[ইয়োভাল নোয়াহ হারারির নতুন বই Homo Deus – A Brief History of Tomorrow এর ভাবানুবাদের একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে নিচের এই সিরিজ। এটি পুরো বইয়ের ভাবানুবাদ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ ও বেশিরভাগ অংশের সারসংক্ষেপের একটি প্রচেষ্টা]

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধে আপনার মারা যাওয়ার যতটুকু সম্ভাবনা, তার থেকে আত্মহত্যায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। না খেয়ে থাকার চেয়ে খেতে খেতে আপনার মোটা হয়ে এর জটিলতায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

কয়েকশো বছর আগেও সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যেতো দুর্ভিক্ষ, প্লেগ আর যুদ্ধে। দুর্ভিক্ষ বা কোন রোগের মহামারি হলে আমাদের দাদা, বা দাদার দাদা বলতেন, “সব আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি যা করেন ভালোর জন্যি করেন”- এই বলে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন- আল্লাহ তুমিই সহায়। তারপর হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া তাদের আর কোন কাজ ছিল না। আজ এরকম কিছু হলে আমরা মনে করি, কোন এক হারামজাদা বা কোন এক সংস্থা বা কোন কর্তৃপক্ষ তাদের কাজে গড়মিল করেছে। আমরা তদন্ত কমিটি বসাই, যাতে ভবিষ্যতে এরকম সমস্যায় আমরা না আর ভবিষ্যতে না পড়ি। আমাদের দেশে হয়তো বেশিরভাগ তদন্ত কমিটি আলোর মুখ দেখে না, অন্যান্য দেশে তা নয়। ইতিহাসে প্রথম বারের মতো, খরা, ইবোলা বা আল-কায়েদার আক্রমণের চেয়ে ম্যাকডোনাল্ডসের বার্গার খেয়ে এখন আপনার মরার সম্ভাবনা বেশি।

আগে মরা খুব সহজ ছিল। সামান্য ভুল, বা অল্প দূর্ভাগ্য পুরো পরিবার বা গ্রামের মৃত্যু ডেকে আনতে পারতো। একটু বেশি বৃষ্টি হয়েছে, আর আপনার সকল গম নষ্ট হয়ে গিয়েছে, বা ডাকাতরা সব ছাগল নিয়ে গেছে – আপনার আর আপনার পরিবারের না খেয়ে মরার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল।

১৬৯২-৯৪ এ শুধু ফ্রান্সে দুর্ভিক্ষে সময় মারা গিয়েছে ২৮ লাখ মানুষ। শুধু ব্রিটিশ শাসনামলে গ্রেট ইন্ডিয়ান ফ্যামিন হয়েছে ৩টা, আর গ্রেট বেঙ্গল ফ্যামিন ২ টা।

14666108_1589518537740811_676756125257677488_n

হাজার হাজার বছর ধরে হলুদ সম্রাটদের সময় থেকে লাল কমিউনিস্টদের সময় পর্যন্ত প্রতি বছর চীনের কোথাও না কোথাও দুর্ভিক্ষ হয়েছে।১৯৭৪ এ যখন প্রথম ওয়ার্ল্ড ফুড কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় তখন ডেলিগেটদের বলা হয়েছিল, চীনের সামনে সমূহ বিপদ। এতো কোটি মানুষকে খাওয়ানোর কোন উপায় নেই। সেই চীন এখন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ দুর্ভিক্ষমুক্ত। হ্যাঁ, এখনো সেখানে অপুষ্টি আছে। তবে অপুষ্টি আর দুর্ভিক্ষ এক কথা নয়।

আঠারো শতকে মেরি এন্টোনিও তার দরিদ্র প্রজাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, এদের যখন খাওয়ার রুটি নেই তাহলে এরা কেক খায় না কেন? রাণী মেরি ভাত আর বিরিয়ানীর পার্থক্য না বুঝে এই মন্তব্য করেছিলেন। অবশ্য আজ দরিদ্ররা রাণীর কথাই মেনে চলছে। বেভারলি হিলসের কোটিপতিরা যখন লেটুস পাতার সালাদ খায়, তখন আমেরিকার বস্তির গরীবরা খাচ্ছে পিজা আর হ্যামবার্গার।

শুধু ২০১৪ তে যত মানুষ অপুষ্টিতে আক্রান্ত, তার ২.৫ গুণ বেশি মানুষের ওজন অতিরিক্ত বেশি। ২০১০ এ অপুষ্টিতে মারা গেছে ১০ লাখ মানুষ। আর মোটা হওয়ার বিভিন্ন জটিলতায় মারা গেছে ৩০ লাখ।

আজ আমরা গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন নিয়ে চিল্লাচিল্লি করি। পৃথিবীতে প্রথম যে জিনিসটা গ্লোবালাইজেশন হয় তার নাম রোগ জীবাণু।
কলম্বাস যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ পোঁছেন তখন তিনি সাথে করে তিনটি জিনিস নিয়ে যানঃ
১. গান পাউডার।
২. শান্তির বাণী বাইবেল।
৩. রোগ জীবাণু।

এবং ইতিহাস স্বাক্ষী নেটিভ আমেরিকানদের যতজন গান পাউডারে মারা গেছে তার কয়েক গুণ মারা গেছে এই আমদানী করা রোগ জীবাণুতে।
৫ মার্চ ১৫২০। কিউবা হয়ে মেক্সিকোর দিকে রওনা দেয় ছোট্ট একটা স্প্যানিশ নৌবহর। জাহাজে ৯০০ স্প্যানিশ সৈন্যের পাশাপাশি ছিল গানপাউডার, ঘোড়া আর কয়েকজন আফ্রিকান দাস। ফ্রান্সিসকো ডি ইগুইয়া, আফ্রিকান দাসদের একজন, নিজেও জানতো না, সে তার শরীরে একটি টাইম বম্ব নিয়ে ঘুরছে- গুটি বসন্ত বা স্মল পক্স।

মেক্সিকোর ক্যামপোএলান পৌঁছার পর জ্বরের সাথে সাথে তার শরীরে অসম্ভব র‍্যাশ তৈরী হওয়া শুরু হয়। তাকে এক নেটিভ আমেরিকান ঘরে নেয়া হয়। ফ্রান্সিসকো থেকে স্মল পক্স ছড়ায় নেটিভ পরিবারে, তাদের থেকে তাদের পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে। ১০ দিনের মধ্যে ক্যামপোএলান হয়ে উঠে কবরস্থান। সমস্যা এখানে শেষ হয়ে গেলে পারতো। সাদা মানুষদের এই জাদু দেখে যে সব নেটিভ শহর ছেড়ে পালায়, তারা স্মল পক্স মেক্সিকো ছাড়িয়ে ছড়িয়ে দেয় দক্ষিণ আমেরিকায়। ৯ মাসের মধ্যে মেক্সিকোর ৮০ লাখ মানুষ মরে সাফ হয়ে যায়।

সেপ্টেম্বর মাসেই এই বসন্ত পৌছায় এজটেক রাজধানী টেনোকটিটলান। দুই মাসের মধ্যেই আড়াই লাখ প্রজার সাথে মারা যান মহান সম্রাট কুইটলাহুয়াক।

বিনিময়ে সাদা চামড়ারা যে কিছু পায়নি তা নয়। নেটিভ আমেরিকানদের স্মল পক্সের মতো ভয়ঙ্কর কিছু না থাকলেও এডভেঞ্চারাস সেক্স লাইফের কারণে সিফিলিসের মতো ভালোবাসাময় একটা রোগ ছিল। স্প্যানিশরা ভালোবাসা আর রেপের বিনিময়ে এই সিফিলিস নিয়ে আসে ইউরোপে। সেই সিফিলিস নেটিভ আমেরিকান থেকে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কাউকেই বাদ দেয়নি।

আমদানি করা এই সিফিলিসের সাথে যক্ষা আর ফ্লু এর জীবাণু নিয়ে ক্যাপ্টেন জেমস কুক পৌঁছেন হাওয়াই। ক্যাপ্টেন কুকের পর অন্যান্য ইউরোপিয়ান মেহমানরা সেখানে নিয়ে আসেন টাইফয়েড আর স্মল পক্স। ৬০ বছরের মাথায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

১৯১৮ তে ফ্রান্সে যুদ্ধরত সৈনিকরা আক্রান্ত হয় ইনফ্লুয়েঞ্জার একটি মিউটেটেড স্ট্রেইনে- স্প্যানিশ ফ্লু। যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইন হচ্ছে গ্লোবাল ট্রেড নেটওয়ার্কের সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ। ১ম বিশ্বযুদ্ধে এই ফ্রন্ট লাইনে সৈন্য আর অস্ত্র আসতো ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত আর অস্ট্রেলিয়া থেকে, তেল আসতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে, খাবার আর মাংস আর্জেন্টিনা থেকে, রাবার মালয় আর তামা কঙ্গো থেকে। বাণিজ্যের এই বিশ্বায়নের বিনিময়ে সব দেশ পায় স্প্যানিশ ফ্লু। ১ বছরে এই ফ্লু হত্যা করে ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি মানুষ। পাঁচ বছরের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যায় ৪ কোটি মানুষ।

আগে মানুষ এই রকম মহামারি দেখা দিলে দোষ দিতো খারাপ বাতাস, আর রাগী ঈশ্বরের উপর। মায়ানরা দোষ দিতো একপেটজ, উজান্নাক আর সোজাকাক এর উপর। এজটেকরা দোষ দিতো টেজকাটলিপোকা আর জাইপ এর উপর। নামাজ পড়া, পূজা দেয়া আর কপাল চাপড়ানো ছাড়া তাদের আর কিছু করার ছিল না। মানুষ খুব সহজেই পরী আর ফেরেশতায় বিশ্বাস করে, কিন্তু চিন্তাও করতে পারেনি ক্ষুদ্র মাছি বা এক ফোঁটা পানিতে আযরাইলের পুরো একটা বাহিনী থাকতে পারে। ১৩৩০ এ মাছি আর ইঁদুর দিয়ে Yersinia pestis ছড়িয়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষ মারা যায়। আমরা এর নাম দিয়েছি প্লেগ। আমাদের পূর্ব পুরুষরা এর নাম দিয়েছিলেন ব্ল্যাক ডেথ।

14720348_10154816524564674_6802801138779804293_n

কিন্তু দুনিয়াটা এখন বদলেছে। ধন্যবাদ ভেক্সিনেশন, ধন্যবাদ এন্টিবায়োটিক, ধন্যবাদ বিজ্ঞান, ধন্যবাদ ডাক্তার।

যেই স্মল পক্স কোটি কোটি মানুষ মেরেছে, আজ তার উপর মানুষ জয়ী। কয়েক বছর পর পর দুই একটা নতুন মহামারি দেখা দেয়- সারস, সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা। কিন্তু, তারা খুব বেশি মানুষকে আযরাইল দেখানোর আগেই আমরা তাদের আযরাইল দেখিয়ে দেই।

গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ফেইলিওর ধরা হয় এইডসকে। কিন্তু এখন এইডস বা ম্যালেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগের বদলে বেশি মানুষ মারা যায় ক্যান্সার আর হার্ট ডিজিজে। অবশ্য ক্যান্সার আর হার্ট ডিজিজ প্রাচীন রোগ। শুধুমাত্র, আগে ক্যান্সার হওয়ার মতো বয়সে পৌঁছানোর আগেই মানুষ অন্যান্য রোগে মারা যেতো।

অনেকে ভয় পান সামনেই হয়তো নতুন কোন ব্ল্যাক ডেথ অপেক্ষা করছে। নতুন সংক্রামক রোগ তৈরীর ক্ষমতা জীবাণুর ভাগ্যের উপর নির্ভর করে- কখন একটা মিউটেশন হবে। কিন্তু ডাক্তাররা ভাগ্যের উপর নির্ভর করেননা। প্রতি বছর তাঁরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে নতুন ঔষধ তৈরি করছেন।
২০১৫ তে সর্বশেষ আবিষ্কৃত এন্টিবায়োটিক হচ্ছে Teixobactin. এর বিরুদ্ধে এখনো কোন রেজিস্ট্যান্স তৈরী হয়নি। অনেক রিসার্চ ল্যাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ন্যানো রোবট। হ্যাঁ, মাইক্রোঅর্গানিজমের আমাদের মত জৈব শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ৪০০ কোটি বছরের অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু আমরা আশাবাদী। কারণ আমাদের তৈরী এই বায়োনিক রোবটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তাদের শূণ্য দিন।

#Homo_Deus_ইয়োভাল_হারারি | ভাবানুবাদ | চ্যাপ্টার ১ কিস্তি ১ ও ২

[370 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0