[১] সির্ফ রামজি কে নাম সে!

একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। কাল্পনিক নয়, একেবার সত্যি ঘটনা। শুধু পাত্রদের নামগুলো ফেকি:

১৯৯০-এর দশকের গোড়ার কথা। বাবরি মসজিদ তখনও ভেঙে পড়েনি। ভাঙবার তোড়জোর চলছে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে। উত্তর প্রদেশের বেনারস থেকে লক্ষ্ণৌ যাওয়ার তিনটি রেলপথের একটিতে, সুলতানপুর স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে কিলোমিটার পাঁচেক উত্তর-পূর্ব কোণে গেলে একটা গ্রাম পড়ে। সারন। মূলত অনুসূচিত জাতির মানুষদের বাস। সেই গ্রামে ১৯৯১ সালে এক বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার আগমন হয়, দলিতদের মধ্যে রামমন্দিরের পক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে।

তিনি সেই গ্রামের কয়েকশ মানুষের সঙ্গে বৈঠকে বসে প্রথমে সকলের শুভ নাম জানতে চান। স্বভাবতই বেশ কিছু নাম এসে পড়ে এই রকম: রামনরেশ, রামভক্ত, রামপ্রসাদ, রামপ্রকাশ, রামকিষেন, রামনারায়ণ, রামজিত, রামপ্রীত, রামসুন্দর, রামধন, রামকুশল, সীতারাম, ভগতরাম, জগতরাম, . . . ইত্যাদি। আরও অনেক রাম-হীন নামও সেখানে ছিল, যেমন মহেশ যাদব, কিশোর সিং, যুগল প্রসাদ, ইন্দারজিত, ইত্যাদি। কিন্তু সেই নেতা সেই সবের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে এই রাম-পৃক্ত নামগুলি আঁকড়ে ধরে এক গম্ভীর বাণী দিলেন: “জিস রামজি কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে খান-পান সে হমারে রহন-সহন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, ওহ নাম কো ক্যায়া হম ভুল যা সকতে হ্যাঁয়? উস পবিত্‌র্‌ নাম সে জুড়ে মন্দির হমে নহি চাহিয়ে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” বলাই বাহুল্য, সেই গ্রামের সেই বৈঠকে উপস্থিত সমস্ত জনতাই সাগ্রহে রামের নামাঙ্কিত মন্দির নির্মাণে সায় দিয়েছিল। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা ভাবলেন, তাঁর আসা সার্থক হল।

এদিকে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের তরফে সেই সময়েই মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ বেরিয়েছে। তা নিয়েও চারদিকে হই-চই হচ্ছে। কাঁশিরাম (আবার রাম!) মায়াবতী প্রমুখর অভ্যুত্থান হচ্ছে। তাঁরা আবার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যাতে সাধারণ দলিত বর্গের মানুষজন রামমন্দিরের হুজুগে গিয়ে না ভিড়ে পড়ে। সুতরাং তাঁদেরও এক নেতা একেবারে সেই সারন গ্রামেই এসে হাজির হলেন। যারা নিয়ে এসেছে, তারা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতার বিগত সভার সাফল্যের কথাও বলে দিয়েছে। সুতরাং তিনিও বাগ্‌বিস্তারে সেই একই পদ্ধতিতে এগোতে চাইলেন। উপস্থিত শ্রোতৃমণ্ডলির সকলের নামধাম শোনার পর রামবিহীন নামগুলিকে অগ্রাহ্য করে তিনি বললেন: “জিস রাম কে নাম হমারে সাথ জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে জীবন সে জুড়ে হুয়ে হ্যায়, হমারে পহচান সে মিলে হ্যায়, না জানে কিতনে দিনোঁ সে, উস নাম সে হমে ক্যায়া মিলা? হমারে খান-পান মে হমারে রহন-সহন মে উস সে ক্যায়া মিলা? নফরত, ঘ্‌রুণা, জীবনভর অবহেলনা, অওর ক্যায়া? তো উস নাম সে হমারা দলিতোঁ কা ক্যায়া লেনাদেনা? উস নাম সে জুড়ে মন্দির হমে কিউঁ চাহিয়ে, জহাঁ হমে ওহ লোগ শায়দ চঢ়নে ভি নহি দেঙ্গে? আপ কা ক্যায়া রায় মুঝে জরা বতানা।” আবারও বলাই বাহুল্য, উপস্থিত সকলেই এক বাক্যে জানাল, সেরকম মন্দিরে তাদের কোনোই আগ্রহ নেই। কাঁশিরামপন্থী নেতা তৃপ্তিসহ ভাবলেন, তাঁরও আসা সার্থক হয়েছে।

বিশ্বের বিচিত্র জটিল ঘটনাচক্রে এর কিছু দিন পর, ১৯৯১ সালের বোধ হয় ডিসেম্বরের দিকে, এই অধমেরও ঠিক সেই গ্রামেই পদার্পণ ঘটে। সেখানে একটি ঘরোয়া সভায় উপস্থিত মানুষেরা দুটো ঘটনাই আমাকে সবিস্তারে জানান। এবং মজার কথা হল, এবার তাঁরা আমার এই ব্যাপারে রায় কী জানতে চান। বলা বাহুল্য, আমার পক্ষে সেই রাম-নাম মাহাত্ম্য নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে খেলা করা সম্ভব ছিল না। পরিস্থিতির গুরুত্বের কথা ভেবে আমি সেদিনের সেই গ্রামীন ঘরোয়া বৈঠকে বেশ কিছু কথা বলেছিলাম, সহজ সরল ভাষায়; এখানে সেই কথাগুলোই একটু শহুরে রঙিন সংলাপে তত্ত্বের আকারে তুলে ধরতে চাই। হয়ত মাঝখানে গত প্রায় তিন দশকে এসে যাওয়া নতুন কিছু তথ্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান যোগ করে।

[২] অন্দর মহলে উঁকি

আজ সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যেভাবে বিজেপি-র দাপট ও প্রভাব বাড়ছে, যেভাবে তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের বক্তব্যকে চাড়িয়ে দিতে পারছে, তাতে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন বহু মানুষই উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। এই যে কখনও পাকিস্তান, কখনও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে জিগির তুলে, কখনও দেশপ্রেমের বুলি আউড়ে, কখনও পাকিস্তান-বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সত্য মিথ্যা কাহিনির গুঞ্জন ছড়িয়ে, আবার কোনো সময় সরাসরি মুসলিম বিরোধী বিষোদ্গার করে দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষকে তারা খেপিয়ে তুলছে—এটা তারা করতে পারছে কেন? আমার ধারণা, এই জায়গাটা মার্ক্সবাদী বা বামপন্থী বলে পরিচিত দলগুলো, তাদের নেতা ও কর্মী, এমনকি তাদের আশেপাশে থাকা বুদ্ধিজীবীদেরও অনেকেই ঠিক মতো বুঝে উঠতে পারছেন না। তার ফলে তাদের কাজ কী, কীভাবে এই বিপদের মোকাবিলা করবেন, তাও তাঁরা ভেবে পাচ্ছেন না!

বিজেপি আরএসএস প্রমুখ জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নানা ধরনের প্রচারে যে হিন্দু জনসাধারণের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করে এবং বিভ্রান্ত হয়, এর পেছনে কতগুলো সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। আমরা যদি সেই জায়গাটা ধরতে না পারি, তাহলে ওদের প্রচারের পাল থেকে কখনই হাওয়া কেড়ে নিতে পারব না। মানব দেহের অসুখের চিকিৎসার মতোই সমাজ মননের অসুখেরও চিকিৎসার পদ্ধতি প্রকরণ অনেকটা একই রকম। ভাইরাস ব্যাক্টিরিয়াগুলোকে সনাক্ত করতে হবে, কোথায় তারা কীভাবে বাসা বেঁধেছে, তা জানতে হবে, তারপর তাদের নির্মূল করার কথা চিন্তা করতে হবে। এযাবত আমরা বামপন্থীরা মার্ক্সবাদীরা এইভাবে কাজটা করিনি। করতে যে হবে তাও ভাবিনি। ওরা একের পর এক মিথ্যা প্রচার গুজব বিভ্রান্তি ছড়িয়ে গেছে, আমরা তার পেছন পেছন ছুটে কোনটা মিথ্যা, কোন কথাগুলো গুজব, কী কী বিভ্রান্তি, তার জবাব দেবার চেষ্টা করে গেছি। ততক্ষণে ওরা আবার নতুন কিছু কথা বাজারে এনে ফেলেছে।

আসলে অবস্থাটা হওয়ার দরকার ছিল এই রকম: আমরা ওদের প্রশ্নের পেছনে ছুটব না; আমরা প্রশ্ন তুলব, ওরা উত্তর দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু দেশের বুকে বিভিন্ন প্রান্তে যখন গণ আন্দোলন শ্রেণি সংগ্রাম সমাজমুক্তির লড়াই চলতে থাকে, তখন ওরা এমনিতেই মুখ লুকিয়ে গর্তে বসে থাকে। বামপন্থীরা তখন মনে করে, এসব ধর্মসংক্রান্ত সাম্প্রদায়িক বা মৌলবাদী মুদ্দাগুলোর কথা আম পাবলিকের কাছে তোলার আর কোনো দরকার নেই। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক শ্রেণি মুদ্দাগুলিকে যত জনপ্রিয় করা যাবে ততই এসব ধ্যান ধারণা সমাজ মননে পিছু হঠতে থাকবে। নিজে থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাবে। অথচ, বাস্তবে যেটা হয়, তা হল: অধিকাংশ সাধারণ মানুষের সচেতন মনে সংগ্রামের কথাগুলোই উথালপাতাল হতে থাকে ঠিকই; কিন্তু পাশাপাশি অবচেতনলোকে তখনও অশ্রেণি বা প্রতি-শ্রেণি অভিপাদ্যগুলো ব্যাক্টিরিয়ার মতোই বাসা বাঁধতে থাকে, গহন মনে উপনিবেশ বানিয়ে ফেলতে থাকে। ধর্ম জাতপাত মগজের কিছু না কিছু জায়গা দখল করে বসেই থাকে। আমরা তা খেয়াল করি না, টের পাই না বা গ্রাহ্যও করি না। অন্তত এতকাল লক্ষ করিনি।

কিন্তু যখন এই রকম আন্দোলন থিতিয়ে যায়, মানুষ হতাশায় ভোগে, তখন সমস্ত ধরনের মৌলবাদীরা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে, আর ওদের কথাগুলি সরবে বলতে শুরু করে। যেহেতু মানুষের মনে তার কিছু কিছু নিরাপদ আশ্রয় স্থল ভালোভাবে থেকে গেছে, তার ফলে তারা জোর পায়, পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায়, সহজেই এক বিরাট অংশের মানুষের মনের চেতন-অচেতন প্রায় সমস্ত কক্ষ দখল করে ফেলে। তখন বামপন্থীদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় কেবলমাত্র সম্প্রীতির কথা বলা, ঐক্যের কথা বলা, ইত্যাদি। তখনও তারা আর ধর্মকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণা সমাজের বুকে ছড়িয়ে আছে তা নিয়ে বিচারবিশ্লেষণাত্মক কিছুই বলতে পারে না। কেন না, সেই রকম পরিস্থিতিতে তাদের ভয় হয়, সেই সব কথা তুলতে গেলে যদি মানুষ খেপে যায়। যদি সাধারণ মানুষ আমাদের কথা শুনতে না চায়। জন-বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কায় আমরা পিছিয়ে যাই। তার মানে হল, প্রয়োজনীয় এই সমস্ত কথাগুলো আমাদের বামপন্থীদের তরফে প্রায় কখনই আর বলা হয়ে ওঠে না। ধর্মীয় মৌলবাদীদের বড় সুবিধা হচ্ছে এই জায়গাটায়। তারা সব সময়েই তাদের কথাগুলো বলতে পারে এবং বলে যেতে থাকে—কখনও ফিসফিস করে, আবার কখনও উঁচু গলায়।

আর একটা কথাও বোধ হয় ভারতের বামপন্থী ও মার্ক্সবাদীরা অনেকেই ভেবে দেখেননি। ইউরোপের কমিউনিস্ট আন্দোলন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বা গণচেতনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুবিধা পেয়েছিল রেনেশাঁস আন্দোলনের ফসল থেকে। ফরাসি বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া থেকে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব তার শ্রেণিগত অনেক দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিন বা চারশ বছর ধরে জনসাধারণের মধ্যে ইতিহাসবোধ বা যুক্তিবাদী বিচারধারা গড়ে তোলার বেশ কিছু কাজ করে ফেলেছিল। বিজ্ঞানের বিকাশও সেখানে হয়েছে নানা রকম ধর্মীয় শক্তি সংগঠন ও বিশ্বাসের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করতে করতে। একদিকে কোপার্নিকাস, সার্ভেতো, ব্রুনো, গ্যালিলেও, প্রমুখর হাত ধরে নিউটন পর্যন্ত এসে বিজ্ঞানের তত্ত্বগত বিকাশ ও আরও এগিয়ে প্রযুক্তিগত প্রয়োগ, শিল্প বিপ্লব; অপর দিকে শিক্ষার বিস্তার, গণ মুদ্রণ ও বইপত্রের সংখ্যাবৃদ্ধি, গ্রাম ও শহরের বিচ্ছিন্নতার অবসান—ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের ক্রমবর্ধমান ধাক্কা খেতে খেতে সামন্তযুগীয় প্রাচীনপন্থী ধর্মীয় মনন ধীরে ধীরে বৃহত্তর জন-মানসে তার শক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। তার দরুন কমিউনিস্ট আন্দোলন সেখানে তার কাজ শুরু করতে পেরেছিল বেশ কয়েক কদম এগিয়ে থেকে।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই সুবিধাটা পাওয়ার উপায় নেই। ভারতীয় বুর্জোয়াদের কিছু ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঔপনিবেশিক পরিমণ্ডলে এখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন তথা রেনেশাঁস আন্দোলন যতটুকু হয়েছে তা দেশের দু তিনটে মাত্র পকেটে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। তার উত্তাপ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কম-বেশি গেলেও তার আলো প্রায় কোথাওই খুব একটা যায়নি। আবার ইউরোপের তুলনায় এই দেশের রেনেশাঁস ছিল নানা দিক থেকে খুবই দুর্বল, জমি এবং জমিদারির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে চলার কারণে সামন্ততান্ত্রিক কু-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বহু কথাই সে খুব জোর গলায় বলতে পারেনি। যেটুকু বলতে শুরু করেছিল, তাকেও খুব তাড়াতাড়ি রক্ষণশীলরা নানা মাত্রায় বিরোধিতা করে অথবা প্রাচীন সংস্কারের খাদ মিশিয়ে অনেকখানি পানসে করে দেয়। ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একই সমস্যা। সেখানেও বুর্জোয়াদের সেই অংশটাই নেতৃত্ব দিয়েছে যারা ছিল মূলত রক্ষণশীল, সমস্ত প্রগতিশীল ধ্যান ধারণা মূল্যবোধের স্বাঙ্গীকরণে অপারগ, বা অনিচ্ছুক। ফলে, এখানে কমিউনিস্টদের সংস্কৃতি কর্মীদের এবং তাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মকর্তাদের এমন অনেক বিষয় উত্থাপনের দায় ছিল যা আসলে অপূরিত বুর্জোয়া বিপ্লবেরই সার কথা। এ কাজগুলি তাঁরাও শেষ অবধি সাহস করে না করায়—এমনকি করতে যে হবে তাও না বোঝায় (কেউ কেউ উলটে রেনেশাঁসের অর্জিত সামান্য ফসলটুকুকেও অস্বীকার ও আত্মস্থ করার এক মেকি-বিপ্লবীয়ানায় ফেঁসে যাওয়ার ফলে)—সমাজ জীবনে একটা বড় ফাঁক থেকে গেছে, যা সহজেই বর্তমান কালের প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের বস্তাপচা আদিম ও মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণা দিয়ে ভরাট করে দেবার সুযোগ পেয়ে গেছে। সেই পাপেরও মূল্য আজ আমাদের কড়ায়-গণ্ডায় চুকাতে হচ্ছে।

২০১৪ সালে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় সরকারে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়া, এবং, বিশেষ করে, আরএসএস পরিবারের গুড-বয়, গুজরাতের শতাব্দকালের ভয়াবহতম মুসলিম নিধন যজ্ঞে হাত পাকানো, নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আসার কাছাকাছি সময় থেকে এই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা আমাদের দেশের বুকে নতুন করে তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। [Bhattacharya 2014] এটাও লক্ষণীয়, যখন যেখানেই নির্বাচনের ঢাক বেজে উঠেছে, সেখানেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিজেপি-র লোকেরা দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে। লোকসভা এবং উত্তরপ্রদেশের বিধানসভার নির্বাচনের প্রাক্কালে ওরা মেরাত মোরাদাবাদ ইত্যাদি জায়গায় মুসলিম বসতির উপরে বেশ ভালো রকম হামলা চালিয়েছে। দিল্লিতে যখন বিধানসভা ভোট আসন্ন, সেখানেও ওরা একবার দাঙ্গা বাধিয়ে বসেছিল। পশ্চিম বাংলায় বিগত বিধানসভার ভোটের প্রাক্কালেও ওরাও বাজারে নেমে পড়েছিল এবং নানা রকম পরিকল্পনা করেই এগোচ্ছিল, যাতে পুরোদস্তুর দাঙ্গা-হাঙ্গামা যদি নাও লাগানো যায়, অন্তত ভোটদাতাদের মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দ্রুত ঘটতে থাকে ও উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কাণ্ডকে কেন্দ্র করে সেই সময় ওরা কীভাবে ঘুঁটি সাজিয়ে এগিয়েছিল, এন-আই-এ-কে দিয়ে কীভাবে একটা জবরদস্ত মুসলিম জঙ্গি চক্রের অস্তিত্ব-কাহিনি তৈরি করে ফেলেছিল, যার মধ্যে এই অপপ্রয়াসের সমস্ত লক্ষণই বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল, এতদিনে সকলেই জেনে গেছেন! [Mirsab 2014; Shahi 2014]

নরেন্দ্র মোদীর সরকার কিছুদিন বিকাশ টিকাশের কথা বলে নিজেদের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী পরিচিতিকে সরিয়ে রেখে একটা শক্ত সমর্থ কাজের দল হিসাবে আসতে চাইলেও, একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে নিতে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ঠুনকো জনপ্রিয়তা দ্রুত হারাতে থাকার ফলে অচিরেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের চাপে বিজেপি আবার তার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে ফেলেছে। গরু এবং গোমাংস নিয়ে দেশ জুড়ে একটা হইচই বাধিয়ে তুলে যত্রতত্র গোমাংসের খোঁজে এবং গন্ধে নিরীহ মুসলিম জনসাধারণের উপর হামলা চালাতে শুরু করে দেয়। একই সঙ্গে চলতে থাকে দলিত সম্প্রদায়ের উপরেও হামলার সিরিয়াল। যেহেতু হিন্দু হিসাবে ধরলে, তারাই সংখ্যায় বিপুল বৃহত্তর অংশ, এক্ষেত্রেও লক্ষ্য হল, ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভন ধরিয়ে তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য ঐতিহ্য ও বিজেপি-আরএসএস মার্কা হিন্দুত্বকে মেনে নিতে বাধ্য করা। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশের বুকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে জ্বালিয়ে রাখা।

[৩] ভ্রম নিরসন

প্রথমে আমি এখানে কিছু সাধারণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। অনেকেই মনে করেন, আমরা বামপন্থীরা, মার্ক্সবাদীরা, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের পক্ষের মানুষেরা ভারতে শুধুমাত্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই সোচ্চার; মুসলিম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমরা নাকি কখনই মুখ খুলি না। সমালোচনা করি না। কথাটা সঙ্ঘ পরিবারের তরফে ইচ্ছাকৃত মিথ্যা প্রচার এবং সাধারণে প্রচলিত একটি আগাপাশতলা ভুল ধারণা। এই মিথ্যা এবং ভুল চিনবার জন্য বিপরীত দিক থেকে একজন মুসলিম মৌলবাদীর সঙ্গে কথা বলে দেখুন। সাড়ে তিন সেকেন্ডের মধ্যেই টের পেয়ে যাবেন, বামপন্থী, মার্ক্সবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদীদের চেয়ে বড় শত্রু তাদের কাছেও আর কেউ নেই। তারাও বরং হিন্দু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদেরই অনেক বেশি আপনজন বলে মনে করে। বন্ধুভাবে দেখে।

কেন?

দুটো অনিবার্য কারণে।

এক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী জঙ্গিপনা দেখানোর তালি বাজানোর ক্ষেত্রেও এক হাতে কাজ হয় না। দুই হাত লাগে। সেখানে এরা একে অপরের তালির কারণ এবং কার্য হিসাবে কাজ করতে পারে। এ ওকে দেখায়, ও একে দেখায়। দু পক্ষেরই দু পক্ষকে প্রয়োজন। এক পক্ষ আর এক পক্ষের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করে। এই কথাটা দুনিয়া জুড়েই সত্য। যেখানে ইহুদি জঙ্গিপনা আছে, সেখানেই ইসলামিক জঙ্গিরাও আছে। হিটলারের খ্রিস্টীয় সন্ত্রাসই ইহুদি সন্ত্রাসীদের জন্ম দিয়ে গেছে। এ প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সর্বজনীন সত্য। অতএব ভারতেও শুধু হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আছে, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা নেই—একথা বলার বা মনে করার কোনো কারণই নেই। এটা বাস্তবে সম্ভবই নয়।

দুই, সমস্ত জঙ্গিবাদেরই একেবারে প্রথম প্রয়োজন যুক্তিবাদের বিনাশ। শ্রেণিচেতনার ধ্বংসসাধন। মানুষ যদি স্বাধীনভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি এবং তথ্য দিয়ে সমস্ত জিনিস বুঝতে চায়, সাধারণ মানুষ যদি তার শ্রেণিস্বার্থের কথা ভাবতে থাকে, ধর্মীয় মৌলবাদের পক্ষে তার চেয়ে সর্বনেশে কীটনাশক আর কিছু হয় না। তার সমস্ত জারিজুরি, সমস্ত জোর, মানুষকে বিভ্রান্ত করার সমস্ত কলকাঠি নিমেষে হাতছাড়া হয়ে যাবে। সুতরাং, আরএসএস যখন যুক্তিবাদকে ধ্বংস করে, শ্রেণিগত ঐক্যের বদলে ধর্মীয় ঐক্যের শ্লোগান দেয়, সে শুধু হিন্দুদেরই যুক্তিবোধ কেড়ে নেয় না, একই সঙ্গে মুসলিম আম জনতারও বিচারবুদ্ধিকে খতম করে দেয়। সে এটা চায় কিনা, ভেবেচিন্তে করে কিনা বড় কথা নয়। যা সে করে তার পরিণাম এটাই। পক্ষান্তরে, মুসলিম মৌলবাদীরাও যা করে তাতে সাড়া দিতে গিয়ে শুধু সাধারণ মুসলিম নয়, একই সঙ্গে হিন্দু জন সাধারণও যুক্তি হারিয়ে মনের ঝাল মেটাতে থাকে। এইভাবে দুই পক্ষই দুই পক্ষকে শক্তি ও ন্যায্যতা যোগাতে থাকে এবং পারে। দু পক্ষেরই টিকে থাকতে গেলে একে অপরকে প্রয়োজন।

এই কারণেই আমরা যখনই যুক্তি দিয়ে তথ্য দিয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে বিচার করি, তাতে শুধু হিন্দুত্ববাদীদের নয়, মুসলিম জঙ্গিদেরও গায়ে ফোস্কা পড়ে। বিপরীতভাবে আপনি যদি মুসলিম মৌলবাদকে যুক্তিপূর্ণভাবে বিচার করতে চান, আরএসএস পন্থীরা তাতেও বাধা দেবে। তারাও চেষ্টা করবে আপনাকে যুক্তির বাইরে টেনে নিয়ে যেতে। কিছু বাজে কূটতর্কে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিতে চেষ্টা করবে।

এখানে একটা উদাহরণই সকলের চোখ খুলে দেবে। অনেকেই লক্ষ করেছেন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন যখন একাত্তরের ঘাতকদালালদের নির্মূল করার দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, এই দেশের বামপন্থী মার্ক্সবাদী যুক্তিবাদীরা দু হাত তুলে বিপুল উৎসাহে তাকে সমর্থন জানিয়েছে, তার সাথে একাত্মতা জ্ঞাপন করেছে। সে তো ঘোষিতভাবেই ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্মের এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান-ধারণার বিরুদ্ধে ভাষা-ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশের ধারণাকে লালনের সপক্ষে এক বিশাল ঊর্মিমালা। কিন্তু এই দেশে শুধু ইসলামি সংগঠনগুলি নয়, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলিও তার সপক্ষে একটি বাক্যও ব্যয় করেনি। কেন? কেন না তারাও বোঝে, বাংলাদেশের জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তার প্রকৃত অভিমুখ শেষ বিচারে তাদেরও বিরুদ্ধেই যাবে। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ভাষার স্বাধিকারের দাবি, ধর্মের ভিত্তিতে নয় ভাষার ভিত্তিতে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি, যে তাদের “হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্তান”-এর বহু-উচ্চারিত একরেখ কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এইটুকু বুদ্ধি তাদেরও আছে।

দু নম্বর কথা হচ্ছে, বিশ্ব-প্রেক্ষিতে ধরলে ইসলামি সন্ত্রাস যে একটা বিরাট সমস্যা—তা নিয়ে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। বিশেষ করে মধ্য প্রাচ্যে, তালিবান, আল কায়দা, আইসিস, ইত্যাদি নানা নামের যে সমস্ত সংগঠনগুলি কাজ করছে তারা মানবতার পক্ষে এক ভয়াবহ বিপদ। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সাপেক্ষেও, মুসলিম জনসংখ্যার বিপুলাধিক্যের কারণে ইসলামি সন্ত্রাসই সেসব দেশে মারাত্মক বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদের কোনো গুরুত্বই নেই। কিন্তু আমরা যখন ভারতের প্রেক্ষিতে আলোচনা করছি, তখন দেখতে হবে, এই মুহূর্তে ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক মঞ্চে বড় বিপদ কোত্থেকে আসছে? ইসলামি সন্ত্রাসই যদি দেশের সামনে বেশি শক্তি এবং মাত্রা নিয়ে উপস্থিত হত, তাহলে তো এতদিনে যেখানে সে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় সেই কাশ্মীর থেকেই ভারতের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে আসার কথা। বরং এখন পর্যন্ত তা যে ঘটেনি তাতেই বোঝা যায়, এই সন্ত্রাসের শক্তি এখনও বৃহত্তর বিপদ নয়।

কথাটা বোঝার জন্য আর একটা ছোট অথচ সহজদৃশ্য উদাহরণ দিচ্ছি। আগের ছয় বছরের অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি শাসন ভারতের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় কতগুলি মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে গেছে। জ্যোতিষ বাস্তুশাস্ত্র পৌরোহিত্য ইত্যাদি আদিম যুগীয় বর্জিত-বিদ্যাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠন তালিকায় তুলে দিয়ে গেছে। এবারকার দফায় তার তিন বছরের রাজত্বে সে মোদীর দক্ষ পরিচালনায় ইতিমধ্যে আরও বেশ কিছু বড় আকারের পরিবর্তন এনে ফেলেছে। প্রথমে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী করে বসল এমন একজনকে যিনি বিদ্যালয়ের গণ্ডি কোনক্রমে পার করেছেন। স্মৃতি ইরানী—যার একমাত্র যোগ্যতা হল তিনি সঙ্ঘ পরিবারের একনিষ্ঠ সদস্য। তিনি আবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদে একের পর এক অযোগ্য লোকদের বসিয়ে দিয়েছেন সেই একই মাপকাঠিতে—শুধু মাত্র সঙ্ঘ পরিবারের কাছে আনুগত্যের কারণে ও প্রয়োজনে। পুনা জেএনইউ হায়দ্রাবাদ ইত্যাদি শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে স্রেফ দলীয় হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ জোর করে চাপাতে গিয়ে তারা এই সব জায়গায় আগুন জ্বালিয়েছে। হায়দ্রাবাদের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দলিত মেধাবী গবেষক ছাত্রকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে এরা। পুনার ফিল্ম ইন্সটিটিউতের মাথায় বসিয়েছে একজন তৃতীয় স্তরের সিনেমা কর্মীকে। তার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ দমন করতে না পেরে পুলিশি সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে তাদের উপর। জেএনইউ-তে কয়েকজন ছাত্রকে ফেক ভিডিও তৈরি করে মিথ্যা দেশদ্রোহের মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা চালিয়েছে। তাতেও সফল না হওয়ায় সেখানকার একজন ছাত্রকে গায়েব করে দিয়েছে। এবার ভেবে দেখুন, ইসলামি জঙ্গিদের হাতে যতই এ-কে ৪৭ ল্যান্ড মাইন আরডিএক্স ইত্যাদি থাকুক, তাদের পক্ষে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে এবং/অথবা প্রশাসনিক কাঠামোয় এরকম একটা ছোট নুড়িও কি যোগবিয়োগের বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষমতা আছে? কাউকে বসানোর কাউকে হঠানোর ক্ষমতা আছে? একটা আঁচড়ও কি কাটার কোনো ক্ষমতা আছে? ইতিহাস ভূগোল বিজ্ঞান বা গণিত শিক্ষার পাঠক্রমে? গত ৭০ বছরে তারা কিছু করতে পারেনি; বিজেপি যা করে চলেছে, আগামী একশ বছরেও এরকম বড় মাত্রার ক্ষতি করার মতো জায়গায় তারা যেতে পারবে বলে মনে হয় না।
ফলে, এই বড় বিপদের বিরুদ্ধেই আমাদের সরব হতে হচ্ছে। যারা দেশের, দেশের শিক্ষা সংস্কৃতির অনেক বেশি—বলা ভালো আসল এবং কার্যকর—ভয়ঙ্কর ক্ষতি করে চলেছে এবং আরও ভয়ানক সর্বনাশ করতে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমাদের সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে।

তৃতীয়ত, সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদের সংজ্ঞা ও আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারেও দু-চার কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। মানসিক উপাদান হিসাবে দুটো কাছাকাছি হলেও ঠিক এক জিনিস নয়, কিন্তু গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং তাদের মধ্যে একটা গসাগু উপাদান হিসাবে ধর্মীয় বিশ্বাসের অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবীরূপে বিদ্যমান। আবার, ধর্মের সাথে এদের কিংবা এদের মধ্যে পারস্পরিকভাবে যে সম্পর্ক তাকে কোনোভাবেই ঠিক কারণ-কার্য সম্বন্ধরূপে অবধারণ করা সঠিক বিচার হবে না। অর্থাৎ, ধর্ম থাকলেই তার থেকে অনিবার্যভাবে সাম্প্রদায়িকতা বা মৌলবাদ আসবে, কিংবা কেউ সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা নিয়ে চলে মানেই সে মৌলবাদী, এমনটা সব সময় নাও হতে পারে। যদিও মৌলবাদী মানেই তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা পুরোদস্তুর বর্তমান। এই সব বহু-বর্ণ সম্পর্কগুলি সমাজ-মনস্তত্ত্ব হিসাবেও যেমন সত্য, আবার ব্যক্তিমানসের বিচারেও এই সব কথা মনে রাখতে হয়। তা না হলে বিচারে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেমন, মধ্য যুগের ভারতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ ছিলেন, পাশাপাশি বাস করেছেন, নিজের নিজের আচার বিশ্বাস পালন করে গেছেন। তাদের মধ্যে অনেক সময়ই ঝগড়াঝাঁটি মারপিট খুনোখুনি হয়েছে, কিন্তু তা কখনই সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত হয়নি। মেরুকরণ হয়ে যায়নি। অথবা, ঝগড়াঝাঁটির ছবিটাই সাধারণ সার্বক্ষণিক চলমান ছবি ছিল না। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঘটনাই ছিল প্রধান ও প্রলম্বিত বৈশিষ্ট্য (পরে আমরা এই প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসব)। আবার, পরাধীন ভারতে মুসলিম লিগ একটি সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে আবির্ভূত হলেও সেটা মৌলবাদী ছিল না। হলে আর জামায়াতে-ইসলাম জাতীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের দরকার হত না। পক্ষান্তরে, আরএসএস প্রথম থেকেই অনেক বেশি মৌলবাদী, এবং সেই কারণেই বা তার অন্যতম আধারের সন্ধানেই সে সাম্প্রদায়িক।

ধর্মীয় বিশ্বাস আচার ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটা গোষ্ঠী যখন নিজেদের একটা বৃহত্তর (কাল্পনিক) ধর্মীয় স্বার্থবোধের দ্বারা তাড়িত ও চালিত হয়, সমাজ ও জীবনের অন্য সমস্ত স্বার্থবোধকে তার কাছে বিলুপ্ত বা গৌণ করে ফেলে, এবং এক (বা একাধিক) ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তার সেই স্বার্থ চরিতার্থতার পথে বাধা বা প্রতিবন্ধক বলে ভাবতে থাকে, তখন সেই গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতার শিকার হয়ে পড়ে। একাধিক ধর্মসম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং চিহ্নিতকরণ সাম্প্রদায়িকতার এক অন্যতম প্রধান শর্ত। সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তার প্রধান লক্ষণ এবং অবলম্বন। এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে কখনও কখনও দাঙ্গার মাধ্যমে, অস্ত্রের ঝনঝনানিতে, নৃশংস রক্তপাতে।

কিন্তু, মৌলবাদ তো শুধু এইটুকু নয়। সে প্রথমে তার নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই শত্রু চিহ্নিত করে ফেলে। তারপর এবং তার ভিত্তিতে সে অন্যত্রও শত্রু খোঁজে। কেন না, শত্রু বেশি হলে তার সুবিধা হয়। তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম যে বিশ্বাস প্রথা প্রকরণ আচার আচরণকে তারই সম্প্রদায়ের মানুষ ইতিহাসের লম্বা সরণিতে জীবনের স্বাভাবিক উজানে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে, সেইগুলিকে আবার ভাঁটিতে ফিরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে তুলে আনা, অন্তত আনার কথা বলা, তার ভিত্তিতে আধুনিক জীবনচর্যাকে সর্বপ্রযত্নে বিরোধিতা করা। ফলে তার প্রথম এবং প্রধান শত্রু অন্য কোনো সম্প্রদায় নয়, তারই সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদী সমাজপরিবর্তনকামী ইতিহাস-বিশ্বাসী মানুষ। তারপর তার লক্ষ্য তার ধর্মের আদিম বর্জিত উপাদানসমূহকে মানজাতির শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক অর্জন হিসাবে দেখানো এবং প্রচার করা। সেই প্রয়োজনে তাকে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়কেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করে তুলতে হয়। এই অর্থে মৌলবাদী শক্তি একটা সমাজের পক্ষে আরও বড় বিপদ ডেকে আনে। তার শুধু সাময়িক ভিত্তিতে এলাকা ধরে ধরে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করলে হয় না, এক সার্বক্ষণিক সাঙ্ঘর্ষিক জঙ্গি উত্তেজনাকে জাগিয়ে রাখতে হয় তাকে।

ভারতীয় উপমহাদেশের তিন টুকরোকে বিগত শতাব্দের ইতিহাসের দীর্ঘ মেয়াদে ভালো করে লক্ষ করলে এই সমস্ত উপলব্ধিগুলোকে মিলিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন শক্তিগুলিকে চিনতে পারা হয়ত একটু সহজ হবে।

[৪] হিন্দু মৌলবাদের জন্ম ও পুষ্টি

আমি এবার সরাসরি ভারতের সমস্যার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। সঙ্ঘ পরিবারের যে মৌলবাদ তার জন্ম হল কীভাবে? সে তো আকাশ থেকে পড়েনি। এই দেশেরই সংস্কৃতির জল মাটি হাওয়ায় সে শ্বাস গ্রহণ করেছে, পরিপুষ্ট হয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ লগ্নে, যখন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্ব দেশের বুকে প্রায় অবিসংবাদী রূপে প্রতিষ্ঠিত, অত্যন্ত জনপ্রিয়, জাতীয় কংগ্রেস যখন খুবই শক্তিশালী জনপ্রিয় সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, সেই সময়ে, উত্তাল জাতীয়তাবাদের লগ্নে, ১৯২৫ সালে, এরকম একটি উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী এবং দেশ ও জাতীয়তা বিরোধী সংগঠনের উৎপত্তি সম্ভব হল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। এর সুষ্ঠু মীমাংসা এখনও হয়নি।

সকলেই জানেন, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের মূল উপাদান দুটো। এক, প্রাচীন ভারতের সব কিছুই জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দুই, এই উপাদানগুলো সমস্তই নষ্ট হয়েছে মূলত মুসলমান রাজত্বের কালে। যা কিছু ওরা বলে, যত ফেনিয়েই বলে, যত খারাপভাবেই বলে, তার সবই হচ্ছে এই দুটো মৌল উপচারের ভাব সম্প্রসারণ। এর বাইরে আর অন্য কোনো কথা ওদের সিলেবাসে নেই।

কিন্তু এই উপচারগুলি ওরা কোথায় পেল? সঙ্ঘ পরিবারের তিন আদি গুরু—হেডগেবার, গোলওয়ালকর, সাভারকর—তাঁরাই কি এগুলোর আবিষ্কারক এবং প্রথম প্রবক্তা?

না। আমি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, আরএসএস প্রতিষ্ঠার অন্তত ছয় দশক আগে থেকেই এই চিন্তাগুলি ভারতীয় শিক্ষিত মননে ঘুরপাক খাচ্ছিল। মূলত শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত অগ্রসর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। ভূদেব মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমুখর লেখনী ও বাণীতে।
তাঁদের মাথাতেই বা এ জাতীয় চিন্তাভাবনা এল কোত্থেকে?

ইংরেজ শাসনের সূত্র ধরে। দুই বিভিন্ন পথে। এক বিচিত্র গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়ায়। সেই জায়গাটা আমাদের প্রথমে বুঝে নিতে হবে। ভারত ইতিহাসের এ এক নির্মম রসিকতা।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ প্রশাসকদের তরফে ভারতীয় সমাজ জীবন সংস্কৃতি ও সভ্যতা সম্পর্কে যে ঔপনিবেশিক তাচ্ছিল্য ঘৃণা অবজ্ঞার মনোভাব ব্যক্ত হত তার প্রতিক্রিয়ায় উনিশ শতকের একদল উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় নিজেদের সম্পর্কে এক কাল্পনিক উচ্চশিখর প্রাচীন সভ্যতার জয়গানে মুখরিত হয়ে ওঠেন। বঙ্কিম চন্দ্রের “মা যা ছিলেন, . . .”, বিবেকানন্দের “হে ভারত ভুলিও না, . . .”, ইত্যাদি এই কল্পস্বর্গেরই উচ্চকিত আলাপন। এর থেকেই শুরু হয় বৈদিক জনজাতির লোকেদের সম্পর্কে এক আর্য-গরিমা কীর্তন। ঋগ-বেদ হয়ে ওঠে সর্বজ্ঞান সংগ্রহ এবং সর্বোচ্চ জ্ঞানের এক দৈব অপৌরুষেয় আকর। গঙ্গা-সিন্ধু অববাহিকার নিবিড় অরণ্য হয়ে ওঠে কোনো এক মনোরম তপোবন (প্রায় এখনকার অভয়ারণ্যের মতো)। সেকালের সমস্ত মানুষের জীবনে ফুটে উঠতে থাকে গণিতের ‘চার’ নামক সংখ্যাটির বিচিত্র রহস্যময় ক্রীড়াশীলতা—চতুর্বেদ, চতুর্বর্ণ, চতুরাশ্রম, চতুর্বর্গ, চতুর্যুগ, চতুর্মুখ, চতুরানন, ইত্যাদি। ধীরে ধীরে প্রাচীন ভারতে আধুনিক গণতন্ত্রের পার্লামেন্ট জাতীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিরও সাক্ষাত মেলে। তারপর ইউরোপ/আমেরিকায় যেমন যেমন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হতে থাকে, সেই সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেই সব কিছুই প্রায় খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে বেদে, পুরাণে, উপনিষদে, তন্ত্রশাস্ত্রে, সাঙ্খ্য-বেদান্তে। সেই তালাশ আজও শেষ হয়নি।

এই মিথ্যা গর্বের অনুসন্ধান অনিবার্যভাবে একই সঙ্গে এক চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক মানসের জন্ম দেয়। যুক্তি ও তথ্যের বদলে বিশ্বাস এবং সংস্কারকেই জ্ঞান অর্জনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে ফেলে। কী জানা গেল সেটা নয়, কী জানলে সুবিধা হবে—তার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা করার মন তৈরি করে দেয়। খোঁজার-আগেই-খুঁজে-পাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে গবেষণা।

এই অন্ধতার প্রভাবেই, ব্রিটিশদের প্রচারিত আর একটি মিথ্যাকে তাঁরা বিনা বিচারে সত্য বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যান। সিপাহি বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা শিক্ষা বিষয়ক সমস্যাগুলিকে গতানুগতিকভাবে দেখছিল। কিছুটা লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ চালানো গোছের কিছু কেরানি তৈরি করার জন্য তারা এখানে ওখানে দু-দশটা স্কুল খুলছিল, তারপরে একটা-দুটো করে কলেজও খুলেছিল, এইভাবে চলছিল। ১৮৫৭ সালে প্রায় আধা-ভারত জোড়া সিপাহি বিদ্রোহ এবং তার সমর্থনে সীমিত আকারে হলেও এক ধরনের গণ অভ্যুত্থান তাদের আত্মবিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দেয়। তারা বুঝে যায়, শুধু সেপাই বরকন্দাজ দিয়ে ধমক-ধামক দিয়ে হয়ত আর বেশিদিন এই দেশে নির্বিঘ্নে ব্যবসাবাণিজ্য লুটপাট চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। ফলে এই সময় থেকেই তাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে ভারতের জনমানসে একটা স্থায়ী ফাটল ধরিয়ে দেওয়া, যা তাদের জাতি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে দেবে না। বা অন্তত জাতি গঠনের প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও বিলম্বিত করবে। ১৮৮০-র দশকে কয়েকজন ব্রিটিশ ইতিহাস লেখক ভারতের ইতিহাসকে হিন্দুযুগ, মুসলিম যুগ ও আধুনিক যুগ—এইভাবে ভাগ করে ফেলেন। তারপর তাঁরা হিন্দুযুগকে খুব শান্তিপূর্ণ সংস্কৃতির বিকাশের কাল হিসাবে চিত্রিত করেন। আর মুসলমান যুগকে দেখান হিন্দুদের উপরে নিরবচ্ছিন্ন অত্যাচার নির্যাতনের এক লম্বা সিরিয়াল হিসাবে। তখন ধরে ধরে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হয়েছে, হিন্দুদের দেবদেবীর মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। [Grewal 1970; Hodiwala 1939; মুখোপাধ্যায় ২০০৩] এই কথাগুলিকে এ দেশের তদানীন্তন বুদ্ধিজীবীরা প্রায় বিনা বিচারে বিনা প্রতিবাদে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাঁদের একবারও মনে হয়নি, এই রকম প্রচারের পেছনে ব্রিটিশ শাসকদের কোনো দুরভিসন্ধিমূলক স্বার্থ থাকতে পারে। তাঁরাও এই কথাগুলিকে তথ্য দিয়ে যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেননি। আসলে এই বিচারশীল মনটাই তখন তাঁদের নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

প্রথম দিকের জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বুদ্ধিজীবীরা ভারতের জনমানসে জাতীয় আবেগ দেশপ্রেম ইত্যাদি জাগিয়ে তোলার জন্য ব্রিটিশদের পরিবেশন করা ইতিহাস থেকে যে বীর-মূর্তি (hero-icon)–গুলি বেছে নিলেন তা হল রাণা প্রতাপ, ছত্রপতি শিবাজি, প্রমুখ। রাণা প্রতাপের লড়াই ছিল আকবর-এর সঙ্গে; শিবাজির ছিল অওরেঙজেব-এর সঙ্গে। ফলে জাতীয়তাবাদের আগমন-ধ্বনি রচিতই হল তথাকথিত এক নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম সংঘাতের কলরব দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণে ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমের কথা বললেও শাসকের ধমকে দ্বিতীয় সংস্করণেই বইটিকে আমূল বদলে ফেলে মুসলিম শাসকদের শত্রুস্থানে বসিয়ে দিলেন, ইংরেজদের দেখালেন হিন্দুর রক্ষাকর্তা হিসাবে। দেশ হয়ে গেল দেশমাতা, রূপকে মা দুর্গা। দেশকে ভালবাসার জন্য প্রথম যে সঙ্গীত (“বন্দে মাতরম”!) রচিত হল তা কোনো মুক্তি সংগ্রামের অভিযাত্রিক গীত হল না; তা হয়ে গেল দেশভক্তিগীতি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই শব্দবন্ধের নিষ্পন্ন কর্মধারয় সমাসে মধ্যপদটি কোনোদিনই আর লোপ পেল না। আজও হিন্দি ভাষায় দেশাত্মবোধক গানকে বলা হয় দেশভক্তিগীতি। স্কুল বসার প্রাক্কালে ছাত্রদের জাতীয় সঙ্গীত গাইবার নাম প্রার্থনা—প্রেয়ার। শপথ গহণ নয়। আজ অবধি। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মহারাষ্ট্রের শিবাজি-উৎসব এক বিপুল গরিমা লাভ করে; রমেশ চন্দ্র দত্তের উপন্যাসে, দ্বিজেন্দ্রলালের নাটকেও রাজস্থানের রাজপুতদের এক মিথ্যা অবিচল দেশপ্রেম-কাহিনি রোমান্টিক কল্পবিলাসে দেশবাসীকে মগ্ন করে দেয়।

ইতিহাস-চেতনা ও সাংস্কৃতিক-বোধবুদ্ধির এই রকম ভ্রান্ত উপাদানগুলিই ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের মনে ধীরে ধীরে সঙ্ঘ-পরিবারের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিভূমি রচনা করতে থাকে। তাই আমি মনে করি, ওদের গাল দেবার আগে, সমালোচনা করার আগে আমাদের এই দুর্বল ইতিহাসবোধ, এই মিথ্যা দেশপ্রেম-সন্ধানকে চিনে নিতে হবে।

এরপর চলে আসতে হবে আমাদের রাজনৈতিক বোধভূমিতে।

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পৃষ্ঠভূমি রচনা করেছিল বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। সেই উপলব্ধি জাতীয় আন্দোলনকে প্রথম থেকেই এক খর্বিত চেতনায় প্লাবিত করে ফেলল। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম সেই চেতনার আপ্লবে স্বাধীনতার যোদ্ধাদের অচেতনেই হয়ে পড়ল হিন্দুদের অভ্যুত্থান কার্যক্রম। যে সমস্ত ছোট ছোট বিপ্লবী গোষ্ঠী গড়ে উঠল বঙ্কিমী আনন্দমঠের সন্তানদের আদলে, কালী মন্দিরে রক্তশপথ নিয়ে যাদের সংগ্রামে যোগদান শুরু হয়, গীতা হয়ে গেল তাঁদের প্রেরণা-উৎস। বাল গঙ্গাধর তিলক মহারাষ্ট্রে স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলেন শিবাজি উৎসব আর গণেশ পুজোর মাধ্যমে। এইভাবে সেদিন ভারতীয় রাজনীতি তার প্রাইমারি শিক্ষার স্তর পার করে মাধ্যমিক স্তরে এসে উপনীত হল। তার আষ্ঠেপৃষ্ঠে হিন্দুচেতনা; তার আগাগোড়া হিন্দুধর্মীয় পলেস্তারা। সে চায় এক অখণ্ড ভারতীয় জাতি; তার ভিত্তিতে সে রেখেছে শুধুই হিন্দু ধর্মীয় অনুষঙ্গ।

এর আর এক পরিণতি হল, হিন্দু ধর্মের বাধ্যতামূলক অঙ্গ জাতিভেদ প্রথা এই জাতীয় ঐক্যের দুর্বল প্রয়াসের মধ্যে খুব স্বাভাবিক নিয়মেই জায়গা পেয়ে গেল। তথাকথিত উচ্চবর্ণের আধিপত্য যতটা বাস্তবে, তার চেয়ে অনেক বেশি আশঙ্কায়, এই আন্দোলনের শক্তিকে গ্রাস করে নিল, একে ভেতর থেকে কুরে কুরে খেতে লাগল। স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু হিন্দু্ধর্মাবলম্বীদের নয়, বিশেষ করে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রায় সোচ্চার চারণভূমি হয়ে উঠল। স্বয়ং তিলকের নেতৃত্বে এবং নির্দেশেই একটা সময় থেকে কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে রাজনৈতিক সম্মেলনের পাশাপাশি সমাজ সংস্কার সম্মেলন মঞ্চটি বন্ধ করে দেওয়া হল। তখনও কিন্তু আরএসএস নামক উপদ্রব এসে পৌঁছয়নি ভারতের রাজনীতির সক্রিয় রঙ্গমঞ্চে।

তার কিছুদিন পরই রাজনীতির ময়দানে আবির্ভাব ঘটল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর।

[৫] অবশেষে গান্ধীও . . .!

ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধী সত্যিই এক বিস্ময়কর চরিত্র। ব্যক্তিগত সততা ও আদর্শবাদিতায় তিনি তখনকার অনেক কংগ্রেসি জাতীয় নেতারই সমকক্ষ। বিরাট কোনো ব্যতিক্রম নন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় ওকালতির ব্যবসায়ে অর্থোপার্জন করতে গিয়ে তিনি যে বাস্তব সাংসারিক অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, তাকে তিনি যেভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন রাজনীতিতে, সেখানটায় তিনি অনেকেরই উপরে। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে বিলিতি পোশাক তথা কোট প্যান্ট টাই ছেড়ে দিয়ে সেই যে তিনি জৈন শ্বেতাম্বর সন্ন্যাসীর বেশভূষা ধারণ করলেন, বাকি সাঁইত্রিশ বছরে তাকে আর পরিত্যাগ করেননি। এর জোরে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দ্রুত মহাত্মা হয়ে গেলেন (উত্তর ও মধ্য ভারতে মহাত্মা বলতে লোকে যে কোনো সংসার ত্যাগী কৌপীন পরিহিত সাধু-সন্ন্যাসীকেই বোঝে; রবীন্দ্রনাথের কল্পিত অর্থে নয়)। এই দেশের জনমানসে তাঁকে আর কেউ কখনই টেক্কা দিতে পারেননি রাজনীতির সর্বোচ্চ আসনটি দখলে রাখায়।

কীভাবে?

তিনি সত্যাগ্রহ গণ আইন অমান্য ধর্না অনশন ইত্যাদি যে সব কর্মসূচি কংগ্রেসের সামনে রেখেছিলেন, তাতে স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের আপামর জনসাধারণের যোগদান করা সম্ভব হয়ে গেল। সেই থেকে সেই কর্মসূচি আজ অবধি বামপন্থী মার্ক্সবাদী দলগুলোও অবিকল ব্যবহার করে চলেছে। তিনি যে খদ্দর পরা এবং চরকায় সুতো কাটার কর্মসূচি হাজির করলেন, তাতে যে কোনো মানুষের, এমনকি ঘরের পর্দানশিন গৃহবধূদেরও, দেশের জন্য প্রতিদিন (রূপক তাৎপর্যে) কিছু না কিছু করার এক মহৎ অনুভূতি লাভ করার অবকাশ মিলে গেল। গৃহত্যাগী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে তিনি যে আশ্রম প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, সেই থেকে আজ পর্যন্ত তা দেশের কোনে কোনে নিবু নিবু প্রদীপের মতো হলেও জেগে রয়েছে এবং তাঁর মত ও পথের রেশটাকে ধরে রেখেছে। এখানে তিনি আজও অনন্য। তাঁর এই সব ক্ষেত্রে ভূমিকা আজও পূর্ণাঙ্গ ও সশ্রদ্ধ মূল্যায়নের দাবি রাখে।

কিন্তু এই রচনায় গান্ধীজির উপরে বিস্তৃত চর্চার সুযোগ আমার নেই। আলোচ্য প্রসঙ্গে যতটুকু না বললেই নয়, সেই কটা কথাই আমি বলে নিতে চাই। যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাস এবং সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সংস্কৃতির বিকাশের পেছনে তাঁরও যে অনিচ্ছাকৃত হলেও বড় মাপের অবদান আছে, যা এযাবত আমরা মার্ক্সবাদীরা প্রায় দেখেও না দেখার ভাণ করে উহ্য রেখে পাশ কাটিয়ে এসেছি, আপাতত সেই দিকটাই আমি আলোচনা করতে চাই।

যখন থেকে তিনি ভারতের রাজনীতিতে যোগ দিলেন (১৯১১), সেই দিন থেকে বরাবর, কংগ্রেসের তিনি নিয়মমাফিক কেউ নন, চার আনার সদস্যও নন; অথচ তিনিই সব, সব কিছু। তিনি সকলকে নিয়ম মানতে বাধ্য করতে পারেন; কিন্তু তাঁকে কেউ প্রশ্ন করতে সাহস পায় না, তিনি কেন সমস্ত নিয়মের ঊর্ধ্বে। কংগ্রেসের যে কোনো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের সিদ্ধান্ত তিনি শুধু আত্মশুদ্ধির উপবাসে বসে এবং সম্পূর্ণ মৌন থেকে দুদিকে স্রেফ আলতোভাবে ঘাড় নেড়ে বাতিল করে দিতে পারেন। দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির পায়ের তলায় লুটিয়ে দেওয়া, বিশ্বাস, শুধুই অযৌক্তিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁর কাছে সকলের হাত জোড় করে নতশির হয়ে থাকা, সকলের কাজের বা আচরণের মূল্যায়ন হলেও তাঁকে সমস্ত মূল্যায়নের বাইরে রেখে চলা—ভারতীয় রাজনীতিতে এই এক সর্বনাশের ঘন্টা সেদিনই প্রথম বেজেছিল। সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে আকণ্ঠনিমগ্ন ভারতীয় বুর্জোয়াদের কাছে কোনো নেতা নয়, দরকার ছিল একজন দৈবাচার্য। গান্ধীর মধ্যে তারা সেই সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে তাঁকেই নিজেদের মসিহা বানিয়ে ফেলে।

রাজনীতিতে তাঁর উপস্থাপনা, তাঁর চলাফেরা—সব এইভাবেই নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, পঞ্জাবে ভগৎ সিং—এই রকম দু একজন মানুষ ছাড়া গান্ধীর এই অন্ধ গুরুবাদী চূড়ান্ত স্বেচ্ছাচারিতা ও তাঁর ভক্তদের সীমাহীন স্তাবকতার বিরুদ্ধে কেউ সেদিন মুখ খোলেননি, বা বলা ভালো, কিছু বলার সাহস পাননি। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘদিন গান্ধীর উচ্চতম প্রশংসা করে এসে একেবারে শেষ বেলায় যখন রাজনীতির মঞ্চে তাঁর কিছু কিছু বিসদৃশ ও অনৈতিক আচরণ দেখে দুঃখ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ব্যক্তি গান্ধী এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত—দুইয়েরই ততদিনে অপূরণীয় ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। আর গান্ধী নিজে এই ক্ষতির পরিণাম বুঝেছেন জীবনের একেবারে অন্তিম লগ্নে, সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ বাহিনীর বিচারের কালে। যখন তাঁর পাশে হাত জোড় করে আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। সেই সময় বক্ষ-বিদীর্ণ হাহাকার নিয়ে তিনি পুরোপুরি একা, নিঃসঙ্গ।

আর তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে বঙ্কিমের চেয়েও সোচ্চারে রাম সীতা তুলসীদাস গীতা রামধুন এই সব নিয়ে এলেন। “রঘুপতি রাঘব . . .” তাঁর প্রিয় গান। গীতায়—যেখানে বিপ্লবীরা পেয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেরণা, সেই গ্রন্থেই তিনি পেতে লাগলেন নিরস্ত্র অহিংস প্রতিবাদের শুলুক সন্ধান। জমিদারি নিয়ে একই বংশের দুই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির রক্তক্ষয়ী লড়াইতে তিনি খুঁজে পেলেন ধর্ম-অধর্ম ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে এক রূপক দ্বন্দ্ব এবং আকাঙ্ক্ষিত নৈতিক বল। এইভাবে গীতা বা অন্য কিছুর যে কোনো রকম ভুল বা অপব্যাখ্যার খোলা জমি তিনি চাষ করে ফেললেন। তিনি এমন এক অহিংসার নীতি নিয়ে প্রচারে মেতে উঠলেন, যা শুধু মাত্র ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই প্রযোজ্য; অন্যত্র নয়। ইংরেজ যদি আফ্রিকায় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, চিনের সাথে হিংস্র যুদ্ধে নামে, তিনি তখন তাঁর অহিংসার পরাকাষ্ঠা নিয়ে সেই সব যুদ্ধে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থ দিয়ে লোকবল দিয়ে অস্ত্রধারণে রক্তক্ষয়ী গণহত্যায় সাহায্য করতে পারেন। এর মধ্যে যে তাঁর স্বপোষিত অহিংসা নীতির বিপুল বিরোধ আছে তা তাঁর (এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও) বহু কাল চোখে পড়ে না। আর এইভাবেই এক ভ্রান্ত, ফাঁপা, শাঁসহীন ধ্যান ধারণা নীতির প্রচার আমাদের দেশের জনমানসে সহজেই বাসা এবং দিশা খুঁজে পায়। তার জন্য যুক্তি তথ্য বাস্তবতা—কিছুরই দরকার পড়ে না।

এই সমস্ত তথ্যগুলো সামনে ফেলে রেখে এক এক করে মিলিয়ে দেখুন, ১৯২৫ সালে আরএসএস-এর অঙ্কুরোদ্গমের জন্য আর কী বাকি ছিল। চিন্তা বিশ্বাস ধ্যান ধারণা আচার আচরণের দিক থেকে কিছুই আর প্রায় পড়ে ছিল না। শুধু গান্ধীর ক্ষেত্রে যা ছিল খণ্ড খণ্ড উপচার, আরএসএস সেইগুলিকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে এক সামূহিক বিচার হিসাবে তুলে ধরেছিল। আর সেই বিচার দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রাহ্য করে তোলার জন্য উর্বর জমি ততদিনে তৈরি হয়েই গিয়েছিল।

অথচ গান্ধী ব্যক্তিগত জীবনে সাম্প্রদায়িক নন। গান্ধীর চিন্তাধারা এমনকি মৌলবাদীও নয়। আরএসএস নাথুরাম গড়সের হাত দিয়ে এটা অন্তত প্রমাণ করে দিয়েছিল। তাঁর ডাকে ব্যাপকতর সংখ্যায় মুসলিম জনসাধারণ সাড়া না দিলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অসাম্প্রদায়িক হওয়ার ভ্রান্ত প্রয়াসেও একটা বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি তখন বুঝেছেন, রঘুপতির নামে আহ্বান জানিয়ে সাধারণ মুসলমানদের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি টেনে আনতে পারবেন না। তাহলে কি শ্লোগান পাল্টে ফেলবেন তিনি? না। উলটে বৃহত্তর মুসলিম জনসমাজকে আকৃষ্ট করার প্রয়োজনে তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করলেন খিলাফত প্রতিষ্ঠার মতো একটা চরম প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলনকে। যার লক্ষ্য সেদিন তুরস্কে সদ্য উচ্ছেদ হওয়া মধ্যযুগীয় ইসলামি খলিফাতন্ত্র আবার ফিরিয়ে আনা। এর পরিণাম কী হল? গণ আন্দোলনের পরিধি যতটুকু বাড়ল, তা দুই প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল চিন্তাধারার মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। তাঁর হাত ধরেই এইভাবে সেদিন মুসলিম জনগণকেও ধর্মান্ধতার দিকেই ঠেলে দেওয়া হল। আর ধর্মান্ধতা বৃদ্ধি যে ফাটল বাড়াতেই সাহায্য করবে, এ আর বেশি কথা কী? আবার এই সব প্রয়াসের দ্বারা তিনি এক ধাক্কায় সীমান্ত গান্ধী, কাজী নজরুল ইসলাম, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, কাজী আবদুল ওদুদ, প্রমুখ চিন্তার দিক থেকে প্রাগ্রসর মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের প্রগতির হাতও দুর্বল করে দিলেন।

এরই পরিণামে আমরা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলাম: যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের এত শক্তি ছিল না, এত বড় বড় প্রভাবশালী নেতা দেশের বুকে উপস্থিত ছিল না, সেই সময় ১৯০৫-১১ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কিন্তু সফল হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসক কার্জনের ষড়যন্ত্র প্রায় ব্যর্থ হয়েছিল। আর, স্বাধীনতা আন্দোলন যত এগিয়েছে, যত তার শক্তি বৃদ্ধি হয়েছে, যত গান্ধী নেহরু পটেল পন্থ প্রমুখ নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব জনমনে বেড়েছে, ততই তার মধ্যে ফাটল ধরেছে, সেই ফাটল বড় হয়েছে, এবং অবশেষে ১৯৪৭-এর অর্ধবর্ষ শেষে দেশকে দুই (আসলে তিন) টুকরো করে স্বাধীনতা পেতে হয়েছে। অর্থাৎ, গান্ধী নেতৃত্বের যেটা শক্তি বলে এতকাল ভাবা হয়েছে, প্রচার হচ্ছে, তা আসলে জাতীয় জীবনের এক মরীচিকা। দুর্বলতারই ছদ্মরূপ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এই নির্মল সুতীক্ষ্ণ রসিকতাটিকে অনেকেই বোধ হয় আজ পর্যন্তও লক্ষ করে উঠতে পারেননি।
আর, না বুঝে বা ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে, এই যে দুষ্ট উদাহরণটি গান্ধী একবার খাড়া করে গেলেন, হাজারও ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও এটাই ভারতীয় জাতি-রাজনীতি এবং জাতীয় রাষ্ট্রের চিরস্থায়ী অঙ্গভূষণ হয়ে রইল। অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার একমাত্র অর্থ দাঁড়িয়ে গেল, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিকৃষ্ট রক্ষণশীল উপাদানগুলির মধ্যে উদার ভ্রাতৃত্ব। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে নেহরুর পছন্দের তালিকায় শেখ আবদুল্লাহ নয়, উঠে এল বক্সি গোলাম মহম্মদ। রাজীব গান্ধীর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ পেল শাহবানু মামলার বিচারালয় প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রক্ষণশীলদের চাপে মুসলিম পার্সোনাল ল-কে আরও নারী বিরোধী করে তোলার মধ্যে।

আর আপাতত সর্বশেষ যে ঘটনাটির উল্লেখ করতে চাই, সেইটি এর মধ্যে সবচেয়ে খাসা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং এর নেতৃত্বে যে জনতা সরকার গঠিত হল, তার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী করা হবে একজন মুসলিম ব্যক্তিকে—এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরামর্শ নিতে তাঁরা চললেন—কোথায় জানেন? দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম বুখারির কাছে। তাঁদের হাতে ছিলেন দুজন ক্যান্ডিডেট—আরিফ মহম্মদ খান এবং মুফতি মহম্মদ সঈদ। বুখারি তাঁদের বললেন, আরিফ কস্মিনকালে নয়। ও কোনো মুসলমানই নয়। ও শাহবানু মামলায় আদালতের রায়ের পক্ষে ছিল, রাজীব গান্ধীর মুসলিম নারীর অধিকার (রক্ষা) বিলের ও বিরোধিতা করেছিল। শরিয়তের বিরুদ্ধে গিয়েছিল। ওকে মন্ত্রীসভায় নেওয়া যাবে না। মুফতি? হ্যাঁ, ওকে করা যাবে। ও পাঁচবার নামাজ পড়ে, খাঁটি ঈমানদার লোক, সাচ্চা মুসলিম। তা, সেবার সেই মুফতি মহম্মদ সঈদকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব দেওয়া হল। গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত সেই ঐতিহ্য সমানে চলেছে।

একটা ছোট পাদটীকা দিয়ে রাখা ভালো: সেই ঈমানদারের কন্যা মাহবুবার নেতৃত্বাধীন দলের সাথেই এখন কাশ্মীরে বিজেপি-র সুদৃঢ় আঁতাত। নিশ্চয়ই তারও কিছু গূঢ় কারণ আছে! আরও আশ্চর্যের কথা হল, যে শরিয়তি আইন নিয়ে বিজেপি-র ব্যাপক বিক্ষোভ আছে, মাহবুবার দল কিন্তু সেই শরিয়তের একনিষ্ঠ সমর্থক। অর্থাৎ, খাঁটি মৌলবাদী হতে পারলে, ধর্ম নির্বিশেষে হাতে হাত দিব্যি মিলে যায়!

তাই বলছিলাম, এই সমস্ত আপসই শেষ পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবারের হাত শক্ত করেছে। তার সাংগঠনিক শক্তি কম বা বেশি যেমনই হোক না কেন, তার আদর্শগত জমি এই রাষ্ট্র এবং তার রাষ্ট্রনায়কদের হাতেই ক্রমাগত পাকাপোক্ত হয়ে চলেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের অজান্তে; কখনও কখনও হয়ত জেনে-বুঝেই। জনসাধারণের মধ্যেও তাদের প্রচার ক্রমাগত ছাপ ফেলে চলেছে। এর ফল হয়েছে দুটো: যখন তখন দেশে সাম্প্রদায়িক হানাহানি লাগিয়ে দেবার মতো পরিস্থিতি প্রস্তুত হয়েই থাকে; যাকে বলা যেতে পারে সক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (active বা hard communalism)। আর, যখন দাঙ্গা হাঙ্গামা হচ্ছে না, তখনও তার সপক্ষে একটা মতবাদিক আদান-প্রদান “ওরা-আমরা” সমস্ত দেশ জুড়েই চলতে থাকে; একে আমি বলতে চাই নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতা (passive বা soft communalism)। এই প্রায়-অদৃশ্য সার্বক্ষণিক নিষ্ক্রিয় সাম্প্রদায়িকতাই আমার মতে বেশি বিপজ্জনক। আসল বিপদ।

[৬] ভারতীয় সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতা: আরও কিছু ভ্রম নিরসন

স্বাধীন ভারত কি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল? অনেকেই মনে করেন—তার মধ্যে বহু বামপন্থী এবং মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীও পড়েন—হ্যাঁ, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শেষে স্বাধীনতার সেই রক্তমাখা ধূসর রাত্রিতে পাকিস্তান আত্মপ্রকাশ করেছিল এক ইসলামিক রাষ্ট্র রূপে, কিন্তু স্বাধীন ভারতের জন্ম হয়েছিল নাকি এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবেই। তাঁরা এর জন্য পণ্ডিত নেহরু প্রমুখ কংগ্রেসের একটা বড় অংশকে বেশ প্রগতিশীল বলেও মনে করেন। যার অর্থ হল, এই ব্যাপারেও প্রকৃত ইতিহাস কী বলে তাঁরা তার কোনো খোঁজখবর রাখেন বলে মনে হয় না। অথবা, জানলেও চেপে যান।

এই ব্যাপারে প্রথম হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেন ভারতের প্রথম এবং সুদীর্ঘ সময়ের (১৯৫০-৬৩) অ্যাটর্নি জেনারেল, ভারতের প্রথম ল কমিশনের চেয়ারম্যান (১৯৫৫-৫৮), পদ্মবিভূষণ, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, মোতিলাল চিমনলাল শেতলবাদ। আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর ১৯৬৫ সালের এক বেতার বক্তৃতায় তিনি বলেন, “প্রকৃত অর্থে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা বোধ হয় ভুল হবে।” [Setalvad 1967, 20] তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে সংবিধান রচনা পরিষদে দু-দুবার এই শব্দটি ঢোকানোর প্রস্তাব উঠেছিল, দু-বারই তা সংখ্যাধিক্য ভোটে বাতিল হয়ে যায়। [Ibid, 21] আসলে এই শব্দটি সংবিধানের ভূমিকায় জায়গা পায় ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়, যখন ইন্দিরা গান্ধী তাঁর স্বৈরাচারী রাজকে সমাজতান্ত্রিক কথামালায় সাজিয়ে তুলছিলেন নানাভাবে। বোঝাই যায়, দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ তৈরি করার চাইতেও তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল নিজের এক প্রগতিশীল ভাবমূর্তি নির্মাণের দিকে। কেন না, সংবিধানে শব্দটির প্রবেশের কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখ সন্ত্রাসী ভিন্দ্রানওয়ালাকে ধীরে ধীরে পেছন থেকে মদত দিয়ে অকালি দলকে ভাঙার আয়োজন করতে থাকেন। অন্য দিকে সেই সন্ত্রাসকে দেখিয়ে দেশের অন্যত্র তিনি প্রচ্ছন্নভাবে নিজের জন্য এক হিন্দুপ্রীতির ছবি আঁকতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সারা দেশের বুকে সংসদীয় রাজনীতিকে এইভাবে খুল্লমখুল্লা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভরিয়ে তোলা সম্ভব হয় এই শব্দটির গম্ভীর সাংবিধানিক অস্তিত্বের মধ্যেই।

প্রয়োগের দিক থেকে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের সামনে জন্ম লগ্নেই একটা সুযোগ এসে পড়েছিল পাকিস্তানের সঙ্গে নিজের পার্থক্য তুলে ধরার। নতুন সংবিধান চালু হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। তার ঠিক এক মাস আগে, ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদল সাম্প্রদায়িক জঙ্গি হিন্দু কুচক্রী চারপাশে পুলিশ প্রহরা থাকা সত্ত্বেও শেষ রাতে বাবরি মসজিদের মধ্যে রাম-সীতা-লক্ষ্মণের মূর্তি ঢুকিয়ে রেখে আসে। পরদিন সকালে তারাই প্রচার শুরু করে দেয়, রামচন্দ্র নিজেই “জন্মস্থান” দখল নিতে চলে এসেছে। তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই পটেল। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন গোবিন্দবল্লভ পন্থ। তাঁর আর এক সহমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। এই সব বাঘা বাঘা নেতারা মসজিদ দখল ও অপবিত্র করার বিরুদ্ধে সেদিন অনেক গরম গরম কথা বলেছিলেন। আর আরএসএস তখন গান্ধী হত্যার দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত। কিন্তু ফৈজাবাদ জেলার জেলাশাসক ও রাজ্যের বিচারবিভাগ হিন্দু মৌলবাদীদের পক্ষ নিয়ে অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দেয় এবং হিন্দুদের পেছন দরজা দিয়ে ঢুকে রাম পূজার অনুমতি দিয়ে দেয়। কংগ্রেসের সমস্ত নেতাই তখন হাত গুটিয়ে বসেছিলেন। লক্ষ করে দেখলেই বোঝা যাবে, নব স্বাধীন পাকিস্তানের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন ভারতের পার্থক্য রইল শুধু এই জায়গায় যে ওরা যে কাজগুলো অত্যন্ত হৈ-হুল্লোর করে করতে পারে এবং করেও থাকে, ভারতে ঠিক সেই কাজগুলোই করা হয় কিঞ্চিৎ আড়াল আবডাল রক্ষা করে। যদিও, আজ সেই আড়ালটাও আর মৌলবাদীরা রাখতে চাইছে না বা পারছে না।

আরও উদাহরণ আছে।

স্কুলে ভর্তি হতে গেলে একটা সরকারি কাগজে আমাদের ধর্ম জাত ইত্যাদি লিখতে হয় (আজকাল অবশ্য এটা আর আবশ্যক থাকছে না)। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও তাই। আপনি ইতিহাস বিজ্ঞান সাহিত্য পড়বেন, তার সাথে আপনার কী জাত কী ধর্ম, তার সম্পর্ক কী? ইংরেজদের দেখানো পথেই এই স্বাধীন দেশে বেনারসে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আর আলিগড়ে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় টিকে রইল। এবং সেই দুটোই কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দিল্লির কায়দায় পশ্চিম বঙ্গে বামফ্রন্টের আমলেও মুসলিমদের জন্য আলাদাভাবে একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে মুসলিম প্রীতির নমুনা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। কলকাতার বুকে আজ অবধি হিন্দু হোস্টেলে মুসলিম ছাত্র বা বেকার হোস্টেলে হিন্দু ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করা গেল না। ইংরেজদের রেখে যাওয়া সেই উত্তরাধিকার আমরা আজও আমাদের সেক্যুলার কাঁধে দিব্যি বহন করে চলেছি। এমন নয় যে কোথাও এই ঐতিহ্য আমরা ভাঙতে পারিনি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রহোস্টেলগুলিতে এটা সম্ভব হয়েছে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলিতে এটা সম্ভব হল, বিশ্বভারতীতেও এটা করা সম্ভব হয়েছে। শুধু এখানে, ভারতীয় রেনেশাঁসের ভেনিস খোদ কলকাতার বুকে কেন এটা সম্ভব হল না—কেউ কি কেউ কখনও ভেবে দেখেছেন? সত্যিকারের অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলে কোনো দেশে এইসব জিনিস সম্ভব হয়?

দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি সংখ্যালঘু অধিকারের নামে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। এটার দ্বারা আসলে সংখ্যালঘুদের কিছু বাড়তি অধিকার দেবার নামে তাদের ধর্মীয় পশ্চাদপদতাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে মুসলমান জনসাধারণকে চিরকালের জন্য জাতীয় মূলস্রোত থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে, প্রান্তবাসী করে দেওয়া হয়েছে। অথচ, যদি দেখা যায়, ইসলামি শরিয়তে সত্যিই এমন কিছু বিধিবিধান আছে যা আধুনিক সমাজ নির্মাণেও কাজে লাগতে পারে (থাকতেই পারে, আমার এটা ভালো করে জানা নেই), তাহলে তা সাধারণভাবে সকলের জন্য গ্রহণ করলেও তো ভালো হত। ভারতের সংবিধান রচয়িতারা ইংল্যান্ড, আমেরিকা, রাশিয়ার সংবিধান বা সাংবিধানিক প্রকরণ থেকে অনেক কিছু যেমন নিয়েছেন, তেমনই ভালো বুঝলে ইসলামি শাসনপদ্ধতির প্রকরণ থেকেও কিছু জিনিস নিতে পারতেন। তাতে অন্তত সেক্যুলারপন্থীদের তো আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং দেশের সামনে শুভবুদ্ধি ও যুক্তিপরায়ণতার একটা সুন্দর দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেত। আসলে ভালোমন্দ বিচার তো নয়, মুসলমানকে মুসলমান করে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসাবেই এগুলো যে করা হয়েছে তা আর কতজন এপর্যন্ত ভেবে দেখেছেন?

এর ফলে যে হিন্দু বা অপরাপর নারীদের সাথে মুসলিম নারীদের অধিকারের তারতম্য ঘটে গেল তা তাঁরা খেয়াল করেননি। মুসলিম আইনে পুরুষের বহুবিবাহ এর ফলে সংবিধান অনুমোদিত ও আইনসিদ্ধ হয়ে যাওয়াতে হিন্দু ও মুসলিম নারীর অধিকারের মধ্যে বিপুল অসাম্য এসে গেল, সংবিধানের অন্যত্র প্রদত্ত নারী-পুরুষ মৌলিক সমানাধিকারের ধারার সাথে মুসলিমদের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর অধিকারের বৈষম্যের বিরোধ হয়ে গেল—এগুলোও তাঁরা ধরতে পারেননি। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও মুসলিম নারীদের অধিকার হিন্দু বা অপরাপর সম্প্রদায়ের নারীদের তুলনায় সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল; আবার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের প্রশ্ন আরও একটা জায়গায় (বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে) ধাক্কা খেল। ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সমস্ত ধর্মকে সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়াবার যে ভ্রান্ত সাংবিধানিক নীতি সেদিন গৃহীত হয়েছিল, তারই জের হচ্ছে এই সমস্ত বিচিত্র বিধান। ইন্দিরা গান্ধী যখন সংবিধানের ভূমিকায় এই শব্দটি জুড়ে দিলেন, তখন তাঁরও মনে হয়নি যে সংবিধানের মধ্যেই পরস্পর বিরোধী এই সব বিষম বিধানগুলিকে নিয়েও তাঁর কিছু করার আছে। আসলে শব্দই তো ব্রহ্ম। বাকি সবই মায়া। অত ভেবে কাজ কী?

এই দুর্বলতা আমাদের রাজনৈতিক জীবনকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। নির্বাচনের প্রার্থীরা সাধু বাবা-মায়েদের পদসেবা করেন, চরণামৃত পান করেন, গণ মাধ্যমে তার ব্যাপক প্রচার হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রচুর ঢাকঢোল পিটিয়ে তিরুপতি মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে আসেন, মাথা ন্যাড়া করে বহুমূল্য চুল দান করে ফেলেন, গণমাধ্যমে তার তড়িৎ-খবর হয়। বড় বড় নেতারা দুই হাতের আট আঙুল ভর্তি করে রঙ-বেরঙের আংটিপাথর পরে ঘুরে বেড়ান। এমএলএ এমপি প্রার্থী পদের ফর্ম জমা দেওয়া, জিতলে শপথ গ্রহণ—সবই তাঁরা করেন নিজেদের আস্থাভাজন বিশিষ্ট জ্যোতিষীর পরামর্শমতো পাঁজিপুঁথি শুভাশুভক্ষণ দেখে। তারও তুমুল প্রচার হয়। কী করে এগুলো একটা আধুনিক সমাজে সম্ভব হয়?
একই দেশের অনেকগুলো রাজ্যে (যেমন, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ইত্যাদি) ধর্মের নামে গোবধ আইনের দ্বারা নিষিদ্ধ। এইভাবে দেশেরই এক বিরাট সম্প্রদায়ের মানুষদের তাদের স্বাভাবিক খাদ্য উৎস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখানে যে সংখ্যালঘুর খাদ্যাভ্যাস (জীবন-ধারণ)-এর মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত সাংবিধানিক ধারাগুলি লঙ্ঘিত হল, তা আর কেউ খেয়াল করছে না। হয়ত এরই জবাবি নিদান হিসাবে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক শুক্রবার বেলা বারটা থেকে দুটো পর্যন্ত শুধু যে ক্যান্টিনগুলি বন্ধ থাকে তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত জলের লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে ক্যাম্পাসের ভেতরে কোথাও কোনো চায়ের দোকানও ওই দু ঘন্টা চলতে না পারে। এই সবও যে বিপরীতভাবে অমুসলিম (বা এমনকি ধর্মে অবিশ্বাসী মুসলিম) পরিবারের ছাত্রছাত্রী কর্মচারি এবং শিক্ষকদের (এবং সেই সময় কোনো কাজে ক্যাম্পাসে আসা অভিভাবক-অতিথিদের) সংবিধান-প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ভঙ্গ করার সামিল, তাও আর কেউ ভেবে দেখছে না। এই সব তথ্যের নিরিখে মাঝে মাঝেই আমার খুব সন্দেহ হয়, আমরা ভারতবাসীরা আজও কোন যুগে পড়ে আছি। নিজেদের চার বছর ধরে অনেক ভাষণবাজি তক্কাতক্কি করে বানানো একটা ইয়াব্বড় দলিলের এক অধ্যায়ের নির্দেশাবলির সাথে আর এক অধ্যায়ের হুকুমনামার নিজেরাই খটামটি লাগিয়ে দিই। এবং সেটা কখনও বুঝে উঠতেই পারি না। ধারার পরা বদলায়, সংশোধন হয়, কিন্তু সেই খটাখটির জায়গাগুলো বহাল তবিয়তে থেকে যায়!

আর আমি আবার বলছি—এই সমস্ত পশ্চাদপদ রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল বিধানগুলির কোনোটাই সঙ্ঘ পরিবারের তত্ত্বাবধানে বা তাদের হাতে সম্পন্ন হয়নি। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলির নেতৃত্বে অধীনে ও উদ্যোগেই এই সব ভ্রান্ত ও অন্যায় পদক্ষেপ বহু দশক ধরে ধাপে ধাপে নিষ্পন্ন হয়ে চলেছে। আরএসএস কোম্পানি শুধু এর থেকে যথাযোগ্য ফায়দা নিতে পেরেছে এবং নিয়ে যাচ্ছে।

[৭] ইতিহাস ও সাম্প্রদায়িকতা

আজ আমরা বামপন্থী মার্ক্সবাদী ধর্মনিরপেক্ষ যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক সকলেই বিজেপি-র শিক্ষানীতি নিয়ে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। প্রচুর সমালোচনাও করছি। তার যথার্থ কারণও আছে। কিন্তু—এই জায়গায় ঢোকার আগে আমি একটা প্রশ্ন তুলতে চাই—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এতকাল, বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে, জওহরলাল নেহরু ইন্দিরা গান্ধীর দীর্ঘ আমলে, সব কিছু ঠিকঠাক ছিল? সেখানে কি জাতীয় ইতিহাসের সমস্ত প্রকরণগুলোকে আগে যে ত্রুটিগুলির কথা আমি উল্লেখ করেছি তার থেকে মুক্ত করা হয়েছিল?

এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, না।

এযাবতকাল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ইংরেজদের দিয়ে যাওয়া উত্তরাধিকার প্রায় একশ শতাংশই বহাল ছিল। আমাদের দেশের স্কুল স্তরের ছাত্ররা ভূগোলের সমস্ত পাঠ নেয় ক্লাশরুমে বসে বসে। তারা মাঠে দাঁড়িয়ে পূর্ব-পশ্চিম চেনে না, বায়ুপ্রবাহের দিক নির্ণয় শেখে না, মেঘ চিনতে শেখে না, কোনো গ্রহ তারা—যেগুলি খালি চোখেই প্রায় চেনা যায়—চিনতে শেখে না। আমাদের দেশের ছাত্রদের মধ্যে গণিতের সম্পর্কে প্রায় একটা জন্মগত ভীতি কাজ করতে থাকে। আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে হাতেকলমে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করে দেওয়া হয় না। আমাদের ছাত্রদের মধ্যে ভাষা শিক্ষার প্রকরণ প্রায় মধ্য যুগের পদ্ধতিতেই পড়ে আছে। সারা পৃথিবীতে ভাষা শিক্ষা নিয়ে, বিদেশি ভাষা শিক্ষা নিয়ে যে এত পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে, গবেষণা চলছে—তার সামান্যও কোনো ছাপ নেই। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে একটা চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক অবৈজ্ঞানিক ভাষানীতি সরকারিভাবে গৃহীত ও স্কুলে স্কুলে প্রযুক্ত হয়ে চলেছে। এইগুলোর কোনোটাই কিন্তু বিজেপি এসে চালু করেনি। করার মতো অবস্থায় এতকাল তারা ছিলই না। তারা এগুলো আজ তৈরি অবস্থায় পেয়েছে এবং এখন তার সদ্ব্যবহার করতে চলেছে।

আমাদের দেশে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ইতিহাসে শিক্ষায়। সঙ্ঘ পরিবারের সরাসরি হস্তক্ষেপের বহুকাল আগে থেকে সিলেবাস এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে ইংরেজদের শেখানো কথা মুখস্থ করেই আমরা স্বাধীন ভারতেও ইতিহাস বইতে একপেশেভাবে পড়ে আসি: মুসলিম রাজত্বে ধারাবাহিকভাবে হিন্দুদের উপরে ধর্মীয় নির্যাতন করা হয়েছে, হাজার হাজার মন্দির ভেঙে দেওয়া হয়েছে, হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ ভারতীয় যখন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়ে ওঠে, এই ধারণাগুলি তার মনে প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতো কাজ করতে থাকে। তার পরেও যদি সে মুসলমানদের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখায় সে তার নিতান্তই উদারতা। কিন্তু যে তথ্যগুলি তাকে কখনও শেখানোই হয় না আমি এখানে তার কিছু কিছু তুলে ধরতে চাই:

১) মুসলমান রাজত্বের অনেক আগে থেকেই ভারতে দেবস্থান ভাঙা এবং দখল করার কাজ হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেরাও করে এসেছে। হাজার হাজার বৌদ্ধমঠ এক সময় হিন্দুরা দখল করে মন্দির বানিয়ে ফেলেছে। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/২৮] এমনকি, পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরও এক সময় একটা বৌদ্ধমঠ ছিল। [বিবেকানন্দ ১৯৮৬; ৬/১২৯, ৯/৭২] স্বামী বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আমি প্রথম এই তথ্যটি পাই। এবং হিন্দু রাজারা শুধু যে বৌদ্ধমঠ ভেঙেছেন বা দখল নিয়েছেন তাই নয়, তারা অনেকেই হিন্দু মন্দিরও ভেঙেছেন, হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি চুরি বা লুট করে এনে বিলাসিতার পাথেয় সংগ্রহ করেছেন। [Sharma 1990] সঙ্ঘপরিবার রামমন্দির বা মধ্য যুগের ইতিহাস নিয়ে বেশি খোঁচাখুঁচি না করলে আজও হয়ত এই সব তথ্য আমাদের অজানাই থেকে যেত। আমি বরং বিজেপি কোম্পানিকে ধন্যবাদ দিই, আমাদের দেশের অন্ধকারে পড়ে থাকা এই সব তথ্য আমাদের জানতে সাহায্য ও প্ররোচিত করার জন্য।

২) এই প্রশ্নটা নিয়ে কতজন ভেবেছেন, যে দেশে বুদ্ধদেবের জন্ম, বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি, প্রায় সারা এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সেই ধর্ম কেন সেই ভারতের বুকেই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রশ্নটা অন্তত উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু না তিনি, না অন্য কেউ এই নিয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান চালিয়েছেন। কেন করেননি তার আমি কেবলমাত্র আন্দাজ করতে পারি: সন্ধানের ফলটা হয়ত অনেকের কাছেই ঠিক সুস্বাদু লাগবে না। দীনেশ চন্দ্র সেন বলেছেন, বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন করার জন্য শঙ্করাচার্য নাকি সঙ্গে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে ঘুরতেন। [সেন ১৯৩৫, ১/৯; বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৯/৭২] গয়ায় “বোধিদ্রুম” নামক যে বোধিবৃক্ষের নিচে বসে গৌতম “বুদ্ধ” হয়েছিলেন বলে বৌদ্ধদের বিশ্বাস, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কর আমলে তার গোড়া শুদ্ধ কেটে ফেলা হয় (এখন সেখানে যে গাছটি দেখা যায়, সেটা অনেক পরে শ্রীলঙ্কা থেকে চারাগাছ এনে বসানো হয়েছে)। [অপূর্বানন্দ ১৯৭৮, ৭২-৭৩] বৌদ্ধ পুঁথিগুলি এই দেশ থেকে সম্পূর্ণ লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পূজারিণী’ কবিতায় লিখেছেন,

“অজাতশত্রু রাজা হল যবে পিতার আসনে আসি’,
পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে,
মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে,
সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে বৌদ্ধ-শাস্ত্র-রাশি।”

গুপ্ত যুগে ইলোরা-অজন্তার মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পাথর কেটে কেন বৌদ্ধদের সঙ্ঘারাম বা আশ্রয় বানাতে হয়েছিল, এরও উত্তর একজন আধুনিক ইতিহাসবিদকে খুঁজে দেখতে হবে। এবং মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধদের ভারত ছাড়া করার কাজটাও বিজেপি-র লোকেরা এসে করেনি। মুসলিমদেরও ভারতে আগমনের অন্তত পাঁচশ বছর আগে এই কুকম্মটি প্রায় সুসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।

৩) এটা ঠিক যে মুসলিম আমলে বেশ কিছু হিন্দু মন্দির ভাঙা হয়েছে। সেই ভাঙা মন্দিরের অনেকগুলিরই অবশেষও আজও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা হল—অধিকাংশ ইতিহাসবিদ চেপে গেছেন এই সত্যটা যে অসংখ্য মন্দির গড়ে দিয়েছে বা গড়তে সাহায্য করেছে মুসলিম শাসকরা—টাকাপয়সা জমি দান করে, করমুক্তি দিয়ে ও অন্যান্য ভাবে। অযোধ্যা সহ ভারতের যেখানে যত পুরনো মন্দির এখনও টিকে আছে, তার সবই ত্রয়োদশ শতাব্দ বা তারপরে নির্মিত হয়েছে। এমনকি যে অওরঙজেবকে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে তীব্র হিন্দুবিদ্বেষী বলে চিত্রিত করা হয়ে থাকে, গোটা উত্তর এবং পূর্ব ভারতে তাঁরই দানে ও সহায়তায় অনেকগুলি মন্দির গড়ে উঠেছিল। [Pandey 1984, 41-56] অধ্যাপক যদুনাথ সরকার থেকে শুরু করে অধিকাংশ ইতিহাস লেখক তাঁর মন্দির ভাঙার কথাই শুধু প্রচার করে গেছেন, মন্দির গড়ে তোলার একটা ঘটনারও স্বীকৃতি দেননি। এই তথ্যও কোথাও পড়ানো হয় না যে টিপু সুলতান তাঁর অতি ক্ষুদ্র রাজ্যে অন্তত ১৫৬টি মন্দির হিন্দুদের জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন। [Ibid, 38]

৪) মন্দির ভাঙা, দেবমূর্তি চুরি ইত্যাদি ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কোনটা ধর্মীয় বিদ্বেষের ঘটনা, আর কোনটা নিছক অর্থলোভ জনিত—তাও বিশ্লেষণ করে দেখা হয়নি। আমাদের ইতিহাস বইতে ধরেই নেওয়া হয়েছে, মুসলিম শাসকরা যখন হিন্দু মন্দির ভেঙেছে, তা ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রসূত। তার পেছনে আর কোনো কারণ থাকতে পারে না। অথচ, অওরঙজেব যে গোলকুণ্ডায় গিয়ে লুকিয়ে রাখা রাজস্ব আদায় করতে মসজিদও ভেঙে দিয়েছিলেন [Ibid, 51], সেই খবরটি ইতিহাস বইপত্রে থাকে না। এটাও কেউ ভেবে দেখেননি, নাদির শাহ গুজরাতের সোমনাথ মন্দির যে এগার বার আক্রমণ করেছিলেন, তা কিসের আশায়। নিছক ধর্মীয় বিদ্বেষে ভাঙতে হলে তো একবারই যথেষ্ট ছিল। আসলে সেই সব মন্দিরে রাজ্যের সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে বছর বছর যে কত সোনা মজুত করা হত, তার কি কখনও হিসাব করা হয়েছে? খোঁজ করা হয়েছে কি, এই অঢেল সম্পদ আসত কোত্থেকে এবং কীভাবে?

৫) ভারতবর্ষের বহু বড় বড় মন্দিরের ইট-পাথরের জাঁকজমক, স্থাপত্যের ঠাটবাটের তলায় চাপা পড়ে আছে এদেশের হাজার হাজার ইতিহাস-বর্জিত নারীর নীরব অশ্রু-রক্ত-কান্না। সেই সমস্ত নারী—যাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে জোর করে অথবা টাকাপয়সার লোভ দেখিয়ে তুলে এনে মন্দিরের দেবদাসী বানানো হত, তারপর চলত দেবতার নামে তারই ইহজাগতিক প্রতিনিধি পাণ্ডা পুরোহিত রাজা-জমিদারদের তরফে জীবনভর যৌন নির্যাতন। পুরুষতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক পারমার্থিক মহান হিন্দু ধর্ম তখন আত্মপ্রকাশ করত সামাজিকভাবে শংসিত বা অনুমোদিত ধর্মীয় পুরুষতন্ত্র রূপে। শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর “দেনা-পাওনা” উপন্যাসে এই ধর্মীয় কদাচারের একটুখানি আভাস মাত্র দিতে পেরেছিলেন।

এমনকি, এই রকম একজন হিন্দু রমণী কচ্ছের রাণির উপর হিন্দু মন্দির সেবকদের হীন লাঞ্ছনার ঘটনাতে ক্রুদ্ধ হয়ে এবং সহযোগী হিন্দু রাজাদের অনুরোধেই যে অওরঙজেব কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের একটা অংশ ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়ে দিয়েছিলেন [Ibid, 51; Sitaramayya 1946, 177-78], আমাদের ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তকগুলি সেই সামান্য তথ্যটিও জানাতে ভুলে যায়। কাকে বাঁচাতে? সাধে কি আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কাশীতে বাবা-মাকে দেবদর্শন করাতে নিয়ে গিয়েও নিজে একটাও মন্দিরের দরজায় পা রাখতে রাজি হননি!

৬) ভারতবর্ষের সমস্ত হিন্দু মন্দিরে হিন্দুদের সংখ্যালঘু তথাকথিত উচ্চবর্ণের লোকেরা অর্থ ও প্রতিপত্তির জোরে সংখ্যাগুরু তথাকথিত নিম্নবর্ণের লোকেদের কখনও ঢুকতে দিত না, গ্রামের প্রধান রাস্তা দিয়ে চলতে দিত না, ভালো গভীর কুঁয়ো বা পুকুর থেকে জল তুলতে দিত না, অস্পৃশ্য বলে গ্রামের বাইরে সবচাইতে খারাপ জায়গায় বসবাস করতে বাধ্য করত [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/২৬২]—এই সব তথ্য কোনো ইতিহাস বইতে লেখা থাকে না। সমস্ত প্রাচীন পবিত্র হিন্দু ধর্মশাস্ত্র—বেদ উপনিষদ ব্রহ্মসূত্র স্মৃতিশাস্ত্র রামায়ণ মহাভারত গীতা—ইত্যাদিতে যে এই ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিভেদপ্রথার সপক্ষে নির্লজ্জ প্রচার চালানো হয়েছে, এই বর্বর প্রথা যে কোনো ভালো প্রথার পরবর্তীকালে বিকৃত রূপ নয়, আদিতেই সে এই জঘন্য বিভেদ-বিদ্বেষ সঙ্গে নিয়ে প্রচলিত হয়েছিল—কোনো ইতিহাস গ্রন্থ তা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের জানবার সুযোগ করে দেয়নি। তাদের পড়ানো ও শেখানো হয়—সমস্ত হিন্দুশাস্ত্রগুলি নাকি প্রথম থেকেই প্রেম ভক্তি বৈরাগ্য অহিংসা সহিষ্ণুতা সকল-নরে নারায়ণ-দর্শন আত্মা-পরমাত্মার মহামিলন এবং উচ্চতম আধ্যাত্মিক ভাবেরই একেবারে খাঁটি নলেন গুড়!

৭) আমাদের দেশে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দকে নিয়ে অনেক গর্ব করা হয়। অথচ যে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরে রামকৃষ্ণ পূজার্চনা করেছেন, বিবেকানন্দের মতো শিষ্য সংগ্রহ করেছেন, সেই মন্দির একদিন হিন্দু মাতব্বররাই গড়তে সাংঘাতিক বাধা দিয়েছিল। জমিদাররা জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে চায়নি, ব্রাহ্মণরা সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে বা সেখানে পূজা করতে যেতেও রাজি হয়নি। কেন না, মন্দিরের প্রতিষ্ঠাত্রী রাণি রাসমনি ছিলেন হিন্দু শাস্ত্রর মাপকাঠিতে শূদ্রাণি, জাতে কৈবর্ত। তাঁর নাকি মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকারই নেই। তাঁকে জমি কিনতে হয়েছিল একজন ইংরেজের কাছ থেকে, মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার তিনি পেয়েছিলেন একজন ব্রাহ্মণকে মন্দিরস্বত্ব নিঃশর্তে দান করে। নেহাত গরিব না হলে গদাধর রামকৃষ্ণও হয়ত সেখানে পুজো করতে আসতেন না। পাঠ্যপুস্তকে, সহায়ক বইপত্রে, এমনকি রামকৃষ্ণ মিশনের বইপত্রেও দক্ষিণেশ্বর নিয়ে কত কাব্যভাব ভক্তিভাব ব্যক্ত হয়; কিন্তু হিন্দু ধর্মের মাতব্বরদের সেদিনকার এই কুৎসিত আচরণের তথ্যগুলি কেউ কোথাও লেখে না। বর্তমান প্রজন্মকে তারা এই সব সত্য জানতে দিতে চায় না।

৮) মোগল যুগে দক্ষিণ-পশ্চিম মারাঠা সাম্রাজ্য এবং উত্তর ভারতে শিখ শক্তির অভ্যুত্থানকে স্রেফ মুসলিম বাদশাহদের সাথে সংঘর্ষের কারণে প্রচুর গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। “জাতীয় গৌরব” হিসাবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে। অথচ, বাংলাদেশে শিবাজি ও তাঁর প্রধান অনুচর ভাস্কর পণ্ডিতের বাহিনী বারবার এসে যে লুঠতরাজ চালাত, তাতে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বর্গি ডাকাত হিসাবে। [রায় ১৯৮৯, ১১শ] আর এই দুই রাজশক্তি সম্পর্কে এমনকি বিবেকানন্দ পর্যন্ত বলেছিলেন, “মহারাষ্ট্র বা শিখ সাম্রাজ্যের উত্থানের প্রাক্কালে যে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণ প্রতিক্রিয়াশীল। . . . মোগল দরবারেও তদানীন্তনকালে যে প্রতিভা ও বুদ্ধিদীপ্তির গৌরব ছিল, পুণার রাজদরবারে কিংবা লাহোরের রাজসভায় বৃথাই আমরা সেই দীপ্তির অনুসন্ধান করে থাকি। মানসিক উৎকর্ষের দিক থেকে এই যুগই ভারত-ইতিহাসের গাঢ়তম তমিস্রার যুগ এবং এই দুই ক্ষণপ্রভ সাম্রাজ্য ধর্মান্ধ গণ অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি স্বরূপ ছিল, . . .।” [বিবেকানন্দ ১৯৮৬, ৫/৩০৭]

৯) আকবরের সাথে রাণা প্রতাপের ও অওরেঙজেবের সঙ্গে শিবাজির যুদ্ধ ছিল বড় ও ছোট দুই সামন্তী শাসকের পারস্পরিক রাজ্য রক্ষা ও বিস্তারের সংঘর্ষ; অথচ সেগুলিকে আমাদের ইতিহাসের বইতে দেখানো হয়ে এসেছে বিদেশি বনাম জাতীয় শক্তির সংগ্রাম হিসাবে। আর এই বিদেশি মানে হল মুসলমান এবং জাতীয় মানে হল হিন্দু। অথচ দেশ জাতির ভারতীয়ত্ব-সূচক উপলব্ধি আমাদের ধারণায় এসেছে ঊনবিংশ শতাব্দে, সিপাহি বিদ্রোহের সামান্য পরে। তার আগে পর্যন্ত দেশ মানে ছিল শুধুই নিজের গ্রাম; তার বাইরে গেলেই ভিন্‌দেশি, পরদেশি। বিদেশ-বিভুঁই। তাছাড়া, আকবর এবং অওরঙজেব—উভয়েরই সেনাবাহিনীতে একটা বড় অংশই ছিল হিন্দু। বস্তুত, মোগল সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল রাজপুত রাজাদের অধিকাংশের সমর্থন ও সাহায্য নিয়ে। একই ভাবে, রাণা প্রতাপ ও শিবাজির বাহিনীতেও অনেক সেনা এবং সেনাপতিই ছিল মুসলমান। এদের মধ্যে যুদ্ধ যা কিছু হয়েছে তা নিজ নিজ শাসনাধীন সামন্তী এলাকা রক্ষা ও বিস্তার নিয়ে। এর সাথে হিন্দু মুসলমানের কোনো সাম্প্রদায়িক বা অন্য কোনো ধরনের স্বার্থ জড়িত ছিল না।

আরও অনেক কিছু . . .।

[চলবে]

তথ্যসূত্র

১। স্বামী অপূর্বানন্দ (১৯৭৮), আচার্য শঙ্কর; উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৭৮।

২। স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৬), স্বামীজীর বাণী ও রচনা; খণ্ড ৫, ৬, ৯, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।

৩। অশোক মুখোপাধ্যায় (২০০৪), মন্দির-মসজিদ বিসম্বাদ; বোধোদয় মঞ্চ, কলকাতা।

৪। হেমেন্দ্র কুমার রায় (১৯৮৯), বর্গি এল দেশে; রচনাবলি, ১১শ খণ্ড; এশিয়া পাবলিশিং কোং, কলকাতা।

৫। দীনেশ চন্দ্র সেন (১৯৩৫), বৃহৎ বঙ্গ (দুই খণ্ড); ১ম খণ্ড, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা।

৬। D. P. Bhattacharya (2014), “BJP gains in polls after every riot, says Yale study”; Economic Times (e-version); 5 December 2014. http://m.economictimes.com/news/politics-and-nation/bjp-gains-in-polls-after-every-riot-says-yale-study/articleshow/45378840.cms

৭। J. S. Grewal (1970), Muslim Rule in India: The Assessment of British Historians; Oxford University Press, Oxford.

৮। H. S. Hodiwala (1939), Studies in Indo-Muslim History; Bombay.

৯। A. Mirsab (2014), “Burdwan Blast: Loopholes in NIA’s investigation, lead NGO to call for independent probe by SC judge”; Two Circles: mainstream news of the marginalized (e-magazine), 3 December 2014. http://twocircles.net/2014dec03/1417616083.html#.VJgXscRDb4

১০। B. N. Pandey (1984), Islam and Indian Culture; Khuda Boksh Memorial Trust, Patna.

১১। Ajit Sahi (2014), “That House in Burdwan”; Outlook (e-version), 8 December 2014. http://www.outlookindia.com/magazine/story/that-house-in-burdwan/292735

১২। M. C. Setalvad (1967), Secularism (Patel Memorial Radio Lecture 1965); Publication Division, Government of India; New Dellhi.

১৩। Ram Saran Sharma (1990), Communal History and Rama’s Ayodhya; People’s Publishing House, Delhi.

১৪। Pattabhi Sitaramayya (1946), The Feathers and the Stones; Padma Publications, Bombay.

[1408 বার পঠিত]