আমাদের আক্রমণের পিছনে ফারসীম মান্নানের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছেন।

না না, ভুলেও ভাববেন না পুলিশ বা বাংলাদেশি গোয়েন্দাদের কেউ করেছেন। বাংলাদেশের সরকার, পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনদিন কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি। তবে অগুনতি সোশ্যাল মিডিয়াবাসী করেছেন। গতবছর আক্রমণের পরপর তো করেছেনই আবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও করেছেন। এবারের গুলশানের জঙ্গি হামলার ঘটনার পর এবং বিশেষ করে হাসনাত করিমের সংশ্লিষ্টতার প্রসঙ্গ ওঠার পর আবার নতুন করে প্রশ্নের সুনামি শুরু হয়েছে। অনেকে আমাকে কোট করে বিভিন্ন কথাও বলছেন। তাই ভাবছি আমাদের ‘জাতীয় সংবাদ মাধ্যম’ ফেসবুকেই পরিষ্কার করে আমার ‘বিজ্ঞ’ মতামতটা না হয় একবার জানিয়ে দেই।

অভির সাথে বইমেলায়

এই এক মহা-ঝামেলা প্রযুক্তির শিখরে ওঠা বিশ্বায়নের যুগে জন্ম নিয়ে। কোন ইস্যু নিয়ে চুপ করে থাকলেন তো নিজের অজান্তেই একগাদি ভূঁইফোঁড় কন্সপিরেসি থিওরির জন্ম দিলেন, তারপর এর ফলোআপের হ্যাপা সামলাতে সামলাতে জীবনটা যাই যাই করবে। এখন আর আমরা কেউ চুপ করে থাকিনা (এটার অনেক ভালো দিকও যেমন আছে খারাপ দিক কম নেই)। একদিকে দেশে বিচারের মিথ্যা প্রহসন, আসামী ধরতে দুর্নীতি-দুইনম্বরি-ক্রস ফায়ারের দক্ষযজ্ঞ, নেতানেত্রী আর আইজি মাওলানাদের খুনিদের বদলে নৃশংসভাবে কোপ খাওয়া লেখক-ব্লগাদেরই উল্টে দোষী করা আর অন্যদিকে জেনে, না জেনে বা সাড়ে ছয় পারসেন্ট জেনেই ফেসবুকে সবার সে কী সব বিজ্ঞ মতামত! হাতি ঘোড়া মারার সে কী প্রতিযোগিতা! অনির্ভরযোগ্য সিস্টেমের উপর থেকে আস্থা চলে গেলে হয়তো এরকমই হয়।

এখন তো আর হাতিঘোড়া মারতে বনে যেতে হয়না, তীর ধনুক বন্দুকও চালাতে হয় না। ফেসবুক যেন সেই রোজ হাশরের ময়দান, আর আমরা সবাই তার মহামতি বিচারক। যাদের বিচার করার কথা, আসামী ধরার কথা তারা তাদের দায়িত্ব পালন না করে রাজনীতি-দুর্নীতির খেলা খেলেন, আর যাদের করার কথা নয় তারা সর্বজ্ঞ হয়ে যাকে ইচ্ছা তাকে কথার ফুলঝুড়ি তুলে শুলে চড়ান, মব লিঞ্চিং এর মাস্টার হয়ে উঠছি আমরা সবাই যেন।

যাহোক, আমি সেই প্রথম থেকে যা ভেবেছি যা বলেছি তাইই ভাবি এখনো।

আমি জানি না ফারসীম এবং তাঁর স্ত্রী আমাদের হামলার পিছনে জড়িত ছিলেন কিনা। তাই এ নিয়ে আমি প্রকাশ্যে কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছি এবং এবারের পরে ভবিষ্যতেও থাকবো। কিছু না জেনে এবং বিশেষ করে এরকম ক্ষেত্রে প্রমাণসহ কিছু না জানলে আমি সেটা নিয়ে কথা বলাটাকে সঠিক মনে করিনা। দেশের এখন যে অবস্থা, দেশজুড়ে, আমাদের সমাজ জুড়ে, বিশ্বজুড়ে আজ যেভাবে ইসলামি মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদের দাপাদাপি তাতে করে যে কেউ এর সাথে জড়িত থাকতে পারে আবার নাও পারে। সম্ভাবনা এদিকেও ৫০%, ওদিকেও ৫০%। সুতরাং, এরকম একটা সংবেদনশীল ব্যাপার নিয়ে আমি প্রকাশ্যে, বিশেষত ফেসবুকে, সন্দেহবশে জোরদার মতামত দিয়ে অপারগ।

আমি ফারসীমদেরকে আগে চিনতাম না। যতদূর মনে পরে, ২০১২ সালে অভি যখন একা দেশে গিয়েছিল তখন প্রথম ওর সাথে ফারসীমের পরিচয় হয়েছিল। এবার ফারসীম এবং তার স্ত্রীর সাথে বেশ কয়েকবারই দেখা হয়েছে বইমেলায়। ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে ওদের সাথে নীরবে খেতেও গিয়েছিলাম আমরা। হ্যাঁ, ফারসীমই বোধ হয় ২৬শে ফেব্রুরারিরওই আড্ডাটা ডেকেছিল। হ্যাঁ, সেদিন বিকেলবেলা (যতদূর মনে পরে ৬:০০টা বা ৬:৩০ এ দেখা করা কথা ছিল) আমরা গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম মেলায়, কারো টিকিটাও দেখা গেলনা। তারপর জেনেছিলাম (মনে নেই কে ফোন করেছিল, অভি না ফারসীম) নামাজের জন্য নাকি অনুষ্ঠান শুরু করতে দেরি হচ্ছে, ওরা নাকি এশার নামাজ পড়ে তারপর মেলায় আসবে। আমি সেদিন মেলায় আসতে চাইনি, অভি অনেক জোরাজুরি করে এনেছিল আমাকে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার আমার মাকে পরে বলেছিল আমি নাকি সারা গাড়ি ঘ্যানঘ্যান করেছিলাম অভির সাথে এ নিয়ে। ফারসীমের কথা শুনে অভিকে খুব বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম (হ্যাঁ, বিরক্তি, রাগ জাতীয় জিনিসগুলো আমার সবসময়েই একটু বেশি) অপেক্ষা না করে আমরা বাসায় চলে গেলেই তো পারি, রোজ রোজ এখানে এসে ভেরান্ডা ভাজার কী দরকার! অভি ওর স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলেছিল আরে দাঁড়াওনা আরেকটু, আই প্রমিজ আজকেই শেষদিন … (:

বিজ্ঞান আড্ডায় এটা সেই আড্ডা থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিট আগের ছবি। খুব খিদা লেগেছে বলেছিলাম দেখে অভি বা অন্য কেউ সমুসা কিনে এনে দিয়েছিল

তখন আমরা টুটুলের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে যোগ দেই যেটা ফারসীমদের আড্ডার পরে হওয়ার কথা ছিল। তারপর সন্ধ্যে হয়ে আসলে ফারসীমরা আসে এবং তাদের অনুষ্ঠান শুরু হয় মাটিতে চাদর না কী যেন বিছিয়ে। ওই অনুষ্ঠানে যারা ছিল তাদের অনেকেই আমি চিনতাম না, দুই একজন ছাড়া অন্যদের চেনারও চেষ্টা করিনি কারণ অভির চেনা বেশিরভাগ মানুষকেই আমি সাধারণত চিনতাম না। আমাদের পাশে তারেক অণু আর তার ভাই বসেছিল, তাদের সাথে কথা হয়েছিল অনেক কিছু নিয়ে। ওখানে একটা রেকর্ডিংও করা হয়েছিল সবার বক্তব্যের। নাহ, সেদিন আমাদের ফারসীমরা ডিনার খেতে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বলেনি, অনুষ্ঠান শেষ হলে আমি আর অভি হেঁটে বেরিয়ে যাই। পরে শুনেছি ওরা নাকি আমাদের উপর আক্রমণের খবর শোনার পরেও বিরিয়ানি খেয়েছিলেন।

Farseem-meeting-boimelaবিজ্ঞান আড্ডার ছবি

আমি এটুকুই জানি। বিশ্বাস করুন, এর বেশি কিছু জানি না। এর ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলে নির্ধারণ করা যায় কিনা তা আমার জানা নেই। আমি যতদূর বুঝি যায় না। তবে যদি জিজ্ঞাসা করেন, এ-নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত কিনা, আমি বলবো হ্যাঁ, অবশ্যই হওয়া উচিত; দেশের গোয়েন্দা পুলিশের আমার কাছে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিল কিনা, হ্যাঁ ছিল। উচিত তো অনেক কিছু ছিল…

হ্যাঁ, আমার সাথে ফেসবুকে ফারসীম এবং তার স্ত্রী যোগাযোগ করেছিলেন, তাঁরা যে নির্দোষ সেটা প্রতিষ্ঠা করতে সহযোগিতা করার অনুরোধ করে। আমি উত্তর দেইনি। প্রথমত, আমার তখন উত্তর দেয়ার মত মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা ছিল না, দ্বিতীয়ত আমি যেহেতু কিছুই জানি না, তাই তাদেরকে এদিক বা ওদিক কোনটাই বলতে চাইনি। আমি দেখেছিলাম অভির বাবা ড. অজয় রায় এ নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এই মানুষটাকে আমি খুব কমই দেখেছি না জেনে বাজে বকতে। তাই ওনার কোন কথার সাথে না জেনে না শুনে কন্ট্রাডিক্ট করার চেয়ে চুপ করে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেছি। না, বাবার সাথে আমার কোনদিন এ নিয়ে কোন কথা হয়নি।

হয়তো আপনারা এই ১৬ মাসে (এবং আগেও যারা আমাকে মুক্তমনায় দেখেছেন) খেয়াল করেছেন আমি ভালোভাবে কিছু না জেনে কথা বলতে পছন্দ করি না। অভিসহ অনেকেই অনেক অনুযোগ করতো আমি আরো বেশি লিখি না কেন। আমার উত্তর একটাই, আমি নিজেকে সব কিছু নিয়ে লেখার যোগ্য মনে করিনা। এখনো কিছু হলেই পত্রিকাগুলো লেখা চায়, সিএনএন, বিবিসিসহ বিভিন্ন নেটোয়ার্ক ইন্টারভিউ চায়, ৯৯ ভাগ সময়েই আমি না করে দেই। অযথাই ওদের ‘নিউজ’ হতে আমার ভাল লাগেনা। বিবর্তনের পথ ধরে বইটা লিখেছিলাম কারণ বিবর্তন নিয়ে ব্যক্তিগত এবং একাডেমিকভাবে অনেক পড়াশুনা করেছিলাম বহু বছর ধরে।

আমরা সন্ত্রাসের স্বীকার হয়েছি বলেই নিজেকে এ বিষয়ে একজন পণ্ডিত বলে মনে করিনা। এর পিছনে যে কতটা আন্তর্জাতিক এবং আভ্যন্তরীণ সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি এবং অর্থনীতির পলিসি থেকে শুরু করে, ঐতিহাসিকভাবে সমাজে ধর্মের এভেইলিবিলিটি এবং ধর্মীয় মৌলবাদের আমদানি-রপ্তানি, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ধর্মের চাষ, একটা জাতির আইডেন্টিটি, শ্রেণী-সম্পর্ক, গ্লোবালাইজেশন এবং প্রযুক্তির সমন্বয়সহ কত জটিল ব্যাপার জড়িত হয়ে আছে সেগুলো নিয়ে জানতে শুরু করলে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়। আরেকটু জেনে বুঝে দেখে পড়ে গবেষণা করে এ নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছে আছে। যতটা না ইচ্ছা লেখার তার চেয়ে অনেক বেশী ইচ্ছা একটা ডায়ালগ শুরু করার। দেখি কতদূর কী হয়। দেশে বিদেশে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন দেখি সবাই কত সহজেই এক নিঃশ্বাসে এত বড় একটা সমস্যার সমাধান দিয়ে ফেলেন তখন বড্ড অসহায় লাগে।

অসহায় তো অনেক কিছুতেই লাগে, কী বা করার আছে!

আমি কাউকে সন্দেহপ্রকাশে বা মতপ্রকাশে বিরত রাখতে পারি না। শুধু এটুকু মনে করিয়ে দিতে পারি হয়ত, যে আমাদের কিছু ব্যাপারে, বিশেষত যেখানে অন্য মানুষের জীবন বা গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যাপার জড়িত, আরো কিছু দায়িত্বশীলভাবে নিজের মতামত জানাতে। ড্রয়িংরুমের অনেককিছুই ফেসবুকে উঠে আসে, কিন্তু সেসব মুছে যায় না, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সেসবের দায়িত্ব কি আমরা নিতে সক্ষম?

[2953 বার পঠিত]

এই লেখাটি শেয়ার করুন:
0