শুভ জন্মদিন, জীবনবতী। এই উত্তুঙ্গ প্রযুক্তির যুগেও তোমার সাথে যোগাযোগের কোনো উপায় নাই। আমরা, পৃথিবীর তাবৎ কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা ব্যর্থ। তোমার বায়বীয় আল্লাহ্ সফল।

তোমার এই আল্লাহ্ চমৎকার খ্যালেন। তোমার প্রেম, তোমার পরিণয়, তোমার পুত্রলাভ – কিছুই গোপন রাখেন না। আমার কানে কীভাবে কীভাবে যেন সব চলে আসে। অথচ তোমার সঙ্গে যোগাযোগের সব পথ কীভাবে কীভাবে যেন রুদ্ধ হয়ে যায়।

আমি ভ্রান্ত মানুষ। আমি প্রতিবার ভ্রান্ত ছিলাম। ভুল করে তোমাকে একদিন আগে অভিবাদন জানিয়ে দিতাম। ২০ নভেম্বর রাত বারোটা এক মিনিটে কবিতা লিখে পাঠাতাম। আর, তুমি ফোন করে বলতে, “কবি সাহেব, আমার জন্মদিন ২১ নভেম্বর।”

আমাকে তুমি ‘কবি সাহেব’ বলে ডাকতে। অথচ আমি খুব হাস্যকর রকমের কবিতা লিখতাম তখন। তুমি ওগুলোকেই ভালবেসে তোমার নরম বুকে চেপে রাখতে। আমার কবিতাগুলো ঘেমে যেতো। আজ ওগুলো বঙ্গোপসাগরে। তুমিই ফেলে এসেছিলে। আমাকে জানিয়েও ছিলে। কালিগুলো সব সাগরে মিশে গ্যাছে। অথচ সাগর আজো নীল, অর্থাৎ বর্ণবিহীন। একটুও কালো হয় নি। আমি বুঝে গ্যাছি, আমার আবেগ কতো ঠুনকো।

নির্মলেন্দু গুণের একটা কবিতা আছে, যার শুরুর দিকের কথাগুলো কিছুটা এমন – একদিন আমার ব্যর্থ কবিতাগুলো যাকে ঘরের বাইরে টেনে এনেছিলো, আজ আমার শ্রেষ্ঠতম কবিতাগুলো তার দুয়ার থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। কবিতাটা তুমিই আমাকে প্রথম শুনিয়েছিলে। এখন তোমার মনে পড়ে ওসব?

আজ আমি ঠিক ২১ নভেম্বরেই তোমায় অভিবাদন জানালাম। অথচ তুমি জানবে না কখনো। তোমার কখনো কৌতুহলও হবে না – আমি মনে রেখেছি কিনা। হয়তো তোমার এখন এটাও মনে পড়ে না, আজ তোমার জন্মদিন। এখন তুমি চাল-ডালের হিসাব কষো। নীল পর্দার নকশা আঁকো। এখন তুমি সন্তানের বুকে স্তন ধরো। এখন হুমায়ুন আজাদ মৃত, জীবনানন্দ ট্রামে পিষ্ট। এখন তুমি “জোনাকির আলোর খসে পড়া” কল্পনা করে কেঁপে ওঠো না। এখন তুমি শাড়ি পরে দেখা করতে আসো না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শাড়ি খুলে পড়বে – এমন আশঙ্কায় থাকো না। এখন তুমি আমার হাত ধরে দুই পা একইসময়ে শূণ্যে তুলে আর নামিয়ে – লাফাতে লাফাতে সিড়ির প্রতিটি ধাপ বেয়ে নামো না। “আমি দুই হাত মেলে ধরেছি, আকাশ / আমাকে তোমার নীলে মিশতে দাও” – প্রচণ্ড বেদনায় এইসব আর মাথায় আসে না তোমার। এখন তো তোমার বেদনা নেই, কারণ এখন তোমার অনুভূতি নেই। এখন তুমি নিরন্তর কর্ষিত হও। অনুভূতিহীন দুচোখ রুদ্ধ করে এখন তুমি নিয়মিত নিজেকে সমর্পণ করো। অথচ তোমার গর্ধবটা কি বোঝে কিছু? এখন কে তোমার নগ্ন শরীর দেখে কিছুক্ষণ স্তম্ভিত – নিষ্ক্রীয় হয়ে তাকিয়ে থাকে শুধু? এখন কি গোধুলির কমলা ফোটন তোমার শরীর ছোঁবার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় আর? যেমনি আগে তুমি চারদিক থেকে প্রতিযোগিদের ছুড়ে দেয়া হাতের ছোঁয়ায় আরো ঝলমলিয়ে উঠতে? তুমি বড্ড বেশি সুন্দর ছিলে। আমি জানি, এখন তুমি চ্যালাকাঠ। এখন কেউ ছোঁবে না তোমায়; কেবল অযু করে, দীর্ঘক্ষণ সঙ্গমের দোয়া পড়ে কষবে। এখন কি তুমি ভয় পেলে কোনো তৃষ্ণার্ত অনভিজ্ঞ কিশোর দ্রুত শিশ্ন গুটিয়ে তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে?

এখন তুমি নারীবাদী নও। এখন তুমি নিয়ম করে নামাজ – রোজা করো, আর সাপের ছোবল খাও। তুমি জানো, তোমার পতির দাড়ি কবির মতো নয়। তুমি জানো, তোমার পতির গালে ছোপ ছোপ কালোসাপ। তুমি জানো, তোমার পতির কালো জিভ কেবল ছোবল দিতে চায়। তুমি জানো, তোমার পতি আক্ষরিক আশীবিষ। তুমি জানো, ওটা শিশ্ন নয়, যাকে আবেগে চেপে ধরে নাড়ানো যেতো – ঘষা যেতো – ওখান থেকে তরল নিয়ে বুকবৃন্তে চাষ করা যেতো; তুমি জানো, ওটা এক প্রকাণ্ড গোখরো সাপ। তুমি তাই নিস্তেজ; তুমি তাই চোখ বুজে পড়ে থাকো কেবল। তুমি গর্তে পড়ে যাও। গর্তে থাকে আরো সাপ। তোমার সর্বাঙ্গে কেঁচো – জোঁক – আরশোলাদের হায়নার মতো হাসির অনুরণন।

তোমার ভাইয়ের কাছে তোমার বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম। জানতাম লাভ নেই। তারপর তোমার মুঠোফোনের ঠিকানা জানতে চেয়েছিলাম। জানলাম, তুমি ব্যবহার করো না। তুমি নিজেকে একশত আশিটি কারাগারে রুদ্ধ করেছে। তোমার চারপাশে কেবল গরাদ আর গরাদ। তুমি আরো গরাদ তৈরি করছো। তুমি হাতে-পায়ে শিকল পড়ছো। তুমি চোখে শিকল পড়ছো। তুমি নাকে শিকল পড়ছো। একদিন তুমি দেখবে, তোমার নি:শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে। তারপর আবিষ্কার করবে, আসলে অনেক আগেই নি:শ্বাস রুদ্ধ হয়েছে। তারপর বুঝবে, তুমি মরে গেছো অনেকদিন আগে। শরীরে তাকালে দেখবে, লক্ষাধিক অজানা বিদঘুটে পরজীবীর বাসভবন।

তোমার আগের জিপি নাম্বার আমি ভুলে গ্যাছি। এয়ারটেল ভুলে গ্যাছি। অনেকদিন পর্যন্ত মনে ছিল। রবি নাম্বার এখনো মনে আছে। সেইভ করা নাই, তবু মনে আছে। ওটায় নিয়মিত বার্তা পাঠাই। অনেক অনেক কথা জমে আছে ওখানে। সিমটা এখন কোথায়? সিটি কর্পোরেশনের ট্রাকে? আমার মোবাইল চুরি গ্যাছিলো, অথবা ছিনতাই। হুইস্কি খেয়ে রিকশায় বসে বান্ধবির সাথে চ্যাট করতেসিলাম। হঠাৎ টান মেরে নিয়ে গ্যালো – এটা চুরি না ছিনতাই? যেটাই হোক, মোবাইলের সাথে সে নিয়ে গ্যাছে তোমার সব ছবি। কিন্তু তোমার বাড়ির সিড়িঘরের সবচে’ উপরতলায় দাড়িয়ে তোমার চোখ বেয়ে মৃতনদীর মতো গড়িয়ে পড়া একটুখানি জলের ছবি হারায় না। যে ছবি তোলা হয় নি, সে ছবি মোছা বড্ড কঠিন।

আমাদের দ্বিতীয়বার চুম্বনের দিনটি মনে নাই তোমার। সেদিন অঝোরে বৃষ্টি নেমেছিল। আমরা রিকশাটাকে বারবার ঘুরাচ্ছিলাম। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। তোমার স্কুলে যাবার তাড়া ছিল। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। তুমি ইউনিফর্ম পড়েছিলে। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। ইউনিফর্মে সুন্দর লাগতো তোমায়। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। আমাদের চার ঠোঁট ভিজতে ভিজতে ফুটে উঠছিলো। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। আমি তোমার কোমরে হাত রেখেছিলাম। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। আমি তোমার কোমর ধরতে ভালোবাসতাম। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। আমি তোমার পেছন দিয়ে হাতটা নিয়ে তোমার বুকে পৌছুতে চাচ্ছিলাম। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। তুমি বাঁধা দিচ্ছিলে। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। তোমার বুক ছুঁয়েছিলাম। সাগরিকা মোড় টু স্টেডিয়াম। স্টেডিয়াম টু সাগরিকা মোড়। আমরা চুমু খেলাম। ভেজা ঠোঁটের পিছলে যাওয়া কামড় আমার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিচ্ছিলো খুব। আমরা চুমু খেলাম। তুমি উত্তেজিত হচ্ছিলে। আমরা চুমু খেলাম। তোমার ধবধবে সাদা দাঁত আমার ঠোঁট কামড়ে পিছলে গ্যালো। – এটাই। হ্যা, আমার ঠোঁটে তোমার পিছলে যাওয়া দাঁতটাই – আমার জীবনের সবচে’ বড়ো তৃষ্ণা। তোমার মনে পড়ে না। আমরা আরো অনেকবার চুমু খেয়েছি। তোমার মনে পড়ে না। কিন্তু তুমি আর কখনো দাঁত বসাও নি। তোমার মনে পড়ে না। আমি প্রতি চুম্বনে তোমার দাঁতের অপেক্ষায় থাকতাম। তোমার মনে পড়ে না। তুমি কিশোরী ছিলে। তোমার মনে পড়ে না। তুমি আজো কিশোরী। তুমি জানো না। তুমি চিরদিন কিশোরী থাকবে। তুমি জানো না। আমি চিরকাল তোমায় ভালোবাসি। তুমি জানো না। আমি চিরদিন অপেক্ষায় আছি। তুমি জানো না। তুমি আজো ভালোবাসো। তুমি জানো না।

একদিন সব মনে পড়বে তোমার। একদিন সব জানবে তুমি। আপাতত শোনো, আমি অনেক বেশি সরি।

[228 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0