লিখেছেনঃ সাইফুল ইসলাম

মার্কিন নির্বাচন নিয়ে, মূলত ট্রাম্পকে ট্রল করা নিয়ে গত কয়েকমাস ফেসবুক এবং ব্লগে রীতিমতো ঝড় বয়ে গেছে । ইচ্ছাকৃতভাবেই পুরোটা সময় জুড়েই নিজেকে এই ঝড়ের বাইরে রেখেছিলাম । নির্বাচন শেষ, সব অনুমান-পরিসংখ্যানকে ভুল প্রমান করে জয়ী হয়েছে ট্রাম্প । ট্রাম্পের এই অভাবনীয় জয় নিয়েও সন্দেহ-অবিশ্বাস মিশ্রিত ট্রলিং হয়েছে বেশ । দুই দিন বাদে সেই ঝড় কিছুটা স্তিমিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে । এবার কিছু সিরিয়াস কথা বলা যাক ।

ট্রাম্প এবং আমাদের অনন্ত জলিলের মধ্যে একটা চমৎকার মিল আছে । তারা দুই জনেই মূলত ব্যবসায়ী এবং দুই জনেই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল । নিজের গন্ডিতে পরিচিত হলেও পাবলিকলি তারা দুইজনেই পরিচিতি পেয়েছেন নিজের ক্ষেত্রের বাইরে এসে । একজন মিডিয়াতে এবং আরেকজন রাজনীতিতে । কিন্তু দুইজনেরই একটা জায়গায় অসম্ভব মিল আছে । কি মিল, সেটা খুঁজে বের করার চেস্টা করবো । এরপর সিদ্ধান্ত নেয়ার চেস্টা করবো, তারা আসলেই বোকা নাকি আমাদেরকেই বোকা বানাচ্ছে তারা ।

১) পারিবারিক সূত্রেই ট্রাম্পরা ব্যবসায়ী । তার বাবা মিলিয়নিয়ার ছিলেন, মারা গিয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি, ১৯৯৯ সালে । মারা যাওয়ার সময় তার সম্পত্তি ছিলো নিউ ইয়র্ক টাইমস এর হিসাবে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার । তবে ট্রাম্প পেয়েছিলেন এর ছোট্ট একটা অংশ । যদিও সঠিক পরিমানটা জানা যায়নি, তবে ধারণা করা হয়, ২০ মিলিয়নের আশেপাশেই হবে সেটা [সূত্রঃ ১] । অনেক বারই ব্যবসায়িকভাবে খাদে পড়ার পরও তিনি এই ১৬ বছরে তার পারিবারিক সম্পত্তির পরিমান বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন প্রায় ১০ গুনের চেয়েও বেশি, যেটা বর্তমানে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার বা ৩৭০০ মিলিয়ন ডলার [সূত্রঃ ২] । আমরা একটা কমন ঘটনা সবসময়ই লক্ষ্য করি যে, পারিবারিকভাবে ধনী ফ্যামিলির সন্তানরা তাদের সেই জৌলুশ ধরে রাখতে পারে না । অথচ ট্রাম্প শুধু যে পেরেছেন তা না, তিনি তার বাবার নেম ভ্যালু ব্যবহার করেছেন অসাধারণভাবে এবং বারবার ব্যবসার বিভিন্ন সেক্টরে দেউলিয়াত্ব ও অন্যান্য ঝামেলায় পড়ার পরেও নিজের বুদ্ধিমত্তা খাঁটিয়ে তার ব্যবসাকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায় । আর আপনারা বলতে চান সে একটা বেকুব? সে কমিক ক্যারেক্টার? প্রশ্ন তুলেন তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে?

২) অনন্ত জলিলের ট্রাম্পের মতো কোন প্রতিষ্ঠিত ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না । তার ভাষ্যমতে, ঢাকার অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে “O” এবং “A” লেভেল এবং ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ [সূত্রঃ ৩] শেষ করার পর সে তার ক্যারিয়ার শুরু করে প্রোডাকশন জেনারেল ম্যানেজার হিসাবে, ১৯৯৯ সালে [সূত্রঃ ৪] । কাকতালীয়ভাবে ট্রাম্পের বাবা মারা যাওয়ার সনও ১৯৯৯ । এরপর সময় গড়িয়েছে, একজন কর্মচারী থেকে সে নিজেই শুরু করেছে গার্মেন্টস ব্যবসা । আর বর্তমানে সে ১৫ টা প্রতিষ্ঠানের মালিক [সূত্রঃ ৫] । RMG(Ready Made Garments) সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সে একবার না, কয়েকবার CIP (Commercially Important Perseon) অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে । ব্যবসাক্ষেত্রের বাইরেও সে প্রচুর সমাজসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত [সূত্রঃ ৬] । ২০০৮ এ যাত্রা শুরু হয় তার চলচিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান “মনসুন ফিল্মস” এর, যার ব্যানারে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে ৬ টা সিনেমা এবং তার মধ্যে ৪ টাই ব্লকবাস্টার হিট । আর আপনারা মনে করেন সে বেকুব? সে আসলেই ইংরেজি বলতে পারে না? সে হাস্যকর কাজ করে এবং সে এটা নিজেও বুঝে না?

৩) অনন্ত জলিলের মতো একজন ব্যবসায়ী, যে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করছে, শুন্য থেকে শুরু করে ১৫ টা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হইছে, একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট মুভি বানাইতেছে, তাকে আমরা মনে করি বেকুব, ইংলিশও ঠিক মতো কইতে পারে না, আউল ফাউল হাস্যকর সিন দিয়ে মুভি ভরিয়ে রাখে । যদি বলি যে, তার এই সব কিছুই ইচ্ছাকৃত? সে ভালোমতোই জানে বাংলাদেশের মানুষের কোন বিষয়ে আগ্রহ বেশি, কিভাবে সেই মানুষদেরকে নিজের সম্পর্কে আগ্রহী করা যাবে । এবং সে সেই কাজই করছে । নিজের পার্সোনালিটির বাইরে বেরিয়ে এসে সে নিজেকে মানুষের সামনে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করছে । মানুষ মজা পাইছে, তাকে নিয়ে মজা করাটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে রীতিমতো, আর সেই মজা করাটাই হয়ে গেছে তার বিনামূল্যে বিজ্ঞাপণ । জাস্ট হাসার জন্য হলেও মানুষ তার সিনেমা দেখতে যায়, কমেডি সিনেও হাসে, সিরিয়াস সিনেও হাসে । ফলাফল মুভি বাম্পার হিট । একজন ব্যবসায়ীর চাওয়াটাইতো থাকে এইটা ।

৪) ট্রাম্পও একই, তার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নাই, যেটা হিলারির আছে । শুধু আছে বললে ভুল হবে, বেশ ভালোভাবেই আছে । সুতারাং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিক থেকে হিলারিকে টেক্কা দেয়া ট্রাম্পের জন্য রীতিমতো অসম্ভব বলা যায় এবং ট্রাম্প সেদিকে যায়ও নাই । সে সরাসরি মানুষের সেন্টিমেন্টের জায়গায় হাত দিছে । রাজনৈতিক প্যাঁচাল না, কোন সুশীলতার মুখোশ না, আমেরিকার মানুষ যা শুনতে চায়, সে সেগুলা শুনাইছে । যেহেতু সুশীলতার মুখোশে সেসব বলে নাই, তাই তার অনেক কথাই সাধারণ পাবলিকের কাছে ফালতু মনে হইছে, পাগলের প্রলাপ মনে হইছে । কিন্তু শুনতে খারাপ হোক বা ভালো, ব্যাপার হইলো, বিশাল একটা অংশের মানুষ সেই কথাগুলাই শুনতে চায়, সে কথাগুলা শুনে নিজেকে বক্তার সাথে কানেক্ট করতে পারে । এবং ট্রাম্পও দিনের পর দিন এটাই করে গেছে । যারা তার কথা পছন্দ করে নাই, তারা তার কঠিন সমালোচনা করতে লাগলো এবং সেইটাও রীতিমতো ট্রেন্ড হয়ে গেলো, যেটা আদতে হলো বিনামূল্যে ট্রাম্পেরই প্রচারণা । এর মধ্যে ফাঁস হলো হিলারির ইমেইল কেলেঙ্কারি, যেটার কারণে ভাসমান ভোটারদের বড় অংশ সরে এলো ট্রাম্পের দিকে । মানুষ দু’মুখো সাপ থেকে সোজাসাপটা পাগলকে বেশি পছন্দ করে । ফেসবুকে ট্রাম্পের অটো মেসেজ নিয়ে আমরা মজা করেছি না অনেক? যদি বলি, এই ধরণের ব্যাপারগুলা ট্রাম্পকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসছে ! হোকনা সেটা অটো মেসেজ, কিন্তু কিছু মানুষের মধ্যে হলেও এই ধারণা আসবে যে, ট্রাম্প সাধারণ পাবলিকের মতামতকে গোনায় ধরে অন্তত । হিলারিকে মেসেজ দেয়ার কোন অপশন কিন্তু ছিলো না ! শুধুমাত্র উপরে বলা এসবের কারণে ট্রাম্প জিতছে, এটা বলা ভুল, শুধু ভুল না, বিরাট ভুল । কিন্তু এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাপারগুলো মিলে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে নির্বাচনে এটা নিঃসঙ্কোচে বলাই যায় ।

৫) ট্রাম্প এবং অনন্ত জলিল দুইজনের কেউই বোকা না । তারা কি ভালো মানুষ নাকি খারাপ, সেটা ব্যাপার না, ব্যাপার হলো, তারা দুজনেই প্রচন্ড চালাক এবং স্মার্ট । অন্য অনেক চালাক এবং সফল মানুষের মতোই তারাও মানুষের মনস্তত্ত্ব পড়তে পারে । আমরা আসলে তাদের সম্পর্কে ভাবি না, তারাই বরং ঠিক করে দেয়, আমরা তাদের সম্পর্কে কি ভাববো ! ১৯৯৮ সালেই পিপল ম্যাগাজিনের একটা সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিল,

“If I were to run, I’d run as a Republican. They’re the dumbest group of voters in the country. They believe anything on Fox News. I could lie and they’d still eat it up. I bet my numbers would be terrific.”

১৮ বছর আগে বলা তার কথাটা কি ভুল হলো? তবে উপরোক্ত কমেন্টের ব্যাপারটা তার বিপক্ষে করা প্রচারণাও হতে পারে [সূত্রঃ ৭] । সে যাই হোক, ট্রাম্প ভালোমতোই জানে তার টার্গেট পিপল কেমন, এবং সে সেভাবেই তার পুরা প্রচারণা চালিয়েছে এবং দিনশেষে সে সফল । শুধু সফল বললে ভুল হবে, গত ৯০ বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে সে তিন ডিপার্টমেন্টেই (প্রেসিডেন্সী, হাউজ এবং সিনেট) জয়ী হয়েছে । নির্বাচনের আগে দেয়া তার বক্তব্যের সাথে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তার দেয়া বক্তব্য মিলিয়ে দেখে দ্বন্দে পড়ে গিয়েছিলেন? মানুষ কিন্তু রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যায় না, তাই না?

শার্লক সিরিজের প্রথম পর্বে (A Study in Pink) সিরিয়াল কিলার ক্যাব চালকের একটা ডায়ালগ আছে,

“I know how people think. I know how people think I think. I can see it all like a map inside my head. Everyone’s so stupid.”

ট্রাম্প এবং অনন্ত জলিল দুই জনের ক্ষেত্রেও এই কথাটা প্রযোজ্য । এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিন, ডাম্ব এবং স্টুপিড কে?

তারা?

নাকি তাদেরকে ডাম্ব এবং স্টুপিড ভাবা এই আমরা?
.
.

.

(এই লেখাটা আমি আমার ফেসবুক পেজে দিয়েছি: লেখক)

[সূত্রঃ ১]
[সূত্রঃ ২]
[সূত্রঃ ৩]
[সূত্রঃ ৪]
[সূত্রঃ ৫]
[সূত্রঃ ৬]
[সূত্রঃ ৭]

[770 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0