ফেইসবুক, ভুয়া খবর, এবং রাজনৈতিক সামাজিক বিপর্যয়


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ বিশেষ করে ফেইসবুক, টুইটার ইত্যাদি এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা চলে। ফেইসবুকের মাধ্যমে অনেকদিন আগের কোনো বন্ধু কিংবা আত্মীয়কে খুঁজে পাওয়া কিংবা নতুন কারো সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, ফেইসবুকের মাধ্যমে তথ্যের আদানপ্রদান, খবর পাওয়া ইত্যাদি কিংবা অনেকে ফেইসবুকের মাধ্যমে বাণিজ্য প্রসার করছেন; এইসব ইতিবাচক দিক ছাড়াও ফেইসবুকের কিছু নেতিবাচক দিক আছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে বেশ আলোচিত ব্যাপার হচ্ছে ফেইসবুকে গুজব ও ভুয়া খবরের ছড়াছড়ি এবং তা কীভাবে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে।

আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ফেইসবুকের ভুয়া খবর বিশেষ প্রভাব রেখেছে। এইসব ভুয়া খবরে জনমত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। যেমন, বার্তাসংস্থা বাজফিড নিউজের মতে নির্বাচনের আগের শেষ তিন মাসে ২০-টি “সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়” ভুয়া খবরের সাইটগুলোর খবর শেয়ার করা, সেগুলোতে মন্তব্য করা, প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন বার, অথচ নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ইত্যাদি সহ নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর শেয়ার করা, মন্তব্য করা, প্রতিক্রিয়া জানানো ইত্যাদি হয়েছে ৭.৩ মিলিয়ন বার; অর্থাৎ, ভুয়া খবর জনগণের মতামতকে অন্যদিকে টেনে নিয়েছে, যার ফলাফল নির্বাচনে প্রকাশিত হয়েছে- হিলারি যাবতীয় জরিপে এগিয়ে থাকলো নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প, এবং অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মনে করছেন এর পেছনে রয়েছে ফেইসবুকের ভুয়া খবরের প্রভাব। এইসব ভুয়া খবরে একজন নারী হিসেবে হিলারি ক্লিন্টনকে অবমাননা করা হয়েছে, তাকে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; অর্থাৎ যে সাধারণ মানুষ খুব বেশি সচেতন নয় সে এইসব খবর পড়ে খুবই প্রভাবিত হওয়ার কথা, এবং তাই হয়েছে বলা চলে। নতুন আরেকটি জরিপে জানা গেছে যে ৭৫% আমেরিকান অনলাইনের ভুয়া খবর দেখে সেটিতে বিশ্বাস করে। স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নির্বাচন-পরবর্তী বক্তব্যে ফেইসবুক ও টুইটারের ব্যবহারকে তার সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে, তার মতে যখন হিলারি ফ্লোরিডায় ৩৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলো টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য সেখানে তার কর্মীরা ফেইসবুক ও টুইটার ব্যবহার করে বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলো।

এছাড়া আমেরিকার গোয়েন্দাসংস্থার কর্মচারীরা বিশ্বাস করেন যে যদিও রাশিয়া হ্যাকিঙের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে সরাসরিভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি, তবে তারা ভুয়া খবরের মাধ্যমে জনমত পাল্টিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছিলো। যদিও ফেইসবুক ও মার্ক জুকারবার্গ অস্বীকার করে আসছে আমেরিকার নির্বাচনে ফেইসবুকের ভুয়া খবরের প্রভাব এবং অদৌ ফেইসবুকে ভুয়া খবরের কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি করছে, বাস্তবতা অন্য। ফেইসবুকের “ট্রেন্ডিং” অংশ কিংবা ভাইরাল খবর বা লিংকগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে প্রতি ১০টি ভুয়া খবরের চারটি ছড়িয়ে পড়ছে ফেইসবুকের আলগরিদমের ভুলের কারণে। যদিও এইসব ভুয়া খবরের সাইট ফেইসবুক নিজে চালাচ্ছে না কিন্তু এইসব ভুয়া খবর ভাইরাল করতে ফেইসবুক অবদান রাখছে।

এইসব ভুয়া খবরের সাইট দেখছে যে খবর ভুয়া হলে-ও (যা অনেক সাধারণ মানুষ সনাক্ত করতে পারে না) লোকজন ঠিকই সাড়া দিচ্ছে এবং প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, ফলে তাদের সাইট জনপ্রিয় হচ্ছে, ফলে তারা আর-ও বেশি ভুয়া খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে, এভাবে ভুয়া খবরের চক্রটি চলতে থাকে; মাঝখানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমগুলো, প্রভাবিত হচ্ছে জনসাধারণ এবং খবরের বিষয়বস্তুর উপর নির্ভর করে উগ্রবাদের-ও জন্ম হচ্ছে (যেমন- ট্রাম্পের সমর্থকদের আগ্রাসনের শিকার হচ্ছেন অনেক সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষ)।
এই বছরের মে মাসের এক জরিপে দেখা গেছে যে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ৪৪ শতাংশ তাদের প্রতিদিনের খবর আহরণ করে ফেইসবুক থেকে, ফেইসবুকে শেয়ার করা বিভিন্ন লিংক থেকে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না এইসব খবরের একটি বিরাট অংশ যদি ভুয়া খবর, গুজবে সমৃদ্ধ থাকে তবে তা ব্যক্তি বা নাগরিককে বাস্তবতা সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়। বাঙলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারীকারীদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে-ও সংবাদ আহরণের প্রধান মাধ্যম ফেইসবুক। তাই এদের কাছে ভুয়া খবর, গুজব পরিবেশন করা হলে তা চক্রবৃদ্ধিহারে সামাজিকভাবে আর-ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।


ফেইসবুক নিজেকে একটি সেবা হিসেবে দাবী করলে-ও এটি মূলত একটি ব্যবসা, এটি শেয়ারবাজারে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎস। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ফেইসবুক তার আয়ের প্রধান অংশ কামাই করে, তাই হয়তো এইসব ভুয়া খবরে ফেইসবুকের আয়ের কমতি নয় বরং বাড়তি সম্ভাবনা থাকার কারণে ফেইসবুক ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণে উদাসীন। অথচ এই ফেইসবুক চীনে তাদের নিউজফিড সেন্সর করে চীন সরকারের সেন্সরশিপের কারণে। কারণ চীনেরর এক বিলিয়নের উপরে-ও মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য (এবং তাদের মাধ্যমে আয়ের জন্য) ফেইসবুককে চীন সরকারের নিয়ম মানতে হবে। অর্থাৎ, নিজের স্বার্থের জ্ন্য ফেইসবুক নিয়ম মানতে চায়। তাই ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকার ফেইসবুককে চাপে রাখতে পারে এবং সঠিক কনটেন্ট পরিবেশন নিশ্চিত করতে পারে।

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস-ও সম্প্রতি ফেইসবুকের ভুয়া খবর সম্পর্কে উদ্বেগ জানিয়েছেন, তার মতে ভুয়া খবরের মাধ্যমে মিডিয়া সংস্থাগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করতে পারে। জার্মান সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে তারা ফেইসবুককে জিজ্ঞাসাবাদ করবে কেনো তারা ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না কেনো এবং না নিলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিবে। অনেক দেশ ফেইসবুকের ভুয়া খবরের সমস্যা নিয়ে নানা কথা তুললে-ও জার্মান বিচারমন্ত্রীর মতে সময় হয়েছে ফেইসবুককে একটি মিডিয়া কোম্পানি হিসেবে দেখার এবং তাদের প্লাটফর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর, ঘৃণ্য বক্তব্য, উগ্রবাদ ইত্যাদির জন্য তাদের অপরাধ আইনের আওতায় আনা। জার্মানির চান্সেলর আঞ্জেলা মার্কেল-ও ভুয়া খবরের ভয়ানক ক্ষমতা সম্পর্কে সর্তকতামূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তার মতে জনমতকে ফেইসবুকের মতন ওয়েবসাইটগুলো প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে এবং অনেকসময় পক্ষপাতিত্বভাবে জনমতকে প্রভাবিত করা হয়। জার্মানিতে রিফিউজিদেরকে আশ্রয় দেয়া ও সেইসময়কার নানা ঘটনা উত্তেজনায় ভুয়া খবরের প্রভাব ছিলো, যা কিছু বর্ণবাদী ও রিফিউজি-বিরোধী লোকদের মনোভাব ও সহিংসতাকে বাড়িয়ে তুলেছিলো।

জার্মানি, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র শুধু নয়, ভুয়া খবর বিশেষ করে ফেইসবুকের মাধ্যমে ভাইরাল হতে থাকা এইসব ভুয়া খবর অন্যান্য দেশে-ও জনমত বিপর্যয় এনেছিলো এবং আনছে। যেমন, ২০১৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় প্রার্থী জোকো উইডুডুকে একজন চাইনিজ খ্রিস্টান ও একজন সমাজতন্ত্রী হিসেবে ভুয়া খবরের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। পরে জোকো উইডুডু নিজের বৈবাহিক সার্টিফিকেট অনলাইনে প্রকাশ করে নিজের সম্প্রদায়, ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত করেছিলেন। তবে এই শিক্ষা নির্বাচনে জয়ী হওয়া জোকো উইডুডুকে ফেইসবুক ও অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানির মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলো। শুধু এই নয়, ব্রাজিলে ফেইসবুকের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিলো ড্রাগ-চোরাইচালানে জড়িত থাকার কারণে এবং ফেইসবুক ও ফেইসবুকের ওয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ভুয়া খবর পরিবেশনে জড়িত থাকায়। ভুয়া খবর আসল খবরের তুলনায় এতো বেশি ছড়িয়ে পড়েছিলো যে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ডিলমা রুসেফের অব্যাহতিতে সেটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো।


ভুয়া খবরের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, নারীদের আক্রমণ করা হচ্ছে, এমনকি লুট, হরণ, আক্রমণ ইত্যাদি-ও ঘটছে। যেমন ধরুন একটি ভুয়া খবরের কারণে কেউ যদি একজন রিফিউজিকে আক্রমণ করে তবে তার দায় সেই ভুয়া খবরের প্রচারকের পাশাপাশি এটি কোন মাধ্যমে ছড়াচ্ছে তার উপর-ও বর্তায়।

ফেইসবুক অনেক দেশে বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুবিধা দিয়ে থাকে, কিন্তু এই সেবার মাধ্যমে মূলত তারা নতুন ব্যবহারকারী আকৃষ্ট করে, এবং নিশ্চিত করে যে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যেনো ফেইসবুক ব্যবহার করে। এতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার ক্ষেত্রে ফেইসবুকেরই লাভ। ফেইসবুক ভুয়া খবর নিয়ন্ত্রণ না করার আরেকটি কারণ হচ্ছে যারা এইসব ভুয়া খবর শেয়ার করছেন তারা যেনো মনক্ষুণ্ন না হয় তার জন্য। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় সম্প্রতি দেখা গেছে যে শুধু সাধারণ জনগণ নয়, অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত আন্তর্জালে একটি তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা কতোটুক তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না, এবং এমনকি একটি বিজ্ঞাপন কিংবা ভুয়া খবর থেকে একটি সঠিক ও বাস্তব খবরকে পৃথক করতে হিমশিম খায়।


একজন সাধারণ পাঠক অথবা ব্যবহারকারী হিসেবে আপনি নিজেকে-ও এইসব ভুয়া খবর ভাইরাল হওয়া রোধ করতে পারেন। কিছু উপায় হচ্ছে:
১. কোনো খবরের ব্যাপারে সন্দেহ জাগলে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। আপনি হয়তো বন্ধুদের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে চাচ্ছেন কিংবা তাদের মতামত চাচ্ছেন কিন্তু যখন ভুয়া খবরটি শেয়ার করা হয় তখন এটি অন্যান্য খবরের তুলনায় এগিয়ে যায় ফেইসবুকের এলগরিদমের কারণে। যেকোনো খবর শেয়ার করার আগে খবরটি পড়ুন, ভাবুন, এবং তারপর শেয়ার করুন।
২. গুগল সার্চের মাধ্যমে অনেক খবরের সত্যতা সহজে যাচাই করা যায়। যদি একই খবর অনেক গ্রহণযোগ্য ও গতানুগতিক সংবাদমাধ্যম থেকে প্রকাশিত হয় তবে সেই খবরের ভিত্তি থাকার সম্ভাবনা বেশি।
৩. যেসব খবরের শিরোনাম মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য রসাল, অভিনব, চমকপ্রদ সেইসব খবর ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া এইসব ভুয়া খবর প্রচুর বানান ভুল থাকে, ব্যাকরণের নিয়মের বালাই নেই, এবং রয়েছে অসম্ভব ব্যাপার, একটু মাথা খাটালেই যা চোখে পড়ার কথা।
৪. খবরটি একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম (যেমন, বিডিনিউজ২৪.কম, বাংলাট্রিবিউন.কম) থেকে এসেছে নাকি সেইরকমের কোনো নকল সাইট (যেমন, বিডিনিউজ২৪.কো, বাংলাট্রিবিউন.কো) থেকে শেয়ার করা হচ্ছে তা দেখুন। অনেক ভুয়া সাইটের “যোগাযোগ” কিংবা “আমাদের সম্পর্কে” পাতায় কিছু থাকে না, যেটি সনাক্ত করার আরেকটি সহজ উপায়। সংবাদমাধ্যমটির “ডোমেইন” বা ঠিকানা ঠিক আছে কিনা দেখুন।
৫. লেখা বা খবরটির লেখক কে কিংবা লেখকের যোগ্যতা কী তা দেখে নিন। যেকোনো খবর পাঠের সময় সন্দিহান থাকুন, একটু চিন্তা করুন।
৬. যেসব সাইট থেকে ভুয়া খবর প্রচারিত হচ্ছে যেগুলোকে রিপোর্ট করুন, কিংবা হাইড করে রাখুন।


মানুষের চিন্তাধারণার ক্ষেত্রে মানুষ প্রায় ২৯টি কগনিটিভ বায়াস বা চিন্তাক্রটি দ্বারা প্রভাবিত। ফেইসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভুয়া খবর, গুজব ইত্যাদি মানুষের এইসব বায়াসের উপর কাজ করে মানুষকে মিথ্যা অসত্যে বিশ্বাস করতে উৎসাহিত করে; ফলে ব্যক্তি বাস্তবতার ভিন্ন রূপ উপলব্ধি করেন, যা শুধুমাত্র ব্যক্তি সামাজিক ও সম্পর্কের বিভিন্ন অবস্থার জন্য নেতিবাচক তা নয় অনেকক্ষেত্রে ব্যক্তিকে বিভিন্ন মানসিক সমস্যা ও ব্যাধির দিকে ঠেলে দিতে পারে। যেমন, দৈনিক ৩ ঘণ্টার অধিক ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের মাঝে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধিতে ভোগার সম্ভাবনা বেশি, ২-৩ ঘণ্টার ব্যবহারে লঘু বা মৃদু বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। এইসবের পেছনের কারণ হচ্ছে যে যেসময় ব্যক্তি ফেইসবুকের পেছনে ব্যয় করছেন তা মূলত তাকে অন্যান্য সামাজিক ও সাম্পর্কিক ব্যাপারগুলো থেকে বঞ্চিত করছে, এছাড়া ফেইসবুকে রয়েছে অনেক নেতিবাচক ঘটনা মতামতের ছড়াছড়ি যা ব্যক্তির জন্য মানসিকভাবে পীড়াদায়ক এবং ব্যক্তির মনমেজাজ পাল্টে দেয়। তাই ফেইসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখতে হবে বা সতর্কতা পালন করতে হবে ব্যক্তিকেই।

একটি কথা মনে রাখতে হবে যে ফেইসবুক তার আলগরিদমের মাধ্যমে ব্যক্তি ব্যবহারকারীর নিউজ ফিড নিয়ন্ত্রণ করলে-ও এটি ব্যবহারকারীর পূর্বের আচরণ থেকে (ক্লিক করা, শেয়ার করা, কার সাথে মিথস্ক্রিয়ায় জড়িত হচ্ছে ইত্যাদি) “শেখে”, ফলে ব্যবহারকারী যদি পূর্বে প্রচুর ভুয়া খবর শেয়ার করে থাকে কিংবা গুজবের প্রতি আগ্রহ দেখায় তবে ফেইসবুকের আলগরিদম এই ধরণের জিনিসই দেখাবে বারবার। এছাড়া মানুষের পূর্বের ধ্যানধারণা তার ভবিষ্যত চিন্তাচেতনাকে প্রভাবিত করে, ফলে একই খবর পাঠ করে পূর্বের ধ্যানধারণার কারণে দুইজন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ধরণের তথ্য আহরণ করতে পারেন, অর্থাৎ, ব্যক্তিকেই সচেতনার পরিচয় দিতে হবে সঠিক বস্তুনিষ্ঠ খবর সংগ্রহে এবং পরিবেশনে।

মানুষের আবেগ, অনুভূতি, মেজাজ ইত্যাদি সংক্রামক রকমের ছোঁয়াচে, অর্থাৎ একজনের অনুভূতি ও আবেগ সহজে অন্যের আবেগ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। ফেইসবুকে ভুয়া খবর ও গুজবের ছড়াছড়ির পেছনে রয়েছে এর প্রভাব। ফেইসবুক ২০১৩ সালে একটি গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছে যে কৃত্রিমভাবে (আলগরিদমের মাধ্যমে) ব্যবহারকারীদের নিউজ ফিডের পোস্টগুলোর (অন্যদের শেয়ার করা) ধরণ (যেমন, ইতিবাচক, সুখদায়ক নাকি বেদনাদায়ক ইত্যাদি) পাল্টে দিলে সেই ব্যবহারকারীদের পরবর্তী পোস্টের ধরণ পাল্টে যায়, অর্থাৎ, আপনার বন্ধুরা যদি কোনো আনন্দদায়ক খবর বা বিষয় নিয়ে পোস্ট করে তবে আপনার পরবর্তী পোস্ট কোনো আনন্দদায়ক পোস্টে হবে এটা ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। তাই ভুয়া খবর ও গুজব শেয়ার করা হলে বলার অপেক্ষা রাখে না তা ব্যবহারকারীদের আবেগ ও অনুভূতি (এবং দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস ও ধারণা) পরিবর্তন করতে পারে। ফেইসবুকের প্রায় ৪৯% ব্যবহারকারী রাজনৈতিক আলোচনাকে “রাগান্বিত” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে “রাগ” বা ক্রোধ সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ। বাঙলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব টের পাওয়া যায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে ফেইসবুক ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ায়। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে ভুয়া খবর ও গুজবের প্রতি সরকারের যেমন মনোযোগ দেয়া দরকার তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর-ও সজাগ থাকা দরকার কীভাবে এই ভুয়া খবর ও গুজবকে ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।

বাঙলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এবং সাম্প্রতিক কিছু বিপর্যয়ে ফেইসবুক কেন্দ্রিক ভুয়া খবরের ভাইরাল হওয়া দায়ী। শাহবাগ আন্দোলন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় “বাঁশের কেল্লা”সহ অনেক জামাতি ও স্বাধীনতাবিরোধীদের অনেক ওয়েবসাইট ও ফেইসবুক পাতা থেকে বিকৃত ও অসত্য খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো শাহবাগ আন্দোলনকে ধর্মীয় দিক থেকে আক্রমণ করার, জনমত প্রভাবিত করা, এবং ভুয়া খবরের মাধ্যমে মানুষের মনে ঘৃণা, আগ্রাসন ইত্যাদি নেতিবাচক অনুভূতি ও মেজাজকে উসকে দেয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য অনেক রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বিকৃত খবর ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা ছিলো।

সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে নেক্কারজনক সাম্প্রদায়িক হামলা যা নাসিরনগরে ঘটেছিলো, এবং অনেক হিন্দু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হলো সেটি কিন্তু ছিলো ফেইসবুক কেন্দ্রিক এবং এইক্ষেত্রে নানা মৌলবাদী ও ধর্মীয় উন্মাদনায় লিপ্ত থাকা অনেক পাতা থেকে বিকৃত তথ্য ও ভুয়া খবর ভাইরাল করে মানুষকে উসকে দেয়া হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো যে এক হিন্দু যুবক কাবা শরিফকে হেয় করে ছবি প্রকাশ করেছে অথচ সেই হিন্দু যুবকের না ছিলো প্রযুক্তি বিষয়ক যথেষ্ট জ্ঞান; অর্থাৎ ভুয়া খবরকে ভিত্তি করে অনেকে তাদের কূটকৌশল ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপ দিচ্ছে, যা বাঙলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও স্বাধীনতাবিরোধী।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে-ও প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে নানা ভুয়া ছবি ও খবর, যার উদ্দেশ্য নানাবিধ। এছাড়া, যেকোনো ধর্ষণ, অপরাধ, নির্যাতন, চলতি খবর ইত্যাদি ঘিরে প্রকাশিত ও পরিবেশিত হয় বা হচ্ছে নানা ভুয়া খবর ও গুজব।

এইসব ভুয়া খবরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাঙলাদেশ সরকার অন্যান্য দেশের মতো ফেইসবুককে অনুরোধ করতে পারে কিংবা আইনের আওতায় আনতে পারে, কারণ ফেইসবুকের মাধ্যমে যদি সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটে তবে তার জন্য কে দায়ী হবে এইসব নির্ধারণের সময় এসেছে। পরবর্তী নির্বাচনে যে ফেইসবুকের এই ভুয়া খবর যথেষ্ট প্রভাব ফেলবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

[393 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0

Leave a Reply

8 Comments on "ফেইসবুক, ভুয়া খবর, এবং রাজনৈতিক সামাজিক বিপর্যয়"

avatar
Sort by:   newest | oldest
বিজন ঘোষ
Member
বিজন ঘোষ
গুজব অস্ত্র নতুন নয়। মহাভারতের যুদ্ধেও গুজাবাস্ত্র ছড়ানো হয়েছিল (অশ্বথামা হত)। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে গুজব অস্ত্র থেকে মুক্ত হতে দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। মুশকিল হচ্ছে এই যুগে যুধিষ্ঠির কই? যে সব সংবাদ পত্র আছে তারা কেউ যুধিষ্ঠির নয় যে গুজব থেকে বাঁচতে মানুষ ওই সংবাদ পত্রের দ্বারস্থ হবে। তাই গুজবাস্ত্র চলবেই । আবার দেখুন গুজব অস্ত্র আইন করে বন্ধ করলে তখন সত্যি খবরও গুজবের দোহাই দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হবে না এমন নিশ্চয়তা কোথায় ? তাই গুজবের শিকার হওয়াই আমাদের ভবিতব্য । কোন শর্ট কাট পথ নেই যে গুজব বন্ধ করা যাবে। এক মাত্র সত্যবাদিতাই গুজবের বিরুদ্ধে অস্ত্র হতে পারে। সত্যের… Read more »
লিপু
Member

গতানুগতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি মানুষের কিছুটা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যা ভুয়া খবরের লিংকের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গীতা দাস
Member
২০১২ সালে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায়ও ফেইসবুকে লিংক শেয়ার করা নিয়ে ঘটেছিল সহিংস ঘটনা। নাসিনগর বা রামুতে অবশ্য রটনা থেকে এসব ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে,আপনার প্রস্তাব—- এইসব ভুয়া খবরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাঙলাদেশ সরকার অন্যান্য দেশের মতো ফেইসবুককে অনুরোধ করতে পারে কিংবা আইনের আওতায় আনতে পারে, পাগলাকে নৌকা ডুবাতে না করলে কিন্তু পাগলা উপরন্তু নৌকা ডুবাতে উদ্ধুদ্ধ হয়। তাকে যেন মনে করিয়ে দেয়া হয় নৌকা ডুবানোর জন্য। এ হয়তো কোন মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। আমাদের সরকারকেও তা মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। সরকার নিয়ন্ত্রণ করে আইনের আওতায়ও আনে, তবে নিজেদের ইচ্ছেমত। আর এর উদাহরণ দুস্প্রাপ্য নয়। যাহোক, লেখাটি ভালো লেগেছে। আরও লিখুন।
wpDiscuz

মুক্তমনার সাথে থাকুন