ্ছি।

দুই
প্রথম দুদিন তো আমার শ্রাবণী আবাস বীথিকাকে ছেড়ে কোথাও বেরতেই পারলাম না – এত বৃষ্টি আর তার এত বেশি শব্দ , ভেজানো দরজা তবুও ভিজে যাওয়া অরণ্যের গন্ধে ঘর ম ম করেছে সমস্তটা দিনই , ভালো তবুও যেন সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণের বিষণ্ণতা , আসলে বৃষ্টি ভেজা দিন গুলোর আলোটাই এমন। বড়জোর আমরা দুজনে বুড়ো আমগাছ তলার চেরারটায় গিয়ে বসেছি – অভিষিক্তার আবার সারা সময়ই মনে হয়েছে , গাছটার নাকি মন খারাপ , ওর শরীর থেকে এত দিনের রৌদ্র মাখা গন্ধটা ধুয়ে ধুয়ে মাটির কাছে চলে যাচ্ছে বলে।

তৃতীয় দিন , বোধহয় বুধবার ছিল , ভোরের দিকে একবার ঘুমটা পাতলা হলে বেশ শুনেছিলাম খুব বৃষ্টি পড়ছে ঝম ঝম করে আর একটু শীত শীত । তবে , যখন সহজ হাওয়ার গন্ধ মাখা একফালি সাহসী রোদ গালে এসে আলতো স্পর্শ করলো , ঘুম ভাঙলো পুরোপুরি। আটটা দশ , বাইরে এসে দেখি ফুটফুটে আলোয় চারিদিক ঝলমল করছে , পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু রামধনু । নটার দিকে আসে সাঁওতাল বৌ , সে রান্নাবান্না থেকে বাকি অন্যসব কাজ একাই করে । সেদিনও তার কোনো ব্যাতিক্রম হল না । সাঁওতাল বৌয়ের রং ঠিক কষ্টিপাথরের মত কালো আর চকচকে ,তার হাসিও মধুর – সিঁথিতে আর কপালে সিঁদুরের বাহুল্যতায় চেহেরাটার ভীতর একটা ভৈরবী ভৈরবী ভাব চলে আসে ।

অভিষিক্তা স্কুটি নিয়ে আসলে পর আমরা একসাথে ব্রেক ফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম , আমার ইচ্ছে ছিল একটু দূরে কথাও যাই , সবই তো ঘোরা – ওর আবার যুক্তি কখন বৃষ্টি নামে , তারচেয়ে বরং সোনাঝুরিই ভালো ।

পথে যেতে যেতেই রোদের মুখ পুড়ল – আকাশ প্রায় কাঁদ কাঁদ । আমি বললুম , চলো ফিরে যাই – বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে জ্বরে পড়লে তোমার মায়ের যত ঝক্কি । ও বললে , চলো না , কিছু হবে না , আজ একটু ভিজবো । আদুরে আবদারের রাঙা ঠোঁট , কি আর করি , বললাম – বেশি সময় নয় কিন্তু !

সেদিন সোনাঝুরির ক্ষ্যাপা বাউল বাতাসের লাস্যময়ী রাঙা ধূলির আঁচল ধরে সেকি টানাটানি , তখনও বৃষ্টি নামেনি – আলাপের লজ্জা কাটিয়ে শালবনে খেলা করে বেড়াচ্ছিল একটা মৃদু অথচ বিহ্বল আঁধারি । শেষ বারের মত সূর্য যখন মেঘের আড় ভেঙে আলতো দেখা দিয়েই লজ্জায় লীন হয়ে একেবারে ধুয়ে মুছে মিলিয়ে গেল – সেই মুহূর্তে অভিষিক্তা আমায় বলে উঠলে – অনিন্দ্য দ্যাখো , আমাকে ঘিরে কেমন বৃষ্টি পড়ছে । সত্যি বলতে আমি সেদিন ওর ভিতর ওকে খুঁজে পাইনি , খুঁজে পেয়েছিলাম একটা কিশোরী শালতরুকে – এখনো ভাবতে অবাক লাগে । তারপর ধীরে ধীরে , কী এক আদ্ভুত কৌশলে কখন যে আমরা হাওয়া আর বৃষ্টির সখ্য হয়ে গিয়েছিলুম জানি না – পাতারা ওকে আর আমাকে দেখে দুলে দুলে হেসেছিল বোধ হয়।
তারপর আর কি , অবিরাম ভিজতে ভিজতে আমার মত সেও ক্লান্ত যখন – সদ্য স্নান করা অরণ্যের ঘ্রাণ নিতে নিতে , আমরা অস্তিত্ব প্রমাণের দায়বদ্ধতার জন্য ফিরে আসছিলাম কাঁচমন্দিরের পাশের রাস্তাটা ধরে ।

তিন
দ্যাখা হয়ে গেল ওর কোন এক বন্ধুর সাথে , সে আমাকে আগে থেকেই চিনতো , বোধ হয় ফেসবুকে আমার ছবি দেখেছে – আমিও বোধ হয় তার নামটা শুনেছি , অভিষিক্তাই আমাকে বলেছে কোন সময়ে । সে আমার দিকে বেশ অভিযোগের ভ্রু তুলে বললে , ” অনিন্দ্য তুমি এসেছ , ও কিন্তু আমাদের বলিনি ! এটা কিন্তু ভারি অন্যায় । তার উপর আজকাল ফোন করলেই কেন বলে – তুই বাড়ি থাক , আমি সময় মত দেখা করে নেবো । বাড়ি ও আসে , কিন্তু কোনদিনই আমাকে নিয়ে কোথাও যায় না , খালি আজ এটা আছে – ওটা আছে বলে, জানো তো । ”

আমার এই একনাগারে কথা বলা অভিমানী মেয়েটিকে বেশ লাগছিল , আমি তো একটু একটু করে হাসছি আর ওর অভিযোগ গুলো খুব মন দিয়ে শুনছি – হটাত অভিষিক্তার দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম, ওর মুখে গভীর একটা কিছুর ছাপ – ওদের ভিতর কি সম্পর্ক ভালো নয় ? ওকি সহ্য করতে পারছে না ওকে ? আমি এবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম ।
অভিষিক্তা বলে উঠল , অলিভা তুই এখানে কেন ? চল তোকে বাড়ি দিয়ে আসি । আমার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল , একবার অলিভার দিকে চাই আর একবার অভিষিক্তার দিকে – দুজনের মুখচ্ছবির অবক্ত্য লেখা গুলো খুব করে পড়ে ফেলে একটা ধারণা সাজিয়ে নিতে চাইছিলাম তখনই কিন্তু কিছুই অনুমান করতে পারছিলাম না ।

অভিষিক্তা একটু এগিয়ে গেল , ওর একটা হাতে আলতো স্পর্শ করে বলল , ” অনিন্দ্য এখান থেকে একাই চলে যেতে পারবে – তুই ওঠ স্কুটিতে , বাড়ি চল অলিভা ।” অলিভার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি , মণিটা কাঁপছে – অপলক গভীর দৃষ্টিতে অভিষিক্তার উদ্বিগ্ন এলোমেলো মুখের দিকে চেয়ে ।

আমিও সেই মুহূর্তে কিছু একটা অনুমান করেছিলাম বোধ হয় , বলে উঠলাম – ” হ্যাঁ , আমার একটু হাঁটতে ইচ্ছে করছে এখন । তাছাড়া মুগ্ধদার সাথে দেখা করার কথা আছে । তুমি যাও অলিভা । ” অভিষিক্তা এখনো ওকেই দেখছে , মনে হল না আমার কথা শুনেছে ও ।
অলিভা নরম ভাবে আমার দিকে ফিরল , এবার লক্ষ্য করলাম মেয়েটা বিষাদ অবনতা আর তার দুচোখ টলমল করছে । ” একি অলিভা কাঁদছ কেন ? কি হয়েছে … ” আমার কথা শেষ হল না , অলিভা আমার সদ্য বৃষ্টিস্নাত একটা হাত ওর তালুর ভিতর নিয়ে ওর বুকের কাছটায় ধরল , বুক এতখানি উষ্ণ হতে পারে সে ধারণা আমার ছিল না । সব কিছু মিলিয়েই ভীষণ অবাক হওয়ার আগেই , অভিভা খুব করে কেঁদে উঠে আমাকে বলল , ” অনিন্দ্য আমি একটা বার বৃষ্টিতে ভিজতে চাই – ওকে বল না , আমাকে ছেড়ে দিতে । অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজিনি , দ্যাখো আবার মেঘ করে এসেছে , আমি ভিজতে চাই আমাকে ছেড়ে দিতে বলো। ”

অভিষিক্তাকে দেখলাম , অনর্গল ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে । আমার ওই অনেক কিছু না বোঝার ভিতরেও অলিভার করুণ টলমলে দুটো চোখের দিকে চেয়ে আপনা থেকেই পল্লব ভিজে উঠছিল আর একটা ঘন বাস্প গলার কাছটায় এসে ভিড় করছিল কিন্তু ছেলেদের যে সহজে কাঁদতে নেই , দাঁতে দাঁত চেপে হলেও চোখের কত জল পল্লবের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয় , এমন লুকিয়ে রাখার শিক্ষা যে আমাদের সহজাত ।
আমি অলিভাকে আলতো আলিঙ্গনে জড়িয়ে বললাম , আলিভা তুমি বোকার মত কাঁদছো কেন ? আচ্ছা বেশ , আমরা তিন জনেই কাল বৃষ্টি আসলে ভিজবো – খুশি তো ? দ্যাখো, আজ তো অনেক বেলা হয়ে গেছে তাই না ।

অলিভা আমার দিকে বিহ্বল চোখে বলল , কথা দিচ্ছ তো ? কাল আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেবে ? আমার তখন মনে হল , চারপাশে আর কিছুই নেই , অন্ধকার আর সেই অন্ধকারের ভিতর ” কথা দিচ্ছ তো ? ” এই কটা বোধহীন শব্দ ছাড়া – ভয় পেলাম , উত্তর দেওয়া হল না – অভিষিক্তার হাত ধরলাম ।

অলিভা চলে গেল স্কুটিতে করে । আমি অনেকক্ষণ কাঁচমন্দিরের দিকে তাকিয়ে রইলাম – মাঝে মাঝে দমকা হাওয়াতে গাছের প্রশাখা দুলছে , টুপটাপ জল খসে পড়ছে , নীচের রাস্তা ধরে হেঁটে চলা হলুদ পাঞ্জাবি শাড়ি পরা ছেলে মেয়েগুলো যখন সজল হাওয়ার আন্দোলনে থেকে থেকে আকস্মিক ভাবে ভিজে যাচ্ছে টুপটাপ জলে , আনন্দ তাদের আর ধরে না – যেন এটার মতো হাস্যকর ঘটনা আর হতেই পারে না – পরস্পরের গায়ে হেসে লুটিয়ে পড়ে তারা উদযাপন করছে তাদের আনন্দ – মন্দিরের টালি ভিজে ভিজে – গাছ গুলোর গন্ধতে চারপাশটা কেমন যেন ভারি – একটা গিরগিটি দেখা দিয়েই ঘাসে মিলিয়ে গেল – অনেক দূরে কথাও দোয়েল ডাকছে ।

চার
” সত্যি বলতো , সখীর সাথে রাগারাগি হল নাকি ? নইলে ভালো করে কথা বলছিস না , কিছু বললেই হ্যা হু করছিস ? ” – মুগ্ধদা চা নিয়ে এসে বসতে বসতে বলল । আমি বললাম , ” না গো , তা নয় – পরে শুনো । মৈনাক কি সোহিনীর সাথে ? আসবে না এখন ? ”
মুগ্ধ – ” মৈনাকের খবর আমি রাখি না – আসার হলে আসবে , আমি অনেক বারই আসতে বলেছি – তুই আসবি তাও বলেছি ” ।
আমি -” হ্যাঁ আমিও ফোন করেছিলাম । বলল সোহিনীকে নিয়ে আসবে ।”
মুগ্ধ – “সে আসলে আসবে ক্ষণ । তুই আমকে বল , তোর এমন উদাসী হওয়ার কারণ কি ? ”
আমি – ” হুমম … আমিও অনেক কিছু না বোঝার ভিতর আছি গো মুগ্ধদা । কি করে তোমাকে বলি । আচ্ছা , অলিভাকে চেনো ? অভিষিক্তার বন্ধু , একসাথেই পড়ে সম্ভাবত । ”
মুগ্ধ – “অলিভা ? মানে যার ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়েছে ? চিনি তো , ইসস আমদের থেকে কত জুনিয়র । ”
আমি – ” ধুর , কি যা তা বলছ ? কাকে বুঝেছ কে জানে ! ”
মুগ্ধ – “তোর সখীর বন্ধু যদি হয় তো ঠিকঠাকই চিনেছি । ওর একটা দিদি আমাদের বান্ধবী । ”

হাতে ধরা চায়ের কাপটাকে টি টেবিলটায় রেখে শরীরটাকে এলিয়ে দিতে দিয়ে চোখে পড়ল – দক্ষিণের জানলা দিয়ে হু হু করে জোলো বাতাসী স্রোতে হালকা ধানী রঙের পর্দাটা অবিরাম উড়ছে – আবার থরে থরে মেঘ জমছে মেঘের উপর – অনেক দূরে নীল বনভূমির রেখা স্পষ্ট , এবার মনে পড়ছে অভিষিক্তা বেশ কয়েক দিন আগে ওর এক বান্ধবিকে নিয়ে এমন কিছুই যেন বলেছিল -অলিভা ছিল কি তার নাম , হবে হয়ত !

মুগ্ধ – কি হল রে ? অলিভার বাড়িতে নিয়ে গিয়াছিল নাকি আজ ?

আমি ওই দূরের থমথমে মেঘের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সবটাই বললাম মুগ্ধদাকে । বলতে বলতে নিজের শরীরটাকেই বড্ড বেশি ভার লাগছিল , কেবল মনে হচ্ছিল অলিভা নয় অলিভা নয় , নিশ্চয়ই অন্য কেউ হবে ! মুগ্ধদা উঠে গিয়ে ওই ধানী রঙের পর্দাটার পাশে দাঁড়িয়েছে – শুনলাম বলছে , ” জানিস মেয়েটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না ও মরে যাবে – ভোরে উঠে এখনও স্নান করে কলেজে যাবে বলে – নাচের ক্লাসেও যায় , সেখান থেকে অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরাতে হয় … এদিকে ডাক্তার বলেই দিয়েছে – যখন তখন ।

একটা মানুষ – এই আছে , এই নেই ! নেই এর তফাতে কত দূর চলে যেতে হয় মুহূর্তে , যতখানি দূর আজ পর্যন্ত কোন মানুষ তার সারা জীবন ধরেও যেতে পারেনি । ”

পাঁচ
বাইরে তুমুল শ্রাবণ – অনেকক্ষণ হল বসার ঘরের সোফাটায় বসে আছি , কোলের উপর মন্দাক্রান্তা সেনের ” হৃদয় অবাধ্য মেয়ে ” , নরম টেবিল ল্যাম্পের আলোয় কবিতার বই থেকে উঠে আসা কত সব তীব্র মুহূর্তেরা সামনের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবিগুলোর উপর অদ্ভুত এক ভিন্ন আলোআঁধারি তৈরি করছে – সমস্ত দরজা জানলা ভেজানো , ঘরটায় সহ্যসীমার গুমোট হাওয়া হামাগুড়ি দিচ্ছে , বাইরে ঝড় বইছে সাথে বৃষ্টির শব্দ – যে মেয়েটি বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছে তারই প্রতীক্ষায় অপেক্ষা যেন সারা আকাশ বৃষ্টি সাজিয়ে বসেছে – শব্দটায় কি অপূর্ব বিষাদ ।

অভিষিক্তার সাথে সেই থেকে আর যোগাযোগ হয়নি , চেষ্টা করলে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বিনীত ভাবে বলেছে – উপলব্ধ সীমার বাইরে আছে – তারপর সন্ধ্যা থেকেই আমার দুটো সিমে নেটওয়ার্ক নেই – অভিষিক্তাও নিশ্চয়ই অনেকবার চেষ্টা করছে , এখন আমরা দুজনেই দুজনের জন্য ফোনের দুই প্রান্তে অপেক্ষা করছি , কে আগে অপেক্ষা ভাঙতে পারি সেটাই দেখার ।

ছয়
অনেকক্ষণ হল বৃষ্টি থেমে গেছে – চারিদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা , ঘোলা জ্যোৎস্না জানলার কাঁচ দিয়ে চলকে মেঝেতে এসে পড়েছে – এই চলকে পড়া জ্যোৎস্নার দিকে বেশি সময় তাকিয়ে থাকলে মন খারাপ করে । আমি তৈরি হয়েই আছি , অভিষিক্তাদের এক বন্ধু সুদীপ আমাকে নিতে আসবে – এই মাত্র যেতে হবে , কারণ অলিভাকে কথাও পাওয়া যাচ্ছে না।

অভিষিক্তার ফোন অবশেষে এসেছিল , তাতে শুধুমাত্র দুটি কথা , ” অলিভা বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে । সুদীপ যাচ্ছে , তুমি চলে এসো – ওকে খুঁজতে যেতে হবে । ”

সাত
বৃষ্টিস্নাত আকাশের নীচে আলোয় ধোয়া রাত্রিতে আমরা পাঁচ জন শান্তিনিকেতনের পথে পথে অনুসন্ধান করছি , কেউ কেউ চিৎকার করে উঠছে – অলিভা , অলিভা কোথায় তুমি ? কত দিনের পুরানো সেসব গাছের বিষণ্ণ অন্ধকারে আমারা যেন একটু একটু করে পালটে যাচ্ছি , সময়ের সাথে একটা বিষাদ যত সুগভীর ভাবে আলিঙ্গন করছে আমাদের ভিতরটাকে , ততই চোখের সামনে যা কিছু , তার সবই যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে , শুধু ব্যপ্ত এক বেদনার অতলে তলিয়ে যাচ্ছি ।

আট
আকাশ বেশ ফর্সা হয়ে আসছে , অনেকক্ষণ হল আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে – চারিদিক ছড়ানো রাত্রি থেকে একটু একটু করে অন্ধকার মুছে দিচ্ছে সজল হাওয়ার স্বনন ।
আমরা যে যার মত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি – ক্লান্তি অবসাদে স্থিমিত আমাদের ভিতরটাকে এই বৃষ্টিপাত গলিয়ে দিচ্ছে , হটাত একটা চিৎকারে চমকে উঠলাম – কেউ আর্তনাদ করছে – উবুশ্রান্ত সজল ধারার শব্দকে ছাপিয়ে সে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে , পাতা গুলো যেন শিহরণে মৃদু মৃদু কেঁপে উঠছে ।

যে দিক থেকে আর্তনাদ এসেছিল ছুটতে ছুটতে সেদিকে গিয়ে দেখলাম , রুদ্র পলাশের একটা গাছের নীচে অলিভার মাথাটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে ওর বাবা , ওদের ঘিরে দাঁড়িয়ে বাকিরা , কেউই চোখের জল সামলাতে পারছে না – আমাদের ঘিরে তখনও তুমুল বৃষ্টি পড়ছে । চোখের জলের এই এক আশ্চর্য ব্যাপার , ঝুম বৃষ্টির মধ্যেও একে আলাদা করে চেনা যায় । ওর বাবা কাঁদছে না , তবে দুচোখে অসম্ভব স্তব্ধতা – অভ্যস্ত আঙুল মেয়ের মাথার চুলে আলতো করে বিলি কাটছে শুধু , এছাড়া ওনার শরীরে কোন আবিলতা নেই ।

প্রকৃতির কাছে মন থেকে কিছু চাইলে প্রকৃতি তা পূরণ করে , শুধু চাইবার মধ্যে সত্যি কারের ব্যাকুলতা থাকতে হয় । যে মেয়েটা সত্যি কারের বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছিল , বিশ্ব প্রকৃতি তাকে ঘর ঘর থেকে চুরি করে যত্ন করে ভিজিয়ে দিয়েছে শ্রাবণের অনাবিল ধারায় যদিও মূল্য হিসাবে নিয়েছে মেয়েটার শরীরের সবটুকু উত্তাপ ।

( সমাপ্ত )

[614 বার পঠিত]