ইওরোপ সফরের সাফল্য বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে জগদীশচন্দ্রকে। বিদ্যুৎ তরঙ্গ নিয়ে তিনি নতুন উদ্যমে গবেষণা শুরু করলেন। ১৮৯৭ সালে তাঁর তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় লন্ডনের রয়েল সোসাইটি থেকে। পেপারগুলো হলো: (১) On the selective conductivity exhibited by certain polarizing substabces, (২) Index refraction of glass for the electric ray, (৩) On the influence of thickness of air space on total reflection of electric radiation। পরের দুবছরে প্রকাশিত হয় আরো তিনটি পেপার।

আলো ও মাইক্রোওয়েভের পোলারাইজেশান সম্পর্কিত অনেকগুলো পরীক্ষা করেন জগদীশ। ডাবল-প্রিজম এবং বিভিন্ন নতুন ক্রিস্টাল ছাড়াও পাটের বান্ডিলের ওপরও ইলেকট্রিক-ওয়েভের পোলারাইজেশানের পরীক্ষা করেন তিনি। প্যাঁচানো পাটের আঁশ দিয়ে তিনি টুইস্টেড ডায়-ইলেকট্রিক এর প্রভাব পরীক্ষা করেন মাইক্রোওয়েভের ওপর। তিনি আবিষ্কার করেন যে ডান দিকে প্যাঁচানো পাটের আঁশের ভেতর দিয়ে যে মাইক্রোওয়েভ পোলারাইজড হয় তার বেগ বাম দিকে প্যাঁচানো আঁশের ভেতর দিয়ে গেলে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

পাটের আঁশের টুইস্টেড ডায়-ইলেকট্রিক

পাটের আঁশের টুইস্টেড ডায়-ইলেকট্রিক

মাইক্রোওয়েভের প্রতিফলন ও প্রতিসরণের ওপরও অনেক পরীক্ষা করেন জগদীশচন্দ্র। সালফারের লেন্স ও প্রিজম তৈরি করে তিনি তাদের ভেতর মাইক্রোওয়েভ প্রেরণ করে দেখেন যে সালফারের মধ্যে মাইক্রোওয়েভের পূর্ণ-অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে।

তাঁর পেপারগুলো ব্যাপক সাড়া ফেলে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-সমাজে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রফেসর হেনরি কন্‌হার্টের নেতৃত্বে জগদীশচন্দ্রের পরীক্ষাগুলো নিজেদের ল্যাবে করে দেখেন এবং একই রকমের ফলাফল পান। জগদীশচন্দ্রকে এই খবর চিঠি লিখে জানান মিশিগানের বিজ্ঞানীরা। আরো উৎসাহিত হয়ে ওঠেন জগদীশ। নিজের হাতে তৈরি করা খুবই সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে তিনি যে ফল পেয়েছেন আমেরিকার উন্নত গবেষণাগারের উন্নত যন্ত্রপাতিতেও সেই ফল। অনুভব করতে থাকেন নিজের একটা ভালো গবেষণাগার থাকলে আরো কত সূক্ষ্মভাবেই না তিনি তাঁর পরীক্ষাগুলো করতে পারতেন।

জগদীশচন্দ্র যখন লন্ডনে ছিলেন তখন রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি লর্ড লিস্টারের নেতৃত্বে ভারতসচিবের কাছে যে স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে ভারতসচিব সুপারিশ করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসুর জন্য একটা আধুনিক ল্যাবোরেটরি তৈরি করে দেয়ার। সেজন্য চল্লিশ হাজার পাউন্ড বরাদ্দ করার জন্য চিঠিও দিয়েছিলেন শিক্ষাবিভাগে। জগদীশচন্দ্র সেই প্রস্তাবের কোনরূপ অগ্রগতি হয়েছে কিনা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলেন – কিছুই হয়নি। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলতে গিয়ে আরো বিপদে পড়ে গেলেন তিনি। লর্ড র্যা লেকে যে তিনি ছুটির দিনে কলেজে নিয়ে এসেছিলেন এবং টয়লেটের পাশে নিজের হাতে গড়া মাত্র আড়াই বর্গমিটারের ল্যাবোরেটরি দেখিয়েছিলেন তার জন্য কৈফিয়ত তলব করা হলো।

কারণ দর্শাতে বলা হলো তাঁকে:

“কলেজের অধ্যাপনায় ফাঁকি দিয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নিজের ইচ্ছেমত গবেষণা করাটা কেন অপরাধের পর্যায়ে পড়বে না? কেন তিনি বাইরের লোককে কতৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কলেজে নিয়ে এসেছিলেন?”

কলেজের ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি চুরির অপবাদও সইতে হয়েছে জগদীশ বসুকে। কারণ তিনি কিছু যন্ত্রপাতি ল্যাব থেকে তাঁর অফিস রুমে এনেছিলেন। অথচ ঐ যন্ত্রপাতিগুলো তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন।

নিজের বেতনের টাকা দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের কাজের জন্য যে ল্যাবরেটরি দাঁড় করিয়েছিলেন, সেটার উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু অনুদানের অনুরোধ করে চিঠি লেখার পর যে উত্তর পেলেন তা এরকম:

“ডক্টর বসু এখন মাসে পাঁচশ টাকা মাইনে পান। কোন নেটিভ সরকারি চাকুরের মাসে পাঁচশ টাকায় পোষাচ্ছে না বলাটা নেহায়েৎ বোকামি।”

রাগে ক্ষোভে অপমানে চাকরি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন জগদীশচন্দ্র। এ প্রসঙ্গে মাসিক বসুমতি পত্রিকায় ‘সঙ্গীত সমাজ’ প্রবন্ধে শ্রী হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ লিখেছেন:

“ইংল্যান্ডের কোন বিখ্যাত বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি কলিকাতায় আসিয়া জগদীশচন্দ্রের গবেষণাগার দেখিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন। তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছুটি। জগদীশচন্দ্র সেই সময় উক্ত বৈজ্ঞানিককে ছুটির সময় কলেজে লইয়া যাইয়া গবেষণাগার দেখাইয়াছিলেন। পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিককে কলেজের গবেষণাগার স্বয়ং-দেখাইবার-সুযোগে-বঞ্চিত কলেজের ইওরোপীয় অধ্যক্ষ জগদীশচন্দ্রের কৈফিয়ৎ তলব করেন, তিনি কেন অধ্যক্ষের বিনাঅনুমতিতে একজন বাহিরের লোককে (stranger) কলেজের গবেষণাগার দেখাইয়াছেন? পত্রখানিতে জগদীশচন্দ্র ও তাঁহার বন্ধুরা অপমান বোধ করেন এবং জগদীশচন্দ্র পদত্যাগে প্রস্তুত হইয়া অধ্যক্ষকে লিখেন – ইংল্যান্ডের সর্বপ্রধান বিদ্যাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি যে সভ্যজগতে কোথাও stranger ইহা তিনি জানিতেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ জগদীশচন্দ্রের বন্ধুরা তাঁহার জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠায় চেষ্টিত হন এবং ত্রিপুরার মহারাজা সেজন্য বহু টাকা দিতে সম্মত হন। একদিন প্রাতঃকালে বর্তমান লেখক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নিকট যাইয়া কথা প্রসঙ্গে এই সংবাদ দিলে রায় মহাশয় তখনই প্রতিবেশী জগদীশচন্দ্রের গৃহে যাইয়া তাঁহাকে পদত্যাগ-সংকল্প বর্জন করান।”

সবার অনুরোধে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন জগদীশচন্দ্র। কলেজ কর্তৃপক্ষও জগদীশকে বার্ষিক কিছু অনুদান দেবার সিদ্ধান্ত নেয়। আবার কাজে ডুবে যান জগদীশচন্দ্র।

১৮৯৯ সালে গবেষণায় তিনি জড়বস্তুর মধ্যে প্রাণস্পন্দনের অনুরূপ সাড়া প্রত্যক্ষ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন প্রাণীদের মত জড়বস্তুও বাইরের উত্তেজনায় সংবেদনশীল এবং উত্তেজনায় সাড়া দিতে দিতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। জড়বস্তুর এই সংবেদনশীলতা ও ক্লান্তিবোধের অভিব্যক্তি সম্পর্কে তখনো কোন গবেষণা কেউ করেননি। জগদীশচন্দ্র দেখলেন তড়িৎ-তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করতে করতে তিনি জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী এক সীমানায় এসে পৌঁছেছেন যেখানে জীব ও জড়ের একটি গোপন ঐকতান রয়েছে। জীব ও জড়ের এই গোপন ঐক্য সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হলো জগদীশচন্দ্রের গবেষণার দ্বিতীয় ধারা। দিনরাত খাটতে শুরু করলেন জগদীশচন্দ্র। এ যেন এক নতুন লড়াই।

জগদীশের এই লড়াকু ভাবটা খুব টানে নিবেদিতাকে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তার বৈজ্ঞানিক যুদ্ধ একাই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন- এটা মুগ্ধ করে নিবেদিতাকে। এ ব্যাপারে নিঃসঙ্গ জগদীশের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তা করতে চান নিবেদিতা। সুযোগ এবং সময় পেলেই তিনি জগদীশের বাড়িতে যান। চিন্তা করেন কীভাবে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা-কাজে সহায়তা করা যায়।

জগদীশের বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপে সহায়তা করার জন্য নিবেদিতা সারা বুলের সাথে যোগাযোগ করলেন। সারা বুলের সাথে জগদীশের আলাপ হয়েছিল ১৮৯৮ সালে আমেরিকান দূতাবাসের পার্টিতে। সারা বুল খুবই ধনী এবং প্রভাবশালী মহিলা। সারা বুলের ১৫ হাজার ডলার অর্থসাহায্যে বেলুড়ে মঠ আর সন্ন্যাসীদের বাসস্থান তৈরি হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষার জন্য নিবেদিতা যে স্কুল করেছেন সেখানেও সারা বুলের সাহায্য আছে। সারা বুল চাইলে জগদীশকেও সহায়তা করতে পারবেন।

১৮৯৯ সালের ১৫ মার্চ নিবেদিতা সারা বুলকে চিঠি লিখে জগদীশের কথা জানান, এবং বলেন যে জগদীশ নিজেই সারার কাছে লিখতে চান। কিন্তু খুবই লাজুক মানুষ বলে লিখতে ইতস্তত করছেন।

ক’দিন পর ২৬ মার্চ তারিখে আবার লিখেন, “বোসদের আমি কতটা ভালোবাসি তা যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম! আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি তুমি ড. বসুকে নিজের ছেলের মতো দেখবে। তিনি প্রায়ই তোমার কথা বলেন।”

ছেলের মতো দেখা সারাহ বুলের একটা দুর্বলতা। বিবেকানন্দ তাঁকে ‘ধীরামাতা’ ডাকেন। জগদীশকে তিনি ছেলে হিসেবে দেখবেন! জগদীশ তাঁর চেয়ে মাত্র আট বছর ছোট বয়সে। কিন্তু নিবেদিতা জানেন পুত্রস্নেহ সারাহ বুলের একটা দুবর্লতা। নিজের একটা মেয়ে আছে সারার, ছেলের জন্য একটা তৃষ্ণা হয়তো ছিল কোথাও।

নিবেদিতা জগদীশকেও বলে দিয়েছেন যেন সারা বুলকে চিঠি লিখেন এবং যেন ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। বিচক্ষণতার সাথে জগদীশকে উদ্বুদ্ধ করেন নিবেদিতা, “তুমি তাঁকে চিঠি লেখো। তোমার কাজের কথা, আশা আকাঙ্ক্ষার কথা তাকে জানাও। তাঁর কাছে কিছু লুকিও না। ধীরামাতা তোমার প্রতীক্ষায় আছেন। একটু সাড়া পেলেই তোমার পাশে এসে দাঁড়াবেন। তোমার শক্তিতে তাঁর আস্থা আছে।”

নিজের কাজের প্রশংসা শুনলে খুব উৎসাহ পান জগদীশ। যখন দেখলেন যে বিদেশের কোন কোন কাগজে তাঁর কাজের প্রশংসা বের হচ্ছে এবং বিদেশ থেকে তাঁর কাছে চিঠি পাঠানো হচ্ছে- জগদীশ খুব খুশি হলেন। একবারও ভাবেননি যে এর পেছনে আছে নিবেদিতার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। ইওরোপের কাগজে ফিচার লিখতেন মার্গারেট। সেই পরিচিতিতে অনেক সাংবাদিকের সাথে পরিচয় ছিলো তাঁর। সেটাকে কাজে লাগিয়ে ইওরোপের সংবাদপত্রে জগদীশের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সম্পর্কে খবর ছাপতে সচেষ্ট হলেন নিবেদিতা।

জগদীশের গবেষণাপত্রগুলো সব ইংরেজিতে লেখা হলেও বাঙালি জগদীশের ইংরেজিতে ইংরেজদের ইংরেজির প্রবাহ থাকার কথা নয়। নিবেদিতা নিজের হাতে তুলে নিলেন জগদীশের পেপার লেখার কাজ। জগদীশকে তিনি বললেন, “আমার কলম অনুগত ভৃত্যের মত তোমার কাজ করবে। মনে কর এ লেখা তোমারই।”

নিবেদিতার পক্ষে কাজটা দুঃসাহসী। কারণ প্রথমত তিনি বিজ্ঞান লেখার দায়িত্ব নিয়েছেন যেটা জগদীশের নিজের বিজ্ঞান। জগদীশের কাছ থেকে আগে বুঝে নিবেন তারপর লিখবেন। বিজ্ঞানের এদিক-ওদিক হলে চলবে না। তাছাড়া তাঁর ভারতে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিবেকানন্দের সাথে থাকা। বিবেকানন্দ তাঁকে নারীশিক্ষার প্রসারের দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু নিবেদিতা কাজ করছেন জগদীশচন্দ্রের। তাতে নানারকম বাঁকা কথা শুনতে হতে পারে তাঁকে। অথচ সেই ভয় একটুও নেই। কিসের জোরে এমন হচ্ছে?

১৫ এপ্রিল ১৮৯৯ রবিবার, জগদীশচন্দ্রের সাথে দীর্ঘ আলাপের পর নিবেদিতা লিখেছেন, “For the first time I entered into the full possession of the heart of my dear Dr. Bose…. and I cannot tell you what a need I have of being loved.”

সারা বুলকে লিখেছেন নিবেদিতা,
“তুমি, আমি আর ইউম (মিস ম্যাকলাউড) – আমরা বোসদের চারপাশে একটা প্রীতির উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করে রাখবো। তাদের শক্তি দেবো যেন সারা দুনিয়াটাই তাদের নিজের ঘর হয়ে ওঠে। এখনো তার সময় আছে। স্বামীজিকে ভালোবাসলে অন্যদেরকে ভালবাসতে বাধা নেই। তাছাড়া অন্যদের ভালোবাসলে স্বামীজির প্রতি ভালোবাসাও মিথ্যে হয়না।”

১৮৯৯ সালের ২৬ এপ্রিল সারা বুলকে জগদীশের সাথে তাঁর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে লিখেন:“আর কোনো বন্ধুত্ব থেকে আমি দুটি বিষয়ের এমন উপলব্ধি আর পাইনি। এক, আমার মাতৃত্ববোধ, দুই, Of being glad to inferior in order to enjoy the greatness and goodness of another. অন্যের মহত্ত্ব এবং ভালোত্ব উপভোগ করার জন্য নিজেকে গুটিয়ে রাখা। কাল রাতে তিনি আমাকে এমন কিছু বলতে চেয়েছেন যা আমার প্রতি তাঁর বন্ধুত্বকে ঠিকভাবে প্রকাশ করে। তিনি বলেছেন, “আমি তোমাকে এমন উঁচুতে স্থান দিয়েছি যেখানে হয়তো এখনো তুমি উঠতে পারোনি, কিন্তু আমার বিশ্বাস একদিন তুমি সেই উচ্চতা ধারণ করবে।”

জগদীশচন্দ্রের প্রতি নিবেদিতার মাতৃত্ববোধ কেন দেখা দিল তা রহস্যময়। জগদীশ তাঁর চেয়ে দশ বছরের বড়। তবু নিবেদিতা জগদীশকে একটি শিশুর মতো ভালোবাসতে চান- যাকে আদর করা যায়, সেবা করা যায়, সাহায্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে অনেক পরে নিবেদিতার বোন বলেছেন, যাঁর বিষয়েই নিবেদিতা গভীর ভালোবাসা অনুভব করতেন- তাকেই তিনি সন্তানের মতো দেখতেন।

নিবেদিতা জগদীশকে Bairn (বে আন) বলে সম্বোধন করতেন। আর অবলাকে ডাকতেন Bo বলে। বো- বউ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হতে পারে। আর স্কটিশ শব্দ বে আন- মানে A Child, শিশু।

জগদীশচন্দ্রের কাজের সাথে এবং মনের সাথে এভাবে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য কিছুটা অপরাধবোধে ভুগছেন নিবেদিতা। গুরু বিবেকানন্দের অনুমতি না নিয়ে এরকম মানসিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?

১৮৯৯ সালের ২৮ এপ্রিল স্বামী বিবেকানন্দকে খুলে বললেন জগদীশচন্দ্রের কথা। এটাও বললেন যে তিনি যদি চান তবে জগদীশের কাজ থেকে পুরোপুরি বিদায় নেবেন। কিন্তু বিবেকানন্দ বুঝতে পারলেন নিবেদিতা যে জগদীশকে সাহায্য করছে তাতে ভারতীয় বিজ্ঞানের উন্নতি হচ্ছে এবং তাতে ভারতবাসীর দেশাত্মবোধ জাগতে সাহায্য করা হচ্ছে। বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে বললেন কোনরকম অপরাধবোধ না রেখে কাজ চালিয়ে যেতে।

নিবেদিতা কিছুটা আশ্বস্ত হলেও দ্বিধা যায় না পুরোপুরি। জ্ঞিজ্ঞেস করেন,
“আদর্শ সন্নাসিনী হবার জন্য আমাকে কী করতে হবে স্বামীজি?”
“এখন যা করছো ঠিক তাই করতে থাকো।”
“কিন্তু এভাবে নানা জায়গায় যাওয়া, নানা মানুষের সাথে যোগাযোগ করা আপনার কাছে অপরাধ নয়?”
“না, অপরাধ নয়।” বিবেকানন্দ উত্তর দিলেন।

নিজের কাছে পরিষ্কার হবার পর নিবেদিতা জগদীশকে জানালেন এখন থেকে প্রতি শুক্রবার তিনি জগদীশের বাড়িতে যাবেন। এর কিছুদিন পর ১৮৯৯ এর ২০ জুন বিবেকানন্দ বাগবাজারের স্কুলের অর্থসংগ্রহের জন্য আমেরিকা যাত্রা করলেন। সাথে নিয়ে গেলেন নিবেদিতাকে। তারপর প্রায় এক বছর জগদীশচন্দ্রের সাথে নিবেদিতার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।

পরিচিত প্রবাসীদের কাছ থেকে নিবেদিতার খবর মাঝে মাঝে পেতেন জগদীশচন্দ্র। নিবেদিতা এখনো গুরুর পেছন পেছন আমেরিকা ঘুরছেন এটা জগদীশের ভালো লাগছে না। আমেরিকায় নিবেদিতার সাথে ব্রাহ্মদের বাকবিতন্ডা হয়েছে এই খবর পেয়েছেন জগদীশ। সেটা তিনি রবীন্দ্রনাথকে লিখেছেন ১৮ এপ্রিল ১৯০০ সালের এক চিঠিতে:

“এবার আমেরিকা হইতে বিপিনচন্দ্র পালের একখানা চিঠি দেখিলাম। তাঁহার সহিত নিবেদিতার তুমুল সংগ্রাম হইয়াছে। বিপিনবাবু এবং নিবেদিতা Mrs Bull এর বাড়িতে অতিথি ছিলেন। সেখানে বিপিনবাবু বিবিধ প্রকার pleasant কথাই বলিতেছিল। কিন্তু দৈবের নিব্বর্ন্ধ! সেখানে একটি meeting হয়, তাহাতে নিবেদিতা জাতিভেদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করিতেছিলেন; বিপিনবাবু চুপ করিয়া শুনিতেছিলেন। হঠাৎ নিবেদিতার মনে হইল যে ব্রাহ্মরা জাতিভেদ মানে না, তাই স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি তাহাদের ভক্তি অপরিমিত নহে। অমনি বললেন, ‘আমি জানি যে এই meeting-এ একজন আছেন যিনি জাতিভেদ মানেন না, এবং সনাতন ধর্মের উপর যাঁহার আস্থা নাই। তাহার পর বিপিনবাবুকে রণং দেহি বলিয়া challenge করিলেন। এইরূপ আকস্মিকরূপে আক্রান্ত হইয়া বিপিনবাবু বলিলেন যে ‘জাতিভেদের অনেক সদগুণ আছে, তবে কিছু অসুবিধাও আছে। It keeps down men of genius; for example Swamiji; could not have had so much influence যদি জাতিভেদ থাকিত। ব্রাহ্মণের একাধিপত্যে নিম্নজাতির উত্থান দুরূহ হইত।’ আর কোথা যায়! মনে করিতে পারেন বিবেকানন্দ স্বামীর সম্পর্কে এরূপ কথা! অমনি এক scene; পরিশেষে ঘোরতম ঘৃণার সহিত নিবেদিতা বলিলেন যে, ব্রাহ্মরা হিন্দুও নহে, খ্রিষ্টানও নহে। আর বিপিনবাবুকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ‘তুমি মৎস্যও নহ, মাংসও নহ!!’ আপনাকে সমস্যা দিতেছি, বিপিনবাবু তবে কী? সে যাহা হউক এরূপ অসাধারণ ভক্তি অতি দুর্লভ।”

১৯০০ সালে প্যারিসে আয়োজিত পদার্থবিজ্ঞান কংগ্রেসে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রিত হলেন জগদীশচন্দ্র। আমন্ত্রণ পেলেও জগদীশের যাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তদানীন্তন শিক্ষা কর্মকর্তা। তবে এতসব বাধার মুখেও জগদীশ বসুকে সহযোগিতা করেছিলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জন উডবার্ন।

প্যারিস কংগ্রেসের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে স্যার উডবার্নের সাথে দেখা করেন জগদীশচন্দ্র। উডবার্ন বললেন, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। তবে এটা অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতসচিবের ইচ্ছার উপর।”

জগদীশচন্দ্রকে সহায়তা করার জন্য লেফটেন্যান্ট গভর্নরের সুপারিশ পেয়ে ক্ষেপে গেলেন শিক্ষা-অধিকর্তা। গভর্নরের সাথে জগদীশচন্দ্র দেখা করেছেন তাকে না জানিয়ে! তিনি চিঠি পাঠালেন জগদীশের কাছে, “I am informed you had an interview with the Lt. Governor and have asked to be deputed to Paris Exn., to attend a meeting of European Scientists. May I ask you to inform me of the reasons for making your request to His Honour?”

জগদীশচন্দ্র তাঁর চিঠির উত্তর দেবার আগেই স্যার উডবার্ন প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা দেখতে আসেন। জগদীশচন্দ্রের কাজে খুশি হয়ে তিনি কয়েকটি শিক্ষাবৃত্তি মঞ্জুর করবেন বলে ঘোষণা দিলেন। এতে শিক্ষা-অধিকর্তা ও কলেজ অধ্যক্ষের মত বদলে যায়। শিক্ষা-অধিকর্তা বেশ নরম হয়ে জগদীশচন্দ্রকে লিখলেন,
“আপনি হয়তো আমার আগের চিঠি ভুল বুঝেছেন। গভর্নর আপনাকে প্যারিসে পাঠাতে চান। আমার কাছে এই বিষয়ে রিপোর্ট চেয়েছেন। তাই আমি এ ব্যাপারে আপনার সাথে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম।”

আলোচনা করে জগদীশচন্দ্র বুঝলেন যে শিক্ষা-অধিকর্তার খুব একটা ইচ্ছা নেই তাঁকে আবার বাইরে পাঠানোর। মাত্র তিন বছর আগে তিনি নয় মাস ইওরোপে কাটিয়ে এসেছেন। এখন আবার ইওরোপে যেতে চাচ্ছেন!

শেষ পর্যন্ত স্যার উডবার্নের সহযোগিতায় জগদীশচন্দ্রের গবেষণার প্রচার ও স্বীকৃতির কথা বিবেচনা করে ভারত সরকার তাঁকে বিদেশে যাবার অনুমতি দেয়।

কিন্তু অনুমতি পেলেও সরকার থেকে কোন পথ-খরচ পাওয়া গেলো না। জগদীশচন্দ্র তাঁর সমস্যার কথা বন্ধু রবীন্দ্রনাথকে জানান সবসময়। এ প্রসঙ্গে ‘জগদীশচন্দ্র’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

“এই সময় যখন জানতে পারলুম যাত্রার পাথেয় সম্পূর্ণ হয়নি, তখন আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুললে। … দুর্ভাগ্যক্রমে আমার নিজের সামর্থ্যে তখন লেগেছে পুরো ভাঁটা। … অগত্যা সে দুঃসময়ে আমার একজন বন্ধুর শরণ নিতে হলো। … তিনি ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর দেবমাণিক্য।”

ত্রিপুরার মহারাজার সাথে জগদীশচন্দ্রকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একবার প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশচন্দ্র বন্ধুদের জন্য বিজ্ঞান-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। খবর পেয়ে বিনাআমন্ত্রণেই ত্রিপুরার মহারাজা সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন।

জগদীশচন্দ্রের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে আগে থেকেই শুনেছিলেন মহারাজা, তবে সরাসরি আলাপ হয় সেদিন। সেই থেকে জগদীশচন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কাজের একজন শুভার্থী ছিলেন ত্রিপুরার মহারাজা। প্যারিস যাবার অর্থ জোগাড় হয়নি শুনে মহারাজা দেবমাণিক্যের কাছে হাত পাতলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তখন যুবরাজ বীরেন্দ্রকিশোরের বিয়ের আয়োজন চলছে। রবীন্দ্রনাথের হাতে পনেরো হাজার টাকার চেক তুলে দিয়ে মহারাজ মৃদু হেসে বলেছিলেন, “বর্তমানে আমার ভাবী বধূমাতার দু’একপদ অলঙ্কার নাই বা হইল।”

সেই অর্থকে পাথেয় করে ১৯০০ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ইওরোপ পাড়ি দেন জগদীশচন্দ্র তাঁর দ্বিতীয় বৈজ্ঞানিক সফরে।

তথ্যসূত্র:
১। শ্রী হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, সঙ্গীত সমাজ, মাসিক বসুমতি, জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬০
২। Letters of sister Nivedita, Vol. I. page 119, 128
৩। শঙ্করীপ্রসাদ বসু। নিবেদিতা লোকমাতা, ১ম খন্ড ২য় পর্ব। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৩৯৮, পৃ: ২৫
৪। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। পত্রাবলী, সম্পাদক দিবাকর সেন, বসু বিজ্ঞান মন্দির, কলকাতা, ১৯৯৪, পৃ: ২০।
৫। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবাসী, পৌষ, ১৩৪৪।
৬। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চিঠিপত্র, ষষ্ঠ খন্ড, পৃ ১৮০

[519 বার পঠিত]