অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিটিশদের স্থাপিত বন্দীশিবিরের শৈশবের দিনলিপি অনুবাদ করছি, ওয়াটকিন টেঞ্চের মূল বই, 1789 সালে প্রকাশিত A Narrative of the Expedition to Botany Bay এবং 1793 সালে প্রকাশিত A Complete Account of the Settlement at Port Jackson থেকে। অনুবাদের প্রথম কিস্তিতে বইটির পরিচিতি, লেখকের ভূমিকা এবং প্রথম চার অধ্যায় (১-৪) অনুবাদ করেছিলাম – যেখানে ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ বন্দর থেকে জাহাজবহর ছাড়ার পরে ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ, কেপ ভের্দে দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে পৌঁছানো পর্যন্ত ঘটনাবলী এসেছে। দ্বিতীয় কিস্তিতে আছে দুটো অধ্যায় (৫-৬) – রিও ডি জেনিরোতে তাদের অবস্থানকাল, সেখান থেকে দক্ষিন আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপের দিকে যাত্রা, কেপ অফ গুড হোপে তাদের কর্মকাণ্ড, এবং সেখান থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বোটানী বে এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা। মূল বই দুটোকে একত্র করে টেক্সট পাবলিশিং কোম্পানি “১৭৮৮” নামে প্রকাশ করেছে ২০১২ সালে, এবং সেই সংস্করনের ভূমিকা লিখেছেন টিম ফ্ল্যানারি, “অনন্য ওয়াটকিন টেঞ্চ” শিরোনামে। তৃতীয় কিস্তিতে টিম ফ্ল্যানারীর সেই ভূমিকাটি অনুবাদ করেছিলাম, যা পাঠককে বইটির একটি সামগ্রিক আলোচনা ছাড়াও লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী এবং ততকালীন প্রেক্ষাপটের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

প্রথম কিস্তি পাবেন এখানে
দ্বিতীয় কিস্তি পাবেন এখানে
তৃতীয় কিস্তি পাবেন এখানে

কয়েদী বহনকারী প্রথম জাহাজবহরের যাত্রাপথ

কয়েদী বহনকারী প্রথম জাহাজবহরের যাত্রাপথ

এই পর্বে আছে তিনটি অধ্যায় (৭-৯), যেখানে প্রথম জাহাজবহর আফ্রিকার কেইপ অফ গুড হোপ (কেপ টাউন) থেকে বোটানি বে পর্যন্ত একমেবাদ্বিতীয়ম যাত্রা শেষে জাহাজ থেকে মালামাল ভূমিতে নামিয়ে বোটানি বে এবং পোর্ট জ্যাকসনের দখল নেয়, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সাক্ষাত লাভ করে এবং বোটানি বে, পোর্ট জ্যাকসন ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করে। অস্ট্রেলিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো বলা যায়। অবশেষে দ্বীপান্তরিত কয়েদিরা তাদের আগামী জীবনের গন্তব্য সেই দূরের দেশের সন্ধান পেল, এবং তাকে নিজের দেশ বানানোর কাজে মন দিল।


কেপ অফ গুড হোপ থেকে বোটানি বে পর্যন্ত যাত্রা

বোটানি বে এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর পরে স্থলভাগ চোখের আড়াল হতে না হতেই দক্ষিণ-পূর্বমূখী একটা বাতাস বেশ চাড়া দিয়ে উঠল এবং মাঝে মাঝে কিছু বিরতি বাদ দিয়ে বলতে গেলে একটানা বইতে থাকল সে মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত। তাতে আমাদের অবস্থান দাঁড়ালো ৩৭ ডিগ্রী ৪০ মিনিট দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ১১ ডিগ্রী ৩০ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। এর ফলে কেপ অফ গুড হোপ থেকে যাত্রা করার পরে বোটানি বে থেকে আমাদের দূরত্ব প্রায় ১০০ লীগ বেড়ে গেল (১ লীগ = প্রায় সাড়ে তিন মাইল)। যেহেতু বাতাসের গতিপথ কিম্বা আমাদের ভাগ্যের কোন আশু পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না, গভর্নর ফিলিপ তখন তার নিজের পতাকা নিয়ে ‘সিরিয়াস’ জাহাজ থেকে ‘সাপ্লাই’ জাহাজে স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন, এবং পুরো জাহাজ বহরের অপেক্ষায় না থেকে বরং নিজে আগেভাগে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলে যেতে মনঃস্থির করলেন। পুরো জাহাজ বহরকে দু’ভাগে ভাগ করা হল – একভাগে পড়ল নৌচালনায় দক্ষ তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজ, যেগুলোকে নৌবাহিনীর একজন লেফট্যানান্টের অধীনে ন্যস্ত করা হল। এই তিনটি জাহাজের মধ্যে একটি ছিল ‘সাপ্লাই’ নামক জাহাজ, যাতে গভর্ণর ফিলিপ অবস্থান নিলেন। বাকী তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজকে খাবারের জোগানদার তিন জাহাজের সাথে রাজকীয় জাহাজ সিরিয়াস এর ক্যাপ্টেন হান্টারের অধীনে ন্যস্ত করা হোল। এই বইয়ের লেখক শেষোক্ত ভাগে ছিলেন। এই ভাগাভাগি হতে নানা কারণে ২৫ তারিখ পর্যন্ত সময় লেগে গেল। যেহেতু গভর্ণর ফিলিপ ঠিক করেছেন যে তিনি আগে গন্তব্যে পৌঁছে গিয়ে বোটানি বে’তে প্রয়োজনীয় কিছু ভবনাদি নির্মানের কাজ এগিয়ে নেবেন বাকী জাহাজ বহর আসতে আসতে, সেই কারণে নানা জাহাজ থেকে বেশ কিছু ছুতারমিস্ত্রী, করাতী, কর্মকার ও অন্যান্য কারিগর শ্রেণীর লোককে গভর্নরের জাহাজে, অর্থাৎ ‘সাপ্লাই’ জাহাজে স্থানান্তর করা হোল। ‘সিরিয়াস’ জাহাজ থেকে লেফট্যানান্ট গভর্নর রস এবং তার অধীনস্থ মেরিন সেনাদের দলকেও ‘স্কারব্রো’ নামক যাত্রীবাহী জাহাজে পাঠানো হল, যা ছিল প্রথম ভাগের তিনটি জাহাজের একটি। এর কারণ ছিল এই যে, যদি তারা আমাদের খানিকটা আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, তাহলে হয়তো জনপ্রশাসনের নানা কাজ এগিয়ে নিতে তারা গভর্নরকে সাহায্য করতে পারবেন বাকী জাহাজগুলো আসার আগে।

এই সময়ের পর থেকে বায়ুপ্রবাহের গতিপথ ছিল আমাদের জন্য সুবিধাজনক, এবং আবহাওয়াও ছিল আমাদের পক্ষে অনুকূল – অনেকটা আমরা যা মনে মনে আশা করেছিলাম ঠিক সে রকম – ফলে এ সব কিছু একসাথে মিলে গিয়ে আমাদের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছিল। অবশেষে জানুয়ারীর ৭ তারিখে বহুল প্রতীক্ষিত ভ্যান ডিমেনের উপকুল (তাসমানিয়ার প্রাক্তন নাম ভ্যান ডিমেন’স ল্যান্ড) আমাদের চোখে ধরা দিল। বিকেলে ঠিক দু’টোর সময় আমরা সেখানে পৌঁছালাম – ক্যাপ্টেন হান্টারের চাঁদ পর্যবেক্ষণের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী আমাদের যখন সেখানে পৌঁছাবার কথা ছিল, কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সেই সময়। জোতির্বিদ হিসেবে ক্যাপ্টেন হান্টারের নিখুঁত হিসাব-নিকাশের দক্ষতা এবং একজন অফিসার হিসেবে তার আচার-আচরণ আমাদের সবার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার দাবীদার ছিল।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, প্রায় বন্দী অবস্থায় এত দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও সংকটপূর্ণ যাত্রার পরে স্বভাবতঃই আমরা সবাই নতুন কিছু দেখার সম্ভাবনায় বেশ আনন্দিত হয়ে উঠেছিলাম। সূর্যাস্তের দিকে আমরা দুটো পাথুরে দ্বীপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করলাম, ক্যাপ্টেন ফার্ন্যো (ব্রিটিশ অভিযাত্রী Tobias Furneaux, ক্যাপ্টেন কুকের সহযাত্রী ছিলেন – অনুবাদক) যে দ্বীপগুলোর নাম দিয়েছিলেন মিউস্টোন ও সুইলি। এর মধ্যে প্রথম দ্বীপটি দেখতে অবিকল ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথের কাছের একটা ছোট্ট দ্বীপের মতন, এবং নামটাও সেখান থেকেই এসেছে (তাসমানিয়ার দক্ষিনে এখনো আছে এই মিউস্টোন দ্বীপ। ইংল্যান্ডে প্লাইমাউথের কাছের সেই দ্বীপের নাম দ্যা গ্রেট মিউ স্টোন। সুইলি দ্বীপকে ম্যাপে খুঁজে আর পাওয়া যায় না। অনুবাদক)। গ্রীনিচের তুলনায় মিউস্টোনের অবস্থান ৪৩ ডিগ্রী ৪৮ মিনিট দক্ষিণ অক্ষাংশ ও ১৪৬ ডিগ্রী ২৫ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশে।

উপকুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা অনেকেই ব্যাগ্র চোখে স্থলভাগের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম, যে ভূমির উপরেই আমাদের ভাগ্য নির্ভর করছে অনাগত দিনগুলোতে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া এবং দূরত্বের কারণে আমরা ঠিক সেভাবে সবকিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের সবচেয়ে বড় আতসী কাঁচ দিয়ে আমরা কেবল মোটামুটি উচ্চতার কিছু বৃক্ষলতাচ্ছাদিত পাহাড় দেখতে পেলাম, যেগুলোতে মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় সাদা বেলেপাথর দেখে মনে হয়েছিল যে, ওগুলো যেন তুষার দিয়ে আচ্ছন্ন। সন্ধ্যার দিকে আমরা পাহাড়ের গায়ে বেশ অনেক জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখলাম।

আমি ও আমার জাহাজের অন্যান্য যাত্রীদের কেউই আগে এই উপকুল দেখে নি, ফলে আমরা একটা ছোট মানচিত্র দেখব বলে ঠিক করলাম। দেখা গেল, লন্ডনের ‘স্টিলি’ প্রকাশনার মানচিত্রটি মোটামুটিভাবে বেশ নিখুঁত। মানচিত্রটি শতভাগ নিখুঁতই হতো যদি তারা মিউস্টোনকে মূল ভূখণ্ড থেকে এতটা বেশী দূরে না দেখাত, এবং এডিস্টোন ও সুইলি দ্বীপদুটোকে একত্রে একটা দ্বীপ হিসেবে না দেখাত, কারণ এডিস্টোন ও সুইলি দুটো আলাদা দ্বীপ। এই দুই দ্বীপের মাঝে একটা অনতিক্রম্য পাথরের দেয়াল আছে, যার অনেকাংশ পানির উপর থেকে দৃশ্যমান। এডিস্টোনের অবস্থান ৪৩ ডিগ্রী ৫৩ ১/২ মিনিট অক্ষাংশ, ১৪৭ ডিগ্রী ৯ মিনিট দ্রাঘিমাংশ ও সুইলি দ্বীপের অবস্থান ৪৩ ডিগ্রী ৫৪ মিনিট দক্ষিণ অক্ষাংশ, ১৪৭ ডিগ্রী ৩ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

যে পশ্চিমা বাতাস আমাদেরকে বেশ দীর্ঘসময় ধরে নৌচালনায় সাহায্য করেছে, তা রাতের দিকে পড়ে গেল। এর পরে উত্তর পূর্ব দিক থেকে বাতাস বইতে লাগল। পরের দিন ভোর হলে আমরা দেখলাম যে, স্থলভাগ আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। এর পরে আমরা আবার যখন ভূমির দেখা পেলাম, সেটা ছিল জানুয়ারী মাসের ১৯ তারিখে, আমাদের কাঙ্খিত বন্দর থেকে মাত্র যখন আমরা মাত্র ১৭ লীগ দূরে। বাতাস আমাদের অনুকূল ছিল, আকাশ ছিল কিছুটা কুয়াশাময় তথাপি শান্ত, এবং বাতাসের উষ্ণতা ছিল খুবই আরামদায়ক। সবার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল, সবাই একে অন্যকে অভিনন্দন জানাতে লাগল। এত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বোটানি বে’তে আস্তানা গাড়ার উদ্দেশ্যে এসেছে যে অভিযাত্রীরা, তারা যতটা আগ্রহভরে বোটানি বে’কে চেয়েছিল, তাদের চেয়ে বেশি আকূল হয়ে কি ইউলিসিস ইথাকাকে চেয়েছিল?

জোসেফ এডিসনের ট্র্যাজেডি কাটো’তে আছেঃ Heavily in clouds brings on the day, The great, the important day, big with the fate, of Cato and Rome. আমাদের আগমনের দিনে আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। আমাদের জন্য অবশ্যই এই দিনটা ছিল এক বিশেষ দিন, গুরুত্বপূর্ণ দিন – যদিও জোসেফ এডিসনের ট্র্যাজেডির বাইরে গিয়ে আমি আশা করি যে, এই দিন একটি সম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন হবে, ধ্বংসের সূচনা নয়।

২০শে জানুয়ারী সকাল দশটার মধ্যেই পুরো জাহাজবহর বোটানি বে’তে নোঙর ফেলল। সেখানেই আমরা দেখতে পেলাম গভর্নরের জাহাজ এবং প্রথম ভাগের তিন যাত্রীবাহী জাহাজকে, যারা আমাদের আগে এসেছিল। তাতে সকল পক্ষই আনন্দিত হল। জানা গেল, গভর্নরকে নিয়ে ‘সাপ্লাই’ জাহাজ এখানে পৌঁছেছে মাত্রই গত ১৮ তারিখে, এবং বাকী তিন যাত্রীবাহী জাহাজ পৌঁছেছে তার আগের দিন।

পোর্টসমাউথ থেকে যাত্রা শুরুর ঠিক ৩৬ সপ্তাহ পর আমরা এই দুঃসাধ্য যাত্রা আনন্দের সাথে শেষ করতে পারলাম। এই সফল যাত্রার পেছনে যাত্রাপথে একের পর এক অভূতপূর্ব ও অবিমিশ্র অনুকূল ঘটনাবলীর সহায়ক ভূমিকার কথা বলতেই হয়। এর আগে এরকম বিপদজনক সফরে অন্য কোন জাহাজ-বহরের ভাগ্যে এতটা সৌভাগ্য জুটেছে বলে মনে হয় না। আমাদের ২১২ জন মেরিন সেনার মধ্যে মাত্র একজন মারা গিয়েছে এই দীর্ঘ সফরে; ইংল্যান্ডে জাহাজে আরোহন করা ৭৭৫ জন কয়েদীর মধ্যে আমরা হারিয়েছি মাত্র ২৪ জনকে। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনের কারনটা কি হতে পারে? আমি উত্তরে বলব, সরকারের তরফ থেকে এই সফরের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহে যে অকৃপণ মনোভাব দেখানো হয়েছিল, সেটি একটি বড় কারণ। পাঠকেরা অবশ্য আমাদের অভিযাত্রার এই ভাল ফলাফলের কথা শুনে আরো বেশি অবাক হবেন যখন তারা জানবেন যে, পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে যাত্রা করা কিছু জাহাজের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমাদের জাহাজ বহরের মালামাল থেকেই দেওয়া হয়েছিল; আমাদের যাত্রায় গম, দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ভিনেগারে ডুবানো শাক-সবজী এবং হালকা স্যুপ নিতে দেয়া হয় নি, এবং স্কার্ভি রোগের জন্য আমাদের একমাত্র প্রতিকার ছিল যৎসামান্য ‘এসেন্স অফ মল্ট’। আরো মনে রাখা দরকার যে, এই যাত্রার মানুষজন কোন পেশাদার জাহাজ কোম্পানীর সুস্থ সবল স্বাধীন মানুষ নয় – তাদের অধিকাংশই দাগী আসামী, যারা বন্দীত্বজনিত কারণে কৃশকায় এবং কাপড়-চোপড়ের অপ্রতুলতায় ভারাক্রান্ত। আমাদের লম্বা সমুদ্রযাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে এই মানুষগুলোকে প্রায় সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকেই বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। তবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জাহাজে সরবরাহকৃত মালামাল ও খাদ্যদ্রব্য বেশ উঁচুমানের ছিল; সাধারনতঃ ঠিকাদারদের দেওয়া জিনিসপত্র এত ভাল হয় না। লন্ডনের টাওয়ার স্ট্রিটের ঠিকাদার মেসার্স রিচার্ডস এন্ড থর্ন ছিল এই জাহাজ বহরের জোগানদাতা ঠিকাদার।


বোটানি বে’তে জাহাজ বহরের আগমন থেকে শুরু করে জাহাজ থেকে মালামাল ভূমিতে নামানো, পোর্ট জ্যাকসনের দখল নেওয়া, আদিবাসীদের সাক্ষাতকার এবং বোটানি বে ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বিবরণ

বোটানি বে’তে পৌঁছে আমরা একে অন্যকে অভিবাদন ও সম্ভাষণ জানানো শেষ করতে না করতেই গভর্ণর ও তার সহকারী লেফট্যানান্ট গভর্ণর মিলে উপসাগরের তট ও আশেপাশের এলাকা রেকি করতে বেরুলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই এলাকার ভুপ্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া এবং আমাদের কার্যক্রম শুরু করার মত উপযুক্ত স্থান খুঁজে নেওয়া। যুতসই কোন জায়গা খুঁজে না পেয়ে অবশেষে গভর্ণর মহাশয় নৌকাযোগে অদূরে পোর্ট জ্যাকসন নামে আরেকটা উপসাগর পরিদর্শনে ব্রতী হলেন, যে উপসাগরের কথা ক্যাপ্টেন কুক তার অভিযানের বর্ণনায় লিখে গিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের জাহাজ বহর নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার মত প্রশস্ত পোতাশ্রয় পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছিল। ২৩শে জানুয়ারী সন্ধ্যায় নৌকা ফিরে এল ভাল খবর নিয়ে – তারা সেখানকার পোতাশ্রয় ও আশেপাশের এলাকার বিভিন্ন সুবিধার এমন আকর্ষণীয় বর্ণনা দিল যে, পরদিন সকালেই বোটানি বে পরিত্যাগ করে পোর্ট জ্যাকসনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা হবে বলে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে অল্প যে সকল নাবিক ও সেনারা তাদের নিজ নিজ জাহাজ ছেড়ে স্থলভাগে নেমেছিলেন, তারা তড়িঘড়ি করে জাহাজে উঠে পড়লেন। যে উপসাগর আমাদের বিগত অনেক দিনের অসংখ্য আলাপচারিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল, সেই বহুল আলোচিত বোটানি বে’কে বিদায় দেওয়ার সকল আয়োজন শুরু হলো। মনে আছে, মাত্র তিন দিন আগে আমরা এই উপসাগরে আসতে পেরে পরম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলাম, এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকালে আমরা সকলেই বিশ্বাস করতাম যে, এই স্থানেই আমাদের ভবিষ্যত জীবনের অগণিত দিবানিশি কাটবে। এই আশু স্থানান্তরের ঘটনায় রাতে আমি ঠিকমত ঘুমাতে পারলাম না, এবং পরের দিন খুব ভোরে জেগে উঠলাম। হঠাত সে সময় আমি যে কেবিনে কাপড় বদলাচ্ছিলাম সেখানে এক সার্জেন্ট হন্তদন্ত হয়ে এসে খবর দিলঃ বোটানি বে এর মুখে একটা অচেনা জাহাজ দেখা গেছে। এ খবর শুনে আমি যারপরনাই আশ্চর্য হলাম। শুরুতে আমি সে কথা হেসে উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পরক্ষণেই যখন খেয়াল করলাম যে, সংবাদ বহনকারী লোকটি তার সত্যবাদিতার জন্য সুবিদিত ছিল, এবং সে কথাটা উচ্চস্বরে পুনরাবৃত্তি করছিল, তখন আমি দ্রুত জাহাজের ডেকে উঠলাম। সেখানে উঠে অবাক হয়ে শুনলাম, আমাদেরই কেউ তারস্বরে চীৎকার করে বলছে ‘একটা অচেনা জাহাজ!’

আমার মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্নের ঘুরপাক খাওয়ার ফলে আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। তার অল্পক্ষণ পরেই আমি আশেপাশের কোলাহল উপেক্ষা করে আমাদের উপসাগরের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বৃহদাকার জাহাজদুটিকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করলাম। এরই মধ্যে আমাদের জাহাজ বহরের প্রায় সকলেই এই অভাবনীয় ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে গেছে। অনেকেই নানা আন্দাজ-অনুমানে ঘটনার ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে লাগল। কেউ হয়তো বলছে, জাহাজগুলো ডাচদের – ওরা আমাদেরকে হটিয়ে এই জায়গা দখল করতে চায়; পরক্ষণেই কেউ হয়তো দাবী করছে, ওগুলো ইংল্যান্ড থেকে আমাদের এই উপনিবেশের জন্য পাঠানো নানা দরকারী জিনিসপত্র বহনকারী জাহাজ। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা এতটাই বোকা বনে গেছিলাম যে, এই দুটো অনুমানই সে পরিস্কারভাবে ভ্রান্ত এবং অসম্ভব, সেটাও আমাদের মাথায় ঢুকল না। অবশেষে গভর্নর ফিলিপ এই রহস্য ভেদ করতে সক্ষম হলেন। দক্ষিন গোলার্ধে যে দুটো ফরাসী জাহাজ আবিস্কারের অভিযানে বেরিয়েছিল, আমাদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্করুপে আবির্ভূত হওয়া এই জাহাজদুটো সেই দুই জাহাজ বলেই নিশ্চিত হওয়া গেল। এভাবে আমাদের সকল সন্দেহ দূর হলো এবং আতঙ্কের পরিবেশ অবশেষে স্বস্তির বাতাবরণ পেল। অবশ্য আমাদের সাথে তাদের পূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া পর্যন্ত বোটানি বে ছেড়ে পোর্ট জ্যাকসনের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা স্থগিত রাখাটাই সমীচীন হবে বলে বিবেচনা করা হল।

সাগরের বাতাস যদি স্থলভাগের দিকে বইতে শুরু করত, তবে এই অচেনা জাহাজদুটো সকাল আটটার দিকে ঠিক উপসাগরের মুখে এসে নোঙর ফেলতে পারত। কিন্তু যেহেতু বাতাস বইছিল উল্টোদিকে, তার ফলে সেই বায়ুতাড়িত একটা শক্তিশালী সমুদ্রস্রোত তাদেরকে ঠেলে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছিল বন্দরের মুখের বাইরে, কিছুটা দক্ষিণে। পরের দিন সকালে তারা আবার তাদের আগের অবস্থানে, অর্থাৎ বোটানি বে এর ঠিক ঢোকার মুখে এসে হাজির হলে নৌবাহিনীর একজন লেফট্যানান্টকে নৌকাযোগে তাদের কাছে পাঠানো হলো সহযোগীতার আশ্বাস নিয়ে এবং উপসাগরে ঢোকার পথ দেখানোর জন্য। সেদিনই ঐ অফিসার খবর নিয়ে ফিরলেন যে, ফরাসী জাহাজগুলোর নাম বুজোল এবং এস্ট্রোল্যাবে, ক্যাপ্টেন লা পেরুজ এর অধীনে ফরাসী রাজার আদেশে তারা বিশ্বভ্রমণরত। আমরা তাদেরকে দেখে যতটা অবাক হয়েছিলাম, তারা সে তুলনায় ততটা অবাক হয় নি, কারণ তারা তাদের যাত্রার এক পর্যায়ে কামচাটকা বন্দরে গিয়েছিল, এবং সেখানেই তারা আমাদের এই সফরের পরিকল্পনা হচ্ছে বলে জানতে পারে। পরদিন সকালে যখন ওরা নোঙর ফেলল, আমরা তখন আমাদের জাহাজ বহর নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথে একেবারে উপসাগরের মুখে গিয়ে পৌঁছুলাম, ফলে এবারের মত আমাদের মধ্যে শুধু ভদ্রতাসূচক সম্ভাষণ বিনিময় ছাড়া বিশেষ যোগাযোগ হলো না ওদের সাথে।

বোটানি বে ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি এখানে আমাদের নাতিদীর্ঘ অবস্থানকালে যতটুকু পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলাম এবং পরবর্তীকালে পোর্ট জ্যাকসনের বসতি থেকে এখানে বেড়াতে এসে যা যা দেখেছি, সে সবের একটা বিবরণ দিতে চাই।

এই উপসাগরটির মুখ যথেষ্ট চওড়া, ফলতঃ দক্ষিন-পূর্ব দিক থেকে আসা তীব্র বাতাসের আক্রোশের শিকার হয় প্রায়শঃই। এই বাতাস যখন বইতে থাকে, তখন তা সাগরকে প্রচণ্ডভাবে ফুলে-ফেঁপে তোলে। ফরাসী জাহাজের কর্মকর্তারা সেখানে অবস্থানকালে অনেক কষ্ট ও ধৈর্য্য সহকারে এই এলাকাটি পুরোপুরি জরিপ করেছিল। উপসাগরের ভেতরের অংশে এর প্রধান শাখাটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে। নানা ক্ষুদ্র-বৃহত শাখা-প্রশাখাসহ এই অংশটি উপসাগরের প্রবেশমুখ থেকে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ফরাসীদের মতে, যে দুটো অন্তরীপ এই উপসাগরের প্রবেশদ্বার গঠন করেছে, সেখান থেকে শুরু করে এর ভেতরের অংশের বাহুটি অন্ততঃপক্ষে ২৪ মাইল দূরে অবস্থিত। উপসাগরের মুখ থেকে প্রায় এক লীগ দূরে গেলে স্থলভাগের দেখা পাওয়া যাবে, যেখানে উপকূলের নিকটে পানির গভীরতা ১৫ ফুটের বেশি হবে না। এখান থেকে শুরু করে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে বেশ কয়েক মাইল ধরে যে বিস্তৃত অংশ (এই অংশের বর্তমান নাম উলুওয়ারে উপসাগর – অনুবাদক), তা পোতাশ্রয় হিসেবে অতুলনীয়। এটি এর আগে যত পোতাশ্রয় আমি দেখেছি তাদের সবগুলোর চেয়ে সেরা না হলেও অন্ততঃ সেগুলোর সমকক্ষ, এবং অগণিত জাহাজকে সমুদ্রের বাতাস থেকে নিরাপদে রাখার পক্ষে উপযুক্ত। আশেপাশের মাটির উর্বরতা ও গঠন কেপ ব্যাংকস এবং পয়েন্ট সোলান্ডার এলাকার মাটির চেয়ে অনেকাংশে ভাল (যে দুটো অন্তরীপ বোটানি বে উপসাগরের প্রবেশদ্বার গঠন করেছে, তার উত্তরটির নাম কেপ ব্যাংকস এবং দক্ষিণটির নাম পয়েন্ট সোলান্ডার। পয়েন্ট সোলান্ডারের বর্তমান নাম বোটানি বে ন্যাশনাল পার্ক – অনুবাদক), যদিও দূর্ভাগ্যক্রমে একটা জরুরী ব্যাপারে এখানকার সব এলাকাই একটা বিরাট সমস্যায় ভারাক্রান্ত – স্বাদু পানির দুষ্প্রাপ্যতা।

উপসাগরের সাথে স্থলভাগের সংযোগস্থল থেকে ভেতরের দিকে যেখানে জর্জেস নদীর শুরু, সেখান থেকে শুরু করে নদীর তীর বরাবর উজানে যাওয়ার সময় আমরা বেশ কিছু আদিবাসীর দেখা পেলাম। এমনকি শুধুমাত্র বোটানি বে এর মুখে দাঁড়িয়েও বলে দেওয়া যায় যে, ক্যাপ্টেন কুক এই দেশের জনসংখ্যা সম্পর্কে যা ধারণা করেছিলেন, তার চেয়ে এই দেশের জনসংখ্যা অনেকখানি বেশি। প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, ১৮ই জানুয়ারী তারিখে আমাদের বহরের জাহাজ ‘সাপ্লাই’ যখন এখানে আসে, সেদিন তারা সংখ্যায় কমপক্ষে জনা চল্লিশেক লোক উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলে জমায়েত হয়েছিল। তারা সেখানে চীৎকার করা ছাড়াও নানারকমের চেনা-অচেনা শ্লীল ও অশ্লীল অঙ্গীভঙ্গী করেছিল। তাদের এই উপস্থিতি ‘সাপ্লাই’ জাহাজের আরোহীদের কৌতুহলকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল, যদিও মাত্র অল্প কয়েকজনে মিলে এতগুলো লোকের সকাশে যাওয়াটা অনেকের কাছেই সুবুদ্ধির পরিচয় বলে মনে হয় নি। তখন উত্তর উপকূলে মাত্র ছ’জন আদিবাসীর একটি ক্ষুদ্র দল চোখে পড়লে গভর্নর ফিলিপ বরং সে দিকে যাওয়াটাই কর্তব্য বলে ঠিক করলেন – যাতে তিনি এই নতুন দেশের দখল নিতে পারেন এবং এই দেশের পুরাতন ও নবাগত অধিবাসীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ শুরু করতে পারেন। যে নৌকায় গভর্নর ফিলিপ ছিলেন, সেটি উপসাগরের উত্তর পাশের স্থলভাগের কাছাকাছি গেলে দেখা গেল, আদিবাসীরাও তার সাথে তাল মিলিয়ে সৈকত ধরে সেই নৌকার দিকে এগিয়ে আসছে। অবশেষে নৌকারোহী একজন কর্মকর্তা আদিবাসীদের উদ্দেশে ইশারায় পানির অভাবের কথা বুঝাতে চাইলেন, এবং ধারণা করা হয়েছিল যে, এতে তারা নৌকা থেকে এই কর্মকর্তার অবতরণের ইচ্ছাটা বুঝতে পারবে। তারা সেটা সহজেই বুঝল, এবং কোন ইতস্ততঃ না করেই উক্ত কর্মকর্তাকে পানির উৎসের সন্ধান দিল। সঙ্গে সঙ্গে নৌকাটিকে তীরে ভেড়ানো হলো এবং আরোহীরা সবাই নৌকা থেকে তীরে নামলেন। যেহেতু এখানে আমাদের ভবিষ্যত শান্তিপূর্ণ অবস্থান অদ্যকার এই প্রথম সাক্ষাতের উপরে অনেকখানি নির্ভর করতেও পারে, সে কারণে আমাদের তরফ থেকে সর্বোচ্চ মার্জিত ও ভদ্রোচিত ব্যবহার দেখানোটা ছিল অত্যাবশ্যক। ইন্ডিয়ানরা যদিও কিছুটা সংশয়ে ছিল, তারা গভর্নরের তীরে অবতরণে খুব একটা নাখোশ বলে মনে হল না। এখানে পারস্পরিক জানাশোনা ও আলাপেরও সূত্রপাত হল, যেখানে দুই পক্ষই অপর পক্ষের আচরণে সন্তুষ্ট ছিল। বহিরাগত ইউরোপীয়ানরা আদিবাসীদের ব্যাপারে আগে যে ধারণা পোষণ করত, তা আমূল বদলে গেল এই দেখা হওয়ার ফলে; তারা আদিবাসীদের সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি ভাল ধারণা পোষণ করে তাদের জাহাজে ফিরে গেল। ওদিকে স্থানীয়রা নবাগতদের দ্বারা বেশ বিনোদিত হলো,এবং খানিকটা প্রাথমিক জড়তা সত্বেও তাদের আনা উপহারাদি যেমন একটি আয়না, কিছু পুতি ও খেলনাপাতি গ্রহণ করতে সম্মত হল।

যেহেতু আমার জাহাজ অনেক দেরী করে বোটানি বে’তে পৌঁছায়, ফলে এই ঘটনার চাক্ষুস সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয় নি। ঘটনার তিন দিন পরে আমি সেখানে যেয়ে আমাদের একটা দলের সাথে দক্ষিণ উপকূলে যাওয়ার কয়েক মিনিট পরেই ডজনখানেক আদিবাসীকে দেখতে পেলাম। তারা ছিল সম্পূর্ণ উলঙ্গ – একেবারে সদ্যজাত শিশুর মত বস্ত্রহীন, এবং তারা সাগরের তীর ধরে হাঁটাহাঁটি করছিল। আমরা তাদের দিকে খুবই সতর্কতার সাথে অগ্রসর হলাম, যেহেতু আমাদের কৌতুহল ছিল অপরিসীম, যদিও তাদেরকে কোনভাবেই আমরা খেপিয়ে দিতে বা তাদের রাগের কারণ হতে চাইছিলাম না। তারাও আমাদের দিকে সহজে অগ্রসর হতে চাইছিল না বলে আমাদের মনে হলো – তারা খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখছিল। দুই পক্ষের হাতেই অস্ত্র ছিল, যদিও কোন ধরনের যুদ্ধাবস্থা বা আক্রমনাত্নক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে, তেমনটা আমাদের মনে হয় নি। আমাদের দিক থেকে অন্ততঃ তেমন কোন আক্রমণকে সম্ভাব্য মনে হয় নি, এবং অপর পক্ষও আমাদের শরীরী ভাষা থেকে তেমনটাই ধারণা করেছিল বলে মনে হয়।

এই ঘটনার সময়ে আমার সাথে প্রায় সাত বছর বয়সী একটা ছেলে ছিল। বালকটির ব্যাপারে আদিবাসীদের বেশ কৌতুহল দেখা গেল; তারা বেশ ঘণঘণ তার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করছিল এবং নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল। বালকটি খুব একটা ভয় পাচ্ছিল না; ফলে আমি তাকে সাথে নিয়ে আদিবাসীদের দিকে খানিকটা এগিয়ে গেলাম, এবং একই সাথে বালকটির শরীরের কিছু কাপড় খুলে নিলাম, যাতে তার বুক ও শরীরের আরো কিছু অংশ দেখা যায়। এই অবস্থায় বালকটিকে দেখে তারা বেশ উচ্চস্বরে বিস্ময়প্রকাশ করে, এবং তাদের মধ্য থেকে একজন বালকটির দিকে এগিয়ে আসে। এই এগিয়ে আসা লোকটি কদাকার দেখতে একজন প্রৌঢ়, যার মুখে লম্বা দাড়ি ছিল। আমি বালকটিকে ভয় না পেতে বললাম, এবং তার সাথে এই আপাতঃ অমার্জিত ব্যক্তিটির পরিচয় করিয়ে দিলাম। ইন্ডিয়ানটি খুবই সাবধানে এবং ভদ্রতাসহকারে ছেলেটির মাথার হ্যাটে হাত বুলাল; এর পরে সে তার কাপড়ে হাত বুলিয়ে পরখ করে দেখল, এবং এই পুরো সময় সে নিজের মত করে বিড়বিড় করতে থাকল। এই পর্যায়ে এসে আমি বালকটিকে সরিয়ে নেওয়াটা প্রয়োজন মনে করলাম, যেহেতু সে এই অপরিচিত লোকের সান্নিধ্যে কিছুটা ভয় পাচ্ছিল বলে আমার মনে হলো, যদিও তাতে বৃদ্ধ লোকটির কোন দোষ ছিল না। এই ঘটনা থেকে আমার বরং এটাই মনে হলো যে তাদের আর আমাদের মাঝে বেশ অনেক মিল আছে, কেননা তাদের সাথেও কিছু কিশোর ছেলেপুলে ছিল, এবং বয়স্করা সেইসব বাচ্চাদেরকে আমাদের থেকে খানিকটা দূরে, পেছনের দিকে আড়াল করে রেখেছিল।

এই পর্যায়ে আরো কিছু আদিবাসী এসে আগের দলের সাথে যোগ দিল, এবং আমরা তাদেরকে বেশ কিছু উপহার দিলাম। আমাদের দেওয়া খেলনাগুলো তারা তেমন মূল্যবান কিছু মনে করেছে বলে মনে হলো না। এর পরে দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হলেও তারা আমাদেরকে বিনিময়ে কোন উপহার দেওয়ার উদ্যোগ নেয় নি। অবশ্য ঠিক আসার আগে আগে তাদের কাছ থেকে আমরা একটা আয়নার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে বড়সড় কোন প্রাণী শিকারের উপযোগী একটা বেশ শক্তপোক্ত লাঠি উপহার পেলাম। তারা সম্ভবতঃ আমাদের দাড়ি না থাকার কারণে আমরা যে পুরুষ নাকি মহিলা, সেটা নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়েছিল, এবং পরে যখন তারা সেটা বুঝতে পারল, তারা অট্টহাসি হেসে এমন উচ্চস্বরে ও দ্রুতলয়ে পরস্পরের সাথে কথা বলতে লাগল, যা আমি আগে কোথাও দেখি নি। এভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক ইশারা-ইঙ্গিত ও শরীরী ভাষা দিয়ে কথাবার্তা চলল এবং তার পরে তারা উপসাগরের মাথার দিকে চলে গেল। আমাদের সাথে কথাবার্তার সময়ে তারা প্রায়ই একটা শব্দ উচ্চারণ করছিল – ‘whurra’ বা হুরা, যার অর্থ হলো অভিভূত হওয়া বা অবাক হওয়া।

আদিবাসীরা চলে যাওয়ার পরে আমরা এই দেশটির অভ্যন্তরভাগ দেখার জন্য খানিকটা ভেতরের দিকে যেতে মনঃস্থির করলাম। একটু এগিয়েই আমরা আশাহত হলাম, কেননা দেশটির স্থলভাগ ছিল মূলতঃ বালুময় এবং চাষাবাদের পক্ষে নিতান্ত অনুপযোগী, যদিও তাতে কয়েক প্রকারের গাছগাছালি ও ঘাসের প্রাচুর্য্য দেখা গেল। আমাদের অদূরে সেই ঝরনা দেখা গেল, যার কথা ক্যাপ্টেন কুক বলে গিয়েছিলেন, তবে সেই ঝরনার পানি খুব একটা ভাল মানের বলে আমাদের মনে হলো না। ঝরনার পানি যে খুব একটা বড় ধারায় প্রবাহিত হচ্ছিল, তাও না। সন্ধ্যার দিকে আমরা আমাদের জাহাজে ফেরত গেলাম, আমাদের সেই যাত্রার শেষভাগের হতাশাব্যাঞ্জক পর্যবেক্ষণের কারণে খানিকটা বিমর্ষ হয়ে। অভিযানের শুরুতে এই দেশের মাটি ও পরিবেশের অল্পকিছু নমুনা দেখেই আমরা কাতর হয়েছিলাম, আর সন্ধ্যা হতে হতে সেই শোক বেড়ে আমাদের পাথর হওয়ার দশা হলো।

আদিবাসীদের প্রথম দলের সাথে সাক্ষাতের পরে আমাদের সন্ধ্যায় জাহাজে ফেরার আগ পর্যন্ত আরো কয়েকটি আদিবাসী দলের সাথে আমাদের দেখা হলো। প্রতিবারেই তাদের সাথে সাক্ষাত বেশ বন্ধুত্বপূর্ণভাবে শেষ হলো। ফলে আমাদের মনে একটা ধারণা হলো যে, হয়তো তাদের সাথে আমাদের একটা সুসম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব। আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য ছিল তাদের আস্থা ও ভালবাসা অর্জন করা, এবং দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে আমাদের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে অবহিত করা বা বুঝিয়ে দেওয়া। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এটা ছাড়া প্রথম উদ্দেশ্যটা গুরুত্বহীন হয়ে যায়।

আমাদের একজন অফিসার একদিন তাদের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর সময় একটা গাছের বাকল দিয়ে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বেশ খানিক দূর থেকে তার পিস্তল দিয়ে সেই লক্ষ্যভেদ করে দেখাল। ইন্ডিয়ানরা সেই আওয়াজে ভীত-সন্ত্রস্ত হলেও দৌড়ে পালায় নি, বরং তারা বেশ মনোযোগ দিয়ে বুলেট এবং ছিদ্র হওয়া লক্ষ্যবস্তুটি পরীক্ষানীরিক্ষা করে দেখতে থাকল। তারা যে খুবই অবাক হয়েছে, তা তাদের আচরনে বেশ বোঝা গেল। পরিস্থিতিটা অস্বস্তিকর হয়ে যাচ্ছে দেখে সেই অফিসার তখন ফরাসী বিষাদগীতি ‘মালব্রুক’ এর সুর শিস বাজিয়ে গাইতে থাকেন। তার এই গান গাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের মনের আতঙ্ক দূর করা এবং তাদের মধ্যে হিংসার উদ্রেক না হতে দেওয়া। (মূল গানটি হলো Malbrooke s’en va-t-en guerre – যা একটি পুরাতন ফরাসী বিরহের গান, যার সুরগুলো ইংরেজী গান ‘we won’t go home till morning’ এর মত। Sydney’s First Four Years, 1797)। আদিবাসীরা গানটি শুনে প্রীত হলো এবং খুবই আগ্রহ ও উদ্দীপনা সহকারে তার সাথে সুর মেলাল। এখানে একটা কথা উল্লেখ না করে পারছি না যে, পরবর্তীকালে আমাকে জনাব লা পেরুজ (ফরাসী অভিযাত্রিক Monsieur La Perouse) বলেছিলেন, তিনি যত জায়গায় গিয়েছেন, তার প্রায় সবখানেই আদিবাসীদের মাঝে এই ছোট ফরাসী বিষাদের গানটি বেশ হৃদয়স্পর্শী ও আনন্দময় সুর বলে বিবেচিত হয়েছিল, তা হোক ক্যালিফোর্নিয়ার আদিবাসীদের মাঝে কিম্বা প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দ্বীপগুলোর আদিবাসীদের মাঝে।


সাগরসেনা ও কয়েদীদেরকে জাহাজ থেকে ভূমিতে নামানোর মাধ্যমে পোর্ট জ্যাকসনের দখল নেওয়া

বোটানী বে থেকে পোর্ট জ্যাকসনে আসতে আমাদের কয়েক ঘণ্টা লেগে গিয়েছিল, তবে সেই সময়টুকু বেশ আনন্দের সাথেই কেটেছিল। সন্ধ্যাটা বেশ উজ্জ্বল ছিল, এবং আমাদের সামনে আশাবাদী হওয়ার মতন নানা ইশারা ও সংকেত দেখা যাচ্ছিল। যে দুটো অন্তরীপ পোর্ট জ্যাকসনের প্রবেশমুখ রচনা করেছে, তা অতিক্রম করার পরে আমরা আমাদেরকে একটা সুরক্ষিত ও নিরাপদ বৃহদাকার বন্দরে আবিস্কার করলাম – এমন নিরাপদ ও পছন্দনীয় বন্দর আমরা কেউই আগে দেখিনি। আমরা পোতাশ্রয় বা হারবারের ভেতরের দিকে পশ্চিমমুখী হয়ে প্রায় মাইল চারেক অগ্রসর হলাম, এবং দুই পাড়ের সবুজ বনানী আমাদেরকে মুগ্ধ করলো। এইসব এলাকায় মাঝে মাঝেই ইন্ডিয়ানদের দেখা পাওয়া গেল। এভাবে যেতে যেতে আমরা দক্ষিণ তীরে একটা ছোট উপসাগর পেলাম, যা বাতাস ও সমুদ্রস্রোত থেকে বেশ সুরক্ষিত। এই উপসাগরের তীরে আমরা যে নামব এবং উপনিবেশের ভিত্তি গাড়ব, তা যেন নিয়তি আগে থেকেই নির্ধারিত করে রেখেছিল বলে আমাদের মনে হল।

সাগরসেনা এবং কয়েদীদের একাংশের অবতরণ সম্পন্ন হলো পরের দিন, এবং তার পরের দিন বাকী সকলে ভূমিতে অবতরণ করল। এর পর থেকে সকলেই নানাভাবে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ল, এবং এই যে বসতি স্থাপনের জায়গাটি, তা যদি আমাদের বাইরে থেকে কেউ দেখতে পেত, তাহলে তারা এর সৌন্দর্য্যে অভিভূত না হয়ে পারত না। একখানে কিছু লোক গাছ কাটছে, আরেকখানে কয়েকজনে মিলে কামারের হাপর বসাতে ব্যস্ত, তৃতীয় আরেকদল লোক বস্তাভর্তি পাথর বা অন্যান্য সামগ্রী টানাটানি করছে, একজন অফিসার তার ছাউনি বসানোর জায়গা ঠিক করছে – একদল সৈন্য তাকে সে কাজে সাহায্য করছে, তাদের পাশেই বাবুর্চীর চুলার আগুনে আশেপাশের এলাকাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। বিভিন্ন কার্যবিভাগের দায়িত্বে যারা নিযুক্ত ছিলেন তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অল্পদিনের ভেতরেই পুরো বসতিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলো, এবং ধীরে ধীরে উপনিবেশের দৈন্দন্দিন জীবনের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রাথমিক অনিশ্চয়তা ও অনিয়মের জায়গায় নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রাধান্য দেখা গেল।

যে উপসাগরের মাথায় আমাদের বসতি স্থাপিত হল, তার ঠিক গোড়ার দিকে একটা ছোট মিঠাপানির নদী আছে, যা নিকটবর্তী সমতল অভ্যন্তরভাগকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। এই ছোট নদীর পূর্ব পাড়ে একটা প্রশস্ত জায়গাকে গভর্নর নিজে তার বাসার জন্য বাছাই করলেন, এবং তার পাশেই বিপুল সংখ্যক কয়েদীর শিবির স্থাপন করা হলো। পশ্চিমপাড়ে সাগরসেনাদের শিবিরের কাছে বাকী সকলের জায়গা হবে বলে ঠিক করা হলো। এই সাগরসেনাদের থেকে বাছাই করে দুটো পাহারাদার বাহিনী গঠন করা হলো, যার প্রতিটিতে থাকলো দুইজন সাব-অল্টার্ন, দুইজন সার্জেন্ট, চারজন কর্পোরাল, দুইজন ড্রামবাদক এবং বিয়াল্লিশজন করে সিপাহী। এই পাহারাদার দলদুটো কর্তব্যরত ক্যাপ্টেনের কাছে প্রতিদিন রিপোর্ট করবে, এবং উপনিবেশের বাকী সকলেও সেই ক্যাপ্টেনের কাছে যাবতীয় বিষয়াদি রিপোর্ট করবে। এই দলদুটোকে সর্বসাধারণের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হলো এবং তাদেরকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করার অনুমতি দেওয়া হলো। এমনকি বিশেষ জরুরী অবস্থায় জনস্বার্থে এবং উপনিবেশের শৃঙ্খলা ও শান্তি রক্ষার্থে তারা বেয়নেট দিয়ে কাউকে হত্যাও করতে পারবে, তেমন ব্যবস্থা রাখা হলো।

যদি কয়েদীরা কাজকর্ম ফাঁকি দিয়ে দলছুট হয়ে ঘুরে বেড়াতে বা পালাতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন উপনিবেশের সরকারী কাজকর্মের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে তেমনি স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে এইসব দলছুট কয়েদীর যোগাযোগ উপনিবেশের পক্ষে অশুভ ফলাফল বয়ে আনতে পারে। ফলে এই ব্যাপারে শুরু থেকেই বেশ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়েছিল, যাতে এমনটা না ঘটতে পারে। উপনিবেশের প্রভোস্ট-মার্শালকে একটা বাহিনী দেওয়া হয়েছিল আমাদের বসতির চারপাশের এলাকা টহল দেওয়ার জন্য, এবং পালিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ শাস্তি কেমন হতে পারে, তা কয়েদীদেরকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সব রকমের সাবধানতার পরেও তাদের কেউ কেউ বোটানী বে এলাকার দিকে পালিয়ে গিয়ে ফরাসীদের সাথে দেখা করেছিল, এবং ফরাসীরা এই সাক্ষাতের ঘটনা থেকে সর্বোচ্চ ফায়দা লুটার জন্য তৈরী ছিল।

তবে কেবলমাত্র শাস্তির উচ্চ মাত্রা এইসব মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে অপর্যাপ্ত ছিল। ফলে নানা সময়ে কয়েদীদেরকে নানাভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল যে, তাদের ভাল আচরণ এবং বিনয়াবনত চালচলন ভবিষ্যতে তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করে বাছাই করতে সাহায্য করবে, এবং সেটা তাদের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনবে। অবশ্য এই ঘোষণা দ্বারা আমরা যেমন ভাল ফলাফল আশা করেছিলাম, বাস্তবে তার কিছুই ঘটে নি, এবং তা দেখে আমার খেদ প্রকাশ ছাড়া অন্য কিছু করার ছিল না। অল্প কিছু ক্ষেত্রে এই প্রণোদনা যে কাজ করেছিল তা অস্বীকার করছি না, তবে সেই সাফল্যের হার খুব কম ছিল। এই সব ভাগ্যহত মানুষদের অবস্থা যে আসলেই খুব শোচনীয় এবং অভূতপূর্ব রকমের ভিন্ন ছিল, সেটাও যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য হবে; ফলে তাদেরকে কিভাবে যে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে রাখা যেতে পারে, তা বুঝতে আমাদের খুবই বেগ পেতে হয়েছিল। জাহাজে থাকা অবস্থায় নারী ও পুরুষদেরকে খুবই কঠোরভাবে আলাদা রাখা হয়েছিল; তবে ভূমিতে অবতরণের পরে তাদেরকে আলাদা রাখা একটা অবাস্তব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। সেটা করাটা হয়তো সম্ভব হতেও পারতো, তবে তা একটা ভুল কাজ হত নিঃসন্দেহে। অনিবার্যভাবেই লাম্পট্য ও যৌন লোলুপতার বাড়াবাড়ি দেখা গেল, এবং পুরাতন অভ্যাশবশতঃ তাদের অনেকেই নানা ভ্রষ্টাচারে লিপ্ত হতে থাকলো। এই অবস্থায় আমাদের কি করা উচিত? তাদের মাঝে যৌন সম্পর্ক বন্ধ করাটা বলতে গেলে অসম্ভব; শুধুমাত্র এর খারাপ দিকগুলোকে কমিয়ে আনার দিকেই আমাদের যাবতীয় চিন্তাভাবনা নিবন্ধ ছিল। বিয়ের পরামর্শ দেওয়া হলো তাদেরকে, এবং যারা সদাচারের মাধ্যমে বসতির শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখলো, তাদেরকে কিছু বিশেষ সুবিধাদি দেওয়া হলো।

আমাদের অবতরণের পরের রবিবার বসতির প্রধান যাজক, রেভারেন্ড জনসনের নেতৃত্বে একটা বড় গাছের নীচে প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হলো। সেখানে অন্য এমনকি সকল সৈন্য এবং কয়েদীরাও উপস্থিত ছিল, এবং তাদের সকলের আচরণই ছিল স্বাভাবিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। এর পর থেকে প্রতি রবিবারেই এটা ঘটতে থাকল, জাহাজগুলো বন্দরে যতদিন ছিল। তাছাড়া রেভারেন্ড জনসন জাহাজগুলোকে নানা বইটই দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলেন, যাতে সকলের মধ্যে ধর্মানুরাগ ও নিয়মানুবর্তিতাকে উতসাহিত করা যায়।

আমাদের আসার অল্প কয়েক দিন পর থেকেই ইন্ডিয়ানরা (আদিবাসীরা) ঘণ ঘণ আমাদের সকাশে আসতে থাকল। তার কিছুদিন পর থেকে তাদেরকে খানিকটা ভীত বা লাজুক মনে হতে থাকল। হঠাত কেন তাদের সাথে আমাদের এই দূরত্ব ঘটল, তা আমাদের পক্ষে ঠাহর করাটা প্রায় অসম্ভব ছিল। আমাদের সাথে যখনই তাদের দেখা হয়েছে, আমরা তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করেছি এবং তাদেরকে নানা উপহারাদিও দিয়েছিলাম। তাদের সাথে আমাদের কোন গণ্ডগোলের ঘটনাও ঘটেনি। আমরা বরং তাদের মাঝে গভর্নর ফিলিপের প্রথমবার স্বাগত সম্ভাষণ লাভের পর থেকেই এই কথাটাকে আপ্তবাক্য মেনেছিলামঃ তাদের সাথে আমাদের এমন সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া দরকার, যাতে দুই পক্ষই লাভবান হতে পারে। তারাও আমাদের মানুষজনকে বেশ আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছিল, এবং আমাদের পক্ষ সমুদ্রের তীরে যে সীমারেখা এঁকেছিল দুই পক্ষের সীমানা হিসেবে, তা মেনেও নিয়েছিল। তারা সেই সীমানা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল না, কিম্বা সেটা ভঙ্গ করার কোন উদ্যোগও তাদেরকে নিতে দেখা যায় নি।

[225 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0