[২৫ অগস্ট, ২০১৬ তারিখে নিউ ইয়র্ক টাইমসে স্কট শেন (১৯৫৪-বর্তমান) নামের নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সাংবাদিক ওপরের শিরোনামের লেখাটা (http://www.nytimes.com/2016/08/26/world/middleeast/saudi-arabia-islam.html?_r=0) লেখেন। স্কট প্রায় এক দশক ধরে কর্মরত নিউ ইয়র্ক টাইমসে। সাংবাদিক হিসেবে এর আগে তিনি নানা জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথমে দ্য ওয়াশিংটন স্টার (১৯৭৯-১৯৮০) পত্রিকায় যোগ দেন তিনি এবং এর পর নানা পত্রিকা ঘুরে শেষমেষ থিতু হন নিউ ইয়র্ক টাইমসে (২০০৪-বর্তমান)। সবচে বেশি সময় কাটিয়েছেন তিনি দ্য বাল্টিমোর সান (১৯৮৩-২০০৪)-এ, এবং তাদের মস্কো প্রতিনিধি হিসেবে কাটানো দুবছরে (১৯৮৮-১৯৯১) তিনি সোভিয়েতভঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু দেখেছেন, সে-নিয়ে রিপোর্ট করেছেন, এবং সোভিয়েটশাসন পতনের মূল কারণে বিশদ ও উজ্জ্বল দৃষ্টি দিয়ে লিখেছেন ডিজম্যান্টলিং ইউটোপিয়া: হাউ ইনফরমেইশন এন্ডেড দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৯৪)। তবে তাঁর সবচে মহতী কীর্তি হল ১৯৯৫ সালে টম বৌম্যানের সাথে মিলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির ওপর ছয় পর্বের একটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যেটা এনএসএ-র ওপর করা সবচে বিশদ প্রথম প্রতিবেদন। তিনি ২০১৬ সালে অবজেক্টিভ ট্রয়: আ টেররিস্ট, আ প্রেসিডেন্ট, এন্ড দ্য রাইজ অব দ্য ড্রোন নামের বইটি লেখেন যা আনওয়ার আল-আওলাকির কাহিনি নিয়ে গাঁথা, আমেরিকার নাগরিক হওয়ার পরেও মার্কিনি গৃহযুদ্ধের পর এই ইমামই প্রথমজন যাঁকে তাঁর রাষ্ট্রই খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছে ২০১১ সালে এক ড্রোন হামলায়। বইটা তাঁকে লিওনেল গেলবার পুরস্কার এনে দেয়। স্কট মূলত নিরাপত্তাবিষয়ক সাংবাদিকতা করেন।
লেখাটা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ও অধ্যবসায়ী প্রতিবেদনের একটা উঁচুসারির দৃষ্টান্ত। লেখাটার সব মতামতের সাথে সর্বাংশে সবাই একমত নাও হতে পারেন, এবং সেটাই স্বাভাবিক। তবে, এতে প্রচুর তথ্য ও উপাত্ত আছে, এমনকি কিছু আছে যা লোকচক্ষুর অগোচর ছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, রাষ্ট্রসমর্থিত গবেষণার পরও। সেসব জানলে মন্দ হয় না বলেই ভাবলাম। বাংলাদেশে সৌদি আরবের একনিষ্ঠ হুকুমবরদার জামায়াত-এ-ইসলামি ও ইসলামি ছাত্রশিবির এদেশে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু ও ভারতবিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষণে ও পরিপালনে যে কতদূর অগ্রগামী সে বলাই বাহুল্য। সুবুদ্ধিমান, হুঁশিয়ার মানুষ মাত্রের কাছেই তা সুস্পষ্ট। তাদের সেই মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অর্থায়নের সিপাহসালার মীর কাসেম আলীর ফাঁসি মোটের ওপর নিশ্চিত হল গত ২৯ অগস্ট, ২০১৬, মঙ্গলবার। নানান দেশিবিদেশি লবি, সুপ্রচুর অর্থায়ন, ও নানান দেনদরবার করেও এই ফাঁসি যে রদ করা সম্ভব হয়নি, সে-কারণে এর সাথে জড়িত সব পক্ষ ও রাষ্ট্র ধন্যবাদার্হ। বেদনাদায়ক ব্যাপার এই যে, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও এর পোষক মানসিকতা রাষ্ট্র, সমাজ, ও নাগরিকের মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে। যেদিন এসবের হাত থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে, আশা করা যায়, সেদিনই হয়তো একমাত্র সত্যিকার অর্থে সফল হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
আমরা শুধু আশাভরা প্রতীক্ষাই করতে পারি, আর পারি সীমিত সাধ্যে লড়াই জারি রাখতে।
জয় বাংলা!]

হিলারি ক্লিনটন আর ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব একটা একমত হন না কোথাও, কিন্তু ব্যতিক্রমটার নাম হতে পারে সৌদি আরব। শ্রীমতি ক্লিনটন “দুনিয়া জুড়ে কট্টরবাদী স্কুল আর মসজিদ যেসব প্রচুর তরুণদের জঙ্গিবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে” সেসব সমর্থনের জন্যে সৌদি আরবের সমালোচনা করেছেন। আর শ্রীমান ট্রাম্প সৌদিদের বলেছেন “দুনিয়ার সর্ববৃহৎ জঙ্গি অর্থায়নকারী।”
মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্যে দূত হিসেবে প্রেরিত প্রথম আমেরিকান কূটনীতিকটি পৃথিবীর অন্তত ৮০টি দেশ ঘুরেছেন আর সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে সৌদি প্রভাব সহনশীল ইসলামি ঐতিহ্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। কর্মকর্তাটি, ফারাহ পণ্ডিত, গত বছর লিখলেন, “যদি সৌদিরা যা করে চলেছে সেটা বন্ধ না-করে, তবে কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
আর এমন একটা হপ্তাও যায় না যখন কোনো টিভিপণ্ডিত বা সংবাদপত্রের কলামনিস্ট সৌদি আরবকে জিহাদি সহিংসতার জন্যে দায়ী না-করেন। এইচবিও-তে বিল মাহের সৌদি শিক্ষা অভিহিত করেন ‘মধ্যযুগীয়’ বলে, সাথে একটা বিশেষণও জুড়ে দিয়ে। ওয়াশিংটন পোস্টে ফরিদ জাকারিয়া লেখেন যে সৌদিরা “ইসলামের দুনিয়ায় একটা দানব তৈরি করেছে।”
ধারণটা মোটের ওপর সর্বজনীন: যে সৌদি আরবের কট্টর, একপেশে, পিতৃতান্ত্রিক, মৌলবাদী ইসলামের ধরন যা ওয়াহাবিবাদ হিসেবে পরিচিত সেটাই বৈশ্বিক চরমপন্থায় ঘৃতাহুতি দিয়েছে আর তাতিয়ে দিয়েছে জঙ্গিবাদ। ইসলামিক স্টেট (আইএস) যখন পশ্চিমা বিশ্বে হামলার ভয়ঙ্করী ডাকের বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে, দেশের পরে দেশে জঙ্গি হামলার নির্দেশনা দিচ্ছে বা উৎসাহিত করছে, তখন ইসলামের ওপর সৌদি প্রভাবের প্রাচীন বিতর্কটা নতুন একটা প্রাসঙ্গিকতা পাচ্ছে।
পৃথিবী আজ কি একটা আরো বেশি করে বিভক্ত, বিপজ্জনক, আর ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হয়ে উঠেছে মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক হৃদয় থেকে পাঁচ দশকের তৈল-অর্থায়িত দলভুক্তির কার্যক্রমের কারণে? কিংবা সৌদি আরব, যা প্রায়ই ইসলামিস্টদের চাইতে পশ্চিমাবান্ধব স্বৈরাচারদের সমর্থন করেছে বেশি, নেহাতই চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদের জন্যে দায়ী অনেক জটিল কারণের বিপরীতে একটা বলির পাঁঠা – যেসব কারণের ভেতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্রিয়াকলাপও রয়েছে?
প্রশ্নগুলো খুবই তর্কসাপেক্ষ, অংশত এর কারণ হল সৌদি রাষ্ট্রটির স্ববিরোধী প্রবণতা।
চরমপন্থী ইসলামের রাজ্যে, সৌদিরা “আগুন লাগানো আর নেভানো দুয়েরই দল”, জানাচ্ছেন উইলিয়াম ম্যাককান্টস, ব্রুকিংস ইন্সটিটিউশনের একজন গবেষক। “তারা ইসলামের ভারি বিষাক্ত একটা ধারার প্রচারণা চালায় যেটা হাতেগোনা কিছু প্রকৃত বিশ্বাসী আর বাকিদের ভেতর, মুসলিম আর অমুসলিমদের ভেতরে একটা সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনে দেয়,” তিনি বলেন, যাতে করে সহিংস জিহাদিরা আদর্শিক সমর্থন পায়।
তারপরও একই সময়ে, “তারা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা,” ম্যাককান্টস জানান। এই প্রতিবেদন লেখার জন্যে যে ডজন তিনেক গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা আর বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তিনি তাঁদের ভেতর একজন।

সাংঘর্ষিক লক্ষ্য

সৌদি নেতারা পশ্চিমের সাথে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখবেন এবং জিহাদি সহিংসতাকে দেখবেন তাদের শাসনের জন্যে একটা অভিশাপ হিসেবে যা তাদের বিপদে ফেলতে পারে, বিশেষত বর্তমান কালে যখন ইসলামিক স্টেট (আই এস) সাম্রাজ্যটিতে হামলা চালাচ্ছে – গত আট মাসে এই হামলার সংখ্যা ২৫, সরকারেরই হিসেব অনুযায়ী। কিন্তু ইরানের সাথে শত্রুতাও তাঁদের খেপিয়ে তুলবে, আর তাঁরা বৈধতার জন্যে নির্ভর করবেন একটা যাজকীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর যেটা প্রতিক্রিয়াশীল বিশ্বাসে আস্থাশীল। এসব সাংঘর্ষিক লক্ষ্যগুলো ধাঁধালাগানো অব্যবস্থিত পদ্ধতিতে ক্রিয়াশীল হতে পারে।
টমাস হেগহ্যামার, একজন নরওয়েজীয় জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ যিনি মার্কিন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন, বললেন যে সৌদি দাওয়াতি কার্যক্রমের সবচে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে ইসলামের বিবর্তন ধীরগতির করে-আনা, একটা বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বায়নমুখী পৃথিবীতে এর আত্মীকরণের পথ রোধ-করা। “বিংশ শতাব্দীতে যদি একটা ইসলামিক নবজাগরণ হত, সৌদিরা আক্ষরিকতাবাদের পেছনে হাওয়া দিয়ে বোধহয় ওটা ঠেকিয়ে দিত।” তাঁর মন্তব্য।
সৌদিদের হাত যে কোথায় কোথায় পৌঁছেছে সেটা ভাবলেই বিস্ময়াবহ ঠেকে, মুসলিম জনগোষ্ঠী আছে এমন প্রায় প্রতিটা দেশেই ছোঁয়াটা লেগেছে, সুইডেনের গোটেনবার্গ মসজিদ থেকে শাদের কিং ফয়সাল মসজিদ, লস এঞ্জেলসের কিং ফাহাদ মসজিদ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদ। সহায়তা এসেছে সৌদি সরকার; রাজপরিবার; সৌদি দাতব্য সংস্থা; আর সৌদি-পৃষ্ঠপোষককৃত প্রতিষ্ঠান থেকে যার ভেতরে আছে ওয়র্ল্ড মুসলিম লিগ, ওয়র্ল্ড এসেম্বলি অব মুসলিম ইউথ আর ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক রিলিফ অর্গানাইজেশন, যারা চোখধাঁধানো সৌধের হার্ডওয়ার আর যাজন ও শিক্ষণের সফটওয়্যারের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
মোটের ওপর বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে উঠেছে যে সৌদি আদর্শিক জগদ্দলটি ডজনে ডজনে দেশের স্থানীয় ইসলামি ঐতিহ্য গুঁড়িয়ে দিয়েছে – প্রায় অর্ধ শতক ধরে ধর্মীয় বিস্তারের পেছনে বিলাসী ব্যয়বাহুল্যের ফলাফল, হিসেব করলে অন্তত কয়েক বিলিয়ন ডলার তো হবেই। ফলাফলটা আরো বহুগুণিত হয়েছে ভিনদেশি শ্রমিকদের কারণে, বেশিরভাগই দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা, যারা সৌদি আরবে অনেকগুলো বছর কাটিয়েছে আর দেশে ফিরেছে সৌদি আরব সঙ্গে করে। অনেক দেশে, ওয়াহাবি প্রচারণা একটা রুক্ষ মতবাদগোঁড়া ধর্মের পুষ্টিসাধন করেছে। মিশর, পাকিস্তান এবং অন্য দেশের কিছু জরিপে ব্যভিচারীদের পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা আর ইসলাম পরিত্যাগকারীদের জন্যে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থনের পেছনেও ওটা আছে।

প্রভাবের সীমানা

কিন্তু সৌদি প্রভাবটা ঠিক কিভাবে ক্রিয়াশীল হবে সেটা অনেকটাই নির্ভর করে স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর। যেমন ধরা যাক আফ্রিকার কিয়দংশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, সৌদি শিক্ষা চোখে-পড়ার মত গোঁড়া পথে নিয়ে গেছে ধর্মীয় সংস্কৃতিকে, যেটা সবচে বেশি করে দেখা যায় বেশিসংখ্যক নারীদের মাথায় কাপড় দেওয়ায় কিংবা পুরুষদের দাড়িরাখায়। ইউরোপে মুসলিম অভিবাসী গোষ্ঠীতে, কট্টরবাদের রাস্তায় নামার জন্যে এটা অন্যতম একটা প্রভাবক মাত্র, এবং মোটেও সবচে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পাকিস্তান আর নাইজেরিয়ার মতন বিভাজিত দেশে, সৌদি রিয়েলের বন্যা আর এর পৃষ্ঠপোষণকৃত মতাদর্শ ধর্মভিত্তিক বিভাজনগুলোর হাল আরো বাজে করেছে যা ক্রমান্বয়ে বিধ্বংসী বলেই প্রমাণিত।
আর অনেক দেশের ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু একটা গোষ্ঠীর কাছে, সুন্নি ইসলামের বদ্ধ সৌদি সংস্করণ, এবং শিয়া, সুফি ও অন্য সংস্কৃতির মুসলিমদের সাথে ইহুদি ও খ্রিশ্চানদের কালিমালিপ্তকরণ, কিছু লোককে হয়ত আল কায়েদা, আই এস আর আরো সহিংস জিহাদি গোত্রের দিকে টেনেছে। “অপরদের বিমানবিকীকরণ এমনভাবে হয়েছে যে আপনার ওপর ব্যাপারগুলো এমনভাবে এসে পড়বে – এমনকি খোদ খোদার বাণীই এসে পড়বে – যে আপনি দাওয়াতের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বেন,” কথাটা ডেভিড এন্ড্রু ওয়েইনবার্গের, ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিতে আছেন তিনি, সৌদি প্রভাবের পরিমাণ খুঁজে ফেরে তারা।
প্রমাণক ক হতে পারে সৌদি আরব খোদ, যে শুধু ওসামা বিন লাদেনেরই জন্ম দেয়নি, বরং ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১১-এর ১৯জন হাইজ্যাকারের ১৫ জনেরই জন্ম দিয়েছে; ২০০৩-এর ইরাকে আক্রমণের পর অন্য যেকোন দেশ থেকেই বেশি পরিমাণে আত্মঘাতী বোমারু পাঠিয়েছে; আর একমাত্র তিউনিশিয়ার পর যেকোন বাইরের দেশ থেকে আই এসের জন্যে যোদ্ধা পাঠিয়েছে, সংখ্যাটা ২,৫০০।
মেহমেট গোমেজ, তুরস্কের বর্ষীয়ান ইসলামি ইমাম, জানালেন যে জানুয়ারিতে তিনি যখন রিয়াদে সৌদি ধর্মগুরুদের সাথে আলাপ করেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ স্রেফ একটা দিনেই জঙ্গিবাদের দায়ে ৪৭ জনের প্রাণদণ্ড কার্যকর করেছে, যার ভেতর ৪৫ জনই সৌদি নাগরিক। “‘আমি বললাম: “এসব লোকগুলো আপনাদের দেশে ১০ কি ১৫ বছর ধরে ইসলামের শিক্ষা নিয়েছে। আপনাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেই কি কোনোরকমের গলদ আছে?”’ একটা সাক্ষাৎকারে জনাব গোমেজ কথাগুলো জানান। তিনি যুক্তি দেখান যে ওয়াহাবি শিক্ষণ ইসলামের বহুবছরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন: বহুত্ববাদ, সহনশীলতা আর বিজ্ঞান ও জ্ঞানমুখী উন্মুক্ততা রোধ করছে। “দুর্ভাগ্যজনকভাবে,” তিনি জানান, পরিবর্তনগুলো ঘটেছে “প্রায় পুরো ইসলামিক বিশ্ব জুড়েই।”
সৌদি কর্তৃপক্ষকে চরম বিব্রত করে, আই এস তাদের স্কুলগুলোয় ২০১৫ সালে নিজেদের পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ না-করা তক অনুমোদিত সৌদি পাঠ্যপুস্তকগুলোই ব্যবহার করে। নিকট প্রাচ্য নীতির ওপর ওয়াশিংটন ইন্সটিটিউটে কাজ করছেন এমন একজন গবেষক জ্যাকব ওলিডার্ট জানান, আই এস যেসব মুসলিম গবেষকদের কাজ পুনর্প্রকাশ করেছে তার ১২টার ভেতর ৭টাই ছিল মুহম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহাবের, যিনি ইসলামের সৌদি ধারার অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রতিষ্ঠাতা। মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদের প্রাক্তন ইমাম, শেখ আদিল আল-কাবানি জানুয়ারিতে একটা টিভি সাক্ষাৎকারে খেদপ্রকাশ করেন যে ইসলামিক স্টেটের নেতারা “যা আমাদের নিজস্ব বইতে লেখা আছে, আমাদের নিজস্ব নীতিতে আছে সেখান থেকেই আদর্শিক ধারণা সংগ্রহ করছে।”
সৌদি চর্যার সামান্য বিবরণেই বিরাট বড় ঝামেলা তৈরি হতে পারে। গত কমপক্ষে দুদশক ধরে, রাজ্যটি ইংরেজিতে কোরানের অনুবাদ বিতরণ করে যাচ্ছে যার প্রথম সুরাহ, বা অধ্যায়েই, ইহুদি আর খ্রিস্টানদের সম্পর্কে আল্লাহকে ডাকার সময় বন্ধনীর ভেতরে বিশ্লেষণ দিয়ে রেখেছে: “যারা আপনার ক্রোধ সৃষ্টি করেছে (যেমন ইহুদিরা), যারা উচ্ছন্নে গেছে (যেমন খ্রিস্টানেরা) এমন কেউ নয়।” সিইয়েদ হোসসেইন নাসর, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর আর নতুন স্টাডি কোরান, একটা সটীক সংস্করণের প্রধান সম্পাদক, বলেন যে ওই টীকাগুলো “পুরোপুরি ধর্মদ্রোহিতা, ইসলামিক আদর্শের কোন ভিত্তি নেই তাতে।”
তেমনিভাবে, যেসব মার্কিনি কর্মকর্তা জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতায় কাজ করেছেন তাঁরা সৌদি প্রভাব সম্পর্কে একটা অন্ধকার মনোভাব ধারণ করেন – তারপরেও, সম্পর্কটার সংবেদনশীলতা বিবেচনায়, তাঁরা প্রায়ই প্রকাশ্যে সেসব নিয়ে আলোচনায় অনাগ্রহী। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সৌদি জঙ্গিবাদবিরোধিতার সহায়তায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা – যেমন ধরা যাক, ২০১০ সালে দুটো মার্কিনি কার্গো বিমান উড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সৌদি সঙ্কেতটা – প্রায়ই কট্টরবাদী প্রভাবের আশঙ্কার চাইতে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। আর অধ্যাপনা ও মার্কিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়, এমনকি সবচে উঁচুদরের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও, উদারহস্তে সৌদি দানশীলতার কারণে সমালোচনা কমেছে ও ওয়াহাবি দলভুক্তির প্রভাবের ব্যাপারে গবেষণা নিরুৎসাহিত হয়েছে। এই মত জনাব ম্যাককান্টস-এর – বৈশ্বিক ইসলামের ওপর সৌদি প্রভাব নিয়ে তিনি একটা বইয়ের কাজ করছেন – এবং অন্য গবেষকদেরও।
মুখ খুলছেন এমন একজন প্রাক্তন মার্কিনি কর্মকর্তা হলেন শ্রীমতি পণ্ডিত, আবিশ্ব মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্টেট ডিপার্টমেন্ট-নিয়োজিত প্রথম বিশেষ প্রতিনিধি তিনি। ২০০৯ থেকে ২০১৪ অবদি, তিনি আশিটা দেশের মুসলিমদের সাথে দেখা করেছেন আর সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে সৌদি প্রভাব হানিকারক ও বিশ্ববিস্তৃত। “যেসব জায়গায় আমি গেছি, ওয়াহাবি প্রভাবের চোরাটানের উপস্থিতিটা ছিলই,” নিউ ইয়র্ক টাইমসে গত বছর একটা লেখায় জানান তিনি। তিনি বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “জঙ্গিবাদি ইমামদের প্রশিক্ষণটা ভণ্ডুল করা,” “মুফত সৌদি পাঠ্যবই আর অনুবাদ যেগুলো ঘৃণাপরিপূর্ণ সেসব খারিজ করা,” আর “স্থানীয় মুসলিম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা যেগুলো ইসলামের বৈচিত্র্যের নমুনা সেসব গুঁড়িয়ে দেওয়া থেকে সৌদিদের বিরত রাখা” উচিত।
তারপরও কিছু ইসলাম আর জঙ্গিবাদ গবেষক, এর ভেতর অনেক দেশের উগ্রপন্থানুসরণের ওপর বিশেষজ্ঞেরাও আছেন, সৌদি আরবই যে জঙ্গিবাদ আর জিহাদি সহিংসতার বর্তমান ঢেউটার জন্যে মুখ্যত দায়ী এই ধারণাটা দূরে ঠেলে দেন। তাঁরা ইসলামি উগ্রবাদিতার উত্থান ও বিস্তারের জন্যে বিভিন্ন সূত্রের দিকে আঙুল তুলে দেখান, এর ভেতরে আছে মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠরোধী সরকারের অবস্থান, স্থানীয় অবিচার ও বিভাজন, সন্ত্রাসী প্রোপাগান্ডার জন্যে ইন্টারনেট ছিনতাই, আর আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইরাকদখল অবদি মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার নাকগলানো। বিংশ শতকীয় মতাদর্শগুলোর ভেতরে আধুনিক জিহাদিদের ভেতর যেসব সবচে জনপ্রিয়, যেমন মিশরের সাইয়িদ কুতব আর পাকিস্তানের আবুল আলা মওদুদি, সেসব কিন্তু সৌদি প্রভাবক ছাড়াই তাদের চরমপন্থী, পশ্চিমাবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিতে পৌঁছে গেছে। আল কায়েদা আর ইসলামিক স্টেট সৌদি শাসকদের ঘেন্না করে, তাদের কাছে তারা ভণ্ডচূড়ামণি।
“মার্কিনিরা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ভালবাসে – কোন লোক, কোন রাজনৈতিক দল কিংবা দেশের ওপর,” কথাটা রবার্ড এস. ফোর্ডের, সিরিয়া আর আলজেরিয়ার প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত তিনি। “কিন্তু ব্যাপারটা আসলে এরচে আরো অনেক বেশি গোলমেলে। সৌদিদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর আগে আমি আরো ভাল করে খেয়াল করতাম।”
তাঁর এবং অন্য অনেকের মতে, সৌদি ধর্মীয় প্রভাব যদিও বিধ্বংসী, এর প্রভাবটা কিন্তু একছাঁচে ঢালাই-করা নয়। সৌদি ইসলামিক শিক্ষার একটা মূল স্তম্ভ হচ্ছে শাসকদের প্রতি আনুগত্য – জাতিরাষ্ট্রগুলো ভাঙার জন্যে সন্ত্রাসবাদকে অন্তত এটা উস্কে দেবে না। অনেক সৌদি আর সৌদি-প্রশিক্ষিত যাজকেরা সবচে নীরব, শাস্ত্র আর উপাসনার প্রতি ভক্তি আর রাজনীতিবিমুখিতা তাঁদের বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক সহিংসতার কথা তো বাদই দিলাম।
আর বিশেষত ২০০৩ থেকে, যখন রাজ্যটায় আল কায়েদার হামলা রাজতন্ত্রের চোখ খুলে দেয় যে জঙ্গিবাদ তাদের জন্যে কী বিপদ ডেকে এনেছে, সৌদি আরব যেসব ধর্মপ্রচারক সহিংসতাপ্রচার করে তাদের বেশ জোরেসোরে বাতিল করে, বন্ধ করে সন্ত্রাসী অর্থায়ন আর পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার সাথে কাঁধ মিলিয়ে সন্ত্রাসীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করার কাজে কাঁধ কাঁধ মেলায়। ২০০৪ থেকে ২০১২ পর্যন্ত, চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির বিপক্ষে আওয়াজ না-তোলার জন্যে চাকরি গেছে ৩,৫০০ জন ইমামের, তথ্যসূত্র ইসলামিক এফেয়ার্সের মন্ত্রণালয়ের – যদিও ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে প্রশিক্ষণগুলো আসলেই “সহনশীলতার বিস্তার ঘটাচ্ছে” কিনা।
সৌদি আরবে অনেকদিনের অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন মার্কিনি গবেষক জানান – পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কারণ রাজ্যটিতে গবেষণার কাজে তাঁকে যেতে হবে আবার – তিনি বিশ্বাস করেন যে মার্কিন রাজনৈতিক আলোচনায় সৌদি প্রভাবের ব্যাপারটা প্রায়ই অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু তিনি এটা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে তুলনা করেন। যেমন তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লেও সেটা বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ প্রভাব ফেলে, গলে যায় হিমবাহ আর মরতে থাকে জীবপ্রজাতি, তেমনি অনেক দেশেই সৌদি শিক্ষাটা এমনভাবে কাজ করছে যেটা বুঝে ওঠাটা ভারি মুশকিল আর খুঁজে-পাওয়াটাও বেশ সমস্যার কিন্তু বস্তুত বেশ গভীরতর, গবেষকটির মতামত।
সৌদি দলভুক্তির ফলাফল হতে পারে তরুণদের জন্যে “ধর্মীয় ভরকেন্দ্রের পুনর্সামঞ্জস্যকরণ”, তাঁর মতামত, যাতে করে “আইসিস যখন আসে তখন ওদের ধর্মীয় বয়ান তাদের গেলা বা হজম করতে সুবিধে হয়। যতটা দূরের শোনাচ্ছে ব্যাপারটা তেমনটা নয়, সৌদি ধর্মীয় প্রভাব যদি নাক না-গলাত তাহলে তেমনটা হত না।”

দোলাচলের শত বছর

দুনিয়ার বেশিরভাগের যেটা নিয়ে আপত্তি সেই মতাদর্শটা ঝেড়ে-ফেলাটা সৌদি আরবের জন্যে এত কঠিন কেন? সৌদি দোলাচলের চাবি খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় শতিনেক বছর পেছনে সেই জোটের উৎসে যেটা এখনো সৌদি রাষ্ট্রের ভিত্তিরক্ষক। ১৭৪৪ সালে, মুহাম্মদ ইবন আবদ আল-ওয়াহহাব, সংশোধনবাদী এক ধর্মপ্রচারক, মুহাম্মদ বিন সাউদের সুরক্ষা যাঞ্ছা করেন যিনি আরব্য দ্বীপমালার রুক্ষতর মরুভূমির এক শক্তিধর গোত্রপতি। জোটটা দুপক্ষের জন্যেই লাভজনক ছিল: ওয়াহহাব তাঁর মতবাদপ্রচারে পেলেন সামরিক সুরক্ষা। নবি মুহম্মদ যখন বেঁচে ছিলেন সেই সপ্তম শতাব্দীর ইসলামের প্রথম যুগের মূল্যবোধ অনুসারে মুসলিমদের সেই আদর্শে ফিরিয়ে নিতে হবে, এটাই তাঁর বিশ্বাস। (তাঁর বিশ্বাসটা সালাফিবাদের একটা ভিন্নতর রূপ। এটা ইসলামের কট্টর মতবাদের একটা ধারা যেটা শেখায় যে সালাফ, বা সাধু পূর্বসূরিরাই জীবন আর বিশ্বাসের সঠিক পথাবলম্বী আর সেসবই আলিঙ্গন করা উচিত।) বিনিময়ে, সাউদ পরিবার লাভ করলেন এক ইসলামিক ধর্মগুরুর সমর্থন –বিশুদ্ধতাবাদী এক নিষ্পেষক যিনি ব্যভিচারের দায়ে দণ্ডিত নারীকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা চাপিয়ে-দেওয়ার মানুষ হিসেবে পরিচিত।
ওয়াহহাবের সুনির্দিষ্ট ইসলামের সংস্করণ প্রথম দুটো ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার একটা যেটা শতাব্দীপরবর্তীকালে সৌদি ধর্মীয় প্রভাবের রাস্তা নির্ধারণ করবে। যেটা ওয়াহাবিবাদ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠল সেটা ছিল “একটা গোত্রভিত্তিক, মরুভূমির ইসলাম”, ওয়াশিংটনের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজের প্রধান আকবর আহমেদের ভাষ্য। নিষ্করুণ আবহাওয়ায় এর গড়ে-ওঠা – জাতিবিদ্বেষ, ধর্মীয় স্থাপনা ও স্মৃতিস্তম্ভের প্রতি হিংস্র শত্রুতা, শিল্প ও সঙ্গীত খারিজকরণ, আর বাগদাদ ও কায়রোর মতন বৈচিত্র্যময় শহরের মহানগরভিত্তিক ইসলাম থেকে এটা অনেকটাই আলাদা।
দ্বিতীয় ঐতিহাসিক ঘটনাটা ঘটে ১৯৩৮-এ, যখন মার্কিনি সন্ধানীরা সৌদি আরবে পৃথিবীর বৃহত্তম তেলের মজুদটি আবিষ্কার করে বসে। আরব্য-আমেরিকান তেল কোম্পানি, বা আরামকোর তেল থেকে আহৃত রাজস্ব অকল্পনীয় সম্পদের জন্ম দেয়। কিন্তু সেটা একইসাথে একটা অপরিবর্তনীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একই জায়গায় আটকে রাখে আর রক্ষণশীল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি এর নিজস্ব ইসলামের চরম ধারার রপ্তানিতে বিলাসী বাজেট বরাদ্দ করে।
“তেল পেয়ে গেলেন একদিন, তো দুনিয়াই ভিড় করবে আপনার কাছে,” প্রফেসর আহমেদ বলেন। “ঈশ্বর আপনাকে আপনার ইসলামের সংস্করণ দুনিয়ার কাছে নিয়ে-যাওয়ার হেকমত দিয়ে দিলেন।”
১৯৬৪ সালে, বাদশা ফয়সাল যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তিনি ইসলামবিস্তারের বাধ্যবাধকতা মেনে নেন। অনেকদিকেই তিনি আধুনিকায়ন করলেও, পাশ্চাত্যের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বলে, ওয়াহাবি মতবাদের তিনি পরিবর্তনসাধন করতে পারেননি, যা বহু দেশেই সৌদি বদান্যতার মুখচ্ছবি। পরের চার দশক জুড়ে, স্রেফ অমুসলিম-সংখ্যাগুরু দেশগুলোতেই, সৌদি আরব বানাবে ১,৩৫৯টা মসজিদ, ২১০টা ইসলামিক সেন্টার, ২০২টা কলেজ আর ২,০০০ বিদ্যালয় (মাদ্রাসা?=অনুবাদক)। সৌদি টাকায় গড়ে উঠেছে ১৬টা মার্কিন মসজিদ; কানাডায় এর সংখ্যা ৪; আর বাকিগুলো লন্ডন, মাদ্রিদ, ব্রাসেলস আর জিনেভায়। হিসেবটা সৌদি রাষ্ট্রপক্ষীয় পত্রিকা, আইন আল-আকিন-এর। মোট খরচটা, যার ভেতর ইমাম আর শিক্ষকদের পাঠানোর কিংবা প্রশিক্ষণের খরচও ধরা আছে, “বহু বিলিয়ন” সৌদি রিয়াল (ডলারে প্রায় চার রিয়াল হিসেবে), প্রতিবেদনটা জানাচ্ছে।
সৌদি ধর্মীয় শিক্ষার সুনির্দিষ্ট শক্তিটার কারণ হল এটা নবি মুহম্মদের জন্মস্থান থেকে, ইসলামের দুটো পবিত্রতম স্থান, মক্কা ও মদিনা থেকে জন্ম নিয়েছে। যখন সৌদি ইমামেরা এশিয়া বা আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে, কিংবা ইউরোপ কি আমেরিকার মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর কাছে যান, পরনে থাকে তাঁদের প্রথাগত আরবি আলখাল্লা, কথা বলেন কোরানের ভাষায় – আর পকেটে থাকে উপুড়হস্ত চেকবই – তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাটা এমনিতেই আসে।
বিংশ শতাব্দী যত এগুচ্ছে আর নানা জাতীয়তাবাদ ও বিশ্বাস নিয়মিতভাবে বুকে বুক মেলাচ্ছে, ওয়াহহাবের শিক্ষা ক্রমে ক্রমে আরো এবং আরো অকর্মণ্য হয়ে পড়বে। কিন্তু বিশেষ করে মার্কামারা ১৯৭৯ সালের পর সৌদি সরকারের পক্ষে এর আদর্শটা বাদ দেওয়ার বা মোলায়েম করার রাস্তাটা আরো অস্বাভাবিকভাবে কঠিন হয়ে পড়বে।

null
ছবিঃ নিউইয়র্ক টাইমস

সেই বছরেই সুন্নিবাদের নৃপতি, বৈশ্বিক ইসলামের শিরোপার দাবিদার সৌদি আরবকে রূপকভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েই যেন তেহরানে ইরানি বিপ্লবের কারণে একটা কট্টরপন্থী শিয়া সরকার ক্ষমতায় আসে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের ঘোষণায় ইসলামের দুটি মূল প্রকরণের ভেতর প্রতিযোগিতা তুঙ্গে ওঠে, সৌদিরা খোঁচা খেয়ে ইরানকে ঠেকাতে আর ওয়াহাবিবাদ দুনিয়ার কোণে কোণে ছড়িয়ে দিতে তাদের প্রচেষ্টা করে দ্বিগুণিত।
তারপর, এক চোখধাঁধানো আক্রমণে, ৫০০ সৌদি চরমপন্থী মক্কায় গ্র্যান্ড মসজিদটা দুসপ্তাহ ধরে দখলে রাখে, খোলাখুলিভাবে সৌদি শাসকদের পশ্চিমাদের পুতুল বলে আর প্রকৃত ইসলামের বিশ্বাসহন্তা বলে ঘোষণা দেয়। বিদ্রোহীরা হার মানে, কিন্তু শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুরুরা রাজ্যে ভয়াবহ একটা তোলপাড় চালানো আর ভিনদেশে ওয়াহাবিবাদের আরো উগ্র রপ্তানির শপথের বিনিময়েই শুধু সরকারকে সমর্থন দেন।
শেষমেষ, সেই বছরের শেষে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে হামলা চালায় আর ক্ষমতা দখল করে একটা কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় বসায়। শিগগিরই এটা মুজাহেদিনদের, মানে ইসলামের পক্ষে যুদ্ধরত পবিত্র যোদ্ধাদের একটা বিদ্রোহের মুখে পড়ে, যেটা দশকব্যাপী যুদ্ধে দখলদারদের উৎখাত করার লড়াইতে সারা দুনিয়া থেকে যোদ্ধাদের টেনে আনে।
১৯৮০-এর দশক জুড়েই, সৌদি আরব আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একইসাথে এই বিপুল আফগান লড়াইতে মুজাহেদিনদের আর্থিক সহায়তা দিতে জোট বেঁধে কাজ করে গেছে, যেটা দুনিয়াভর মুসলিমদের মহান সশস্ত্র জিহাদের ধারণাটি পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ওভাল অফিসে একদল শ্মশ্রূমণ্ডিত “আফগান স্বাধীনতা যোদ্ধাদের” সাথে বিখ্যাত স্বাগত সাক্ষাৎ করেন যাদের সামাজিক ও ধর্মতত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালের তালিবানদের চাইতে খুব বেশি আলাদা মোটেও ছিল না।
বলতে কি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত একহাতেই ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে তথাকথিত ‘জিহাদি সাক্ষর’ প্রকল্পে। আফগান শিশু ও বড়দের জন্যে বই ছাপিয়ে সেসবে অমুসলিম ‘কাফিরদের’ অর্থাৎ, সোভিয়েট সৈনিকদের বিপক্ষে সহিংসতা উস্কে দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এসোসিয়েট প্রফেসর ডানা বুর্ডের একটা গবেষণায় দেখা যায়, পশতুভাষী প্রথম শ্রেণীর ভাষাবিষয়ক একটা পাঠ্যবইতে, ‘মুজাহিদ’ শব্দটা, বা জিহাদের সৈনিক, এমনিকরে বুঝিয়ে দেওয়া আছে: “আমার ভাই একজন মুজাহিদ। আফগান মুসলিমেরা মুজাহেদিন। আমি তাদের সাথে জিহাদ করি। কাফেরদের বিপক্ষে জিহাদ করা আমাদের দায়িত্ব।”

অক্ষর ত (বড়হাতের ত ও ছোটহাতের ত): তলোয়ার (তুররা): আহমেদের একটা তলোয়ার আছে। সে তলোয়ার দিয়ে জিহাদ করে।
তোপক (বন্দুক): আমার মামার একটা বন্দুক আছে। তিনি বন্দুক দিয়ে জিহাদ করেন।

অক্ষর জ (বড় জ ও ছোট জ): (জিহাদ): জিহাদ একটি দায়িত্ব। সেরাজ জিহাদে গেছে। সে একজন ভাল মুজাহিদ।

অক্ষর দ: ধর্ম (দিন): আমাদের ধর্ম হল ইসলাম। মুহাম্মদ (সা.) আমাদের নেতা। সব রুশি আর কাফের আমাদের ধর্মের শত্রু।

অক্ষর গাইন: সম্মান (গাইরাত): প্রতিটা মুসলিমই ইসলামকে সম্মান করে ও রক্ষা করে। আফগানিস্তানের মুসলিমেরা কারোর দাস হওয়া বরদাস্ত করবে না। তারা স্বাধীনতার ঝান্ডা উঁচু করে রাখবে।


ছবিঃ নিউইয়র্ক টাইমস

৯/১১-এর পরের চাপ

১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পরের মাসগুলোর একদিনে সৌদি আরবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট ডব্ল্যু. জর্ডান একদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রদূত-থাকা প্রিন্স বন্দর বিন সুলতানের সাথে একটা গাড়িসফরে যান। প্রিন্স একটা মসজিদের দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, “ওই মসজিদের ইমামটার চাকরি বাতিল করে দিয়ে এলাম।” তাঁর মতে, লোকটার প্রচারণাগুলো বেশ জঙ্গি ছিল।
টেক্সাসের আইনজীবী মিস্টার জর্ডান জানান যে আল কায়েদার আক্রমণের পর, তিনি জঙ্গিবাদ ছড়ানোর ব্যাপারে সৌদি সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে গেছেন। “আমি তাদের বলেছিলাম: ‘আপনাদের স্কুলগুলোয় যাকিছু শেখাচ্ছেন আর মসজিদে যেসব প্রচারণা চালাচ্ছেন সেসব এখন আর অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়। ওটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে,” তাঁর উক্তি।
সোভিয়েতবিরোধী জিহাদের সমর্থনে রুক্ষ ইসলামের বৎসরব্যাপী উৎসাহপ্রদান ও অর্থায়নের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গন্তব্য বদলায় – ১৯৯০-এর দশক ধরে ধীরে ধীরে এবং তারপর আচমকা ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পরে। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর চাপপ্রয়োগের বেলায়, মার্কিনি কর্মকর্তারা বরাবরই ধীরে চলো নীতি নিয়েছেন, তাঁরা সৌদি তেল ও গোয়েন্দা সহায়তার ওপর মার্কিন নির্ভরশীলতার ব্যাপারে বেশ ভালই ওয়াকিবহাল ছিলেন। সৌদি পরিবর্তন বেদনাদায়ক ধীর গতিতে হচ্ছিল।
১১ই সেপ্টেম্বরের এক যুগ পরে, সৌদি শিক্ষণের ব্যাপারে মার্কিন অভিযোগের নীরবতা ভঙ্গ করে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন ঠিকেদার, দ্যা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর রিলিজয়ন এন্ড ডিপ্লোমেসি সৌদি অনুমোদিত পাঠ্যবইগুলোর ওপর একটা গবেষণা শেষ করে। তাতে করে কিছু পরমত-অসহিষ্ণু এবং সহিংস উপাদানের কাটছাঁট করায় কিছু উন্নতির কথা জানানো হলেও ভূরি ভূরি আপত্তিকর উপাদান দিব্যি আছেই। ২০১৩-এর ওই গবেষণার ফলাফল কর্মকর্তারা প্রকাশ্য করেননি, পাছে সৌদিরা রেগে যায় এই ভয়ে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এটা ফ্রিডম অব ইনফর্মেশন এক্টের মাধ্যমে হাতে পেয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির বাচ্চাদের শেখানো হচ্ছে যে আল্লাহর প্রিয়তম কাজগুলোর অন্যতম হচ্ছে “আল্লাহর বাণী সমুন্নত রাখার জন্যে কাফেরদের সাথে লড়াই করা”। যেসব ডজনখানেক অনুচ্ছেদে ঝামেলা পেয়েছেন তাঁরা তার ভেতর এটা একটা। দশম শ্রেণির পড়ুয়ারা শিখছে যে যেসব মুসলিমেরা ইসলাম ত্যাগ করে তাদের তিনদিন ধরে জেলে পুরে রাখতে হবে, আর তারপরও তারা যদি মনোভাব না পাল্টায়, তবে “তাদের সত্য ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্যে তাদের হত্যা করতে হবে।” চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়ছে অমুসলিমদের “সত্য পথ দেখানো হয়েছে কিন্তু সেসব পরিত্যাগ করেছে তারা, ইহুদিদের মত”, কিংবা সত্য প্রতিস্থাপিত করেছে “অজ্ঞতা আর বিভ্রান্তি দিয়ে, খ্রিস্টানদের মত।”
সরকারের তরফে প্রস্তুতকৃত এবং বিতরিত কিছু ওরকম পাঠ্যবই এরকম ধারণা ছড়াচ্ছে যেসব বিজ্ঞান, আধুনিকতা ও নারীস্বাধীনতার বিরোধী, ঠিক সরাসরি উদ্ভট বলা যাবে না – যেমন এক জায়গায় জাদুকরদের শাস্তি দেওয়া এবং রোটারি ক্লাব ও লায়নস ক্লাবের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। (দশম শ্রেণির একটা পাঠ্যবই জানাচ্ছে ওসব দলের উদ্দেশ্য হচ্ছে, “জায়নবাদী আন্দোলনের লক্ষ্য হাসিল করা”)
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় পাঠ্যবইগুলো, কিংবা একই উদ্দেশ্যবাহী অন্য সৌদি শিক্ষণোপকরণগুলো অজস্র দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৩-এর গবেষণাটার সময় থেকেই পাঠ্যবইগুলোর সংস্কার শুরু হয়েছে, আর সৌদি কর্মকর্তারা বলছেন তাঁরা নানান দেশে পাঠানো পুরনো বইগুলো পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
৮. কে আমাদের জাকাতের হকদার?…যেসব মুজাহেদিনে তাঁদের জীবন আল্লাহর রাহে কোরবান করেছেন। তাঁদের প্রচুর অস্ত্র, খাবার আর অন্য জিনিসপত্র দিতে হবে যাতে তাঁরা জিহাদ চালিয়ে যেতে পারেন ও নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারেন।
(ফিকহ বা আইনশাস্ত্র, অষ্টম শ্রেণি (টার্ম ১), ২০১১-২০১২, পৃ. ৪০)

মন্তব্য: এই লেখাটা শিশুদের মুজাহেদিনদের অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়াটা দানশীলতা হিসেবে দেখাচ্ছে। বিপদটা হল এইই যে ‘মুজাহেদিন’ শব্দটা সন্ত্রাসবাদীদের ভুলভাবে চিহ্নিত করার বেলায় এত বেশি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে যে শিশুরা ভাবতেই পারে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র দেওয়াটা একটা ইসলামিক কর্মকাণ্ড।

৪. উপসংহার:
…আহলে কিতাবিদের ভেতর ইহুদি আর খ্রিস্টান পণ্ডিতেরা জানে যে ইসলামের বাণীই স্পষ্টতই সত্যি, তাদের নিজেদের কিতাবেই তার উপস্থিতি আছে। কিন্তু তারা গো্ঁয়ার্তুমি আর ঔদ্ধত্য থেকে এর বিরোধিতা করে যায়। আল্লাহ তাদের দেখেন, এবং তাদের কাজগুলো ভোলেন না কারণ তারা শাস্তি পাবে।
(তাফসির, একাদশ শ্রেণি, ২০১১-২০১২, পৃ. ৪৬)

মন্তব্য: উপসংহারটা অতিসরলীকরণ। এতে ইহুদি আর খ্রিস্টানদের ভ্রান্ত ধর্ম সচেতনভাবে অনুসরণের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছে এবং প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে যে তারা সবাই ঈশ্বরের হাতে শাস্তি পাবে।

কিন্তু গবেষণাটার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, স্কুলপাঠ্যগুলো সৌদির দুনিয়াভর ওয়াহাবিবাদ রপ্তানির বিলাসী অর্থায়নের স্রেফ খুদে একটা অংশ। অনেক জায়গাতেই, গবেষণাটা বলছে, দানশীলতার ভেতরে রয়েছে “একটা ওয়াহাবি শিক্ষকময় (সৌদি টাকায় বানানো ওয়াহাবিবাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনো) সৌদি-অর্থায়নকৃত একটা স্কুল, যার সাথে জুড়ে আছে একটা ওয়াহাবি ইমামের হাতে-চালানো মসজিদ, আর শেষমেষ যেসব নিয়ন্ত্রণ করছে একটা আন্তর্জাতিক ওয়াহাবি শিক্ষাসংস্থা।”
এই আদর্শবাদী স্টিমরোলার নানান জায়গাতেই চলেছে যেখানে মুসলিমেরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে শতাব্দীভর একে অন্যের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান শিখে এসেছিল। সাইয়িদ শাহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডক্টরেট ডিগ্রি নিতে-আসা এক পাকিস্তানি সাংবাদিক, তাঁর নিজের শহরের প্রলয়ঙ্করী প্রভাবের বিবরণ দিলেন। শহরটা আফগান সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কাহিনিটা শুরু হয় বছরখানেক আগে সৌদি টাকায় চালানো একটা মাদ্রাসা থেকে বেরুনো এক পাকিস্তানি মৌলভি সেখানে আসার পর।

ছবিঃ নিউইয়র্ক টাইমস
তিনি বলেন, গ্রামবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম বিশ্বাসের একটা মিলনভূমি ছিল। “আমরা সুন্নি ছিলাম, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য ছিল শিয়া আর বেরেলভি আর দেওবন্দির একটা যুগলবন্দি,” মুসলিম গোত্রগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে জনাব শাহ বলেন। তাঁর পরিবার বিশাল বেরেলভি তীর্থস্থানটায় যেত, আর শিয়া প্রতিবেশীদের প্রকাশ্যে ধর্মীয় উৎসবে নিজেদের চাবুক মারতে দেখত। “আমরা নিজেরা সেসব করতাম না, কিন্তু আমরা মিষ্টি আর পানি বিলাতাম,” তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, নতুন যে মৌলভি এলেন তিনি বেরেলভি আর শিয়াদের বিশ্বাসকে ভুয়া আর ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে খারিজ করে দিলেন, ভাগ হয়ে গেল গোষ্ঠীটা আর বছরব্যাপী তিক্ততর্ক শুরু হয়ে গেল। ২০১০-এ “সবকিছুই বদলে গেল।” যেসব নারীরা শাল দিয়ে তাঁদের চুল ও মুখ ঢেকে রাখতেন এবার শুরু করলেন পুরোদস্তুর বোরকাপরা। যেসব দোকানে দোকানদারেরা ধর্মনিরপেক্ষ গানের সিডি বিক্রি করত সেসবে হামলা চালাল জঙ্গিরা। দুবার জঙ্গিরা গ্রামের স্থানীয়ভাবে প্রসিদ্ধ ধর্মস্থানটা উড়িয়ে দেওয়ার জন্যে বিস্ফোরক ব্যবহার করে।
জনাব শাহ বললেন, পরিবারগুলোই এখন দ্বিধাবিভক্ত। তাঁর তুতো ভাই “স্রেফ সৌদি ধর্ম চায়।” তিনি বললেন পুরো একটা প্রজন্মই গোঁড়া, ক্ষমাহীন একটা পথে ‘দীক্ষিত’ হয়ে গেছে।
“কী যে ঝামেলা হয় আজকাল,” তিনি বলেন। “প্রথমদিকে আমরা একই রাস্তায় ছিলাম। স্রেফ টাকাপয়সার সমস্যা ছিল, কিন্তু সাংস্কৃতিক দিক থেকে আমরা একদম ঠিকঠাক ছিলাম।”
তিনি যোগ করেন, “কিন্তু এখন সেসব ভারি কঠিন হয়ে গেছে, কারণ কিছু লোক চায় সৌদি সংস্কৃতিই আমাদের সংস্কৃতি হোক, আর বাকিরা সেসবের বিরোধিতা করছে।”
সি. খ্রিস্টিন ফেয়ার, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ, বলেন জনাব শাহের বিবরণ বাস্তবসম্মত। কিন্তু অন্য অনেক গবেষক যেমনটা ধর্মের ওপর সৌদি প্রভাবের কথা বিশদ করেছেন, তিনি বলেন যে পাকিস্তানে জঙ্গিবাদের নিজস্ব কারণও আছে। সৌদি পয়সা আর শিক্ষা প্রশ্নাতীতভাবে ‘গতিদায়ক’, কিন্তু পাকিস্তানের গোত্রবিবাদের সমস্যা আর জিহাদি সহিংসতার গভীর শেকড় ১৯৪৭-এ ভারত থেকে আলাদা হওয়ায় দেশটার উৎসের ভেতরেই আছে।
“সৌদিরা না-থাকলে পাকিস্তান সুইজারল্যান্ড হয়ে যেত এই ধারণাটা হাস্যকর,” মিজ ফেয়ারের মতামত।

চোখ-এড়িয়ে যাওয়া সৌদি সম্পর্ক

প্রশ্নটা নিঃসন্দেহে বিতর্কটা উস্কে দেয়: দশকের পর দশক ধরে সৌদি-অর্থায়নকৃত ইসলামের রূপটা না-থাকলে পৃথিবীটা কতটা আলাদা হত। যদিও এমন একটা বিশ্বব্যাপী বিশ্বাস আছে, যে সৌদি প্রভাব দুনিয়া জুড়ে সন্ত্রাসবাদের বেড়ে-ওঠায় উস্কানি দিয়েছে, ঠিক কার্যকারণ সম্পর্ক আছে এমন একটা প্রত্যক্ষ উদাহরণও খুঁজে-পাওয়া মুশকিল। উদাহরণস্বরূপ, ব্রাসেলসে গ্র্যান্ড মসজিদটা সৌদি টাকায় বানানো আর সৌদি ইমামে ভর্তি। ২০১২-তে উইকিলিকসের ফাঁস-করা সৌদি কূটনৈতিক তারবার্তায় দেখা যায়, বেলজিয়াম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একজন সৌদি ধর্মপ্রচারককে সরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল তিনি একজন ‘সাচ্চা সালাফি’যিনি ইসলামের অন্য ধারাগুলো মেনে নেন না। আর ব্রাসেলসের অভিবাসী প্রতিবেশী এলাকা, বিশেষত মোলেনবিক, অনেকদিন ধরেই রাস্তার পাশের মসজিদের জায়গা যেগুলোয় কট্টর সালাফি দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষা দেওয়া হয়।
নবেম্বরে প্যারিসে আর মার্চে ব্রাসেলসে সন্ত্রাসী হামলাগুলো বেলজিয়ামের ইসলামিক স্টেটের একটা দলের সাথে সংযুক্ত হওয়ার পর, সৌদি ইতিহাসটা বেশকটা নিউজ মিডিয়ার প্রতিবেদনে উঠে আসে। তারপরও বেলজিয়ামের রাজধানীতে বোমারু আর সৌদি ধারাবাহিকতার কোন সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে-পাওয়া শক্ত ছিল।
অল্পকজন সন্দেহভাজনের ছিঁচকে অপরাধী কাজের ইতিহাস ছিল; তাদের ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান বন্ধুদের ভাষায় ভাসা ভাসা; তারা কোন মসজিদেই নিয়মিত উপস্থিত ছিল না। যদিও আই এস এসব বিস্ফোরণগুলোর দায় নিয়েছিল, হামলাগুলোর পেছনে মুখ্য কারণ হিসেবে দেখা গেল উত্তর আফ্রিকার অভিবাসী পরিবারগুলোর সাথে করা ব্যবহার নিয়ে ক্ষোভ এবং ব্যক্তিগতভাবে কিংবা ইন্টারনেট আর সামাজিক গণমাধ্যমগুলোয় ইসলামিক স্টেটের প্রোপাগান্ডার শিকার-হওয়া।
যদি সৌদি কোনো সম্পর্ক থেকেও থাকে, ওটা খুব বেশি পরোক্ষ, হয়ত কয়েক প্রজন্ম বা আরো বেশি সময় ধরেই চলে-আসা ব্যাপারটা। হিন্দ ফ্রাইহি, একজন মরক্কান-বেলজিয়ান সাংবাদিক যিনি ব্রাসেলসের অভিবাসী প্রতিবেশী এলাকা মোলেনবিকে পরিচয় গোপন করে ২০০৫-এ লুকিয়ে থাকেন এবং সেটা নিয়ে একটা বই লেখেন, সৌদি-প্রশিক্ষিত ইমামদের সাথে দেখা করেন এবং সৌদি আরবে লেখা এন্তার চরমপন্থী বই খুঁজে পান যেসব “মেরুকরণ, আমাদের-বিপক্ষে-তারা আবেগ, জিহাদের মহিমান্বিতকরণ” উৎসাহিত করে।
সাম্প্রতিক হামলাকারীদের, মিজ ফ্রাইহির মতে গতিশীল করেছে “অনেকগুলো কারণ – অর্থনৈতিক হতাশা, বর্ণবাদ, একটা প্রজন্ম যারা ভাবছে তাদের আর কোন ভবিষ্যৎ নেই।” কিন্তু সৌদি শিক্ষা, তাঁর মতে, “মিশ্রণের অংশমাত্র।”
দশকব্যাপী সৌদি উপস্থিতি না-থাকলে হয়তো অভিবাসী মরক্কানদের শেকড়সম্পৃক্ত একটা আরো প্রগতিশীল ও মিলমিশমুখী ইসলাম থাকতে পারত? বেলজিয়ামে বেড়ে-ওঠা তরুণ মুসলিমেরা কি ইসলামিক স্টেটের ক্রূর, সহিংস আহ্বানে আরো কম সাড়া দিতে পারত? ধারণা করা যায় বটে, কিন্তু এটা প্রমাণ করাটা অসম্ভব।
কিংবা আরেকটা পুরোপুরি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশের কথা ধরা যাক – পৃথিবীর সবচে জনবহুল মুসলিম রাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া। জাকার্তার ইন্সটিটিউট ফর পলিসি এনালিসিস অব কনফ্লিক্টের পরিচালক সিডনি জোন্স বলেন, সৌদিরা দশকের পর দশক ধরে মসজিদ নির্মাণ, বই আর শিক্ষকের জন্যে টাকা ঢেলে গেছে।
মিজ জোন্স ১৯৭০ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় থাকছেন বা ঘুরে গেছেন। তাঁর মতে, সৌদি প্রভাব “আরো রক্ষণশীল, আরো অসহনশীল বাতাবরণ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।” (প্রেসিডেন্ট ওবামা, ইন্দোনেশিয়ায় যিনি বাল্যকাল কাটিয়েছেন, একই ঘটনা নিয়ে কথা বলেছেন।) তিনি বলেন তাঁর বিশ্বাস ইন্দোনেশিয়ায় শিয়া ও আহমদিয়া মুসলিমদের বিপক্ষে প্রচারণায় সৌদি ব্যক্তিগত দাতা ও প্রতিষ্ঠানের টাকা রয়েছে, ওয়াহাবি শিক্ষায় শিয়া ও আহমদিয়াদের ধর্মদ্রোহী ধরা হয়। কিছু নামকরা ইন্দোনেশীয় ধর্মীয় নিয়ন্ত্রকও সৌদি-শিক্ষিত, জানান তিনি।
কিন্তু মিজ জোন্স যখন ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রায় ১,০০০ লোকের সাক্ষাৎ নেন, তিনি খুব কম – “বলতে কি চার বা পাঁচজন” – পেয়েছিলেন যাদের ওয়াহাবি বা সালাফি প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ আছে। যখন সহিংসতার ব্যাপারটা আসে, তাঁর সিদ্ধান্ত, সৌদি সম্পর্ক “প্রায়ই একটা অচিন পাখি।”
বলতে কি, তিনি বলেন, ইন্দোনেশীয় জিহাদি আর ইন্দোনেশীয় সালাফি যারা সৌদি বা ইয়েমেনি পণ্ডিতদের কাছে তালিম নিয়েছে, তাদের ভেতর সাগরসমান পার্থক্য। জিহাদিরা সালাফিদের অভিযুক্ত করে তাদের বিশ্বাসানুযায়ী কাজ করার ব্যর্থতায়; সালাফিরা জিহাদিদের চরমপন্থী বলে গালি ঝাড়ে।
সৌদি দলভুক্তির দশকবিস্তৃত বৈশ্বিক প্রভাবগুলো যাইই হোক, এটা আগের চাইতে অনেক বেশি নজরদারিতে আছে, যেমন বাইরে তেমনি রাজ্যটার ভেতরেও। সৌদি নেতাদের আদর্শিক সংস্কারের প্রভাবগুলো, পাঠ্যবই আর প্রচারণাসহ ঘিরে, একটা নীরব সম্মতি তৈরি করেছে যে এর ধর্মীয় রপ্তানি ক্ষেত্রবিশেষে বুমেরাং হয়েছে। আর রাজ্যটি পাশ্চাত্যে একটা জোরদার গণসংযোগ প্রচারণা হাতে নিয়েছে, মার্কিনি প্রচারবিশেষজ্ঞদের ভাড়া করে সমালোচনামুখী সংবাদমাধ্যমের বিরোধিতা করা আর সৌদি নেতাদের একটা সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তি তৈরি করার জন্যে।
কিন্তু প্রচারবিশেষজ্ঞেরা কিংবা তাদের মক্কেলেরা সৌদি রাজ্য ইসলামের যে-ধারার ওপর গড়ে উঠেছে সেটা অস্বীকার করতে পারেন না, আর পুরনো অভ্যেস কখনো কখনো চেপে রাখা দায় হয়ে পড়ে। খ্যাতনামা এক সৌদি ধর্মগুরু, সাদ বিন নাসের আল-শেথরিকে প্রাক্তন বাদশা আবদুল্লাহ একটা নেতৃস্থানীয় পদ থেকে অপসারণ করেন, কারণ তিনি সহশিক্ষার বিরোধিতা করেন। বাদশা সালমান শেথরিকে ইসলামিক স্টেটের বিরোধিতাকারী দলের সাথে গলা মেলানোর অল্প দিন পরে গত বছরে চাকরিটা ফিরিয়ে দেন। কিন্তু আল্লামা শেথরির ইসলামিক স্টেটের বিরোধিতার যুক্তিটাই পরিবর্তনের সমস্যাটা ধরিয়ে দেয়। ওই দলটা, তাঁর মতে, “ইহুদি আর খ্রিস্টানদের চাইতেও বেশি কাফের।”

[1011 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0