১.
আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে শুয়োরের বাচ্চায়। এক ঘন্টা ধরে বসে আছি তালুকদারের বাড়ির সামনে।

২.
তালুকদারের বড় পোলা। জমির আইল ঠেলছে দেড় হাত। কইলাম, কিগো বাজান এ কেমন কারবার, এক ঠেলায় দেড় হাত! এটা অবিচার, কঠিন অবিচার।

পোলায় আমারে কয় চুপ থাকতে। চুপ না থাকলে নাকি ঠ্যাং ভেঙ্গে দিবে!

মিজাজটা খারাপ হয় না কন? আমিও কইলাম সাহস থাকলে ভেঙ্গে দেখাইতে। তারপর সত্য সত্য ঠ্যাংটা ভেঙ্গে দিলো! ডান ঠ্যাং, হাঁটুর নিচ বরাবর। তব্ধা খাইলাম। এইভাবে কেউ দুই কথায় কারো ঠ্যাং ভেঙ্গে দিতে পারে!

৩.
ভাঙ্গা ঠ্যাং টানতে টানতে গেলাম তালুকদারের কাছে। চিল্লানি শুনে ঘরের বাইরে আইলেন। কইলাম, তালুকদার সাব আপনার বড় পোলা আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে। বিশ্বাস করেন, আমার কোন দোষ নাই। আমি তারে একটা গাইলও দিই নাই। খালি কইছি জমির আইল ঠেলা ঠিক না। এটা অবিচার।

এটা শুনে তালুকদার ঘরের ভিতরে গেলেন। আমি ভাবলাম বন্দুক নিয়ে বার হবেন বোধ হয়। তারপর পোলার কাছে গিয়ে বন্দুক তাক করে কইবেন আমার ঠ্যাং ভালো করে দিতে, নইলে গুলি করে মারবেন। কিন্তু তালুকদার সাব আইলেন দুইটা একশ টাকার নোট নিয়া। হাতে ধরায়া বাংলার সাথে ইংরেজি মিশিয়ে কইলেন, যা হওয়ার হয়া গেছে। টাকাটা নে, কিছু প্রুট কিনে খা, নাদান পোলাটারে বদদোয়া দিস না।

পুরা বেক্কল হই গেলাম। এ কেমন বিচার! দেশ থেকে কি বিচার আচার উঠি গেলো নাকি! যাইহোক, একশ টাকার নোট দুইটা ফেরত দিই নাই। গেরামের সবাইরে দেখামু। কমু, পোলা আমার ঠ্যাং ভাঙছে, বাপে দুইশ টাকা হাতে ধরায়া দিছে।

৪.
ভাঙ্গা ঠ্যাং টানতে টানতে তালুকদারের বাড়ি থেকে বার হইলাম। বার হয়েই রাস্তায় মসজিদের ইমাম সাবের দেখা পাইলাম। কইলাম, তালুকদারের বাদাইম্যাটা আছে না? ওইটা আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে। এটা শুনে ইমাম সাব তার মাথা উঁচা কইরা আকাশের দিকে তাকাইলেন। তারপর মাথাটা নামায়া আমারে কইলেন, আল্লা যা করেন ভালোর জন্য করেন, দোয়া করি যেন এই ভাঙ্গা ঠ্যাং নিয়েই তার খেদমত করতে পারো।

মিজাজটা খারাপ হয় না কন? আল্লা নাকি ভালোর জন্য আমার ঠ্যাং ভাঙছেন! কার ভালোর জন্য? আমার? নাকি ইমাম সাবের? নাকি তালুকদারের?

৫.
ভাঙ্গা ঠ্যাং টানতে টানতে এবার গেলাম মাতবরের কাছে। কইলাম, তালুকদারের পাঠায় আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে, আর পাঠার বাপে হাতে দুইশ টাকা ধরায়া দিছে। কথাটা শুনে মাতবরের চেহারায় কোন সমবেদনা নাই, চু চু করা আপসোস নাই। মাতবর কয় শনিবারে হাটে যাইতে। দুইশ টাকা দিয়ে একটা ঠ্যাং কিনে নিতে। তারপর আরো কইলো তালুকদার দিল দরিয়া মানুষ। দেড়শ টাকাতেই নাকি ভালো ঠ্যাং পাওন যায়।

মিজাজটা খারাপ হয় না কন? হাটে নাকি ঠ্যাং পাওন যায়! তামাশা করে আমার লগে, আমি তামাশার পাত্র।

৬.
এবার হইলো আলগা বিপদ। গেরামের দুষ্টু পোলাপান পিছু নিছে। ভারি বেয়াদব এসব পোলাপান। আমার ভাঙা ঠ্যাং নিয়ে মশকরা করে। কয় –
বড় পোলার ছোট চ্যাং, রহমতের ভাঙ্গা ঠ্যাং
ঠ্যাং করে ট্যাং ট্যাং, ব্যাং ডাকে ঘ্যাঙর ঘ্যাং।

আচ্ছা বুঝলাম এরা অবুঝ। এখনো শেখেনি কারো ভাঙ্গা ঠ্যাং নিয়ে মশকরা করতে নাই। কিন্তু মেম্বার সাব? তিনিতো অবুঝ না। দুই দুইটা বৌয়ের স্বামী, পঞ্চাশের মত বয়স। মেম্বার সাবের কাছে গিয়ে কইলাম, তালুকদারের ধামড়াটা আছে না? ওই হারামির বাচ্চা আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে। বিচার নিয়ে গেলাম ধামড়ার বাপের কাছে। ধামড়ার বাপ আমার হাতে দুইশ টাকা ধরায়া দিয়ে কইলো প্রুট কিনে খাইতে। আপনি এর একটা বিচার করেন।

মেম্বার সাব কয় একদিন না একদিন এসব অনাচারের বিচার হবে। ঘুচে যাবে জরা, মুছে যাব ব্যাধি। এই পৃথিবীতেই হবে অত্যাচারির সমাধি।

মিজাজটা খারাপ হয় না কন? হালারপুতরে ভোট দিয়ে মেম্বার বানাইছি কবিতা শোনার লাগি!

৭.
আবার টানো। ভাঙ্গা ঠ্যাং টানো। টানতে টানতে গেলাম চেয়ারম্যানের কাছে। নতুন প্রজন্মের চেয়ারম্যান। হেবি ইস্মার্ট। কম বয়সী শিক্ষিত চ্যাংরা পোলা। ভাবলাম নতুন কিছু শুনাইবো। বিচার পাবো। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কচি মুখে সেই পুরানা কথা। দম নিয়ে ধীরস্থির হয়ে খুব ভদ্রভাবে চেয়ারম্যানরে প্রথমে কইলাম বেয়াদবি মাপ করতে। তারপর কইলাম, হারামি তালুকদারের জাওরা পোলাটা আমার ঠ্যাং ভেঙ্গে দিছে। বিচার চাইতে গেলাম আর জাওরার বাপে একশ টাকার দুইটা নোট হাতে ধরায়া দিছে। এর একটা বিহিত করেন। একটা সুবিচার করে দেন।

চেয়ারম্যান কয় তালুকদার সম্মানি মানুষ। দানবীর। তার বিচার করন যাইবো না। গেরামের রাস্তার কামের জন্য তালুকদার নাকি চল্লিশ হাজার টাকা ডোনেশন দিছে। উন্নয়ন খুব জরুরী বিষয়। কিছু পাইতে হইলে কিছু দিতে হয়। গেরামের উন্নয়নের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ত্যাগ স্বীকার না করলে উন্নয়ন হইবো না।

চেয়ারম্যান আরো কয় আমার ঠ্যাং নাকি গেরামের রাস্তার কামের জন্য ডোনেশন হিসেবে ধরে নিছেন। উন্নয়নের জন্য আমি নাকি ঠ্যাং বিসর্জন দিছি। এটা উনি উনার ডায়েরিতে লিখে রাখবেন। আমার এই দানের কথা স্মরণ রাখবেন।

মিজাজটা আর কত খারাপ হইতে পারে? এসব নতুন প্রজন্মের কুত্তার বাচ্চাগোরে কী করতে মন চায় কন? এসব দেখলে কী যে কষ্ট লাগে বুঝাইতে পারুম না। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চেয়ারম্যানের পাছায় সারাদিন পিডাইলেও পরাণ ঠান্ডা হইবো না। পরাণটা এমন পোড়া পুড়তেছে।

আমি যা বুঝার বুঝছি, এখন যা করার তা করবো।

৮.
ঠ্যাঙের ব্যাথা ম্যালা বাড়ছে। তাতে কী হইছে! ব্যাথায় গোঙাইতে গোঙাইতে গেছি কামারের দোকানে। দুইশ টাকা দিয়া দুই ইঞ্চি মোটা আড়াই হাত লম্বা একটা রড কিনছি। রডের মাথাটা বাঁকা করে ঘুরায়া নিছি। এবার তালুকদার হারামিরে বুঝাবো রহমতের মিজাজ গরম হলে সে কী করতে পারে।

৯.
এক ঘন্টা ধরে বসে আছি তালুকদারের বাড়ির সামনে। তালুকদার নাকি বাজারে গেছে। আসুক, বাজার থেকে আসুক। বাড়িতে ঢোকার সময় রড দিয়ে পথ আটকায়া বলবো, শুয়োরের বাচ্চা, তোর পোলা আমার এক ঠ্যাং ভাঙছে। এখন তুই যদি তোর পোলার দুই ঠ্যাং না ভাঙ্গস, তাহলে আমি তোর ঠ্যাং দুইটাতো ভাঙবো ভাঙবো, হাতও কুঁচা কুঁচা কইরা দিবো।

১০.
রহমত আজ ক্ষেপছে।

[924 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0