[ইয়োভাল নোয়াহ হারারির নতুন বই Homo Deus – A Brief History of Tomorrow এর ভাবানুবাদের একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে নিচের এই সিরিজ। এটি পুরো বইয়ের ভাবানুবাদ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ ও বেশিরভাগ অংশের সারসংক্ষেপের একটি প্রচেষ্টা]

গল্প বা নাটক লেখার ক্ষেত্রে আন্তন চেখবের একটা সূত্র আছে। এটি চেখব ল নামে পরিচিত। কোন গল্পের বা নাটকের প্রথম দৃশ্যে যদি আপনি একটি দেয়ালে ঝোলানো বন্দুকের কথা বলেন, তাহলে তৃতীয় দৃশ্যে অবশ্যই সে বন্দুক থেকে গুলি ছুড়তে হবে।

কোটি কোটি বছর ধরে মানুষ এই নিয়ম মেনে এসেছে। যার হাতেই ক্ষমতা ছিল, সে-ই গরীবদের শোষণ করেছে। এটাই জঙ্গলের নিয়ম। প্রস্তর যুগ থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের যুগ, সাহারা থেকে আর্কটিক, মানুষ সব সময়ই জানতো, যেকোন সময় পাশের লোক তার এলাকায় হামলা চালাতে পারে, তার পরিবারের লোকদের হত্যা করতে পারে এবং তার জায়গা দখল করতে পারে।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই জঙ্গলের নিয়ম চেখব ল মানুষ ভেঙ্গে ফেলেছে। মস্কো প্রতিবছর প্যারেডে পারমাণবিক বোমা দেখালেও কখনোই তা ব্যবহার করেনি। এটা শুরু হয়েছে ওপেনহেইমারের হাত ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর।

শান্তিতে যদি কাউকে নোবেল দিতে হয় – তবে তার প্রথম ভাগীদার হবেন ওপেনহেইমার আর তার দল। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের জন্য। হিরোসিমা আর নাগাসাকির পর পরাশক্তিগুলো খুব ভালো করে জানে, এ ধরণের যুদ্ধ মানে ‘কালেক্টিভ সুইসাইড’। একারণে এখন আর বড় ধরণের যুদ্ধ হয়না বললেই চলে।

14642274_10154823746074674_4514176133679442942_n

আপনি এখন তেড়ে আসবেন, তাহলে ইরাক? তাহলে আফগানিস্তান?

এগুলো হচ্ছে ব্যতিক্রম। প্রাচীন কালে মোট মানুষের ১৫% মারা যেতো ভায়োলেন্সে। এখন তা ১% এরও কম। ২০১২ সালে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা গেছে যুদ্ধে, ৮ লাখ মানুষ মারা গেছে আত্মহত্যা করে। আর ১৫ লাখ মানুষ মারা গেছে ডায়বেটিস এ আক্রান্ত হয়ে। Sugar is now more dangerous than gunpowder.

যুদ্ধ কমার আরেকটা কারণ হচ্ছে সম্পদ সম্পর্কে আমাদের ধারণার পরিবর্তন। আগে সম্পদ ভাবা হতো সোনা রূপা এগুলোকে। এখন সম্পদ ভাবা হয় জ্ঞানকে। এখন পৃথিবীতে যে জায়গায় এই পুরানো সম্পদের ধারণা আছে, সেই জায়গায়ই যুদ্ধ হচ্ছে – মধ্যপ্রাচ্য আর মধ্য আফ্রিকা।

১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডা কঙ্গোর কাল্টান (Coltan) মাইন লুট করে। তখন এই কাল্টান মাইনের খুব গুরুত্ব- কারণ ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোন তৈরিতে কাল্টান ব্যবহার করা হয়। এই লুট করা মাইন থেকে রুয়ান্ডা বছরে ২৪ কোটি ডলার আয় করতো।

একই কাজ যদি চীন পাশের ক্যালিফোর্নিয়ায় করে তাহলে কী হবে? কিছুই হবে না। কারণ সিলিকন ভ্যালির মূল সম্পদ সিলিকন নয়, বরং সেখানকার ওয়েব জায়ান্টদের কর্মচারীদের জ্ঞান। রুয়ান্ডা ১ বছরে যে পরিমাণ আয় করে, চীন যুদ্ধ না করে শুধু ব্যবসা করে সিলিকন ভ্যালি থেকে ১ দিনেই সেই টাকা আয় করতে পারে।

তাহলে সন্ত্রাসীরা? সন্ত্রাসীরা কিভাবে পত্রিকার হেডলাইন হয়?

২০১০ এ পুরো পৃথিবীতে মোটা হওয়ার জটিলতায় মারা গেছে ৩০ লাখ মানুষ। আর সন্ত্রাসীদের হাতে মারা গেছে ১ হাজারেরও কম। একজন গড়পড়তা আমেরিকান বা ইউরোপিয়ানের জন্য আল-কায়েদার তুলনায় কোকা-কোলা বেশি মারাত্মক।

ইতিহাসের একটা মূল শিক্ষা হচ্ছে, ইতিহাস কখনোই শূণ্যস্থান পছন্দ করেনা। দুর্ভিক্ষ যুদ্ধ যদি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, নিশ্চিতভাবে সেখানে নতুন কিছু আসবে। আর মানবজাতি কখনো অল্পে তুষ্ট থাকেনি। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কী আসবে তা হয়তো শুধু ভবিষ্যতই বলবে।

#Homo_Deus_ইয়োভাল_হারারি | ভাবানুবাদ | চ্যাপ্টার ১ কিস্তি ৩)

[222 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0