প্রাচীন ভারতবর্ষ ও আমাদের যেটুকু অহঙ্কার

সম্রাট আকবরকে ইসলামি পন্ডিতেরা ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী সহজাত বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দেখালে তিনি বলেছিলেন,

“ যুক্তিবিচারের অনুসরণ ও গতানুগতিকতা বর্জনের প্রয়োজন এমন জাজ্বল্যমানভাবে প্রতীয়মান যে, তার সপক্ষে সওয়াল করারও কোনো প্রয়োজন নেই। পরম্পরার অনুসরণই যদি সঠিক পন্থা হত তাহলে পয়গম্বরেরাও পূর্বসূরীদের অনুসরণ করেই ক্ষ্যান্ত হতেন, কোনো নতুন বার্তা নিয়ে আসতেন না”।

আবার “সৎকর্ম পরজন্মের সুফল লাভের জন্যে করা উচিত” – হিন্দু মুনিঋষিদের এ ধরণের মতেরও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন সম্রাট আকবর,

“ আমার মতে, পুন্যকর্ম সাধনের সময়ে মৃত্যুর কথা মনে আসাই উচিত নয়। এতে কোনও আশা বা আশঙ্কার কথা না ভেবেই, কেবল ভাল বলেই শুভ বা সৎ কাজ করা উচিত”।

আবার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করার পক্ষে সম্রাট আকবরের দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন,

“ যে নির্বোধ মনে করে শারীরিক কসরৎ করলেই ঈশ্বরের উপাসনা করা যায়, সে পথটি বন্ধ করে দিলে তার ঈশ্বরকে স্মরণ করাই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। এটা পরমতসহিষ্ণুতা ও বহুসংস্কৃতিবাদের বিরোধী”।

হিন্দুদের বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে সম্রাট আকবর বলেছিলেন, “ যে ধর্মে বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ সেখানে কষ্ট আরও বেশী”। ইসলামে নারীদের সম্পত্তি ভাগের সম্বন্ধেও আকবর বলেছিলেন, “ মুসলিম ধর্মে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে কন্যার অংশ কম, যদিও দুর্বলতার কারণে কন্যার অংশ বেশী হওয়া উচিত ছিল”।

এ সকল কথা সম্রাট আকবর বলেছিলেন ১৫৯০ সালের দিকে ভারতবর্ষে , যখন শাস্ত্রবিরোধী মত প্রকাশের জন্য জিয়োর্দানো ব্রুনোকে রোমের ক্যাম্পো দেই ফিয়োরতে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা হয়েছিল।

এত বছর পরে আজ কোথায় আমাদের দেশ তথা ভারতবর্ষ আর কোথায় ইউরোপ?

এ পর্যন্ত লেখাটি শেষ করা যেত। কিন্তু একজন মানুষের কথা এখানে উল্লেখ করা আবশ্যিক,যাঁর বই থেকেই এ মহান উক্তিগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি আমাদের এ উপমহাদেশের এক কৃতি সন্তান, অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। তাঁর ইংরেজিতে লেখা বই “ The argumentative Indian”-যার বাংলা সংস্করণের নাম “ তর্কপ্রিয় ভারতীয়”। এ গ্রন্থ থেকেই আকবরের উক্তিগুলি নেয়া হয়েছে।

অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের এ গ্রন্থটি প্রায় ১৬টি ঢাউস আকারের প্রবন্ধসংকলন। প্রতিটি প্রবন্ধের আকার বিবেচনা করা যায় এর পেছনের প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি টীকা গ্রন্থের উল্লেখ থেকেই। তেমনি কিছু গ্রন্থের কথা অধ্যাপক অমর্ত্য সেন উল্লেখ করেছেন সম্রাট আকবরের সময় বর্ণনায় যেমন, শিরিন মুসভির “ Episodes in the Life of Akbar: Contemporary Records and Reminiscences” কিংবা মোহাম্মদ আতাহার আলীর “ The perception of India in Akbar and Abul Fazl” ইত্যাদি।

ষোড়শ শতকের বাংলার মুসলিম শাসক সম্রাট আকবরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও বহু ধর্ম কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাস্তিকতাকে উৎসাহ দেয়াসহ এ সকল কথা আমাদের ইতিহাসের বইতে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে বর্ণিত হয়নি। শুধুমাত্র ভাসাভাসা ভাবে ‘দ্বীন-এ ইলাহি” কিংবা “তারিখ-ই-ইলাহি ( যা বাংলা সনের সাথে সম্পর্কিত বিধায়” খন্ডিতভাবে উঠে এসেছে।

অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বাংলার ইতিহাসের সে অলিখিত কথাগুলো বিশ্বসাহিত্যের নানা গ্রন্থ ও তথ্য-উপাত্ত ঘেটে তাঁর প্রতিটি প্রবন্ধ তুলে এনেছেন।
শুধু কি সম্রাট আকবরের কথা? প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাসের বাঁক থেকে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন গৌরব,গর্ব ও অহংকারের সাথে সাথে সংহতিও বহু-সংস্কৃতির নিদর্শনকেও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় স্থুলতার বাইরেরও যে আরেকটা বহুত্ববাদ ও আধুনিক সংশয়বাদের প্রবনতা ছিল সেটাকেই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন গুরুত্ব দিয়েছেন।

এ প্রসংগে বেদ, রামায়ণ, মহাভারতসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকেও তিনি আলোকিত অংশগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বর্ণনা করেছেন। উদাহরণ হিসেবে সম্রাট অশোক কিংবা আকবরের কথা বলা যায়।

বেদে শুধু যে স্তোত্র ও ধর্মীয় প্রার্থণা ছিল না, ছিল নানা তার্কিকের কাহিনি বর্ণনা, ছিল সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সংশয়।প্রশ্ন ছিল পৃথিবী সৃষ্টি নিয়ে; “ কেউ কি একে গড়েছিলেন, না কি এটি নিজে নিজেই উঠে এসেছিল” কিংবা “ এমন কোনও ঈশ্বর কি আছেন যিনি জানেন প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল?”

এ সকল কথা কিন্তু বেদের বিভিন্ন শ্লোকে ছিল সেই দুই সহস্র বছরের অধিককাল আগে। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন এ সংশয় ও প্রশ্নবাদী ঐতিহ্যের কথা তুলে এনে বলতে চেয়েছেন যে, সংশয়বাদ ও যুক্তিবাদের মাধ্যমেই ভারতবর্ষ এগিয়েছে আজকের এ সময় পর্যন্ত।

রামায়ণের চরিত্র “ভগবানের অবতার” রামকে দেবতা মেনে যাঁরা অন্য ধর্মের লোকের উপাসনালয় ধ্বংস করেন,তাদের উদ্দেশ্যে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, রামায়ণের মহাকাব্যিক নায়ক রামেরও দুর্বলতা দোষ আছে, যার মধ্যে অন্যতম সীতার বিশ্বাসপরায়ণতা নিয়ে সন্দেহ লালন করা।

রামায়ণেও রামের সমালোচনা আছে, আছে রামকে কাজকর্মে “নির্বোধ” আখ্যা দেয়া জাবালির কাহিনিও। যদিও জাবালি চাপের মুখে তাঁর বক্তব্য তুলে নেন কিন্তু তার আগেই তিনি বিশদ বলেছিলেন,

“ না পরলোক বলে কিছু আছে, না আছে সেখানে পৌঁছবার জন্য কোনও ধর্মীয় আচরণ”।

জাবালির আরও কিছু উক্তি অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তুলে ধরেছেন যেমন,

“ শাস্ত্রে দেবতার পূজা, বলি, দান ও শাস্তির যে বিধানের কথা বলা হয় সেগুলি কিছু চালাক লোকের তৈরি করা যাতে এগুলির সাহায্যে তারা অন্য লোকেদের উপর শাসন চালাতে পারে”।

অধ্যাপক অমর্ত্য সেন গ্রন্থটির ভূমিকায় বলেছেন,

“ একটি বহুল প্রচারিত ধারণা আছে যে ভারতবর্ষ হচ্ছে ধর্মের দেশ, বিনাবাক্যে মেনে নেওয়া বিশ্বাস ও প্রশ্নহীন ভাবে পালন করা ধর্মাচরণের দেশ।…অথচ এর বিপরীতে একটি বৃহৎ ও মতবৈচিত্র্যপূর্ণ ভারতবর্ষকে পরিচিত করা খুবই প্রাসংগিক”।

আর সেই প্রাসংগিকতা থেকেই অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ভারতবর্ষের একটি প্রগতিপন্থী ও যুক্তির বিস্তৃতিময় আত্মপরিচয়কেই তুলে এনেছেন। অর্থনীতি ও ধর্মসহ নানা বাতাবরণের লক্ষণরেখায় বহুধাবিভক্তি আজকের সমাজে আমাদের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ অহঙ্কারের সকল দিগন্ত উন্মোচন করা গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়-আবশ্যিকও বটে।
।। মার্চ ২,২০১৭।।

About the Author:

মুক্তমনা লেখক; প্রকাশিত বই- "বিভক্তির সাতকাহন", " ক্যানভাসে বেহুলার জল", " বাঁশে প্রবাসে"।

মন্তব্যসমূহ

  1. Ali Ashman Bar এপ্রিল 24, 2017 at 3:04 অপরাহ্ন - Reply

    রামকে ভগবান বা প্রম দেবতা মেনে হিন্দুরা অন্য ধর্মের একটা উপাসনালয় ধ্বংস করেছে, যা আবার তর্কের খাতিরে দেখা যায় যে ওটা হিন্দুদের উপাসনালয় ছিল। সেটা তারা ফিরে পেতে চায়, কিন্তু দেখা যায় একটার জন্য হাজার হাজার মন্দির ভাঙা হল ও শত শত, হাজার ও লক্ষ মানুষ্কে নির্যাতন করা হল। নিরপেক্ষ ভাবে এই কথাটুকু থাকলে লেখাটা আর বেশী গ্রহণযোগ্য হতো। কেননা এই বিশ্বে আস্তিক ও নাস্তিক সব রকম মানুষ আছে। প্রত্যেক আস্তিকই নিজ ধর্মকে মেনে চলে, তার ধর্মকে কেউ খাটো করলে বা ধ্বংস করলে বা চেষ্টা করলে সে সহ্য করবেনা।
    আকবর নিজের ধ্রম ও মতকে বেশী প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

  2. গীতা দাস মার্চ 10, 2017 at 12:12 অপরাহ্ন - Reply

    অনেক আগে আপনার একটি লেখা পড়ে জয় গোস্বামীর “যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল” বইটি খঁজে খুঁজে কিনে পড়েছিলাম। আর আজ এ লেখাটি পড়ে মেয়ের কেনা ( অবশ্যই পড়া) “ তর্কপ্রিয় ভারতীয়” বইটি পড়তে উদ্ধুদ্ধ হলাম।
    লেখার ধারা অব্যাহত রাখুন।

  3. Shakha Nirvana মার্চ 4, 2017 at 8:17 অপরাহ্ন - Reply

    আকবারের বহু প্রতিভা এবং ভারতবর্ষের সংস্কৃতিতে যে বহু পথ বহু মতের স্থিতি ছিল সে বিষয়ে জানলাম আপনার নাতিদীর্ঘ রচনার মধ্য দিয়ে। তবে এই বিরাট বিষয় সম্ভার এত অল্পে শেষ করে দেয়াতে একটু আশাহত হয়েছি। তারপরে এই ব্যস্ততার শতাব্দীতে যেটুকু দিতে পেরেছেন তার জন্যে অশেষ ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন