অটিজম: কিছু কারণ, কিছু ভুল ধারণা ও কিছু করণীয়।


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনবক্সে একজন লিংক শেয়ার করে অভিমত জানতে চাওয়ায় উইমেন-চ্যাপ্টারে অটিজম নিয়ে প্রকাশিত লেখাটি পড়লাম। এক কথায় বলতে গেলে লেখাটি ভুলে ভরা এবং বিভ্রান্ত-সৃষ্টিকারী। অটিজমের মতো একটি জটিল জেনেটিক-নিউরোবায়োলজিক্যাল-সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারকে শুধুমাত্র “অপুষ্টিজনিত” রোগ বা সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা ও চিকিৎসা-উপদেশ দেয়া জ্ঞানের অপরিপক্কতা, এবং অটিস্টিক শিশু ও তাদের অভিভাবকের জন্য বিভ্রান্ত-সৃষ্টিকারী ও অপমানসূচক।

অটিজমের অনেক কারণ আছে, নিত্যনতুন গবেষণায় আরো অনেক কারণ ও ফ্যাক্টর সম্পর্কে জানা যাচ্ছে। কিন্তু অটিজম শুধুমাত্র অপুষ্টিজনিত কোনো ডিসঅর্ডার নয়।

পুষ্টির ব্যাপারটি এতোই মৌলিক যে আপনি ইচ্ছে করলে সব রোগের সাথে পুষ্টির সম্পর্ক খুঁজে পাবেন। কারণ শরীর ও মস্তিষ্কের যাবতীয় জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন জ্বালানি বা পুষ্টি। তবে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে যে অপুষ্টিজনিত চিহ্ন চোখে পড়ে সেগুলো রোগের কারণ নয়, বরং “ফলাফল” বা কনসিকিউয়েন্স। একটি উদাহরণ বা উপমা দিয়ে বুঝাই। যেমন ধরেন ভাইরাসের আক্রমণে আপনার হেপাটাইটিস এ হয়েছে, ফলে জ্বর, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদির কারণে আপনি শুকিয়ে গেলেন, খাদ্যে রুচি পান না, এবং স্বাভাবিকভাবে আপনার শরীরের পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেবে। এখন আপনি হেপাটাইটিস এ হওয়ার জন্য কি অপুষ্টিকে দায়ী করবেন? না, বরং ভাইরাসকে। অপুষ্টিজনিত চিহ্ন ও লক্ষণগুলো রোগের ফলাফল বা রোগের কারণে সৃষ্টি, রোগ সৃষ্টির কারণ নয়। অটিজমের ক্ষেত্রে-ও তাই। তবে পুষ্টিকর খাবার খেলে যেমন সব রোগের ক্ষেত্রে উন্নতি হয়, পুষ্টিকর খাবার খেলে অটিস্টিক শিশুদের-ও উপকার হবে।

প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলো, যেমন, হাত দিয়ে কিছু খাওয়া, জুতোর ফিতে লাগানো, ইত্যাদি ব্যাপারগুলো আপনার আমার কাছে সহজ মনে হলে-ও অটিস্টিক শিশুদের জন্য এই কাজগুলো-ও বিশাল যুদ্ধজয়ের মতন। অনেক শিশু নিজের মতো করে অন্যান্য “স্বাভাবিক শিশুদের” মতো খায় না, অনেক অভিভাবকরা-ও বাচ্চাদের পুষ্টির ব্যাপারে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন না, ফলে অটিস্টিক শিশুরা প্রায় পুষ্টিহীনতায় ভুগে। তবে শুধুমাত্র পুষ্টিহীনতা অটিজম সৃষ্টি করে না, অটিজমের লক্ষণ ও অবস্থাকে আরো খারাপ করে তুলতে পারে।

পুষ্টিহীনতা অটিজম সৃষ্টিতে প্রভাব রাখতে পারে যদি এই পুষ্টিহীনতা ক্রিটিক্যাল পিরিয়ডে হয়ে থাকে। যেমন গর্ভকালীন সময়ে ও শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক বছরে। তবে গর্ভকালীন ও জন্ম-পরবর্তী প্রথম কয়েক বছরে যখন মস্তিষ্ক ও শরীরের বিকাশ দ্রুত গতিতে ঘটে তখন পুষ্টিহীনতায় ভুগলে শুধুমাত্র অটিজম না আরো অসংখ্য শারীরিক ও মানসিক রোগ ও ডিসঅর্ডার হতে পারে। পুষ্টিহীনতা কখনোই ভালো নয়, কিন্তু পুষ্টিহীনতা অটিজমের একমাত্র ও প্রধান কারণ নয় (যেটি শাহমিকার লেখায় দাবি করা হয়েছে)। পুষ্টিহীনতা বড়জোর অনেকগুলোর একটি কারণ কিংবা প্রভাবক হতে পারে (এই বিষয়ে পরবর্তীতে লিখছি)। আপনার শিশু যদি স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করে এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে তবে হঠাৎ পুষ্টিহীনতায় ভুগলে তার অটিজম হবে না, হওয়ার সম্ভাবনা ১% এর চেয়ে-ও কম। তবে পুষ্টিহীনতা অন্য অনেক রোগ হতে পারে।

অটিজমের সাথে পুষ্টিহীনতার সম্পর্ক আছে? আছে, তবে এটি কজ-এন্ড-ইফেক্ট (cause-and-effect) বা কারণ-ফলাফল ধরণের সম্পর্ক নয়, বরং কোরিলেশনাল। যেমন ধরুন, আমি এবং আপনি মানুষ (তাই আমাদের মধ্যে কোরিলেশন আছে), কিন্তু আমি আপনার জীবনকে পরিবর্তন করছি না আমূলভাবে, অর্থাৎ আমি কার্যকরী কারণ নই। কিছু কিছু গবেষণা অটিজমের সাথে পুষ্টিহীনতার সম্পর্ক খুঁজে পায় বা পাচ্ছে, এইসব গবেষণার অন্যতম ক্রটি হচ্ছে যে এগুলো অন্যান্য কারণগুলোকে (যেমন, বায়োলজিক্যাল কিংবা সাইকোলজিক্যাল) কন্ট্রোল না করেই উপাত্ত বিশ্লেষণ করে, ফলে ফলাফল বড় আকারে দেখায়, কিন্তু বাস্তুবিকভাবে অন্যান্য কারণগুলোর প্রভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে ধরলে পুষ্টিহীনতার প্রভাব ততো থাকে না। আর এই পুষ্টিহীনতা ক্রিটিক্যাল সময়ে হতে হয় (যেমন- গর্ভকালীন কিংবা জন্মের প্রথম কয়েক বছরে)।


অটিজম আসলে কী?

অটিজম হচ্ছে মূলত নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ মস্তিষ্কের বিকাশ বয়স অনুসারে স্বাভাবিকভাবে হয় না, ফলে আচরণগত ও চিন্তাগত সমস্যা ও লক্ষণ দেখা দেয়। পৃথিবীতে ২০১৩ সালে প্রায় ২১.৭ মিলিয়ন মানুষ (শিশু ও পূর্ণবয়ষ্ক) অটিজম ও অটিজম-সংক্রান্ত ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ছিলেন বলে জানা গেছে১। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৬৮ জন শিশুর ১ জন অটিজম বা এই ঘরনার রোগে ভুগে। আরেক তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি, মূলত নিত্য নতুন গবেষণার ফলে দ্রুত ও দক্ষতার সাথে ডিসঅর্ডারটি সনাক্ত করতে পারা ও অভিভাবকের মাঝে এর সম্পর্কে সচেতনতার কারণে এই সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বেশি।

এই ডিসঅর্ডারে ভোগা শিশুদের লক্ষণ দেখা দেয় জন্মের পরের প্রথম তিন বছরের মাঝেই। অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো তাদের মোটর বিকাশ (যেমন, হাঁটা চলা করতে না পারা, বা বয়েসের তুলনায় দেরিতে করা) বাঁধাগ্রস্ত হয়। ভাষিক দক্ষতা রপ্ত হয় না, যেমন কথা বলতে পারে না সঠিকভাবে, বাক্য-গঠন কিংবা শব্দ গঠন করতে পারে না, শব্দের উচ্চারণ সঠিক হয় না, অনেক ক্ষেত্রে এই বাক্য ও শব্দ বারবার বলতে থাকে। কেউ কিছু বললে সেটি সহজে বুঝতে পারে না, যেমন কেউ কৌতুক করলে সেটিকে আক্ষরিক অর্থে নেয়, কৌতুক হিসেবে নয়। অন্যের ইনটেনশন কী তা অনুধাবন করতে পারে না, যেমন ধরুন আমি আর আপনি টেবিলের এই পাশে ও ওপাশে বসে আছি এবং আমাদের মাঝখানে টেবিলের উপর খাতা-কলম রাখা কিন্তু আমার নাগালের বাইরে। আমি খাতা-কলম নেয়ার জন্য হাত বাড়ালে কিন্তু নাগাল না পেলে অনেক স্বাভাবিক শিশুই সাহায্য করার জন্য খাতা-কলম আমার দিকে ঠেলে দেবে। অটিস্টিক শিশুরা এই ব্যাপারটি বুঝতে পারে না, বুঝতে কষ্ট নয়, অর্থাৎ তারা আমি কী চাইছি, কী করতে চাইছি এইসব সামাজিক কিউ সম্পর্কে ধারণা কম রাখে। মনোবিজ্ঞানে এই ব্যাপারটিকে বলে থিউরি অফ মাইন্ড (theory of mind), অর্থাৎ আমি যেভাবে চিন্তা ও কাজ করি সেই ধারার মতো অন্য কেউ চিন্তা ও কাজ না করতে পারে, অন্যের ইনটেনশন কী তা বুঝে উঠতে পারা এইসব। অটিস্টিক শিশুদের এইসব সামাজিক আচরণে সমস্যা পেতে হয়। অধিকাংশ শিশু একই কাজ বারবার করে (যেমন, কোনো খেলনা বা সামগ্রীকে একইভাবে বারবার ঘোরানো), অনেকে নিজের ক্ষতি-ও করে (যেমন- হাত পা কাটা, কিংবা মাথা দেয়ালে বাড়ি মারা ইত্যাদি)। শুধু তাই নয়, তারা তাদের মনোভাব প্রকাশ করতে পারে না বা প্রকাশ করতে বেগ পেতে হয় (ভাষিক জ্ঞান কম থাকায় ও মনোভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে দক্ষতা না থাকায়), যেমন ঠাণ্ডা লাগলে শিশু মুখ ফুটে না-ও বলতে পারে যে তার ঠাণ্ডা লাগছে। অধিকাংশের আচরণে “কঠোর মনোভাব” বা “রিজিড” ভাব থাকে, মানে “একবার মাথায় যা আসে তাই নিয়ে থাকা,” অর্থাৎ আচরণে ফ্লেক্সিবিলিটি না থাকা। অর্থাৎ সামাজিক, ভাষিক, চিন্তামূলক ও আচরণগত অনেক আচরণের সমষ্টি হচ্ছে অটিজম। একেক শিশুর মাঝে আচরণে এইসব “অস্বাভাবিকতা” কম বা বেশি পরিমাণে বা মাত্রায় থাকে, এই জন্যই এটি একটি স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ, মনে করুন যে ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত দাগাঙ্কিত একটি স্কেল, একেক জনের আচরণের মাত্রা ০ থেকে ১০০ মাঝে একেক অংশে পড়ে; অর্থাৎ কারো ৫ হলে সে ততো বেশি অটিস্টিক নয়, আবার কারো ৮৫ হলে তার অনেক অটিস্টিক লক্ষণ আছে, এইরকম।


অটিজম ও অন্যান্য অনেক সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার হচ্ছে বায়োসাইকোসোশ্যাল (biopsychosocial) অসংখ্য কারণে সৃষ্টি। একেকজনের ক্ষেত্রে মূল কারণ একেক রকম হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি বা দুটি নয়- অনেকগুলো কারণ অথবা ফ্যাক্টরের সমষ্টি ও তাদের মিথস্ক্রিয়ার কারণে রোগের লক্ষণ দেখা দেয় বা ডিসঅর্ডার সৃষ্টি হয়। অটিজমের ক্ষেত্রে জেনেটিক, ডেভেলপমেন্টাল (গর্ভকালীন ও নবজাতক সময়কালীন), পারিবারিক ও সামাজিক কারণ-ও আছে। তাই অটিজমকে শুধুমাত্র অপুষ্টিজনিত রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা দূরদর্শীতা ও জ্ঞানের অভাব। আমি এই লেখায় একেকটি ক্যাটেগরির (জেনেটিক, ডেভেলপমেন্টাল, পারিবারিক ও সামাজিক একেকটি কারণ নিয়ে কথা বলবো সংক্ষেপে, তবে এই কারণগুলোই শেষ ও একমাত্র প্রধান কারণ নয়।

জেনেটিক: অনেক অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে ক্রোমোজোমাল আবনরমালিটি (chromosomal abnormalities) দেখা যায়২, ৩। যেমন অনেক অস্টিস্টিক শিশুদের (বিশেষত ছেলেদের) এক্স ক্রোমোজোম পুরোপুরি কপি হয় নি নিষেকের পরে ক্রোমোজোম সৃষ্টির সময় কিংবা কিছু অংশ বাদ পড়েছে বা “ভেঙে” গেছে। ছেলেদের মেয়েদের তুলনায় অটিজম ৪-৫ গুণ বেশি হয়, এর পেছনে অন্যতম কারণের একটি হচ্ছে ক্রোমোজোমে ক্রুটি। আমরা জানি যে পুরুষ বা ছেলে শিশুদের এক্স ক্রোমোজোম একটি মাত্র হয়ে থাকে (মায়ের কাছ থেকে পাওয়া), ফলে এই একমাত্র ক্রোমোজোমে সমস্যা থাকলে জিন এক্সপ্রেশনের সময় সমস্যা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে মেয়েদের দুটো এক্স ক্রোমোসোম থাকে, ফলে একটিতে সমস্যা থাকলে অন্যটি ভালো হলে প্রভাব অতো ভয়াবহ বা নাজুক হয় না। এছাড়া অন্যান্য অনেক জেনেটিক কারণ আছে, যেমন, অনেক জিন একেকটি ক্রোমোজোমে যেখানে থাকার কথা সেখানে থাকে না, অন্যত্র স্থানান্তর করে; এছাড়া অনেক জিনে ক্রটি পাওয়া যায় (যেমন, জিনের এক্সপ্রেশনে গণ্ডগোল৪, প্রোটিন সংশ্লেষণে সমস্যা৫ ইত্যাদি; এইসব কাজ শারীরবৃত্তীয় কাজের ও আচরণের “স্বাভাবিক বিকাশের” জন্য প্রয়োজন। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা এপিজেনেটিক কারণ-ও (অর্থাৎ জিনে সমস্যা না হলে জিনের প্রকাশে সমস্যা দেখা দেয়) তুলে ধরছে৬।

নিউরোবায়োলজিক্যাল বা নিউরোসাইকোলজিক্যাল বা নিউরোডেভেলপমেন্টাল: অটিস্টিক শিশুদের মস্তিষ্কের আকার সাধারণত সাধারণ শিশুদের তুলনায় অনেক বড় হয়ে থাকে এবং স্নায়ুকোষগুলোর মাঝে অস্বাভাবিক রকমের বেশি সংযোগ লক্ষ্য করা যায়৭। এটার একটি বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা আছে। যাকগে, ভ্রুণের যখন প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রাইমিস্টারে মস্তিষ্কের গঠন ও সংযোগ সৃষ্টি হয় তখন অনেক অপ্রয়োজনীয় সংযোগ সৃষ্টি হয় (ব্যাপারটি অনেকটা এইরকম, বাড়ির সবগুলো পাইপের সাথে অন্যান্য পাইপের সংযোগ দেয়া হয়, পরে এই সব সংযোগের মধ্যে যেগুলো কাজে লাগে ও বেশি ব্যবহৃত হয় সেগুলো রাখা হয় এবং বাকিগুলোকে জ্বালানি ও স্নায়ুবিক যোগাযোগ দ্রুত করার জন্য বাতিল করা হয়। ব্যাপারটিকে স্নায়ুসন্ধিক ছাঁট বা সিন্যাপ্টিক প্রুনিং (synaptic pruning) বলা হয়। অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুসন্ধিক প্রুনিং ঘটে না বা খুব কম হয়৮। ফলে তাদের মস্তিষ্ক বড় হলে-ও স্বাভাবিক আচরণের ও দক্ষতার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ (মস্তিষ্কের এক অংশের সাথে অন্য অংশের) সৃষ্টি হয় না, কিংবা সৃষ্ট সংযোগগুলো দ্রুততর ও এফিশিয়েন্ট নয়৯। এছাড়া তাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে গঠনে-ও ভিন্নতা চোখে পড়ে১০। যেহেতু মস্তিষ্ক মানুষ ও প্রাণীদের যাবতীয় আচরণ সৃষ্টি করে তাই মস্তিষ্কের অস্বাভাবিকতার কারণে আচরণে ভিন্নতা আসবে এটা হচ্ছে নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণগুলোর অন্যতম।

পারিবারিক ও সামাজিক: আধুনিক কিছু সাইকোলজিক্যাল গবেষণা মতে অটিজম ৩-৬ মাসের বয়েসের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে-ও চিহ্নিত করা যায়। যেমন মস্তিষ্কের গঠন ও শিশুদের চোখের দৃষ্টি লক্ষ্য করে১১। আমরা যখন কারো সাথে কথা বলি কিংবা কোনো কিছুতে ব্যাপাক আগ্রহ পাই তখন সেই ব্যাক্তির চোখের দিকে তাকাই। অটিস্টিক শিশুরা এটি করে না। চোখের দৃষ্টির এই ভিন্নতাকে ভিত্তি করে কিছু ডায়াগনস্টিক টুলস সৃষ্টি হচ্ছে। যাহোক, অটিজম যদি খুব অল্প বয়েসে শনাক্ত করা যায় তবে দ্রুত ইন্টারভিন করা যাবে (যখন মস্তিষ্ক বিকশিত হচ্ছে দ্রুত বেগে), ফলে মাত্রা কমানো যেতে পারে। অটিস্টিক শিশুরা দেরিতে কথা বলা শিখে, উচ্চারণে ক্রটি থাকে, একই বাক্য বা শব্দ বার বার বলে (একই আচরণ-ও বারবার করে), অনেকের সাইকোমোটর ফাংশনালিটিতে অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। তাই যতো দ্রুত চিহ্নিত করা যায় ততো ভালো। যেহেতু অনেক অভিভাবক (বিশেষত আমাদের দেশের) মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখেন না ফলে তারা অনেক ব্যাপার অবহেলা করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুরুতর অবস্থায় পৌঁছলে তখন তেমন কিছু করার থাকে না। আর অনেক পরিবার ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুদের মধ্যে জেন্ডার-অনুযায়ী আচরণ প্রত্যাশা করে, যেমন ছেলেরা একটু চঞ্চল হবে উশৃঙ্খল হবে কিন্তু মেয়েরা শান্ত লাজুক হবে এইরকম। ছেলেদের ক্ষেত্রে অটিজম বেশি সনাক্তের একটি কারণ এটি-ও। ছেলে শিশুর অস্বাভাবিকতা অভিভাবকদের দ্রুত চোখে পড়ে, মেয়েদের নয়।

উপরে যে জেনেটিক, নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণগুলো বললাম তার পেছনে কিন্তু ব্যক্তির পারিবারিক সামাজিক পরিবেশ প্রভাব রাখে। দরিদ্র বৈষম্য ভরা পরিবেশে বড় হলে কিংবা সেসব স্থানে যথেষ্ট শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই সেখানকার নারী-পুরুষদের স্বাস্থা (মানসিক ও শারীরিক) ভঙ্গুর হয়, ফলে প্রজন্মান্তরে এগুলো শিশুদের মাঝে-ও ছড়ায়। তাই প্রয়োজন সচেতনতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে শারীরিক স্বাস্থের মতো জোর দেয়া।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে অতিরিক্ত বুদ্ধিমান নারী-পুরুষদের (দুজনেই অতিরিক্ত বুদ্ধিমান হলে, বিশেষত অটিস্টিক ছেলে শিশুদের বাবা১২) সন্তানের মাঝে অটিজম বেশি হয়ে থাকে১৩ (এটার বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে যে অটিজম হচ্ছে বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ বা উৎকর্ষতা বিপথে যাওয়া)। আবার সন্তান জন্মদানের সময়ে বাবা মার বয়েস কতো তা-ও প্রভাব রাখে, বেশি বয়েস হলে পুরুষদের শুক্রাণুর মান ও নারীদের হরমোন ও গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতা-ও প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করা হয়১৪। এখানে একটি ব্যাপার আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, বাবা-মা অতিরিক্ত বুদ্ধিমান হলে কিংবা বেশি বয়েসের হলেই যে শিশুর অটিজম হবে এমন কোনো পাথরে-খোদাই করা নিশ্চয়তা নেয়, বরং এইসব ফ্যাক্টরগুলো প্রভাব রাখে বা ঝুঁকি বাড়ায়।


মনোবিজ্ঞানে একটি ডিসঅর্ডার কীভাবে সৃষ্টি হয় বা আবির্ভূত হয় সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য অন্যতম থিউরি হচ্ছে পীড়া-পূর্বঝুঁকি অনুজ্ঞা (stress-diathesis hypothesis)। এই তত্ত্ব মতে একজনের পূর্ব কিছু ঝুঁকি থাকে এবং সামাজিক কিংবা অন্যান্য পীড়া বা কারণে এই ঝুঁকি বেড়ে গিয়ে ডিসঅর্ডার সৃষ্টি হয়। যেমন, মনে করুন একটি ভ্রুণের জেনেটিক ঝুঁকি আছে (এক্স ক্রোমোজোম ভঙ্গুরতা), এবং গর্ভকালীন সময়ে সেই ভ্রুণের মা অ্যালকোহল কিংবা অন্য কোনো মাদক গ্রহণ করলো কিংবা কোনো জটিলতায় ভুগলো, ফলে শিশুটি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক গুণ বেশি ঝুঁকি নিয়ে (অটিজমের) জন্ম নিলো। জন্মের পরে বাবা-মা অথবা অভিভাবকের অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে সঠিক গুরুতর সময়ে ইন্টারভিন করা গেলো না, ফলে এই অতিরিক্ত ঝুঁকি ও পীড়ার কারণে শিশুটি পুরো অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ করতে লাগলো, এবং এতো বেশি পরে চিকিৎসার জন্য যাওয়া হলো যে তেমন কিছু করার নেই।

শুধু ঝুঁকি থাকলেই যে রোগ হবে এমন নয়। পরিবেশ ও সমাজের অন্যান্য কারণের প্রভাবের উপর নির্ভর করে এই ঝুঁকি বাড়ে এবং সীমা অতিক্রম করলে ডিসঅর্ডারের লক্ষণ প্রকাশিত হয়।


মোটের কথা হচ্ছে অটিজম একটি কারণে ঘটে না, ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি-ও “ধরো-তক্তা-মারো-পেরেক” টাইপের এক রকম নয়। আপনার শিশুর যদি অটিস্টিক লক্ষণ আছে বলে মনে করেন তবে বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করুন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন শিশু বা ব্যক্তির রিস্ক ফ্যাক্টর ও প্রোটেকটিভ ফ্যাক্টর, জেনেটিক-নিউরোসাইকোলজিক্যাল কারণ ও অবস্থা পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ করে কেইস-বাই-কেইস চিকিৎসা হয়। এই বিষয়ে পরে আরো বিস্তারিত লিখবো ধারাবাহিকভাবে।

অটিস্টিক ছেলেমেয়েদের অভিভাবকদের জন্য বাঙলায় নুশেরা তাজরীনের একটি চমৎকার বই আছে, ২০১১ সালে তাম্রলিপি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত, নাম হচ্ছে “শিশুর অটিজম তথ্য ও ব্যবহারিক সহায়িতা”। এই বিষয়টি অটিস্টিক শিশুর অভিভাবকের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। এটি ব্যবহারিক সহায়িতা।

আপনার শিশুর মাঝে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করলে সাইকোলজিস্ট কিংবা নিউরোসাইকোলজিস্টদের পরামর্শ নিন। ডাক্তারদের মাঝে যেমন বিশেষজ্ঞের ভাগ আছে তেমনি সাইকোলজিস্টদের মাঝে-ও ভাগ আছে, একেকজন একেক ধরণের ডিসঅর্ডারে দক্ষ। এমন কারো কাছে যান যার অটিস্টিক রোগীদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

অটিজমের জন্য জৈবিক চিকিৎসা-ও (যেমন- ওষুধ সেবন) আছে। যেমন- এন্টিসাইকোটিক মেডিকেশন haloperidol এবং risperidone ব্যবহৃত হয় শিশুর মারাত্মক বিধ্বংসী আচরণ (হাত-পা কেটে নিজের ক্ষতি করা, অন্যের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ) কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এইসব ড্রাগে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে যে অনেক সময় হিতে-বিপরীত হতে পারে। এছাড়া, কোনো ড্রাগই আচরণে আমূল পরিবর্তন আনে না, শুধুমাত্র মাত্রা কমায়। অনেক ক্ষেত্রে সেরোটোনিন রি-আপটেক ব্লকার (serotonin reuptake blocker) ধরণের এন্টিড্রিপেরেসান্ট ব্যবহার করা হয় শিশুর পুনঃপুনঃ আচরণ (বারবার একই জিনিস করা) কমানোর জন্য। এছাড়া, রিটালিন (Ritalin), যা মূলত এডিএসডি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় সেটিও মনোযোগহীনতা ও উচ্চ মাত্রা কার্যকলাপ কমানোর ক্ষেত্রে ফল দেয়। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি যেটি শিশুর সামাজিক আচরণকে উন্নত করবে, যেটি কিনা অটিস্টিক শিশুদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

কী ধরণের চিকিৎসা হবে তা নির্ভর করে সর্ব-পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে (রোগীর অবস্থা, পরিবেশের অবস্থা ইত্যাদি) প্রাপ্ত ফলাফলের উপর। সাইকোথেরাপি করলে শিশু অনেক কিছু শিখতে পারে যা পরবর্তীকালে অন্যান্য ক্ষেত্রে-ও কাজে লাগতে পারে।


অটিজম সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা আছে যে ভ্যাকসিনের সাথে এর সম্পর্ক আছে, এটি ডাহা ভুল কথা। ভ্যাকসিন কখনোই অটিজম সৃষ্টি করে না, কিংবা অটিজমের মাত্রাকে বৃদ্ধি করে না১৫। ভ্যাকসিনের ফলে বরং শিশুর শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

সব কথা শেষ কথা হচ্ছে, বেশি বেশি জানুন, সচেতন হোন, এবং কোনো জ্ঞানই শেষ নয়। কোনো কিছুতে সন্দেহ হলে যাচাই করুন। এবং মনে রাখুন যে স্বাস্থ্য দুই প্রকার- মানসিক ও শারীরিক; এবং দুই ধরণের স্বাস্থ্যই পরষ্পরের সাথে জড়িত। আপনার আমার সচেতনতাই নিজেদের ও পরবর্তীদের প্রজন্মের জীবনকে শুভ করে তুলবে।

(দোহাই: বলার অপেক্ষা রাখে না লেখাটি অসমাপ্ত। পরবর্তীতে এই বিষয়ে আরো বিস্তারিতভাবে লিখবো। আপাতত উল্লেখিত লেখাটির ভুল ধরিয়ে দিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এই লেখা প্রাথমিকভাবে লেখা।)

তথ্যসূত্র
১। Vos, T., Barber, R. M., Bell, B., Bertozzi-Villa, A., Biryukov, S., Bolliger, I., … & Duan, L. (2015). Global, regional, and national incidence, prevalence, and years lived with disability for 301 acute and chronic diseases and injuries in 188 countries, 1990-2013: a systematic analysis for the Global Burden of Disease Study 2013. The Lancet, 386(9995), 743.
২। Skuse, D. H. (2000). Imprinting, the X-chromosome, and the male brain: explaining sex differences in the liability to autism. Pediatric Research, 47(1), 9-9.
৩। Jamain, S., Quach, H., Betancur, C., Råstam, M., Colineaux, C., Gillberg, I. C., … & Bourgeron, T. (2003). Mutations of the X-linked genes encoding neuroligins NLGN3 and NLGN4 are associated with autism. Nature genetics, 34(1), 27-29.
৪। Alarcón, M., Abrahams, B. S., Stone, J. L., Duvall, J. A., Perederiy, J. V., Bomar, J. M., … & Nelson, S. F. (2008). Linkage, association, and gene-expression analyses identify CNTNAP2 as an autism-susceptibility gene. The American Journal of Human Genetics, 82(1), 150-159.
৫। Kelleher, R. J., & Bear, M. F. (2008). The autistic neuron: troubled translation?. Cell, 135(3), 401-406.
৬। Schanen, N. C. (2006). Epigenetics of autism spectrum disorders. Human molecular genetics, 15(suppl 2), R138-R150.
৭। Fein, D. (2011). The neuropsychology of autism. Oxford University Press.
৮। Rogers, S. J. (1998). Neuropsychology of autism in young children and its implications for early intervention. Developmental Disabilities Research Reviews, 4(2), 104-112.
৯। Courchesne, E. (2004). Brain development in autism: early overgrowth followed by premature arrest of growth. Mental retardation and developmental disabilities research reviews, 10(2), 106-111.
১০। Nickl‐Jockschat, T., Habel, U., Maria Michel, T., Manning, J., Laird, A. R., Fox, P. T., … & Eickhoff, S. B. (2012). Brain structure anomalies in autism spectrum disorder—a meta‐analysis of VBM studies using anatomic likelihood estimation. Human brain mapping, 33(6), 1470-1489.
১১। Boraston, Z., & Blakemore, S. J. (2007). The application of eye‐tracking technology in the study of autism. The Journal of physiology, 581(3), 893-898.
১২। Happé, F., Frith, U., & Briskman, J. (2001). Exploring the cognitive phenotype of autism: weak “central coherence” in parents and siblings of children with autism: I. Experimental tests. The Journal of Child Psychology and Psychiatry and Allied Disciplines, 42(3), 299-307.
১৩। Crespi, B. J. (2016). Autism As a Disorder of High Intelligence. Frontiers in Neuroscience, 10.
১৪। Durkin, M. S., Maenner, M. J., Newschaffer, C. J., Lee, L. C., Cunniff, C. M., Daniels, J. L., … & Schieve, L. A. (2008). Advanced parental age and the risk of autism spectrum disorder. American Journal of Epidemiology, 168(11), 1268-1276.
১৫। Stehr-Green, P., Tull, P., Stellfeld, M., Mortenson, P. B., & Simpson, D. (2003). Autism and thimerosal-containing vaccines: lack of consistent evidence for an association. American journal of preventive medicine, 25(2), 101-106.

[424 বার পঠিত]