লেখকঃ সুমন চৌকিদার।

প্রথম পর্ব

বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত এবং মহাভয়ংকর সমস্যা- ধর্মীয় জঙ্গিবাদ। যা মোকাবেলায় রাষ্ট্রগুলো প্রচণ্ডরকমের দিশেহারা এবং একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার/চুক্তি করছে! কিন্তু ধর্ম মোকাবেলায় (সংস্কারে) কিছুই করছে না! ধর্ম মোকাবেলা না করে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা কীভাবে সম্ভব? বুদ্ধিমানেরা বুঝলেও আমি মূর্খ বুঝি না। কারণ জীবনের শুরুতেই (ধর্মরাষ্ট্রগুলোর) প্রায় প্রতিটি মানুষই এমন এক ইস্পাতকঠিন ও ভাবাবেগপূর্ণ ধর্মশিক্ষা পায়, যা তাকে (অন্য ধর্মের মানুষ থেকে) সম্পূর্ণরূপে আলাদা এক স্বত্তা হিসেবে গঠন করে এবং পৃথিবীর সর্বত্রই স্বধর্মের মানুষদের প্রতি অকল্পনীয় ও অভাবিত অতি আবেগে, ভালোবাসা, সহমর্মিতায়… বন্দি করে ফেলে। ফলে প্রায় সকলেই স্বধর্মের সামান্যতম সমালোচনা সহ্য করার ন্যূনতম ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং অন্য ধর্মের সমালোচনা/কুৎসায়/অপমানে/অত্যাচারে মুগ্ধ হয়।

সুতরাং মনে হয়, ধর্মে (কমবেশি) কট্টরবাদি শিক্ষা না থাকলে, অনুসারীদের একত্রিত রাখা কষ্টসাধ্য। ফলে শিশুকালেই অন্য ধর্ম সম্পর্কে যে প্রাচীর ও বিভক্তির সৃষ্টি করা হয়, ধামির্কদের পক্ষে তা ডিঙ্গেয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনকি একই ধর্মের বিভিন্ন গোষ্ঠির বিভক্তি/বিভাজন ভেঙ্গে ফেলাও অসম্ভব। অথচ ধর্মের এমন বিভক্তি/বিভাজন, কুপ্রথার বিরুদ্ধে কোনো যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেও ধার্মিকগণ রেগে যান; ধর্ম রক্ষার জন্য অযৌক্তিক রকমের মরিয়া হয়ে ওঠেন…। তাই প্রশ্ন জাগে, ধর্মের প্রতি এতো ভালোবাসা, এতো দুর্বলতা, এতো মায়া-মমতা, এতো টান… থাকতেও মানুষ এতো অসৎ হচ্ছে কোনো? অথবা, মানুষ যেহারে ধর্ম পালন করে, সেই হারে সৎ হচ্ছে না কেনো? অর্থাৎ ধর্মের যতোটুকু গুণাগুণ, এর প্রভাব মানুষের জীবনে কতোটুকু কার্যকর? এতে দেশ ও জাতির কতোখানি উপকার হচ্ছে…? এসব প্রশ্নের উত্তর কী?

এছাড়া ধর্ম নিজেই যখন বিভ্রান্তিপূর্ণ, তখন একজন মানুষ এর প্রতি অনুগত থেকে কীভাবে বিভ্রান্ত না হয়ে পারে? রাষ্ট্রের কর্ণধারগণসহ কেউ কী এসব পর্যালোচনা করেছেন? কারণ, যে দেশে ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধার্মিকের অভাব নেই, সে দেশে সততার এতো বেশি অভাব কেনো? বাংলাদেশের ন্যায় ধর্মরাষ্ট্রগুলোতে বাসগৃহের আশে-পাশে বহু ধর্মালয় রয়েছে অথচ নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই কেনো? তা না থাক! কিন্তু যেহারে ধর্মশিক্ষা দেয়া হচ্ছে, সেহারে মানুষ যদি সৎ না-ই হবে, তাহলে ধর্মের মর্যাদা থাকে কী করে? যদিও (অল্প জ্ঞানেই বুঝি), সৎ থাকতে চাইলে ধর্মের প্রয়োজন হয় না, নিজের ইচ্ছাই যথেষ্ট। যেমন নেশা ছাড়ার জন্য নিজের দৃঢ় ইচ্ছাই সর্বোত্তম ওষুধ।

অন্যদিকে, একই ধর্ম পালন করা সত্ত্বেও, একগোষ্ঠি অন্য গোষ্ঠিকে ধার্মিক বলে না বা মনে করে না কেনো? এর কারণও বোধকরি, ধর্মপুস্তকগুলোর বিভ্রান্তিকর বাণী। যেমন, একই বাণীর বহুরকম ব্যাখ্যা দেয়া যায় এবং মনে হয় প্রতিটি ব্যাখ্যাই সঠিক। ফলে এতে যেমন ভালো বাণী আছে, তেমনি বিভ্রান্তিকর ও ধর্মসন্ত্রাসী তৈরির মতো বাণীর সংখ্যাও কম নয়। উদাহরণস্বরূপ- প্রায়ই শুনি, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না; নিজ ধর্মবিশ্বাসী ছাড়া অন্যরা অবিশ্বাসী বা ভ্রান্তবিশ্বাসী; স্বধর্মী ছাড়া কাউকে বন্ধু বানিও না; ধর্ম প্রচার ও রক্ষা করে সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে স্বধর্মে আনার চেষ্টা করো। আরো বলা হয়েছে, অন্য ধর্মের প্রতি জোর খাটিও না; অবিশ্বাসীদের জন্য নরকে কঠিন শাস্তির বিধানও আছে; মানুষ হত্যাকারীর ক্ষমা নেই। অন্যত্র বলা হয়েছে, ধর্ম অবমানাকারী শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; স্বধর্মীকে হত্যা করলে তার বিচার হবে, বিধর্মীকে হত্যা করলে বিচার হবে না… ইত্যাদি। প্রশ্ন হলো, এক ব্যক্তি ধর্মপুস্থক পড়ে, স্ববিরোধি এরূপ বহু বাণী পাঠ করে কী করবেন? লোকটি যদি ভালো বাণীগুলোর চেয়ে খারাপ বাণীগুলোতেই বেশি উৎসাহিত হয় এবং ধর্মসন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য কোনো এক কট্টোর ধর্মগুরুর হাতে পড়ে অথবা নিজে নিজেই ধর্ম বিস্তারের জন্য এবং অবিশ্বাসীদের হত্যা কিংবা সমস্ত পৃথিবী জয় করার উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদ প্রচার শুরু করলো… তখন কী হবে? একথা বলছি কারণ- সম্প্রতি, রাষ্ট্র ও সরকার, উগ্র ধর্মজীবি এবং উগ্র ধর্মশিক্ষার উপর নজরদারির কার্যক্রম চালাচ্ছে (বহু দেরিতে হলেও ভালো লক্ষণ), তবে আসল কাজটি করবে কে? অর্থাৎ উগ্র ধর্মজীবির সংস্পর্শে না এসেও শুধু ধর্মপুস্তকের বিভ্রান্তিকর বাণী পড়েই যে ধর্মসন্ত্রাসী হওয়া যায়, তা ঠেকাবে কে এবং কীভাবে?

মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর সাদা মগজে সর্বপ্রথম যে নাম দুটি লেখা হয়, তাহলো- ঈশ্বর ও শয়তান। যা প্রায় সকলকেই প্রশ্নহীনভাবে, চিরজীবন ধারণ-বহন, লালন-পালন, পুঁজার্চনা… করতে হয়। কারণ শিশুবয়সে মানুষ যা বিশ্বাস করে, এর ভুলভ্রান্তি প্রায়ই খোঁজে না। যেহেতু ধর্ম সম্পর্কে সে প্রথমই শেখে, তার ধর্মই সর্বশ্রেষ্ঠ, এর উপরে কোন ধর্ম নেই, অন্য ধর্ম মিথ্যা, বানোয়াট… ইত্যাদি। অতএব প্রকৃত অর্থে সে কোনোদিনও অন্য ধর্মকে সম্মান, ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে, ভালোবাসতে… পারে না। যদিও লোকদেখানো ভক্তি-শ্রদ্ধা করা যায়, কিন্তু প্রকাশ্যে ও সত্যিকারভাবে তা করলে ধর্ম প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ তা মেনে নেয় না। বরং শাস্তির ব্যবস্থা করে। তাছাড়া ধর্মের শিক্ষা এমনই যে, (ধর্ম প্রশ্নে বা বিবাদে) নিজ ধর্মের মানুষদের হত্যায় (অন্য ধর্মের হাতে) মানুষ যতোটা ব্যাকুল হয়, অন্য ধর্মের মানুষ হত্যায় (নিজ ধর্মের মানুষদের হাতে) ততোটা হয় না। অর্থাৎ এখানে মানবতা বড় নয়, ধর্মই বড়। এতে শিশু শেখে একই মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতি, ভিন্ন জাতি-গোষ্ঠি, ভিন্নতালম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণুতা, অবজ্ঞা, অসহনশীলতা…, নিজের মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, অংহকার, গর্ব… ইত্যাদি। যা চির অভ্যস্ততার কারণে আমরা দেখি না বা ধরতে পারি না। অথচ অন্য ধর্মের প্রতি অসহনশীলতা, অশ্রদ্ধা, ঘৃণা… এসব শিক্ষার কারণেই কারো আশ্রয়-প্রশয় ছাড়াই বহু একক জঙ্গির সৃষ্টি হতে পারে। যদিও সত্য যে, অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার শিক্ষা দিলে, হয়তো নিজেদের ধর্মকে খাটো করা হয় এবং অনুসারীরা তা মেনে নিতে চায় না, ফলে ধর্মজীবিরা সে শিক্ষা দেন না। বরং প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে ধর্মজীবিরা অন্য ধর্মের নিন্দাই বেশি করেন (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)।

অনেকেই ধর্মের নামে ও শ্লোগানে জঘন্যতাময়, বর্বরতাময়… হত্যাকাণ্ডের সাথে রাজনৈতিক যুদ্ধ ও হত্যার তুলনা করেন। বর্তমানের ও অতীতের অনেক স্বৈরাচারিদের যুদ্ধ/গণহত্যার উদাহরণ টেনে কথিত ধর্মযুদ্ধের, বিশেষ করে ধর্মের/ধর্মসন্ত্রাসের দোষ ঢাকাতে চাইছেন। বলছেন, ধর্মের নামে ও শ্লোগানে যেসব হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, তার চেয়ে রাজনৈতিক হত্যাগুলো কম কীসে? অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতারা যা করছে তা ঈশ্বরের লোকেরা করলে দোষ কীসের? প্রশ্ন হলো- রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আর ধর্মের নামে ও শ্লোগানে হত্যাকাণ্ড কী এক হতে পারে? তাহলে ধর্মে আর অধর্মে পার্থক্যটা কী? মানুষ বা স্বৈরাচারগণ যেসব অন্যায় করতে পারে, ধর্ম যদি একই অন্যায় করে তাহলে সবার আগে ধর্মের বিচার করা উচিত, স্বৈরাচারের বিচার পরে! অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতারা যা করে, ধর্ম তা করতে পারে না, কারণ (ধর্মানুসারে) ধর্ম হলো- মহাপবিত্র, মানবীয়, দয়া, সহানুভূতি, উদার, বৈষম্যহীন, মহানুভবতার… সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহারণ। তাই যুদ্ধ করা, হিংসা করা, অপরকে/অন্য ধর্মকে ছোট ভাবা, ঘৃণা করা/গণহত্যা… স্বৈরাচারগণ করতে পারলেও ধর্মের পক্ষে তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া, এতোসব বিশেষণ যার (ধর্মের) সে-ই যখন রাজনৈতিক নেতাদের মতো যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং এর অনুসারীদের যুদ্ধ ও গণহত্যায় উৎসাহিত করে এবং অনুসারীরাও যদি তা সমর্থন করে, তখন এর চেয়ে নিকৃষ্ট, জঘন্য অপরাধ আর কী হতে পারে? অর্থাৎ মানুষ (রাজনীতিবিদ) আর ঈশ্বর যদি একইভাবে নিজেদের ধর্ম ও স্বার্থ রক্ষার জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তাহলে ঈশ্বরদের মহাপবিত্র(!), সর্বশক্তিমান(!), মহাদয়ালু(!), প্রেমময়(!), গরিবের বন্ধু(!), দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনকর্তা(!), রক্ষাকর্তা(!), বিচারকর্তা(!)… এসব বিশেষণ মানায় কী?

সমস্যা হলো- কেউ যদি ঈশ্বর এবং ধর্ম সম্পর্কে বুঝেও না বোঝে, জেনেও না জানার ভান করে… তাকে বোঝাবেন কীভাবে? হয়তো উল্টা বলে বসবে- বুঝেছি, কিন্তু তুমি বোঝো না কেনো- তালগাছটা অবশ্যই আমার! ঠিক তেমনি কেউ যদি পড়তে না চায় তাকে পড়াবেন কী করে? অনেককে বই পড়তে বললে উত্তর পাই, সময় হয় না। অথচ প্রতিদিন (সন্ধ্যে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত) তাদের আড্ডা মারা দেখে অবাক হই। এই যে ঈশ্বর এবং ধর্মের বাজে দিকগুলো তুলে ধরলাম (যে শিক্ষা কয়েক মিনিটেই একজনকে জঙ্গি বানানোর জন্য যথেষ্ট), এরপরও রাষ্ট্র পরিচালক এবং বিদ্বানগণ যখন প্রশ্ন করেন, কেনো ও কীভাবে উচ্চশিক্ষিতরা জঙ্গি হচ্ছে? এছাড়া তাঁরা জঙ্গিদমনে বহু পথনির্দেশ করছেন (যা সকলেই জানেন)। অথচ তাঁরা নাস্তিকদের যুক্তি পরীক্ষা (সত্য/মিথ্যা) করে দেখন না। কারণ নাস্তিকরা যুক্তি দেয় ধর্মপুস্তক ঘেটে এবং ধর্মের নয় বরং ঈশ্বর ও ধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। অতএব, নাস্তিকদের যুক্তিগুলো মিলিয়ে দেখতে সমস্যা কোথায়? এসব প্রমাণিত সত্যকে তাঁরা যে পর্যন্ত এড়িয়ে চলবেন, সে পর্যন্ত জঙ্গি সৃষ্টি হতেই থাকবে। অন্যদিকে নাস্তিকদের গ্রেফতার করলে বা জঙ্গিদের হাতে খুন হলে, সবাই একই সুরে বলে উঠেন, ওরা ভালো কাজ করছে না, ধর্মকে আঘাত দেয়া হচ্ছে কেনো…? কেনো হচ্ছে, সেটা তো ধর্মপুস্তক পড়লেই বুঝতে পারেন। বারবার একই ঘেনর-ঘেনর কেনো? কারণ ওতে সবই বলা আছে। নাস্তিকরা যা বলে ওখান থেকেই বলে, আপনারা যা খুঁজছেন (জঙ্গিত্তত্ব) তাও ওখানেই আছে। মূলত ধর্মপুস্তকের বাইরে কেউ যেমন ধার্মিক হয় না, তেমনি জঙ্গিও হয় না। অর্থাৎ দুটোর উৎস ওখানেই। অথচ এখান-সেখানে, ওখান-আঁধারে… খুঁজে শুধু পন্ডশ্রমই করছেন এবং নিজেদের ঠকাচ্ছেন। এছাড়াও, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি গ্রেফতার করে নানা ধর্মীয় পুস্তক উদ্ধার করছেন এবং বলছেন, ওমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে, তমুক স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতের এসব বইপুস্তক পাওয়া গেছে ইত্যাদি। আপনার যেসব বইপুস্তকের কথা বলছেন, তা কোন লাইব্রেরিতে নেই? সব লাইব্রেরিতেই ওসব পাবেন। কারণ মূল বইতে যখন ওসব আছে, তখন চটি বইতে (পুস্তিকায়) কী অন্যকিছু থাকবে?

আপনার আরো বলছেন, ধর্ম বিকৃত করে জঙ্গি সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- প্রতিষ্ঠিত সত্য বিকৃত হয় কীভাবে? যদিও ধর্ম অবমাননাকারীদের(!) জন্য রাষ্ট্রীয় আইন ও শাস্তির বিধান করেছেন। কিন্তু ধর্ম বিকৃতকারীদের(!) জন্য আইন আছে কী? থাকলেও এর প্রয়োগ আছে কী? নতুবা তারা কী করে প্রায় সব ধর্মানুষ্ঠানেই বিকৃত এবং অন্য ধর্মের কঠোর সমালোচনা করেও জেলের বাইরে থাকে? কারণ যারা ধর্ম অবমাননা/সমালোচনা করে, তারচেয়ে কয়েক কোটিগুণ বেশি ক্ষতি করে কথিত ধর্ম বিকৃতকারীরা। প্রকৃতপক্ষে, কথিত ধর্ম অবমাননাকারীরা ধর্মের নয় বরং এর কুসংস্কারগুলোর সমালোচনা করে। অথচ ধর্ম বিকৃতকারীরা নিজেদের ধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ বানাতে ও রাখতে, অন্য সব ধর্মগুলোরই কঠিন ও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে। এছাড়াও কেউ কী, কোনদিন দেখেছেন বা শুনেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননাকারীরা এমন বীভৎস্য হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে কিংবা সমর্থন করছে? বরং তারা সব হত্যাযজ্ঞেরই বিরোধিতা করে। তাহলে, কোনটির জন্য আইন বা বিধিনিষেধ এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা অত্যাবশ্যকীয়? কথিত ধর্ম অবমানাকারী, নাকি ধর্মসন্ত্রাসী? রাষ্ট্রনায়ক এবং বুদ্ধিজীবীগণ, উত্তর দিবেন কী? (বি.দ্র : ধর্ম ‘অবমাননাকারী’ এবং ধর্ম ‘বিকৃতকারী’ শব্দ দুটোতেই আপত্তি আছে। কারণ যারা ‘অবমানানা’ করে তারা মূলত ধর্মের কুপ্রথা/কুসংস্কার নিয়ে আলোচনা/প্রতিবাদ করে, এতে অবমাননার কিছু নেই। আর যারা ‘বিকৃতকারী’তারা মোটেও ধর্মকে বিকৃত করে না, বরং ধর্মপুস্তকের আলোকেই তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ সঠিকভাবেই পরিচালনা করে)।

অতএব গ্যারান্টিসহ বলছি, যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষ ‘সঠিক’ভাবে ধর্মগ্রন্থ পড়লে ধার্মিক অথবা জঙ্গি কোনোটাই হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে কী হবেন? ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। অথচ ধর্মের কাহীনি না পড়ে, শুধু শুনে বিশ্বাস করলে, যে কোনোটিই হতে পারেন (উল্লেখ্য, হয়তো ৯০% লোকই ধর্ম না পড়ে শুধু শুনেই ধার্মিক)। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মানুষ তৈরির প্রথম ধাপেই (শিশুকে) ধর্মের নানা কল্পকাহিনী, একইসাথে ভয়ংকর ক্রোধী ও প্রেমময় ঈশ্বর এবং স্বর্গের বিলাসবহুল জীবনের লোভ দিয়ে সম্পূর্ণরূপে অসুস্থ করে রাখা হয়। সুতরাং প্রশ্ন, ধর্মের ন্যায় এমন বিতর্কিত/বিভ্রান্তিকর দর্শন বা মতবাদ এ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে কী? থাকলেও (বর্তমান পৃথিবীতে) তা কী ধর্মের ন্যায় পৈশাচিকতা চালাচ্ছে? অতএব যা বিতর্কিত, যা সত্য নয়, তা নিয়ে কেনো সমালোচনা করা যাবে না? সুতরাং বিশ্বনেতাদের উচিত ধর্মপুস্তক পড়া এবং এতে সন্ত্রাস বা জঙ্গি বানানোর মশলা আছে কীনা তা খতিয়ে দেখা। কারণ এসব বিষাক্ত মশলা/মাদক সেবনেই (অল্পসংখ্যক হলেও) জঙ্গি হয়। যে জঙ্গি/দানবগুলো একেকটা হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে নিমিশেই পিষে বা গিলে খেতে পারে!

আরো প্রশ্ন, কঠোর পাহারা দিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদ্‌যাপন করায় কী ধর্মের মর্যাদা বাড়ে না কমে? বিষয়টি কী ধার্মিকগণ ভেবে দেখেছেন? বিশেষ করে ধর্মরাষ্ট্রগুলো এবং যেখানে অধিকাংশই একই ধর্মালম্বী সেসব দেশে যদি ধর্মকে পাহার দিয়ে পালন বা রক্ষা করতে হয়, তাহলে ধর্ম এবং ঈশ্বরদের অবশ্যই আত্মহত্যা করা প্রয়োজন। কেনো যে ঈশ্বরেরা সর্বশক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পাহারদার নিয়োগ করতে হচ্ছে, সৈনিক বানাতে হচ্ছে… সেটাও প্রশ্ন! যদি একই ধর্মালম্বীদের মধ্যে একজন অন্যজনের ভয়ে ভীত হয়ে পাহারাদার নিয়োগ করে, তাহলে অন্যধর্মালম্বীদের অবস্থা কী হতে পারে, তা বলা নিসপ্রয়োজন। সুতরাং প্রশ্ন, ঈশ্বর এবং ধর্মগুলোর লজ্জাবোধ, মর্যাদাবোধ, আত্মসম্মানবোধ… আছে কী? এছাড়াও প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই যখন কঠোর পাহারা দিয়ে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে, তখন ধর্মীয় সম্প্রীতি থাকে কীভাবে?

মূলত, সত্য রক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য পাহাদারের প্রয়োজন হয় না, মিথ্যার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন। অর্থাৎ সত্যকে প্রচার করতে হয় না, তা এমনিতেই প্রকাশ পায়। অথচ মিথ্যাকে বিরামহীনভাবে প্রকাশ ও প্রচার করতে হয়; না হলে মিথ্যা প্রতিষ্ঠা পায় না, স্থায়ী হয় না বা টিকে থাকতে পারে না। যেমন, গোয়েবলেসীয় থিওরি, একটা মিথ্যা বারবার বললে নাকি সত্যে পরিণত হয়। ঠিক তেমনি ধর্ম নামক মিথ্যাটিতেও (হাজার হাজার বছর ধরে) একই কথা, একই গান, একই সুরে… বাজানো হচ্ছে। ফলে এ প্রপাগান্ডাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই মানুষ জন্মগত ও প্রশ্নহীনভাবে বিশ্বাস করে। এ যে কতো ভয়ংকর মিথ্যা এবং এতে যে বিষ আছে, তা বোঝার চেষ্টাও করে না। এতো মিথ্যাচার, এতো নোংরামো, এতো খুনখারাবি, এতো পৈশাচিকতা… এরপরও অতি সামান্য কিছু নাস্তিক ছাড়া কেউই প্রশ্ন তোলেন না যে, ধর্মের নামে ও করণে বিরতিহীনভাবে এমন ধ্বংসলীলা হচ্ছে কেনো? গুটিকয়েক কথিত বুদ্ধিজীবি যা বলেন, তা ধর্মের কুপ্রথা/কুসংস্কারের কাছ দিয়েও যায় না, বরং বহুদূর দিয়েই যায়। মূলত একটি মিথ্যা যখন বিলিয়ন বিলিয়ন লোকের কাছে মহাসত্যে পরিণত হয়, তখন কতিপয় লোকের মনে প্রশ্ন জাগলেও, প্রশ্ন করার সাহস থাকে না (কারণ ধার্মিকদের কোপ বড় ভয়ানক এবং রাষ্ট্র যখন এর অন্ধ সমর্থক হয়, তখন পোয়াবারো)। সুতরাং যা তথাকথিত মহাসত্য, চরম খাঁটি বা নিখাঁদ, সর্বোৎকৃষ্ট, মহাপবিত্র… তা নিয়ে বিবাদ, যুদ্ধ-দাঙ্গা, লুটপাট, ধর্ষণ, হত্যাযজ্ঞ, মিথ্যাচার… হওয়ার কথা নয়, কিন্তু হচ্ছে। কারণ মিথ্যাকে সত্য বানালেও মিথ্যা-মিথ্যাই। অতএব, যা মিথ্যা তা নিয়েই বিতর্ক ও সমালোচনা হবেই। এর ফলেই ধর্ম জন্মকাল থেকেই বিতর্কিত এবং যতোদিন ধর্ম থাকবে ততোদিনই তা চলবেই-চলবে।

তাছাড়া, এক ধর্ম আরেক ধর্মকে শত্রু মনে করে কেনো? যা কখনো প্রকাশিত সত্য, বেশিরভাগ সময় গোপনীয় সত্য। তথাপিও মানুষ প্রকৃত সত্য অস্বীকার করে বলে যে, ধর্ম সাম্প্রদায়িকতা শিক্ষা দেয় না। এমন অসত্য বলার অর্থ কী? শুধু তাই-ই নয়, একই ধর্মের মধ্যে এক গোষ্ঠি, অপর গোষ্ঠিকেও শত্রু মনে করে। এরা সর্বদাই শঙ্কায় থাকে, এই বুঝি অন্য কেউ ধর্ম নষ্ট করলো, ওরা নষ্ট করলো, তারা নষ্ট করলো… ইত্যাদি! যা সত্য তা অন্যেরা নষ্ট করে কীভাবে? সত্যকে কেউ নষ্ট করলে, বুঝতে হবে, ওই সত্যের মধ্যে খাঁদ আছে, অর্থাৎ তা খাঁটি নয়। তবে ভালো মানুষ হতে হলে নিজেকে জানতে-চিনতে হয়, অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই, ধর্মের প্রয়োজন তো নয়ই। নিজের মনকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার ধর্মের প্রয়োজন কীসের?

বর্তমান ভয়াবহ পরিস্তিতির প্রেক্ষিতে একথা বললে বোধকরি বেশি বলা হবে না, ধর্ম এবং ঈশ্বর শুধু পশুর রক্ত নয়, এখন মানুষের রক্তেই আরো হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে। কেনো এসব? বারবার বলছি, ধর্মপুস্তকের মধ্যেই এর উত্তর রয়েছে, যেজন্য এসব পড়ার কোনোই বিকল্প নেই। এসব পুস্তকের মধ্যে ভালো কিছু নেই যে, তা বলছি না। তবে যেসব নোংরামো, বিকৃত, অসত্য, অসভ্য, কট্টোর, জঘন্য… ভাষা ও বাক্য রয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো দর্শন বা মতবাদের মধ্যে আছে কী? এমন ভাষা যদি কোনো ব্যক্তি প্রকাশ করতো, তাহলে কী অবস্থা হতো? বিশ্ববাসী কী তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে ছাড়তো? মনে হয় না। অথচ ঈশ্বরীয় ভাষা/বাক্য বলেই মানুষ প্রশ্নহীন ও অন্ধহীন হয়ে তা মেনে নিয়েছে! এতো কর্কশ, নিন্দনীয় ভাষা, সবচেয়ে বুদ্ধিমান জীব মানুষ কী করে যে সত্য, সুন্দর, পবিত্র… বলছে ও সমর্থন করছে তা বোধগম্য নয়। কারণ, এসব না পড়েই পৃথিবীর সেরা বুদ্ধিজীবিসহ রাষ্ট্র নায়কগণ প্রায় সকলেই বলছেন, ধর্ম মহান, সত্য, সুন্দর, পবিত্র, প্রেম, ভালোবাসা, শান্তি… ইত্যাদিতে ভরপুর। অথচ যারা ‘ঠিকভাবে’ ধর্মপুস্তক পড়েছেন, তাদের অনেকের দৃষ্টিতে ধর্মপুস্তকগুলো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম পুস্তক! কারণ এরূপ জঘন্য ভাষা ও বাক্য ধর্মপুস্তক ছাড়া অন্য কোনো পুস্তকে নেই বলেই তাদের বিশ্বাস। শুধু তাই নয়, ধর্মপুস্তকগুলো অত্যন্ত এক ঘেয়েমি, বিরক্তিকর, পুনরুক্তিময় এবং নানারূপ ভয়ভীত, হুমকি-ধামকিসহ লোভ-লালসায়… ভরা। এতে মানুষের মঙ্গল, মর্যাদা কিংবা স্বাধীনতার চেয়ে কল্পকাহিনী, যুদ্ধের প্রশংসাসহ ঘৃণ্য, জঘন্য, দাসত্ব, বন্দিত্বের… কথাই বেশি। যা মানবতাবাদিরা কোনোভাবেই যা মেনে নিতে পারেন না। যে পুস্তক অনুসরণ করে মানুষ (অল্প সংখ্যক হলেও) এক একটা মহাদানব হয়, নৃশংস্য গণহত্যা চালাতে সিদ্ধহস্ত হয়, তা সহ্য করা মানবাতাবাদিদের কোনোভাবেই উচিত নয়। অতএব ধর্মের সমালোচনা হালকাভাবে নয়, অত্যন্ত উলঙ্গভাবেই হওয়া উচিত বলে মনে করি।

মনে হয়, মানুষ দুইভাবে উম্মাদ হয়। এক- মানসিক অসুখে বা অত্যাচারে। দুই- ধর্ম দিয়ে, দ্বারা, প্রতি…। প্রথম শ্রেণির উম্মাদদের নিয়ে সমাজের তেমন একটা ভয় থাকে না। তবে দ্বিতীয় শ্রেণির উম্মাদরা মানবতার জন্য যতোটা মঙ্গলজনক, তারচেয়ে বহুগুণ ভয়ানকও হতে পারে (যার বহু প্রমাণ আছে)। কারণ তাদের হার্ডডিস্কে ধর্ম ছাড়া অন্য কিছু থাকে না, এমনকি ধর্মের সামান্য ভালো দিকটুকুও থাকে না বলেই তারা ধার্মিক না হয়ে জঙ্গি হয়। যেহেতু তারা প্রথমে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট হয়, পরে জঙ্গি হয়, সেহেতু ধর্ম এর দায় এড়াতে পারে না। তবে মানসিক আঘাতে উম্মাদ আর ধর্মোম্মাদদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মানসিক উম্মাদরা সমাজের পরিচিত চেনা-জানা, অর্থাৎ তার গতিপ্রকৃতি ষ্পষ্ট এবং মানুষ চাইলেই তাকে এড়িয়ে যেতে পারে বা সতর্ক থাকতে পারে, এমনকি মানুষ এদেরকে একটু আদর-যত্ন করলে, খাবার দিলে… বন্ধুও হতে পারে। কিন্তু ধর্মোম্মাদরা পরিচিত হলেও তার গতিপ্রকৃতি, চিন্তাধারা সমপর্কে মানুষ থাকে অন্ধকারে। ফলে এসব উম্মাদদের এড়িয়ে চলা যায় না। তারা ঘাপটি মেরে, ভালোমানুষ সেজে, ধার্মিক বেশে… সমাজের মধ্যেই মিশে থাকে। পরিবার কিংবা নিকট আত্মীয়রা যে টের পায় না তা মোটেও সত্য নয়, কিন্তু তারা খুশি, কারণ সন্তানটি তো পাক্কা ধার্মিক, অতএব নিশ্চিন্ত! অথচ এরা চরম বুজরুকি জানে, অভিনয় জানে এবং মিথ্যাচারেও সর্বসেরা। ওরা ওঁৎ পেতে থাকে, সময় ও সুযোগ বুঝে মহাদনবের ন্যায় প্রচণ্ড বেগে ঝাপিয়ে পড়ে। কখনো ট্রাক চালিয়ে পিষে ফেলে, কখনো একত্রে জড়ো করে পুড়িয়ে কিংবা জবাই করে মারে এবং ধর্মের নামেই উল্লাস করে। এদের মন এমন বিষাক্ত বিষে নীল থাকে যে, বিধর্মী কিংবা তাদের মতাদর্শী বাদে সকলকেই (পিতা-মাতা পর্যন্ত) প্রচণ্ড ঘৃণা করে। ফলে এরা এক হাতেই ২০/৩০ বা শতশত মানুষ জবাই করার মতো জিঘাংসা হৃদয়ে পুষে রাখে, এমনকি জবাই শেষে কুচিকুচি করতেও মজা পায়। বিশেষ করে এরা নারীদের প্রতি হয় সবচেয়ে বেশি বৈরীভাবাপন্ন। অথচ নারীর গর্ভে ও নারীর কোলে, নারীর দুগ্ধ পান করেই এজগতে তার বেঁচে থাকা। এসব তারা ভুলে যায় ধর্মগুরুদের মগজ ধোলাইয়ের ফলে (নারী বিদ্বেষী এসব প্রচারণা ইউটিউবে বহু পাওয়া যাচ্ছে এবং তা লক্ষ লক্ষ লোকেরই প্রিয়ও বটে, হিট দেখে বোঝা যায়)। অন্যদিকে মানসিক কারণে উম্মাদরা যদিও বা কখনো হামলা করে তো, এক-দুজন হতাহত করতে পারে, একসাথে শত-সহস্র হতাহত করতে পারে না, কারণ এরা মারণাস্ত্র কিনতে বা চালাতে পারে না বা একত্রে বেশি মানুষ মারার কুবুদ্ধিও তাদের নেই। অর্থাৎ এরা হঠাৎ উত্তেজনায় সামান্য দু’একটা খুন-খারাবি করলে করতেও পারে। অথচ ধর্মের নামে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ধর্মোম্মাদদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই থাকে একই একসাথে যতো বেশি মানুষ হত্যা করা যায়, যাতে ধর্মগুরু এবং ঈশ্বর বেশি খুশি হয়। পরকালের পূণ্যিও ততো বেশি হয়। ফলে তারা জনগণের উপর ট্রাক উঠিয়ে আনন্দ পায়, মা-বোনকে ধর্মের সম্মান রক্ষার জন্য হাসতে হাসতে খুন করে, মহানন্দে নিজের মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করে…। যদিও ধর্ম রক্ষার জন্য বহু ধর্মোম্মাদ পিতা-মাতারাও আপন সন্তানকে খুন করে…। (যাকে ‘অর্নার কিলিং’বলে; কিন্তু হত্যা কী করে সম্মানের হয়? জানি না, এতে ধর্মের এবং ঈশ্বরদের গৌরব বাড়ে কিনা, বাড়লে কীভাবে ও কেনো? মূল প্রশ্ন হলো- ধর্মের মধ্যে যদি ঘৃণার বাক্য/বাণী না-ই থাকতো, তাহলে কী তারা এসব করতো? অর্থাৎ তারা কী এমন নৃশংস্য জঙ্গি বা ‘অর্নার কিলার’হতে পারতো? এ মূর্খের মনে হয়, পারতো না।

যা বলছিলাম, প্রায়ই ভয়ংকর সব খুনের পরেই শুনি, সন্তান জঙ্গি হয়ে গেছে, সেটা পিতা-মাতা, অভিভাবকরা টেরই পায়নি। পাবেন কীভাবে? জঙ্গিরা মারাত্মক ভাইরাসের কারণেই তাদের আসল রূপ পূর্ব থেকে কাউকে প্রকাশ করে না। কারণ, আমি খারাপ, বিষাক্ত ভাইরাস আক্রান্ত, আমি সমাজে, পরিবারে, অন্য ধর্মের কাউকে ঘৃণা করি, আমার মতাদর্শ ওরা মানে না, তাই খুন করতে চাই… এসব কী প্রকাশ করা যায়! এসব যদি আগে থেকে প্রকাশ করা হয়, তাহলে তো আমি ওই নিষ্ঠুর কাজ করতে পারবো না। তাই তো আমাকে সদাসর্বদা ভদ্র ছেলে, ধার্মিক ছেলে হয়েই সমাজে চলতে ও থাকতে হবে। অর্থাৎ ধর্মের আবরণ ছাড়া এসব লুকিয়ে রাখা যায় না। এছাড়াও ভাইরাসের তো একটা কর্তব্য আছে, সে তো তার কার্যসিদ্ধ অর্থাৎ নৃশংস্যতম হত্যাযজ্ঞের পূর্বে আমাকে কখনোই আসল রূপটা প্রকাশ পেতে দেবে না। ফলে এরা চরম ঘৃণা চেপে রাখতে পারে এবং মানবতার চরম সর্বনাশের অপেক্ষায় মহাধৈর্যশীল হয়।

এছাড়া, কোনো কোনো ধর্মে বহু বিষয় নিষিদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ- হৈহুল্লোড়পূর্ণ আনন্দময় জীবন, ছেলেমেয়েদের খোলামেলা পোষাক ও মেলামেশা… ইত্যাদি। যখন আমার ধর্মে এসব নিষেধ তখন অন্যরা তা করবে কেনো? অর্থাৎ ধার্মিকের ভাবনাটা এমন যে, যা তাদের বেলায় নিষিদ্ধ, তা অধার্মিক বা বিধর্মী অথবা ভিন্নধর্মীদের কাছে আইনসিদ্ধ হওয়া উচিত নয় বা হতে পারবে না। আবার, ধর্মানুসারে আমাদেরই উন্নত জাতি হওয়ার কথা, অথচ যারা বিধর্মী কিংবা ধর্মের ধার ধারে না, তারাই কেনো এতো উন্নত হচ্ছে? ধর্মানুসারে ধনী থাকার কথা আমাদেরই, অথচ আমরাই দরিদ্র…। এসব সহ্য করা অনেক ধার্মিকের পক্ষে পীড়াদায়ক এবং এমন ঈর্ষা ও হীন্যমতনতায় ভুগছে অনেককেই। ফলে এরূপ ঈর্ষা, হিংসা, হতাশা… থেকেও জঙ্গিবাদের জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

যাহোক, অনেকে হয়তো ভাবছেন, অবিশ্বাসী/নাস্তিকদের ধর্ম নিয়ে এতো মাথাব্যাথা কেনো? সত্যিই তো! মূলত ধর্মের ব্যাপারে অবিশ্বাসীরা কোনোই প্রশ্ন তুলতো না, যদি কিনা তা মানুষের ব্যক্তিগত সীমায় এবং সামান্যতম সহনশীল অবস্থায় থাকতো। যেহতু ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, যেহেতু এটা মহামারি আকার ধারণ করে সমস্ত পৃথিবীকে উথালপাথাল করে তুলেছে, সেহেতু অবিশ্বাসীরা প্রশ্ন তুলতে বাধ্য (বর্তমানের প্রেক্ষিতে)। কারণ, ব্যক্তি যুদ্ধবাজ হলে এর জন্য সারা বিশ্বকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় না (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তা রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ); তবে ধর্ম যুদ্ধবাজ হলে পুরো বিশ্বেকেই দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং চরম মূল্য দিতে হয় (যা চলমান)। অতএব ধর্মসন্ত্রাসের দায় ধর্মকেই নিতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে, ধর্মব্যবসায়ীরা তো বটেই রাজনৈতিক নেতারাও এর দায় ধর্মের উপর চাপাতে নারাজ। অথচ ধর্মের নামেই এ অপ্রতিরোধ্য, মহাভয়ংকর, মহাতঙ্ক সৃষ্টিকারী, মহাভাইরাসটি পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে এবং ভয়াবহতম, নিকৃষ্টতম, জঘন্যতম, মহাপৈশাচিকতম… হত্যাযজ্ঞগুলো ধর্মের শ্লোগানেই ওরা উল্লাস করতে করতেই ঘটাচ্ছে। এতোকিছুর পরেও কেনো ধর্ম এর দায় নিবে না? অর্থাৎ ধর্ম ভালো কিছু করলে যখন প্রশংসায় গদগদ হন, তাহলে বীভৎস্যতম হত্যাযজ্ঞের দায় ধর্মের নয় কেনো? অতএব ধর্মসন্ত্রাসীদের দমন করতে হলে ধর্মের ব্যাপারে সকলকেই কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ধর্মব্যবসায়ী ও কট্টোর মতবাদে দীক্ষাপ্রাপ্ত পরিবারের মধ্যে যেভাবে ধর্ম শিক্ষা/ব্যাখ্যা দেয়া হয়, সেখানে হস্তক্ষেপ করতেই হবে। তাদেরকে সীমানা নির্ধারণ করে দিতে হবে, শিশুসহ অন্যদেরকে কতোটুকু এবং কীভাবে ধর্মশিক্ষা দিলে মানবতা লংঘিত হবে না, কিংবা মানবতা রক্ষা পাবে… ইত্যাদি।

তাছাড়া, নাস্তিকরা যখন এমন বীভস্যতম, নৃশংস্যতম, জঘন্যতম, ঘৃণ্যতম, সীমাহীন বর্বরতার (ক্ষোভ প্রকাশের কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়) জন্য ধর্মকে দায়ী করে কলম ধরে, তখন মানবধিকারের দোহাই দিয়ে, মানবাধিকার কর্মীসহ বিশ্ব নেতারা হৈচৈ শুরু করে- ধর্মকে কিছু বলা যাবে না! অথচ তারা একটিবারও কী ভেবে দেখছেন, ধর্মের মধ্যেই মানবাধিকারের প্রচণ্ডতম অভাব রয়েছে। ওর মধ্যে যা আছে- তা নেকামি, ধূর্তামি, চালাকি, ইতরামি…। আপনারা মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে ধর্ম সমালোচকদের থামিয়ে দেন, রেসিজম বলে চিৎকার শুরু করেন। অথচ ধর্মের কারণেই যেসব নিরীহ মানুষগুলো প্রাণ হারাচ্ছে, তা তো মিথ্যা নয়! অতএব সেটা মেনে নিয়ে ধর্মকে সমালোচনা তো বটেই, প্রয়োজনে কাঠগড়ায় তুলতে অসুবিধা কোথায়? জানিনা, যা মানবতাবিরোধী (কমবেশি হলেও) তার সমালোচনা কেনো করা যাবে না? ধর্মের সমালোচনা যদি রেসিজম হবে, তাহলে ধর্মের বর্বরতাকে কী বলবেন? চ্যালেঞ্জসহ বলছি, ধর্মের মধ্যেই যদি বর্বরতা না থাকতো, তাহলে একটা ধর্মসন্ত্রাসীও জন্ম নিতো না। যেহেতু ধর্মসন্ত্রাসের বীজ ধর্মের মধ্যেই, সেহেতু সকল রাষ্ট্রনায়ক এবং মানবাধিকার কর্মীসহ প্রতিটি সচেতন মানুষকেই ধর্মের হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে হলে একযোগে এর সংস্কার সাধনে একাট্টা হতে হবে, নতুবা বিশ্ব সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ থামবে না। বিশেষ করে যে ধর্ম যতো বেশি সন্ত্রাস করবে, সেই ধর্মকেই সর্বোতভাবে গুরুত্ব দিয়ে, প্রকাশ্যে সমালোচনার অধিকার দিতে হবে…। এমন ঘোষণা যে পর্যন্ত জাতিসংঘ থেকে না আসবে, যে পর্যন্ত খোলাখুলিভাবে ও প্রকাশ্যে ধর্মের কুকথা/কুপ্রথা/কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়া না যাবে… সে পর্যন্ত ধর্মসন্ত্রাস বন্ধ হবে না।

অতএব, বিশ্ব নেতাদের কাছে সবিনয়ে প্রশ্ন, এখনো কী ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় হয়নি? কেনো বারাবার ধর্মকে ছাড়া দেয়া হচ্ছে? কেনো ধর্মপুস্তকগুলোর কদাচার কাহিনী, হিংস্র বাণীগুলো প্রকাশ্যে সমালোচনার আইন করা হচ্ছে না? কেনো ধর্ম সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র আইন করছে এবং শাস্তি দিয়ে দমন করছে? কোনো ধর্মকে ধরা হচ্ছে না? এর আমূল সংস্কার করা হচ্ছে না? কেননা, যা সন্ত্রাসের মূল উৎস, তা না রুখে, আমাদের রুখলে, জেলে ভরলে, কুপিয়ে মারলে… মানবজাতির মঙ্গল তো হবেই না বরং অমঙ্গল এবং হত্যাযজ্ঞ বাড়তেই থাকবে।

[1253 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0